১০:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

রেটিনার অবক্ষয়জনিত দৃষ্টিহীনতা এবং প্লুরিপোটেন্টস্টেম কোষ থেরাপি

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
  • প্রকাশ: ০৯:৪১:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ মার্চ ২০২৩
  • / ১০৬২ বার পড়া হয়েছে

চোখ


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বা দৃষ্টিসূক্ষ্মতা হলো ২০/২০। অর্থাৎ, এ ধরণের দৃষ্টির সংজ্ঞা হচ্ছে ২০ ফুট দূর থেকে একটি বস্তুকে স্পষ্টভাবে দেখার ক্ষমতা। দৃষ্টির এই স্বচ্ছতা এনে দেয় মুলতঃ চোখের রেটিনা। রেটিনা হলো স্নায়ুকোষযুক্ত চোখের একটি পাতলা স্তর (প্রায় ০.৫ মিলিমিটার পুরু), যা আলোকসংবেদী কোষ ফটোরিসেপ্টর (রড ও কোণ কোষ), বাইপোলার কোষ ও গ্যাংলিওন কোষ-এবং সাথে দুটি দৃষ্টি-সমন্বয়কারী কোষ হোৱাইজোন্টাল ও অ্যামাক্রিন কোষ-নিয়ে গঠিত। সমন্বিতভাবে এই কোষগুলো রেটিনায় একটি জটিল সার্কিট তৈরি করে, যা দৃষ্টিগত সংকেতগুলোকে তড়িৎ-রাসায়নিক শক্তি বা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ায় ফটোরিসেপ্টর কোষ থেকে বাইপোলার কোষে এবং তারপর গ্যাংলিয়ন কোষে প্রেরণ করা হয় যা অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছয় (ছবি১ দেখুন)। রড কোষগুলো আবছা বা মৃদু আলোতে দেখতে সাহায্য করে (নিরালোক দৃষ্টিশক্তি), আর কোণ কোষগুলো স্বাভাবিক উজ্জ্বল আলোতে দেখতে সাহায্য করে (সালোক দৃষ্টিশক্তি)। রেটিনা ও অপটিক স্নায়ু হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অংশ। মানবচক্ষুতে রয়েছে প্রায় ১২০ মিলিয়ন (এক কোটি বিশ লক্ষ) রড কোষ ও মাত্র ৬ মিলিয়ন (৬০ লক্ষ) কোণ কোষ। রেটিনার কোণ-ফটোরিসেপ্টর তিনটি ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীল অপসিন (L-opsin/L-cone, M-opsin/M-cone, S-opsin/S-cone) প্রোটিন নিয়ে গঠিত, যা দিনের উজ্জ্বল আলোয় (ফোটপিক, photopic) বিভিন্ন রঙের দৃষ্টিগত প্রত্যক্ষণে ব্যবহৃত হয়। রেটিনার পশ্চাদ্ভাগে (রেটিনা এবং কোরয়েড স্তরের মাঝে) “রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম”(RPE)নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ এপিথেলীয় কোষস্তর রয়েছে, যা রেটিনাকে সজীব রাখতে এবং আলো শনাক্ত করতে ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোকে সক্ষম করে তোলে।
D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\Eye anatomy with retinal cell layers-Rashid.jpg

ম্যাকুলার গুরুত্ব ও অবক্ষয়

রেটিনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ডিম্বাকৃতির হলুদ রঙের এলাকা যা ম্যাকুলা (macula) নামে পরিচিত। মানুষের রেটিনাতে কোণ কোষগুলোর অধিকাংশই রেটিনার ম্যাকুলা অঞ্চলে ঘনীভূত (ছবি২ দেখুন)। ম্যাকুলার ব্যাস প্রায় ৫.৫ মিমি (0.২২ ইঞ্চি)। ম্যাকুলা তিনটি ক্যারোটিনয়েড রঙ্গক ধারণ করে: লুটেইন, জিজ্যানথিন এবং মেজো-জিজ্যানথিন। ম্যাকুলার মাঝে রয়েছে ফোভিয়া (fovea)। বইপড়া, গাড়ি চালনা ইত্যাদি যেসব কাজে তীক্ষ্ণদৃষ্টির প্রয়োজন, সেসব কাজে ফোভিয়া ব্যবহৃত হয়। ম্যাকুলা মুলতঃ সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয়, উচ্চমানের তীক্ষ্ণদৃষ্টি, এবং সেই সাথে বিভিন্ন রঙের দৃষ্টি। বর্ধিত বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ, কোরয়েডের উচ্চতর রক্ত ​​প্রবাহ এবং ফোকাসযুক্ত আলোক শক্তির সংস্পর্শও ম্যাকুলাকে পার্শ্বীয় (peripheral) রেটিনা থেকে আলাদা করে। ম্যাকুলা ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ম্যাকুলা-সম্পর্কিত দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যেসব চোখের রোগে মানুষ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে সেগুলো হলো বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন, রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (একটি জিনগত রোগ), গ্লুওকোমা, ক্যাটারাক্ট ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। এছাড়া, আঘাতজনিত কারণ ও ভিটামিনের অভাবেও অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন ও তার সম্ভাবনাময় চিকিৎসা নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\retina fundus-Rashid.jpg

এএমডি হচ্ছে ম্যাকুলার অবক্ষয় বা ভাঙ্গন, যার ফলে চোখের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে, এমনকি পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হওয়ায় সম্ভাবনাও রয়েছে। যদিও ম্যাকুলার অবক্ষয়ের কারণে পেরিফেরাল বা পার্শ্বীয় দৃষ্টি সাধারণত প্রভাবিত হয় না, তবে বিস্তারিত দেখার জন্য প্রয়োজনীয় তীক্ষ্ণ, কেন্দ্রীয়দৃষ্টি বা  সোজা-সামনের দৃষ্টি হারায়। ম্যাকুলার কেন্দ্রে রয়েছে ফোবিয়া (fovea) যেখানে কোণ ফটোরিসেপ্টর কোষের ঘনত্ব অনেক বেশি। প্রথমদিকে এএমডি রোগের প্রায়ই কোন উপসর্গ থাকে না। সময়ের সাথে সাথে, দৃষ্টিশক্তি ক্রমশঃ খারাপ হতে থাকে যা উভয় চোখকে প্রভাবিত করতে পারে। কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারানোর ফলে মানুষকে চিনতে, গাড়ি চালাতে, পড়া বা দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন বা অবক্ষয় সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়, যদিও শিশু এবং অল্প বয়স্কদের মধ্যেও ম্যাকুলার অবক্ষয়জনিত এএমডি-সমতুল্য স্টারগার্ড রোগ (Stargardt disease, STGD1) দেখা দিতে পারে, যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একক-জিনগত রেটিনার একটি রোগ। তবে, STGD1 রোগের কারণ ভিন্ন- এটি একটি অটোজোমাল রিসেসিভ (autosomal recessive) রোগ, যা রেটিনা-নির্দিষ্ট এটিপি-বাইন্ডিং ক্যাসেট সাবফ্যামিলি এ, মেম্বার ৪ (ABCA4) জিনের মিউটেশনের কারণে ঘটে। 

বয়সজনিত ম্যাকুলার অবক্ষয় (এএমডি) হতে পারে “শুষ্ক” (অ্যাট্রোফি/atrophy) বা “ভেজা” (নিঃস্রাবনমূলক/exudative)। এএমডি-র শুষ্ক রূপটিতে RPE ও ফটোরিসেপ্টরগুলো ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ম্যাকুলা পাতলা হয়ে যায়। এই রূপের উল্লেখযোগ্য কোনো চিকিৎসা নেই। তবে পুষ্টিকর সম্পূরক, যেমন ভিটামিন সি (৫০০ মিলিগ্রাম/মিগ্রা), ভিটামিন ই (৪০০ IU), লুটেইন (১০ মিগ্রা), জিজ্যান্থিন (২ মিগ্রা), জিঙ্ক (৪০ মিগ্রা) এবং ক্যুপ্রিক অক্সাইড (২ মিগ্রা) এই রোগের অগ্রগতি ধীর করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে, শুষ্ক-এএমডি রোগীদের চোখে টেলিস্কোপিক লেন্স প্রতিস্থাপন করে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। অপরদিকে, এএমডি-র “ভেজা” আকারে, রেটিনার নীচে একটি অস্বাভাবিক রক্তনালীর স্তর বৃদ্ধি পায় এবং অনিয়ন্ত্রিত ওই রক্তনালিগুলোয় যত্রতত্র ফুটো হয়ে তরল পদার্থ ও রক্ত ​​নির্গত হতে পারে। ফলে, কেন্দ্রীয় দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। “ভেজা এএমডি” রোগটিকে অ্যান্টি-ভেজেফ (anti-VEGF) থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ভাস্কুলার এন্ডোথেলিয়াল গ্রোথ ফ্যাক্টর বা VEGF হলো একটি সংকেতবাহী গ্রোথ ফ্যাক্টর বা প্রোটিন, যা বিদ্যমান রক্তনালি থেকে নতুন রক্তনালিকা সৃষ্টি করে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় নিওভাসকুলারাইজেশন (neovascularization)। অ্যান্টি-ভেজেফ ওষুধ, যেমন একটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি রানিবিজুমাব (ranibizumab/lucantis), VEGF-এর ক্রিয়া প্রতিরোধ করে এবং ম্যাকুলার অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে, উভয় ক্ষেত্রে এমন কোন প্রতিকার বা স্থায়ী চিকিৎসা নেই যা ইতিমধ্যে হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেয়। ২০২০ সালের হিসাবে, এএমডি বিশ্বব্যাপী ১৯০ মিলিয়নেরও বেশি লোককে প্রভাবিত করেছে এবং অনুমান করা হচ্ছে যে ২০৪০ সাল নাগাদ এর প্রকোপ ২৪৪ মিলিয়নে উন্নীত হবে। এটি পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে সমানভাবে দেখা যায়।

এএমডি রোগের কারণসমূহ

এএমডি হলো ম্যাকুলার অবক্ষয় এবং এটি বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রোগ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। তবে, এই রোগটির বিকাশে অন্তর্নিহিত জেনেটিক এবং নন-জেনেটিক নানাবিধ জৈবিক কারণও রয়েছে। এএমডি রোগের প্রাথমিক কারণ হলো চোখের ‘রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম’ (RPE) এর অবক্ষয়, যার ফলে এএমডি রোগীদের ক্ষেত্রে ফটোরিসেপ্টর (রড/কোণ) কোষগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ফলে অপরিবর্তনীয় দৃষ্টিহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগটিতে RPE এবং কোরয়েড স্তরের মাঝে ম্যাকুলায় এক ধরণের হলুদবর্ণের দলা বা ড্র্রুজন (drusen) ক্রমবর্ধিষ্ণুহারে জমতে থাকে। এই ড্র্রুজনগুলো বহিঃকোষীয় প্রোটিন এবং লিপিড দিয়ে তৈরি। জমতে থাকা ড্র্রুজনের মধ্যে দেখা গিয়েছে ভিট্রোনেকটিন (vitronectin) এবং অ্যামাইলয়েড বিটা (Amyloid beta) প্রোটিনের আধিক্য (যা আলঝেইমার্স রোগেও মস্তিষ্কে তৈরি হয়), ফলে এএমডি রোগটিকে অনেকে চোখের আলঝেইমার্স বলে আখ্যায়িত করেছেন। এএমডি রোগের ঝুঁকিপূর্ণ প্রধান কারণগুলো হলো বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ মাত্রার সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (CRP), স্থূলতা, হৃদরোগ, হালকা রঙের চোখ (নীল বা সবুজ আইরিস), ধূমপান, সূর্যালোক থেকে প্রাপ্ত অতিবেগুনী রশ্মি এবং পারিবারিক ইতিহাস বা জেনেটিক্স। শেষোক্ত কারণটি মূলত জিনগত এবং সেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে এএমডি হওয়ার প্রবণতা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় তিন থেকে ছয় গুণ বেশি। GWAS (Genome-wide association studies) ক্যাটালগ অনুযায়ী অনেকগুলো জিন এএমডি-র সাথে সম্পৃক্ত (https://www.ebi.ac.uk/gwas/)। তাদের মধ্যে যে সমস্ত জিন বা ফ্যাক্টর নিয়ে বেশি অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং এএমডি রোগের জিনগত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো কমপ্লিমেন্ট ফ্যাক্টর, বিশেষ করে ফ্যাক্টর H, অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন ই (APOE), ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর ২ (FGF-2), ডিএনএ মেরামতকারী প্রোটিন (যেমন PARP1), মেটালোপ্রোটিনেজ ইনহিবিটর (TIMP3) এবং বয়সজনিত ম্যাকুলোপ্যাথি সংবেদনশীলতা প্রোটিন২ (ARMS2)। এছাড়াও, SERPING1 (সেরপিন পেপ্টিডেজ ইনহিবিটর) ও HTRA1 (একটি সেরিন প্রোটিয়েজ) জিনের মিউটেশন ম্যাকুলার অবক্ষয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। 

কোষের প্লুরিপোটেন্সি কী

একটি কোষ যখন তার বিভাজনের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন ধরণের কোষে রূপান্তরিত হওয়ার জিনগত বিশেষ এক ক্ষমতা অর্জন করে, তখন কোষটির সেই অসাধারণ সামর্থ্যকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্সি (pluripotency) ও কোষটিকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্ট। শুধুমাত্র দেহের অন্তর্নিবিষ্ট স্টেম কোষগুলো প্রকৃতিগতভাবে এই ধরণের অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। সামর্থ্যের তারতম্যে স্টেম কোষকে কখনও বলা হয় টটিপোটেন্ট, প্লুরিপোটেন্ট, বা মাল্টিপোটেন্ট। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতা টোটিপটেন্ট কোষের তুলনায় কম। প্রকৃতিগতভাবে ভ্রূণীয় স্টেম কোষ (Embryonic Stem Cells, ESCs)গুলোর সে ক্ষমতা থাকায় তারা তিনটি ভ্রূণীয় জার্ম স্তর তৈরি করে- এন্ডোডার্ম, মেসোডার্ম ও এক্টোডার্ম। এন্ডোডার্ম তৈরি করে ফুসফুস ও শ্বাসনালী, পেটের অভ্যন্তরীণ আস্তরণ, মূত্রথলি এবং পৌষ্টিক নালী (মুখ, ফ্যারিংক্স ও রেকটাম ছাড়া)। মেসোডার্মের কোষগুলো সৃষ্টি করে অস্থি ও অস্থি-পেশি, পৌষ্টিকতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, লোহিত রক্তকণিকা, মূত্রনালী এবং এক ধরনের সংযোগকারী টিস্যু, মেসেনকাইম (mesenchyme)। অন্যদিকে, এক্টোডার্ম স্তনগ্রন্থিসহ এপিথেলীয় ও স্নায়ু টিস্যু (মেরুদন্ড, পেরিফেরাল স্নায়ু এবং মস্তিষ্ক)র বিকাশ করে। টটিপোটেন্ট ও প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি সম্পূর্ণ জীব তৈরি না হওয়া পর্যন্ত একটি টটিপোটেন্ট কোষের বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পক্ষান্তরে, প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলো একটি জীবের বেশিরভাগ বা সমস্ত কোষে বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ জীবে বিকাশ করতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে ভ্রূণীয় স্টেম কোষ, আম্বিলিকাল কর্ড স্টেম কোষ এবং প্রবর্তিত বা ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকে হেমাটোপয়েটিক (hematopoietic) স্টেম কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ এই কোষগুলোকে মাল্টিপোটেন্ট হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করেছেন। যাই হোক, হেমাটোপয়েটিক স্টেম কোষগুলো রূপান্তরিত হয় রক্তকণিকা, প্লেটলেট, মাস্ট কোষ, ডেনড্রাইটিক কোষ, ম্যাক্রোফেজ, লিম্ফোসাইট, নিউট্রোফিল, বেসোফিল এবং ইওসিনোফিল কোষে। এই কোষগুলোর প্রতিটির কাজ হচ্ছে আলাদা, তবে তারা সবাই ইমিউন সিস্টেমের অংশ হিসেবে একসাথে কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অস্থি মজ্জাতেই থাকে ব্যাপকভাবে কার্যকরী স্টেম কোষ; তবে অন্যান্য অনেক টিস্যু, যেমন ডেন্টাল পাল্প, কর্ড ব্লাড, মুস্কের সেমিনিফেরাস টিউবুলসের বেসমেন্ট মেমব্রেন এবং এন্ডোমেট্রিয়ামে প্লুরিপোটেন্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত স্টেম কোষ পাওয়া যায়। এছাড়া, বেশিরভাগ মেরুদণ্ডী প্রাণীর রেটিনায় স্টেম কোষের একটি ছোট গ্রুপ রেটিনার প্রান্তে, অর্থ্যাৎ সিলিয়ারি এপিথেলিয়ামের (ছবি১ দেখুন) সংযোগস্থলে রয়ে গেছে। মাছ এবং উভচর প্রাণীদের মধ্যে, এই স্টেম কোষগুলো সারাজীবন বিদ্যমান রেটিনার পরিধিতে নতুন রেটিনা যুক্ত করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর যেমন OCT4 (octamer-binding transcription factor 4), SOX2 (sex determining region Y-box 2), এবং হোমিওবক্স প্রোটিন NANOG কোষের প্লুরিপোটেন্ট অবস্থা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। 

D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\Induced PC- Rashid.jpg

এএমডি চিকিৎসায় প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষের ব্যবহার

রেটিনার, বিশেষভাবে ম্যাকুলার অবক্ষয় দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের একটি প্রধান কারণ। যেহেতু রেটিনার স্নায়ুকোষগুলোয় বিভাজন হয় না এবং তাদের অভ্যন্তরীণ প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতাও নেই, তাই ক্ষতিগ্রস্থ রেটিনার মেরামত এবং ম্যাকুলার পুনর্জন্মের জন্য স্টেম সেল থেরাপি একটি সম্ভাবনাময় চিকিৎসা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দৃষ্টি গবেষণায় তিন ধরনের স্টেম কোষ ব্যবহার করা হয়: ১) ভ্রূণীয় স্টেম কোষ (ESC), ২) প্রবর্তিত বা  ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ (iPSC), এবং ৩)  প্রোজেনিটর (progenitor) বা পরিপক্ক স্টেম কোষ। পরিপক্ক স্টেম কোষগুলো অনেক টিস্যুতে অল্প সংখ্যায় পাওয়া যায়, এমনকি রেটিনাতেও বিদ্যমান, কিন্তু সেগুলো পরিপক্ক বা মাল্টিপোটেন্ট হওয়ায় সব ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে না। যদিও বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে প্রোজেনিটর কোষ থেকে রেটিনার নতুন কোষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু প্রকৃত চিকিৎসায় তাদের ব্যবহার ESC বা iPSC এর তুলনায় অনেক সীমিত।

কৃত্রিমভাবে প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ (যা সাধারণত iPS কোষ বা iPSCs হিসেবে পরিচিত) সৃষ্টি করা হয় সাধারণত একটি পরিপক্ক দেহকোষ (যেমন, ফাইব্রোব্লাস্ট যা যোজক কলা/টিস্যু তৈরি করে) থেকে, এবং নির্দিষ্ট কিছু জিন ও ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের উদ্দীপনার মাধ্যমে কোষগুলোকে পুন:প্রোগ্রামিং করা হয় (ছবি৩ দেখুন)। ফলশ্রুতিতে, উদ্দীপ্ত দেহকোষগুলো প্রাথমিক ভ্রূণীয় স্টেম কোষগুলোর মতোই জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে ও ফিরে পায় প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতা। এই পদ্ধতিতে, চারটি  ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (Oct4, Sox2, Klf4 ও c-Myc)র উদ্দীপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট করে জীববিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনেছিলেন বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ও জন গার্ডন। তাঁদের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ২০০৬ সালে তাঁরা নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। পরবর্তীতে, iPSC প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আণবিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালে, প্রথমবারের মতো একটি ইঁদুরের রেটিনায় মানব iPSC উদ্ভুত RPE প্রয়োগের ফলে ইঁদুরের দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তির আরও অগ্রগতি হয়েছে, যখন ২০১৪ সালে iPSC-RPE কোষস্তর বানরের চোখে প্রতিস্থাপন করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন বিজ্ঞানী মাসিও তাকাহাশি। ২০১২ সালে, গবেষকরা সর্বপ্রথম সফলভাবে মানব ভ্রূণীয় স্টেম সেল (hESC) থেকে প্রাপ্ত RPE কোষগুলো শুষ্ক-এএমডি রোগীদের মধ্যে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন।

বিজ্ঞানী সাই চ্যাভেলা (Sai Chavala)-র নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ‘সেন্টার ফর রেটিনা ইনোভেশন’ এর গবেষকগণ ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন, যা ২০২০ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশ পেয়েছে (Mahato et al., Nature, 2020)। বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল বা ভ্রূণ কোষের বিকল্প হিসেবে ত্বকের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষ থেকে রাসায়নিক-রূপান্তর ঘটিয়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য আলোক সংবেদনশীল ফটোরিসেপ্টর কোষ বানিয়ে সবাইকে বিস্মিত করেছেন। এই রূপান্তরিত কোষগুলোকে বলা হয়েছে প্রবর্তিত ফটোরিসেপ্টর-সাদৃশ কোষ (photoreceptor-like cells)। তাঁরা যে কৌশলটি আবিষ্কার করেছেন তা স্টেমসেল-মধ্যস্থতাকারী পদক্ষেপ ছাড়াই ত্বকের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে ফার্মাকোলজিক্যাল-রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সরাসরি রড-ফটোরিসেপ্টর কোষগুলিতে পুনঃপ্রোগ্রাম করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষকদের ল্যাব-নির্মিত রড-কোষগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হতে মাত্র ১০ দিন সময় লাগে, যেখানে কোষ বা টিস্যু প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে সাধারণত ছয় মাস মত সময় নিতে পারে। রূপান্তরিত কোষগুলো rd1 ইঁদুরের (যে সমস্ত ইঁদুরের রড-ফটোরিসেপ্টর অনুপস্থিত, ফলে তারা অন্ধ) চোখে প্রতিস্থাপন করার পর ওই অন্ধ ইঁদুরগুলোর চোখে জ্যোতি ফিরে আসে। এই নব্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ করে ফটোরিসেপ্টর-কোণ কোষও তৈরি করা সম্ভব, যা ম্যাকুলা পুনঃনির্মানে এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে।    

উপসংহার

স্টেম কোষের উপর ভিত্তি করে এএমডি চিকিৎসায় অনেক থেরাপিউটিক বিকল্প গত কয়েক দশক ধরে অন্বেষণ করা হয়েছে। তুলনামূলভাবে কম ইমিউনোজেনিক হওয়ায় প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম (iPS) কোষগুলোর ব্যবহার ম্যাকুলার ক্ষয়জনিত রোগসহ গ্লুওকোমা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগসমূহে মানুষের মধ্যে দৃষ্টিহীনদের জন্য নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখাচ্ছে। এছাড়া, নৈতিকতার দিক থেকেও এটির প্রয়োগ বিতর্কের উর্ধে। এ যাবৎ গবেষণার যেসব সার্থক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে তা সবই স্তন্যপায়ী প্রাণিদের উপর। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ এখনও ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। মানবচক্ষুতে বাস্তবিক চিকিৎসার প্রাক্কালে পুনঃপ্রোগ্রামিং পদ্ধতিগুলো অপ্টিমাইজ করা, চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রচুর সংখ্যক ফটোরিসেপ্টর কোষ তৈরি করার জন্য কার্যকর পদ্ধতি বিকাশ করা, সুরক্ষা এবং অখণ্ডতা পরীক্ষা করা এবং প্রতিস্থাপনের পরে কোষগুলোর দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার প্রোফাইলগুলো বোঝা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্ভাবন মানুষের মধ্যে যথোচিত প্রয়োগ করে অদূরভবিষ্যতে দৃষ্টিহীনদের চোখে জ্যোতি ফিরে আসুক এই আমাদের প্রত্যাশা। এছাড়া, এই কৌশলগুলো  শুধুমাত্র RPE ও রেটিনায় নয়, দেহের অনেক ধরণের কোষেও প্রয়োগ করতে সহায়তা করবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

রেটিনার অবক্ষয়জনিত দৃষ্টিহীনতা এবং প্লুরিপোটেন্টস্টেম কোষ থেরাপি

প্রকাশ: ০৯:৪১:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ মার্চ ২০২৩

মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বা দৃষ্টিসূক্ষ্মতা হলো ২০/২০। অর্থাৎ, এ ধরণের দৃষ্টির সংজ্ঞা হচ্ছে ২০ ফুট দূর থেকে একটি বস্তুকে স্পষ্টভাবে দেখার ক্ষমতা। দৃষ্টির এই স্বচ্ছতা এনে দেয় মুলতঃ চোখের রেটিনা। রেটিনা হলো স্নায়ুকোষযুক্ত চোখের একটি পাতলা স্তর (প্রায় ০.৫ মিলিমিটার পুরু), যা আলোকসংবেদী কোষ ফটোরিসেপ্টর (রড ও কোণ কোষ), বাইপোলার কোষ ও গ্যাংলিওন কোষ-এবং সাথে দুটি দৃষ্টি-সমন্বয়কারী কোষ হোৱাইজোন্টাল ও অ্যামাক্রিন কোষ-নিয়ে গঠিত। সমন্বিতভাবে এই কোষগুলো রেটিনায় একটি জটিল সার্কিট তৈরি করে, যা দৃষ্টিগত সংকেতগুলোকে তড়িৎ-রাসায়নিক শক্তি বা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ায় ফটোরিসেপ্টর কোষ থেকে বাইপোলার কোষে এবং তারপর গ্যাংলিয়ন কোষে প্রেরণ করা হয় যা অপটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছয় (ছবি১ দেখুন)। রড কোষগুলো আবছা বা মৃদু আলোতে দেখতে সাহায্য করে (নিরালোক দৃষ্টিশক্তি), আর কোণ কোষগুলো স্বাভাবিক উজ্জ্বল আলোতে দেখতে সাহায্য করে (সালোক দৃষ্টিশক্তি)। রেটিনা ও অপটিক স্নায়ু হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অংশ। মানবচক্ষুতে রয়েছে প্রায় ১২০ মিলিয়ন (এক কোটি বিশ লক্ষ) রড কোষ ও মাত্র ৬ মিলিয়ন (৬০ লক্ষ) কোণ কোষ। রেটিনার কোণ-ফটোরিসেপ্টর তিনটি ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতি সংবেদনশীল অপসিন (L-opsin/L-cone, M-opsin/M-cone, S-opsin/S-cone) প্রোটিন নিয়ে গঠিত, যা দিনের উজ্জ্বল আলোয় (ফোটপিক, photopic) বিভিন্ন রঙের দৃষ্টিগত প্রত্যক্ষণে ব্যবহৃত হয়। রেটিনার পশ্চাদ্ভাগে (রেটিনা এবং কোরয়েড স্তরের মাঝে) “রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম”(RPE)নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ এপিথেলীয় কোষস্তর রয়েছে, যা রেটিনাকে সজীব রাখতে এবং আলো শনাক্ত করতে ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোকে সক্ষম করে তোলে।
D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\Eye anatomy with retinal cell layers-Rashid.jpg

ম্যাকুলার গুরুত্ব ও অবক্ষয়

রেটিনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ডিম্বাকৃতির হলুদ রঙের এলাকা যা ম্যাকুলা (macula) নামে পরিচিত। মানুষের রেটিনাতে কোণ কোষগুলোর অধিকাংশই রেটিনার ম্যাকুলা অঞ্চলে ঘনীভূত (ছবি২ দেখুন)। ম্যাকুলার ব্যাস প্রায় ৫.৫ মিমি (0.২২ ইঞ্চি)। ম্যাকুলা তিনটি ক্যারোটিনয়েড রঙ্গক ধারণ করে: লুটেইন, জিজ্যানথিন এবং মেজো-জিজ্যানথিন। ম্যাকুলার মাঝে রয়েছে ফোভিয়া (fovea)। বইপড়া, গাড়ি চালনা ইত্যাদি যেসব কাজে তীক্ষ্ণদৃষ্টির প্রয়োজন, সেসব কাজে ফোভিয়া ব্যবহৃত হয়। ম্যাকুলা মুলতঃ সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয়, উচ্চমানের তীক্ষ্ণদৃষ্টি, এবং সেই সাথে বিভিন্ন রঙের দৃষ্টি। বর্ধিত বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ, কোরয়েডের উচ্চতর রক্ত ​​প্রবাহ এবং ফোকাসযুক্ত আলোক শক্তির সংস্পর্শও ম্যাকুলাকে পার্শ্বীয় (peripheral) রেটিনা থেকে আলাদা করে। ম্যাকুলা ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ম্যাকুলা-সম্পর্কিত দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যেসব চোখের রোগে মানুষ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে সেগুলো হলো বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন, রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (একটি জিনগত রোগ), গ্লুওকোমা, ক্যাটারাক্ট ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। এছাড়া, আঘাতজনিত কারণ ও ভিটামিনের অভাবেও অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন ও তার সম্ভাবনাময় চিকিৎসা নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\retina fundus-Rashid.jpg

এএমডি হচ্ছে ম্যাকুলার অবক্ষয় বা ভাঙ্গন, যার ফলে চোখের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে, এমনকি পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হওয়ায় সম্ভাবনাও রয়েছে। যদিও ম্যাকুলার অবক্ষয়ের কারণে পেরিফেরাল বা পার্শ্বীয় দৃষ্টি সাধারণত প্রভাবিত হয় না, তবে বিস্তারিত দেখার জন্য প্রয়োজনীয় তীক্ষ্ণ, কেন্দ্রীয়দৃষ্টি বা  সোজা-সামনের দৃষ্টি হারায়। ম্যাকুলার কেন্দ্রে রয়েছে ফোবিয়া (fovea) যেখানে কোণ ফটোরিসেপ্টর কোষের ঘনত্ব অনেক বেশি। প্রথমদিকে এএমডি রোগের প্রায়ই কোন উপসর্গ থাকে না। সময়ের সাথে সাথে, দৃষ্টিশক্তি ক্রমশঃ খারাপ হতে থাকে যা উভয় চোখকে প্রভাবিত করতে পারে। কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারানোর ফলে মানুষকে চিনতে, গাড়ি চালাতে, পড়া বা দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন বা অবক্ষয় সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়, যদিও শিশু এবং অল্প বয়স্কদের মধ্যেও ম্যাকুলার অবক্ষয়জনিত এএমডি-সমতুল্য স্টারগার্ড রোগ (Stargardt disease, STGD1) দেখা দিতে পারে, যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একক-জিনগত রেটিনার একটি রোগ। তবে, STGD1 রোগের কারণ ভিন্ন- এটি একটি অটোজোমাল রিসেসিভ (autosomal recessive) রোগ, যা রেটিনা-নির্দিষ্ট এটিপি-বাইন্ডিং ক্যাসেট সাবফ্যামিলি এ, মেম্বার ৪ (ABCA4) জিনের মিউটেশনের কারণে ঘটে। 

বয়সজনিত ম্যাকুলার অবক্ষয় (এএমডি) হতে পারে “শুষ্ক” (অ্যাট্রোফি/atrophy) বা “ভেজা” (নিঃস্রাবনমূলক/exudative)। এএমডি-র শুষ্ক রূপটিতে RPE ও ফটোরিসেপ্টরগুলো ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ম্যাকুলা পাতলা হয়ে যায়। এই রূপের উল্লেখযোগ্য কোনো চিকিৎসা নেই। তবে পুষ্টিকর সম্পূরক, যেমন ভিটামিন সি (৫০০ মিলিগ্রাম/মিগ্রা), ভিটামিন ই (৪০০ IU), লুটেইন (১০ মিগ্রা), জিজ্যান্থিন (২ মিগ্রা), জিঙ্ক (৪০ মিগ্রা) এবং ক্যুপ্রিক অক্সাইড (২ মিগ্রা) এই রোগের অগ্রগতি ধীর করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে, শুষ্ক-এএমডি রোগীদের চোখে টেলিস্কোপিক লেন্স প্রতিস্থাপন করে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। অপরদিকে, এএমডি-র “ভেজা” আকারে, রেটিনার নীচে একটি অস্বাভাবিক রক্তনালীর স্তর বৃদ্ধি পায় এবং অনিয়ন্ত্রিত ওই রক্তনালিগুলোয় যত্রতত্র ফুটো হয়ে তরল পদার্থ ও রক্ত ​​নির্গত হতে পারে। ফলে, কেন্দ্রীয় দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। “ভেজা এএমডি” রোগটিকে অ্যান্টি-ভেজেফ (anti-VEGF) থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ভাস্কুলার এন্ডোথেলিয়াল গ্রোথ ফ্যাক্টর বা VEGF হলো একটি সংকেতবাহী গ্রোথ ফ্যাক্টর বা প্রোটিন, যা বিদ্যমান রক্তনালি থেকে নতুন রক্তনালিকা সৃষ্টি করে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় নিওভাসকুলারাইজেশন (neovascularization)। অ্যান্টি-ভেজেফ ওষুধ, যেমন একটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি রানিবিজুমাব (ranibizumab/lucantis), VEGF-এর ক্রিয়া প্রতিরোধ করে এবং ম্যাকুলার অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে, উভয় ক্ষেত্রে এমন কোন প্রতিকার বা স্থায়ী চিকিৎসা নেই যা ইতিমধ্যে হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেয়। ২০২০ সালের হিসাবে, এএমডি বিশ্বব্যাপী ১৯০ মিলিয়নেরও বেশি লোককে প্রভাবিত করেছে এবং অনুমান করা হচ্ছে যে ২০৪০ সাল নাগাদ এর প্রকোপ ২৪৪ মিলিয়নে উন্নীত হবে। এটি পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে সমানভাবে দেখা যায়।

এএমডি রোগের কারণসমূহ

এএমডি হলো ম্যাকুলার অবক্ষয় এবং এটি বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রোগ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। তবে, এই রোগটির বিকাশে অন্তর্নিহিত জেনেটিক এবং নন-জেনেটিক নানাবিধ জৈবিক কারণও রয়েছে। এএমডি রোগের প্রাথমিক কারণ হলো চোখের ‘রেটিনা পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম’ (RPE) এর অবক্ষয়, যার ফলে এএমডি রোগীদের ক্ষেত্রে ফটোরিসেপ্টর (রড/কোণ) কোষগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ফলে অপরিবর্তনীয় দৃষ্টিহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগটিতে RPE এবং কোরয়েড স্তরের মাঝে ম্যাকুলায় এক ধরণের হলুদবর্ণের দলা বা ড্র্রুজন (drusen) ক্রমবর্ধিষ্ণুহারে জমতে থাকে। এই ড্র্রুজনগুলো বহিঃকোষীয় প্রোটিন এবং লিপিড দিয়ে তৈরি। জমতে থাকা ড্র্রুজনের মধ্যে দেখা গিয়েছে ভিট্রোনেকটিন (vitronectin) এবং অ্যামাইলয়েড বিটা (Amyloid beta) প্রোটিনের আধিক্য (যা আলঝেইমার্স রোগেও মস্তিষ্কে তৈরি হয়), ফলে এএমডি রোগটিকে অনেকে চোখের আলঝেইমার্স বলে আখ্যায়িত করেছেন। এএমডি রোগের ঝুঁকিপূর্ণ প্রধান কারণগুলো হলো বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ মাত্রার সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (CRP), স্থূলতা, হৃদরোগ, হালকা রঙের চোখ (নীল বা সবুজ আইরিস), ধূমপান, সূর্যালোক থেকে প্রাপ্ত অতিবেগুনী রশ্মি এবং পারিবারিক ইতিহাস বা জেনেটিক্স। শেষোক্ত কারণটি মূলত জিনগত এবং সেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে এএমডি হওয়ার প্রবণতা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় তিন থেকে ছয় গুণ বেশি। GWAS (Genome-wide association studies) ক্যাটালগ অনুযায়ী অনেকগুলো জিন এএমডি-র সাথে সম্পৃক্ত (https://www.ebi.ac.uk/gwas/)। তাদের মধ্যে যে সমস্ত জিন বা ফ্যাক্টর নিয়ে বেশি অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং এএমডি রোগের জিনগত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো কমপ্লিমেন্ট ফ্যাক্টর, বিশেষ করে ফ্যাক্টর H, অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন ই (APOE), ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর ২ (FGF-2), ডিএনএ মেরামতকারী প্রোটিন (যেমন PARP1), মেটালোপ্রোটিনেজ ইনহিবিটর (TIMP3) এবং বয়সজনিত ম্যাকুলোপ্যাথি সংবেদনশীলতা প্রোটিন২ (ARMS2)। এছাড়াও, SERPING1 (সেরপিন পেপ্টিডেজ ইনহিবিটর) ও HTRA1 (একটি সেরিন প্রোটিয়েজ) জিনের মিউটেশন ম্যাকুলার অবক্ষয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। 

কোষের প্লুরিপোটেন্সি কী

একটি কোষ যখন তার বিভাজনের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন ধরণের কোষে রূপান্তরিত হওয়ার জিনগত বিশেষ এক ক্ষমতা অর্জন করে, তখন কোষটির সেই অসাধারণ সামর্থ্যকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্সি (pluripotency) ও কোষটিকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্ট। শুধুমাত্র দেহের অন্তর্নিবিষ্ট স্টেম কোষগুলো প্রকৃতিগতভাবে এই ধরণের অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। সামর্থ্যের তারতম্যে স্টেম কোষকে কখনও বলা হয় টটিপোটেন্ট, প্লুরিপোটেন্ট, বা মাল্টিপোটেন্ট। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতা টোটিপটেন্ট কোষের তুলনায় কম। প্রকৃতিগতভাবে ভ্রূণীয় স্টেম কোষ (Embryonic Stem Cells, ESCs)গুলোর সে ক্ষমতা থাকায় তারা তিনটি ভ্রূণীয় জার্ম স্তর তৈরি করে- এন্ডোডার্ম, মেসোডার্ম ও এক্টোডার্ম। এন্ডোডার্ম তৈরি করে ফুসফুস ও শ্বাসনালী, পেটের অভ্যন্তরীণ আস্তরণ, মূত্রথলি এবং পৌষ্টিক নালী (মুখ, ফ্যারিংক্স ও রেকটাম ছাড়া)। মেসোডার্মের কোষগুলো সৃষ্টি করে অস্থি ও অস্থি-পেশি, পৌষ্টিকতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, লোহিত রক্তকণিকা, মূত্রনালী এবং এক ধরনের সংযোগকারী টিস্যু, মেসেনকাইম (mesenchyme)। অন্যদিকে, এক্টোডার্ম স্তনগ্রন্থিসহ এপিথেলীয় ও স্নায়ু টিস্যু (মেরুদন্ড, পেরিফেরাল স্নায়ু এবং মস্তিষ্ক)র বিকাশ করে। টটিপোটেন্ট ও প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি সম্পূর্ণ জীব তৈরি না হওয়া পর্যন্ত একটি টটিপোটেন্ট কোষের বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পক্ষান্তরে, প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলো একটি জীবের বেশিরভাগ বা সমস্ত কোষে বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ জীবে বিকাশ করতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে ভ্রূণীয় স্টেম কোষ, আম্বিলিকাল কর্ড স্টেম কোষ এবং প্রবর্তিত বা ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকে হেমাটোপয়েটিক (hematopoietic) স্টেম কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ এই কোষগুলোকে মাল্টিপোটেন্ট হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করেছেন। যাই হোক, হেমাটোপয়েটিক স্টেম কোষগুলো রূপান্তরিত হয় রক্তকণিকা, প্লেটলেট, মাস্ট কোষ, ডেনড্রাইটিক কোষ, ম্যাক্রোফেজ, লিম্ফোসাইট, নিউট্রোফিল, বেসোফিল এবং ইওসিনোফিল কোষে। এই কোষগুলোর প্রতিটির কাজ হচ্ছে আলাদা, তবে তারা সবাই ইমিউন সিস্টেমের অংশ হিসেবে একসাথে কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অস্থি মজ্জাতেই থাকে ব্যাপকভাবে কার্যকরী স্টেম কোষ; তবে অন্যান্য অনেক টিস্যু, যেমন ডেন্টাল পাল্প, কর্ড ব্লাড, মুস্কের সেমিনিফেরাস টিউবুলসের বেসমেন্ট মেমব্রেন এবং এন্ডোমেট্রিয়ামে প্লুরিপোটেন্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত স্টেম কোষ পাওয়া যায়। এছাড়া, বেশিরভাগ মেরুদণ্ডী প্রাণীর রেটিনায় স্টেম কোষের একটি ছোট গ্রুপ রেটিনার প্রান্তে, অর্থ্যাৎ সিলিয়ারি এপিথেলিয়ামের (ছবি১ দেখুন) সংযোগস্থলে রয়ে গেছে। মাছ এবং উভচর প্রাণীদের মধ্যে, এই স্টেম কোষগুলো সারাজীবন বিদ্যমান রেটিনার পরিধিতে নতুন রেটিনা যুক্ত করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর যেমন OCT4 (octamer-binding transcription factor 4), SOX2 (sex determining region Y-box 2), এবং হোমিওবক্স প্রোটিন NANOG কোষের প্লুরিপোটেন্ট অবস্থা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। 

D:\Rashid\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান\মলিক্যুলার বায়োলজি অভিধান- প থেকে ম\Induced PC- Rashid.jpg

এএমডি চিকিৎসায় প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষের ব্যবহার

রেটিনার, বিশেষভাবে ম্যাকুলার অবক্ষয় দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের একটি প্রধান কারণ। যেহেতু রেটিনার স্নায়ুকোষগুলোয় বিভাজন হয় না এবং তাদের অভ্যন্তরীণ প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতাও নেই, তাই ক্ষতিগ্রস্থ রেটিনার মেরামত এবং ম্যাকুলার পুনর্জন্মের জন্য স্টেম সেল থেরাপি একটি সম্ভাবনাময় চিকিৎসা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দৃষ্টি গবেষণায় তিন ধরনের স্টেম কোষ ব্যবহার করা হয়: ১) ভ্রূণীয় স্টেম কোষ (ESC), ২) প্রবর্তিত বা  ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ (iPSC), এবং ৩)  প্রোজেনিটর (progenitor) বা পরিপক্ক স্টেম কোষ। পরিপক্ক স্টেম কোষগুলো অনেক টিস্যুতে অল্প সংখ্যায় পাওয়া যায়, এমনকি রেটিনাতেও বিদ্যমান, কিন্তু সেগুলো পরিপক্ক বা মাল্টিপোটেন্ট হওয়ায় সব ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে না। যদিও বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে প্রোজেনিটর কোষ থেকে রেটিনার নতুন কোষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু প্রকৃত চিকিৎসায় তাদের ব্যবহার ESC বা iPSC এর তুলনায় অনেক সীমিত।

কৃত্রিমভাবে প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ (যা সাধারণত iPS কোষ বা iPSCs হিসেবে পরিচিত) সৃষ্টি করা হয় সাধারণত একটি পরিপক্ক দেহকোষ (যেমন, ফাইব্রোব্লাস্ট যা যোজক কলা/টিস্যু তৈরি করে) থেকে, এবং নির্দিষ্ট কিছু জিন ও ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের উদ্দীপনার মাধ্যমে কোষগুলোকে পুন:প্রোগ্রামিং করা হয় (ছবি৩ দেখুন)। ফলশ্রুতিতে, উদ্দীপ্ত দেহকোষগুলো প্রাথমিক ভ্রূণীয় স্টেম কোষগুলোর মতোই জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে ও ফিরে পায় প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতা। এই পদ্ধতিতে, চারটি  ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (Oct4, Sox2, Klf4 ও c-Myc)র উদ্দীপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট করে জীববিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনেছিলেন বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ও জন গার্ডন। তাঁদের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ২০০৬ সালে তাঁরা নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। পরবর্তীতে, iPSC প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আণবিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালে, প্রথমবারের মতো একটি ইঁদুরের রেটিনায় মানব iPSC উদ্ভুত RPE প্রয়োগের ফলে ইঁদুরের দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তির আরও অগ্রগতি হয়েছে, যখন ২০১৪ সালে iPSC-RPE কোষস্তর বানরের চোখে প্রতিস্থাপন করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন বিজ্ঞানী মাসিও তাকাহাশি। ২০১২ সালে, গবেষকরা সর্বপ্রথম সফলভাবে মানব ভ্রূণীয় স্টেম সেল (hESC) থেকে প্রাপ্ত RPE কোষগুলো শুষ্ক-এএমডি রোগীদের মধ্যে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন।

বিজ্ঞানী সাই চ্যাভেলা (Sai Chavala)-র নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ‘সেন্টার ফর রেটিনা ইনোভেশন’ এর গবেষকগণ ম্যাকুলার ডিজেনেরেশন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন, যা ২০২০ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশ পেয়েছে (Mahato et al., Nature, 2020)। বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল বা ভ্রূণ কোষের বিকল্প হিসেবে ত্বকের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষ থেকে রাসায়নিক-রূপান্তর ঘটিয়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য আলোক সংবেদনশীল ফটোরিসেপ্টর কোষ বানিয়ে সবাইকে বিস্মিত করেছেন। এই রূপান্তরিত কোষগুলোকে বলা হয়েছে প্রবর্তিত ফটোরিসেপ্টর-সাদৃশ কোষ (photoreceptor-like cells)। তাঁরা যে কৌশলটি আবিষ্কার করেছেন তা স্টেমসেল-মধ্যস্থতাকারী পদক্ষেপ ছাড়াই ত্বকের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে ফার্মাকোলজিক্যাল-রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সরাসরি রড-ফটোরিসেপ্টর কোষগুলিতে পুনঃপ্রোগ্রাম করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষকদের ল্যাব-নির্মিত রড-কোষগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হতে মাত্র ১০ দিন সময় লাগে, যেখানে কোষ বা টিস্যু প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে সাধারণত ছয় মাস মত সময় নিতে পারে। রূপান্তরিত কোষগুলো rd1 ইঁদুরের (যে সমস্ত ইঁদুরের রড-ফটোরিসেপ্টর অনুপস্থিত, ফলে তারা অন্ধ) চোখে প্রতিস্থাপন করার পর ওই অন্ধ ইঁদুরগুলোর চোখে জ্যোতি ফিরে আসে। এই নব্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ করে ফটোরিসেপ্টর-কোণ কোষও তৈরি করা সম্ভব, যা ম্যাকুলা পুনঃনির্মানে এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে।    

উপসংহার

স্টেম কোষের উপর ভিত্তি করে এএমডি চিকিৎসায় অনেক থেরাপিউটিক বিকল্প গত কয়েক দশক ধরে অন্বেষণ করা হয়েছে। তুলনামূলভাবে কম ইমিউনোজেনিক হওয়ায় প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম (iPS) কোষগুলোর ব্যবহার ম্যাকুলার ক্ষয়জনিত রোগসহ গ্লুওকোমা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগসমূহে মানুষের মধ্যে দৃষ্টিহীনদের জন্য নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখাচ্ছে। এছাড়া, নৈতিকতার দিক থেকেও এটির প্রয়োগ বিতর্কের উর্ধে। এ যাবৎ গবেষণার যেসব সার্থক ফলাফল পাওয়া গিয়েছে তা সবই স্তন্যপায়ী প্রাণিদের উপর। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ এখনও ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। মানবচক্ষুতে বাস্তবিক চিকিৎসার প্রাক্কালে পুনঃপ্রোগ্রামিং পদ্ধতিগুলো অপ্টিমাইজ করা, চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রচুর সংখ্যক ফটোরিসেপ্টর কোষ তৈরি করার জন্য কার্যকর পদ্ধতি বিকাশ করা, সুরক্ষা এবং অখণ্ডতা পরীক্ষা করা এবং প্রতিস্থাপনের পরে কোষগুলোর দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার প্রোফাইলগুলো বোঝা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্ভাবন মানুষের মধ্যে যথোচিত প্রয়োগ করে অদূরভবিষ্যতে দৃষ্টিহীনদের চোখে জ্যোতি ফিরে আসুক এই আমাদের প্রত্যাশা। এছাড়া, এই কৌশলগুলো  শুধুমাত্র RPE ও রেটিনায় নয়, দেহের অনেক ধরণের কোষেও প্রয়োগ করতে সহায়তা করবে।