০৮:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন এবং যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা

একুশ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট পূর্ববাংলা আইন  পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮ টি আসন লাভ করে; পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।
বিশ্লেষণ সংকলন টিম
  • প্রকাশ: ০৭:৩০:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • / ২৬৫ বার পড়া হয়েছে

মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন শেখ মুজিব। ১০ মে ১৯৫৪।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের জাগরণের ক্ষেত্রে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যুক্তফ্রন্ট হচ্ছে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরূদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কয়েকটি বিরোধী দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ঐক্যজোট। যুক্তফ্রন্ট এ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ সরকারকে পরাজিত করে পূর্ব বাংলায় তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন তথা ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের ব্যপক সাফল্য জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে পূর্ব বাংলার প্রতি ক্সবষম্যমূলক ও ঊপনিবেশিক নীতি অনুসরণ করতে থাকে। ফলে সকল ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সকল রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে লিয়াকত আলী খান, সোহরাওয়ার্দীর পরিবর্তে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এর প্রতিবাদে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর জন্ম হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ বাঙালিদের দাবি দাওয়ার সাংগঠনিক মুখপাত্রে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৫৪ সালের ১১ মার্চ পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করলে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নে․কা। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ভিত্তিতে তরুণ ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি

একুশ দফা  ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগ শাসনের অবসানকল্পে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর  যুক্তফ্রণ্ট নামে এক নির্বাচনী মোর্চা গঠিত হয়। এ মোর্চা গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি এ.কে ফজলুল হক, আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যুক্তফ্রণ্টের পক্ষ থেকে ২১টি প্রতিশ্রুতি সম্বলিত যে নির্বাচনী মেনিফেস্টো ঘোষণা করা হয় তা-ই ২১-দফা নামে পরিচিত। এ ২১-দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ:

  • ১. বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে;
  • ২. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সকল খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। খাজনার পরিমাণ হ্রাস এবং সার্টিফিকেট জারির মাধ্যমে খাজনা আদায় প্রথা রহিত করা হবে;
  • ৩. পাটব্যবসা জাতীয়করণ করে তা পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং মুসলিম লীগ শাসনামলের পাট-কেলেঙ্কারি তদন্ত ও অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে;
  • ৪. কৃষিক্ষেত্রে সমবায় প্রথা প্রবর্তন এবং সরকারি অর্থ সাহায্যে কুটিরশিল্পের উন্নয়ন সাধন করা হবে;
  • ৫. পূর্ববঙ্গকে লবণশিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে এবং লবণ-কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে;
  • ৬. কারিগর শ্রেণির গরিব মোহাজেরদের কর্মসংস্থানের আশু ব্যবস্থা গৃহীত হবে;
  • ৭. খাল খনন ও সেচব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে বন্যা ও দুর্ভিক্ষ রোধের সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়া হবে;
  • ৮. পূর্ববঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ওখঙ) মূলনীতি মাফিক শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে;
  • ৯. দেশের সর্বত্র অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হবে;
  • ১০. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ করে সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে;
  • ১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইনসহ সকল প্রতিক্রিয়াশীল আইন বাতিল করে সকলের জন্য উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা হবে;
  • ১২. শাসন পরিচালনা ব্যয় হ্রাস করা হবে; যুক্তফ্রণ্টের কোনো মন্ত্রী এক হাজার টাকার বেশি বেতন গ্রহণ করবেন না;
  • ১৩. দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-রিশ্ওয়াত বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে;
  • ১৪. জননিরাপত্তা আইন, অর্ডিন্যান্স ও অনুরূপ কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দির মুক্তি, রাষ্ট্রদ্রোহিতায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার এবং সংবাদপত্র ও সভাসমিতি করার অবাধ অধিকার নিশ্চিত করা হবে;
  • ১৫. বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে;
  • ১৬. বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রণ্টের প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল নির্ধারণ করা হবে এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথমে ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা হবে;
  • ১৭. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং শহীদদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে;
  • ১৮. একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হবে;
  • ১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত সকল বিষয় পূর্ববাংলা সরকারের অধীনে আনয়ন; দেশরক্ষাক্ষেত্রে স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে এবং নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন; এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা স্থাপন ও আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হবে;
  • ২০. কোন অজুহাতে যুক্তফ্রণ্ট মন্ত্রিসভা কর্তৃক আইন পরিষদে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না; নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পূর্বে মন্ত্রিসভা পদত্যাগপূর্বক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে;
  • ২১. যুক্তফ্রণ্টের আমলে সৃষ্ট শূণ্য আসনে তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে এবং পর পর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট-প্রার্থী পরাজিত হলে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবে।

একুশ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট পূর্ববাংলা আইন  পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮ টি আসন লাভ করে; পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।  বলা যায় যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে, সেটিকে ১, ১৬, ১৭ ও ১৮নং দফায় স্থায়ীরূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আর ১৯ নং দফায় পূর্ব বাংলার জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয়। এভাবে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের উপর বিশেষ জোর দেয় এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রাধান নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করে।

সূত্র: শেখ মুজিবুর রহমান রচিত অসমাপ্ত অত্মজীবনী এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

একুশ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট পূর্ববাংলা আইন  পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮ টি আসন লাভ করে; পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন এবং যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা

প্রকাশ: ০৭:৩০:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের জাগরণের ক্ষেত্রে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যুক্তফ্রন্ট হচ্ছে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরূদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কয়েকটি বিরোধী দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ঐক্যজোট। যুক্তফ্রন্ট এ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ সরকারকে পরাজিত করে পূর্ব বাংলায় তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন তথা ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের ব্যপক সাফল্য জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে পূর্ব বাংলার প্রতি ক্সবষম্যমূলক ও ঊপনিবেশিক নীতি অনুসরণ করতে থাকে। ফলে সকল ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সকল রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে লিয়াকত আলী খান, সোহরাওয়ার্দীর পরিবর্তে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এর প্রতিবাদে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর জন্ম হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ বাঙালিদের দাবি দাওয়ার সাংগঠনিক মুখপাত্রে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৫৪ সালের ১১ মার্চ পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করলে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নে․কা। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ভিত্তিতে তরুণ ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি

একুশ দফা  ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগ শাসনের অবসানকল্পে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর  যুক্তফ্রণ্ট নামে এক নির্বাচনী মোর্চা গঠিত হয়। এ মোর্চা গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি এ.কে ফজলুল হক, আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। যুক্তফ্রণ্টের পক্ষ থেকে ২১টি প্রতিশ্রুতি সম্বলিত যে নির্বাচনী মেনিফেস্টো ঘোষণা করা হয় তা-ই ২১-দফা নামে পরিচিত। এ ২১-দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ:

  • ১. বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে;
  • ২. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সকল খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। খাজনার পরিমাণ হ্রাস এবং সার্টিফিকেট জারির মাধ্যমে খাজনা আদায় প্রথা রহিত করা হবে;
  • ৩. পাটব্যবসা জাতীয়করণ করে তা পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং মুসলিম লীগ শাসনামলের পাট-কেলেঙ্কারি তদন্ত ও অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে;
  • ৪. কৃষিক্ষেত্রে সমবায় প্রথা প্রবর্তন এবং সরকারি অর্থ সাহায্যে কুটিরশিল্পের উন্নয়ন সাধন করা হবে;
  • ৫. পূর্ববঙ্গকে লবণশিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে এবং লবণ-কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে;
  • ৬. কারিগর শ্রেণির গরিব মোহাজেরদের কর্মসংস্থানের আশু ব্যবস্থা গৃহীত হবে;
  • ৭. খাল খনন ও সেচব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে বন্যা ও দুর্ভিক্ষ রোধের সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়া হবে;
  • ৮. পূর্ববঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ওখঙ) মূলনীতি মাফিক শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে;
  • ৯. দেশের সর্বত্র অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হবে;
  • ১০. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ করে সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে;
  • ১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইনসহ সকল প্রতিক্রিয়াশীল আইন বাতিল করে সকলের জন্য উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা হবে;
  • ১২. শাসন পরিচালনা ব্যয় হ্রাস করা হবে; যুক্তফ্রণ্টের কোনো মন্ত্রী এক হাজার টাকার বেশি বেতন গ্রহণ করবেন না;
  • ১৩. দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-রিশ্ওয়াত বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে;
  • ১৪. জননিরাপত্তা আইন, অর্ডিন্যান্স ও অনুরূপ কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দির মুক্তি, রাষ্ট্রদ্রোহিতায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার এবং সংবাদপত্র ও সভাসমিতি করার অবাধ অধিকার নিশ্চিত করা হবে;
  • ১৫. বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা হবে;
  • ১৬. বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রণ্টের প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল নির্ধারণ করা হবে এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথমে ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা হবে;
  • ১৭. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং শহীদদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে;
  • ১৮. একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হবে;
  • ১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত সকল বিষয় পূর্ববাংলা সরকারের অধীনে আনয়ন; দেশরক্ষাক্ষেত্রে স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে এবং নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন; এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা স্থাপন ও আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হবে;
  • ২০. কোন অজুহাতে যুক্তফ্রণ্ট মন্ত্রিসভা কর্তৃক আইন পরিষদে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না; নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পূর্বে মন্ত্রিসভা পদত্যাগপূর্বক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে;
  • ২১. যুক্তফ্রণ্টের আমলে সৃষ্ট শূণ্য আসনে তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে এবং পর পর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট-প্রার্থী পরাজিত হলে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবে।

একুশ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রণ্ট পূর্ববাংলা আইন  পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮ টি আসন লাভ করে; পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।  বলা যায় যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে, সেটিকে ১, ১৬, ১৭ ও ১৮নং দফায় স্থায়ীরূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আর ১৯ নং দফায় পূর্ব বাংলার জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয়। এভাবে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের উপর বিশেষ জোর দেয় এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রাধান নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করে।

সূত্র: শেখ মুজিবুর রহমান রচিত অসমাপ্ত অত্মজীবনী এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া