০৭:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

ক্রমহ্রাসমান মানব Y (ওয়াই)-ক্রোমোজোম নিয়ে নানা উদ্বেগ ও জেন্ডার সমতায় দৃষ্টিপাত

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
  • প্রকাশ: ০৭:৫৪:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
  • / ১৪৮৮ বার পড়া হয়েছে


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

যে প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে নর ও নারী তাদের স্বতন্ত্র শারীরবৃত্তীয়তা অর্জন করে, তার মুলে রয়েছে নারী-পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোমের ভিন্নতা। মানুষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে পুরুষদের থাকে একটি একক X (এক্স)-ক্রোমোজোম (তাদের মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া) এবং একটি একক Y (ওয়াই)-ক্রোমোজোম (তাদের পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত), অর্থাৎ XY। বিপরীতে, নারীদের থাকে দুটি এক্স ক্রোমোজোম, XX।  তাই তিনটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যৌন-সংযুক্ত জিনের অভিব্যক্তি মস্তিষ্ক এবং আচরণে যৌন দ্বিরূপতায় অবদান রাখতে পারে (Davies et al, 2006):  প্রথমত, যেহেতু পুরুষের একটির বিপরীতে নারীদের দুটি এক্স-ক্রোমোজোম থাকে, তাই এক্স-নিষ্ক্রিয়করণ (X-inactivation) এর প্রক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া জিনগুলি পুরুষ টিস্যুর তুলনায় নারীদের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ বেশি প্রকাশ পায়। দেখা গিয়েছে, মানব এক্স-ক্রোমোজোমের সমস্ত এক্স-সংযুক্ত জিনের মধ্যে ~২০% জিন এক্স-নিষ্ক্রিয়তা এড়াতে পারে (Carrel and Willard, 2005)। দ্বিতীয়ত, যেহেতু দুটি লিঙ্গ তাদের এক্স-ক্রোমোজোমের পিতামাতার উৎপত্তির ক্ষেত্রে পৃথক, তাই এই ক্রোমোজোমের যে কোনো জিন যৌনভাবে দ্বিরূপ অভিব্যক্তি প্রদর্শন করতে পারে। তৃতীয়ত, নারী-পুরুষদের মস্তিষ্কের যৌন পার্থক্য ঘটতে পারে ওয়াই-ক্রোমোজোমের অ-পুনঃসংযোজন অঞ্চলে (non-recombining region, NRY) Y-অনন্য জিনের পুরুষ-সীমিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে। 

মানব ওয়াই-ক্রোমোজোম নিয়ে নতুন করে ঔৎসুক্য দেখা দিয়েছে, আবার তর্ক শুরু হয়েছে। তর্কের শুরু বেশ অনেক বছর আগে থেকেই। পুরুষের দিন নাকি শেষ হয়ে আসছে, এদের ওয়াই-ক্রোমোজোম নাকি বিলুপ্তির পথে। কারণ, সৃষ্টির শুরুতে ওয়াই-ক্রোমোজমের যে চরিত্র ছিলো তা এরই মধ্যে অনেকটা (প্রায় ৬০ শতাংশ) ক্ষয় হয়ে গেছে। আর, যেটুকু বাকি রয়েছে তা এই খর্বাকায় ক্রোমোজোমটির শেষ হতে কত সময় লাগবে এ নিয়ে বিজ্ঞানী ও বোদ্ধাদের মধ্যে নানা ভাবনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানমহলে যখনই কোনো নতুন তথ্য জেগে ওঠে, তখনই আবার শুরু হয় নতুন করে তর্ক। ওয়াই-ক্রোমোজোম চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণের পূর্বে এক্স-ক্রোমোজোম সম্বন্ধেও আমাদের তুলনামূলক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এক্স-ক্রোমোজোম নিষ্ক্রিয়করণ

প্রকৃতি যেমন ওয়াই-ক্রোমোজোমকে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে, তেমনি নারীদের জোড়া এক্স-ক্রোমোজোমকে একেবারে স্বাধীন করেও দেয় নি। মানুষসহ থেরীয় (theria: ক্যাঙ্গারুজাতীয় প্রাণী ও প্লাসেন্টাধারী স্তন্যপায়ী গ্রুপ) শ্রেণীর স্তন্যপায়ী স্ত্রী-প্রাণীদের মধ্যে XX-ক্রোমোজোমের একটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, যাতে করে পুরুষ ও নারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও জিনগত সমতা বজায় রাখা যায়, যেহেতু পুরুষদের মাত্র একটি এক্স-ক্রোমোজোম বিদ্যমান। এক্স-ক্রোমোজোমে অবস্থান করে ৯০০টি জিন এবং তাদের সহোদর জিন বা অ্যালিল (allele) অবস্থান করে ঠিক তার বিপরীতে আরেকটি এক্স-ক্রোমোজোমে, যার কোনোটি প্রকট বা প্রচ্ছন্ন। ভেবে দেখুন, এই জোড়া-ক্রোমোজোমের প্রকট জিনগুলি যদি সব একসাথে প্রকাশ পেতো, তাহলে  নারী-পুরুষদের সমতা ধরে রাখা সম্ভব হতো? এছাড়া, কয়েক মিলিয়ন বছর আগেও তো এক্স- এবং ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার ও জিনের সংখ্যা ছিল একই। প্রকৃতি ভেবে উঠতে পারিনি যে ওয়াই-ক্রোমোজোম তার সহচরের তুলনায় এতোটা খর্বকায় হয়ে যাবে। যাইহোক, দুটি এক্স-ক্রোমোজোমের একটি অনুলিপিকে হেটারোক্রোমাটিন (heterochromatin) নামক একটি নিষ্ক্রিয় কাঠামোতে রূপান্তরের ফলে নীরব করা হয়। এই নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেন্স আরএনএ (asRNA) বা Xist আরএনএ ও পলিকম্ব রিপ্রেসিভ কমপ্লেক্স (polycomb repressive complex) প্রোটিনগুলোর সহায়তায়। তবুও নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়াটি শতভাগ সফল হয়নি, জিনগুলির ২০% নারীদের আনুকূল্যেই ছাড় পেয়েছে। ছাড় পাওয়া এই ২০ শতাংশ জিনের মধ্যে রয়েছে নারী-বৈশিষ্ট্যের আভিজাত্য ও দাম্ভিকতা।

Y-ক্রোমোজোমের গঠন এবং বৈশিষ্ট

সেক্স ক্রোমোজোমের বিবর্তনীয় উৎস যদি লক্ষ করি, তাহলে এক্স- এবং ওয়াই-ক্রোমোজোম (যা অটোজোম থেকে উদ্ভূত) এমনকি ১৬০ মিলিয়ন বছর আগেও প্রায় একই আকারের ছিল, তাদের জিনের সংখ্যাও ছিল এক, এবং এক্স- ও ওয়াই-ক্রোমজোমের মধ্যে রিকম্বিনেশন (genetic recombination) প্রক্রিয়ায় জীন অদল-বদল হতো। সময়ের বিবর্তনে, ওয়াই-ক্রোমোজোম ধীরে ধীরে এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে রিকম্বিনেশন বা জিনগত তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে শুরু করে, যা ওয়াই-ক্রোমোজোমকে এক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। বর্তমানে, মানব এক্স-ক্রোমোজোমের আকার হচ্ছে ~১৫৫Mb (১Mb = ১০০০ নিউক্লিওটাইড) এবং এতে ~১৫০০ জিন থাকে (যার মধ্যে ৯০০টি জিন কার্যকরী ও বাকিসব সিউডোজিন/pseudogene), যেখানে ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার এসে ঠেকেছে মাত্র ~ ৬০,০০০ নিউক্লিওটাইডে এবং এতে থাকে ~ ১৭৮টি জিন, যার পরিপাট্যে বেশিরভাগই (৪০%) হচ্ছে হেটারোক্রোমাটিন ও সিউডোজিন, এবং কার্যকরী জিনের সংখ্যা মাত্র ৪৫টি (Graves, 2006), আবার কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে ৫৫টি। অর্থাৎ দু’জনে (এক্স ও ওয়াই) আর সমান সমান নয়। ৪৫টি জিনের মধ্যে শুধুমাত্র পুরুষ-নির্ধারক জিন হচ্ছে ২৭টি, যার মধ্যে SRY (Sex-determing Region of Y) জিনটি হচ্ছে পুরুষত্বের ধ্বজ্জাধারী। একটি গবেষণায় মানুষ ও শিম্পাঞ্জির X-Y অনুরূপ পুরুষ-নির্দিষ্ট অঞ্চলের ৫,৩০০ নিউক্লিওটাইডের ক্রম (sequence) তুলনা করে দেখা গিয়েছে যে, মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমের ওই অঞ্চলটিতে রয়েছে ১৬টি কার্যকরী জিন এবং ১১টি সিউডোজিন, যার হুবুহু মিল রয়েছে শিম্পাঞ্জির সাথে, কিন্তু শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলটিতে রয়েছে  ১৬টি  কার্যকরী জিনের পরিবর্তে ১১টি জিন (Hughes et al., 2005 ), যা ইঙ্গিত করে যে মানুষের তুলনায় শিম্পাঞ্জির ওয়াই-ক্রোমোজোম দ্রুততার সাথে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখান থেকেই কতিপয় বিজ্ঞানীদের মাঝে একটি ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে যে মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমটি অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, হয়তো ততটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। যাহোক, ওয়াই-ক্রোমোজোমের এই অবনতির জন্য মূলত ক্ষতিকারক মিউটেশনকেই দায়ী করা হয়েছে এবং এক্স-ক্রোমোজোমের জিনগুলির সাথে আদান-প্রদান (recombination) করার সুযোগ না থাকায় এসব মিউটেশন থেকে পুনরুদ্ধারের  সম্ভাবনাও বিলীন হয়ে গেছে।

অটোজোম এবং এক্স-ক্রোমোজোমের মতো, মানুষের ওয়াই-ক্রোমোজোম একটি ছোটো (Yp) ও একটি দীর্ঘ (Yq) বাহু (যথাক্রমে ~১১.৫Mb এবং ~৪৮.৫Mb) নিয়ে গঠিত, যা একটি সেন্ট্রোমিয়ার (centromere) দ্বারা বিভক্ত। ওয়াই-ক্রোমোজোমের উভয়প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল (সিউডোঅটোজমীয় অঞ্চল/ বা PAR) রয়েছে (ছবি দেখুন), যা মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় এক্স-ক্রোমোজোমের সমতুল্য অঞ্চলগুলির সাথে পুনঃসংযোগ (recombination) বা জিনগত তথ্য বিনিময় করতে পারে। তবে, প্রান্তীয় এই অঞ্চল-দুটি ওয়াই-ক্রোমোজোমের মাত্র ৫% জুড়ে রয়েছে। ওয়াই-ক্রোমোজোমের বাকি ৯৫% অংশ (NRY) এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে জিনগত তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এই অঞ্চলটিতে যেসব প্রোটিন-কোডিং জিন রয়েছে, তার মধ্যে ২০% জিন প্রকাশ পায় মস্তিস্কসহ দেহের বিভিন্ন টিস্যুতে (Skaletsky et al., Nature, 2003)। NRY অঞ্চলের বাকি জিনগুলি একচেটিয়াভাবে শুক্রাশয়-নির্দিষ্ট, যা  শুক্রাশয়ের বিকাশ, শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া (স্পার্মাটোজেনেসিস) এবং পুরুষ-সাধারণ শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সাথে জড়িত ।

সাম্প্রতিক কালে (প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর আগে) দুটো জিন. TGIF2LY ও PCDH১১Y (Cadherin জিন) এক্স-ক্রোমোজোম থেকে কপি হয়ে ওয়াই-ক্রোমোজোমে সন্নিবেশিত হয়েছে SRY জিনের পাশে (Bachtroget al., 2013)। PCDH১১Y প্রোটিনটি স্নায়ুকোষের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। হঠাৎ করে এদের ওয়াই-ক্রোমোজোমে অধিগমনের রহস্য এখনও অনধিগম্য রয়ে গেছে (ছবি দেখুন)।D:\Rashid\Y chromosome\Human Y chromosome-.jpg

লিঙ্গ-নির্ধারক জিন, SRY: ওয়াই-ক্রোমোজোমের ছোটো বাহুর একপ্রান্তে (Yp১১.৩ লোকাসে) অবস্থিত SRY (Sex-determining region Y protein) জিনটি স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে পুরুষ লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য আবশ্যিক। এই লিঙ্গ-নির্ধারক জিনটি আবিষ্কৃত হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে (Sinclair et al.,1990)। কুপম্যান ও তার সহযোগী বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে, XY-ইঁদুর থেকে যখন SRY জিন কেটে ফেলা হয়, তখন পুরুষ ইঁদুরগুলি সবাই স্ত্রী ইঁদুর-এ রূপান্তরিত হয় এবং সে সময় থেকেই SRY জিনটি পুরুষত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক জিন হিসেবে চিহ্নিত হয় (Koopman et al., 1990)। ভ্রূণের নর বা নারী লিঙ্গ ঠিক করে দেয় এই জিন। SRY জিন দ্বারা সংকেতপ্রাপ্ত এই লিঙ্গ-নির্ধারক প্রোটিনটি হলো একটি ডিএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন বা একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর, যা অন্যান্য লিঙ্গ-সমন্বয়কারী জিনগুলির প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু মানুষ কেন, প্ল্যাসেন্টাযুক্ত স্তন্যপায়ী ও মার্সুপিয়াল প্রাণিদের পুরুষত্বের সূচনা হয় এই জিনটির উপস্থিতিতে (Berta et al.,1990; Cortez et al., 2014)। বিপরীতে, WNT4 ও DAX1 জিন দুটি হচ্ছে নারীদের আত্মশ্লাঘা, যাদের উপস্থিতি ডিম্বাশয়ের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে।

SRY হলো SOX (SRY-related box) ডিএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন পরিবারের সদস্য। SF1 (Splicing factor 1) নিউক্লীয় রিসেপ্টর প্রোটিনকে সাথে নিয়ে SRY-প্রোটিন সরাসরি তার ডাউনস্ট্রিম টার্গেট জিনের অভিব্যক্তিকে সক্রিয় করে, যেমন SOX9 ও FGF9 (Glia-activating factor) [Sekido and Lovell-Badge, 2008; Kashimada and Koopman, 2010]। শুক্রাশয়ের বিকাশের জন্য SOX9 জিনের সক্রিয়করণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ SOX9 হলো শুক্রাশয় গঠনের অন্যতম একটি প্রোটিন, যার ভুল অভিব্যক্তির কারণে লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যায়। SRY প্রোটিনটি প্রাথমিক যৌন কর্ডের বিকাশ ঘটায়, যা পরে সেমিনিফেরাস টিউবুল (seminiferous tubules)এ পরিণত হয়। এই কর্ডগুলি অভিন্ন গোনাডের কেন্দ্রীয় অংশ গঠন করে, যা পরবর্তীতে শুক্রাশয়ে পরিণত হয়। শুক্রাশয়ের লেডিগ (Leydig) কোষগুলি টেস্টোস্টেরন নিঃসরণ শুরু করে, যখন সের্টোলি (Sertoli) কোষগুলি অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন (AMH) তৈরি করে। SRY জিনের প্রভাব সাধারণত ভ্রূণ গঠনের ৬-৮ সপ্তাহ পরে ঘটে যা পুরুষদের মধ্যে নারীদের শারীরবৃত্তীয় কাঠামোগত বৃদ্ধিকে বাধা দেয়। বিপরীতে, এটি পুরুষ-বৈশিষ্ট্য বিকাশের পক্ষেই কাজ করে। 

যে-কোনো ভ্রূণের গোনাড তাদের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট সময় (৬-৮ সপ্তাহ) পর্যন্ত অভিন্ন থাকে, যখন টেস্টিস-নির্ধারক ফ্যাক্টর (SRY) পুরুষের যৌন অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একটি পুরুষ ক্যারিওটাইপ হলো XY, যেখানে নারীদের XX। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে যেখানে SRY একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। যেমন, ক্লাইনফেল্টার (Klinefelter) সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা উত্তরাধিকারসূত্রে একটি  ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং দুইটি এক্স-ক্রোমোজোম পেয়ে থাকে। দুইটি XX থাকা সত্ত্বেও ওয়াই-ক্রোমোজোমে SRY জিন থাকার কারণে এসব ব্যক্তিদের পুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং টার্নার্স (Turner’s) সিনড্রোম (XO) নারী বৈশিষ্ট্য বহন করে। তবে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষত্রে, যদি SRY জিনটি ওয়াই-ক্রোমোজোমে থাকার পরিবর্তে এক্স-ক্রোমোজোমে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে শুক্রাশয়ের বিকাশ আর ঘটে না। এসব ক্ষেত্রে XY ক্যারিওটাইপ থাকা সত্ত্বেও (শুক্রাশয়ের পরিবর্তে) এদের স্বাভাবিক ফ্যালোপিয়ান নালী ও জরায়ু তৈরি হয়- এরা সয়ার (Swyer) সিন্ড্রোম নামে পরিচিত (Elzaiat et al., 2022)।  অন্যদিকে, ‘XX পুরুষ সিন্ড্রোম’ হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে কিছু ব্যক্তি, যাদের ক্যারিওটাইপ হচ্ছে নারী ধরণের, কিন্তু এক্স-ক্রোমোজোমে SRY জিন ট্রান্সলোকেশন/স্থানান্তরিত হওয়ায় এদের  শারীরিক বৈশিষ্ট্য সব পুরুষালী। আবার, XY ক্যারিওটাইপ থাকা সত্ত্বেও SRY জিনের অভাবে প্রাণিদের মধ্যে তৈরি করে ডিম্বাশয় এবং এরা স্ত্রী-যৌন বিকাশের পথ অনুসরণ করে (Lovell-Badge and Robertson, 1990)। এসব তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে SRY জিনটি পুরুষ বা স্ত্রী গোনাড বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

যৌন দ্বিরূপতা এবং মানব মস্তিস্ক

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে অনেক জৈবিক এবং শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য রয়েছে। নিউরোসাইকোলজি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ করেছে যে, পুরুষরা দৃশ্যমান এবং ন্যাভিগেশনাল দক্ষতা ব্যবহার ক’রে আচরণগত কাজগুলিতে নারীদের চেয়ে অধিকতর কার্য সম্পাদন করে, যেখানে নারীরা সামাজিক দক্ষতা নির্ধারণের কাজগুলিতে বেশি দক্ষতা রাখে (Craig et al., 2004)। স্মৃতিশক্তি, আবেগ ও সহানুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও নারীরা বেশ এগিয়ে রয়েছে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে উচ্চ মাত্রায় আগ্রাসনী আচরণ  লক্ষণীয় (Craig et al., 2004)। বস্তুতঃ প্রাণিদের মধ্যেও দেখা গিয়েছে আগ্রাসন অত্যন্ত যৌনভাবে দ্বিরূপ একটি বৈশিষ্ট্য, যেখানে পুরুষ প্রাণিদের মধ্যে আক্রমনের প্রবণতা অনেক বেশি। এছাড়া, নিউরোইমেজিং বিশ্লেষণ করেও দেখা গিয়েছে যে, মস্তিষ্কের কোনো কোনো অংশ লিঙ্গ-নির্দিষ্ট, যা  পুরুষ ও নারীদের মধ্যে আচরণগত প্রভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপঃ মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (পুরুষদের মধ্যে বড়ো), হিপ্পোক্যাম্পাস (নারীদের মধ্যে বড়ো) এবং কর্পাস ক্যালোসাম (নারীদের মধ্যে বড়ো- যদিও এ বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে)। সেরিব্রাল কর্টেক্সের অঞ্চলগুলিতে নারী-পুরুষ ভেদে ভিন্নতা দেখা যায়- যেমন, নারীদের মধ্যে বৃহত্তর প্যারালিম্বিক এবং ফ্রন্টো-অরবিটাল এলাকা থাকে, যা আবেগ প্রক্রিয়াকরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ, অনুপ্রেরণা এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের কাজগুলির সাথে জড়িত, যেখানে পুরুষদের থাকে বৃহত্তর ফ্রন্টো-মিডিয়াল কর্টেক্স, যা জ্ঞানীয় কার্যসম্পাদনার ত্রুটিগুলি নিরীক্ষণ করে। পিটুইটারি গ্রন্থির নিকটস্থ হাইপোথ্যালামাসেও দেখা যায় যৌন দ্বিরূপতা। হাইপোথ্যালামাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে হরমোন নিঃসরণ (যেমন সোমাটোস্ট্যাটিন, অক্সিটোসিন),  দৈনিক শারীরবৃত্তীয় চক্র (circadian rhythm) বজায় রাখা, যৌন আচরণ পরিচালনা এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা। হাইপোথ্যালামাসে, ডিম্বস্ফোটন চক্র নিয়ন্ত্রণকারী অ্যান্টেরোভেনট্রাল পেরিভেন্ট্রিকুলার নিউক্লিয়াস (AVPV) এর ক্ষেত্রটি পুরুষদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই নারীদের মধ্যে বড়ো।

মস্তিষ্কে SRY জিনের ভূমিকা

মূলতঃ মানবমস্তিষ্ক একটি যৌন দ্বিরূপ অঙ্গ। তবে মস্তিষ্ক ও আচরণের যৌন দ্বিরূপতার অন্তর্নিহিত আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের খুব বেশি ধারণা নেই। এছাড়া, এই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে বেশ বিতর্কও রয়ে গেছে। যাইহোক, মানবদেহে শুক্রাশয়ের ভূমিকা কেবল যৌনক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। এছাড়া, গোনাড থেকে প্রস্রুত স্টেরয়েড হরমোনগুলি লিঙ্গ-নির্দিষ্ট আচরণগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে বটে, কিন্তু এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কে যৌন দ্বিরূপতা প্রতিষ্ঠারও একমাত্র কারণ নয়। এই দ্বিরূপতার পেছনে রয়েছে  XY এবং XX কোষের মধ্যে অন্তর্নিহিত জেনেটিক পার্থক্য- বিশেষকরে নেপথ্যে রয়েছে  Y-সংযুক্ত বেশ কিছু জিন, যার মধ্যে SRY জিন পুরুষদের মস্তিকে বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ পায়। SRY জিন মূলত প্রকাশ পায় শুক্রাশয়ে, কিন্তু শুক্রাশয়ের বাইরেও এর কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে মস্তিষ্কে ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে (Rosenfeld, 2017)। পুরুষদের মস্তিষ্কে SRY জিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হাইপোথ্যালামাস এবং ফ্রন্টাল ও টেম্পোরাল কর্টেক্সে (Mayer et al., 1998)। একইভাবে, SRY প্রোটিন শনাক্ত হয়েছে মস্তিষ্কের সাবস্ট্যানশিয়া নায়াগ্রা (substantia nigra) অঞ্চলে যার নিউরোনগুলিতে প্রকাশ পায় টাইরোসিন হাইড্রোক্সিলেজ (Czech et al., 2012), ডোপামিন সংশ্লেষণের প্রধান এনজাইম। এই তথ্যগুলি ইঙ্গিত দেয় কেন পুরুষরা ডোপামিন-সংশ্লিষ্ট রোগ (যেমন পারকিনসন রোগ এবং সিজোফ্রেনিয়া)-র জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিপরীতদিকে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের হাইপোথ্যালামাসে গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণ অনেক বেশি৷ SRY জিন ছাড়াও, ওয়াই-ক্রোমোজোমের NRY অঞ্চলে আরও কয়েকটি Y-সংযুক্ত জিন রয়েছে,  (Ddx3y, Eif2s3y, Uty) যেগুলি পুরুষ মস্তিষ্কে স্নায়ুজনিত যৌন পার্থক্য ও পুরুষ-সাধারণ আচরণের দিকেও সম্ভাব্য অবদান রাখে (Kopsida et al., 2009)।

Y ক্রোমোজোমের বিলুপ্তি
১৬৬ মিলিয়ন বছর আগে স্তন্যপায়ী প্রাণিদের আবির্ভাবের সময় এক্স- ও ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার ও গুণাগুণ প্রায় সমান ছিল, দুটোতে জিনের সংখ্যাও ছিল এক। বর্তমানে জীবিত স্তন্যপায়ী প্রাণিদের পূর্বসূরি অস্ট্রেলিয়ার হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস (Ornithorhynchus anatinus) প্রাণিদের XY ক্রোমোজোমগুলিতে সমপরিমাণ জিনের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। পুরুষের কোষে ওয়াই-ক্রোমোজম একটি মাত্র হওয়ায় তার সঙ্গী এক্স-ক্রোমোজমে অবস্থিত অন্যসব জিনগুলোর সাথে আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিকশিত হওয়ার সুযোগ আর নেই। ফলে, সময়ের সাথে সাথে তার অবনতিই হচ্ছে। বর্তমানে এর আকার এক্স-ক্রোমোজমের চেয়ে অনেক ছোটো, কার্জকরী মাত্র ৪৫টি জিনের মালিক, যেখানে এক্স-ক্রোমোজোমে ৯০০টি জিন বিদ্যমান। ওয়াই ক্রোমোজমের অধঃপতনের বিবর্তনীয় গতিবিদ্যা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে পুরো ওয়াই-ক্রোমোজম বিলুপ্ত হতে আর চার মিলিয়ন থেকে এগারো মিলিয়ন বছর লাগবে। ওয়াই-ক্রোমোজোমের বিলুপ্তির সাথে লিঙ্গ নির্ধারক জিন SRY জিনটি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সন্তানদের লিঙ্গ নির্ধারণের কী হবে? জাপানি  বিজ্ঞানীরা এর উত্তর হিসেবে ওয়াই-ক্রোমোজোম বিলুপ্ত হওয়া দুটি ইঁদুর (rodent) প্রজাতি খুঁজে পেয়েছেন। পূর্ব ইউরোপের ইঁদুরসদৃশ (vole: Ellobius lutescens) প্রাণী ও জাপানের কাঁটাযুক্ত ইঁদুর (Tokudaia osimensis)গুলির ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং SRY সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এদের এক্স-ক্রোমোজোম উভয় লিঙ্গের মধ্যে একক (X0) বা দ্বিগুণ (XX) মাত্রায় থাকে। সম্প্রতি, জাপানের একদল বিজ্ঞানী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কাঁটাযুক্ত ইঁদুরের ওয়াই-ক্রোমোজোমের এর বেশিরভাগ জিন কোষের অন্যান্য ক্রোমোজোমে স্থানান্তরিত হয়েছে, যদিও SRY বা এটির বিকল্প কোনো জিন খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে, তিন দশকের অন্বেষণে তাঁরা কেবল পূরুষ ইঁদুরদের মধ্যে ৩ নং ক্রোমোজোমে খুঁজে পেলেন ১৭ হাজার নিউক্লিওটাইড-দীর্ঘ SOX9 জিনের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা পুরুষ ইঁদুরদের SRY এর বিকল্প হিসেবে টেস্টিস-নির্ধারক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে (Terao et al., 2022)। 
মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমের অন্তর্ধান আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলেছে। সে ক্ষেত্রে মানুষ প্রজাতির কী হবে? আমাদের জানা আছে, কিছু সরিসৃপ জাতীয় প্রাণী, যেমন টিকটিকি ও সাপ পার্থেনোজেনেসিস নামে পরিচিত বিশেষ এক প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে শুধুমাত্র স্ত্রী-প্রজাতি তাদের নিজস্ব জিন থেকে ডিম্বাণু তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটি মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ঘটতে পারে না, কারণ ডিম্বাণু সক্রিয়করণ বা নিষিক্তকরণের জন্য প্রয়োজন উচ্চমাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি যার সংকেত আসে শুক্রাণু থেকে। এছাড়া, ভ্রূণ গঠনের অন্তঃনিষেক ও বহিঃনিষেক প্রকিয়ায় জড়িত নানা সংকেতও আসে শুক্রাণু থেকে। SRY, SOX9, AMH (anti-Mullerian hormone) ও ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর (FGF9) জিন তাদের মধ্যে অন্যতম, এবং তারা যথাক্রমে মানব ওয়াই-ক্রোমোজোম, ১৭ নং, ১৯ নং ও ১৩ নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত। মোদ্দাকথা, প্রজনন করার জন্য মানবসমাজে পুরুষদের প্রয়োজন, যার অর্থ হলো এই যে ওয়াই-ক্রোমোজোমের অন্তর্ধান মানব জাতির বিলুপ্তির সূচনা করতে পারে। মানুষ কী তাহলে নতুন লিঙ্গ নির্ধারণকারী জিন উদ্ভাবন করতে পারে? সেই রকম একটি বিকল্প সম্ভাবনাকেও বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। তবে, একটি নতুন লিঙ্গ-নির্ধারণকারী জিন কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। খুব সহজেই একটি সমাধান হতে পারে যদি SRY জিনটির একটি কপি অন্য যে কোনো অটোজোমে স্থানান্তরিত হয়। তবে, একটির পরিবর্তে টেস্টিস-নির্ধারক জিন SRY এর একাধিক কপি যদি বিভিন্ন অটোজোমে প্রতিস্থাপিত হয়, তাহলে পুরুষজাতি নানা  বিপদেও পড়তে পারে, এ বিষয়টিও অবহেলা করা যায় না। এছাড়া, স্তন্যপায়ী প্রাণিদের জীবিত পূর্বসূরি অস্ট্রেলিয়ার হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস প্রাণিদের মধ্যেও SRY জিন অনুপস্থিত (Wallis et al., 2008), কিন্তু তাদের ওয়াই-ক্রোমোজোম (পাঁচ জোড়া XY ক্রোমোজোম)গুলিতে পূরুষ-নির্ধারক জিন হিসেবে কাজ করে AMH জিন (Cortez et al., Nature, 2014) এবং অটোজোমে (১৫ নং ক্রোমোজোম) অবস্থিত SOX9 (Wallis et al., 2007)। পুরুষ ভ্রূণের কোষে SOX9 দ্বারা AMH সক্রিয় হয়। এর অভিব্যক্তি পুরুষ ভ্রূণে নারী প্রজনন নালীর বা মুলেরিয়ান নালী এর বিকাশকে বাধা দেয়, যার ফলে ফ্যালোপিয়ান টিউব ও জরায়ুর বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় (Rey et al., 2003)। কাজেই SRY জিনের বিকল্প হিসেবে FOX9 ও AMH জিন পুরুষ গোনাড সৃষ্টি করতে পারে। তবুও, পুরুষজাতির উৎকন্ঠা কাটে না। তাদের ললাটে যে দুঃখ নেমে এসেছে  তা খন্ডাবে কে? শেষমেশ ভরসা মলিক্যুলার বায়োলজি প্রযুক্তির ওপর। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি তো বিজ্ঞানীদের এখন নখাগ্রে, তাদের কাছে দুর্ভেদ্য বলে কোনো সংজ্ঞা নেই। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরও উন্নতি ঘটবে। কাজেই ওয়াই-ক্রোমোজোমের এই অসহায়ত্বে ডিএনএ প্রযুক্তিবিশারদগণ তাঁদের নিরলস সাধনায় কোনো একটি উপায় বের করবেনই।

লিঙ্গ-অনুপাত ও জেন্ডার সমতা

পৃথিবীব্যাপি লিঙ্গ-অনুপাত মেয়েদের দিকে ঝুঁকেছে। সম্ভবতঃ এর সঙ্গে নারীর সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতায়নের সম্পর্ক সম্পৃক্ত। সংখ্যার দিক থেকে সামগ্রিক ভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর এগিয়ে যাওয়া কি নির্দেশ করে যে, পুত্রসন্তানের তুলনায় কন্যাসন্তানের জন্মহার বেশি? তা বোধয় নয়, ক্ষীয়মাণ ওয়াই-ক্রোমোজোম-কেন্দ্রিক সে ঘণ্টা এখনও বাজেনি। জগতের মোট (৮ বিলিয়ন) জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে নারীদের তুলনায় তাৎপর্যহীনভাবে পুরুষরা (৫০.৩%) সামান্য এগিয়ে।  তবে, বাংলাদেশের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মোট ১৬.৫২ (১৬৫ মিলিয়ন) কোটি জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষের (৮.১৭ কোটি) চেয়ে নারী জনসংখ্যা (৮.৩৩ কোটি) বেশি (www.banglainsider.com/ আগস্ট ২, ২০২২)। পার্শ্ববর্তী ভারতেও একই ব্যতিক্রমী চিত্র ফুটে উঠেছে। সে ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকাতেও। এছাড়া, দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর গড় আয়ুও বেশি (৭৪.৯ বছর)। ব্যাপক পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, নগরায়ন এবং অন্যান্য সামাজিক পরিবর্তনের কারণে জন্মহারও কমেছে। 

পৃথিবীব্যাপি যখন জেন্ডার সমতায় দৃষ্টিপাত করা হচ্ছে তখন প্রকৃতিদত্ত ওয়াই-ক্রোমোজোমের ক্রমাগত খর্বাকৃতি হওয়ার বিষয়টি মানবসমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণ হতে বলা যায়, সমাজ-সভ্যতার বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সহাবস্থানের ফলেই সমাজের ভারসাম্য রক্ষা হয়। সভ্যতা বিকাশের পরিক্রমায় নারী-পুরুষের অবস্থান এবং ভূমিকাগত পরিবর্তন দেখা যায়, সাথে বদলায় দৃষ্টিভঙ্গিও। অনেক নারী এখন একান্তভাবে স্বামী-উপজীবিনী নন, তাঁরাও নিজ নিজ কর্মস্থলে খেটে অর্থাপার্জন করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ি দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ হচ্ছে নারী। অর্থাৎ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে. নারী-পুরুষ একত্রে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছেন। নারীর প্রতিই কেবল জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে প্রকৃত নারীবাদ তা বলে না, বরং কোন বিশেষ লিঙ্গকে প্রাধান্য না দিয়ে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নর-নারী উভয় গোষ্ঠীর প্রতি সংবেদনশীল হতে প্রকৃত নারীবাদ শিক্ষা দেয়। জেন্ডার সংবেদনশীলতা আচরণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের সর্বস্তরের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। শারীরিক ভিন্নতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের বিকাশ, সক্ষমতা প্রকাশে, স্বপ্ন ও চাহিদার স্বীকৃতি ও যথার্থ মূল্যায়ন পাবার দাবীদার (UN Women, 20 March 2020)। তাইতো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” এক্স- বা ওয়াই-ক্রোমোজোম জেন্ডার আইডেনটিটির নির্ধারক বটে, কিন্তু জেন্ডার অসাম্য নির্ধারণে কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে না। এই বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সমাজ ও সংস্কৃতি। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশসাধন প্রয়োজন। 

উপসংহার

ওয়াই-ক্রোমোজোম আকারে বেশ ছোটো, আকৃতিতে ও প্রকৃতিতে (বৈশিষ্ট্যে), এবং এদের জিনগুলি বড্ড একা, এদের এক্স-ক্রোমোজোমে কোনো জুটি নেই। তাই, তারা অস্বাভাবিক বিবর্তনীয় চাপের মধ্য দিয়ে সময় পার করে আসছে। কারণ, সমজাতীয় এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে ওয়াই-ক্রোমোজোমের জেনেটিক উপাদানগুলিকে অদল-বদল করে সে চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ারও উপায় নেই। পরিণতিতে, বিবর্তনীয় পথযাত্রায় ইতোমধ্যে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ-নির্দিষ্ট জিন হারিয়েছে। যেখানে এক্স-ক্রোমোজোম এখনও ৯০০টি জিন ধারণ করে, সেখানে ওয়াই-ক্রোমোজোমে আছে তো সবে ধন নীলমনি SRY ও তার সহযোগী কিছু জিন- সর্বমোট কার্যকরী মাত্র ৪৫টি। আগের সেই বলিষ্ঠ ও প্রাণশক্তিধারী ওয়াই-ক্রোমোজোম আর নেই, শুধু বর্তমান তাঁর ভগ্নবশেষ। যদিও আজ ভগ্নদশা দেখে তার বিগত সৌষ্ঠব বুজবার উপায় নেই। এসবের ওপরে আছে সর্বগুণান্বিতা নারীদের শক্তিশালী দুটো এক্স-ক্রোমোজোম, যদিও একটি এক্স-ক্রোমোজোমের বেশির ভাগ জিন-ই প্রকৃতিগতভাবে আচ্ছন্ন। ওয়াই-ক্রোমোজোমের হারিয়ে যাবার অর্থ কী সমাজ থেকে পুরুষ হারানো? সে আশংকা তো রয়েছেই- তবে অনেক বিজ্ঞানী কিছু আশাপ্রদ যুক্তিও দেখিয়েছেন। তাঁদের মতে যদি পুরুষরা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে মানুষও বিলুপ্ত হবে- কারণ, মানব জিনোমে অনেক মাতৃত্বের জিন রয়েছে যা কেবলমাত্র সক্রিয় হতে পারে ওয়াই-ক্রোমোজোমের জিন দ্বারা। তাই প্রজনন চালিয়ে যেতে মানব জাতিকে অবশ্যই পুরুষদের রক্ষা করতে হবে। তাঁদের মতে ওয়াই-ক্রোমোজম ছাড়া পুরুষজাতি বিলুপ্ত না হয়ে নতুন পুংলিঙ্গ নির্ধারণকারী জিন বিবর্তনের মাধ্যমেও হয়তো টিকে থাকতে পারবে। অন্ততঃ সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত দুটি ইঁদুর প্রজাতি আমাদের সে আশাই দেখাচ্ছে। অনেকের মতে, ক্রমহ্রাসমান এই ওয়াই-ক্রোমোজোমটির কৌলিন্য যা হারাবার হারিয়েছে, কিন্তু এখন তারা অনেক স্থিতিশীল হয়েছে, হয়তো সেটি চিরতরে হারিয়ে যাবে না। তবে, অনেক গবেষণায় এটা স্পষ্ট যে, ওয়াই ক্রোমোজোম সম্ভবপর দ্রুত বিবর্তনীয় অবনতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে, যদিও ফকির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কথায় বলতেই হয় সে তো “দূর অস্ত”।

তথ্যসূত্র:

  • Bachtrog D. Y-chromosome evolution: emerging insights into processes of Y-chromosome degeneration. Nat Rev Genet. 2013; 14 (2): 113-24.
  • Berta P, Hawkins JR, Sinclair AH, Taylor A, Griffiths BL, Goodfellow PN, Fellous M. Genetic evidence equating SRY and the testis-determining factor. Nature. 1990, 348 (6300): 448–50.
  • Carrel L, Willard HF. X-inactivation profile reveals extensive variability in X-linked gene expression in females. Nature. 2005; 434: 400–4.
  • Craig IW, Harper E, Loat CS. The genetic basis for sex differences in human behaviour: role of sex chromosomes. Ann Hum Genet. 2004; 68: 269–84. 
  • Czech D. P., Lee J., Sim H., Parish C. L., Vilain E., Harley V. R. The human testis-determining factor SRY localizes in midbrain dopamine neurons and regulates multiple components of catecholamine synthesis and metabolism. J. Neurochem. 2012; 122: 260–271.
  • Cortez D., Marin R., Toledo-Flores D., Froidevaux L., Liechti A., Waters P. D., et al. Origins and functional evolution of Y chromosomes across mammals. 2014. Nature 508: 488–493.
  • Davies W, Wilkinson LS. It is not all hormones: alternative explanations for sexual differentiation of the brain. Brain Res. 2006; 1126: 36–45.
  • Elzaiat M, McElreavey K, Bashamboo A. Genetics of 46, XY gonadal dysgenesis. Best Pract Res Clin Endocrinol Metab. 2022; 36(1): 101633.
  • Graves JA. Sex chromosome specialization and degeneration in mammals. Cell. 2006;124(5): 901-14.
  • Hughes JF, Skaletsky H, Pyntikova T, Minx PJ, Graves T, Rozen S, Wilson RK, Page DC. Conservation of Y-linked genes during human evolution revealed by comparative sequencing in chimpanzee. Nature. 2005; 437 (7055): 100-3.
  • Kashimada K, Koopman P. Sry: the master switch in mammalian sex determination. Development. 2010, 137 (23): 3921–30.
  • Koopman P, et al. A gene mapping to the sex-determining region of the mouse Y chromosome is a member of a novel family of embryonically expressed genes. Nature. 1990; 346: 245–50.
  • Kopsida E, Stergiakouli E, Lynn PM, Wilkinson LS, Davies W. The Role of the Y Chromosome in Brain Function. Open Neuroendocrinol J. 2009; 2: 20-30.
  • Lejbak L, Vrbancic M, Crossley M. The female advantage in object location memory is robust to verbalizability and mode of presentation of test stimuli. Brain Cogn. 2009; 69: 148–53. 
  • Lovell-Badge R, Robertson E. XY female mice resulting from a heritable mutation in the primary testis-determining gene, Tdy. Development. 1990; 109(3): 635-46.
  • Mayer A, Lahr G, Swaab DF, Pilgrim C, Reisert I. The Y-chromosomal genes SRY and ZFY are transcribed in adult human brain. Neurogenetics 1998; 1 (4): 281–288.
  • Rey R, Lukas-Croisier C, Lasala C, Bedecarrás P. “AMH/MIS: what we know already about the gene, the protein and its regulation”. Molecular and Cellular Endocrinology. 2003; 211 (1–2): 21–31.
  • Rosenfeld CS. Brain Sexual Differentiation and Requirement of SRY: Why or Why Not? Front Neurosci. 2017; 11: 632.
  • Sekido R, Lovell-Badge R. Sex determination involves synergistic action of SRY and SF1 on a specific Sox9 enhancer. Nature. 2008; 453 (7197): 930-4. 
  • Sinclair AH, Berta P, Palmer MS, et al. A gene from the human sex-determining region encodes a protein with homology to a conserved DNA-binding motif. Nature. 1990; 346: 240–4.
  • Skaletsky H, Kuroda-Kawagushi T, Minx PJ, et al. The male-specific region of the human Y chromosome is a mosaic of discrete sequence classes. Nature. 2003; 423: 825–37.
  • Terao M, Ogawa Y, Takada S, Kajitani R, Okuno M, et al. Turnover of mammal sex chromosomes in the Sry-deficient Amami spiny rat is due to male-specific upregulation of Sox9. Proc Natl Acad Sci U S A. 2022; 119(49): e2211574119.
  • UN Women, (20 March 2020). Five big wins ushered in by the landmark Beijing Platform for action. https://www.unwomen.org/en/news/stories/2020/3/.
  • Wallis MC, Delbridge ML, Pask A.J, Alsop AE, Grutzner F, et al.. Mapping platypus SOX genes; autosomal location of SOX9 excludes it from sex determining role. Cytogenet. Genome Res. 2007; 116: 232–234.
  • Wallis MC, Waters PD, Graves JA. Sex determination in mammals–before and after the evolution of SRY. Cell. Mol. Life Sci. 2008; 65: 3182–3195.

লেখক পরিচিতি

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক:  সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। 

C:\Users\Rawnaq\Desktop\Rawnaq Passport Size Picture.jpg
রওনক আরা পারভীন: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

ক্রমহ্রাসমান মানব Y (ওয়াই)-ক্রোমোজোম নিয়ে নানা উদ্বেগ ও জেন্ডার সমতায় দৃষ্টিপাত

প্রকাশ: ০৭:৫৪:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

যে প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে নর ও নারী তাদের স্বতন্ত্র শারীরবৃত্তীয়তা অর্জন করে, তার মুলে রয়েছে নারী-পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোমের ভিন্নতা। মানুষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে পুরুষদের থাকে একটি একক X (এক্স)-ক্রোমোজোম (তাদের মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া) এবং একটি একক Y (ওয়াই)-ক্রোমোজোম (তাদের পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত), অর্থাৎ XY। বিপরীতে, নারীদের থাকে দুটি এক্স ক্রোমোজোম, XX।  তাই তিনটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যৌন-সংযুক্ত জিনের অভিব্যক্তি মস্তিষ্ক এবং আচরণে যৌন দ্বিরূপতায় অবদান রাখতে পারে (Davies et al, 2006):  প্রথমত, যেহেতু পুরুষের একটির বিপরীতে নারীদের দুটি এক্স-ক্রোমোজোম থাকে, তাই এক্স-নিষ্ক্রিয়করণ (X-inactivation) এর প্রক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া জিনগুলি পুরুষ টিস্যুর তুলনায় নারীদের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ বেশি প্রকাশ পায়। দেখা গিয়েছে, মানব এক্স-ক্রোমোজোমের সমস্ত এক্স-সংযুক্ত জিনের মধ্যে ~২০% জিন এক্স-নিষ্ক্রিয়তা এড়াতে পারে (Carrel and Willard, 2005)। দ্বিতীয়ত, যেহেতু দুটি লিঙ্গ তাদের এক্স-ক্রোমোজোমের পিতামাতার উৎপত্তির ক্ষেত্রে পৃথক, তাই এই ক্রোমোজোমের যে কোনো জিন যৌনভাবে দ্বিরূপ অভিব্যক্তি প্রদর্শন করতে পারে। তৃতীয়ত, নারী-পুরুষদের মস্তিষ্কের যৌন পার্থক্য ঘটতে পারে ওয়াই-ক্রোমোজোমের অ-পুনঃসংযোজন অঞ্চলে (non-recombining region, NRY) Y-অনন্য জিনের পুরুষ-সীমিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে। 

মানব ওয়াই-ক্রোমোজোম নিয়ে নতুন করে ঔৎসুক্য দেখা দিয়েছে, আবার তর্ক শুরু হয়েছে। তর্কের শুরু বেশ অনেক বছর আগে থেকেই। পুরুষের দিন নাকি শেষ হয়ে আসছে, এদের ওয়াই-ক্রোমোজোম নাকি বিলুপ্তির পথে। কারণ, সৃষ্টির শুরুতে ওয়াই-ক্রোমোজমের যে চরিত্র ছিলো তা এরই মধ্যে অনেকটা (প্রায় ৬০ শতাংশ) ক্ষয় হয়ে গেছে। আর, যেটুকু বাকি রয়েছে তা এই খর্বাকায় ক্রোমোজোমটির শেষ হতে কত সময় লাগবে এ নিয়ে বিজ্ঞানী ও বোদ্ধাদের মধ্যে নানা ভাবনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানমহলে যখনই কোনো নতুন তথ্য জেগে ওঠে, তখনই আবার শুরু হয় নতুন করে তর্ক। ওয়াই-ক্রোমোজোম চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণের পূর্বে এক্স-ক্রোমোজোম সম্বন্ধেও আমাদের তুলনামূলক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এক্স-ক্রোমোজোম নিষ্ক্রিয়করণ

প্রকৃতি যেমন ওয়াই-ক্রোমোজোমকে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে, তেমনি নারীদের জোড়া এক্স-ক্রোমোজোমকে একেবারে স্বাধীন করেও দেয় নি। মানুষসহ থেরীয় (theria: ক্যাঙ্গারুজাতীয় প্রাণী ও প্লাসেন্টাধারী স্তন্যপায়ী গ্রুপ) শ্রেণীর স্তন্যপায়ী স্ত্রী-প্রাণীদের মধ্যে XX-ক্রোমোজোমের একটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, যাতে করে পুরুষ ও নারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও জিনগত সমতা বজায় রাখা যায়, যেহেতু পুরুষদের মাত্র একটি এক্স-ক্রোমোজোম বিদ্যমান। এক্স-ক্রোমোজোমে অবস্থান করে ৯০০টি জিন এবং তাদের সহোদর জিন বা অ্যালিল (allele) অবস্থান করে ঠিক তার বিপরীতে আরেকটি এক্স-ক্রোমোজোমে, যার কোনোটি প্রকট বা প্রচ্ছন্ন। ভেবে দেখুন, এই জোড়া-ক্রোমোজোমের প্রকট জিনগুলি যদি সব একসাথে প্রকাশ পেতো, তাহলে  নারী-পুরুষদের সমতা ধরে রাখা সম্ভব হতো? এছাড়া, কয়েক মিলিয়ন বছর আগেও তো এক্স- এবং ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার ও জিনের সংখ্যা ছিল একই। প্রকৃতি ভেবে উঠতে পারিনি যে ওয়াই-ক্রোমোজোম তার সহচরের তুলনায় এতোটা খর্বকায় হয়ে যাবে। যাইহোক, দুটি এক্স-ক্রোমোজোমের একটি অনুলিপিকে হেটারোক্রোমাটিন (heterochromatin) নামক একটি নিষ্ক্রিয় কাঠামোতে রূপান্তরের ফলে নীরব করা হয়। এই নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেন্স আরএনএ (asRNA) বা Xist আরএনএ ও পলিকম্ব রিপ্রেসিভ কমপ্লেক্স (polycomb repressive complex) প্রোটিনগুলোর সহায়তায়। তবুও নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়াটি শতভাগ সফল হয়নি, জিনগুলির ২০% নারীদের আনুকূল্যেই ছাড় পেয়েছে। ছাড় পাওয়া এই ২০ শতাংশ জিনের মধ্যে রয়েছে নারী-বৈশিষ্ট্যের আভিজাত্য ও দাম্ভিকতা।

Y-ক্রোমোজোমের গঠন এবং বৈশিষ্ট

সেক্স ক্রোমোজোমের বিবর্তনীয় উৎস যদি লক্ষ করি, তাহলে এক্স- এবং ওয়াই-ক্রোমোজোম (যা অটোজোম থেকে উদ্ভূত) এমনকি ১৬০ মিলিয়ন বছর আগেও প্রায় একই আকারের ছিল, তাদের জিনের সংখ্যাও ছিল এক, এবং এক্স- ও ওয়াই-ক্রোমজোমের মধ্যে রিকম্বিনেশন (genetic recombination) প্রক্রিয়ায় জীন অদল-বদল হতো। সময়ের বিবর্তনে, ওয়াই-ক্রোমোজোম ধীরে ধীরে এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে রিকম্বিনেশন বা জিনগত তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে শুরু করে, যা ওয়াই-ক্রোমোজোমকে এক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। বর্তমানে, মানব এক্স-ক্রোমোজোমের আকার হচ্ছে ~১৫৫Mb (১Mb = ১০০০ নিউক্লিওটাইড) এবং এতে ~১৫০০ জিন থাকে (যার মধ্যে ৯০০টি জিন কার্যকরী ও বাকিসব সিউডোজিন/pseudogene), যেখানে ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার এসে ঠেকেছে মাত্র ~ ৬০,০০০ নিউক্লিওটাইডে এবং এতে থাকে ~ ১৭৮টি জিন, যার পরিপাট্যে বেশিরভাগই (৪০%) হচ্ছে হেটারোক্রোমাটিন ও সিউডোজিন, এবং কার্যকরী জিনের সংখ্যা মাত্র ৪৫টি (Graves, 2006), আবার কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে ৫৫টি। অর্থাৎ দু’জনে (এক্স ও ওয়াই) আর সমান সমান নয়। ৪৫টি জিনের মধ্যে শুধুমাত্র পুরুষ-নির্ধারক জিন হচ্ছে ২৭টি, যার মধ্যে SRY (Sex-determing Region of Y) জিনটি হচ্ছে পুরুষত্বের ধ্বজ্জাধারী। একটি গবেষণায় মানুষ ও শিম্পাঞ্জির X-Y অনুরূপ পুরুষ-নির্দিষ্ট অঞ্চলের ৫,৩০০ নিউক্লিওটাইডের ক্রম (sequence) তুলনা করে দেখা গিয়েছে যে, মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমের ওই অঞ্চলটিতে রয়েছে ১৬টি কার্যকরী জিন এবং ১১টি সিউডোজিন, যার হুবুহু মিল রয়েছে শিম্পাঞ্জির সাথে, কিন্তু শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলটিতে রয়েছে  ১৬টি  কার্যকরী জিনের পরিবর্তে ১১টি জিন (Hughes et al., 2005 ), যা ইঙ্গিত করে যে মানুষের তুলনায় শিম্পাঞ্জির ওয়াই-ক্রোমোজোম দ্রুততার সাথে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখান থেকেই কতিপয় বিজ্ঞানীদের মাঝে একটি ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে যে মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমটি অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, হয়তো ততটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। যাহোক, ওয়াই-ক্রোমোজোমের এই অবনতির জন্য মূলত ক্ষতিকারক মিউটেশনকেই দায়ী করা হয়েছে এবং এক্স-ক্রোমোজোমের জিনগুলির সাথে আদান-প্রদান (recombination) করার সুযোগ না থাকায় এসব মিউটেশন থেকে পুনরুদ্ধারের  সম্ভাবনাও বিলীন হয়ে গেছে।

অটোজোম এবং এক্স-ক্রোমোজোমের মতো, মানুষের ওয়াই-ক্রোমোজোম একটি ছোটো (Yp) ও একটি দীর্ঘ (Yq) বাহু (যথাক্রমে ~১১.৫Mb এবং ~৪৮.৫Mb) নিয়ে গঠিত, যা একটি সেন্ট্রোমিয়ার (centromere) দ্বারা বিভক্ত। ওয়াই-ক্রোমোজোমের উভয়প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল (সিউডোঅটোজমীয় অঞ্চল/ বা PAR) রয়েছে (ছবি দেখুন), যা মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় এক্স-ক্রোমোজোমের সমতুল্য অঞ্চলগুলির সাথে পুনঃসংযোগ (recombination) বা জিনগত তথ্য বিনিময় করতে পারে। তবে, প্রান্তীয় এই অঞ্চল-দুটি ওয়াই-ক্রোমোজোমের মাত্র ৫% জুড়ে রয়েছে। ওয়াই-ক্রোমোজোমের বাকি ৯৫% অংশ (NRY) এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে জিনগত তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এই অঞ্চলটিতে যেসব প্রোটিন-কোডিং জিন রয়েছে, তার মধ্যে ২০% জিন প্রকাশ পায় মস্তিস্কসহ দেহের বিভিন্ন টিস্যুতে (Skaletsky et al., Nature, 2003)। NRY অঞ্চলের বাকি জিনগুলি একচেটিয়াভাবে শুক্রাশয়-নির্দিষ্ট, যা  শুক্রাশয়ের বিকাশ, শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া (স্পার্মাটোজেনেসিস) এবং পুরুষ-সাধারণ শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সাথে জড়িত ।

সাম্প্রতিক কালে (প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর আগে) দুটো জিন. TGIF2LY ও PCDH১১Y (Cadherin জিন) এক্স-ক্রোমোজোম থেকে কপি হয়ে ওয়াই-ক্রোমোজোমে সন্নিবেশিত হয়েছে SRY জিনের পাশে (Bachtroget al., 2013)। PCDH১১Y প্রোটিনটি স্নায়ুকোষের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। হঠাৎ করে এদের ওয়াই-ক্রোমোজোমে অধিগমনের রহস্য এখনও অনধিগম্য রয়ে গেছে (ছবি দেখুন)।D:\Rashid\Y chromosome\Human Y chromosome-.jpg

লিঙ্গ-নির্ধারক জিন, SRY: ওয়াই-ক্রোমোজোমের ছোটো বাহুর একপ্রান্তে (Yp১১.৩ লোকাসে) অবস্থিত SRY (Sex-determining region Y protein) জিনটি স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে পুরুষ লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য আবশ্যিক। এই লিঙ্গ-নির্ধারক জিনটি আবিষ্কৃত হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে (Sinclair et al.,1990)। কুপম্যান ও তার সহযোগী বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে, XY-ইঁদুর থেকে যখন SRY জিন কেটে ফেলা হয়, তখন পুরুষ ইঁদুরগুলি সবাই স্ত্রী ইঁদুর-এ রূপান্তরিত হয় এবং সে সময় থেকেই SRY জিনটি পুরুষত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক জিন হিসেবে চিহ্নিত হয় (Koopman et al., 1990)। ভ্রূণের নর বা নারী লিঙ্গ ঠিক করে দেয় এই জিন। SRY জিন দ্বারা সংকেতপ্রাপ্ত এই লিঙ্গ-নির্ধারক প্রোটিনটি হলো একটি ডিএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন বা একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর, যা অন্যান্য লিঙ্গ-সমন্বয়কারী জিনগুলির প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু মানুষ কেন, প্ল্যাসেন্টাযুক্ত স্তন্যপায়ী ও মার্সুপিয়াল প্রাণিদের পুরুষত্বের সূচনা হয় এই জিনটির উপস্থিতিতে (Berta et al.,1990; Cortez et al., 2014)। বিপরীতে, WNT4 ও DAX1 জিন দুটি হচ্ছে নারীদের আত্মশ্লাঘা, যাদের উপস্থিতি ডিম্বাশয়ের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে।

SRY হলো SOX (SRY-related box) ডিএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন পরিবারের সদস্য। SF1 (Splicing factor 1) নিউক্লীয় রিসেপ্টর প্রোটিনকে সাথে নিয়ে SRY-প্রোটিন সরাসরি তার ডাউনস্ট্রিম টার্গেট জিনের অভিব্যক্তিকে সক্রিয় করে, যেমন SOX9 ও FGF9 (Glia-activating factor) [Sekido and Lovell-Badge, 2008; Kashimada and Koopman, 2010]। শুক্রাশয়ের বিকাশের জন্য SOX9 জিনের সক্রিয়করণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ SOX9 হলো শুক্রাশয় গঠনের অন্যতম একটি প্রোটিন, যার ভুল অভিব্যক্তির কারণে লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যায়। SRY প্রোটিনটি প্রাথমিক যৌন কর্ডের বিকাশ ঘটায়, যা পরে সেমিনিফেরাস টিউবুল (seminiferous tubules)এ পরিণত হয়। এই কর্ডগুলি অভিন্ন গোনাডের কেন্দ্রীয় অংশ গঠন করে, যা পরবর্তীতে শুক্রাশয়ে পরিণত হয়। শুক্রাশয়ের লেডিগ (Leydig) কোষগুলি টেস্টোস্টেরন নিঃসরণ শুরু করে, যখন সের্টোলি (Sertoli) কোষগুলি অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন (AMH) তৈরি করে। SRY জিনের প্রভাব সাধারণত ভ্রূণ গঠনের ৬-৮ সপ্তাহ পরে ঘটে যা পুরুষদের মধ্যে নারীদের শারীরবৃত্তীয় কাঠামোগত বৃদ্ধিকে বাধা দেয়। বিপরীতে, এটি পুরুষ-বৈশিষ্ট্য বিকাশের পক্ষেই কাজ করে। 

যে-কোনো ভ্রূণের গোনাড তাদের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট সময় (৬-৮ সপ্তাহ) পর্যন্ত অভিন্ন থাকে, যখন টেস্টিস-নির্ধারক ফ্যাক্টর (SRY) পুরুষের যৌন অঙ্গগুলির বিকাশ ঘটায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একটি পুরুষ ক্যারিওটাইপ হলো XY, যেখানে নারীদের XX। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে যেখানে SRY একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। যেমন, ক্লাইনফেল্টার (Klinefelter) সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা উত্তরাধিকারসূত্রে একটি  ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং দুইটি এক্স-ক্রোমোজোম পেয়ে থাকে। দুইটি XX থাকা সত্ত্বেও ওয়াই-ক্রোমোজোমে SRY জিন থাকার কারণে এসব ব্যক্তিদের পুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং টার্নার্স (Turner’s) সিনড্রোম (XO) নারী বৈশিষ্ট্য বহন করে। তবে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষত্রে, যদি SRY জিনটি ওয়াই-ক্রোমোজোমে থাকার পরিবর্তে এক্স-ক্রোমোজোমে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে শুক্রাশয়ের বিকাশ আর ঘটে না। এসব ক্ষেত্রে XY ক্যারিওটাইপ থাকা সত্ত্বেও (শুক্রাশয়ের পরিবর্তে) এদের স্বাভাবিক ফ্যালোপিয়ান নালী ও জরায়ু তৈরি হয়- এরা সয়ার (Swyer) সিন্ড্রোম নামে পরিচিত (Elzaiat et al., 2022)।  অন্যদিকে, ‘XX পুরুষ সিন্ড্রোম’ হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে কিছু ব্যক্তি, যাদের ক্যারিওটাইপ হচ্ছে নারী ধরণের, কিন্তু এক্স-ক্রোমোজোমে SRY জিন ট্রান্সলোকেশন/স্থানান্তরিত হওয়ায় এদের  শারীরিক বৈশিষ্ট্য সব পুরুষালী। আবার, XY ক্যারিওটাইপ থাকা সত্ত্বেও SRY জিনের অভাবে প্রাণিদের মধ্যে তৈরি করে ডিম্বাশয় এবং এরা স্ত্রী-যৌন বিকাশের পথ অনুসরণ করে (Lovell-Badge and Robertson, 1990)। এসব তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে SRY জিনটি পুরুষ বা স্ত্রী গোনাড বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

যৌন দ্বিরূপতা এবং মানব মস্তিস্ক

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে অনেক জৈবিক এবং শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য রয়েছে। নিউরোসাইকোলজি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ করেছে যে, পুরুষরা দৃশ্যমান এবং ন্যাভিগেশনাল দক্ষতা ব্যবহার ক’রে আচরণগত কাজগুলিতে নারীদের চেয়ে অধিকতর কার্য সম্পাদন করে, যেখানে নারীরা সামাজিক দক্ষতা নির্ধারণের কাজগুলিতে বেশি দক্ষতা রাখে (Craig et al., 2004)। স্মৃতিশক্তি, আবেগ ও সহানুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও নারীরা বেশ এগিয়ে রয়েছে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে উচ্চ মাত্রায় আগ্রাসনী আচরণ  লক্ষণীয় (Craig et al., 2004)। বস্তুতঃ প্রাণিদের মধ্যেও দেখা গিয়েছে আগ্রাসন অত্যন্ত যৌনভাবে দ্বিরূপ একটি বৈশিষ্ট্য, যেখানে পুরুষ প্রাণিদের মধ্যে আক্রমনের প্রবণতা অনেক বেশি। এছাড়া, নিউরোইমেজিং বিশ্লেষণ করেও দেখা গিয়েছে যে, মস্তিষ্কের কোনো কোনো অংশ লিঙ্গ-নির্দিষ্ট, যা  পুরুষ ও নারীদের মধ্যে আচরণগত প্রভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপঃ মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (পুরুষদের মধ্যে বড়ো), হিপ্পোক্যাম্পাস (নারীদের মধ্যে বড়ো) এবং কর্পাস ক্যালোসাম (নারীদের মধ্যে বড়ো- যদিও এ বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে)। সেরিব্রাল কর্টেক্সের অঞ্চলগুলিতে নারী-পুরুষ ভেদে ভিন্নতা দেখা যায়- যেমন, নারীদের মধ্যে বৃহত্তর প্যারালিম্বিক এবং ফ্রন্টো-অরবিটাল এলাকা থাকে, যা আবেগ প্রক্রিয়াকরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ, অনুপ্রেরণা এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের কাজগুলির সাথে জড়িত, যেখানে পুরুষদের থাকে বৃহত্তর ফ্রন্টো-মিডিয়াল কর্টেক্স, যা জ্ঞানীয় কার্যসম্পাদনার ত্রুটিগুলি নিরীক্ষণ করে। পিটুইটারি গ্রন্থির নিকটস্থ হাইপোথ্যালামাসেও দেখা যায় যৌন দ্বিরূপতা। হাইপোথ্যালামাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে হরমোন নিঃসরণ (যেমন সোমাটোস্ট্যাটিন, অক্সিটোসিন),  দৈনিক শারীরবৃত্তীয় চক্র (circadian rhythm) বজায় রাখা, যৌন আচরণ পরিচালনা এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা। হাইপোথ্যালামাসে, ডিম্বস্ফোটন চক্র নিয়ন্ত্রণকারী অ্যান্টেরোভেনট্রাল পেরিভেন্ট্রিকুলার নিউক্লিয়াস (AVPV) এর ক্ষেত্রটি পুরুষদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই নারীদের মধ্যে বড়ো।

মস্তিষ্কে SRY জিনের ভূমিকা

মূলতঃ মানবমস্তিষ্ক একটি যৌন দ্বিরূপ অঙ্গ। তবে মস্তিষ্ক ও আচরণের যৌন দ্বিরূপতার অন্তর্নিহিত আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের খুব বেশি ধারণা নেই। এছাড়া, এই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে বেশ বিতর্কও রয়ে গেছে। যাইহোক, মানবদেহে শুক্রাশয়ের ভূমিকা কেবল যৌনক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। এছাড়া, গোনাড থেকে প্রস্রুত স্টেরয়েড হরমোনগুলি লিঙ্গ-নির্দিষ্ট আচরণগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে বটে, কিন্তু এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কে যৌন দ্বিরূপতা প্রতিষ্ঠারও একমাত্র কারণ নয়। এই দ্বিরূপতার পেছনে রয়েছে  XY এবং XX কোষের মধ্যে অন্তর্নিহিত জেনেটিক পার্থক্য- বিশেষকরে নেপথ্যে রয়েছে  Y-সংযুক্ত বেশ কিছু জিন, যার মধ্যে SRY জিন পুরুষদের মস্তিকে বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ পায়। SRY জিন মূলত প্রকাশ পায় শুক্রাশয়ে, কিন্তু শুক্রাশয়ের বাইরেও এর কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে মস্তিষ্কে ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে (Rosenfeld, 2017)। পুরুষদের মস্তিষ্কে SRY জিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হাইপোথ্যালামাস এবং ফ্রন্টাল ও টেম্পোরাল কর্টেক্সে (Mayer et al., 1998)। একইভাবে, SRY প্রোটিন শনাক্ত হয়েছে মস্তিষ্কের সাবস্ট্যানশিয়া নায়াগ্রা (substantia nigra) অঞ্চলে যার নিউরোনগুলিতে প্রকাশ পায় টাইরোসিন হাইড্রোক্সিলেজ (Czech et al., 2012), ডোপামিন সংশ্লেষণের প্রধান এনজাইম। এই তথ্যগুলি ইঙ্গিত দেয় কেন পুরুষরা ডোপামিন-সংশ্লিষ্ট রোগ (যেমন পারকিনসন রোগ এবং সিজোফ্রেনিয়া)-র জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিপরীতদিকে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের হাইপোথ্যালামাসে গ্রোথ হরমোনের নিঃসরণ অনেক বেশি৷ SRY জিন ছাড়াও, ওয়াই-ক্রোমোজোমের NRY অঞ্চলে আরও কয়েকটি Y-সংযুক্ত জিন রয়েছে,  (Ddx3y, Eif2s3y, Uty) যেগুলি পুরুষ মস্তিষ্কে স্নায়ুজনিত যৌন পার্থক্য ও পুরুষ-সাধারণ আচরণের দিকেও সম্ভাব্য অবদান রাখে (Kopsida et al., 2009)।

Y ক্রোমোজোমের বিলুপ্তি
১৬৬ মিলিয়ন বছর আগে স্তন্যপায়ী প্রাণিদের আবির্ভাবের সময় এক্স- ও ওয়াই-ক্রোমোজোমের আকার ও গুণাগুণ প্রায় সমান ছিল, দুটোতে জিনের সংখ্যাও ছিল এক। বর্তমানে জীবিত স্তন্যপায়ী প্রাণিদের পূর্বসূরি অস্ট্রেলিয়ার হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস (Ornithorhynchus anatinus) প্রাণিদের XY ক্রোমোজোমগুলিতে সমপরিমাণ জিনের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। পুরুষের কোষে ওয়াই-ক্রোমোজম একটি মাত্র হওয়ায় তার সঙ্গী এক্স-ক্রোমোজমে অবস্থিত অন্যসব জিনগুলোর সাথে আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিকশিত হওয়ার সুযোগ আর নেই। ফলে, সময়ের সাথে সাথে তার অবনতিই হচ্ছে। বর্তমানে এর আকার এক্স-ক্রোমোজমের চেয়ে অনেক ছোটো, কার্জকরী মাত্র ৪৫টি জিনের মালিক, যেখানে এক্স-ক্রোমোজোমে ৯০০টি জিন বিদ্যমান। ওয়াই ক্রোমোজমের অধঃপতনের বিবর্তনীয় গতিবিদ্যা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে পুরো ওয়াই-ক্রোমোজম বিলুপ্ত হতে আর চার মিলিয়ন থেকে এগারো মিলিয়ন বছর লাগবে। ওয়াই-ক্রোমোজোমের বিলুপ্তির সাথে লিঙ্গ নির্ধারক জিন SRY জিনটি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সন্তানদের লিঙ্গ নির্ধারণের কী হবে? জাপানি  বিজ্ঞানীরা এর উত্তর হিসেবে ওয়াই-ক্রোমোজোম বিলুপ্ত হওয়া দুটি ইঁদুর (rodent) প্রজাতি খুঁজে পেয়েছেন। পূর্ব ইউরোপের ইঁদুরসদৃশ (vole: Ellobius lutescens) প্রাণী ও জাপানের কাঁটাযুক্ত ইঁদুর (Tokudaia osimensis)গুলির ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং SRY সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এদের এক্স-ক্রোমোজোম উভয় লিঙ্গের মধ্যে একক (X0) বা দ্বিগুণ (XX) মাত্রায় থাকে। সম্প্রতি, জাপানের একদল বিজ্ঞানী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কাঁটাযুক্ত ইঁদুরের ওয়াই-ক্রোমোজোমের এর বেশিরভাগ জিন কোষের অন্যান্য ক্রোমোজোমে স্থানান্তরিত হয়েছে, যদিও SRY বা এটির বিকল্প কোনো জিন খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে, তিন দশকের অন্বেষণে তাঁরা কেবল পূরুষ ইঁদুরদের মধ্যে ৩ নং ক্রোমোজোমে খুঁজে পেলেন ১৭ হাজার নিউক্লিওটাইড-দীর্ঘ SOX9 জিনের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা পুরুষ ইঁদুরদের SRY এর বিকল্প হিসেবে টেস্টিস-নির্ধারক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে (Terao et al., 2022)। 
মানব ওয়াই-ক্রোমোজোমের অন্তর্ধান আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলেছে। সে ক্ষেত্রে মানুষ প্রজাতির কী হবে? আমাদের জানা আছে, কিছু সরিসৃপ জাতীয় প্রাণী, যেমন টিকটিকি ও সাপ পার্থেনোজেনেসিস নামে পরিচিত বিশেষ এক প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে শুধুমাত্র স্ত্রী-প্রজাতি তাদের নিজস্ব জিন থেকে ডিম্বাণু তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটি মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ঘটতে পারে না, কারণ ডিম্বাণু সক্রিয়করণ বা নিষিক্তকরণের জন্য প্রয়োজন উচ্চমাত্রায় ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি যার সংকেত আসে শুক্রাণু থেকে। এছাড়া, ভ্রূণ গঠনের অন্তঃনিষেক ও বহিঃনিষেক প্রকিয়ায় জড়িত নানা সংকেতও আসে শুক্রাণু থেকে। SRY, SOX9, AMH (anti-Mullerian hormone) ও ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর (FGF9) জিন তাদের মধ্যে অন্যতম, এবং তারা যথাক্রমে মানব ওয়াই-ক্রোমোজোম, ১৭ নং, ১৯ নং ও ১৩ নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত। মোদ্দাকথা, প্রজনন করার জন্য মানবসমাজে পুরুষদের প্রয়োজন, যার অর্থ হলো এই যে ওয়াই-ক্রোমোজোমের অন্তর্ধান মানব জাতির বিলুপ্তির সূচনা করতে পারে। মানুষ কী তাহলে নতুন লিঙ্গ নির্ধারণকারী জিন উদ্ভাবন করতে পারে? সেই রকম একটি বিকল্প সম্ভাবনাকেও বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। তবে, একটি নতুন লিঙ্গ-নির্ধারণকারী জিন কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। খুব সহজেই একটি সমাধান হতে পারে যদি SRY জিনটির একটি কপি অন্য যে কোনো অটোজোমে স্থানান্তরিত হয়। তবে, একটির পরিবর্তে টেস্টিস-নির্ধারক জিন SRY এর একাধিক কপি যদি বিভিন্ন অটোজোমে প্রতিস্থাপিত হয়, তাহলে পুরুষজাতি নানা  বিপদেও পড়তে পারে, এ বিষয়টিও অবহেলা করা যায় না। এছাড়া, স্তন্যপায়ী প্রাণিদের জীবিত পূর্বসূরি অস্ট্রেলিয়ার হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস প্রাণিদের মধ্যেও SRY জিন অনুপস্থিত (Wallis et al., 2008), কিন্তু তাদের ওয়াই-ক্রোমোজোম (পাঁচ জোড়া XY ক্রোমোজোম)গুলিতে পূরুষ-নির্ধারক জিন হিসেবে কাজ করে AMH জিন (Cortez et al., Nature, 2014) এবং অটোজোমে (১৫ নং ক্রোমোজোম) অবস্থিত SOX9 (Wallis et al., 2007)। পুরুষ ভ্রূণের কোষে SOX9 দ্বারা AMH সক্রিয় হয়। এর অভিব্যক্তি পুরুষ ভ্রূণে নারী প্রজনন নালীর বা মুলেরিয়ান নালী এর বিকাশকে বাধা দেয়, যার ফলে ফ্যালোপিয়ান টিউব ও জরায়ুর বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় (Rey et al., 2003)। কাজেই SRY জিনের বিকল্প হিসেবে FOX9 ও AMH জিন পুরুষ গোনাড সৃষ্টি করতে পারে। তবুও, পুরুষজাতির উৎকন্ঠা কাটে না। তাদের ললাটে যে দুঃখ নেমে এসেছে  তা খন্ডাবে কে? শেষমেশ ভরসা মলিক্যুলার বায়োলজি প্রযুক্তির ওপর। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি তো বিজ্ঞানীদের এখন নখাগ্রে, তাদের কাছে দুর্ভেদ্য বলে কোনো সংজ্ঞা নেই। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরও উন্নতি ঘটবে। কাজেই ওয়াই-ক্রোমোজোমের এই অসহায়ত্বে ডিএনএ প্রযুক্তিবিশারদগণ তাঁদের নিরলস সাধনায় কোনো একটি উপায় বের করবেনই।

লিঙ্গ-অনুপাত ও জেন্ডার সমতা

পৃথিবীব্যাপি লিঙ্গ-অনুপাত মেয়েদের দিকে ঝুঁকেছে। সম্ভবতঃ এর সঙ্গে নারীর সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতায়নের সম্পর্ক সম্পৃক্ত। সংখ্যার দিক থেকে সামগ্রিক ভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর এগিয়ে যাওয়া কি নির্দেশ করে যে, পুত্রসন্তানের তুলনায় কন্যাসন্তানের জন্মহার বেশি? তা বোধয় নয়, ক্ষীয়মাণ ওয়াই-ক্রোমোজোম-কেন্দ্রিক সে ঘণ্টা এখনও বাজেনি। জগতের মোট (৮ বিলিয়ন) জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে নারীদের তুলনায় তাৎপর্যহীনভাবে পুরুষরা (৫০.৩%) সামান্য এগিয়ে।  তবে, বাংলাদেশের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মোট ১৬.৫২ (১৬৫ মিলিয়ন) কোটি জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষের (৮.১৭ কোটি) চেয়ে নারী জনসংখ্যা (৮.৩৩ কোটি) বেশি (www.banglainsider.com/ আগস্ট ২, ২০২২)। পার্শ্ববর্তী ভারতেও একই ব্যতিক্রমী চিত্র ফুটে উঠেছে। সে ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকাতেও। এছাড়া, দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর গড় আয়ুও বেশি (৭৪.৯ বছর)। ব্যাপক পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, নগরায়ন এবং অন্যান্য সামাজিক পরিবর্তনের কারণে জন্মহারও কমেছে। 

পৃথিবীব্যাপি যখন জেন্ডার সমতায় দৃষ্টিপাত করা হচ্ছে তখন প্রকৃতিদত্ত ওয়াই-ক্রোমোজোমের ক্রমাগত খর্বাকৃতি হওয়ার বিষয়টি মানবসমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণ হতে বলা যায়, সমাজ-সভ্যতার বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সহাবস্থানের ফলেই সমাজের ভারসাম্য রক্ষা হয়। সভ্যতা বিকাশের পরিক্রমায় নারী-পুরুষের অবস্থান এবং ভূমিকাগত পরিবর্তন দেখা যায়, সাথে বদলায় দৃষ্টিভঙ্গিও। অনেক নারী এখন একান্তভাবে স্বামী-উপজীবিনী নন, তাঁরাও নিজ নিজ কর্মস্থলে খেটে অর্থাপার্জন করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ি দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ হচ্ছে নারী। অর্থাৎ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে. নারী-পুরুষ একত্রে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছেন। নারীর প্রতিই কেবল জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে প্রকৃত নারীবাদ তা বলে না, বরং কোন বিশেষ লিঙ্গকে প্রাধান্য না দিয়ে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নর-নারী উভয় গোষ্ঠীর প্রতি সংবেদনশীল হতে প্রকৃত নারীবাদ শিক্ষা দেয়। জেন্ডার সংবেদনশীলতা আচরণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের সর্বস্তরের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। শারীরিক ভিন্নতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের বিকাশ, সক্ষমতা প্রকাশে, স্বপ্ন ও চাহিদার স্বীকৃতি ও যথার্থ মূল্যায়ন পাবার দাবীদার (UN Women, 20 March 2020)। তাইতো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” এক্স- বা ওয়াই-ক্রোমোজোম জেন্ডার আইডেনটিটির নির্ধারক বটে, কিন্তু জেন্ডার অসাম্য নির্ধারণে কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে না। এই বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সমাজ ও সংস্কৃতি। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশসাধন প্রয়োজন। 

উপসংহার

ওয়াই-ক্রোমোজোম আকারে বেশ ছোটো, আকৃতিতে ও প্রকৃতিতে (বৈশিষ্ট্যে), এবং এদের জিনগুলি বড্ড একা, এদের এক্স-ক্রোমোজোমে কোনো জুটি নেই। তাই, তারা অস্বাভাবিক বিবর্তনীয় চাপের মধ্য দিয়ে সময় পার করে আসছে। কারণ, সমজাতীয় এক্স-ক্রোমোজোমের সাথে ওয়াই-ক্রোমোজোমের জেনেটিক উপাদানগুলিকে অদল-বদল করে সে চাপ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ারও উপায় নেই। পরিণতিতে, বিবর্তনীয় পথযাত্রায় ইতোমধ্যে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ-নির্দিষ্ট জিন হারিয়েছে। যেখানে এক্স-ক্রোমোজোম এখনও ৯০০টি জিন ধারণ করে, সেখানে ওয়াই-ক্রোমোজোমে আছে তো সবে ধন নীলমনি SRY ও তার সহযোগী কিছু জিন- সর্বমোট কার্যকরী মাত্র ৪৫টি। আগের সেই বলিষ্ঠ ও প্রাণশক্তিধারী ওয়াই-ক্রোমোজোম আর নেই, শুধু বর্তমান তাঁর ভগ্নবশেষ। যদিও আজ ভগ্নদশা দেখে তার বিগত সৌষ্ঠব বুজবার উপায় নেই। এসবের ওপরে আছে সর্বগুণান্বিতা নারীদের শক্তিশালী দুটো এক্স-ক্রোমোজোম, যদিও একটি এক্স-ক্রোমোজোমের বেশির ভাগ জিন-ই প্রকৃতিগতভাবে আচ্ছন্ন। ওয়াই-ক্রোমোজোমের হারিয়ে যাবার অর্থ কী সমাজ থেকে পুরুষ হারানো? সে আশংকা তো রয়েছেই- তবে অনেক বিজ্ঞানী কিছু আশাপ্রদ যুক্তিও দেখিয়েছেন। তাঁদের মতে যদি পুরুষরা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে মানুষও বিলুপ্ত হবে- কারণ, মানব জিনোমে অনেক মাতৃত্বের জিন রয়েছে যা কেবলমাত্র সক্রিয় হতে পারে ওয়াই-ক্রোমোজোমের জিন দ্বারা। তাই প্রজনন চালিয়ে যেতে মানব জাতিকে অবশ্যই পুরুষদের রক্ষা করতে হবে। তাঁদের মতে ওয়াই-ক্রোমোজম ছাড়া পুরুষজাতি বিলুপ্ত না হয়ে নতুন পুংলিঙ্গ নির্ধারণকারী জিন বিবর্তনের মাধ্যমেও হয়তো টিকে থাকতে পারবে। অন্ততঃ সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত দুটি ইঁদুর প্রজাতি আমাদের সে আশাই দেখাচ্ছে। অনেকের মতে, ক্রমহ্রাসমান এই ওয়াই-ক্রোমোজোমটির কৌলিন্য যা হারাবার হারিয়েছে, কিন্তু এখন তারা অনেক স্থিতিশীল হয়েছে, হয়তো সেটি চিরতরে হারিয়ে যাবে না। তবে, অনেক গবেষণায় এটা স্পষ্ট যে, ওয়াই ক্রোমোজোম সম্ভবপর দ্রুত বিবর্তনীয় অবনতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে, যদিও ফকির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কথায় বলতেই হয় সে তো “দূর অস্ত”।

তথ্যসূত্র:

  • Bachtrog D. Y-chromosome evolution: emerging insights into processes of Y-chromosome degeneration. Nat Rev Genet. 2013; 14 (2): 113-24.
  • Berta P, Hawkins JR, Sinclair AH, Taylor A, Griffiths BL, Goodfellow PN, Fellous M. Genetic evidence equating SRY and the testis-determining factor. Nature. 1990, 348 (6300): 448–50.
  • Carrel L, Willard HF. X-inactivation profile reveals extensive variability in X-linked gene expression in females. Nature. 2005; 434: 400–4.
  • Craig IW, Harper E, Loat CS. The genetic basis for sex differences in human behaviour: role of sex chromosomes. Ann Hum Genet. 2004; 68: 269–84. 
  • Czech D. P., Lee J., Sim H., Parish C. L., Vilain E., Harley V. R. The human testis-determining factor SRY localizes in midbrain dopamine neurons and regulates multiple components of catecholamine synthesis and metabolism. J. Neurochem. 2012; 122: 260–271.
  • Cortez D., Marin R., Toledo-Flores D., Froidevaux L., Liechti A., Waters P. D., et al. Origins and functional evolution of Y chromosomes across mammals. 2014. Nature 508: 488–493.
  • Davies W, Wilkinson LS. It is not all hormones: alternative explanations for sexual differentiation of the brain. Brain Res. 2006; 1126: 36–45.
  • Elzaiat M, McElreavey K, Bashamboo A. Genetics of 46, XY gonadal dysgenesis. Best Pract Res Clin Endocrinol Metab. 2022; 36(1): 101633.
  • Graves JA. Sex chromosome specialization and degeneration in mammals. Cell. 2006;124(5): 901-14.
  • Hughes JF, Skaletsky H, Pyntikova T, Minx PJ, Graves T, Rozen S, Wilson RK, Page DC. Conservation of Y-linked genes during human evolution revealed by comparative sequencing in chimpanzee. Nature. 2005; 437 (7055): 100-3.
  • Kashimada K, Koopman P. Sry: the master switch in mammalian sex determination. Development. 2010, 137 (23): 3921–30.
  • Koopman P, et al. A gene mapping to the sex-determining region of the mouse Y chromosome is a member of a novel family of embryonically expressed genes. Nature. 1990; 346: 245–50.
  • Kopsida E, Stergiakouli E, Lynn PM, Wilkinson LS, Davies W. The Role of the Y Chromosome in Brain Function. Open Neuroendocrinol J. 2009; 2: 20-30.
  • Lejbak L, Vrbancic M, Crossley M. The female advantage in object location memory is robust to verbalizability and mode of presentation of test stimuli. Brain Cogn. 2009; 69: 148–53. 
  • Lovell-Badge R, Robertson E. XY female mice resulting from a heritable mutation in the primary testis-determining gene, Tdy. Development. 1990; 109(3): 635-46.
  • Mayer A, Lahr G, Swaab DF, Pilgrim C, Reisert I. The Y-chromosomal genes SRY and ZFY are transcribed in adult human brain. Neurogenetics 1998; 1 (4): 281–288.
  • Rey R, Lukas-Croisier C, Lasala C, Bedecarrás P. “AMH/MIS: what we know already about the gene, the protein and its regulation”. Molecular and Cellular Endocrinology. 2003; 211 (1–2): 21–31.
  • Rosenfeld CS. Brain Sexual Differentiation and Requirement of SRY: Why or Why Not? Front Neurosci. 2017; 11: 632.
  • Sekido R, Lovell-Badge R. Sex determination involves synergistic action of SRY and SF1 on a specific Sox9 enhancer. Nature. 2008; 453 (7197): 930-4. 
  • Sinclair AH, Berta P, Palmer MS, et al. A gene from the human sex-determining region encodes a protein with homology to a conserved DNA-binding motif. Nature. 1990; 346: 240–4.
  • Skaletsky H, Kuroda-Kawagushi T, Minx PJ, et al. The male-specific region of the human Y chromosome is a mosaic of discrete sequence classes. Nature. 2003; 423: 825–37.
  • Terao M, Ogawa Y, Takada S, Kajitani R, Okuno M, et al. Turnover of mammal sex chromosomes in the Sry-deficient Amami spiny rat is due to male-specific upregulation of Sox9. Proc Natl Acad Sci U S A. 2022; 119(49): e2211574119.
  • UN Women, (20 March 2020). Five big wins ushered in by the landmark Beijing Platform for action. https://www.unwomen.org/en/news/stories/2020/3/.
  • Wallis MC, Delbridge ML, Pask A.J, Alsop AE, Grutzner F, et al.. Mapping platypus SOX genes; autosomal location of SOX9 excludes it from sex determining role. Cytogenet. Genome Res. 2007; 116: 232–234.
  • Wallis MC, Waters PD, Graves JA. Sex determination in mammals–before and after the evolution of SRY. Cell. Mol. Life Sci. 2008; 65: 3182–3195.

লেখক পরিচিতি

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক:  সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। 

C:\Users\Rawnaq\Desktop\Rawnaq Passport Size Picture.jpg
রওনক আরা পারভীন: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বাংলাদেশ।