শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৩

সংবাদ প্রভাকর— বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র

সংবাদ প্রভাকর-এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন যুগসন্ধির কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এবং এর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি।

For all latest articles, follow on Google News

বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা কোনটি? সংবাদ প্রভাকর ছিল বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক পত্রিকা, তবে প্রতিষ্ঠার সময় এটি কোনো দৈনিক প্রকাশনা ছিল না। সংবাদ প্রভাকর  ছিল বাংলা ভাষার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা যা পরবর্তীতে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। সংবাদ প্রভাকর ছিল উনিশ শতকের একটি প্রথম শ্রেণির পত্রিকা, যাতে ভারতবর্ষসহ বহির্বিশ্বের সংবাদের পাশাপাশি ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও রচনা প্রকাশিত হতো। ইংরেজিতে পত্রিকাটির নাম লেখা হতো—  Sambad Prabhakar; কেউ কেউ এর নামটি বাংলায় ইংরেজি অনুসরণে লেখেন সম্বাদ প্রভাকর

সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে ১৮৩১ একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র হিসেবে এটি চালু হওয়ার ৮ বছর পর ১৮৩৯ সালে এটি একটি দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়৷ এটিই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র৷ ব্রিটিশ ভারত ও বিদেশের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি এই সংবাদপত্র ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ ও সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করত৷ বাংলার নবজাগরণ ও নীল বিদ্রোহের প্রতি মানুষকে সহানুভূতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে এই সংবাদপত্রের বিশেষ প্রভাব ছিল৷ সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক ভাবধারা বা মতবাদ ছিল না।

‘সংবাদ প্রভাকর’-এর প্রকাশনা

সংবাদ প্রভাকর-এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন যুগসন্ধির কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এবং এর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। শোনা যায় যোগেন্দ্রমোহন এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদকও ছিলেন, বিষয়টি নিশ্চিত নয়। যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার বাসিন্দা। ঠাকুর বাবুর মৃত্যুর পরে কবি গুপ্ত এই পত্রিকাটির সার্কুলেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

সংবাদ প্রভাকর নামের এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৩১ সালের ২৮ জানুয়ারি, শুক্রবার (১৬ মাঘ, ১২৩৭ বঙ্গাব্দ); দৈনিক হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের মৃত্যুর পরে তার পরিবারের সহযোগিতায়। এর কার্যালয় ছিল ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কলকাতা শহরে (আধুনিক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কোলকাতা)।

সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি প্রকাশে পাথুরিয়াঘাটার যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর শুধু অর্থ দিয়েই সহযোগিতা করেননি, এর প্রচারণার মাধ্যমে ইংরেজমুখী বাঙালি সমাজে এর বিস্তার ঘটানোর দায়িত্বও নিজের কাঁধেই নিয়েছিলেন, যার ফলে এর সুনাম খুবই কম সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পরে বাংলায়। পত্রিকাটির পেছনে ঠাকুর মহাশয়ের ভূমিকা ও সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ও অপরিহার্য। তাঁর মৃত্যুর কারণে ১৮৩২ সালের ২৫ মে প্রকাশিত ৬৯তম সংখ্যার পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের মৃত্যুর চার বছরেরও বেশি সময় পর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পুনরায় সংবাদ প্রভাকর প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৩৬ সালের ১০ আগস্ট থেকে পত্রিকাটি বারত্রয়িক রূপে প্রকাশিত হতে থাকে। এই বারেও পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবার অর্থাৎ মৃত যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের পরিবারই পত্রিকাটি প্রকাশে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করে। ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন সংবাদ প্রভাকর বাংলায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম দৈনিক পত্রিকারূপে আবির্ভূত হয়।

১৮৫৩ সাল থেকে পত্রিকাটির মাসিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মাসিক সংবাদ প্রভাকর-এ ঈশ্বরচন্দ্র প্রাচীন বাংলার ‘কবিয়াল’ ও গীতিকারদের জীবনী ও কর্মগাথা সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছিলেন।

‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সম্পাদকগণ

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রামচন্দ্র গুপ্ত সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদক নিযুক্ত হন। অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে এ দায়িত্ব বেশিদিন পালন করা সম্ভব হয়নি এবং তাঁর স্থলে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দায়িত্ব লাভ করেন। ধারণা করা হয় যে, মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত ছিলেন সংবাদ প্রভাকরের সর্বশেষ সম্পাদক। পত্রিকাটি বিশ শতকের প্রথম ভাগের বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।

এই হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা মোট ৪ জনের নাম মোটামুটিভাবে পরিস্কার, এঁরা হলে— প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রামচন্দ্র গুপ্ত, গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, এবং মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত।

কারা লিখতেন ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ?

পত্রিকাটিতে তৎকালীন বহু বিখ্যাত পন্ডিত ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি তাঁদের রচনা প্রকাশ করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা রাধাকান্ত দেব, জয়গোপাল তর্কালংকার, প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং রামকমল সেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং দীনবন্ধু মিত্রের লেখক জীবনের প্রথম পর্যায়ের অনেক রচনাই সংবাদ প্রভাকরে প্রকাশিত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লেখকদল পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন এবং পত্রিকাটির প্রাথমিক রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে কিছুটা নমনীয় ও উদার হয়েছিল।

‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার বিশেষ অবদান

১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে পত্রিকাটি নারীশিক্ষা ও বিধবা-বিবাহের প্রতি সমর্থন প্রদান করা ছাড়াও কৌলীন্য প্রথার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জমিদারদের সহায়তার কারণে পত্রিকাটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ততটা জোরালোভাবে সমালোচনা না করে বরং শাসকদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। তবে, নীলচাষের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সংবাদ প্রভাকর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সংক্ষেপে বলা যায় যে, পত্রিকাটিতে উনিশ শতকের বাংলা রেনেসাঁর ভাবধারার প্রতিফলন ঘটেছিল।

কোথায় পাওয়া যাবে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার কপি?

সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার অবদান বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে অস্বীকার করার উপায় নেই। যে পত্রিকা বহু বিশাল মাপের সাহিত্যিক তৈরির কারখানা হিসেবে কাজ করেছে; সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কলম নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেই পত্রিকার অবদান কীভাবে অস্বীকার করা যায়? তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, পত্রিকাটির প্রকাশিত সবগুলি সংখ্যা কোন গ্রন্থাগারেই সংরক্ষিত হয়নি। তবে, কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও জাতীয় গ্রন্থাগারে এর কয়েকটি সংখ্যা সংরক্ষিত রয়েছে।

এক নজরে ‘সংবাদ প্রভাকর’

নামসংবাদ প্রভাকর (Sambad Prabhakar)
বিশেষত্ববাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক পত্রিকা
ধরনদৈনিক সংবাদপত্র (মাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত)
প্রকাশকঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
দৈনিক হিসেবে প্রকাশজুন ১৪, ১৮৩৯
সম্পাদকঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রামচন্দ্র গুপ্ত, গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্ত
প্রতিষ্ঠাকালজানুয়ারি ২৮, ১৮৩১
রাজনৈতিক মতাদর্শপ্রযোজ্য নয়
ভাষাবাংলা
প্রকাশনা স্থগিতবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ
কার্যালয়কলকাতা, বাংলা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
জারিন তাসনিম
জারিন তাসনিম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্বাধীন লেখক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ