হাছন রাজা: বাউলা কে বানাইলো রে

হাছন রাজা জাতি ধর্ম বর্ণের উপরে গিয়ে সঙ্গীত চেতনায় তুলে এনেছেন মরমী দর্শন। কেউ কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন বাউল বা বৈষ্ণব গোত্রীয় হিসেবে। কিন্তু হাছন দৌহিত্র দেওয়ান আজরফের মতে হাছন রাজা বাউল নয় বরং চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন, কেননা নিরাসক্ত জীবনাচার গ্রহণ করলেও তিনি সংসার ত্যাগী ছিলেন না।

বাউল গানের জগতে মুকুটহীন রাজা ছিলেন দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী। হাছন রাজার ধমনীতে জমিদারের রক্ত। হাতের কাছে ভোগের সকল সামগ্রী। বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। এই হাছন রাজা এক সময় সমস্ত ভোগ বিলাস উপেক্ষা করে অনাসক্ত জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে মজেছিলেন— বাউল মরমীবাদের ভাব দর্শনে। তাইতো এক সময় বাউল প্রেমে মগ্ন হয়ে হাছন গেয়েছেন…

বাউলা কে বানাইলো রে,
হাছন রাজারে বাউলা
কে বানাইলো রে ॥
বানাইলো বানাইলো বাউলা
তার নাম হয় যে মাওলা
দেখিয়া তার রূপের ঝলক
হাছন রাজা হইল আউলা ॥

হাছন রাজা ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার আলী রাজা চৌধুরী ও হুরমত জাহান বিবির ২য় পুত্র। দেওয়ান হাছন রাজা সিলেটের লক্ষণশ্রী পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে ২১ ডিসেম্বর, ১৮৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। নাজির আব্দুল্লাহ নামক একজন বিখ্যাত ফারসি ভাষাবিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শমতে তার নামকরণ করা হয় হাছন রাজা। পরবর্তীতে বহু দলিল দস্তাবেজে দস্তখত করেছেন আরবি অক্ষরে। অথচ হাছন রাজার পূর্বপুরুষ ছিল হিন্দু এবং আদি বসবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায়। অযোধ্যা থেকে তারা এসে পড়ে দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলার কাগদি গ্রামে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে হাছন রাজার দাদা বীরেন্দ্র চন্দ্র সিংহদেব (বাবু রায় চৌধুরী) সিলেটে পাড়ি জমান এবং এখানেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

দাদা বাবু রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর হাছন পিতা পিতৃ ও মাতৃবংশীয় সকল সম্পদের মালিক হন। এত অল্প বয়সে বিপুল বিত্তবৈভব হাতে পেয়ে হাছন হয়ে ওঠেন ভোগবিলাসী, শৌখিন ও কিছুটা বেপরোয়া। প্রথম যৌবনে নারী সম্ভোগে অক্লান্তি বোঝা যায় তারই রচনা থেকে—

‘হাছন রাজার অভিলাষ নারীর বাস শুঙ্গে
পেয়ারা চেহারার নারী পাইলে ঘষে অঙ্গে অঙ্গে’!

নারীর প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নারীর সংস্পর্শে আসার কথা জানা যায় অনেক লেখা থেকেই। হাসান দৌহিত্র অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জানান, ‘কবির ৪ জন পত্নী ছাড়াও ১৬ জন উপ-পত্নী ছিল।

হাছন পরিবারের উত্তরসূরি সাদিয়া চৌধুরী পরাগ ‘প্রেম বাজারে হাছন রাজা’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘জমিদার দেওয়ান হাছন রাজা যৌবনে বহু সুন্দরী নারীর শয্যাসঙ্গী হয়ে বহু সন্তান-সন্তানাদির জন্মদান করেছিলেন।’ (প্রসঙ্গ হাছন রাজা, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত। বাংলা একাডেমি ঢাকা। ১৯৯৮ পৃষ্ঠা ১৪৮)

কথিত আছে যে, দিন দিন ছেলের কর্মকাণ্ডে লজ্জিত হয়ে হাসন রাজার মা তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর জন্য নিজে অজ্ঞাত নাইওরী সেজে যাত্রা করেন এবং নিজেকে যৌনশিকার হিসেবে উপস্থাপন করেন। হাছন রাজা লজ্জায় তার মায়ের পায়ে ক্ষমা চেয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং এ পথ থেকে ফিরে আসেন। লোকমুখে শোনা যায়, মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি হাছন রাজার এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন-দর্শন তার জীবনদর্শন আমূল পরিবর্তন করে দেয়। হাছন রাজা যেমন ঘোর বুঝতে পেরে বলেছেন, ‘ও যৌবন ঘুমেরই স্বপন/ সাধন বিনে নারী সনে হারাইলাম মূলধন’। তেমন বহির্জগৎ-অন্তর্জগৎ মিলিয়ে প্রজারা যেনো দেখা পেলো তাদের অন্য এক রাজার। ভোগবিলাস ছেড়ে বেছে নিলেন চাকচিক্যবিহীন উদাসীন জীবন। 

একদিকে প্রজাদের খোঁজখবর রাখা থেকে শুরু করে নিজের বিষয়সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে অনেক স্কুল, ধর্মপ্রতিষ্ঠান, আখড়া স্থাপন করা শুরু করলেন। মরমীভাব ধারণ করে তৈরি করতে লাগলেন একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি। যেখানে জীবনবোধ- গান-নানামুখী দ্যোতনা একাকার হয়ে গেছে।

হাছন রাজা রচিত প্রায় ৫০০ গানের সব উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিছু তার নায়েব কর্মচারীরা সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন, কিছু গান প্রচলিত হয়েছে লোকমুখে, কিছু হারিয়ে গিয়েছে কালের স্রোতে।

হাছন রাজা জাতি ধর্ম বর্ণের উপরে গিয়ে সঙ্গীত চেতনায় তুলে এনেছেন মরমী দর্শন। কেউ কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন বাউল বা বৈষ্ণব গোত্রীয় হিসেবে। কিন্তু হাছন দৌহিত্র দেওয়ান আজরফের মতে হাছন রাজা বাউল নয় বরং চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন, কেননা নিরাসক্ত জীবনাচার গ্রহণ করলেও তিনি সংসার ত্যাগী ছিলেন না।

সুনামগঞ্জের তেঘরিয়ার রয়েছে হাছন রাজার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি যা বর্তমানে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এছাড়াও ‘মিউজিয়াম অফ রাজাস’ নামে সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘর। তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বই, নিজের হাতে লেখা পা-ুলিপিসহ তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য এখনো আপ্লুত করে দর্শনার্থীদের। দেশ বিদেশের দর্শনার্থীরা সেখানে প্রতিদিন ভিড় করে হাছন রাজার মাধ্যমে হয়তো মরমী দর্শনকে একটু ছুঁয়ে দেখতে চান। মৃত্যু তাকে এক সময় নিয়ে যায় মহাকালের অনন্ত অসীমের পথে। চারদিকে শোকের সুর।

মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে।
কান্দে হাছন রাজার মন ময়নারে॥
এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

মমতাজউদদীন আহমদ: বাংলাদেশী নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক

মমতাজউদদীন আহমদ (১৮ জানুয়ারি ১৯৩৫ – ২ জুন ২০১৯) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি নাট্যকার, অভিনেতা ও ভাষাসৈনিক। তিনি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজ ভাবনা

বাঙালিরর সামগ্রিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। বাংলা ও বাঙালীর সমাজ-সংস্কার থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কর্মপ্রবাহের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-চেতনা এক অবিচ্ছিন্ন...

টপ্পা গান কী, টপ্পা গানের উৎপত্তি, বাংলায় টপ্পা গান ও এর বিশেষত্ব

টপ্পা গান এক ধরনের লোকিক গান বা লোকগীতি যা ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই টপ্পা গান বলতে...

রিভিউ: বেগম রোকেয়ার উপন্যাসিকা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এবং কল্পনা ও বাস্তব

সুলতানা একরাতে তার শয়নকক্ষে বসে ছিল। অচেনা এক নারী তার কাছে এসে ভ্রমণের আহ্বান জানালে সে সাড়া দিয়ে বাইরে আসে এবং বিমূঢ়...
আরও পড়তে পারেন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

জীবনী: সুভাষ মুখোপাধ্যায়

বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একটি হলো "ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত"; এই উক্তিটি কার জানেন? উক্তিটি পশ্চিমবঙ্গের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের।...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here