০২:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

বিজ্ঞানজগতে একজন কিংবদন্তি নোবেল বিজয়ী ফেরিদ মুরাদ এবং নাইট্রিক  অক্সাইড

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
  • প্রকাশ: ০৯:১৭:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • / ৫৪০ বার পড়া হয়েছে

ড. ফেরিদ মুরাদ | ছবি: DePauw University

ফেরিদ মুরাদ ছিলেন একজন বিখ্যাত আলবেনীয়-আমেরিকান চিকিৎসক এবং ফার্মাকোলজিস্ট। ১৯৯৮ সালে তিনি নাইট্রিক অক্সাইড আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে  নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞানজগতে ফেরিদ মুরাদের আবিষ্কার শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকে, যখন তিনি নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন, এই পদার্থটি আলফ্রেড নোবেল ১৮৬৭ সালে ডিনামাইট আবিষ্কার করতে ব্যবহার করেছিলেন। নোবেলের কারখানার কর্মীরা প্রথম বিস্ফোরক পদার্থের একটি অদ্ভুত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছিলেন। কারখানার ভিতরে নাইট্রোগ্লিসারিনের ধোঁয়া নিঃশ্বাসে নিলে কঠোর পরিশ্রমের ফলে তাদের যে বুকের ব্যথা, তা প্রশমিত হয়ে যায়। শীঘ্রই, চিকিৎসকরা অ্যানজিনা, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য হৃদসংবহন-সম্বন্ধীয় রোগের প্রতিকার হিসেবে নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহার করতে শুরু করেন। মুরাদের আবিষ্কারের পূর্বে কেউ জানতেন না যে এটি কীভাবে কাজ করে। একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে মুরাদ আবিষ্কার করেন যে নাইট্রোগ্লিসারিন রূপান্তরিত হয় নাইট্রিক অক্সাইডে, যা রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষগুলিকে শিথিল করে। বিজ্ঞানের জগতে খুব সহজে এই ধারণাটি গ্রহণ করতে পারেনি যে একটি বিষাক্ত পদার্থের এত গভীর জৈবিক প্রভাব কীভাবে থাকতে পারে।

১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আলবেনীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে ফেরিদ মুরাদের জন্ম। মুরাদের বাবা ছিলেন মুসলিম। তিনি অভিবাসী হয়ে নিউ ইয়র্কে আসেন। মুরাদের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে। তিনি এমডি-পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি থেকে। ফেরিদ মুরাদ অধ্যাপনা করেন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। গবেষণায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই বেছে নিয়েছিলেন ফার্মাকোলজি। বলা যায় ভীষণ নেশা ছিল তার এই বিষয়টি নিয়ে, বিশেষকরে ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি। তিনি তার গবেষণায় দেখেছিলেন যে সাইক্লিক গুয়ানোসিন মনোফসফেট (cGMP/সিজিএমপি) নামক একটি অণু রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। রক্তনালির টিস্যু ব্যবহার করে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে যান তিনি। তার গবেষণায় হঠাৎ-ই খুঁজে পেলেন এই নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাসীয় পদার্থটিকে। মুরাদের আবিষ্কার উম্মোচন করে দেয় চিকিৎসার নানা দিক। বিশেষকরে, রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম-প্রাপ্ত রিলাক্সিং ফ্যাক্টর হিসেবে হৃদসংবহন সিস্টেমে নাইট্রিক অক্সাইড আবিষ্কারের পর থেকে, গবেষকরা চিকিৎসাশাস্ত্রে বিস্তৃত পরিসরে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা চিহ্নিত করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফেরিদ মুরাদ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ১৯৯৮ সালে, সাথে ছিলেন আরো দুই বিজ্ঞানী: রবার্ট ফুরগট ও লুই ইগনারো।

ড. ফেরিদ মুরাদ | ছবি: DePauw University
ড. ফেরিদ মুরাদ | ছবি: DePauw University

নাইট্রিক অক্সাইড কী?

মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ী জীবের মধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড হলো দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং জৈবিক প্রক্রিয়ায় জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসীয় সংকেতবাহী অণু। এটি একটি স্নেহ-আকর্ষী অণু যা ব্যাপন প্রক্রিয়ায় খুব সহজেই কোষঝিল্লি অতিক্রম করতে সক্ষম। এটি ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং প্রাণিকোষসহ প্রায় সব ধরনের জীবের একটি ক্ষণস্থায়ী জৈবপণ্য। এটি একটি মুক্ত র‌্যাডিক্যাল যা দেহের অনেক জৈবিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। নাইট্রিক অক্সাইড তিন ধরনের নাইট্রিক অক্সাইড সিন্থেজ (NOS/এনওএস) এনজাইম দ্বারা অ্যামিনো অ্যাসিড এল-আরজিনিন (অক্সিজেন এবং NADPH এর সহযোগিতায়) থেকে (এমনকি, অজৈব নাইট্রেটের বিজারণ থেকেও) সংশ্লেষিত হয়। এনওএস এনজাইমটি স্নায়ুকোষে নার্ভিয়-এনওএস (nNOS/NOS-1) এবং  রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম (অভ্যন্তরীণ আস্তরণ) কোষে এন্ডোথেলীয়-এনওএস (eNOS/NOS-3) নামে অভিহিত। উভয় ক্ষেত্রে এনওএস ক্যালসিয়াম/ক্যালমোডুলিন (calmodulin)-নির্ভর। এছাড়াও রয়েছে ক্যালসিয়াম-অনির্ভর সাইটোকাইন-ইন্ডিউসিবল এনওএস (iNOS/NOS-2), যা ফ্যাগোসাইট-জাতীয় কোষ (যেমন মনোসাইট, ম্যাক্রোফেজ, নিউট্রোফিল)গুলিতে বেশি পাওয়া যায় এবং দেহের অনাক্রম্যতায় মূল ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ও সার্স-কোভি-২ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহৃত হয়েছিল নাইট্রিক অক্সাইড।

কোষে, নার্ভিয় ও এন্ডোথেলীয় এনওএস-প্রাপ্ত নাইট্রিক অক্সাইডের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি হলো এনজাইম গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (GC), যা সিজিএমপি সংশ্লেষণ করে। তবে, কোষের ভিতর অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি সিজিএমপি সংশ্লেষণকে বাধাগ্রস্থ করে। শারীরবিদ্যা ও চিকিৎশাস্ত্রে,  রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম-উদ্ভুত নাইট্রিক অক্সাইড-কে একটি হৃদসংবহন-সংকেতবাহী অণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এন্ডোথেলিয়াম নাইট্রিক অক্সাইড ব্যবহার ক’রে আশেপাশের মসৃণ পেশি কোষগুলিকে শিথিল করার জন্য সঙ্কেত দেয়, যার ফলে রক্তনালির প্রসারণ (ভাসোডাইলেশন) ঘটে এবং রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। নাইট্রিক অক্সাইডের এই প্রভাবটি কার্যকর হয় এন্ডোথেলিন বি রিসেপ্টর (ETB) প্রোটিনের মাধ্যমে। এন্ডোথেলীয় ও মসৃণ পেশি কোষের পাশাপাশি, স্নায়ুপ্রান্ত এবং মসৃণ পেশি কোষগুলির মধ্যে যোগাযোগও সরবরাহ করে নাইট্রিক অক্সাইড। প্রিসিন্যাপ্টিক স্নায়ুপ্রান্তে, নাইট্রিক অক্সাইড γ-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড (GABA), গ্লুটামেট এবং নরএপিনেফ্রিনের মুক্তিকে উদ্দীপিত করে। এছাড়াও, নাইট্রিক অক্সাইডের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়া, ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষা, প্রদাহমূলক প্রতিক্রিয়া, অনুচক্রিকাগুলিকে জমাট বাধা থেকে প্রতিহত করা, লিঙ্গোত্থান, স্নায়ুসংকেতসংবহন, আয়ন চ্যানেলের সমন্বয় ইত্যাদি। উপরন্তু, এটি গ্রোথ হরমোন ও ইনসুলিনসহ অন্যান্য হরমোন নিঃসরণকেও উদ্দীপিত করতে পারে।

ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেলের মধ্যদিয়ে বহিঃকোষীয় ক্যালসিয়াম কোষের ভিতর প্রবেশ করে। তবে,  কোষে ক্যালসিয়ামের আধিক্য দেহে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন সৃষ্টি করতে পারে। তাই, উচ্চ রক্তচাপজনিত চিকিৎসা ব্যবস্থায়, এল-টাইপ ক্যালসিয়াম চ্যানেল প্রতিরোধক/অ্যান্টাগোনিস্ট, যেমন অ্যামলোডিপিন, হৃৎপিন্ডীয় এবং রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষে ক্যালসিয়াম আয়ন চলাচলে বাধা দেয় এবং বৃদ্ধি করে এন্ডোথেলীয় নাইট্রিক অক্সাইড, ফলে রক্তনালিগুলির প্রসারণ ঘটে ও উচ্চ রক্তচাপ কমে আসে। 

নাইট্রিক অক্সাইডের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সিজিএমপি উৎপাদন

গুয়ানোসিন ট্রাইফসফেট (GTP/জিটিপি) থেকে এনজাইম গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (GC) দ্বারা সংশ্লেষিত হয় সাইক্লিক গুয়ানোসিন মনোফসফেট, সংক্ষেপে সিজিএমপি (cGMP)। গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ দুই ধরণের। ঝিল্লি-আবদ্ধ এনজাইমটি সক্রিয় হয় পেপ্টাইড হরমোন, যেমন অ্যাট্রিয় নেট্রিউরেটিক পেপ্টাইড (ANP) দ্বারা, যখন দ্রবণীয় গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (sGC) উদ্দীপ্ত হয় সরাসরি ঝিল্লি-ভেদ্য নাইট্রিক অক্সাইড দ্বারা। উপরন্তু, জিটিপি থেকে সিজিএমপি রূপান্তরটি নিয়ন্ত্রিত হয় কোষীয় ক্যালসিয়ামের পরিমাণের উপর। কোষের ভিতর উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি সিজিএমপি সংশ্লেষণকে বাধাগ্রস্থ করে, যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সিএএমপি (cAMP) এর মতো, সিজিএমপি হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহী অণু, যা সক্রিয় করে অন্তঃকোষীয় প্রোটিন কাইনেজ জি (PKG/পিকেজি) এনজাইমকে। বহুমুখী অণু হিসেবে সিজিএমপি নানা ধরনের জৈবিক প্রভাব ফেলতে পারে কোষাভ্যন্তরে, তবে সেগুলি পিকেজি সক্রিয়করণের মাধ্যমেই মধ্যস্থতা করা হয়। নাইট্রিক অক্সাইডের অনেক প্রভাবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রক্তনালির শিথিলকরণ (ভাসোডাইলেশন)। সিজিএমপি দ্বারা পিকেজি সক্রিয়করণের ফলে মায়োসিন ফসফেটেজ এনজাইমটি সক্রিয় হয়, যা মায়োসিন হালকা চেইনকে ফসফেট মুক্ত করে, যার ফলস্বরূপ মসৃণ পেশি কোষে অন্তঃকোষীয় স্টোর থেকে বেশ সীমিতপরিমাণে ক্যালসিয়াম নিঃসৃত হয়। যার ফলে কোষে ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং যথাক্রমে, মসৃণ পেশি শিথিল হয়, প্রসারিত হয় রক্তনালি এবং বৃদ্ধি পায় রক্ত সঞ্চালন। রক্তনালির শিথিলকরণের ক্ষেত্রে নাইট্রিক অক্সাইড মূলত পার্শ্ববর্তী এন্ডোথেলিয়াল কোষে উৎপন্ন হয়, যা মসৃণ পেশি কোষে দ্রবণীয় গুয়ানাইলেট সাইক্লেজকে সক্রিয় করে সিজিএমপি উৎপাদন করে। অনেক আয়ন চ্যানেল (যেমন সোডিয়াম ও পটাশিয়াম চ্যানেল)-র কার্যকলাপও নিয়ন্ত্রণ করে সিজিএমপি। কোষে পিকেজি-এর অন্যান্য প্রভাবও রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ এই এনজাইমটি অনেকগুলি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (যেমন CREB)কে সক্রিয় করে, যা জিনের অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিভিন্ন উদ্দীপনায় কোষের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে (ছবি দেখুন)। 

অনেক আয়ন চ্যানেল (যেমন সোডিয়াম ও পটাশিয়াম চ্যানেল)-র কার্যকলাপও নিয়ন্ত্রণ করে সিজিএমপি। কোষে পিকেজি-এর অন্যান্য প্রভাবও রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ এই এনজাইমটি অনেকগুলি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (যেমন CREB)কে সক্রিয় করে, যা জিনের অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিভিন্ন উদ্দীপনায় কোষের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে

ফসফোডাইস্টেরেজ (বিশেষ করে PDE-5) নামে পরিচিত এনজাইম দ্বারা সিজিএমপি-কে আবার জিটিপিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। সিজিএমপি-কে জিটিপিতে রূপান্তর কার্যকরভাবে নাইট্রিক অক্সাইড সংকেতকে ব্লক করে। ফলে, রক্তনালি আর প্রসারিত থাকে না। এখন বেশ কিছু ওষুধ রয়েছে যা ফসফোডাইস্টেরেজ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং নাইট্রিক অক্সাইড/সিজিএমপি সঙ্কেত পুনরুদ্ধার করতে পারে। সম্ভবত এই শ্রেণির ওষুধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলো যৌন উত্তেজক সিলডেনাফিল বা ভায়াগ্রা, যা রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষগুলিতে সিজিএমপি-এর সংশ্লেষণ বাড়ায়, সক্ষম করে তোলে লিঙ্গোত্থানে। এখানে উল্লেখ্য, মানুষসহ অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণিদের সিজিএমপি সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রিত হয় জৈবিক ঘড়ি দ্বারা। মধ্যরাত থেকে শেষরাত পর্যন্ত প্লাজমা সিজিএমপির মাত্রা থাকে সবচেয়ে বেশি। দিনের আলোয় PDE-5 এনজাইমের আবির্ভাবে cGMP-এর সংশ্লেষণ কমে আসে তলানিতে।

এছাড়াও, চোখের দৃষ্টিগত সংকেতসংবহনে (ফটোট্রান্সডাকশন), সিজিএমপি একটি বার্তাবাহী অণু হিসেবে কাজ করে। nNOS দ্বারা চোখের মধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি হয় রেটিনার ফটোরিসেপ্টর (বিশেষকরে রড-কোষ) এবং বাইপোলার কোষগুলিতে। রডকোষে NO-cGMP ক্যালসিয়ামের প্রবাহ বৃদ্ধি করে, যা সান্ধ্যকালীন দৃষ্টি-প্রত্যক্ষণে মধ্যস্থতা করে। দিনের আলোয় চোখের ফটোরিসেপ্টর কোষগুলিতে PDE5-কে সক্রিয় করে, ফলে কোষে সিজিএমপি এর পরিমাণ কমে আসে। ফলস্বরূপ, ফটোরিসেপ্টরগুলিতে সোডিয়াম আয়ন চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়, যা ফটোরিসেপ্টরের কোষগুলিকে রেস্টিং পটেনশিয়ালের তুলনায় অধিকতর ঋণাত্মক করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় দিনের আলোয় দৃষ্টি-প্রত্যক্ষণের তথ্য পাঠানো হয় মস্তিষ্কে।

ডায়াবেটিস রোধে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা

টাইপ২ ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। এই ক্ষতি উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য অঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতিও হতে পারে। যেহেতু নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালিগুলির প্রসারণের সাথে ওতপ্রোত, তাই এটি রক্তচাপ কমায় এবং অঙ্গের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। এছাড়াও, ডায়াবেটিস স্বয়ং নাইট্রিক অক্সাইডের জৈব উপলভ্যতাও হ্রাস করতে পারে। ফলে এন্ডোথেলীয় কর্মহীনতার মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা হৃদরোগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। 

নাইট্রিক অক্সাইড অন্তঃস্রাবী অগ্ন্যাশয়ে উৎপাদিত হয় এবং ইনসুলিনের সংশ্লেষণ এবং নিঃসরণে অবদান রাখে। তবে, ইনসুলিন নিঃসরণে নাইট্রিক অক্সাইডের সম্ভাব্য ভূমিকা এখনও বিতর্কিত। এটি ইনসুলিন নিঃসরণে উদ্দীপক নাকি প্রতিরোধক-  তা নিয়ে উভয়দিকেই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে। তবে নাইট্রিক অক্সাইডের প্রভাব এর ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। বেশ কিছু গবেষণায় প্রমাণিত যে, নাইট্রিক অক্সাইড অন্তঃকোষীয় ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে, সাথে আইলেট/অগ্ন্যাশয় রক্তনালির স্ফীতি, ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায়। অপরদিকে, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে যে, ইনসুলিন হরমোন ফসফ্যাটিডিল ইনোসিটল ৩-(PI3)-কাইনেজ এবং প্রোটিন কাইনেজ বি (পিকেবি) এনজাইমগুলির মতো নির্দিষ্ট সংকেতপথের মাধ্যমে নাইট্রিক অক্সাইডের উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে। তবে নানা বিপাকীয় অস্বাভাবিকতা, যেমন ইনসুলিন প্রতিরোধ্যতা কিংবা অতিরিক্ত ইনসুলিনক্ষরণ (হাইপারইনসুলিনোমিয়া) নাইট্রিক অক্সাইড সিস্টেমকে ব্যাহত করে। এছাড়াও, ডায়াবেটিস প্রোটিন কাইনেজ সি (পিকেসি) এনজাইমকে সক্রিয় করে প্রাগ্রসর গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টগুলির উৎপাদন বৃদ্ধি করে, যা হৃদসংবহনতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে পারে।

নাইট্রিক অক্সাইড সরাসরি ধারণ করে এমন কোন সম্পূরক নেই। তবে আমাদের দেহ নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষ করতে যে দু’টি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড, যেমন এল-আরজিনিন এবং এল-সিট্রুলিন ব্যবহার করে সেগুলি সম্পূরক আকারেও পাওয়া যায়। এই সম্পূরকগুলি গ্রহণ করলে দেহে নাইট্রিক অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, নাইট্রেটযুক্ত খাদ্য (যেমন পালং শাক, বোক-চোই শাক, লেটাস, গাজর, বিট) থেকেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষিত হতে পারে। তবে, মাত্রা খুব বেশি হলে নাইট্রিক অক্সাইড শরীরের অভ্যন্তরে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। কিছু কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে, নাইট্রিক অক্সাইডের সম্পূরক ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের জন্য উপকারী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যামিনো অ্যাসিড এল-আরজিনিন ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে, যা রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে, যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে। একইভাবে, এল-সিট্রুলিন ইনসুলিন সিগন্যালিং এবং গ্লুকোজ হোমিওস্ট্যাসিস-কে উন্নত করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। নাইট্রিক অক্সাইডের এই শারীরবৃত্তীয় প্রভাবগুলি মূলত গুনাইলেট সাইক্লেজ-সিজিএমপি সংকেতপথ দ্বারা মধ্যস্থতা করে।

ক্যান্সার বিকাশে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা

সাধারণত, নার্ভিয়-এনওএস এবং এন্ডোথেলীয়-এনওএস দেহে অল্প পরিমাণে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন করে, যা একটি নিউরোট্রান্সমিটার, ভাসোডাইলেটর হিসেবে কাজ করতে পারে বা ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু, সাইটোকাইন-ইন্ডিউসিবল এনওএস এনজাইম জীবাণুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রচুর পরিমাণে নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষ করে। নাইট্রিক অক্সাইড ক্যান্সারের বিকাশ এবং দমন উভয় ক্ষেত্রেই একটি মূল নিয়ামক- এটি নির্ভর করে তার উৎস ও ঘনত্বের উপর। এটি বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সারের জন্য দায়ী হতে পারে, যেমন স্তন, ফুসফুস, প্রোস্টেট, কোলন, অগ্ন্যাশয় এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার। উচ্চ মাত্রার নাইট্রিক অক্সাইড ডিএনএ এর ভাঙ্গন ঘটাতে পারে, ডিএনএ মেরামত প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পরবর্তীকালে কোষ চক্র রোধকেও সংশোধন করে। কিছু পরিস্থিতিতে, টিউমারিজেনেসিস থেকে রক্ষা পেতে নাইট্রিক অক্সাইড কোষ চক্র রোধ ও অ্যাপোপটোসিস উভয়কে প্ররোচিত করে। আবার, অন্যান্য ক্ষেত্রে নাইট্রিক অক্সাইড কোষ চক্রের অগ্রগতিতে বিলম্ব ঘটাতে পারে,  অস্বাভাবিক ডিএনএ মেরামতের কারণে সৃষ্টি হতে পারে নানা মিউটেশন, ফলে তৈরি হয় নানা ধরণের টিউমার। বিপরীতে, M1 ম্যাক্রোফেজ এবং Th1 লিম্ফোসাইটের ইন্ডিউসিবল এনওএস  থেকে প্রাপ্ত উচ্চ মাত্রার নাইট্রিক অক্সাইড ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রক্ষাকারী টিউমার-বিরোধী প্রভাব প্রয়োগ করতে পারে।

উপসংহার

জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে ড. ফেরিদ মুরাদের অবদান অপরিসীম। নিউরোসায়েন্স, ফিজিওলজি এবং ইমিউনোলজিতে তিনি এক নতুন দিগন্ত উম্মুক্ত করেছেন। নোবেল পুরস্কারসহ অনেক স্বীকৃতি তিনি অর্জন করেছেন। ফেরিদ মুরাদ তাঁর জীবনকালেই দেখে গেছেন যে তাঁর আবিষ্কৃত নাইট্রিক অক্সাইড বিজ্ঞানজগতে একটি আলোড়িত বিষয়, যার জাগরণে ইতোমধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দেড় লাখ গবেষণা-প্রকাশনা। যদি আমরা সেই ফলাফলগুলির সারসংক্ষেপ করি, তাহলে এটি খুব স্পষ্ট যে নাইট্রিক অক্সাইড দেহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে একটি বার্তাবাহক অণু হিসেবে কাজ করে: শ্বেত রক্তকণিকায়, এটি সাইটোটক্সিক প্রভাবের মধ্যস্থতা করে; রক্তনালীতে, এটি মসৃণ পেশি কোষ শিথিলকরণের মাধ্যমে বৃদ্ধি করে রক্ত সঞ্চালন; এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে, এটি একটি নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৮৬ বছর বয়সে ফেরিদ মুরাদ প্রয়াত হলেন, কিন্ত রেখে গেলেন মানবকল্যানের জন্য অফুরান অবদান। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর জন্ম, সেপ্টেম্বর মাসেই তাঁর তিরোধান। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব আজ এক কৃতি বিজ্ঞানীকে হারালো।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

বিজ্ঞানজগতে একজন কিংবদন্তি নোবেল বিজয়ী ফেরিদ মুরাদ এবং নাইট্রিক  অক্সাইড

প্রকাশ: ০৯:১৭:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ফেরিদ মুরাদ ছিলেন একজন বিখ্যাত আলবেনীয়-আমেরিকান চিকিৎসক এবং ফার্মাকোলজিস্ট। ১৯৯৮ সালে তিনি নাইট্রিক অক্সাইড আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে  নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞানজগতে ফেরিদ মুরাদের আবিষ্কার শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকে, যখন তিনি নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন, এই পদার্থটি আলফ্রেড নোবেল ১৮৬৭ সালে ডিনামাইট আবিষ্কার করতে ব্যবহার করেছিলেন। নোবেলের কারখানার কর্মীরা প্রথম বিস্ফোরক পদার্থের একটি অদ্ভুত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছিলেন। কারখানার ভিতরে নাইট্রোগ্লিসারিনের ধোঁয়া নিঃশ্বাসে নিলে কঠোর পরিশ্রমের ফলে তাদের যে বুকের ব্যথা, তা প্রশমিত হয়ে যায়। শীঘ্রই, চিকিৎসকরা অ্যানজিনা, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য হৃদসংবহন-সম্বন্ধীয় রোগের প্রতিকার হিসেবে নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহার করতে শুরু করেন। মুরাদের আবিষ্কারের পূর্বে কেউ জানতেন না যে এটি কীভাবে কাজ করে। একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে মুরাদ আবিষ্কার করেন যে নাইট্রোগ্লিসারিন রূপান্তরিত হয় নাইট্রিক অক্সাইডে, যা রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষগুলিকে শিথিল করে। বিজ্ঞানের জগতে খুব সহজে এই ধারণাটি গ্রহণ করতে পারেনি যে একটি বিষাক্ত পদার্থের এত গভীর জৈবিক প্রভাব কীভাবে থাকতে পারে।

১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আলবেনীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে ফেরিদ মুরাদের জন্ম। মুরাদের বাবা ছিলেন মুসলিম। তিনি অভিবাসী হয়ে নিউ ইয়র্কে আসেন। মুরাদের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে। তিনি এমডি-পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি থেকে। ফেরিদ মুরাদ অধ্যাপনা করেন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। গবেষণায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই বেছে নিয়েছিলেন ফার্মাকোলজি। বলা যায় ভীষণ নেশা ছিল তার এই বিষয়টি নিয়ে, বিশেষকরে ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি। তিনি তার গবেষণায় দেখেছিলেন যে সাইক্লিক গুয়ানোসিন মনোফসফেট (cGMP/সিজিএমপি) নামক একটি অণু রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। রক্তনালির টিস্যু ব্যবহার করে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে যান তিনি। তার গবেষণায় হঠাৎ-ই খুঁজে পেলেন এই নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাসীয় পদার্থটিকে। মুরাদের আবিষ্কার উম্মোচন করে দেয় চিকিৎসার নানা দিক। বিশেষকরে, রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম-প্রাপ্ত রিলাক্সিং ফ্যাক্টর হিসেবে হৃদসংবহন সিস্টেমে নাইট্রিক অক্সাইড আবিষ্কারের পর থেকে, গবেষকরা চিকিৎসাশাস্ত্রে বিস্তৃত পরিসরে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা চিহ্নিত করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফেরিদ মুরাদ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ১৯৯৮ সালে, সাথে ছিলেন আরো দুই বিজ্ঞানী: রবার্ট ফুরগট ও লুই ইগনারো।

ড. ফেরিদ মুরাদ | ছবি: DePauw University
ড. ফেরিদ মুরাদ | ছবি: DePauw University

নাইট্রিক অক্সাইড কী?

মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ী জীবের মধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড হলো দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় এবং জৈবিক প্রক্রিয়ায় জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসীয় সংকেতবাহী অণু। এটি একটি স্নেহ-আকর্ষী অণু যা ব্যাপন প্রক্রিয়ায় খুব সহজেই কোষঝিল্লি অতিক্রম করতে সক্ষম। এটি ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং প্রাণিকোষসহ প্রায় সব ধরনের জীবের একটি ক্ষণস্থায়ী জৈবপণ্য। এটি একটি মুক্ত র‌্যাডিক্যাল যা দেহের অনেক জৈবিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। নাইট্রিক অক্সাইড তিন ধরনের নাইট্রিক অক্সাইড সিন্থেজ (NOS/এনওএস) এনজাইম দ্বারা অ্যামিনো অ্যাসিড এল-আরজিনিন (অক্সিজেন এবং NADPH এর সহযোগিতায়) থেকে (এমনকি, অজৈব নাইট্রেটের বিজারণ থেকেও) সংশ্লেষিত হয়। এনওএস এনজাইমটি স্নায়ুকোষে নার্ভিয়-এনওএস (nNOS/NOS-1) এবং  রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম (অভ্যন্তরীণ আস্তরণ) কোষে এন্ডোথেলীয়-এনওএস (eNOS/NOS-3) নামে অভিহিত। উভয় ক্ষেত্রে এনওএস ক্যালসিয়াম/ক্যালমোডুলিন (calmodulin)-নির্ভর। এছাড়াও রয়েছে ক্যালসিয়াম-অনির্ভর সাইটোকাইন-ইন্ডিউসিবল এনওএস (iNOS/NOS-2), যা ফ্যাগোসাইট-জাতীয় কোষ (যেমন মনোসাইট, ম্যাক্রোফেজ, নিউট্রোফিল)গুলিতে বেশি পাওয়া যায় এবং দেহের অনাক্রম্যতায় মূল ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ও সার্স-কোভি-২ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহৃত হয়েছিল নাইট্রিক অক্সাইড।

কোষে, নার্ভিয় ও এন্ডোথেলীয় এনওএস-প্রাপ্ত নাইট্রিক অক্সাইডের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি হলো এনজাইম গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (GC), যা সিজিএমপি সংশ্লেষণ করে। তবে, কোষের ভিতর অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি সিজিএমপি সংশ্লেষণকে বাধাগ্রস্থ করে। শারীরবিদ্যা ও চিকিৎশাস্ত্রে,  রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম-উদ্ভুত নাইট্রিক অক্সাইড-কে একটি হৃদসংবহন-সংকেতবাহী অণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এন্ডোথেলিয়াম নাইট্রিক অক্সাইড ব্যবহার ক’রে আশেপাশের মসৃণ পেশি কোষগুলিকে শিথিল করার জন্য সঙ্কেত দেয়, যার ফলে রক্তনালির প্রসারণ (ভাসোডাইলেশন) ঘটে এবং রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। নাইট্রিক অক্সাইডের এই প্রভাবটি কার্যকর হয় এন্ডোথেলিন বি রিসেপ্টর (ETB) প্রোটিনের মাধ্যমে। এন্ডোথেলীয় ও মসৃণ পেশি কোষের পাশাপাশি, স্নায়ুপ্রান্ত এবং মসৃণ পেশি কোষগুলির মধ্যে যোগাযোগও সরবরাহ করে নাইট্রিক অক্সাইড। প্রিসিন্যাপ্টিক স্নায়ুপ্রান্তে, নাইট্রিক অক্সাইড γ-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড (GABA), গ্লুটামেট এবং নরএপিনেফ্রিনের মুক্তিকে উদ্দীপিত করে। এছাড়াও, নাইট্রিক অক্সাইডের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়া, ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষা, প্রদাহমূলক প্রতিক্রিয়া, অনুচক্রিকাগুলিকে জমাট বাধা থেকে প্রতিহত করা, লিঙ্গোত্থান, স্নায়ুসংকেতসংবহন, আয়ন চ্যানেলের সমন্বয় ইত্যাদি। উপরন্তু, এটি গ্রোথ হরমোন ও ইনসুলিনসহ অন্যান্য হরমোন নিঃসরণকেও উদ্দীপিত করতে পারে।

ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেলের মধ্যদিয়ে বহিঃকোষীয় ক্যালসিয়াম কোষের ভিতর প্রবেশ করে। তবে,  কোষে ক্যালসিয়ামের আধিক্য দেহে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন সৃষ্টি করতে পারে। তাই, উচ্চ রক্তচাপজনিত চিকিৎসা ব্যবস্থায়, এল-টাইপ ক্যালসিয়াম চ্যানেল প্রতিরোধক/অ্যান্টাগোনিস্ট, যেমন অ্যামলোডিপিন, হৃৎপিন্ডীয় এবং রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষে ক্যালসিয়াম আয়ন চলাচলে বাধা দেয় এবং বৃদ্ধি করে এন্ডোথেলীয় নাইট্রিক অক্সাইড, ফলে রক্তনালিগুলির প্রসারণ ঘটে ও উচ্চ রক্তচাপ কমে আসে। 

নাইট্রিক অক্সাইডের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সিজিএমপি উৎপাদন

গুয়ানোসিন ট্রাইফসফেট (GTP/জিটিপি) থেকে এনজাইম গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (GC) দ্বারা সংশ্লেষিত হয় সাইক্লিক গুয়ানোসিন মনোফসফেট, সংক্ষেপে সিজিএমপি (cGMP)। গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ দুই ধরণের। ঝিল্লি-আবদ্ধ এনজাইমটি সক্রিয় হয় পেপ্টাইড হরমোন, যেমন অ্যাট্রিয় নেট্রিউরেটিক পেপ্টাইড (ANP) দ্বারা, যখন দ্রবণীয় গুয়ানাইলেট সাইক্লেজ (sGC) উদ্দীপ্ত হয় সরাসরি ঝিল্লি-ভেদ্য নাইট্রিক অক্সাইড দ্বারা। উপরন্তু, জিটিপি থেকে সিজিএমপি রূপান্তরটি নিয়ন্ত্রিত হয় কোষীয় ক্যালসিয়ামের পরিমাণের উপর। কোষের ভিতর উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি সিজিএমপি সংশ্লেষণকে বাধাগ্রস্থ করে, যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। সিএএমপি (cAMP) এর মতো, সিজিএমপি হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহী অণু, যা সক্রিয় করে অন্তঃকোষীয় প্রোটিন কাইনেজ জি (PKG/পিকেজি) এনজাইমকে। বহুমুখী অণু হিসেবে সিজিএমপি নানা ধরনের জৈবিক প্রভাব ফেলতে পারে কোষাভ্যন্তরে, তবে সেগুলি পিকেজি সক্রিয়করণের মাধ্যমেই মধ্যস্থতা করা হয়। নাইট্রিক অক্সাইডের অনেক প্রভাবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রক্তনালির শিথিলকরণ (ভাসোডাইলেশন)। সিজিএমপি দ্বারা পিকেজি সক্রিয়করণের ফলে মায়োসিন ফসফেটেজ এনজাইমটি সক্রিয় হয়, যা মায়োসিন হালকা চেইনকে ফসফেট মুক্ত করে, যার ফলস্বরূপ মসৃণ পেশি কোষে অন্তঃকোষীয় স্টোর থেকে বেশ সীমিতপরিমাণে ক্যালসিয়াম নিঃসৃত হয়। যার ফলে কোষে ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং যথাক্রমে, মসৃণ পেশি শিথিল হয়, প্রসারিত হয় রক্তনালি এবং বৃদ্ধি পায় রক্ত সঞ্চালন। রক্তনালির শিথিলকরণের ক্ষেত্রে নাইট্রিক অক্সাইড মূলত পার্শ্ববর্তী এন্ডোথেলিয়াল কোষে উৎপন্ন হয়, যা মসৃণ পেশি কোষে দ্রবণীয় গুয়ানাইলেট সাইক্লেজকে সক্রিয় করে সিজিএমপি উৎপাদন করে। অনেক আয়ন চ্যানেল (যেমন সোডিয়াম ও পটাশিয়াম চ্যানেল)-র কার্যকলাপও নিয়ন্ত্রণ করে সিজিএমপি। কোষে পিকেজি-এর অন্যান্য প্রভাবও রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ এই এনজাইমটি অনেকগুলি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (যেমন CREB)কে সক্রিয় করে, যা জিনের অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিভিন্ন উদ্দীপনায় কোষের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে (ছবি দেখুন)। 

অনেক আয়ন চ্যানেল (যেমন সোডিয়াম ও পটাশিয়াম চ্যানেল)-র কার্যকলাপও নিয়ন্ত্রণ করে সিজিএমপি। কোষে পিকেজি-এর অন্যান্য প্রভাবও রয়েছে, উদাহরণস্বরূপ এই এনজাইমটি অনেকগুলি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (যেমন CREB)কে সক্রিয় করে, যা জিনের অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিভিন্ন উদ্দীপনায় কোষের প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে

ফসফোডাইস্টেরেজ (বিশেষ করে PDE-5) নামে পরিচিত এনজাইম দ্বারা সিজিএমপি-কে আবার জিটিপিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। সিজিএমপি-কে জিটিপিতে রূপান্তর কার্যকরভাবে নাইট্রিক অক্সাইড সংকেতকে ব্লক করে। ফলে, রক্তনালি আর প্রসারিত থাকে না। এখন বেশ কিছু ওষুধ রয়েছে যা ফসফোডাইস্টেরেজ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং নাইট্রিক অক্সাইড/সিজিএমপি সঙ্কেত পুনরুদ্ধার করতে পারে। সম্ভবত এই শ্রেণির ওষুধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলো যৌন উত্তেজক সিলডেনাফিল বা ভায়াগ্রা, যা রক্তনালির মসৃণ পেশি কোষগুলিতে সিজিএমপি-এর সংশ্লেষণ বাড়ায়, সক্ষম করে তোলে লিঙ্গোত্থানে। এখানে উল্লেখ্য, মানুষসহ অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণিদের সিজিএমপি সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রিত হয় জৈবিক ঘড়ি দ্বারা। মধ্যরাত থেকে শেষরাত পর্যন্ত প্লাজমা সিজিএমপির মাত্রা থাকে সবচেয়ে বেশি। দিনের আলোয় PDE-5 এনজাইমের আবির্ভাবে cGMP-এর সংশ্লেষণ কমে আসে তলানিতে।

এছাড়াও, চোখের দৃষ্টিগত সংকেতসংবহনে (ফটোট্রান্সডাকশন), সিজিএমপি একটি বার্তাবাহী অণু হিসেবে কাজ করে। nNOS দ্বারা চোখের মধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি হয় রেটিনার ফটোরিসেপ্টর (বিশেষকরে রড-কোষ) এবং বাইপোলার কোষগুলিতে। রডকোষে NO-cGMP ক্যালসিয়ামের প্রবাহ বৃদ্ধি করে, যা সান্ধ্যকালীন দৃষ্টি-প্রত্যক্ষণে মধ্যস্থতা করে। দিনের আলোয় চোখের ফটোরিসেপ্টর কোষগুলিতে PDE5-কে সক্রিয় করে, ফলে কোষে সিজিএমপি এর পরিমাণ কমে আসে। ফলস্বরূপ, ফটোরিসেপ্টরগুলিতে সোডিয়াম আয়ন চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়, যা ফটোরিসেপ্টরের কোষগুলিকে রেস্টিং পটেনশিয়ালের তুলনায় অধিকতর ঋণাত্মক করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় দিনের আলোয় দৃষ্টি-প্রত্যক্ষণের তথ্য পাঠানো হয় মস্তিষ্কে।

ডায়াবেটিস রোধে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা

টাইপ২ ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। এই ক্ষতি উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য অঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতিও হতে পারে। যেহেতু নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালিগুলির প্রসারণের সাথে ওতপ্রোত, তাই এটি রক্তচাপ কমায় এবং অঙ্গের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। এছাড়াও, ডায়াবেটিস স্বয়ং নাইট্রিক অক্সাইডের জৈব উপলভ্যতাও হ্রাস করতে পারে। ফলে এন্ডোথেলীয় কর্মহীনতার মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা হৃদরোগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। 

নাইট্রিক অক্সাইড অন্তঃস্রাবী অগ্ন্যাশয়ে উৎপাদিত হয় এবং ইনসুলিনের সংশ্লেষণ এবং নিঃসরণে অবদান রাখে। তবে, ইনসুলিন নিঃসরণে নাইট্রিক অক্সাইডের সম্ভাব্য ভূমিকা এখনও বিতর্কিত। এটি ইনসুলিন নিঃসরণে উদ্দীপক নাকি প্রতিরোধক-  তা নিয়ে উভয়দিকেই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে। তবে নাইট্রিক অক্সাইডের প্রভাব এর ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। বেশ কিছু গবেষণায় প্রমাণিত যে, নাইট্রিক অক্সাইড অন্তঃকোষীয় ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে, সাথে আইলেট/অগ্ন্যাশয় রক্তনালির স্ফীতি, ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায়। অপরদিকে, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে যে, ইনসুলিন হরমোন ফসফ্যাটিডিল ইনোসিটল ৩-(PI3)-কাইনেজ এবং প্রোটিন কাইনেজ বি (পিকেবি) এনজাইমগুলির মতো নির্দিষ্ট সংকেতপথের মাধ্যমে নাইট্রিক অক্সাইডের উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে। তবে নানা বিপাকীয় অস্বাভাবিকতা, যেমন ইনসুলিন প্রতিরোধ্যতা কিংবা অতিরিক্ত ইনসুলিনক্ষরণ (হাইপারইনসুলিনোমিয়া) নাইট্রিক অক্সাইড সিস্টেমকে ব্যাহত করে। এছাড়াও, ডায়াবেটিস প্রোটিন কাইনেজ সি (পিকেসি) এনজাইমকে সক্রিয় করে প্রাগ্রসর গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টগুলির উৎপাদন বৃদ্ধি করে, যা হৃদসংবহনতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে পারে।

নাইট্রিক অক্সাইড সরাসরি ধারণ করে এমন কোন সম্পূরক নেই। তবে আমাদের দেহ নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষ করতে যে দু’টি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড, যেমন এল-আরজিনিন এবং এল-সিট্রুলিন ব্যবহার করে সেগুলি সম্পূরক আকারেও পাওয়া যায়। এই সম্পূরকগুলি গ্রহণ করলে দেহে নাইট্রিক অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, নাইট্রেটযুক্ত খাদ্য (যেমন পালং শাক, বোক-চোই শাক, লেটাস, গাজর, বিট) থেকেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষিত হতে পারে। তবে, মাত্রা খুব বেশি হলে নাইট্রিক অক্সাইড শরীরের অভ্যন্তরে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। কিছু কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে, নাইট্রিক অক্সাইডের সম্পূরক ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের জন্য উপকারী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যামিনো অ্যাসিড এল-আরজিনিন ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে, যা রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে, যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে। একইভাবে, এল-সিট্রুলিন ইনসুলিন সিগন্যালিং এবং গ্লুকোজ হোমিওস্ট্যাসিস-কে উন্নত করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। নাইট্রিক অক্সাইডের এই শারীরবৃত্তীয় প্রভাবগুলি মূলত গুনাইলেট সাইক্লেজ-সিজিএমপি সংকেতপথ দ্বারা মধ্যস্থতা করে।

ক্যান্সার বিকাশে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকা

সাধারণত, নার্ভিয়-এনওএস এবং এন্ডোথেলীয়-এনওএস দেহে অল্প পরিমাণে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন করে, যা একটি নিউরোট্রান্সমিটার, ভাসোডাইলেটর হিসেবে কাজ করতে পারে বা ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু, সাইটোকাইন-ইন্ডিউসিবল এনওএস এনজাইম জীবাণুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রচুর পরিমাণে নাইট্রিক অক্সাইড সংশ্লেষ করে। নাইট্রিক অক্সাইড ক্যান্সারের বিকাশ এবং দমন উভয় ক্ষেত্রেই একটি মূল নিয়ামক- এটি নির্ভর করে তার উৎস ও ঘনত্বের উপর। এটি বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সারের জন্য দায়ী হতে পারে, যেমন স্তন, ফুসফুস, প্রোস্টেট, কোলন, অগ্ন্যাশয় এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার। উচ্চ মাত্রার নাইট্রিক অক্সাইড ডিএনএ এর ভাঙ্গন ঘটাতে পারে, ডিএনএ মেরামত প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং পরবর্তীকালে কোষ চক্র রোধকেও সংশোধন করে। কিছু পরিস্থিতিতে, টিউমারিজেনেসিস থেকে রক্ষা পেতে নাইট্রিক অক্সাইড কোষ চক্র রোধ ও অ্যাপোপটোসিস উভয়কে প্ররোচিত করে। আবার, অন্যান্য ক্ষেত্রে নাইট্রিক অক্সাইড কোষ চক্রের অগ্রগতিতে বিলম্ব ঘটাতে পারে,  অস্বাভাবিক ডিএনএ মেরামতের কারণে সৃষ্টি হতে পারে নানা মিউটেশন, ফলে তৈরি হয় নানা ধরণের টিউমার। বিপরীতে, M1 ম্যাক্রোফেজ এবং Th1 লিম্ফোসাইটের ইন্ডিউসিবল এনওএস  থেকে প্রাপ্ত উচ্চ মাত্রার নাইট্রিক অক্সাইড ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রক্ষাকারী টিউমার-বিরোধী প্রভাব প্রয়োগ করতে পারে।

উপসংহার

জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে ড. ফেরিদ মুরাদের অবদান অপরিসীম। নিউরোসায়েন্স, ফিজিওলজি এবং ইমিউনোলজিতে তিনি এক নতুন দিগন্ত উম্মুক্ত করেছেন। নোবেল পুরস্কারসহ অনেক স্বীকৃতি তিনি অর্জন করেছেন। ফেরিদ মুরাদ তাঁর জীবনকালেই দেখে গেছেন যে তাঁর আবিষ্কৃত নাইট্রিক অক্সাইড বিজ্ঞানজগতে একটি আলোড়িত বিষয়, যার জাগরণে ইতোমধ্যে নাইট্রিক অক্সাইড নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দেড় লাখ গবেষণা-প্রকাশনা। যদি আমরা সেই ফলাফলগুলির সারসংক্ষেপ করি, তাহলে এটি খুব স্পষ্ট যে নাইট্রিক অক্সাইড দেহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে একটি বার্তাবাহক অণু হিসেবে কাজ করে: শ্বেত রক্তকণিকায়, এটি সাইটোটক্সিক প্রভাবের মধ্যস্থতা করে; রক্তনালীতে, এটি মসৃণ পেশি কোষ শিথিলকরণের মাধ্যমে বৃদ্ধি করে রক্ত সঞ্চালন; এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে, এটি একটি নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৮৬ বছর বয়সে ফেরিদ মুরাদ প্রয়াত হলেন, কিন্ত রেখে গেলেন মানবকল্যানের জন্য অফুরান অবদান। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর জন্ম, সেপ্টেম্বর মাসেই তাঁর তিরোধান। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব আজ এক কৃতি বিজ্ঞানীকে হারালো।