বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২

বায়ুমণ্ডল কাকে বলে? বায়ুমণ্ডলের উপাদান কী কী এবং কোন উপাদানের পরিমাণ কত?

ভূ-পৃষ্ঠের চারপাশ যে বায়বীয় আবরণ দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তাকেই সহজ ভাষায় বলা হয় বায়ুমণ্ডল। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে বায়ুমণ্ডলের বয়স প্রায় ৩৫ কোটি বছর। এর গভীরতা প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বলতে পৃথিবীর চারপাশে ঘিরে থাকা বিভিন্ন গ্যাস মিশ্রিত স্তরকে বোঝায়, যা পৃথিবী তার মধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা ধরে রাখে। একে আবহমণ্ডল-ও বলা হয়। এটি সূর্য থেকে আগত অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব রক্ষা করে। এখানে বায়ুমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডলের উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হলো। বায়ুমণ্ডলের স্তর সম্পর্কে পড়তে ক্লিক করুন

বায়ুমণ্ডল কাকে বলে?

ভূ-পৃষ্ঠের চারপাশ যে বায়বীয় আবরণ দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তাকেই সহজ ভাষায় বলা হয় বায়ুমণ্ডল। আমরা জানি যে, সৌরজগতের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবী এবং মানুষ, প্রাণি অর্থাৎ জীবজগতের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য এই বায়ুমণ্ডল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উর্ধ্ব দিকে যে বায়বীয় আস্তরণ তাই বায়ুমণ্ডল নামে পরিচিত এবং এই মণ্ডলটি নানা প্রকার গ্যাসীয় উপাদান দ্বারা গঠিত। পৃথিবীর আকর্ষণে আকৃষ্ট হয়ে এ বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সঙ্গে আবর্তিত হচ্ছে। তবে বায়ুমণ্ডল কঠিন ভূমির সাথে সমানভাবে চলতে পারে না বরং কিছুটা পশ্চাতে পড়ে থাকে।

বায়ুমণ্ডলের গভীরতা

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে বায়ুমণ্ডলের বয়স প্রায় ৩৫ কোটি বছর। এর গভীরতা প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় এটাও উলেস্নখ করেন যে এই বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৭ শতাংশই ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৩০ কিলোমিটার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বায়ুমণ্ডলের একটির উপর আরেকটি পর্যায়ক্রমে অবস্থিত। সাধারণত উপরের স্তরের বায়ু নিচের বায়ুস্তরে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। বায়ুর এই চাপের জন্যই পৃথিবীপৃষ্ঠ হতে যত উপরে উঠা যায়, বায়ুর ঘনত্ব ততই কমতে থাকে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠে এই বায়ুচাপের ঘনত্ব সব থেকে বেশি দেখা যায়।

বায়ুমণ্ডলের উপাদান

পৃথিবীপৃষ্ঠ ও তার চারদিক জুড়ে বায়ুমণ্ডল বেষ্টিত। এই মণ্ডল নানা রকমের গ্যাসের মিশ্রণে গঠিত হয়েছে। এই গ্যাসীয় মিশ্রণ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ৮০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত প্রায় সমান। বায়ুমণ্ডলে আরও রয়েছে অসংখ্য ধূলিকণার সংমিশ্রণ। এই সব কঠিন ও তরল কণিকাকে একত্রে বলা হয় রঞ্জক পদার্থ (Aerosols)। বায়ুমণ্ডলের বর্ণ, গন্ধ, আকার কিছুই নেই। তাই বায়ুমণ্ডলের এই সব উপাদান স্বাভাবিক অবস্থায় অনুভব করা যায় না। সুতরাং বায়ুমণ্ডলের উপাদান বলতে বিভিন্ন প্রকার গ্যাস, জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা ও কণিকার সংমিশ্রণকে বুঝায়।

ভূ-পৃষ্ঠের চারপাশ যে বায়বীয় আবরণ দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে তাকেই সহজ ভাষায় বলা হয় বায়ুমণ্ডল।

বায়ুমণ্ডলের গঠনকারী উপাদানসমূহ

বায়ুমণ্ডল বিভিন্ন প্রকারের গ্যাসীয় উপাদান দ্বারা গঠিত। বিশুদ্ধ ও শুষ্ক বায়ুর প্রধান দুইটি উপাদানের নাম নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। এই দুটি গ্যাস একত্রে মিলে বায়ুমণ্ডলের ৯৮.৭৩ শতাংশ জায়গা জুড়ে আছে এবং বাকি ১.২৭ শতাংশ জায়গা জুড়ে আছে অন্যান্য গ্যাসীয় উপাদান। এই ১.২৭ শতাংশ জায়গা জুড়ে থাকা গ্যাসীয় উপাদানগুলো হলো নিষ্ক্রিয় গ্যাস যেমন- ওজোন, জেনন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্রিপটন, হিলিয়াম, নিয়ন ইত্যাদি।

বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদানের নাম, পরিমাণ ও শতকরা হার

আয়তন হিসেবে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদানসমূহের একটি তালিকা দেয়া হলো—

বিভিন্ন গ্যাস বা বায়ুমণ্ডলের উপাদানের নামপরিমাণ শতকরা হার
নাইট্রোজেন (N2)৭৮০,৮৪০ পিপিএমভি (৭৮.০৮৪%)
অক্সিজেন (O2)২০৯,৪৬০ পিপিএমভি (২০.৯৪৬%)
আর্গন (Ar)৯,৩৪০ পিপিএমভি (০.৯৩৪০%)
কার্বনডাইঅক্সাইড (CO2)৩৯৭ পিপিএমভি (০.০৩৯৭%)
নিয়ন (Ne)১৮.১৮ পিপিএমভি (০.০০১৮১৮%)
হিলিয়াম (He)৫.২৪ পিপিএমভি (০.০০০৫২৪%)
মিথেন (CH4)১.৭৯ পিপিএমভি (০.০০০১৭৯%)
ক্রিপ্টন (Kr)১.১৪ পিপিএমভি (০.০০০১১৪%)
হাইড্রোজেন (H2)০.৫৫ পিপিএমভি (০.০০০০৫৫%)
নাইট্রাস অক্সাইড (N2O)০.৩২৫ পিপিএমভি (০.০০০০৩২৫%)
কার্বন মনোক্সাইড (CO)০.১ পিপিএমভি (০.০০০০১%)
জেনন (Xe)০.০৯ পিপিএমভি (৯×১০−৬%) (০.০০০০০৯%)
ওজন (O3)০.০ থেকে ০.০৭ পিপিএমভি (০ থেকে ৭×১০−৬%)
নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2)০.০২ পিপিএমভি (২×১০−৬%) (০.০০০০০২%)
আয়োডিন (I2)০.০১ পিপিএমভি (১×১০−৬%) (০.০০০০০১%)
অ্যামোনিয়া (NH3)ট্রেস গ্যাস
উপর্যুক্ত শুষ্ক বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান না:
জলীয় বাষ্প (H2O)~০.২৫% সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডলের ভর দ্বারা, স্থানীয়ভাবে ০.০০১%–৫%
পিপিএমভি: প্রতি মিলিয়নে কণা পরিমাণ অনুসারে (note: volume fraction is equal to mole fraction for ideal gas only, see volume (thermodynamics))

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা খুব সামান্য (০.০৩ শতাংশ) হলেও এই গ্যাসীয় উপাদান বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কার্বন ডাই-অক্সাইড সূর্য থেকে আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গের আলোক রশ্মিকে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করে। পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রতিফলিত এ জলবায়ু বিকিরিত আলোক রশ্মি ক্ষুদ্র তরঙ্গ থেকে দীর্ঘ তরঙ্গে পরিণত হয়। কার্বন ডাই-অক্সাইড এই দীর্ঘ তরঙ্গ রশ্মিকে শুষে নেয় বলেই বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে উঠে। মূলত নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন ছাড়া অন্যান্য গ্যাসীয় উপাদানসমূহকে বায়ুর কৃত্রিম বা অশুদ্ধ উপাদান বলা হয়। এই সকল কৃত্রিম বা অশুদ্ধ উপাদান সূর্যতাপ, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বায়ুমণ্ডলের এই কৃত্রিম বা অশুদ্ধ উপাদানসমূহ মেঘ, কুয়াশা সৃষ্টি, সৌরতাপ বন্টনে ভূমিকা রাখে ও অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীর জীবজগতের প্রাণ রক্ষায় গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সারসংক্ষেপ

ভূ-পৃষ্ঠের চারপাশ যে বায়বীয় আবরণ দ্বারা বেষ্টিত আছে তাকে বায়ুমন্ডল বলে। বায়ুমণ্ডলের বয়স প্রায় ৩৫ কোটি বছর এবং গভীরতা প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার। বায়ু

একটির উপর আরেকটি স্তর আছে। ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি বা সমুদ্রপৃষ্ঠে এই বায়ুচাপের ঘনত্ব বেশি ও উর্ধ্বদিকে এই ঘনত্ব কমতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের উপাদান মূলত বিভিন্ন প্রকার গ্যাস, জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা ও কণিকার সংমিশ্রণ। বায়ুমণ্ডলের এই সব গ্যাসীয় উপাদানের মধ্যে শুদ্ধ উপাদান হলো অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন, বাকী উপাদান হলো কৃত্রিম বা অশুদ্ধ উপাদান। এই সব গ্যাসীয় উপাদান, জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা ও কণিকাসমূহ বায়ুমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।

অর্থনীতি কাকে বলে? অর্থনীতির সংজ্ঞা, পরিধি বা বিষয়বস্তু কী?

অর্থনীতির ইংরেজি হলো 'ইকোনোমিকস' (Economics); এই ইকোনোমিকস শব্দটি গ্রিক...