বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

আরোহী পদ্ধতি কী ও আরোহী পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও অসুবিধা কী কী?

জানা থেকে অজানা, মূর্ত থেকে বিমূত, সহজ থেকে কঠিন, বিশেষ থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া, উদাহরণ থেকে সূত্র গঠন করাকে আরোহী পদ্ধতি বলে।

আরোহী এবং অবরোহী হলো এমন দুইটি সনাতন পদ্ধতি যা পূর্বেও যেমন বহুল ব্যবহৃত হয়েছে তেমন আধুনিক যুগের শিক্ষাবিদরাও শ্রেণিকক্ষে এগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দেন। শ্রেণিকক্ষে আরোহী ও অবরোহী পদ্ধতি এখনো খুবই গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে; এর ব্যবহার ও কার্যকারিতার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। এখানে আরোহী পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা করা হয়েছে।

আরোহী পদ্ধতি কী? (What Is the Inductive Method)

যে পদ্ধতিতে উদাহরণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সূত্র বা সংজ্ঞা গঠন করা হয় তা হলো আরোহী পদ্ধতি। ‘আরোহী পদ্ধতি’ ইংরেজি হলো Inductive ‘Method’।

জানা থেকে অজানা, মূর্ত থেকে বিমূত, সহজ থেকে কঠিন, বিশেষ থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া, উদাহরণ থেকে সূত্র গঠন করাকে আরোহী পদ্ধতি বলে। বাংলা ব্যাকরণ পাঠদানে এই পদ্ধতি অধিক ফলপ্রসূ। এই কারণে, এই পদ্ধতি সম্পর্কে বাংলা শিক্ষককে বিশেষ ভাবে অবগত হওয়ার পরামর্শ দেয়া যায়।

কতগুলো উদাহরণ ভালো ভাবে পরীক্ষা করে সেগুলো থেকে যদি যুক্তির সাহয্যে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় বা সূত্র গঠন করা যায় তবেই আরোহী পদ্ধতি কার্যকর হয়। আরোহী পদ্ধতির মূল কথা হলো ‘উদাহরণ থেকে সূত্র’।

শিক্ষার্থীর সামনে কতগুলো উদাহরণ তুলে ধরলে তারা সেগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে নিজস্ব চিন্তা ও যুক্তি-বিন্যাস ক্ষমতা দ্বারা স্বাভাবিক পথে সূত্র বা সিদ্ধান্তে পৌঁছবে।

যেমন: সূত্র মুখস্থ না করে ‘পদ’ শেখানোর জন্য শিক্ষক পাঁচটি ভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে তৈরি একটি তোড়া শ্রেণিকক্ষে প্রদর্শন করতে পারেন উদাহরণ স্বরূপ। একটি করে ফুল তোড়া থেকে খুলে নাম বলতে পারেন। গোলাপ গাঁদা, চামেলী, গন্ধরাজ, লিলি ইত্যাদি প্রতিটি এক-একটি ভিন্ন ফুল। বাক্যের অন্তর্গত প্রতিটি শব্দকে তেমনি বলা যায় যে, এক-একটি পদ অথবা বাক্যের অন্তর্গত প্রতিটি শব্দকে পদ বলে। এভাবে সূত্র গঠন করা যায়। 

জানা থেকে অজানা, মূর্ত থেকে বিমূত, সহজ থেকে কঠিন, বিশেষ থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া, উদাহরণ থেকে সূত্র গঠন করাকে আরোহী পদ্ধতি বলে।

আরোহী পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য

  • আরোহী পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা এক দিকে যেমন নিষ্ক্রিয় শ্রোতা হয়ে বসে থাকে না, অন্যদিকে তেমনি বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে একটা নতুন তত্ত্ব ও তথ্য উদঘাটনের আনন্দ লাভ করে। 
  • কোনো সর্বজনীন সত্য বা সাধারণ সূত্র নির্ণয়ের জন্য কতকগুলো বিশেষ দৃষ্টান্তের সহায়তায় তার সত্যতা যাচাই করা হয়।
  • আরোহী পদ্ধতির অনুমান পরীক্ষা প্রসূত।
  • আরোহী পদ্ধতিতে প্রাপ্ত সাধারণ সিদ্ধান্তকে সব সময় চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া যায় না। তবে সেগুলো সঠিক হবার সম্ভাবনা বেশি।
  • আরোহী পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর গাণিতিক ক্ষেত্রে, কেননা গণিতের প্রাথমিক রূপই হলো আরোহী। ব্যাকরণ শেখানোর ক্ষেত্রেও আরোহী পদ্ধতি খুবই উপযোগী।
  • আরোহী পদ্ধতি একটি মনোবিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি।

আরোহী পদ্ধতির সুবিধা

  • আরোহী পদ্ধতিতে যেহেতু উদাহরণ থেকে সূত্রে, সহজ থেকে কঠিন, জানা থেকে অজানায়, বিশেষ সত্য থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া যায় সেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করা সহজ হয়।
  • শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা সঙ্গে এবং বাস্তব ঘটনার সঙ্গে আরোহী পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • আরোহী পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ, চিন্তন ও পরীক্ষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
  • শিক্ষার্থীরা নিজ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে আবিষ্কার করতে হয় তা শেখে এবং কিছুটা আবিষ্কারের আনন্দও তারা লাভ করে।
  • ছোটো ছোটো অভিজ্ঞতা থেকে সূত্র নির্মাণ করা গণিতের যে একটি প্রধান কাজ, তা এই পদ্ধতি থেকে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও সহজে কাজে লাগানো যায়।
  • না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতা, নিরানন্দ পঠন ও বাড়ির কাজের চাপ থেকে আরোহী পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেয়।
  • শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার এবং অনুসন্ধান করার সুযোগ সৃষ্টি করে আরোহী পদ্ধতি।
  • শিক্ষার্থীরা আরোহী পদ্ধতিতে সক্রিয় থাকে। 
  • আরোহী পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নিজের বুদ্ধি, চিন্তা ও বিচার শক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসতে পারে।

আরোহী পদ্ধতির অসুবিধা/সমস্যা 

  • আরোহী পদ্ধতির মাধ্যমে সূত্র গঠন করলেই বিষয়টির পাঠ শেষ হয়ে যায় না। সূত্র প্রয়োগ করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করলেই শিক্ষার্থীর মনে বিষয়টি সম্বন্ধে ধারণা দৃঢ় হয়।
  • গণিতের ক্ষেত্রে আরোহী পদ্ধতির প্রয়োগের কথা বলা হলেও এর ব্যবহার সীমিত।
  • উচ্চ শ্রেণিতেতে আরোহী পদ্ধতি কম কার্যকর অথবা কার্যকরই নয়। এখানে অপ্রয়োজনীয় অংশ বা পুনরাবৃত্তির জন্য একঘেয়েমী ও ক্লান্তি আসা অসম্ভব নয়।
  • সাধারণভাবে আরোহী পদ্ধতি দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ।
  • আরোহী পদ্ধতি দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য সমস্যা সমাধানে বিশেষ সহায়ক হয় না।

আরোহী পদ্ধতির বেশ কিছু অসুবিধা থাকার পরেও শিক্ষাবিদরা শ্রেণিকক্ষে এই পদ্ধতি প্রয়োগের পরামর্শ দেন কারণ এতে সাধারণ শিক্ষার্থী বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই পাঠের সাথে সংযোগ ঘটাতে পারে।

আহমেদ মিন্টো
মিন্টো একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং বিশ্লেষণ'র কন্ট্রিবিউটর।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ