০৫:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিবর্তনের ধারায় বুদ্ধিমত্তার ক্রমবিকাশ– মস্তিষ্কের মহাযাত্রা

বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে মানুষের মস্তিষ্ক কোনো হঠাৎ সৃষ্টি নয়—এটি কোটি বছরের অভিযোজন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং জৈবিক পরিবর্তনের ফল। পাখি, প্রাইমেট এবং অন্যান্য প্রাণীর সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়, বুদ্ধিমত্তা একটিমাত্র সরল পথে বিকশিত হয়নি; বরং ভিন্ন ভিন্ন বিবর্তনীয় পথে জটিল স্নায়বিক কাঠামো ও জ্ঞানীয় ক্ষমতা গড়ে উঠেছে।

মানুষের বুদ্ধিমত্তা কি হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি এটি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল? পৃথিবীর প্রাণীজগতে মস্তিষ্কের বিকাশ একটি দীর্ঘ ও বিস্ময়কর যাত্রা—যেখানে পরিবেশ, সামাজিক জীবন এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম মিলে তৈরি করেছে জটিল স্নায়বিক কাঠামো। এই অভিযোজনের পথে পাখি, অক্টোপাস, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্ক ভিন্ন ভিন্ন পথে বিকশিত হয়েছে। আধুনিক মানুষের অসাধারণ জ্ঞানীয় ক্ষমতার পেছনে রয়েছে সেরিব্রাল কর্টেক্সের বিস্তার, নিউরনের ঘন সংযোগ এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।


সারাংশ: প্রাণীজগতে বুদ্ধিমত্তা মানেই মানুষের মতো হওয়ার কোনো সরল পথে অগ্রগতি নয়। এটি মূলত পরিবেশগত, সামাজিক এবং খাদ্যাভ্যাসের চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য জটিল মস্তিষ্কের একটি বৈচিত্র্যময়, অভিসারী/কনভার্জেন্ট বিবর্তন। এই বিবর্তন ঘটেছে একাধিকবার এবং স্বাধীনভাবে। অর্থাৎ, সেফালোপড (অক্টোপাসের মতো), পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, বা প্রাইমেট (বানর জাতীয়) —একে অপরের সাথে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, একই ধরনের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে (যেমন- হাতিয়ার ব্যবহার বা নেভিগেশন) এরা ভিন্নভাবে একই ধরনের উচ্চ বুদ্ধি অর্জন করেছে। বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য একরকম, আবার অক্টোপাস বা কাকের জন্য অন্যরকম। পরিবেশে টিকে থাকার স্বার্থে তাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা সেভাবেই উন্নত হয়েছে। বুদ্ধিমত্তা শুধু মস্তিষ্কের আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং মস্তিষ্কের নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলো কতটা ঘন এবং কতটা সুশৃঙ্খলভাবে একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে, তার ওপর নির্ভর করে।


মূল শব্দ: মস্তিষ্ক, সেরিব্রীয়/সেরিব্রাল কর্টেক্স, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, সেরিব্রীয় টর্ক, নিউরোসায়েন্স, মানব বিবর্তন, কনভার্জেন্ট বিবর্তন


বিবর্তন প্রাণীজগতজুড়ে এক বৈচিত্র্যময়, জটিল মন তৈরি করেছে, যা প্রমাণ করে যে বুদ্ধিমত্তা কেবলই মানব-কেন্দ্রিক শিখর নয় বরং পরিবেশগত চাপ দ্বারা গঠিত অভিযোজনের একটি পরিসর। প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা একবার নয়, বরং একাধিকবার স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রাণীজগতের বিভিন্ন বংশধারায় জটিল মস্তিষ্ক এবং উচ্চ-স্তরের জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে। যদিও মৌলিক স্নায়ুতন্ত্রের আবির্ভাব অনেক আগেই হয়েছিল, তবে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ –  যেমন মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক–  উদ্ভূত হয়েছিল প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে, যখন বিশেষায়িত জটিল উচ্চ-স্তরের বুদ্ধিমত্তা দুটি ভিন্ন পথে (যেমন, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদের মধ্যে) স্বাধীনভাবে  বিকশিত হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সহযোগী নার্ভীয়/নিউরোনাল নেটওয়ার্ক রয়েছে।

পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী-ছাড়াও কিছু পোকামাকড়ের গ্রুপ (যেমন ব্লাটয়েড, ডিপ্টেরান, হাইমেনোপ্টেরান), অক্টোপাস প্রাণীদের মধ্যে, কিছু মাছ প্রজাতির মধ্যে (যেমন সিচলিড) উচ্চ-স্তরের বুদ্ধিমত্তা অবিচ্ছিন্নভাবে বহুমুখী কেন্দ্রের সাথে আবদ্ধ থাকে। যেমন অক্টোপাস মস্তিষ্কের উল্লম্ব/ভার্টিক্যাল লোব একটি উচ্চ মানের সমন্বিত কেন্দ্র, যা চাক্ষুস শিক্ষা, স্মৃতি অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার জন্য দায়ী। এটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের অনুরূপ। যদিও প্রাণীজগত জুড়ে কোনও না কোনও ধরনের বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান, তবে এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র পাখি এবং মানব বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক কী?

মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক (প্রোজেনসেফালন) মস্তিষ্কের সবচেয়ে অগ্রগামী, অত্যন্ত বিকশিত একটি জটিল অংশ, যা উচ্চতর বৌদ্ধিক, আবেগগত এবং সংবেদনশীল কার্য  (দৃষ্টি, ঘ্রাণ) পরিচালনা করে। এটি টেলেন্সেফালন (সেরেব্রাম) এবং ডায়েন্সেফালন (থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস)-এ বিভক্ত।  টেলেন্সেফালন অংশে  সেরিব্রাল/সেরিব্রীয় কর্টেক্স (অথবা অ-স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে প্যালিয়াম) অন্তর্ভুক্ত থাকে, এবং ডাইন্সেফালন অংশে (মস্তিষ্কের নীচে অবস্থিত) অন্তর্ভুক্ত থাকে থ্যালামাস (রিলে স্টেশন) এবং হাইপোথ্যালামাস (যা শরীরের তাপমাত্রা, ঘুম-জাগরণ চক্র, ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে)। বিবর্তনের সময় অগ্রমস্তিষ্ক অনেক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে গেছে। এটি সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত একটি মৌলিক কাঠামোগত পরিকল্পনা (প্যালিয়াল অঞ্চলসহ) যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত রয়েছে, ল্যাম্প্রে (প্রাচীন, চোয়ালবিহীন, বাইন-মাছের মতো পরজীবী মাছ) থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত। প্রাথমিক বিকাশের সময়, অগ্রমস্তিষ্কটি একটি অগ্রবর্তী নিউরাল টিউবের অংশ হিসেবে শুরু হয়, যা পরবর্তীতে প্রসারিত হয়ে মানব মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিশাল কাঠামো তৈরি করে।

প্রাইমেটদের সেরিব্রাম স্তন্যপায়ী প্রাণীদের থেকে কি আলাদা?

সেরিব্রাম হলো মস্তিষ্কের বৃহত্তম অংশ যা মূলত পাঁচটি লোবে বিভক্ত (ফ্রন্টাল, প্যারিয়েটাল, টেম্পোরাল, অক্সিপিটাল এবং ইন্সুলার লোব), যখন সেরিব্রাল কর্টেক্স হলো পাতলা (প্রায় ৩ মিমি পুরু), কুঁচকানো বাইরের স্তর যা সেরিব্রামকে আবৃত রাখে। প্রাইমেট হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি উচ্চতর গোষ্ঠী, যার মধ্যে রয়েছে মানুষ, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, অন্যান্য বানর, লেমুর এবং টারসিয়ার। মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষের রয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃহত্তর মস্তিষ্ক, উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতা এবং জটিল ব্যাকরণগত ভাষা, সে কারণেই মানুষ এক অনন্য সৃষ্টি। স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে একটি অত্যন্ত জটিল, দ্বিপাক্ষিক স্নায়ুতন্ত্র রয়েছে যা দুটি প্রধান উপাদানে বিভক্ত: তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য ‘কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র’ (মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকাণ্ড) এবং শরীরের সাথে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগের জন্য পার্শ্বীয় বা ‘পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্র’। এছাড়াও রয়েছে স্বয়ংক্রিয় সমবেদী (সিমপ্যাথেটিক) ও পরাসমবেদী (প্যারাসিমপ্যাথেটিক) স্নায়ুতন্ত্র এবং আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র। স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র এবং আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র গঠনগতভাবে পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্রের অংশ হলেও, এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, বিশেষ করে হাইপোথ্যালামাস এবং ব্রেনস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিবর্তনের সময়, মানব সেরিব্রীয় কর্টেক্স প্রাইমেটদের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক নিউরন (১৬ বিলিয়ন) অর্জন করেছে, যা মানব বুদ্ধিমত্তার অন্তর্নিহিত একটি বড় অর্জন বলে মনে করা হয়। বিপরীতে, শিম্পাঞ্জির সেরিব্রীয় কর্টেক্সে ৮ বিলিয়ন নিউরন, ম্যাকাক কর্টেক্সে (পুরাতন বিশ্বের বানর) প্রায় ১.৭ বিলিয়ন, মারমোসেট (নতুন বিশ্বের বানর) কর্টেক্সে ০.২৪৫ বিলিয়ন এবং ইঁদুর কর্টেক্সে মাত্র ০.০১৪ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে (দেখুন চিত্র ১)। অতএব, মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার জন্য, একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ ছিল ১৬ বিলিয়ন নিউরন এর একটি সেরেব্রীয় কর্টেক্স তৈরি করা।

স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

প্রাইমেটদের সেরিব্রাম অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা, যা আনুপাতিকভাবে মস্তিষ্ক-শরীরের অনুপাতে বেশ বড়, রয়েছে উচ্চ নার্ভীয় ঘনত্ব ও উন্নত সংযোগ, এবং এটি অত্যন্ত ভাঁজ করা একটি অঞ্চল, যার ফ্রন্টাল, প্যারিয়েটাল এবং অক্সিপিটাল (ভিজ্যুয়াল) কর্টেক্স উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত। এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো, বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্সে, জটিল সামাজিক আচরণ, হাতিয়ার ব্যবহার এবং উন্নত দৃষ্টিশক্তির (বিপরীতে স্তন্যপায়ী প্রাণী গন্ধের উপর নির্ভরশীল) মতো উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতাগুলোকে সহজতর করে। 

হোমো প্রজাতির মধ্যে সেরিব্রীয় কর্টেক্সের বিবর্তন:

আমাদের আধুনিক মানব হয়ে ওঠার পেছনে যেসব বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছে তা নিহিত আছে আমাদের সেরিব্রীয় কর্টেক্সে। মস্তিষ্কের সেরিব্রীয় কর্টেক্স হল আমাদের অনন্য জ্ঞানীয় ক্ষমতার জৈবিক স্তর, যার মধ্যে রয়েছে স্মৃতি, বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং উন্নত  ভাষা। হোমো প্রজাতিগুলোর (যেমন হোমো হ্যাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ান্ডারথ্যালেনসিস, হোমো হাইডেলবার্গেনসিস, হোমো নালেডি এবং হোমো স্যাপিয়েন্স) সেরিব্রীয়  কর্টেক্সের বিবর্তন, যা প্রায় ২০ লক্ষ বছর ধরে চলে আসছে, তা নাটকীয়ভাবে আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে, জটিল ভাঁজ (জাইরিফিকেশন) সৃষ্টির মাধ্যমে এক বর্ধিত স্নায়ুসংযোগের পুনর্গঠন করেছে। প্রিফ্রন্টাল, পশ্চাদবর্তী প্যারিয়েটাল এবং পার্শ্বীয় টেম্পোরাল অঞ্চলে বিশেষায়িত সম্প্রসারণসহ নিওকর্টেক্স মোট মস্তিষ্কের আয়তনের প্রায় ৪০% জুড়ে রয়েছে, যা বিমূর্ত চিন্তাভাবনা এবং ভাষার মতো উন্নত জ্ঞানীয় কার্যগুলোকে সহজতর করেছে। এখানে লক্ষণীয়, হোমো প্রজাতিদের মধ্যে মূল বিবর্তনীয় প্রবণতা ছিল তাদের কর্টেক্সের দ্রুত আয়তন বৃদ্ধি। হোমো হ্যাবিলিস-এর মস্তিষ্কের আয়তন  (যারা২৪ লক্ষ থেকে ১৪ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় বাস করতো) ৬০০-৭০০ সিসি থেকে হোমো ইরেক্টাস এর (যারা আফ্রিকায় উদ্ভূত হয়ে ইউরেশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল) ৯০০-১১০০ সিসি কর্টেক্সের মধ্য দিয়ে আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্স-এ  বৃদ্ধি পেয়েছে ঢের, ১৩৫০-১৪৫০ সিসি, যা মূলত কর্টেক্সের পৃষ্ঠের বৃদ্ধির মাধ্যমেই ঘটেছে।

বিশেষ করে, একটি অঞ্চলের কথা না বললেই নয় যা আমাদের, অর্থাৎ আধুনিক মানবকে ইউনিক করে তুলেছে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে সম্প্রসারণের সময় ভাষা উৎপাদন-সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা ব্রোকা’র অঞ্চল (ফরাসি বিজ্ঞানী পল ব্রোকা-র  নাম অনুসারে) হিসেবে পরিচিত (দেখুন ছবি ২)। এই ব্রোকার ক্ষেত্রটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল, যার পূর্বসূরি নিউরো-অ্যানাটমিক কাঠামো সম্ভবত ৫ মিলিয়ন (৫০ লক্ষ) বছর আগে প্রাথমিক হোমিনিডদের মধ্যে উদ্ভূত হয়েছিল। তবে, মানুষের মতো এর সংগঠন সম্ভবত প্রাথমিক হোমো প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ বছর আগে স্থায়ী হয়েছিল, এবং প্রাচীন মানুষ (হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস) এবং আধুনিক মানব (হোমো স্যাপিয়েন্স) মস্তিষ্কের আকার আবির্ভূত না হওয়া পর্যন্ত এর কাঠামোগত পরিমার্জন আরও অব্যাহত ছিল।

সেরিব্রীয় কর্টেক্সের পুরুত্ব কি মানুষের বুদ্ধিমত্তার নির্দেশক?

আগেই উল্লেখ করেছি, মানব সেরিব্রীয় কর্টেক্স ছয়টি স্বতন্ত্র কার্যকরী নার্ভীয় স্তর দ্বারা গঠিত, যা নিওকর্টেক্স বা আইসোকর্টেক্স নামে পরিচিত। এই ছয়-স্তরযুক্ত কাঠামোটি বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাভাবনা, ভাষা এবং স্মৃতির মতো উচ্চ-ক্রমের জ্ঞানীয় কার্যাবলীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের পুরুত্ব (ব্যক্তিভেদে ১ থেকে ৪.৫ মিমি হতে পারে) এবং নার্ভীয় ঘনত্ব মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধিৎসু মন গবেষণা করেছে প্রায় ৫০ বছর এবং এর উত্তর মিলেছে ইতিবাচক। কর্টেক্সের পুরুত্ব জিনগত তো বটেই, তবে এর বিকাশের গতি এবং পরিপক্কতাও হচ্ছে বিশেষ ফ্যাক্টর। যেমন, মানবশিশু জন্মের সময় এটি, বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল এবং টেম্পোরাল অঞ্চলে, তুলনামূলকভাবে সরু হয় (তখন স্নায়ুকোষের সংখ্যা থাকে ১০ – ১২ বিলিয়ন), শৈশবকালে (৯-১১ বছর বয়স পর্যন্ত) স্নায়ুসন্ধি বা সিন্যাপ্স, ডেনড্রাইটগুলোর শাখা প্রসারণ এবং নিউরনের আকার বৃদ্ধির কারণে কর্টেক্স দ্রুত পুরু হয়, যেখানে জন্মগত মান থেকে স্নায়ুকোষের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬০-৭৮% বেশি এবং বয়ঃসন্ধিকালে/প্রাথমিক প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় উদ্বৃত্ত অব্যবহৃত সংযোগ ছাঁটাই করে এটি আবারো পাতলা (১৪-১৬ বিলিয়ন কোষ) হতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে সেটি ধীরে ধীরে বয়ঃবৃদ্ধকালে আরও হালকা হতে থাকে, যদিও নিউরনের সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে (১৫-১৬ বিলিয়ন), কমে আসে নিউরনের শাখা-প্রশাখাগুলো। আবারো পাতলা হওয়ার কারণ হলো এই অঞ্চলে যেসব উদ্বৃত্ত অব্যবহৃত সংযোগ (সিন্যাপ্স এবং ডেনড্রাইট) রয়েছে, সেগুলোকে ছাঁটাই  করা হয়। এছাড়া, অতিরিক্ত– সংযোগ ধরে রাখা মস্তিষ্কের পক্ষে বিপাকীয়ভাবে ব্যয়বহুলও বটে, তাই বাড়তি নিউরন এবং তাদের সংযোগগুলোর ছাঁটাই বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। কর্টেক্স যে গতিতে পরিপক্ক হয়–  বিশেষ করে ঘনীভূত এবং পাতলা হওয়ার সময়–  তার উপর নির্ভর করে আমাদের বুদ্ধিমত্তা। ছেলেবেলায় কর্টেক্স ঘন ও পুরু হওয়ার কারণ সেখানে নিউরনের উচ্চ ঘনত্ব বা আরও জটিল ডেনড্রাইটগুলোর শাখা বিরাজমান, যা জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াকরণের গতি বাড়ায় এবং দ্রুত শিখতে সক্ষম করে; সেকারণেই, শিশুকাল ও কৈশোর-ই (৮-থেকে ১৬ বছর) হচ্ছে শেখার মূল বয়স ।

মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স/লোব-ই কি মানুষকে অনন্য করে তুলেছে?

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের বৃহত্তর ফ্রন্টাল লোবের একটি বিশেষ উপসেট, যা উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় কাজ, পরিকল্পনা এবং ব্যক্তিত্বের জন্য দায়ী নির্দিষ্ট অগ্রভাগ (দেখুন ছবি ২ )। মানুষ ছাড়াও, এটি সমস্ত প্রাইমেট ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত থাকে, তবে বিগত পাঁচ লক্ষ বছরের বিবর্তনে অন্যান্য প্রাইমেটদের তুলনায় মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের অসাধারণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রসারণ, বর্ধিত স্নায়ু সংযোগ এবং উন্নত নিউরোঅ্যানাটমিক্যাল পুনর্গঠন মানুষের মস্তিষ্ককে বিশেষায়িত করেছে, জ্ঞানীয় প্রজ্ঞা ও গভীর উপলব্ধিবোধে আমাদের স্বতন্ত্র করেছে। গত ২০ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ব্যবধানে, মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বিস্ময়করভাবে আয়তনে শিম্পাঞ্জির তুলনায় ৪.৫ গুণ বড় হয়েছে, যেখানে শিম্পাঞ্জির মাত্র ১৩৭ মিলিয়ন নিউরন এবং মানুষের এই অঞ্চলে এসে দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন স্নায়ুকোষে। 

মস্তিষ্কের টর্ক (brain torque) কি মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পর্কিত?

মস্তিষ্কের টর্ক বা সেরিব্রীয় টর্ক (যা ইয়াকোলেভিয়ান টর্ক নামেও পরিচিত), হলো মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের সামান্য মোচড়  বা ঘূর্ণন (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে- বামাবর্ত), যেখানে মস্তিষ্কের ডান দিকটি সামান্য সামনের দিকে এবং বাম দিকটি সামান্য পিছনের দিকে বাঁকা থাকে (দেখুন ছবি ৩)। অর্থাৎ এটি ফ্রন্টাল লোব এবং প্যারিয়েটো-অক্সিপিটাল লোবের ডান-বাম অসামঞ্জস্যের বাস্তবতাকে বোঝায়। এই মোচড় বা ঘূর্ণনটি একটি অনন্য মানব বৈশিষ্ট্য, যা প্রাইমেট গ্ৰুপের কোনো প্রজাতির মধ্যে, এমনকী শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও দেখা যায় না। এটি উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় এবং ভাষাগত দক্ষতার সাথে জড়িত। এটি শুধুমাত্র হোমিনিড পরিবারের একটি  বিবর্তনীয় অভিযোজন বলেই ধরে নেয়া হয়। এটি আধুনিক মানুষের বেঁচে থাকা এবং জ্ঞানীয় ক্ষমতা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষাগত অর্জন এবং বিভিন্ন স্নায়বিক/মানসিকব্যাধিসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে ‘মস্তিষ্ক টর্ক’-এর একটি জিনগত লিংক রয়েছে। যদিও মস্তিষ্কের আকার (আয়তন) সাধারণত বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পর্কিত, কিন্তু মস্তিষ্কের টর্ক-ও মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বাধীনভাবে জড়িত- বিজ্ঞানীদের সেরকমই মতামত। ‘মস্তিষ্ক টর্ক’ ছাড়াও মস্তিষ্কের আরও একটি অংশ ‘প্ল্যানাম টেম্পোরাল/পিটি ‘ (planum temporale), যা মস্তিষ্কের সুপিরিয়র টেম্পোরাল লোবের একটি অত্যন্ত অসমমিত কর্টেক্স এলাকা। মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধে ১টি করে এর অবস্থান এবং এটি একটি মূল শ্রবণ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র যা ভাষা বোধগম্যতা এবং শ্রবণ প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধের  তুলনায় বাম ‘পিটি’-তে অ্যাক্সন এবং ডেনড্রাইটের ঘনত্ব বেশি (বর্ধিত নিউরাইট ঘনত্ব) থাকায় এটি প্রায় ৪০% বড়। 

পাখি এবং প্রাইমেটদের জ্ঞানীয় ক্ষমতার অভিসারী/কনভার্জেন্ট বিবর্তন:

পাখি এবং প্রাইমেট মস্তিষ্ক একটি অসাধারণ অভিসারী বিবর্তন প্রদর্শন করে, যেখানে পূর্বপুরুষদের ভিন্নতা সত্ত্বেও পাখিরা স্বাধীনভাবে উচ্চ বুদ্ধিমত্তা এবং অনুরূপ স্নায়বিক কাঠামো বিকাশ করে। পাখি (কাক, তোতাপাখি) এবং প্রাইমেট উভয়েরই মস্তিষ্কে ঘনবসতিপূর্ণ নিউরন থাকে, বিশেষ করে অগ্রমস্তিষ্ক/প্যালিয়ামে, যা অনেক ছোট পরম মস্তিষ্কের আকার থাকা সত্ত্বেও, হাতিয়ার ব্যবহার, সামাজিক জটিলতা এবং কণ্ঠ শিক্ষার মতো তুলনামূলক জ্ঞানীয় কৃতিত্ব পাখিরা অর্জন করেছে। পাখি এবং স্তন্যপায়ী/প্রাইমেট প্রাণীরা স্বাধীনভাবে ভিন্ন বিবর্তনীয় পথ অনুসরণ করেছে বটে, কিন্তু পাখিরা তাদের বুদ্ধিমত্তা প্রকাশে একটি বিশেষ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর মতো অগ্রমস্তিষ্কের বিকাশ ঘটিয়েছে। স্তন্যপায়ী নিওকর্টেক্সের কার্যকরী সমতুল্য পাখিদের এই অঞ্চলটি হলো অগ্রমস্তিষ্ক বা “প্যালিয়াম”, যা উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় ফাংশন, স্মৃতি এবং সংবেদনশীল প্রক্রিয়াকরণ পরিচালনার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। যদিও মানুষের উন্নত বিমূর্ত যুক্তি এবং প্রতীকী ভাষা রয়েছে, পাখিরা অসাধারণ সমস্যা সমাধান, সরঞ্জাম ব্যবহার এবং সামাজিক বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করে, কখনও কখনও বানর বা ছোট বাচ্চাদের মতো। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ তাদের ছয়-স্তরযুক্ত নিওকর্টেক্সের কাঠামো না থাকা সত্ত্বেও, তারা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো উচ্চ-স্তরের জ্ঞানের জন্য একই ধরনের নিউরন এবং নেটওয়ার্ক-সংযোগ ব্যবহার করে, এবং তাদের এই দ্রুত নার্ভীয় প্রক্রিয়াকরণটি ঘটে উচ্চ তাপমাত্রায় (৪০-৪২ ° সে:), যেখানে মানুষের মস্তিষ্কে থাকে ৩৭° সে: থেকে ৩৯.৫° সে:। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিশেষ কিছু পাখি, যেমন করভিড গ্রুপ (কাক পাখির গোত্র), সিটাসিড/Psittacid (প্যারোট গোত্র) এবং কাকাটিড/Cacatuid গ্রুপ (তোতাপাখি) প্রাইমেটদের মতো বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তাদের অগ্রমগজে (উচ্চতর জ্ঞানের জন্য দায়ী যে এলাকা) উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনবসতিপূর্ণ নিউরন থাকে এবং এরা উচ্চ-স্তরের নেটওয়ার্ক-সংযোগ ব্যবহার করে। ড. আইরিন পেপারবার্গ এর গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, গ্রিফিন নামের একটি আফ্রিকার (কঙ্গো) ধূসর তোতাপাখি একটি ভিজ্যুয়াল/দৃষ্টিলব্ধ ওয়ার্কিং মেমরি পরীক্ষায় হার্ভার্ড স্নাতকদের ছাড়িয়ে গেছে।  এছাড়া, এন’কিসি (N’kisi) নামক একটি আফ্রিকীয় ধূসর তোতাপাখির শব্দভাণ্ডারে প্রায় ৯৫০টি ইংরেজি শব্দ সঞ্চিত রয়েছে (২০০৪ সালের তথ্য), যা তার চিত্তাকর্ষক ইংরেজি ব্যবহারের দক্ষতার জন্য বিখ্যাত, এবং আশ্চর্য্যের বিষয়, তার পরিবেশের উপর ভিত্তি করে সে কথোপকথন শুরু করতে সক্ষম। তাই এই পাখিটিকে প্রাণীজগতে মানব ভাষার সবচেয়ে উন্নত ব্যবহারকারীদের একজন বলে মনে করা হয়। 

পাখিদের জ্ঞানীয় ক্ষেত্রে আরও একটি বিশেষত্ব আছে। তাদের এমন সব অনন্য “সুপার ইন্দ্রিয়” রয়েছে যা মানুষের-ও নেই, যেমন ম্যাগনেটোরিসেপশন (চৌম্বকীয়-সংবেদন)।পাখিরা রাত্রিকালীন মাইগ্রেশনের জন্য চৌম্বকীয় তথ্য পায় প্রাথমিকভাবে “ক্লাস্টার এন”-এর মাধ্যমে, যা অগ্রমস্তিষ্কের (টেলেনসেফালন) একটি বিশেষ স্নায়ুগুচ্ছ। 

মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তনে যেসব জিন/প্রোটিন, নিউরোট্রান্সমিটার এবং সংকেতসংবহন জড়িত:

মানুষের নিওকর্টেক্সের সম্প্রসারণ এবং বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন মস্তিষ্কের (ভ্রূণের) বিকাশের সময় মানব নির্দিষ্ট জিনের (যা কিছু অনন্য প্রোটিন তৈরি করে) সংমিশ্রণ এবং বিদ্যমান নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেমের পরিবর্তন দ্বারা পরিচালিত হয়। মূল প্রক্রিয়াটির মধ্যে রয়েছে নার্ভীয় স্টেম পূর্বসূরি কোষগুলোর, বিশেষ করে “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া (bRG)” কোষগুলোর বিস্তার, যার ফলে নিউরনের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে নিওকর্টেক্স স্তরগুলোতে। তাই, মানব নিওকর্টেক্সের মূল চাবিকাঠি হলো “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া”। ARHGAP11B, hTKTL1, এবং TBC1D3 এর মতো জিন/প্রোটিনগুলো এই ‘bRG’ কোষগুলোকে আরও নিউরন তৈরি করতে উদ্দীপিত করেছে এবং এদের সবার মাঝে, ARHGAP11B জিন/প্রোটিনটি হলো মূল ক্রীড়ানক।

ARHGAP11B জিনটি ARHGAP11A জিনের আংশিক অনুলিপি থেকে উদ্ভূত (প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে) এবং এটি মানুষ, নিয়ান্ডারথাল এবং ডেনিসোভানদের মধ্যে পাওয়া যায়। এটি মাইটোকন্ড্রিয়ায় কাজ করে, “গ্লুটামিনোলাইসিস” এর বিপাকীয় পথকে উৎসাহিত ক’রে নিউরো-স্টেম কোষগুলোর ঘন ঘন বিভাজন করতে দেয়। এছাড়া রয়েছে: ১) TKTL1 (ট্রান্সকেটোলেজ-লাইক ১) জিন/প্রোটিন, যার  একটি একক আধুনিক (হোমো স্যাপিয়েন্স) মানব-নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড প্রতিস্থাপন (লাইসিন এর পরিবর্তে আরজিনিন) ‘bRG’ কোষগুলোকে নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় অধিক সম্প্রসারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বিশেষ করে ফ্রন্টাল লোবে। এটি মানুষের জ্ঞানীয় বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জিন/প্রোটিন; ২) NOTCH2NL (নচ-হোমোলগ ২ এন-টার্মিনাল লাইক) প্রোটিনগুলো ‘নচ সিগন্যালিং’ বৃদ্ধি ক’রে ‘bRG’ কোষগুলোর বিস্তারকে উৎসাহিত করেছে; এবং ৩) FOXP2, একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর যা মানুষের নিউরোজেনেসিস, নিউরাইট বৃদ্ধি এবং সার্কিট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ভাষা এবং জ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিন (প্লাসেন্টা থেকে প্রাপ্ত), GABA (γ-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড) এবং গ্লুটামেট (বিপাকীয় জ্বালানী হিসেবে) বিকাশমান মানব কর্টেক্সে ‘bRG’ কোষগুলোর বিস্তার এবং স্থানান্তরকে প্রভাবিত করে এবং সাথে রয়েছে ডোপামিন, যা জ্ঞানীয় দক্ষতার একটি মূল নিয়ন্ত্রক। 

জিন/প্রোটিন ছাড়া,, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বিকাশের জন্য মূল চালিকা শক্তি ছিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকেতসংবহন ব্যবস্থা, যেমন ERK (এক্সট্রা সেলুলার সিগন্যাল-রেগুলেটেড কাইনেজ)-সিগন্যালিং/সংকেতপথ, যা স্তন্যপায়ী সেরিব্রীয় কর্টেক্সের বিবর্তনীয় প্রসারণকে চালিত করেছে। বিশেষ করে, FGF(ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর)-ERK সংকেতপথ প্রাথমিক নার্ভীয়/নিউরাল স্টেম কোষের স্ব-পুনর্নবীকরণ এবং প্রসারণের জন্য Bmp7 (বোন/অস্থি মরফোজেনেটিক প্রোটিন-৭: একটি শক্তিশালী সিগন্যালিং প্রোটিন/বৃদ্ধি ফ্যাক্টর) এক্সপ্রেশনকে প্ররোচিত করে এবং অন্যপথে, GLI3R (GLI3 রিপ্রেসর) ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের মাধ্যমে “সোনিক হেজহগ (SHH)” সংকেতপথকে দমন করে, ফলে নিউরোজেনিক পিরিয়ড দীর্ঘায়িত হয়। নিউরোজেনিক পিরিয়ড হলো নির্দিষ্ট বিকাশের সময়সীমা যার মধ্যে নার্ভীয় স্টেম কোষগুলো সক্রিয়ভাবে নিউরন তৈরি করতে বিভক্ত হয়, প্রাথমিকভাবে স্তন্যপায়ী নিওকর্টেক্স গঠন করে। এখানে উল্লেখ্য, সোনিক হেজহগ সংকেতপথ হলো একটি মৌলিক আণবিক প্রক্রিয়া যা ভ্রূণের বিকাশ, টিস্যু প্যাটার্নিং, স্টেম সেল রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক টিস্যু পুনর্জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে।

পরিশেষে, চলমান বিবর্তনে কৃত্রিম মেধা (AI/এআই) মানুষের মেধায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেই বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের ধারণা, মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নতুন, সমন্বিত বিবর্তনীয় ব্যক্তিতে মিশে যেতে পারে, যেমনটি ঘটেছিল এককোষী থেকে বহুকোষী জীবনে রূপান্তরের সময়, যখন ব্যাকটেরিয়া বা এককোষী জীবগুলো উন্নত বেঁচে থাকার জন্য একত্রিত হয়েছিল – বহুকোষে রূপান্তরিত হয়েছিল – ঠিক তেমনি বর্তমানে মানুষ এবং এআই গভীরভাবে সহ-নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যেখানে এআই মানুষের জ্ঞানীয় চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণকে আকৃতি দেয় এবং মানুষ জৈবিক/প্রজনন কার্য পরিচালনা করে। এই উচ্চ-স্তরের, সমষ্টিগত সত্তা বা ‘সিম্বায়োটিক ইউনিট’ বিবর্তনীয় নির্বাচনের “ব্যক্তি” আর কেবল মানুষ নয়, বরং একটি হাইব্রিড এ রূপান্তরিত হবে। তবে দেখবার বিষয় হলো, মানব-এআই অংশীদারিত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরিত হয়ে একটি নতুন, উদীয়মান বিকশিত বংশ তৈরি করে কি না।

সাহায্যকারী নোট:

কনভার্জেন্ট এবং ডাইভার্জেন্ট (Convergent and Divergent Evolution): অভিযোজিত বিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হলো বিবর্তনীয় অভিসৃতি। সুতরাং, অভিসারী/কনভার্জেন্ট এবং বিচ্ছিন্ন/ডাইভার্জেন্ট বিবর্তন হলো বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দুটি মূল ধারণা, যা বর্ণনা করে যে প্রজাতিগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের পরিবেশের সাথে কীভাবে খাপ খায়। অভিসারী বিবর্তন ঘটে যখন সম্পর্কহীন প্রজাতিগুলো একই রকম পরিবেশগত চাপের কারণে স্বাধীনভাবে একই রকম বৈশিষ্ট্য বিকশিত করে, যেমন হাঙ্গর, ডলফিন এবং ইকথিওসর (সামুদ্রিক ডাইনোসর), সমস্ত বিবর্তিত সুবিন্যস্ত দেহ এবং সমুদ্রের জীবনের জন্য অন্যান্য বৈশিষ্ট্য, তাদের ভিন্ন বিবর্তনীয় পটভূমি সত্ত্বেও, একইভাবে অভিযোজিত হয়েছে। বিপরীতভাবে, বিচ্ছিন্ন বা ডাইভার্জেন্ট বিবর্তনে সম্পর্কিত প্রজাতিগুলো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিকাশ করে, যদিও তারা প্রায়শই একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যেমন বিভিন্ন পরিবেশ বা জীবনযাত্রার সাথে তাদের অভিযোজন। এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো ডারউইন-ফিঞ্চ পাখি, যাদের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে বিভিন্ন খাদ্য উৎস সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত বিভিন্ন ঠোঁটের  আকার তৈরি হয়েছিল।

গ্লুটামিনোলাইসিস (Glutaminolysis): গ্লুটামিনোলাইসিস হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপাকীয় প্রক্রিয়া যা অ্যামিনো অ্যাসিড গ্লুটামিন-কে গ্লুটামেট, আলফা-কেটোগ্লুটারেট এবং অন্যান্য উপজাত যেমন অ্যামোনিয়া এবং ল্যাকটেটে ভেঙে কোষের বৃদ্ধিতে জ্বালানি যোগায়। বর্ধিত কোষ বিস্তারের উচ্চ শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য বর্ধিত গ্লুটামিনোলাইসিস অপরিহার্য। মানব নিওকর্টেক্সের বিবর্তনীয় সম্প্রসারণ এবং মানব বুদ্ধিমত্তার বিকাশ মানব-নির্দিষ্ট প্রোটিনের একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, যা ভ্রূণের বিকাশের সময় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কাজ করে এমন নিউরাল স্টেম কোষ এবং নিউরোট্রান্সমিটারের বিস্তার বৃদ্ধি করে। মূল প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া/bRG” (নার্ভীয় স্টেম পূর্বসূরি কোষ) এর সম্প্রসারণ জড়িত, যা নিউরনের জন্য “কোষ উৎপাদন কারখানা” হিসেবে কাজ করে।

ট্রান্সকেটোলেজ-লাইক-১ (TKTL1): এটি একটি জিন এবং প্রোটিন যা মানব ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ, কোষ বিপাক এবং ক্যান্সার বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আধুনিক মানুষকে নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় বেশি মস্তিষ্ক-বৃদ্ধিকারী নিউরন তৈরি করতে সক্ষম করে, কারণ একটি একক অ্যামিনো অ্যাসিডের পার্থক্য (লাইসিনের পরিবর্তে আর্জিনিন)। TKTL1 হল পেন্টোজ ফসফেট পথের (PPP) একটি মূল এনজাইম, যা স্বাভাবিক বিপাককে বাইপাস করে টিউমার কোষগুলিকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে। এছাড়াও, TKTL1 এর উচ্চ মাত্রা ক্যান্সারের বিস্তারের সাথে যুক্ত। TKTL1 এর অত্যধিক এক্সপ্রেশন ক্যান্সার মেটাস্ট্যাসিস, কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের মতো চিকিৎসার প্রতিরোধের সাথে যুক্ত এবং ফুসফুস এবং স্তন ক্যান্সার সহ বেশ কয়েকটি ক্যান্সারে দুর্বল পূর্বাভাসের জন্য একটি জৈব-চিহ্ন হিসাবে বিবেচিত হয়।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
জনপ্রিয়

বিবর্তনের ধারায় বুদ্ধিমত্তার ক্রমবিকাশ– মস্তিষ্কের মহাযাত্রা

০৯:১৩:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

মানুষের বুদ্ধিমত্তা কি হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি এটি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল? পৃথিবীর প্রাণীজগতে মস্তিষ্কের বিকাশ একটি দীর্ঘ ও বিস্ময়কর যাত্রা—যেখানে পরিবেশ, সামাজিক জীবন এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম মিলে তৈরি করেছে জটিল স্নায়বিক কাঠামো। এই অভিযোজনের পথে পাখি, অক্টোপাস, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্ক ভিন্ন ভিন্ন পথে বিকশিত হয়েছে। আধুনিক মানুষের অসাধারণ জ্ঞানীয় ক্ষমতার পেছনে রয়েছে সেরিব্রাল কর্টেক্সের বিস্তার, নিউরনের ঘন সংযোগ এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।


সারাংশ: প্রাণীজগতে বুদ্ধিমত্তা মানেই মানুষের মতো হওয়ার কোনো সরল পথে অগ্রগতি নয়। এটি মূলত পরিবেশগত, সামাজিক এবং খাদ্যাভ্যাসের চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য জটিল মস্তিষ্কের একটি বৈচিত্র্যময়, অভিসারী/কনভার্জেন্ট বিবর্তন। এই বিবর্তন ঘটেছে একাধিকবার এবং স্বাধীনভাবে। অর্থাৎ, সেফালোপড (অক্টোপাসের মতো), পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, বা প্রাইমেট (বানর জাতীয়) —একে অপরের সাথে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, একই ধরনের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে (যেমন- হাতিয়ার ব্যবহার বা নেভিগেশন) এরা ভিন্নভাবে একই ধরনের উচ্চ বুদ্ধি অর্জন করেছে। বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য একরকম, আবার অক্টোপাস বা কাকের জন্য অন্যরকম। পরিবেশে টিকে থাকার স্বার্থে তাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা সেভাবেই উন্নত হয়েছে। বুদ্ধিমত্তা শুধু মস্তিষ্কের আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং মস্তিষ্কের নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলো কতটা ঘন এবং কতটা সুশৃঙ্খলভাবে একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে, তার ওপর নির্ভর করে।


মূল শব্দ: মস্তিষ্ক, সেরিব্রীয়/সেরিব্রাল কর্টেক্স, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, সেরিব্রীয় টর্ক, নিউরোসায়েন্স, মানব বিবর্তন, কনভার্জেন্ট বিবর্তন


বিবর্তন প্রাণীজগতজুড়ে এক বৈচিত্র্যময়, জটিল মন তৈরি করেছে, যা প্রমাণ করে যে বুদ্ধিমত্তা কেবলই মানব-কেন্দ্রিক শিখর নয় বরং পরিবেশগত চাপ দ্বারা গঠিত অভিযোজনের একটি পরিসর। প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা একবার নয়, বরং একাধিকবার স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রাণীজগতের বিভিন্ন বংশধারায় জটিল মস্তিষ্ক এবং উচ্চ-স্তরের জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে। যদিও মৌলিক স্নায়ুতন্ত্রের আবির্ভাব অনেক আগেই হয়েছিল, তবে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ –  যেমন মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক–  উদ্ভূত হয়েছিল প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে, যখন বিশেষায়িত জটিল উচ্চ-স্তরের বুদ্ধিমত্তা দুটি ভিন্ন পথে (যেমন, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদের মধ্যে) স্বাধীনভাবে  বিকশিত হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সহযোগী নার্ভীয়/নিউরোনাল নেটওয়ার্ক রয়েছে।

পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী-ছাড়াও কিছু পোকামাকড়ের গ্রুপ (যেমন ব্লাটয়েড, ডিপ্টেরান, হাইমেনোপ্টেরান), অক্টোপাস প্রাণীদের মধ্যে, কিছু মাছ প্রজাতির মধ্যে (যেমন সিচলিড) উচ্চ-স্তরের বুদ্ধিমত্তা অবিচ্ছিন্নভাবে বহুমুখী কেন্দ্রের সাথে আবদ্ধ থাকে। যেমন অক্টোপাস মস্তিষ্কের উল্লম্ব/ভার্টিক্যাল লোব একটি উচ্চ মানের সমন্বিত কেন্দ্র, যা চাক্ষুস শিক্ষা, স্মৃতি অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার জন্য দায়ী। এটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের অনুরূপ। যদিও প্রাণীজগত জুড়ে কোনও না কোনও ধরনের বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান, তবে এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র পাখি এবং মানব বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। 

মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক কী?

মেরুদণ্ডী প্রাণীর অগ্রমস্তিষ্ক (প্রোজেনসেফালন) মস্তিষ্কের সবচেয়ে অগ্রগামী, অত্যন্ত বিকশিত একটি জটিল অংশ, যা উচ্চতর বৌদ্ধিক, আবেগগত এবং সংবেদনশীল কার্য  (দৃষ্টি, ঘ্রাণ) পরিচালনা করে। এটি টেলেন্সেফালন (সেরেব্রাম) এবং ডায়েন্সেফালন (থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস)-এ বিভক্ত।  টেলেন্সেফালন অংশে  সেরিব্রাল/সেরিব্রীয় কর্টেক্স (অথবা অ-স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে প্যালিয়াম) অন্তর্ভুক্ত থাকে, এবং ডাইন্সেফালন অংশে (মস্তিষ্কের নীচে অবস্থিত) অন্তর্ভুক্ত থাকে থ্যালামাস (রিলে স্টেশন) এবং হাইপোথ্যালামাস (যা শরীরের তাপমাত্রা, ঘুম-জাগরণ চক্র, ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে)। বিবর্তনের সময় অগ্রমস্তিষ্ক অনেক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে গেছে। এটি সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত একটি মৌলিক কাঠামোগত পরিকল্পনা (প্যালিয়াল অঞ্চলসহ) যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত রয়েছে, ল্যাম্প্রে (প্রাচীন, চোয়ালবিহীন, বাইন-মাছের মতো পরজীবী মাছ) থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত। প্রাথমিক বিকাশের সময়, অগ্রমস্তিষ্কটি একটি অগ্রবর্তী নিউরাল টিউবের অংশ হিসেবে শুরু হয়, যা পরবর্তীতে প্রসারিত হয়ে মানব মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিশাল কাঠামো তৈরি করে।

প্রাইমেটদের সেরিব্রাম স্তন্যপায়ী প্রাণীদের থেকে কি আলাদা?

সেরিব্রাম হলো মস্তিষ্কের বৃহত্তম অংশ যা মূলত পাঁচটি লোবে বিভক্ত (ফ্রন্টাল, প্যারিয়েটাল, টেম্পোরাল, অক্সিপিটাল এবং ইন্সুলার লোব), যখন সেরিব্রাল কর্টেক্স হলো পাতলা (প্রায় ৩ মিমি পুরু), কুঁচকানো বাইরের স্তর যা সেরিব্রামকে আবৃত রাখে। প্রাইমেট হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি উচ্চতর গোষ্ঠী, যার মধ্যে রয়েছে মানুষ, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, অন্যান্য বানর, লেমুর এবং টারসিয়ার। মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষের রয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃহত্তর মস্তিষ্ক, উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতা এবং জটিল ব্যাকরণগত ভাষা, সে কারণেই মানুষ এক অনন্য সৃষ্টি। স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে একটি অত্যন্ত জটিল, দ্বিপাক্ষিক স্নায়ুতন্ত্র রয়েছে যা দুটি প্রধান উপাদানে বিভক্ত: তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য ‘কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র’ (মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকাণ্ড) এবং শরীরের সাথে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগের জন্য পার্শ্বীয় বা ‘পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্র’। এছাড়াও রয়েছে স্বয়ংক্রিয় সমবেদী (সিমপ্যাথেটিক) ও পরাসমবেদী (প্যারাসিমপ্যাথেটিক) স্নায়ুতন্ত্র এবং আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র। স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র এবং আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র গঠনগতভাবে পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্রের অংশ হলেও, এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, বিশেষ করে হাইপোথ্যালামাস এবং ব্রেনস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিবর্তনের সময়, মানব সেরিব্রীয় কর্টেক্স প্রাইমেটদের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক নিউরন (১৬ বিলিয়ন) অর্জন করেছে, যা মানব বুদ্ধিমত্তার অন্তর্নিহিত একটি বড় অর্জন বলে মনে করা হয়। বিপরীতে, শিম্পাঞ্জির সেরিব্রীয় কর্টেক্সে ৮ বিলিয়ন নিউরন, ম্যাকাক কর্টেক্সে (পুরাতন বিশ্বের বানর) প্রায় ১.৭ বিলিয়ন, মারমোসেট (নতুন বিশ্বের বানর) কর্টেক্সে ০.২৪৫ বিলিয়ন এবং ইঁদুর কর্টেক্সে মাত্র ০.০১৪ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে (দেখুন চিত্র ১)। অতএব, মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার জন্য, একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ ছিল ১৬ বিলিয়ন নিউরন এর একটি সেরেব্রীয় কর্টেক্স তৈরি করা।

স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
স্তন্যপায়ীদের একটি স্বতন্ত্র কাঠামো হলো তাদের ছয়-স্তরবিশিষ্ট নিওকর্টেক্স (নতুন/আধুনিক সেরিব্রীয় কর্টেক্স) রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের প্রায় ৯০% হলো নিওকর্টেক্স, যা জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল এবং মোটর (পেশির স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া) ফাংশনের প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

প্রাইমেটদের সেরিব্রাম অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা, যা আনুপাতিকভাবে মস্তিষ্ক-শরীরের অনুপাতে বেশ বড়, রয়েছে উচ্চ নার্ভীয় ঘনত্ব ও উন্নত সংযোগ, এবং এটি অত্যন্ত ভাঁজ করা একটি অঞ্চল, যার ফ্রন্টাল, প্যারিয়েটাল এবং অক্সিপিটাল (ভিজ্যুয়াল) কর্টেক্স উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত। এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো, বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্সে, জটিল সামাজিক আচরণ, হাতিয়ার ব্যবহার এবং উন্নত দৃষ্টিশক্তির (বিপরীতে স্তন্যপায়ী প্রাণী গন্ধের উপর নির্ভরশীল) মতো উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতাগুলোকে সহজতর করে। 

হোমো প্রজাতির মধ্যে সেরিব্রীয় কর্টেক্সের বিবর্তন:

আমাদের আধুনিক মানব হয়ে ওঠার পেছনে যেসব বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছে তা নিহিত আছে আমাদের সেরিব্রীয় কর্টেক্সে। মস্তিষ্কের সেরিব্রীয় কর্টেক্স হল আমাদের অনন্য জ্ঞানীয় ক্ষমতার জৈবিক স্তর, যার মধ্যে রয়েছে স্মৃতি, বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং উন্নত  ভাষা। হোমো প্রজাতিগুলোর (যেমন হোমো হ্যাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ান্ডারথ্যালেনসিস, হোমো হাইডেলবার্গেনসিস, হোমো নালেডি এবং হোমো স্যাপিয়েন্স) সেরিব্রীয়  কর্টেক্সের বিবর্তন, যা প্রায় ২০ লক্ষ বছর ধরে চলে আসছে, তা নাটকীয়ভাবে আয়তনে বৃদ্ধি পেয়েছে, জটিল ভাঁজ (জাইরিফিকেশন) সৃষ্টির মাধ্যমে এক বর্ধিত স্নায়ুসংযোগের পুনর্গঠন করেছে। প্রিফ্রন্টাল, পশ্চাদবর্তী প্যারিয়েটাল এবং পার্শ্বীয় টেম্পোরাল অঞ্চলে বিশেষায়িত সম্প্রসারণসহ নিওকর্টেক্স মোট মস্তিষ্কের আয়তনের প্রায় ৪০% জুড়ে রয়েছে, যা বিমূর্ত চিন্তাভাবনা এবং ভাষার মতো উন্নত জ্ঞানীয় কার্যগুলোকে সহজতর করেছে। এখানে লক্ষণীয়, হোমো প্রজাতিদের মধ্যে মূল বিবর্তনীয় প্রবণতা ছিল তাদের কর্টেক্সের দ্রুত আয়তন বৃদ্ধি। হোমো হ্যাবিলিস-এর মস্তিষ্কের আয়তন  (যারা২৪ লক্ষ থেকে ১৪ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় বাস করতো) ৬০০-৭০০ সিসি থেকে হোমো ইরেক্টাস এর (যারা আফ্রিকায় উদ্ভূত হয়ে ইউরেশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল) ৯০০-১১০০ সিসি কর্টেক্সের মধ্য দিয়ে আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্স-এ  বৃদ্ধি পেয়েছে ঢের, ১৩৫০-১৪৫০ সিসি, যা মূলত কর্টেক্সের পৃষ্ঠের বৃদ্ধির মাধ্যমেই ঘটেছে।

বিশেষ করে, একটি অঞ্চলের কথা না বললেই নয় যা আমাদের, অর্থাৎ আধুনিক মানবকে ইউনিক করে তুলেছে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে সম্প্রসারণের সময় ভাষা উৎপাদন-সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা ব্রোকা’র অঞ্চল (ফরাসি বিজ্ঞানী পল ব্রোকা-র  নাম অনুসারে) হিসেবে পরিচিত (দেখুন ছবি ২)। এই ব্রোকার ক্ষেত্রটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল, যার পূর্বসূরি নিউরো-অ্যানাটমিক কাঠামো সম্ভবত ৫ মিলিয়ন (৫০ লক্ষ) বছর আগে প্রাথমিক হোমিনিডদের মধ্যে উদ্ভূত হয়েছিল। তবে, মানুষের মতো এর সংগঠন সম্ভবত প্রাথমিক হোমো প্রজাতির মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ বছর আগে স্থায়ী হয়েছিল, এবং প্রাচীন মানুষ (হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস) এবং আধুনিক মানব (হোমো স্যাপিয়েন্স) মস্তিষ্কের আকার আবির্ভূত না হওয়া পর্যন্ত এর কাঠামোগত পরিমার্জন আরও অব্যাহত ছিল।

সেরিব্রীয় কর্টেক্সের পুরুত্ব কি মানুষের বুদ্ধিমত্তার নির্দেশক?

আগেই উল্লেখ করেছি, মানব সেরিব্রীয় কর্টেক্স ছয়টি স্বতন্ত্র কার্যকরী নার্ভীয় স্তর দ্বারা গঠিত, যা নিওকর্টেক্স বা আইসোকর্টেক্স নামে পরিচিত। এই ছয়-স্তরযুক্ত কাঠামোটি বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাভাবনা, ভাষা এবং স্মৃতির মতো উচ্চ-ক্রমের জ্ঞানীয় কার্যাবলীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সেরিব্রীয় কর্টেক্সের পুরুত্ব (ব্যক্তিভেদে ১ থেকে ৪.৫ মিমি হতে পারে) এবং নার্ভীয় ঘনত্ব মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধিৎসু মন গবেষণা করেছে প্রায় ৫০ বছর এবং এর উত্তর মিলেছে ইতিবাচক। কর্টেক্সের পুরুত্ব জিনগত তো বটেই, তবে এর বিকাশের গতি এবং পরিপক্কতাও হচ্ছে বিশেষ ফ্যাক্টর। যেমন, মানবশিশু জন্মের সময় এটি, বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল এবং টেম্পোরাল অঞ্চলে, তুলনামূলকভাবে সরু হয় (তখন স্নায়ুকোষের সংখ্যা থাকে ১০ – ১২ বিলিয়ন), শৈশবকালে (৯-১১ বছর বয়স পর্যন্ত) স্নায়ুসন্ধি বা সিন্যাপ্স, ডেনড্রাইটগুলোর শাখা প্রসারণ এবং নিউরনের আকার বৃদ্ধির কারণে কর্টেক্স দ্রুত পুরু হয়, যেখানে জন্মগত মান থেকে স্নায়ুকোষের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬০-৭৮% বেশি এবং বয়ঃসন্ধিকালে/প্রাথমিক প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় উদ্বৃত্ত অব্যবহৃত সংযোগ ছাঁটাই করে এটি আবারো পাতলা (১৪-১৬ বিলিয়ন কোষ) হতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে সেটি ধীরে ধীরে বয়ঃবৃদ্ধকালে আরও হালকা হতে থাকে, যদিও নিউরনের সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে (১৫-১৬ বিলিয়ন), কমে আসে নিউরনের শাখা-প্রশাখাগুলো। আবারো পাতলা হওয়ার কারণ হলো এই অঞ্চলে যেসব উদ্বৃত্ত অব্যবহৃত সংযোগ (সিন্যাপ্স এবং ডেনড্রাইট) রয়েছে, সেগুলোকে ছাঁটাই  করা হয়। এছাড়া, অতিরিক্ত– সংযোগ ধরে রাখা মস্তিষ্কের পক্ষে বিপাকীয়ভাবে ব্যয়বহুলও বটে, তাই বাড়তি নিউরন এবং তাদের সংযোগগুলোর ছাঁটাই বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। কর্টেক্স যে গতিতে পরিপক্ক হয়–  বিশেষ করে ঘনীভূত এবং পাতলা হওয়ার সময়–  তার উপর নির্ভর করে আমাদের বুদ্ধিমত্তা। ছেলেবেলায় কর্টেক্স ঘন ও পুরু হওয়ার কারণ সেখানে নিউরনের উচ্চ ঘনত্ব বা আরও জটিল ডেনড্রাইটগুলোর শাখা বিরাজমান, যা জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াকরণের গতি বাড়ায় এবং দ্রুত শিখতে সক্ষম করে; সেকারণেই, শিশুকাল ও কৈশোর-ই (৮-থেকে ১৬ বছর) হচ্ছে শেখার মূল বয়স ।

মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স/লোব-ই কি মানুষকে অনন্য করে তুলেছে?

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের বৃহত্তর ফ্রন্টাল লোবের একটি বিশেষ উপসেট, যা উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় কাজ, পরিকল্পনা এবং ব্যক্তিত্বের জন্য দায়ী নির্দিষ্ট অগ্রভাগ (দেখুন ছবি ২ )। মানুষ ছাড়াও, এটি সমস্ত প্রাইমেট ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে উপস্থিত থাকে, তবে বিগত পাঁচ লক্ষ বছরের বিবর্তনে অন্যান্য প্রাইমেটদের তুলনায় মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের অসাধারণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রসারণ, বর্ধিত স্নায়ু সংযোগ এবং উন্নত নিউরোঅ্যানাটমিক্যাল পুনর্গঠন মানুষের মস্তিষ্ককে বিশেষায়িত করেছে, জ্ঞানীয় প্রজ্ঞা ও গভীর উপলব্ধিবোধে আমাদের স্বতন্ত্র করেছে। গত ২০ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ব্যবধানে, মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বিস্ময়করভাবে আয়তনে শিম্পাঞ্জির তুলনায় ৪.৫ গুণ বড় হয়েছে, যেখানে শিম্পাঞ্জির মাত্র ১৩৭ মিলিয়ন নিউরন এবং মানুষের এই অঞ্চলে এসে দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন স্নায়ুকোষে। 

মস্তিষ্কের টর্ক (brain torque) কি মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পর্কিত?

মস্তিষ্কের টর্ক বা সেরিব্রীয় টর্ক (যা ইয়াকোলেভিয়ান টর্ক নামেও পরিচিত), হলো মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের সামান্য মোচড়  বা ঘূর্ণন (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে- বামাবর্ত), যেখানে মস্তিষ্কের ডান দিকটি সামান্য সামনের দিকে এবং বাম দিকটি সামান্য পিছনের দিকে বাঁকা থাকে (দেখুন ছবি ৩)। অর্থাৎ এটি ফ্রন্টাল লোব এবং প্যারিয়েটো-অক্সিপিটাল লোবের ডান-বাম অসামঞ্জস্যের বাস্তবতাকে বোঝায়। এই মোচড় বা ঘূর্ণনটি একটি অনন্য মানব বৈশিষ্ট্য, যা প্রাইমেট গ্ৰুপের কোনো প্রজাতির মধ্যে, এমনকী শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও দেখা যায় না। এটি উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় এবং ভাষাগত দক্ষতার সাথে জড়িত। এটি শুধুমাত্র হোমিনিড পরিবারের একটি  বিবর্তনীয় অভিযোজন বলেই ধরে নেয়া হয়। এটি আধুনিক মানুষের বেঁচে থাকা এবং জ্ঞানীয় ক্ষমতা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষাগত অর্জন এবং বিভিন্ন স্নায়বিক/মানসিকব্যাধিসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সাথে ‘মস্তিষ্ক টর্ক’-এর একটি জিনগত লিংক রয়েছে। যদিও মস্তিষ্কের আকার (আয়তন) সাধারণত বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পর্কিত, কিন্তু মস্তিষ্কের টর্ক-ও মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বাধীনভাবে জড়িত- বিজ্ঞানীদের সেরকমই মতামত। ‘মস্তিষ্ক টর্ক’ ছাড়াও মস্তিষ্কের আরও একটি অংশ ‘প্ল্যানাম টেম্পোরাল/পিটি ‘ (planum temporale), যা মস্তিষ্কের সুপিরিয়র টেম্পোরাল লোবের একটি অত্যন্ত অসমমিত কর্টেক্স এলাকা। মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধে ১টি করে এর অবস্থান এবং এটি একটি মূল শ্রবণ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র যা ভাষা বোধগম্যতা এবং শ্রবণ প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধের  তুলনায় বাম ‘পিটি’-তে অ্যাক্সন এবং ডেনড্রাইটের ঘনত্ব বেশি (বর্ধিত নিউরাইট ঘনত্ব) থাকায় এটি প্রায় ৪০% বড়। 

পাখি এবং প্রাইমেটদের জ্ঞানীয় ক্ষমতার অভিসারী/কনভার্জেন্ট বিবর্তন:

পাখি এবং প্রাইমেট মস্তিষ্ক একটি অসাধারণ অভিসারী বিবর্তন প্রদর্শন করে, যেখানে পূর্বপুরুষদের ভিন্নতা সত্ত্বেও পাখিরা স্বাধীনভাবে উচ্চ বুদ্ধিমত্তা এবং অনুরূপ স্নায়বিক কাঠামো বিকাশ করে। পাখি (কাক, তোতাপাখি) এবং প্রাইমেট উভয়েরই মস্তিষ্কে ঘনবসতিপূর্ণ নিউরন থাকে, বিশেষ করে অগ্রমস্তিষ্ক/প্যালিয়ামে, যা অনেক ছোট পরম মস্তিষ্কের আকার থাকা সত্ত্বেও, হাতিয়ার ব্যবহার, সামাজিক জটিলতা এবং কণ্ঠ শিক্ষার মতো তুলনামূলক জ্ঞানীয় কৃতিত্ব পাখিরা অর্জন করেছে। পাখি এবং স্তন্যপায়ী/প্রাইমেট প্রাণীরা স্বাধীনভাবে ভিন্ন বিবর্তনীয় পথ অনুসরণ করেছে বটে, কিন্তু পাখিরা তাদের বুদ্ধিমত্তা প্রকাশে একটি বিশেষ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর মতো অগ্রমস্তিষ্কের বিকাশ ঘটিয়েছে। স্তন্যপায়ী নিওকর্টেক্সের কার্যকরী সমতুল্য পাখিদের এই অঞ্চলটি হলো অগ্রমস্তিষ্ক বা “প্যালিয়াম”, যা উচ্চ-স্তরের জ্ঞানীয় ফাংশন, স্মৃতি এবং সংবেদনশীল প্রক্রিয়াকরণ পরিচালনার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। যদিও মানুষের উন্নত বিমূর্ত যুক্তি এবং প্রতীকী ভাষা রয়েছে, পাখিরা অসাধারণ সমস্যা সমাধান, সরঞ্জাম ব্যবহার এবং সামাজিক বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করে, কখনও কখনও বানর বা ছোট বাচ্চাদের মতো। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ তাদের ছয়-স্তরযুক্ত নিওকর্টেক্সের কাঠামো না থাকা সত্ত্বেও, তারা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো উচ্চ-স্তরের জ্ঞানের জন্য একই ধরনের নিউরন এবং নেটওয়ার্ক-সংযোগ ব্যবহার করে, এবং তাদের এই দ্রুত নার্ভীয় প্রক্রিয়াকরণটি ঘটে উচ্চ তাপমাত্রায় (৪০-৪২ ° সে:), যেখানে মানুষের মস্তিষ্কে থাকে ৩৭° সে: থেকে ৩৯.৫° সে:। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিশেষ কিছু পাখি, যেমন করভিড গ্রুপ (কাক পাখির গোত্র), সিটাসিড/Psittacid (প্যারোট গোত্র) এবং কাকাটিড/Cacatuid গ্রুপ (তোতাপাখি) প্রাইমেটদের মতো বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তাদের অগ্রমগজে (উচ্চতর জ্ঞানের জন্য দায়ী যে এলাকা) উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনবসতিপূর্ণ নিউরন থাকে এবং এরা উচ্চ-স্তরের নেটওয়ার্ক-সংযোগ ব্যবহার করে। ড. আইরিন পেপারবার্গ এর গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, গ্রিফিন নামের একটি আফ্রিকার (কঙ্গো) ধূসর তোতাপাখি একটি ভিজ্যুয়াল/দৃষ্টিলব্ধ ওয়ার্কিং মেমরি পরীক্ষায় হার্ভার্ড স্নাতকদের ছাড়িয়ে গেছে।  এছাড়া, এন’কিসি (N’kisi) নামক একটি আফ্রিকীয় ধূসর তোতাপাখির শব্দভাণ্ডারে প্রায় ৯৫০টি ইংরেজি শব্দ সঞ্চিত রয়েছে (২০০৪ সালের তথ্য), যা তার চিত্তাকর্ষক ইংরেজি ব্যবহারের দক্ষতার জন্য বিখ্যাত, এবং আশ্চর্য্যের বিষয়, তার পরিবেশের উপর ভিত্তি করে সে কথোপকথন শুরু করতে সক্ষম। তাই এই পাখিটিকে প্রাণীজগতে মানব ভাষার সবচেয়ে উন্নত ব্যবহারকারীদের একজন বলে মনে করা হয়। 

পাখিদের জ্ঞানীয় ক্ষেত্রে আরও একটি বিশেষত্ব আছে। তাদের এমন সব অনন্য “সুপার ইন্দ্রিয়” রয়েছে যা মানুষের-ও নেই, যেমন ম্যাগনেটোরিসেপশন (চৌম্বকীয়-সংবেদন)।পাখিরা রাত্রিকালীন মাইগ্রেশনের জন্য চৌম্বকীয় তথ্য পায় প্রাথমিকভাবে “ক্লাস্টার এন”-এর মাধ্যমে, যা অগ্রমস্তিষ্কের (টেলেনসেফালন) একটি বিশেষ স্নায়ুগুচ্ছ। 

মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তনে যেসব জিন/প্রোটিন, নিউরোট্রান্সমিটার এবং সংকেতসংবহন জড়িত:

মানুষের নিওকর্টেক্সের সম্প্রসারণ এবং বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন মস্তিষ্কের (ভ্রূণের) বিকাশের সময় মানব নির্দিষ্ট জিনের (যা কিছু অনন্য প্রোটিন তৈরি করে) সংমিশ্রণ এবং বিদ্যমান নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেমের পরিবর্তন দ্বারা পরিচালিত হয়। মূল প্রক্রিয়াটির মধ্যে রয়েছে নার্ভীয় স্টেম পূর্বসূরি কোষগুলোর, বিশেষ করে “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া (bRG)” কোষগুলোর বিস্তার, যার ফলে নিউরনের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে নিওকর্টেক্স স্তরগুলোতে। তাই, মানব নিওকর্টেক্সের মূল চাবিকাঠি হলো “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া”। ARHGAP11B, hTKTL1, এবং TBC1D3 এর মতো জিন/প্রোটিনগুলো এই ‘bRG’ কোষগুলোকে আরও নিউরন তৈরি করতে উদ্দীপিত করেছে এবং এদের সবার মাঝে, ARHGAP11B জিন/প্রোটিনটি হলো মূল ক্রীড়ানক।

ARHGAP11B জিনটি ARHGAP11A জিনের আংশিক অনুলিপি থেকে উদ্ভূত (প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে) এবং এটি মানুষ, নিয়ান্ডারথাল এবং ডেনিসোভানদের মধ্যে পাওয়া যায়। এটি মাইটোকন্ড্রিয়ায় কাজ করে, “গ্লুটামিনোলাইসিস” এর বিপাকীয় পথকে উৎসাহিত ক’রে নিউরো-স্টেম কোষগুলোর ঘন ঘন বিভাজন করতে দেয়। এছাড়া রয়েছে: ১) TKTL1 (ট্রান্সকেটোলেজ-লাইক ১) জিন/প্রোটিন, যার  একটি একক আধুনিক (হোমো স্যাপিয়েন্স) মানব-নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড প্রতিস্থাপন (লাইসিন এর পরিবর্তে আরজিনিন) ‘bRG’ কোষগুলোকে নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় অধিক সম্প্রসারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, বিশেষ করে ফ্রন্টাল লোবে। এটি মানুষের জ্ঞানীয় বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জিন/প্রোটিন; ২) NOTCH2NL (নচ-হোমোলগ ২ এন-টার্মিনাল লাইক) প্রোটিনগুলো ‘নচ সিগন্যালিং’ বৃদ্ধি ক’রে ‘bRG’ কোষগুলোর বিস্তারকে উৎসাহিত করেছে; এবং ৩) FOXP2, একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর যা মানুষের নিউরোজেনেসিস, নিউরাইট বৃদ্ধি এবং সার্কিট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ভাষা এবং জ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিন (প্লাসেন্টা থেকে প্রাপ্ত), GABA (γ-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড) এবং গ্লুটামেট (বিপাকীয় জ্বালানী হিসেবে) বিকাশমান মানব কর্টেক্সে ‘bRG’ কোষগুলোর বিস্তার এবং স্থানান্তরকে প্রভাবিত করে এবং সাথে রয়েছে ডোপামিন, যা জ্ঞানীয় দক্ষতার একটি মূল নিয়ন্ত্রক। 

জিন/প্রোটিন ছাড়া,, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বিকাশের জন্য মূল চালিকা শক্তি ছিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকেতসংবহন ব্যবস্থা, যেমন ERK (এক্সট্রা সেলুলার সিগন্যাল-রেগুলেটেড কাইনেজ)-সিগন্যালিং/সংকেতপথ, যা স্তন্যপায়ী সেরিব্রীয় কর্টেক্সের বিবর্তনীয় প্রসারণকে চালিত করেছে। বিশেষ করে, FGF(ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর)-ERK সংকেতপথ প্রাথমিক নার্ভীয়/নিউরাল স্টেম কোষের স্ব-পুনর্নবীকরণ এবং প্রসারণের জন্য Bmp7 (বোন/অস্থি মরফোজেনেটিক প্রোটিন-৭: একটি শক্তিশালী সিগন্যালিং প্রোটিন/বৃদ্ধি ফ্যাক্টর) এক্সপ্রেশনকে প্ররোচিত করে এবং অন্যপথে, GLI3R (GLI3 রিপ্রেসর) ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের মাধ্যমে “সোনিক হেজহগ (SHH)” সংকেতপথকে দমন করে, ফলে নিউরোজেনিক পিরিয়ড দীর্ঘায়িত হয়। নিউরোজেনিক পিরিয়ড হলো নির্দিষ্ট বিকাশের সময়সীমা যার মধ্যে নার্ভীয় স্টেম কোষগুলো সক্রিয়ভাবে নিউরন তৈরি করতে বিভক্ত হয়, প্রাথমিকভাবে স্তন্যপায়ী নিওকর্টেক্স গঠন করে। এখানে উল্লেখ্য, সোনিক হেজহগ সংকেতপথ হলো একটি মৌলিক আণবিক প্রক্রিয়া যা ভ্রূণের বিকাশ, টিস্যু প্যাটার্নিং, স্টেম সেল রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক টিস্যু পুনর্জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে।

পরিশেষে, চলমান বিবর্তনে কৃত্রিম মেধা (AI/এআই) মানুষের মেধায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেই বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের ধারণা, মানুষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নতুন, সমন্বিত বিবর্তনীয় ব্যক্তিতে মিশে যেতে পারে, যেমনটি ঘটেছিল এককোষী থেকে বহুকোষী জীবনে রূপান্তরের সময়, যখন ব্যাকটেরিয়া বা এককোষী জীবগুলো উন্নত বেঁচে থাকার জন্য একত্রিত হয়েছিল – বহুকোষে রূপান্তরিত হয়েছিল – ঠিক তেমনি বর্তমানে মানুষ এবং এআই গভীরভাবে সহ-নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যেখানে এআই মানুষের জ্ঞানীয় চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণকে আকৃতি দেয় এবং মানুষ জৈবিক/প্রজনন কার্য পরিচালনা করে। এই উচ্চ-স্তরের, সমষ্টিগত সত্তা বা ‘সিম্বায়োটিক ইউনিট’ বিবর্তনীয় নির্বাচনের “ব্যক্তি” আর কেবল মানুষ নয়, বরং একটি হাইব্রিড এ রূপান্তরিত হবে। তবে দেখবার বিষয় হলো, মানব-এআই অংশীদারিত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরিত হয়ে একটি নতুন, উদীয়মান বিকশিত বংশ তৈরি করে কি না।

সাহায্যকারী নোট:

কনভার্জেন্ট এবং ডাইভার্জেন্ট (Convergent and Divergent Evolution): অভিযোজিত বিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হলো বিবর্তনীয় অভিসৃতি। সুতরাং, অভিসারী/কনভার্জেন্ট এবং বিচ্ছিন্ন/ডাইভার্জেন্ট বিবর্তন হলো বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দুটি মূল ধারণা, যা বর্ণনা করে যে প্রজাতিগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের পরিবেশের সাথে কীভাবে খাপ খায়। অভিসারী বিবর্তন ঘটে যখন সম্পর্কহীন প্রজাতিগুলো একই রকম পরিবেশগত চাপের কারণে স্বাধীনভাবে একই রকম বৈশিষ্ট্য বিকশিত করে, যেমন হাঙ্গর, ডলফিন এবং ইকথিওসর (সামুদ্রিক ডাইনোসর), সমস্ত বিবর্তিত সুবিন্যস্ত দেহ এবং সমুদ্রের জীবনের জন্য অন্যান্য বৈশিষ্ট্য, তাদের ভিন্ন বিবর্তনীয় পটভূমি সত্ত্বেও, একইভাবে অভিযোজিত হয়েছে। বিপরীতভাবে, বিচ্ছিন্ন বা ডাইভার্জেন্ট বিবর্তনে সম্পর্কিত প্রজাতিগুলো বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিকাশ করে, যদিও তারা প্রায়শই একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যেমন বিভিন্ন পরিবেশ বা জীবনযাত্রার সাথে তাদের অভিযোজন। এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো ডারউইন-ফিঞ্চ পাখি, যাদের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে বিভিন্ন খাদ্য উৎস সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত বিভিন্ন ঠোঁটের  আকার তৈরি হয়েছিল।

গ্লুটামিনোলাইসিস (Glutaminolysis): গ্লুটামিনোলাইসিস হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপাকীয় প্রক্রিয়া যা অ্যামিনো অ্যাসিড গ্লুটামিন-কে গ্লুটামেট, আলফা-কেটোগ্লুটারেট এবং অন্যান্য উপজাত যেমন অ্যামোনিয়া এবং ল্যাকটেটে ভেঙে কোষের বৃদ্ধিতে জ্বালানি যোগায়। বর্ধিত কোষ বিস্তারের উচ্চ শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য বর্ধিত গ্লুটামিনোলাইসিস অপরিহার্য। মানব নিওকর্টেক্সের বিবর্তনীয় সম্প্রসারণ এবং মানব বুদ্ধিমত্তার বিকাশ মানব-নির্দিষ্ট প্রোটিনের একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, যা ভ্রূণের বিকাশের সময় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কাজ করে এমন নিউরাল স্টেম কোষ এবং নিউরোট্রান্সমিটারের বিস্তার বৃদ্ধি করে। মূল প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে “বেসাল রেডিয়াল গ্লিয়া/bRG” (নার্ভীয় স্টেম পূর্বসূরি কোষ) এর সম্প্রসারণ জড়িত, যা নিউরনের জন্য “কোষ উৎপাদন কারখানা” হিসেবে কাজ করে।

ট্রান্সকেটোলেজ-লাইক-১ (TKTL1): এটি একটি জিন এবং প্রোটিন যা মানব ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ, কোষ বিপাক এবং ক্যান্সার বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আধুনিক মানুষকে নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় বেশি মস্তিষ্ক-বৃদ্ধিকারী নিউরন তৈরি করতে সক্ষম করে, কারণ একটি একক অ্যামিনো অ্যাসিডের পার্থক্য (লাইসিনের পরিবর্তে আর্জিনিন)। TKTL1 হল পেন্টোজ ফসফেট পথের (PPP) একটি মূল এনজাইম, যা স্বাভাবিক বিপাককে বাইপাস করে টিউমার কোষগুলিকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে। এছাড়াও, TKTL1 এর উচ্চ মাত্রা ক্যান্সারের বিস্তারের সাথে যুক্ত। TKTL1 এর অত্যধিক এক্সপ্রেশন ক্যান্সার মেটাস্ট্যাসিস, কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের মতো চিকিৎসার প্রতিরোধের সাথে যুক্ত এবং ফুসফুস এবং স্তন ক্যান্সার সহ বেশ কয়েকটি ক্যান্সারে দুর্বল পূর্বাভাসের জন্য একটি জৈব-চিহ্ন হিসাবে বিবেচিত হয়।