১১:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার – সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি  

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
  • প্রকাশ: ০১:২৫:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩
  • / ১০১৬ বার পড়া হয়েছে

২০২২ সালের অটিজম দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, "অটিজম: কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি"


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

অটিজম হলো শিশুদের স্নায়ুবিকাশজনিত একটি সমস্যা, যার কারণে একটি শিশু সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানুষের মধ্যে অটিজম নিয়ে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। জ্ঞান প্রসারের মাধ্যমে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে (যদিও অটিজমের কিছু স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে), বরং বোঝানো হয়ে থাকে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাগুলির সংমিশ্রণ, যেখানে আত্মসংবৃতি, অ্যাসপারজার-র সংলক্ষণ (Asperger’s syndrome) এবং পরিব্যাপক বিকাশমূলক ব্যাধির (pervasive developmental disorder, PDD) লক্ষণগুলি বিদ্যমান। আবার, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশেষ এক ধরণের সিনড্রোম, যার নাম ‘ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম (Fragile X syndrome, FXS)1। যদিও, অনেক বিশেষজ্ঞ FXS-কে সরাসরি অটিজম-এর অংশ হিসেবে গণ্য করেন না, বরং বলেন যে FXS-আক্রান্ত ব্যক্তিদের অটিজম হবার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যহারে বেশি। ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম মানব X ক্রোমোজোমে FMR1 (ফ্র্যাজাইল এক্স মেসেঞ্জার রিবোনিউক্লিওপ্রোটিন) জিনের মধ্যে নিউক্লিওটাইড CGG ট্রিপলেট পুনরাবৃত্তির কারণে ঘটে, যার পুনরাবৃত্তি ৫৫ থেকে ২০০ পর্যন্ত দেখা যায়। ফলে FMR1-জিনটি অকার্যকর হয় এবং তার প্রোটিন (FMRP) তৈরিতে ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে সংযোগের ত্রুটি ও এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতাও পরিলক্ষিত হয়। অটিজমের যে উপসর্গগুলি দৃশ্যমান তার মধ্যে যোগাযোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা-ই হচ্ছে প্রকট। তাই, বর্তমানে শুধুমাত্র অটিজমের পরিবর্তে এই মিশ্র-সমস্যাটি ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD/এএসডি)’ বলে আখ্যায়িত হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ ডিসঅর্ডারের পরিবর্তে ‘কন্ডিশন’ বলে থাকেন, কাজেই সে অর্থে এটি ‘অটিজম স্পেকট্রাম কন্ডিশন (ASC)। এই প্রবন্ধে অটিজম ‘এএসডি’ হিসেবেই ব্যাখ্যাত হয়েছে।

লক্ষণসমূহ

এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের আচরণ সাধারণ শিশুদের থেকে আলাদা, দেখা যায় শিশুদের মানসিক সীমাবদ্ধতা। তারা সব সময় আত্মলীন থাকে, কারো সঙ্গে কথা বলে না, খেলা করে না, নিজের জগতেই নিজে বিচরণ করে এবং তাদের মধ্যে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়- যেন সে ওই কাজটিতে অভিরত। অন্যদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশতেও পারে না। এ ছাড়াও অনেক সময় শিশুটির মা প্রথম বুঝতে পারেন যে তাঁর শিশুটি কথা বলতে পারছে না বা কথা বলতে দেরি হচ্ছে। শিশুটির বাবা-মা স্বভাবতই উদ্বিগ্ন হন। তাদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য প্রকট থাকে যে তারা কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলে না বা শোনে না। এমনকী, নিজের বাবা বা মায়ের চোখের দিকেও এরা চোখ রাখতে পারে না। অনেকে হাইপার অ্যাকটিভ হয়, নিজের হাত কামড়িয়ে রক্তাক্ত করে বা হাতের কাছের জিনিস-পত্র ভেঙে নষ্ট করে। তবে যাইহোক, আর অন্যান্য মানসিক ব্যাধির মত এএসডি-কে মানসিক ব্যাধি হিসাবে দেখার কোনো কারণ নেই।

এএসডি আক্রান্তে লিঙ্গ পার্থক্য

বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন যে, প্রতি ৫৪ জনের মধ্যে ১টি শিশুর ASD হওয়ার প্রবণতা আছে। এএসডি সমস্ত আর্থ-সামাজিক স্তরেই দেখা যায়। তবে, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের এএসডি হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যহারে বেশি2, অর্থাৎ ছেলে-থেকে-মেয়ে ৪:১ অনুপাতে। এই লিঙ্গ পার্থক্যের অন্তর্নিহিত জিনগত কারণ লুকিয়ে রয়েছে মানুষের সেক্স-ক্রোমোজোমে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানব এক্স (X)-ক্রোমোজোমে অবস্থিত নিউরোলিগিন (Neuroligin, NLGN4) নামক একটি জিনের মিউটেশন এএসডি-র একটি অন্যতম কারণ3। নিউরোলিগিন প্রোটিনটি স্নায়ুগুলির মধ্যে সিন্যাপসিস (সংযোগস্থল) স্থাপন এবং বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাতে করে স্নাতকোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন থাকে। যেহেতু মেয়েদের সেক্স-ক্রোমোজোমের দুটি-ই  হলো X ক্রোমোজোম এবং ছেলেদের মধ্যে একটি X ও একটি Y, কাজেই একটি X ক্রোমোজোমে ঘটে যাওয়া NLGN4X-জিনটির মিউটেশন আরেকটি (সমসংস্থ) X ক্রোমোজোমের স্বাভাবিক NLGN4X জিন দ্বারা সুরক্ষা পায়। কিন্তু, ছেলেদের ক্ষেত্রে Y ক্রোমোজোমে যেহেতু কার্যকরীভাবে সমতুল্য জিন থাকে না, তাই তারা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রসঙ্গতঃ সাধারণ অবস্থায় মেয়েদের দুটি X ক্রোমোজোমের একটি নিষ্ক্রিয় থাকে। তবে, এক্ষেত্রে NLGN4X জিনটি নিষ্ক্রিয়করন থেকে মুক্তি পেয়ে একটি স্বাভাবিক প্রোটিন তৈরি ক’রে মেয়েদের সুরক্ষিত রাখে।

অটিজম কোনো বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী রোগ নয়। সে কারণেই, কখনও এই শিশুরাই বিশেষ গুণে পারদর্শী হয়। বিশ্বখ্যাত অনেক মনীষী আছেন যাঁরা অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। দেখা গিয়েছে, এএসডি-আক্রান্ত কিছু মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জীবনে অবিশ্বাস্যভাবে সফলতা এনেছে। অনেক উদাহরণ রয়েছে- তবে দুইজন বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ না করলেই নয়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও নোবেল জয়ী আলবার্ট আইনস্টেইন অটিস্টিক ছিলেন এবং তিনিও কথা বলা শুরু করেছেন অনেক দেরিতে। আইজ্যাক নিউটন-ও অটিস্টিক ছিলেন। ২০২২ সালের অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী ভার্নন স্মিথ আক্রান্ত ছিলেন অ্যাসপার্জার সিন্ড্রোমে।

সিন্যাপসে-এর গঠন ও বিকাশ

প্রি- এবং পোস্ট-সিন্যাপ্টিক স্নায়ুকোষের সংযোগস্থলকে সিন্যাপস (synapse) বলে। সুস্থ ও স্বাভাবিক সিন্যাপ্সগঠন সংকেত-সংবহনের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিউরনগুলি সিন্যাপসের মাধ্যমে আন্তঃযোগাযোগ এবং যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক গঠন করে। নিউরেক্সিন (Neurexin)  ও  নিউরোলিগিন (NLGN 3/4) হচ্ছে কোষ সংযোজন প্রোটিন যা নিউরন সিন্যাপসের পরিপক্কতা এবং কার্যকারিতায় ভূমিকা পালন করে4। সিন্যাপস বিকাশে সহযোগী প্রোটিনগুলি হলো PSD-95, SHANK, ও GKAP (দেখুন ছবি ১)। এছাড়াও, সিন্যাপটোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় NMDA (N-methyl-d-aspartate) গ্লুটামেট রিসেপ্টর ও তার সংশ্লিষ্ট প্রোটিনগুলির সক্রিয়করণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্স-ক্রোমোজোমে অবস্থিত NLGN4 জিনের মিউটেশন এএসডি সমস্যার একটি সম্ভাব্য কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, মস্তিষ্কের, বিশেষ করে সেরেব্রাম অঞ্চলের স্নায়ুকোষে অ্যাক্সনগুলির মায়েলিন (myelin) নামক অন্তরক আবরণের অপর্যাপ্ততা (hypomyelination) নিউরনগুলির সংযোগ ও সংবহন সমন্বয়হীনতার পরিণতি বলে মনে করা হয় 5। এই অনাটনের জিনগত কারণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে IGF (insulin growth factor)1-জিনের মিউটেশন। IGF-1 এর ঘাটতি অপর্যাপ্ত নিউরন-মায়েলিন এবং ত্রুটিপূর্ণ সিন্যাপসের বিকাশ প্রসবোত্তর জীবনের প্রথম বছরে শিশুদের মস্তিষ্কে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে দেখা যায় এবং তাদের শৈশব বছর এবং তার পরেও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে 6। এছাড়াও, SHANK3 জিনের মিউটেশন বা ডিলিশন ত্রুটিযুক্ত মায়েলিন তৈরি করে যা স্বাভাবিক সংকেত-সংবহনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় 7। 

D:\Rashid\Autism\Nuroligin-Neurexin-RH.jpg

কারণসমূহ

এএসডি সৃষ্টির একাধিক কারণ রয়েছে, যার ফলে এর সঠিক চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়েছে। দুই দশকের নিবিড় গবেষণার ফলাফল থেকে অটিজম-এর কারণ সমন্ধে এখন অনেকটা স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। একটি ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন কোষগুলির পারস্পরিক সংযোগ কমে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন হওয়া,  কিংবা স্নায়ু থেকে নিঃসৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থের অভাব হবার কারণেই শিশুদের এএসডি দেখা দেয়। যাইহোক, এএসডি-র পেছনে দুটি মূল কারণ হচ্ছে জিনগত সমস্যা এবং পরিবেশগত। 

জিনগত কারণ

FMR1 জিনের মিউটেশন ও নিউক্লিওটাইড-পুনরাবৃত্তি ছাড়াও, মানব এক্স (X)-ক্রোমোজোমে অবস্থিত নিউরোলিগিন (Neuroligin, NLGN4) জিনের মিউটেশন অটিজমের একটি অন্যতম কারণ- যা আগেই উল্লেখ করেছি। স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য প্রিসিন্যাপটিক নিউরেক্সিন প্রোটিন এবং পোস্টসিন্যাপটিক নিউরোলিগিন প্রোটিন-দুটি সরাসরি জড়িত, এবং সংকেতসংবহনে ত্রুটির কারণেই সৃষ্টি হয় এএসডি-সহ নানা স্নায়ুবিকাশ-সম্পর্কিত জটিলতা। নিউরোলিগিন পরিবারের চারটি জিন রয়েছে, তম্মধ্যে NLGN3 ও NLGN4 জিনের একাধিক মিউটেশনকে এএসডি-র কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে 8, 9। 

শ্যাঙ্ক (SHANK) প্রোটিন হল পোস্টসিনাপটিক নিউরোনের একটি মাল্টিডোমেন স্ক্যাফোল্ড প্রোটিন যা নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপ্টর, আয়ন চ্যানেল এবং অন্যান্য মেমব্রেন প্রোটিনকে অ্যাক্টিন সাইটোস্কেলটন এবং জি-প্রোটিন-যুক্ত সিগন্যালিং পাথওয়ের সাথে সংযুক্ত করে। এই প্রোটিনগুলি সিন্যাপস গঠনেও ভূমিকা পালন করে। Shank-জিনের মিউটেশন এএসডি-র কারণ হিসেবে চিহ্নিত 7, 10

বিশেষ কিছু জিনের কপি নাম্বার বৈচিত্র (Copy number variation, CNV) এএসডি-সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে স্বীকৃত। CNV আমাদের জিনোমের কোনো জিন বা ডিএনএ খন্ডের কপি বা অনুলিপির সংখ্যাকে বোঝায়। জিনোমে CNV বৈচিত্র আনে ডুপ্লিকেশন এবং ডিলিশন জিনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ডুপ্লিকেশনের মাধ্যমে কারো জিনোমে নির্দিষ্ট কোনো একটি জিনের অনেকগুলি কপি দেখা যায়, কিন্তু অন্যদের মাঝে ডিলিশনের কারণে ওই একই জিনটির কপি নাম্বার অনেকাংশে কম পাওয়া যায়। CNV-র ক্লাসিক উদাহরণ হিসাবে আমরা অ্যামাইলেজ (Amylase) জিনটিকে তুলে ধরি। মানবজিনোমে বিশেষ কিছু জিনের সংখ্যার এই পরিবর্তন (ডুপ্লিকেশন বা ডিলিশন) শিশুদের স্নায়ুবিকাশে এক বড় পরিণতি ডেকে আনে। মানবজিনোমের ১৫নং ক্রোমোজোমের এক প্রান্তে, ঠিক 15q11.2 লোকাসে, এই ধরণের একটি ভঙ্গুর অঞ্চল রয়েছে যেখানে অবস্থান করে চারটি জিন: TUBGCP5, NIPA1, NIPA2 ও CYFIP1। গবেষষণায় দেখা গিয়েছে যে শেষোক্ত দুইটি (NIPA2 ও CYFIP1) জিন মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স, হিপ্পোক্যাম্পাস ও সেরেবেলাম অঞ্চলগুলিতে প্রকাশ পায় এবং জিনগুলির CNV এএসডি-সহ অন্যান্য স্নায়ুবিকাশজনিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার সাথে সরাসরি জড়িত11। স্বাভাবিক সিন্যাপটিক ফাংশন এবং আচরণ বজায় রাখতে CYFIP1 (cytoplasmic FMR1 interacting protein1) সিন্যাপ্সগুলিতে NMDA গ্লুটামেট রিসেপ্টর এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলির প্রোটিন সংশ্লেষণকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংকেত-সংবহনে CYFIP1 প্রোটিনটি সিন্যাপপটিক উত্তেজনা এবং নিরোধের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। এএসডি-র স্পেকট্রাম বিশেষে জিনটির ডুপ্লিকেশন বা ডিলিশন এর অন্যতম একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে12। এমনকি CYFIP1 জিনটির ডোজ পরিবর্তন করে গবেষকগণ প্রতিরোধমূলক সংকেত-সংবহনের দ্বিমুখী প্রভাব প্রকাশ করেছেন (দেখুন ছবি ২) 11
D:\Rashid\Autism\CYPIP1.jpg

গবেষণামূলক একটি বড় সমীক্ষায় আরও একটি বিষয় উদ্ঘাটিত হয়েছে যে, এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ক্যানাবিনোয়েড (CBD) উপাদানগুলি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে13। এই নিরীক্ষণটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের এএসডি-সম্পর্কিত সামাজিক আচরণের অস্বাভাবিকতার পেছনে অভ্যন্তরীণ CBD-গুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটা প্রমাণিত যে, মানুষের অভ্যন্তরীণ CBD-গুলি- যেমন আনন্দমাইড বা AEA (N-arachidonoylethanolamine), PEA (N-palmitoylethanolamine) এবং OEA (N-oleoylethanolamine), তাদের রিসেপ্টরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে আচরণগত বিভিন্ন কার্যকলাপ14। মস্তিষ্ক (ফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং সাবকর্টিক্যাল এলাকা) থেকে নিঃসৃত আনন্দমাইড একটি ফ্যাটি অ্যাসিড নিউরোট্রান্সমিটার, ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি উপজাত। জি প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর CB1 এর সাথে আনন্দমাইডের আবদ্ধতা ডোপামিন, সেরোটোনিন, GABA (গামা-অ্যামিনোব্যুটারিক অ্যাসিড) এবং গ্লুটামেট স্নায়ুসংকেত পরিবহনে ভূমিকা পালন করে। আনন্দমাইড নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক যোগাযোগ, কমায় মানসিক চাপ ও বৃদ্ধি করে স্মৃতিশক্তি।

পরিবেশগত কারণ

গর্ভাবস্থার প্রথম দুইটি মাস অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময়ে মায়েদের সংক্রমণকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এর মতো স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থার ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ে গর্ভিণী মায়েদের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে তাদের দেহে যেসব এন্টিবডি তৈরি করে তা এএসডি সৃষ্টির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গতঃ গর্ভাবস্থার তৃতীয় সপ্তাহে ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ শুরু হয়। নিউরাল প্রোজেনিটার কোষগুলি নিউরন এবং গ্লিয়াতে বিভক্ত এবং পার্থক্য হতে শুরু করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে। নবম সপ্তাহের মধ্যে, মস্তিষ্ক একটি ছোট, মসৃণ গঠন হিসাবে উপস্থিত হয় এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের শেষে, ভ্রূণের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। 

এছাড়াও, গর্ভধারণের সময় পিতামাতার বেশি বয়স, বায়ু দূষণ, মাতৃ-স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা ইমিউন সিস্টেমের ব্যাধি, শিশুর মস্তিষ্কে প্রসবকালীন অক্সিজেন প্রতিবন্ধকতা এএসডি-র কারণ হতে পারে। পরিবেশের বিষাক্ত উপকরণ (যেমন  মার্কারি, আর্সেনিক, কীটনাশক ওষুধ ইত্যাদি) গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ধ্বংস করতে পারে। গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অতিমাত্রায় ওষধ সেবন, মায়ের ধুমপান ও মদ্যপান এএসডি-র সূত্রপাত হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এএসডি-র বর্তমান ও ভবিষ্যত চিকিৎসা

শিশুদের মধ্যে এএসডি-র কোন লক্ষণ দেখতে পাওয়া গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অজ্ঞানতা সবসময়ই সমস্যা সমাধানের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের অটিজম সমন্ধে সচেতন করে প্রয়োজন। নইলে, দেরি হয় রোগ নির্ণয় ও নিরাময় করতে, তৈরি হয় নতুন জটিলতা। বর্তমানে অটিজম চিকিৎসার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কাউন্সিলিং ও থেরাপি গ্রহণ করা উচিত। অনেক চিকিৎসক বিশেষকরে ‘আচরণ এবং যোগাযোগ বৃদ্ধিকারক থেরাপি’, ‘কথা-ভাষা থেরাপি’-সহ অন্যান্য থেরাপি নেয়ার পরামর্শ দেন। এসব থেরাপি আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে শেখায়। এএসডি-আক্রান্ত অনেক শিশুদের মধ্যে হাইপার অ্যাকটিভিটি, অনিদ্রা, খিঁচুনি জাতীয় রোগ দেখা যায়। তবে ঠিক সময়ে দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে দেখা গিয়েছে এদের অনেকেই সমাজের স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে।

দুঃখের বিষয়, এএসডি নিরাময়ের ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল চিকিৎসায় অদ্যাবধি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। গবেষকগণ নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু এএসডি-এর জিনগত ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা, ব্যাপকতা এবং বহুমাত্রিক রূপ চিকিৎসা বিকাশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সে কারণে, এএসডি-র প্রতিকার হিসেবে কোনো জাদুকরী ওষুধ বর্তমানে নেই। যেসব প্রচলিত অ্যান্টিসাইকোটিক ও অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ এএসডি চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় তার কার্যকারিতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে সেগুলোর ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেন। বর্তমানে এএসডি-র যেসব জিনগত কারণসমূহ চিহ্নিত হয়েছে সেগুলোর উপর ভিত্তি করে বেশ কিছু নতুন প্রজন্মের ওষুধ পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে- যেমন: ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর (CB1) অ্যাগোনিস্ট, ভাসোপ্রেসিন 1A নিরোধক, NMDA রিসেপ্টর নিরোধক, অ্যাসিটিলকোলিনেস্টারেজ ইনহিবিটর, টাইরোসিন হাইড্রোক্সিলেজ ইনহিবিটর, অক্সিটোসিন রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট এবং GABA A রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট। আশা করি, নতুন প্রজন্মের এই ওষুধগুলি এএসডি নিরাময়ে অচিরেই উলেখযোগ্য ফলপ্রসূতা এনে দিবে। আবার অনেক নিউরোবিজ্ঞানী স্টেমকোষ থেরাপিকেও এএসডি নিরাময়যোগ্য কৌশল হিসেবে দেখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সতর্কতা হিসেবে প্রসবপূর্ব ফোলিক অ্যাসিড (Folic acid/ভিটা.বি৯)সহ মাল্টিভিটামিন গ্রহণ অটিজম ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অধিকন্তু, গর্ভাবস্থায় ভিটামিন ও সম্পূরক গ্রহণ নির্দিষ্ট পরিবেশগত দূষকগুলির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষামূলক প্রভাব প্রদান করতে পারে। এছাড়া, ফ্যাটি অ্যাসিড সম্মৃদ্ধ মাছ, ডিম, ফল ও সব্জি শিশুদের এএসডি বিকাশকেও প্রতিহত করে। কারণ এই খাবারগুলোর মধ্যেই রয়েছে প্রাকৃতিক আনন্দ-মাইড, CB1 রিসেপ্টরের লাইগ্যান্ড।

উপসংহার

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার বিভিন্ন শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পায়। শিশুরা মোটামুটি ৩ বছর বয়সের আগে তেমন ভাবে কথা বলতেও শেখে না বলে এএসডি নির্ণয় হয় অনেক দেরিতে। অটিস্টিক চিলড্রেনস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন-২০১১ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় তিন লক্ষ শিশু অটিজমে আক্রান্ত, যেখানে প্রতি ৯৪ জন ছেলের মধ্যে একজন এবং প্রতি ১৫০ জন মেয়ের মধ্যে একজন এএসডি-তে আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয়েছিল। ১৮-৩৬ মাসের শিশুদের নিয়ে ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় আক্রান্ত শিশুদের পরিসংখ্যান আগের তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ঢাকায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসঅর্ডার ও অটিজম (IPNA) এর গবেষকগণ তা উল্লেখ করেছেন15। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (CDC) কেন্দ্রের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে প্রতি ৩৬টি শিশুর মধ্যে একজন শিশুর ধরা পড়ে এএসডি16। তবে জিনগত অবকাঠামো ও অঞ্চলভিত্তিতে এই পরিসংখ্যানের পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর এপ্রিল মাসে “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস”পালন করা হয়। বাংলাদেশেও তা উদযাপন করা হয়, কিন্তু এএসডি-সংক্রান্ত গবেষণায় ও চিকিৎসা-ব্যবস্থায় গবেষকদের উচ্চ গুণমানসম্পন্ন অংশীদারিত্ব দেখা যায় না। বলতেই হয়, পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশগুলির তুলনায় বাংলাদেশে অটিজম গবেষণা অনেকটাই পিছিয়ে। আশা করি, সরকার ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এএসডি সমন্ধে আরও সচেতনতামূলক ও গবেষণামূলক-কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। এছাড়াও প্রয়োজন সরকার থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। 

তথ্যসূত্র

  1. McLennan Y, Polussa J, Tassone F, et al. Fragile x syndrome. Curr Genomics. 2011 May;12(3):216-24. 
  2. Nguyen TA, Wu K, Pandey S, et al. A Cluster of Autism-Associated Variants on X-Linked NLGN4X Functionally Resemble NLGN4Y. Neuron. 2020 Jun 3;106(5):759-768.e7.
  3. Schuck RK, Flores RE, Fung LK. Brief Report: Sex/Gender Differences in Symptomology and Camouflaging in Adults with Autism Spectrum Disorder. J Autism Dev Disord. 2019 Jun;49(6):2597-2604.
  4. Liu X, Hua F, Yang D, et al. Roles of neuroligins in central nervous system development: focus on glial neuroligins and neuron neuroligins. J Transl Med. 2022 Sep 10;20(1):418.
  5. Galvez-Contreras AY, Zarate-Lopez D, Torres-Chavez AL, et al.. Role of Oligodendrocytes and Myelin in the Pathophysiology of Autism Spectrum Disorder. Brain Sci. 2020 Dec 8;10(12):951.
  6. Steinman G. IGF – Autism prevention/amelioration. Med Hypotheses. 2019 Jan;122:45-47.
  7. Malara M, Lutz AK, Incearap B, et al. SHANK3 deficiency leads to myelin defects in the central and peripheral nervous system. Cell Mol Life Sci. 2022 Jun 20;79(7):371. 
  8. Trobiani L, Meringolo M, Diamanti T, et al. The neuroligins and the synaptic pathway in Autism Spectrum Disorder. Neurosci Biobehav Rev. 2020, 119: 37-51.
  9. Cast TP, Boesch DJ, Smyth K, et al. An Autism-Associated Mutation Impairs Neuroligin-4 Glycosylation and Enhances Excitatory Synaptic Transmission in Human Neurons. J Neurosci. 2021; 41(3):392-407.
  10. Monteiro P, Feng G. SHANK proteins: roles at the synapse and in autism spectrum disorder. Nat Rev Neurosci. 2017, 18: 147–157. 
  11. Davenport EC, Szulc BR, Drew J, et al. Autism and Schizophrenia-Associated CYFIP1 Regulates the Balance of Synaptic Excitation and Inhibition. Cell Rep. 2019 Feb 19; 26(8): 2037-2051.e6.
  12. Cox DM, Butler MG. The 15q11.2 BP1-BP2 microdeletion syndrome: a review. Int J Mol Sci. 2015 Feb 13;16(2):4068-82.
  13. Aran A, Eylon M, Harel M, et al. Lower circulating endocannabinoid levels in children with autism spectrum disorder. Mol Autism. 2019 Jan 30;10:2.
  14. Phan KL, Angstadt M, Golden J, et al. Cannabinoid modulation of amygdala reactivity to social signals of threat in humans. J Neurosci. 2008;28(10):2313–2319. 
  15. Akhter S, Hussain AHME, Shefa J, Kundu GK, Rahman F, Biswas A. Prevalence of Autism Spectrum Disorder (ASD) among the children aged 18-36 months in a rural community of Bangladesh: A cross sectional study. F1000Res. 2018 Apr 4;7:424.
  16. CDC (U.S. Centers for Disease Control and Prevention) 2018. Data and Statistics on Autism Spectrum Disorder. [accessed 7 March 2019].

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার – সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি  

প্রকাশ: ০১:২৫:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩

অটিজম হলো শিশুদের স্নায়ুবিকাশজনিত একটি সমস্যা, যার কারণে একটি শিশু সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানুষের মধ্যে অটিজম নিয়ে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। জ্ঞান প্রসারের মাধ্যমে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অটিজমকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে (যদিও অটিজমের কিছু স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে), বরং বোঝানো হয়ে থাকে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাগুলির সংমিশ্রণ, যেখানে আত্মসংবৃতি, অ্যাসপারজার-র সংলক্ষণ (Asperger’s syndrome) এবং পরিব্যাপক বিকাশমূলক ব্যাধির (pervasive developmental disorder, PDD) লক্ষণগুলি বিদ্যমান। আবার, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশেষ এক ধরণের সিনড্রোম, যার নাম ‘ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম (Fragile X syndrome, FXS)1। যদিও, অনেক বিশেষজ্ঞ FXS-কে সরাসরি অটিজম-এর অংশ হিসেবে গণ্য করেন না, বরং বলেন যে FXS-আক্রান্ত ব্যক্তিদের অটিজম হবার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যহারে বেশি। ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম মানব X ক্রোমোজোমে FMR1 (ফ্র্যাজাইল এক্স মেসেঞ্জার রিবোনিউক্লিওপ্রোটিন) জিনের মধ্যে নিউক্লিওটাইড CGG ট্রিপলেট পুনরাবৃত্তির কারণে ঘটে, যার পুনরাবৃত্তি ৫৫ থেকে ২০০ পর্যন্ত দেখা যায়। ফলে FMR1-জিনটি অকার্যকর হয় এবং তার প্রোটিন (FMRP) তৈরিতে ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে সংযোগের ত্রুটি ও এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতাও পরিলক্ষিত হয়। অটিজমের যে উপসর্গগুলি দৃশ্যমান তার মধ্যে যোগাযোগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা-ই হচ্ছে প্রকট। তাই, বর্তমানে শুধুমাত্র অটিজমের পরিবর্তে এই মিশ্র-সমস্যাটি ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD/এএসডি)’ বলে আখ্যায়িত হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ ডিসঅর্ডারের পরিবর্তে ‘কন্ডিশন’ বলে থাকেন, কাজেই সে অর্থে এটি ‘অটিজম স্পেকট্রাম কন্ডিশন (ASC)। এই প্রবন্ধে অটিজম ‘এএসডি’ হিসেবেই ব্যাখ্যাত হয়েছে।

লক্ষণসমূহ

এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের আচরণ সাধারণ শিশুদের থেকে আলাদা, দেখা যায় শিশুদের মানসিক সীমাবদ্ধতা। তারা সব সময় আত্মলীন থাকে, কারো সঙ্গে কথা বলে না, খেলা করে না, নিজের জগতেই নিজে বিচরণ করে এবং তাদের মধ্যে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়- যেন সে ওই কাজটিতে অভিরত। অন্যদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশতেও পারে না। এ ছাড়াও অনেক সময় শিশুটির মা প্রথম বুঝতে পারেন যে তাঁর শিশুটি কথা বলতে পারছে না বা কথা বলতে দেরি হচ্ছে। শিশুটির বাবা-মা স্বভাবতই উদ্বিগ্ন হন। তাদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য প্রকট থাকে যে তারা কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলে না বা শোনে না। এমনকী, নিজের বাবা বা মায়ের চোখের দিকেও এরা চোখ রাখতে পারে না। অনেকে হাইপার অ্যাকটিভ হয়, নিজের হাত কামড়িয়ে রক্তাক্ত করে বা হাতের কাছের জিনিস-পত্র ভেঙে নষ্ট করে। তবে যাইহোক, আর অন্যান্য মানসিক ব্যাধির মত এএসডি-কে মানসিক ব্যাধি হিসাবে দেখার কোনো কারণ নেই।

এএসডি আক্রান্তে লিঙ্গ পার্থক্য

বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন যে, প্রতি ৫৪ জনের মধ্যে ১টি শিশুর ASD হওয়ার প্রবণতা আছে। এএসডি সমস্ত আর্থ-সামাজিক স্তরেই দেখা যায়। তবে, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের এএসডি হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যহারে বেশি2, অর্থাৎ ছেলে-থেকে-মেয়ে ৪:১ অনুপাতে। এই লিঙ্গ পার্থক্যের অন্তর্নিহিত জিনগত কারণ লুকিয়ে রয়েছে মানুষের সেক্স-ক্রোমোজোমে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানব এক্স (X)-ক্রোমোজোমে অবস্থিত নিউরোলিগিন (Neuroligin, NLGN4) নামক একটি জিনের মিউটেশন এএসডি-র একটি অন্যতম কারণ3। নিউরোলিগিন প্রোটিনটি স্নায়ুগুলির মধ্যে সিন্যাপসিস (সংযোগস্থল) স্থাপন এবং বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাতে করে স্নাতকোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন থাকে। যেহেতু মেয়েদের সেক্স-ক্রোমোজোমের দুটি-ই  হলো X ক্রোমোজোম এবং ছেলেদের মধ্যে একটি X ও একটি Y, কাজেই একটি X ক্রোমোজোমে ঘটে যাওয়া NLGN4X-জিনটির মিউটেশন আরেকটি (সমসংস্থ) X ক্রোমোজোমের স্বাভাবিক NLGN4X জিন দ্বারা সুরক্ষা পায়। কিন্তু, ছেলেদের ক্ষেত্রে Y ক্রোমোজোমে যেহেতু কার্যকরীভাবে সমতুল্য জিন থাকে না, তাই তারা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রসঙ্গতঃ সাধারণ অবস্থায় মেয়েদের দুটি X ক্রোমোজোমের একটি নিষ্ক্রিয় থাকে। তবে, এক্ষেত্রে NLGN4X জিনটি নিষ্ক্রিয়করন থেকে মুক্তি পেয়ে একটি স্বাভাবিক প্রোটিন তৈরি ক’রে মেয়েদের সুরক্ষিত রাখে।

অটিজম কোনো বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী রোগ নয়। সে কারণেই, কখনও এই শিশুরাই বিশেষ গুণে পারদর্শী হয়। বিশ্বখ্যাত অনেক মনীষী আছেন যাঁরা অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। দেখা গিয়েছে, এএসডি-আক্রান্ত কিছু মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জীবনে অবিশ্বাস্যভাবে সফলতা এনেছে। অনেক উদাহরণ রয়েছে- তবে দুইজন বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ না করলেই নয়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও নোবেল জয়ী আলবার্ট আইনস্টেইন অটিস্টিক ছিলেন এবং তিনিও কথা বলা শুরু করেছেন অনেক দেরিতে। আইজ্যাক নিউটন-ও অটিস্টিক ছিলেন। ২০২২ সালের অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী ভার্নন স্মিথ আক্রান্ত ছিলেন অ্যাসপার্জার সিন্ড্রোমে।

সিন্যাপসে-এর গঠন ও বিকাশ

প্রি- এবং পোস্ট-সিন্যাপ্টিক স্নায়ুকোষের সংযোগস্থলকে সিন্যাপস (synapse) বলে। সুস্থ ও স্বাভাবিক সিন্যাপ্সগঠন সংকেত-সংবহনের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিউরনগুলি সিন্যাপসের মাধ্যমে আন্তঃযোগাযোগ এবং যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক গঠন করে। নিউরেক্সিন (Neurexin)  ও  নিউরোলিগিন (NLGN 3/4) হচ্ছে কোষ সংযোজন প্রোটিন যা নিউরন সিন্যাপসের পরিপক্কতা এবং কার্যকারিতায় ভূমিকা পালন করে4। সিন্যাপস বিকাশে সহযোগী প্রোটিনগুলি হলো PSD-95, SHANK, ও GKAP (দেখুন ছবি ১)। এছাড়াও, সিন্যাপটোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় NMDA (N-methyl-d-aspartate) গ্লুটামেট রিসেপ্টর ও তার সংশ্লিষ্ট প্রোটিনগুলির সক্রিয়করণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্স-ক্রোমোজোমে অবস্থিত NLGN4 জিনের মিউটেশন এএসডি সমস্যার একটি সম্ভাব্য কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, মস্তিষ্কের, বিশেষ করে সেরেব্রাম অঞ্চলের স্নায়ুকোষে অ্যাক্সনগুলির মায়েলিন (myelin) নামক অন্তরক আবরণের অপর্যাপ্ততা (hypomyelination) নিউরনগুলির সংযোগ ও সংবহন সমন্বয়হীনতার পরিণতি বলে মনে করা হয় 5। এই অনাটনের জিনগত কারণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে IGF (insulin growth factor)1-জিনের মিউটেশন। IGF-1 এর ঘাটতি অপর্যাপ্ত নিউরন-মায়েলিন এবং ত্রুটিপূর্ণ সিন্যাপসের বিকাশ প্রসবোত্তর জীবনের প্রথম বছরে শিশুদের মস্তিষ্কে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে দেখা যায় এবং তাদের শৈশব বছর এবং তার পরেও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে 6। এছাড়াও, SHANK3 জিনের মিউটেশন বা ডিলিশন ত্রুটিযুক্ত মায়েলিন তৈরি করে যা স্বাভাবিক সংকেত-সংবহনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় 7। 

D:\Rashid\Autism\Nuroligin-Neurexin-RH.jpg

কারণসমূহ

এএসডি সৃষ্টির একাধিক কারণ রয়েছে, যার ফলে এর সঠিক চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়েছে। দুই দশকের নিবিড় গবেষণার ফলাফল থেকে অটিজম-এর কারণ সমন্ধে এখন অনেকটা স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। একটি ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন কোষগুলির পারস্পরিক সংযোগ কমে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন হওয়া,  কিংবা স্নায়ু থেকে নিঃসৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থের অভাব হবার কারণেই শিশুদের এএসডি দেখা দেয়। যাইহোক, এএসডি-র পেছনে দুটি মূল কারণ হচ্ছে জিনগত সমস্যা এবং পরিবেশগত। 

জিনগত কারণ

FMR1 জিনের মিউটেশন ও নিউক্লিওটাইড-পুনরাবৃত্তি ছাড়াও, মানব এক্স (X)-ক্রোমোজোমে অবস্থিত নিউরোলিগিন (Neuroligin, NLGN4) জিনের মিউটেশন অটিজমের একটি অন্যতম কারণ- যা আগেই উল্লেখ করেছি। স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য প্রিসিন্যাপটিক নিউরেক্সিন প্রোটিন এবং পোস্টসিন্যাপটিক নিউরোলিগিন প্রোটিন-দুটি সরাসরি জড়িত, এবং সংকেতসংবহনে ত্রুটির কারণেই সৃষ্টি হয় এএসডি-সহ নানা স্নায়ুবিকাশ-সম্পর্কিত জটিলতা। নিউরোলিগিন পরিবারের চারটি জিন রয়েছে, তম্মধ্যে NLGN3 ও NLGN4 জিনের একাধিক মিউটেশনকে এএসডি-র কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে 8, 9। 

শ্যাঙ্ক (SHANK) প্রোটিন হল পোস্টসিনাপটিক নিউরোনের একটি মাল্টিডোমেন স্ক্যাফোল্ড প্রোটিন যা নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপ্টর, আয়ন চ্যানেল এবং অন্যান্য মেমব্রেন প্রোটিনকে অ্যাক্টিন সাইটোস্কেলটন এবং জি-প্রোটিন-যুক্ত সিগন্যালিং পাথওয়ের সাথে সংযুক্ত করে। এই প্রোটিনগুলি সিন্যাপস গঠনেও ভূমিকা পালন করে। Shank-জিনের মিউটেশন এএসডি-র কারণ হিসেবে চিহ্নিত 7, 10

বিশেষ কিছু জিনের কপি নাম্বার বৈচিত্র (Copy number variation, CNV) এএসডি-সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে স্বীকৃত। CNV আমাদের জিনোমের কোনো জিন বা ডিএনএ খন্ডের কপি বা অনুলিপির সংখ্যাকে বোঝায়। জিনোমে CNV বৈচিত্র আনে ডুপ্লিকেশন এবং ডিলিশন জিনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ডুপ্লিকেশনের মাধ্যমে কারো জিনোমে নির্দিষ্ট কোনো একটি জিনের অনেকগুলি কপি দেখা যায়, কিন্তু অন্যদের মাঝে ডিলিশনের কারণে ওই একই জিনটির কপি নাম্বার অনেকাংশে কম পাওয়া যায়। CNV-র ক্লাসিক উদাহরণ হিসাবে আমরা অ্যামাইলেজ (Amylase) জিনটিকে তুলে ধরি। মানবজিনোমে বিশেষ কিছু জিনের সংখ্যার এই পরিবর্তন (ডুপ্লিকেশন বা ডিলিশন) শিশুদের স্নায়ুবিকাশে এক বড় পরিণতি ডেকে আনে। মানবজিনোমের ১৫নং ক্রোমোজোমের এক প্রান্তে, ঠিক 15q11.2 লোকাসে, এই ধরণের একটি ভঙ্গুর অঞ্চল রয়েছে যেখানে অবস্থান করে চারটি জিন: TUBGCP5, NIPA1, NIPA2 ও CYFIP1। গবেষষণায় দেখা গিয়েছে যে শেষোক্ত দুইটি (NIPA2 ও CYFIP1) জিন মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স, হিপ্পোক্যাম্পাস ও সেরেবেলাম অঞ্চলগুলিতে প্রকাশ পায় এবং জিনগুলির CNV এএসডি-সহ অন্যান্য স্নায়ুবিকাশজনিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার সাথে সরাসরি জড়িত11। স্বাভাবিক সিন্যাপটিক ফাংশন এবং আচরণ বজায় রাখতে CYFIP1 (cytoplasmic FMR1 interacting protein1) সিন্যাপ্সগুলিতে NMDA গ্লুটামেট রিসেপ্টর এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলির প্রোটিন সংশ্লেষণকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংকেত-সংবহনে CYFIP1 প্রোটিনটি সিন্যাপপটিক উত্তেজনা এবং নিরোধের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। এএসডি-র স্পেকট্রাম বিশেষে জিনটির ডুপ্লিকেশন বা ডিলিশন এর অন্যতম একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে12। এমনকি CYFIP1 জিনটির ডোজ পরিবর্তন করে গবেষকগণ প্রতিরোধমূলক সংকেত-সংবহনের দ্বিমুখী প্রভাব প্রকাশ করেছেন (দেখুন ছবি ২) 11
D:\Rashid\Autism\CYPIP1.jpg

গবেষণামূলক একটি বড় সমীক্ষায় আরও একটি বিষয় উদ্ঘাটিত হয়েছে যে, এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ক্যানাবিনোয়েড (CBD) উপাদানগুলি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে13। এই নিরীক্ষণটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের এএসডি-সম্পর্কিত সামাজিক আচরণের অস্বাভাবিকতার পেছনে অভ্যন্তরীণ CBD-গুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটা প্রমাণিত যে, মানুষের অভ্যন্তরীণ CBD-গুলি- যেমন আনন্দমাইড বা AEA (N-arachidonoylethanolamine), PEA (N-palmitoylethanolamine) এবং OEA (N-oleoylethanolamine), তাদের রিসেপ্টরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে আচরণগত বিভিন্ন কার্যকলাপ14। মস্তিষ্ক (ফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং সাবকর্টিক্যাল এলাকা) থেকে নিঃসৃত আনন্দমাইড একটি ফ্যাটি অ্যাসিড নিউরোট্রান্সমিটার, ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি উপজাত। জি প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর CB1 এর সাথে আনন্দমাইডের আবদ্ধতা ডোপামিন, সেরোটোনিন, GABA (গামা-অ্যামিনোব্যুটারিক অ্যাসিড) এবং গ্লুটামেট স্নায়ুসংকেত পরিবহনে ভূমিকা পালন করে। আনন্দমাইড নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক যোগাযোগ, কমায় মানসিক চাপ ও বৃদ্ধি করে স্মৃতিশক্তি।

পরিবেশগত কারণ

গর্ভাবস্থার প্রথম দুইটি মাস অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময়ে মায়েদের সংক্রমণকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এর মতো স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থার ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়ে গর্ভিণী মায়েদের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে তাদের দেহে যেসব এন্টিবডি তৈরি করে তা এএসডি সৃষ্টির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রসঙ্গতঃ গর্ভাবস্থার তৃতীয় সপ্তাহে ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ শুরু হয়। নিউরাল প্রোজেনিটার কোষগুলি নিউরন এবং গ্লিয়াতে বিভক্ত এবং পার্থক্য হতে শুরু করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে। নবম সপ্তাহের মধ্যে, মস্তিষ্ক একটি ছোট, মসৃণ গঠন হিসাবে উপস্থিত হয় এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের শেষে, ভ্রূণের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। 

এছাড়াও, গর্ভধারণের সময় পিতামাতার বেশি বয়স, বায়ু দূষণ, মাতৃ-স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা ইমিউন সিস্টেমের ব্যাধি, শিশুর মস্তিষ্কে প্রসবকালীন অক্সিজেন প্রতিবন্ধকতা এএসডি-র কারণ হতে পারে। পরিবেশের বিষাক্ত উপকরণ (যেমন  মার্কারি, আর্সেনিক, কীটনাশক ওষুধ ইত্যাদি) গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ধ্বংস করতে পারে। গর্ভাবস্থায় অধিক দুশ্চিন্তা করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অতিমাত্রায় ওষধ সেবন, মায়ের ধুমপান ও মদ্যপান এএসডি-র সূত্রপাত হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এএসডি-র বর্তমান ও ভবিষ্যত চিকিৎসা

শিশুদের মধ্যে এএসডি-র কোন লক্ষণ দেখতে পাওয়া গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অজ্ঞানতা সবসময়ই সমস্যা সমাধানের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের অটিজম সমন্ধে সচেতন করে প্রয়োজন। নইলে, দেরি হয় রোগ নির্ণয় ও নিরাময় করতে, তৈরি হয় নতুন জটিলতা। বর্তমানে অটিজম চিকিৎসার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কাউন্সিলিং ও থেরাপি গ্রহণ করা উচিত। অনেক চিকিৎসক বিশেষকরে ‘আচরণ এবং যোগাযোগ বৃদ্ধিকারক থেরাপি’, ‘কথা-ভাষা থেরাপি’-সহ অন্যান্য থেরাপি নেয়ার পরামর্শ দেন। এসব থেরাপি আক্রান্ত শিশুদের অন্যদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে শেখায়। এএসডি-আক্রান্ত অনেক শিশুদের মধ্যে হাইপার অ্যাকটিভিটি, অনিদ্রা, খিঁচুনি জাতীয় রোগ দেখা যায়। তবে ঠিক সময়ে দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে দেখা গিয়েছে এদের অনেকেই সমাজের স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে।

দুঃখের বিষয়, এএসডি নিরাময়ের ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল চিকিৎসায় অদ্যাবধি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। গবেষকগণ নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু এএসডি-এর জিনগত ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা, ব্যাপকতা এবং বহুমাত্রিক রূপ চিকিৎসা বিকাশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সে কারণে, এএসডি-র প্রতিকার হিসেবে কোনো জাদুকরী ওষুধ বর্তমানে নেই। যেসব প্রচলিত অ্যান্টিসাইকোটিক ও অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ এএসডি চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় তার কার্যকারিতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে সেগুলোর ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেন। বর্তমানে এএসডি-র যেসব জিনগত কারণসমূহ চিহ্নিত হয়েছে সেগুলোর উপর ভিত্তি করে বেশ কিছু নতুন প্রজন্মের ওষুধ পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে- যেমন: ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টর (CB1) অ্যাগোনিস্ট, ভাসোপ্রেসিন 1A নিরোধক, NMDA রিসেপ্টর নিরোধক, অ্যাসিটিলকোলিনেস্টারেজ ইনহিবিটর, টাইরোসিন হাইড্রোক্সিলেজ ইনহিবিটর, অক্সিটোসিন রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট এবং GABA A রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট। আশা করি, নতুন প্রজন্মের এই ওষুধগুলি এএসডি নিরাময়ে অচিরেই উলেখযোগ্য ফলপ্রসূতা এনে দিবে। আবার অনেক নিউরোবিজ্ঞানী স্টেমকোষ থেরাপিকেও এএসডি নিরাময়যোগ্য কৌশল হিসেবে দেখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সতর্কতা হিসেবে প্রসবপূর্ব ফোলিক অ্যাসিড (Folic acid/ভিটা.বি৯)সহ মাল্টিভিটামিন গ্রহণ অটিজম ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অধিকন্তু, গর্ভাবস্থায় ভিটামিন ও সম্পূরক গ্রহণ নির্দিষ্ট পরিবেশগত দূষকগুলির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষামূলক প্রভাব প্রদান করতে পারে। এছাড়া, ফ্যাটি অ্যাসিড সম্মৃদ্ধ মাছ, ডিম, ফল ও সব্জি শিশুদের এএসডি বিকাশকেও প্রতিহত করে। কারণ এই খাবারগুলোর মধ্যেই রয়েছে প্রাকৃতিক আনন্দ-মাইড, CB1 রিসেপ্টরের লাইগ্যান্ড।

উপসংহার

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার বিভিন্ন শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ পায়। শিশুরা মোটামুটি ৩ বছর বয়সের আগে তেমন ভাবে কথা বলতেও শেখে না বলে এএসডি নির্ণয় হয় অনেক দেরিতে। অটিস্টিক চিলড্রেনস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন-২০১১ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় তিন লক্ষ শিশু অটিজমে আক্রান্ত, যেখানে প্রতি ৯৪ জন ছেলের মধ্যে একজন এবং প্রতি ১৫০ জন মেয়ের মধ্যে একজন এএসডি-তে আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয়েছিল। ১৮-৩৬ মাসের শিশুদের নিয়ে ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় আক্রান্ত শিশুদের পরিসংখ্যান আগের তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ঢাকায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসঅর্ডার ও অটিজম (IPNA) এর গবেষকগণ তা উল্লেখ করেছেন15। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (CDC) কেন্দ্রের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে প্রতি ৩৬টি শিশুর মধ্যে একজন শিশুর ধরা পড়ে এএসডি16। তবে জিনগত অবকাঠামো ও অঞ্চলভিত্তিতে এই পরিসংখ্যানের পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর এপ্রিল মাসে “বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস”পালন করা হয়। বাংলাদেশেও তা উদযাপন করা হয়, কিন্তু এএসডি-সংক্রান্ত গবেষণায় ও চিকিৎসা-ব্যবস্থায় গবেষকদের উচ্চ গুণমানসম্পন্ন অংশীদারিত্ব দেখা যায় না। বলতেই হয়, পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশগুলির তুলনায় বাংলাদেশে অটিজম গবেষণা অনেকটাই পিছিয়ে। আশা করি, সরকার ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এএসডি সমন্ধে আরও সচেতনতামূলক ও গবেষণামূলক-কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। এছাড়াও প্রয়োজন সরকার থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। 

তথ্যসূত্র

  1. McLennan Y, Polussa J, Tassone F, et al. Fragile x syndrome. Curr Genomics. 2011 May;12(3):216-24. 
  2. Nguyen TA, Wu K, Pandey S, et al. A Cluster of Autism-Associated Variants on X-Linked NLGN4X Functionally Resemble NLGN4Y. Neuron. 2020 Jun 3;106(5):759-768.e7.
  3. Schuck RK, Flores RE, Fung LK. Brief Report: Sex/Gender Differences in Symptomology and Camouflaging in Adults with Autism Spectrum Disorder. J Autism Dev Disord. 2019 Jun;49(6):2597-2604.
  4. Liu X, Hua F, Yang D, et al. Roles of neuroligins in central nervous system development: focus on glial neuroligins and neuron neuroligins. J Transl Med. 2022 Sep 10;20(1):418.
  5. Galvez-Contreras AY, Zarate-Lopez D, Torres-Chavez AL, et al.. Role of Oligodendrocytes and Myelin in the Pathophysiology of Autism Spectrum Disorder. Brain Sci. 2020 Dec 8;10(12):951.
  6. Steinman G. IGF – Autism prevention/amelioration. Med Hypotheses. 2019 Jan;122:45-47.
  7. Malara M, Lutz AK, Incearap B, et al. SHANK3 deficiency leads to myelin defects in the central and peripheral nervous system. Cell Mol Life Sci. 2022 Jun 20;79(7):371. 
  8. Trobiani L, Meringolo M, Diamanti T, et al. The neuroligins and the synaptic pathway in Autism Spectrum Disorder. Neurosci Biobehav Rev. 2020, 119: 37-51.
  9. Cast TP, Boesch DJ, Smyth K, et al. An Autism-Associated Mutation Impairs Neuroligin-4 Glycosylation and Enhances Excitatory Synaptic Transmission in Human Neurons. J Neurosci. 2021; 41(3):392-407.
  10. Monteiro P, Feng G. SHANK proteins: roles at the synapse and in autism spectrum disorder. Nat Rev Neurosci. 2017, 18: 147–157. 
  11. Davenport EC, Szulc BR, Drew J, et al. Autism and Schizophrenia-Associated CYFIP1 Regulates the Balance of Synaptic Excitation and Inhibition. Cell Rep. 2019 Feb 19; 26(8): 2037-2051.e6.
  12. Cox DM, Butler MG. The 15q11.2 BP1-BP2 microdeletion syndrome: a review. Int J Mol Sci. 2015 Feb 13;16(2):4068-82.
  13. Aran A, Eylon M, Harel M, et al. Lower circulating endocannabinoid levels in children with autism spectrum disorder. Mol Autism. 2019 Jan 30;10:2.
  14. Phan KL, Angstadt M, Golden J, et al. Cannabinoid modulation of amygdala reactivity to social signals of threat in humans. J Neurosci. 2008;28(10):2313–2319. 
  15. Akhter S, Hussain AHME, Shefa J, Kundu GK, Rahman F, Biswas A. Prevalence of Autism Spectrum Disorder (ASD) among the children aged 18-36 months in a rural community of Bangladesh: A cross sectional study. F1000Res. 2018 Apr 4;7:424.
  16. CDC (U.S. Centers for Disease Control and Prevention) 2018. Data and Statistics on Autism Spectrum Disorder. [accessed 7 March 2019].