০৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রচলিত অর্থে বার্ধক্যকে সময়ের সাথে সাথে শারীরবৃত্তীয়, দৈহিক এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার প্রগতিশীল এবং অপরিবর্তনীয় অবক্ষয় হিসেবে বোঝা হয়, যা বর্ধিত দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা এবং অবশেষে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে

রক্ষণাবেক্ষণ বনাম বংশবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব: বার্ধক্যের গোপন বিজ্ঞান

সারসংক্ষেপ: প্রাকৃতিক নির্বাচন মূলত প্রজনন সক্ষমতা এবং বংশবিস্তারের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যেহেতু বার্ধক্যে প্রজনন ক্ষমতা কমে বা শেষ হয়ে যায়, তাই এই সময়ে ঘটা ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলোকে দূর করার জন্য প্রকৃতির ওপর কোনো বিশেষচাপথাকে না। একারণেই বার্ধক্যজনিত ত্রুটিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে।  রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে বংশবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে শরীরের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্রুটি বা ‘ড্যামেজ’ জমা হতে থাকে। অল্প বয়সে শরীর এই ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মেরামতের অভাব প্রকট হয়, যার ফলে কোষের কার্যক্ষমতা কমে যায়, ধেয়ে আসে বার্ধক্য। এর মূলে রয়েছে শক্তির ব্যবহার। জীববিজ্ঞানে শক্তি সীমাবদ্ধ। একই সময়ে শরীর মেরামতের (ডিএনএ মেরামত, রোগ প্রতিরোধ) এবং প্রজনন ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয় না। জীববিজ্ঞানে “রক্ষণাবেক্ষণ বনাম বংশবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব”  হলো একটি মৌলিক ধারণা, যেখানে জীব তার সীমিত শক্তি শরীর সচল রাখা (রক্ষণাবেক্ষণ/বেঁচে থাকা) নাকি নতুন বংশধর তৈরিতে (বংশবৃদ্ধি) ব্যয় করবে, তা নির্ধারণ করে। এই দ্বন্দ্বে বেশি শক্তি বংশবৃদ্ধিতে দিলে আয়ু কমে।

মূলশব্দ: বার্ধক্য, পুনরুজ্জীবন/রিজেনেরেশন, হেফ্লিক সীমাবদ্ধতা, ডিএনএ মেরামত, টেলোমেয়ার, পি-৫৩, m-TOR, অটোফ্যাজি, জৈবিক অমরত্ব।

 

আত্ম-সচেতনতায় সক্ষম একটি মস্তিষ্কের বিবর্তনে আমরা আমাদের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছি, যা অন্যান্য জীব, এমনকী উদ্ভিদের মতো জটিল জীবও মৃত্যুকে উপলব্ধি করতে পারে না, এবং  তখন থেকে মৃত্যুর জ্ঞান আমাদের কাছে এতটাই ভীতিকর যে, আমাদের জীবনের অধিকাংশ সময় তা বুঝতে এড়িয়ে চলি। আর যখন কেউ মারা যায়, তখন মৃত্যুর চূড়ান্ততা মেনে নিতে পারি না, বরং তার পরিবর্তে “পরলোকগমন করেছেন” বা “প্রয়াত হয়েছেন” বা “তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন” এগুলোর মতো সুভাষণ আমরা ব্যবহার করি, যা বোঝায় যে মৃত্যু চূড়ান্ত নয়, বরং অন্য কিছুতে রূপান্তর মাত্র মর্ত্যলোক থেকে পরলোকে গমন, এবং এই রূপান্তর আমাদের সংস্কৃতিতে, নানা ধর্মে, বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উচ্চশ্রেণির পশুদের নিজেদের কেউ মারা গেলে তারা তা চিনতে পারে, বুঝতে পারে, এবং কেউ কেউ তাদের জন্য শোকও প্রকাশ করে বটে (যেমন হাতির ক্ষেত্রে দেখেছি); কিন্তু পশুরা যে তাদের নিজেদের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতন, তার কোনো প্রমাণ নেই। 

প্রচলিত অর্থে বার্ধক্যকে সময়ের সাথে সাথে শারীরবৃত্তীয়, দৈহিক এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার প্রগতিশীল এবং অপরিবর্তনীয় অবক্ষয় হিসেবে বোঝা হয়, যা বর্ধিত দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা এবং অবশেষে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। এটিকে একটি রোগ হিসেবে না দেখে, বরং ক্ষয়ের একটি স্বাভাবিক, সার্বজনীন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হলো দেহের কোষগুলোতে এমনসব ক্ষতিকর পরিবর্তন সঞ্চিত হয়, যা একটি জীবের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে এবং অবশেষে তা সমগ্র দেহের বিকলতা, অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। মৃত্যু বার্ধক্যের ফল। যখন আমাদের কোষ-সংগ্রহ যা টিস্যু এবং অঙ্গগুলো গঠন করে, তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে, তারা আর একক হিসেবে একসাথে কাজ করে না, তখন আমরা মারা যাই। কোষগুলোর ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে বুড়িয়ে যাওয়া বা বার্ধক্য। তাই, কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে, বার্ধক্য কি অনিবার্য?  

বার্ধক্যের চিরায়ত বিবর্তনীয় তত্ত্বসমূহ:

যদি আমাদের ডিএনএ-তে অবস্থিত জিনগুলোর পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারণ নিশ্চিত করা-ই লক্ষ্য হয়, তাহলে বিবর্তন শুরুতেই বার্ধক্যকে প্রতিরোধ করেনি কেন? এই ধাঁধার সমাধান শুরু হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক অভিজাত শ্রেণির দুই সদস্য, জে. বি. এস. হ্যালডেন এবং রোনাল্ড ফিশারের হাত ধরে। তাঁরা উভয়েই উপলব্ধি করেন, কোষে “মিউটেশন অ্যাকুমুলেশন” বা “ক্ষতিকর জিনগুলোর সঞ্চয়ন” হলো বার্ধক্যের মূল কারণ, যখন জীবনের শুরুতে ক্ষতিকর মিউটেশন বা পরিব্যক্তিগুলোর বিরুদ্ধে প্রবলভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে, নইলে যারা এগুলো বহন করে তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারবে না; কিন্তু, জীবনের মাঝ বয়সে বা বার্ধক্যে এসব ক্ষতিকারক মিউটেশনের প্রতি ‘নির্বাচন’ কাজ করে না, সাড়া দেয় না। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবনের পরবর্তী সময়ের তুলনায় যৌবনে প্রজনন এবং টিকে থাকার উপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব বেশি শক্তিশালী। 

এক ধাপ এগিয়ে, জীববিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস (১৯৫৭) প্রস্তাব করেন যে, বার্ধক্য ঘটে কারণ প্রকৃতি জীবনের প্রথম দিকে জিনগত বৈচিত্র্যগুলোকে নির্বাচন করে (যেমন উচ্চ উর্বরতা বা বৃদ্ধি), যদিও পরবর্তী জীবনে সেগুলো মিউটেশন বা অবক্ষয়ের কারণে ক্ষতিকরও হয়। এর অর্থ হলো, একই জিনের সময়ের পরিবর্তনে বিপরীতধর্মী প্রভাব থাকতে পারে- যে কারণে এই তত্ত্বটির নামকরণ হয়েছে ‘অ্য”ন্টাগনিস্টিক প্লিওট্রপি।“ অর্থাৎ, বার্ধক্যের সাথে জড়িত এই জিনগুলো জীবনের শুরুতে সহায়ক হয়, কিন্তু পরে সমস্যা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, যে জিনগুলো জীবনের শুরুতে আমাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, সেগুলোই বৃদ্ধ বয়সে ক্যান্সার এবং আলঝেইমার্স এর মতো বয়স-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নির্দিষ্টভাবে এই তত্ত্বের পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। ‘অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন’- নামক একটি প্রোটিন লিপিড-বিপাকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন-ইপ্সিলন৪ (APOE-ε4), অ্যাপোলাইপোপ্রোটিনের একটি ভ্যারিয়েন্ট, জিনটি আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং আয়ু হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত। ট্রাম্বল ও তার সহকর্মীদের (২০২৩) একটি  গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব নারীদের এই জিনটির (অ্যাপো-ই৪) দুটি অনুলিপি থাকে, তারা এই জিনটির অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট- সংমিশ্রণযুক্ত নারীদের তুলনায় বেশি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যদিও এটি পরবর্তী জীবনে আলঝেইমার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি এই তত্ত্বটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে APOE-ε4 একটি ‘অ্যান্টাগনিস্টিক প্লিয়োট্রপি’ জিন।    

একইভাবে, ‘ডিসপোজেবল সোমা’ (Disposable soma) হাইপোথিসিস অনুযায়ী, সীমিত সম্পদসম্পন্ন একটি জীবকে তার সম্পদ দুটি ভাগে ভাগ করতে হয়: একটি হলো প্রাথমিক বৃদ্ধি ও প্রজননে বিনিয়োগ করা এবং অন্যটি হলো কোষের ক্ষয়ক্ষতি ক্রমাগত মেরামত করে জীবন দীর্ঘায়িত করা। ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী টমাস কার্কউড, যিনি ১৯৭০-এর দশকে প্রথম এই তত্ত্বটি প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁর মতে, একটি জীবের বার্ধক্য হলো দীর্ঘায়ু এবং প্রজননগত সাফল্যের মাধ্যমে তার জিন পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরের বর্ধিত সম্ভাবনার মধ্যে একটি বিবর্তনীয় আপস-মীমাংসা।

প্রাণীদের আকার, জীবনকাল এবং বিপাকীয় হার যেন একসুতোয় বাঁধা: 

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের জীবনকালে যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে। কিছু ছোট মাছ মাত্র কয়েক মাস বাঁচে, অন্যদিকে একটি বো-হেড তিমি ২০০ বছরেরও বেশি সময় বাঁচে এবং একটি গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর প্রায় ৪০০ বছর বাঁচে। এই বিস্তৃত আয়ুষ্কালের পেছনে জৈবিক রহস্য কী? স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণভাবে প্রাণী আকারে যত বড় হয়, তার জীবনকালও তত দীর্ঘ হয়। বিবর্তনগতভাবে এটি যৌক্তিক। মনে হয় যেন এক ধরনের “জৈবিক সময়রক্ষক” রয়েছে, যেখানে জীবনকাল এবং বিপাকীয় হার একে অপরের সাথে জড়িত। ছোট প্রাণীদের দ্রুত বিপাকের ফলে তাদের “জীবনের গতি” দ্রুততর হয়, যার ফলে হৃৎস্পন্দনের হার বেশি (যেমন একটি ছুঁচোর হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০০০ বারের বেশি, একটি ইঁদুরের ৭০০ বার) এবং জীবনকাল সংক্ষিপ্ত হয় (১ থেকে ২ বছর)। বিপরীতভাবে, বড় প্রাণীদের (যেমন, তিমি/হাতি) ধীর বিপাকের কারণে তাদের জীবনের গতিও ধীর হয়, যার ফলে হৃৎস্পন্দনের হার কম থাকে (প্রতি মিনিটে প্রায় ৩০ বার); অর্থাৎ, তাদের হৃদস্পন্দনের হার কমে যাওয়ার অনুপাতে তাদের আয়ুষ্কালও বৃদ্ধি পায়। বিপাকীয় হার সরাসরি শক্তি, বিশেষত অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। ১৯৩০-এর দশকে ম্যাক্স ক্লেইবার নামে একজন সুইস জীববিজ্ঞানী একটি নীতি প্রণয়ন করেছিলেন যা জৈবিক জগতে একটি আকর্ষণীয় প্যাটার্ন প্রকাশ করে। একটি জীবের বিপাকীয় হার— যে গতিতে এটি শক্তি ব্যবহার করে— সরাসরি তার শরীরের ভরের সাথে স্কেল করে না। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রাণীর ভর M হয়, তবে তার বিপাকের হার M৩/৪ (বা M.৭৫)-এর সমানুপাতিক। যেহেতু হৃদস্পন্দনও বিপাকীয় হারের সাথে সমানুপাতিক, তাই ইঁদুর থেকে তিমি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পুরো জীবনকালে সাধারণত প্রায় একই সংখ্যক হৃদস্পন্দন থাকে: প্রায় ১.৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি)। বর্তমানে মানুষের এর প্রায় দ্বিগুণ রয়েছে (৩ বিলিয়ন)। মানুষ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম (গ্রাফে দেখুন, সীমা-বহির্ভূত  মান/outlier)। এর কারণ হলো চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি, যা আমাদের আয়ুষ্কালকে আমাদের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের হারের চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে (নিচের ছবিটি দেখুন)। 

তবে, প্রাণীদের আকারের তুলনায় প্রত্যাশিত আয়ুর চেয়ে অনেক বেশি বা অনেক কম বেঁচে থাকার ব্যতিক্রমও রয়েছে।  যেমন, আমরা প্রত্যাশার চেয়ে ৫ গুণ বেশি দিন বাঁচি, যার ব্যাখ্যা পূর্বেই দেয়া হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী প্রজাতিগুলোকে নিয়ে গবেষণা করেছেন স্টিভেন অস্টাড (ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র)। এসব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বিশালাকায় কচ্ছপ, যেমন গ্যালাপাগোস কচ্ছপ, যা স্থলচর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে দীর্ঘতম জীবনকালের রেকর্ডধারী এবং দুই শতাব্দী ধরে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে—অর্থাৎ, এদের মধ্যে বার্ধক্যজনিত প্রভাব নগণ্য। কচ্ছপের জৈবিক সময়কাল বেশ ভিন্ন: তারা ধীর গতিতে জীবনযাপন করে। তারা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো উষ্ণ-রক্তবিশিষ্ট প্রাণী নয়। তারা ধীরে চলে এবং ধীরে প্রজনন করে, বন্য পরিবেশে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছাতে তাদের প্রায়ই কয়েক দশক সময় লাগে। তাদের হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে মাত্র ৬ বার স্পন্দিত হয় এবং তারা ধীরে শ্বাস নেয়। অন্যান্য দীর্ঘজীবী প্রজাতিগুলো জলজ, যেমন বেলুগা স্টারজন এবং গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর। কচ্ছপের মতো, তাদেরও কোনো তাড়া নেই। শীতযাপনকারী বাদুড়েরা তাদের আকারের তুলনায় ব্যতিক্রমীভাবে দীর্ঘজীবী হয়, তাই এটা স্পষ্ট যে তাদের দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ বিপাকীয় হার নয়। বরং, তাদের এমন বিশেষ প্রক্রিয়া থাকতে পারে যা তাদের বার্ধক্য থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে, পূর্ব আফ্রিকার একটি স্থানীয় প্রজাতির ইঁদুর (সেটি অবশ্য ইঁদুর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রাণী নয়), যা আকারে প্রায় একটি ইঁদুরের সমান, কিন্তু যেখানে একটি ইঁদুর প্রায় দুই বছর বাঁচে, সেখানে এই “নগ্ন মোল ইঁদুর”-টি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় বাঁচতে পারে। তারা হাইড্রা এবং অমর জেলিফিশের মতো নয়, যারা সহজেই নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তবুও, ব্যতিক্রমী দীর্ঘজীবী স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে, তারা আমাদের নিজেদের বার্ধক্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। শিকাগোর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রোশেল বাফেনস্টাইন “নগ্ন মোল ইঁদুর” এর বার্ধক্যের জীববিদ্যা বোঝার জন্য সম্ভবত অন্য সবার চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যখন বাফেনস্টাইন এবং তার সহকর্মীরা অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করা কৌশল ব্যবহার করে  “নগ্ন মোল ইঁদুর” এর ত্বকের কোষে ক্যান্সার সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ, এই ইঁদুরগুলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী জিনের প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সাড়া দেয়।

কোষে ডিএনএ মেরামত ব্যর্থতা (জিনোমিক অস্থিরতা) এবং ক্রোমোজোমীয় প্রান্ত টেলোমেয়ার এর সংক্ষিপ্তকরণ বার্ধক্যের দুটি প্রাথমিক, আন্তঃসম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, যা নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো:

ডিএনএ-মেরামতে ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের যোগসূত্র:

টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। এর ফলে আমাদের জিনোমে (একটি কোষের সমস্ত ডিএনএ-এর জিনগত বা বংশগতিমূলক তথ্য) অস্থিরতা দেখা দেয়। ডিএনএ ক্ষতি হলো ডিএনএ অণুর ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন—যেমন ডিএনএ কাঠামো (স্ট্র্যান্ড) ভেঙে যাওয়া বা ভুল বেস পেয়ারিং—যা বিপাক (যেমন  প্রতিক্রিয়াশীল অণু ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যাল’), বিকিরণ (যেমন অতিবেগুনী বিকিরণ, আয়নাইজিং বিকিরণ/এক্স-রে), এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থের (তামাকের ধোঁয়া) কারণে ঘটে। এক্স-রে যে মিউটেশন ঘটায়, তা আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৬ সালে হারম্যান মুলার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বার্ধক্যের সাথে ডিএনএ-এর এই ক্ষতিগুলোর একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে: যখন ডিএনএ মেরামত ব্যর্থ হয়, তখন এসব ক্ষতি জমা হতে থাকে, যা কোষগুলোকে মিউটেশনের দিকে ঠেলে দেয়। আর কিছু রাসায়নিক এজেন্ট (যেমন অ্যাসিট্যালডিহাইড, ফরমালডিহাইড) ডিএনএ সুত্রকের সঙ্গে আঠার মত যুক্ত হয়ে কোষের ডিএনএ অনুলিপন বা প্রতিলিপন প্রক্রিয়াগুলোকে ব্যাহত করে।  যখন ডিএনএ-র ক্ষতিগুলো মেরামত করা যায় না, যখন আমাদের জিনোম এভাবে এলোমেলো হয়ে যায়, তখন কোষগুলো প্রায়শই বার্ধক্যে প্রবেশ করে— এমন একটি অবস্থা যেখানে তারা বিভাজন বন্ধ করে, ফলে কোষের মৃত্যুও হতে পারে। ডিএনএ-র ক্ষতি বিশেষত স্টেম সেলের জন্য ক্ষতিকর, যেগুলো টিস্যু পূরণের জন্য দায়ী। কিছু  ‘দীর্ঘায়ু জিন’ -ও রয়েছে, যেমন ‘সার্টুইন’ জিন (১-৭) মানুষের সুস্থ জীবনকাল এবং বার্ধক্য-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যথা,বিপাকক্রিয়া ও ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করে। ডিএনএ মেরামতের ক্ষেত্রে সার্টুইন-৬ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এর ঘাটতি ঘটলে বার্ধক্য প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

সুতরাং, জিনোমের অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করা এবং কোষীয় স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ–র মেরামত অপরিহার্য এবং এর জন্য প্রয়োজন নিরন্তর পর্যবেক্ষণ ও মেরামত। কারণ, ডিএনএ মেরামতের প্রতিবন্ধকতা বা ব্যর্থতা অকাল বার্ধক্যজনিত সিন্ড্রোম (যেমন: ককেইন/Cockayne সিন্ড্রোম, ওয়ার্নার সিন্ড্রোম এবং হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোম), স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ, হৃদরোগ এবং অঙ্গের কার্যকারিতায় বয়স–সম্পর্কিত হ্রাসের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তবে, এই ক্ষতিগুলো মোকাবেলা করার জন্য কোষগুলোতে ডিএনএ মেরামতের বিভিন্ন আণবিক কৌশল রয়েছে। এ শুধু আমাদের কোষগুলোর কৌশল নয়, ব্যাকটেরিয়া থেকে মানুষ পর্যন্ত সকল জীবের মধ্যে ডিএনএ মেরামত কৌশলের অনেক কিছুই মূলত একই রকম। ডিএনএ মেরামত জীবনের জন্য এতটাই অপরিহার্য যে এর উৎপত্তি হয়েছিল কোটি কোটি বছর আগে, ব্যাকটেরিয়া এবং উচ্চতর জীবের বিবর্তনেরও আগে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বেস এক্সিশন’ মেরামত (BER), ‘নিউক্লিওটাইড এক্সিশন’ মেরামত (NER), ‘ডিএনএ অমিল/মিসম্যাচ’ মেরামত (MMR), এবং ‘ডাবল–স্ট্র্যান্ড ব্রেক’ মেরামত (DSBR)। এসব মেরামতের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু মেরামতকারী এনজাইম, যারা আমাদের জিনোমের প্রহরী হিসেবে কাজ করে। তবে, এটিও সত্য যে জীবের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিএনএ মেরামতকারী এনজাইমগুলোর দক্ষতা হ্রাস পায়, যা জিনোমের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য ক্যান্সার বিকাশের দিকে পরিচালিত করে। ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। নির্মম শুনালেও সত্য, ৫০-ঊর্ধ্ব বয়সি মানুষের জীবদ্দশায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি রয়েছে ৪০%। মানব ১৭নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত ডিএনএ মেরামতকারী BRCA1 জিনের মিউটেশন নারীদের প্রধানত স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিতে ফেলে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণাগারে কর্মরত শত শত বিজ্ঞানী এই আবিষ্কারগুলোতে অবদান রেখেছেন, কিন্তু সম্মান জানানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের  বেছে নেওয়ার কঠিন কাজটি নোবেল কমিটির উপর বর্তায়। সেই বিবেচনায়, ক্যান্সার ও বার্ধক্য উভয়ের ভিত্তি বোঝার জন্য এবং ডিএনএ মেরামতের এসব কার্যপ্রণালী বিষয়ক গবেষণার জন্য টমাস লিন্ডাল, পল মোডরিচ এবং আজিজ সানকার (তুর্কী) একত্রে ২০১৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।   

 পি-৫৩ (p53) একটি টিউমার দমনকারী জিন: পি-৫৩ জিন পরিবারটি ১ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে বিবর্তিত হয়েছিল এবং বহুকোষী প্রাণীজগতের (মেটাজোয়া) সূচনালগ্নে আধুনিক সামুদ্রিক অ্যানিমোন এবং কোয়ানোফ্ল্যাজেলেটদের সাথে সম্পর্কিত পূর্বপুরুষদের মধ্যে এর আবির্ভাব ঘটে। অর্থাৎ, ব্যাক্টেরিয়াগুলোতে এই জিনটি উপস্থিত থাকে না। বিবর্তনের প্রারম্ভে, এর মূল ভূমিকা ছিল জার্ম-লাইন গ্যামেটকে ডিএনএ-র ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে জটিল সোম্যাটিক স্টেম সেল বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে, এই জিনটি সোম্যাটিক কোষে টিউমারের বৃদ্ধি দমন করার ভূমিকা গ্রহণ করে। হাতি বা তিমির মতো বড় প্রাণীদের আমাদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি কোষ থাকে, যেমন মানুষের তুলনায় তিমির দেহে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। তবুও এই বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিরোধী এবং আমাদের প্রায় সমান বা তার চেয়েও বেশি দিন বাঁচে। বোহেড তিমি বাঁচে ২০০ বছর। যেখানে মানুষের রয়েছে মাত্র একটি পি-৫৩ জিন, সেখানে হাতির জিনোমে রয়েছে সক্রিয় কুড়িটি কপি। অন্যদিকে, বো-হেড তিমি-দের একটি পি-৫৩ জিন থাকলেও তারা CIRBP (কোল্ড-ইনডিউসিবল আরএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন) নামক একটি প্রোটিন উচ্চ মাত্রায় উৎপাদন করে (মানুষের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি), যা ডিএনএ-র প্রান্ত স্থিতিশীল করতে এবং নির্ভুল ডিএনএ মেরামতে সহায়তা করে বলে প্রমাণিত। এছাড়া, এটি মানুষের ক্ষেত্রে কোষীয় চাপের প্রতিক্রিয়ার সাথে জড়িত, দীর্ঘায়ুর সাথে নয়। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের একটিমাত্র পি-৫৩ জিনটিতে একটি অনন্য, হাঙ্গর-নির্দিষ্ট মিউটেশন রয়েছে যা এটিকে ব্যতিক্রমীভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং তাদের ৪০০ বছরের জীবদ্দশায় ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানব ১নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত আরও একটি জিন m-TOR (‘এম-টোর’: মেকানিস্টিক টার্গেট অব রাপামাইসিন) এবং এর প্রোটিন (প্রোটিন কাইনেজ) কোষীয় স্তরে দীর্ঘায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিণত হয়েছে। এটি খামির থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের জীবনের মধ্যেই পাওয়া যায়। ‘এম-টোর’ একটি প্রধান পুষ্টি-সংবেদনকারী প্রোটিন, যা পুষ্টির পর্যাপ্ততায় বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে, কিন্তু ত্বরান্বিত ‘এম-টোর-কার্যকলাপ’ বার্ধক্য এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগগুলোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, পুষ্টির স্বল্পতায় বা অভাবে অটোফ্যাজি-নামক কোষীয় নবায়ন ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করে, যা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ এবং প্রোটিনগুলোকে পরিষ্কার করে এবং বার্ধক্যজনিত ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে। ২০১৬ সালে অটোফেজি বিষয়ক আবিষ্কারের জন্য ইয়োশিনোরি ওসুমি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলোর সংকোচন বার্ধক্যের আরও একটি বড় কারণ:

একটি ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তে একধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক ডিএনএ অনুক্রম (TTAGGG) হলো “টেলোমেয়ার” বা সুরক্ষাকবচ, যা বিশেষ কিছু প্রোটিন (শেল্টারিন) দ্বারা আবদ্ধ থাকে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়া, সকল অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী জীবের জিনোমে টেলোমেয়ার পাওয়া যায়। মানুষের প্রতিটি কোষে মাত্র বিরানব্বইটি টেলোমেয়ার রয়েছে; ছেচল্লিশটি ক্রোমোজোমের প্রতিটির জন্য দুটি করে।  আমাদের জীবনের শুরুতে ক্রোমোজোমের দুইপ্রান্তে এই টেলোমেয়ারগুলোয় থাকে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ নিউক্লিওটাইড। এদের স্যাটেলাইট ডিএনএ-ও বলা হয়। এই অঞ্চলটি কোনও প্রোটিনের জন্য কোডিং বা সংকেত বহন করে না, বরং এটি ক্রোমোজোমের প্রান্তকে সুরক্ষা দেয়। ধারাবাহিক বেশ কিছু কোষ বিভাজনের পর, টেলোমেয়ারগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈর্ঘ্যে পৌঁছায়, যখন বিভাজন বন্ধ হয়ে কোষটি বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে বয়বৃদ্ধের ডিএনএ-তে দেখা যায় মাত্র ১,৫০০ নিউক্লিওটাইড (ছবি দেখুন)। অর্থাৎ, প্রতিটি কোষ বিভাজনের সময় প্রায় ৫০ – ২০০টি নিউক্লিওটাইড প্রান্ত থেকে ঝরে যায়, ফলে ধীরে ধীরে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে। টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো যা মারা না গিয়ে শরীরে জমে থাকে এবং সুস্থ কোষের ক্ষতি করে- এগুলোকে বলে সেনেসেন্ট কোষ। এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন, ক্যারল গ্রেইডার এবং জ্যাক সোস্টাক ২০০৯ সালে টেলোমেয়ার ও টেলোমারেজ নামক এনজাইমের মাধ্যমে ক্রোমোজোম কীভাবে সুরক্ষিত থাকে এবং কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া কীভাবে উন্মোচিত হয়, তা আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। বেশিরভাগ টিস্যুর কোষ খুব সামান্য বা একেবারেই ‘টেলোমারেজ’ তৈরি করে না। সুতরাং, এই এনজাইমটির অনুপস্থিতে ঝরে যাওয়া ক্রমগুলো পুনরুদ্ধার হয় না। ব্যতিক্রম শুধু জননকোষ, স্টেম কোষ, নার্ভীয় স্টেম কোষ এবং ক্যান্সার কোষ, যেখানে ‘টেলোমারেজ’ এনজাইম অবিরত সংশ্লেষিত হয় এবং ক্রোমোজোমপ্রান্তে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হয় না, কারণ এনজাইমটি টেলোমেয়ার পুনর্নির্মাণ করতে পারে । ফলে ওই কোষগুলো আরও অনেক বার, এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভক্ত হতে পারে। একটি কোষ যে অমর নয়, অর্থাৎ একটি কোষ যে অনন্তকাল ধরে বিভাজিত হতে পারে না, এই ধারণাটি প্রথমে দিয়েছিলেন মার্কিন অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ/অ্যনাটমিস্ট লিওনার্ড হেইফ্লিক ১৯৬১ সালে। কোষ বিভাজনের এই সীমিত ক্ষমতাকে ‘হেইফ্লিক সীমা’বলা হয়। কোষগুলো হেইফ্লিক সীমাতে পৌঁছালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে প্রোগ্রামকৃত কোষমৃত্যু (অ্যাপোপটোসিস) প্রক্রিয়ায় কোষটির মৃত্যু হতে পারে। 

শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি প্রকৃতকোষীয় (মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী) জীবের জন্য এটি গ্রহণযোগ্য। যেমন, সিশেল (Seychelles) বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের কচ্ছপগুলো প্রায় ২০০-২৫০ বছর বাঁচে, কিংবা “কুয়াহগ”জাতীয় একধরনের সামুদ্রিক ঝিনুক ৪০০ বছর এবং সামুদ্রিক লবস্টার ১৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মানুষের তুলনায় তাদের সুদীর্ঘ টেলোমেয়ার এবং তার অবক্ষয়ের ধীর গতি-ই হল দীর্ঘায়ুর মূল কারণ। মানুষের টেলোমেয়ারের সংকোচনের হারকে বার্ধক্যসহ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ এবং লৈঙ্গিক পার্থক্য

নারীদের টেলোমেয়ার সাধারণত পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘ থাকে। এই পার্থক্যটি মূলত ইস্ট্রোজেনের মতো হরমোনজনিত কারণগুলোর সাথে যুক্ত। ইস্ট্রোজেন হরমোন টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপকে উদ্দীপিত করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে (Aging Cell. ২০২২)। পুরুষদের ক্ষেত্রে, বিশেষকরে কিছু কিছু টিস্যুতে, কোষ বিভাজনের সম্ভাব্য উচ্চ হার  এবং ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য কমাতে অবদান রাখতে পারে। উপরন্তু, নারীদের মধ্যে এক্স (X) ক্রোমোজোমে অবস্থিত DKC1-এর মতো জিনের দ্বি-অ্যালিলিক প্রকাশ (অর্থাৎ, জিনের উভয় কপি (অ্যালিল) সক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়) টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে সম্ভাব্যভাবে টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা ধরে রাখে। প্রসঙ্গত, DKC1 জিন ‘ডিস্কেরিন’ প্রোটিন তৈরির জন্য নির্দেশনা প্রদান করে, যা টেলোমেরেজ সক্রিয় রাখার এবং রাইবোজোমীয় আরএনএ (rRNA) একত্রিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্কেরিন টেলোমেরেজ কমপ্লেক্সকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে, যা কোষ বিভাজনের সময় টেলোমেয়ারকে ছোট হওয়া থেকে রক্ষা করে।

কোষ থেকে ‘বৃত্তাকার আরএনএ (CircRNA)’ অপসারণ আয়ু বাড়ায়:

বৃত্তাকার আরএনএ (circRNA) হলো সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক শ্রেণীর ননকোডিং আরএনএ। এগুলো অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী প্রাণীদের সর্বত্রই  পাওয়া যায়, যারা বিভিন্ন জৈবিক কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে জিনের নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প স্প্লাইসিং, এবং এমনকী প্রোটিন সংশ্লেষণ। এখন পর্যন্ত, বৃত্তাকার আরএনএ  প্রধানত “বার্ধক্যের চিহ্ন” হিসেবে পরিচিত ছিল, কারণ এর উচ্চ স্থিতিশীলতার কারণে এটি বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্ষয় না হয়ে কোষে জমা হতে থাকে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় (কিম এট অল, মলিকিউলার সেল, ২০২৬) দেখা গিয়েছে যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে, দীর্ঘায়ুর জন্য অপরিহার্য আরএনএ-অবক্ষয়কারী প্রোটিন/এনজাইম  ‘আরএনএ-য়েজ -কে’ (RNASEK) বা ‘রাইবোনিউক্লিয়েজ কাপ্পা’ -এর পরিমাণ হ্রাস পায়, যার ফলে কোষের মধ্যে বৃত্তাকার আরএনএ-এর অস্বাভাবিক জমাট বেঁধে বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যা কোষের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে এবং বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই অবস্থায়, বয়স-নির্ভর বৃত্তাকার আরএনএ-গুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আরএনএ-সেক এর ব্যবহার মানব বার্ধক্য এবং অবক্ষয়জনিত রোগের চিকিৎসার কৌশল বিকাশে সাহায্য করতে পারে। রাইবোনিউক্লিয়েজ-কাপ্পা (RNASEK) সার্কুলার আরএনএ-অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে বয়স-নির্ভর সার্কুলার আর এনএ জমা হওয়াকে প্রতিরোধ করে।

জৈবিক অমরত্বের অন্বেষণে:

“অমরত্ব” শব্দটি প্রথম সেই-সব ক্যান্সার কোষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যেগুলো টেলোমেয়ার-দীর্ঘকারী এনজাইম ‘টেলোমারেজ’প্রকাশ করত এবং এর ফলে তারা ‘অ্যাপোপটোসিস’ বা কোষ-মৃত্যু এড়িয়ে যেত। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেসব সেল লাইনগুলোর জন্য, যেমন  ‘হি-লা’ এবং ‘জুরকাত’ ক্যান্সার সেল লাইন, যারা বাস্তবিক অর্থে অমর —পুষ্টির অভাব না হলে তাদের মৃত্যু নেই। জীবজগতেও, বেশ কয়েকটি প্রজাতির মধ্যেও “জৈবিক অমরত্ব” পরিলক্ষিত হয়েছে। অবশ্যই, গাছপালা তাদের পুনর্জন্মের বা ‘রিজেনেরেশন’ ক্ষমতার কারণে আমাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। তবে, প্রাণীজগতেও এমন কিছু প্রজাতি রয়েছে যাদের গাছের মতো বৈশিষ্ট্য আছে। যদি একটি তারামাছের বাহু কাটা যায়, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে আবার গজিয়ে উঠতে পারে। যদি প্লেনারিয়া নামক একটি মুক্তজীবী ‘চ্যাপ্টা কৃমি’-কে দশটি ভাগে কাটা হয়, সেগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ দশটি প্লেনারিয়া জণ্ম নেয়। হাইড্রা নামক একটি ছোট জলজ প্রাণী আরও বেশি আশ্চর্যজনক: এর বয়স যেন বাড়েই না এবং এটি ক্রমাগত টিস্যু পুনরুৎপাদন করতে সক্ষম।  একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র এর মাথা পুনরুৎপাদনের জন্য প্রচুর সংখ্যক জিন জড়িত থাকে। এই সবকিছু এমন একটি জীবের জন্য যা দৈর্ঘ্যে মাত্র আধা ইঞ্চি। ট্রান্সডিফারেনসিয়েশনের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক মেরুদণ্ডী একপ্রকার অর্ধ-জলজ উভচর প্রাণী ‘নিউট’ এর চোখের লেন্স-পুনর্জন্ম একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে লেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের ‘আইরিস এপিথেলীয় কোষ’ সংখ্যাবৃদ্ধি করে একটি নতুন লেন্স তৈরি করে। আমাদের (মানুষের) প্রাপ্তবয়স্কতায়, আংশিকভাবে, এই পুনর্নবায়নমূলক সুবিধা রয়েছে, শুধুমাত্র যকৃতে। যকৃত তার হেপাটোসাইট (যকৃত কোষ)-এর স্টেম সেলের মতো আচরণের কারণে সম্পূর্ণভাবে (৯০% পর্যন্ত) পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ক্ষমতার দিক থেকে অনন্য। এই কোষগুলো আঘাত পেলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বিভাজিত হয়ে যকৃত পুনরুদ্ধার করে। ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড বা কিডনির মতো অন্যান্য অঙ্গের এই পুনরুজ্জীবনের নমনীয়তা নেই, কারণ তাদের কোষগুলো চূড়ান্ত ও বিশেষায়িত রূপে আবদ্ধ থাকে এবং নবায়নের চেয়ে তাৎক্ষণিক কার্যকারিতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে, জেব্রাফিশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হৃৎপিণ্ডের গঠন ও কার্যকারিতা, Hmga1- এর মতো প্রোটিনের মহানুভবতায়, সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করে, যা এদেরকে মানব হৃৎপিণ্ডের নিরাময় প্রক্রিয়া অধ্যয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেলে পরিণত করে। পক্ষান্তরে, মানব হৃৎপিণ্ডের কোষগুলো (কার্ডিওমায়োসাইট) পলিপ্লয়েড (একটি কোষে দুইয়ের অধিক ক্রোমোজোম সেট ধারণকারী- 4n, 8n ) হওয়ায় দৃঢ়তা প্রদান করতে পারে, যা হৃৎপেশিকোষগুলোকে ক্ষতি, জারণজনিত পীড়ন এবং বিপাকীয় চাপ সামলাতে পারে; কিন্তু তারা প্রয়োজনে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ তৈরি করতে পারে না। 

তবে, এক আশ্চর্যজনক প্রজাতি হলো ‘টুরিটোপসিস ডব্রনি’, যা অমর জেলিফিশ নামে পরিচিত। এই জেলিফিশ আঘাত, চাপ বা বার্ধক্যের সম্মুখীন হলে সে তার যৌবন বয়সে ফিরে যায় এবং নতুন করে জীবন শুরু করে। এটা অনেকটা এমন, যেন একটি আহত প্রজাপতি নিজেকে আবার শুঁয়োপোকায় রূপান্তরিত করে নতুন করে জীবন শুরু করে। যেহেতু হাইড্রা এবং অমর জেলিফিশের মধ্যে বার্ধক্যের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না, তাই এদেরকে প্রায়শই জৈবিকভাবে অমর বলা হয়। অর্থাৎ, বয়সের সাথে সাথে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে না। পরিশেষে, সেই অমর প্রাণীদের কাছ থেকে আমরা যা জেনেছি তা হলো “অবিরাম স্টেম সেল পুনর্নবীকরণ, উন্নত ডিএনএ মেরামত, এবং কোষীয় রিপ্রোগ্রামিং (ট্রান্সডিফারেনসিয়েশন)” এর মাধ্যমে অনির্দিষ্ট দীর্ঘায়ু সম্ভব, যেখানে পরিপক্ক কোষগুলো টিস্যু পুনরুত্পাদনের জন্য ‘প্লুরিপোটেন্ট’ (পুনর্নবায়নকারী) অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। তবে যাই হোক, হাইড্রা বা জেলিফিশ থেকে প্রাপ্ত আবিষ্কার আমাদের মতো জটিল জীবনব্যবস্থায় কাজে লাগাতে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে।

একটি বিশেষ পরামর্শ:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তিটির মাধ্যমে সময়ের গভীর এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। প্রজাপতির আয়ু খুব স্বল্প, কিন্তু সে সেই সীমাবদ্ধ সময়ের মধ্যেও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করে। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য—আমরা দীর্ঘ সময়ের হিসেব করে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, যদি বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিই এবং প্রাণবন্তভাবে বাঁচার চেষ্টা করি, তবে আমাদের হাতেও জীবনের আনন্দ আস্বাদনের জন্য যথেষ্ট সময় থাকে। অর্থাৎ, জীবনের সার্থকতা সময়ের দৈর্ঘ্যের ওপর নয়, বরং মুহূর্তের গভীরতার ওপর নির্ভর করে:

“প্রজাপতি সেতো বরষ না গণে,

নিমেষ গণিয়া বাঁচে,

সময় তাহার যথেষ্ট তাই আছে॥”

 

সাহায্যকারী নোট:

DKC1 জিন (Dyskeratosis Congenita 1): এই জিনটি ‘ডিসকেরিন’ নামক প্রোটিন সংশ্লেষ করে। এই প্রোটিনটি টেলোমারেজকে স্থিতিশীল রাখা, ক্রোমোজোমের প্রান্তে টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখা এবং রাইবোজোমীয়  আরএনএ -এর প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিহার্য। DKC1 জিনে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটলে ‘এক্স-লিংকড ডিসকেরাটোসিস কঞ্জেনিটা’ নামক একটি রোগ দেখা দেয়; এটি একটি বিরল ও অকালবার্ধক্যজনিত সিনড্রোম, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো অস্থিমজ্জার অকার্যকারিতা, ত্বকের অস্বাভাবিকতা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি। ডিসকেরিন প্রোটিন টেলোমারেজের আরএনএ উপাদানের (TERC) সাথে যুক্ত হয়ে টেলোমারেজের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। এছাড়া এটি জোমীয় আরএনএ-এর একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়া—’সিউডোইউরিডিলেশন’ (pseudouridylation)—এর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রাইবোসোম গঠনের প্রক্রিয়ায়ও এর ভূমিকা রয়েছে।

বিপাকীয় হার (Metabolism rate): বিপাকীয় হার বা মেটাবলিক রেট হলো সেই গতি, যে গতিতে আমাদের শরীর শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত ​​সঞ্চালন এবং কোষ উৎপাদনের মতো অপরিহার্য জীবন কার্য সম্পাদনের জন্য ক্যালোরি পোড়ায়, যা সাধারণত ২৪ ঘণ্টা ধরে পরিমাপ করা হয়। এটি বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR)—অর্থাৎ বিশ্রামের সময় ব্যবহৃত শক্তি—এবং শারীরিক কার্যকলাপ ও হজমের মাধ্যমে পোড়ানো ক্যালোরি নিয়ে গঠিত। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিশ্রামের সময় দৈনিক প্রায় ১,২০০–২,০০০ ক্যালোরি (কিলোক্যালোরি) পোড়ায়, সেখানে একটি ইঁদুরের বিপাকীয় হার তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি। একটি ইঁদুর শুধুমাত্র বিশ্রামকালীন শক্তি ব্যয়ের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোক্যালোরি পোড়ায়। এর কারণ হলো: ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃষ্ঠতল-থেকে-ভর  (surface-to-mass) অনুপাত মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, যার অর্থ হলো তারা দ্রুত তাপ হারায় এবং শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য তাদের দ্রুত শক্তি পোড়াতে হয়।

প্লুরিপোটেন্সি (pluripotency): একটি কোষ যখন তার বিভাজনের মাধ্যমে ভিন্ন জাতীয় কোষ তৈরি করার  জিনগত বিশেষ এক ক্ষমতা রাখে, তখন  সেই সামর্থ্যকে বলা হয় কোষটির প্লুরিপোটেন্সি ও কোষটিকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্ট। সামর্থ্যের তারতম্যে স্টেম কোষকে কখনও বলা হয় টোটিপটেন্ট, প্লুরিপোটেন্ট, বা মাল্টিপোটেন্ট, যেমন প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতা টোটিপটেন্ট কোষের তুলনায় কম। কোষ জীববিজ্ঞানে, প্লুরিপোটেন্সি বলতে ভ্রূণীয় স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতাকে বুঝায়, যা তিনটি ভ্রূণীয় স্তরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে: এন্ডোডার্ম, মেসোডার্ম বা এক্টোডার্ম। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলো একটি জীবের বেশিরভাগ বা সমস্ত কোষে বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ জীবে বিকাশ করতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে ভ্রূণীয় স্টেম সেল, অম্বিলিকাল কর্ড স্টেম সেল এবং প্ররোচিত বা ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃত্রিমভাবে প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (যা সাধারণত iPS কোষ বা iPSCs হিসাবে পরিচিত) সৃষ্টি করা হয় সাধারণত একটি পরিপক্ক দেহকোষ কোষ থেকে এবং নির্দিষ্ট কিছু জিন ও ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের উদ্দীপনার মাধ্যমে কোষগুলোরকে রিপ্রোগ্রামিং করা হয়। ফলশ্রুতিতে, এই উদ্দীপ্ত দেহকোষগুলো প্রাথমিক ভ্রূণ কোষগুলোর মতোই জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে ও ফিরে পায় প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতা।  এই পদ্ধতিতে,  চারটি  ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (Oct4, Sox2, Klf4 ও c-Myc)র  উদ্দীপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট করে জীব বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে  দিয়েছিলেন  বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ও জন গার্ডন। তাঁদের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁরা (শিনিয়া ইয়ামানাকা এবং জন গারডন) ২০১২ সালের নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।  iPSCs প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আণবিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। 

মন্তব্য

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
জনপ্রিয়

প্রচলিত অর্থে বার্ধক্যকে সময়ের সাথে সাথে শারীরবৃত্তীয়, দৈহিক এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার প্রগতিশীল এবং অপরিবর্তনীয় অবক্ষয় হিসেবে বোঝা হয়, যা বর্ধিত দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা এবং অবশেষে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে

রক্ষণাবেক্ষণ বনাম বংশবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব: বার্ধক্যের গোপন বিজ্ঞান

১১:৪৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

সারসংক্ষেপ: প্রাকৃতিক নির্বাচন মূলত প্রজনন সক্ষমতা এবং বংশবিস্তারের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যেহেতু বার্ধক্যে প্রজনন ক্ষমতা কমে বা শেষ হয়ে যায়, তাই এই সময়ে ঘটা ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলোকে দূর করার জন্য প্রকৃতির ওপর কোনো বিশেষচাপথাকে না। একারণেই বার্ধক্যজনিত ত্রুটিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে।  রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে বংশবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে শরীরের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্রুটি বা ‘ড্যামেজ’ জমা হতে থাকে। অল্প বয়সে শরীর এই ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মেরামতের অভাব প্রকট হয়, যার ফলে কোষের কার্যক্ষমতা কমে যায়, ধেয়ে আসে বার্ধক্য। এর মূলে রয়েছে শক্তির ব্যবহার। জীববিজ্ঞানে শক্তি সীমাবদ্ধ। একই সময়ে শরীর মেরামতের (ডিএনএ মেরামত, রোগ প্রতিরোধ) এবং প্রজনন ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয় না। জীববিজ্ঞানে “রক্ষণাবেক্ষণ বনাম বংশবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব”  হলো একটি মৌলিক ধারণা, যেখানে জীব তার সীমিত শক্তি শরীর সচল রাখা (রক্ষণাবেক্ষণ/বেঁচে থাকা) নাকি নতুন বংশধর তৈরিতে (বংশবৃদ্ধি) ব্যয় করবে, তা নির্ধারণ করে। এই দ্বন্দ্বে বেশি শক্তি বংশবৃদ্ধিতে দিলে আয়ু কমে।

মূলশব্দ: বার্ধক্য, পুনরুজ্জীবন/রিজেনেরেশন, হেফ্লিক সীমাবদ্ধতা, ডিএনএ মেরামত, টেলোমেয়ার, পি-৫৩, m-TOR, অটোফ্যাজি, জৈবিক অমরত্ব।

 

আত্ম-সচেতনতায় সক্ষম একটি মস্তিষ্কের বিবর্তনে আমরা আমাদের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছি, যা অন্যান্য জীব, এমনকী উদ্ভিদের মতো জটিল জীবও মৃত্যুকে উপলব্ধি করতে পারে না, এবং  তখন থেকে মৃত্যুর জ্ঞান আমাদের কাছে এতটাই ভীতিকর যে, আমাদের জীবনের অধিকাংশ সময় তা বুঝতে এড়িয়ে চলি। আর যখন কেউ মারা যায়, তখন মৃত্যুর চূড়ান্ততা মেনে নিতে পারি না, বরং তার পরিবর্তে “পরলোকগমন করেছেন” বা “প্রয়াত হয়েছেন” বা “তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন” এগুলোর মতো সুভাষণ আমরা ব্যবহার করি, যা বোঝায় যে মৃত্যু চূড়ান্ত নয়, বরং অন্য কিছুতে রূপান্তর মাত্র মর্ত্যলোক থেকে পরলোকে গমন, এবং এই রূপান্তর আমাদের সংস্কৃতিতে, নানা ধর্মে, বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উচ্চশ্রেণির পশুদের নিজেদের কেউ মারা গেলে তারা তা চিনতে পারে, বুঝতে পারে, এবং কেউ কেউ তাদের জন্য শোকও প্রকাশ করে বটে (যেমন হাতির ক্ষেত্রে দেখেছি); কিন্তু পশুরা যে তাদের নিজেদের মরণশীলতা সম্পর্কে সচেতন, তার কোনো প্রমাণ নেই। 

প্রচলিত অর্থে বার্ধক্যকে সময়ের সাথে সাথে শারীরবৃত্তীয়, দৈহিক এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার প্রগতিশীল এবং অপরিবর্তনীয় অবক্ষয় হিসেবে বোঝা হয়, যা বর্ধিত দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা এবং অবশেষে মৃত্যুর দিকে পরিচালিত করে। এটিকে একটি রোগ হিসেবে না দেখে, বরং ক্ষয়ের একটি স্বাভাবিক, সার্বজনীন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হলো দেহের কোষগুলোতে এমনসব ক্ষতিকর পরিবর্তন সঞ্চিত হয়, যা একটি জীবের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে এবং অবশেষে তা সমগ্র দেহের বিকলতা, অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। মৃত্যু বার্ধক্যের ফল। যখন আমাদের কোষ-সংগ্রহ যা টিস্যু এবং অঙ্গগুলো গঠন করে, তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে, তারা আর একক হিসেবে একসাথে কাজ করে না, তখন আমরা মারা যাই। কোষগুলোর ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে বুড়িয়ে যাওয়া বা বার্ধক্য। তাই, কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে, বার্ধক্য কি অনিবার্য?  

বার্ধক্যের চিরায়ত বিবর্তনীয় তত্ত্বসমূহ:

যদি আমাদের ডিএনএ-তে অবস্থিত জিনগুলোর পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারণ নিশ্চিত করা-ই লক্ষ্য হয়, তাহলে বিবর্তন শুরুতেই বার্ধক্যকে প্রতিরোধ করেনি কেন? এই ধাঁধার সমাধান শুরু হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক অভিজাত শ্রেণির দুই সদস্য, জে. বি. এস. হ্যালডেন এবং রোনাল্ড ফিশারের হাত ধরে। তাঁরা উভয়েই উপলব্ধি করেন, কোষে “মিউটেশন অ্যাকুমুলেশন” বা “ক্ষতিকর জিনগুলোর সঞ্চয়ন” হলো বার্ধক্যের মূল কারণ, যখন জীবনের শুরুতে ক্ষতিকর মিউটেশন বা পরিব্যক্তিগুলোর বিরুদ্ধে প্রবলভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে, নইলে যারা এগুলো বহন করে তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারবে না; কিন্তু, জীবনের মাঝ বয়সে বা বার্ধক্যে এসব ক্ষতিকারক মিউটেশনের প্রতি ‘নির্বাচন’ কাজ করে না, সাড়া দেয় না। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবনের পরবর্তী সময়ের তুলনায় যৌবনে প্রজনন এবং টিকে থাকার উপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব বেশি শক্তিশালী। 

এক ধাপ এগিয়ে, জীববিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস (১৯৫৭) প্রস্তাব করেন যে, বার্ধক্য ঘটে কারণ প্রকৃতি জীবনের প্রথম দিকে জিনগত বৈচিত্র্যগুলোকে নির্বাচন করে (যেমন উচ্চ উর্বরতা বা বৃদ্ধি), যদিও পরবর্তী জীবনে সেগুলো মিউটেশন বা অবক্ষয়ের কারণে ক্ষতিকরও হয়। এর অর্থ হলো, একই জিনের সময়ের পরিবর্তনে বিপরীতধর্মী প্রভাব থাকতে পারে- যে কারণে এই তত্ত্বটির নামকরণ হয়েছে ‘অ্য”ন্টাগনিস্টিক প্লিওট্রপি।“ অর্থাৎ, বার্ধক্যের সাথে জড়িত এই জিনগুলো জীবনের শুরুতে সহায়ক হয়, কিন্তু পরে সমস্যা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, যে জিনগুলো জীবনের শুরুতে আমাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, সেগুলোই বৃদ্ধ বয়সে ক্যান্সার এবং আলঝেইমার্স এর মতো বয়স-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নির্দিষ্টভাবে এই তত্ত্বের পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। ‘অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন’- নামক একটি প্রোটিন লিপিড-বিপাকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন-ইপ্সিলন৪ (APOE-ε4), অ্যাপোলাইপোপ্রোটিনের একটি ভ্যারিয়েন্ট, জিনটি আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং আয়ু হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত। ট্রাম্বল ও তার সহকর্মীদের (২০২৩) একটি  গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব নারীদের এই জিনটির (অ্যাপো-ই৪) দুটি অনুলিপি থাকে, তারা এই জিনটির অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট- সংমিশ্রণযুক্ত নারীদের তুলনায় বেশি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যদিও এটি পরবর্তী জীবনে আলঝেইমার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি এই তত্ত্বটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে APOE-ε4 একটি ‘অ্যান্টাগনিস্টিক প্লিয়োট্রপি’ জিন।    

একইভাবে, ‘ডিসপোজেবল সোমা’ (Disposable soma) হাইপোথিসিস অনুযায়ী, সীমিত সম্পদসম্পন্ন একটি জীবকে তার সম্পদ দুটি ভাগে ভাগ করতে হয়: একটি হলো প্রাথমিক বৃদ্ধি ও প্রজননে বিনিয়োগ করা এবং অন্যটি হলো কোষের ক্ষয়ক্ষতি ক্রমাগত মেরামত করে জীবন দীর্ঘায়িত করা। ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী টমাস কার্কউড, যিনি ১৯৭০-এর দশকে প্রথম এই তত্ত্বটি প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁর মতে, একটি জীবের বার্ধক্য হলো দীর্ঘায়ু এবং প্রজননগত সাফল্যের মাধ্যমে তার জিন পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরের বর্ধিত সম্ভাবনার মধ্যে একটি বিবর্তনীয় আপস-মীমাংসা।

প্রাণীদের আকার, জীবনকাল এবং বিপাকীয় হার যেন একসুতোয় বাঁধা: 

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের জীবনকালে যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে। কিছু ছোট মাছ মাত্র কয়েক মাস বাঁচে, অন্যদিকে একটি বো-হেড তিমি ২০০ বছরেরও বেশি সময় বাঁচে এবং একটি গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর প্রায় ৪০০ বছর বাঁচে। এই বিস্তৃত আয়ুষ্কালের পেছনে জৈবিক রহস্য কী? স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণভাবে প্রাণী আকারে যত বড় হয়, তার জীবনকালও তত দীর্ঘ হয়। বিবর্তনগতভাবে এটি যৌক্তিক। মনে হয় যেন এক ধরনের “জৈবিক সময়রক্ষক” রয়েছে, যেখানে জীবনকাল এবং বিপাকীয় হার একে অপরের সাথে জড়িত। ছোট প্রাণীদের দ্রুত বিপাকের ফলে তাদের “জীবনের গতি” দ্রুততর হয়, যার ফলে হৃৎস্পন্দনের হার বেশি (যেমন একটি ছুঁচোর হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০০০ বারের বেশি, একটি ইঁদুরের ৭০০ বার) এবং জীবনকাল সংক্ষিপ্ত হয় (১ থেকে ২ বছর)। বিপরীতভাবে, বড় প্রাণীদের (যেমন, তিমি/হাতি) ধীর বিপাকের কারণে তাদের জীবনের গতিও ধীর হয়, যার ফলে হৃৎস্পন্দনের হার কম থাকে (প্রতি মিনিটে প্রায় ৩০ বার); অর্থাৎ, তাদের হৃদস্পন্দনের হার কমে যাওয়ার অনুপাতে তাদের আয়ুষ্কালও বৃদ্ধি পায়। বিপাকীয় হার সরাসরি শক্তি, বিশেষত অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। ১৯৩০-এর দশকে ম্যাক্স ক্লেইবার নামে একজন সুইস জীববিজ্ঞানী একটি নীতি প্রণয়ন করেছিলেন যা জৈবিক জগতে একটি আকর্ষণীয় প্যাটার্ন প্রকাশ করে। একটি জীবের বিপাকীয় হার— যে গতিতে এটি শক্তি ব্যবহার করে— সরাসরি তার শরীরের ভরের সাথে স্কেল করে না। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রাণীর ভর M হয়, তবে তার বিপাকের হার M৩/৪ (বা M.৭৫)-এর সমানুপাতিক। যেহেতু হৃদস্পন্দনও বিপাকীয় হারের সাথে সমানুপাতিক, তাই ইঁদুর থেকে তিমি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পুরো জীবনকালে সাধারণত প্রায় একই সংখ্যক হৃদস্পন্দন থাকে: প্রায় ১.৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি)। বর্তমানে মানুষের এর প্রায় দ্বিগুণ রয়েছে (৩ বিলিয়ন)। মানুষ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম (গ্রাফে দেখুন, সীমা-বহির্ভূত  মান/outlier)। এর কারণ হলো চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি, যা আমাদের আয়ুষ্কালকে আমাদের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের হারের চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে (নিচের ছবিটি দেখুন)। 

তবে, প্রাণীদের আকারের তুলনায় প্রত্যাশিত আয়ুর চেয়ে অনেক বেশি বা অনেক কম বেঁচে থাকার ব্যতিক্রমও রয়েছে।  যেমন, আমরা প্রত্যাশার চেয়ে ৫ গুণ বেশি দিন বাঁচি, যার ব্যাখ্যা পূর্বেই দেয়া হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী প্রজাতিগুলোকে নিয়ে গবেষণা করেছেন স্টিভেন অস্টাড (ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র)। এসব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বিশালাকায় কচ্ছপ, যেমন গ্যালাপাগোস কচ্ছপ, যা স্থলচর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে দীর্ঘতম জীবনকালের রেকর্ডধারী এবং দুই শতাব্দী ধরে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে—অর্থাৎ, এদের মধ্যে বার্ধক্যজনিত প্রভাব নগণ্য। কচ্ছপের জৈবিক সময়কাল বেশ ভিন্ন: তারা ধীর গতিতে জীবনযাপন করে। তারা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো উষ্ণ-রক্তবিশিষ্ট প্রাণী নয়। তারা ধীরে চলে এবং ধীরে প্রজনন করে, বন্য পরিবেশে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছাতে তাদের প্রায়ই কয়েক দশক সময় লাগে। তাদের হৃৎপিণ্ড প্রতি মিনিটে মাত্র ৬ বার স্পন্দিত হয় এবং তারা ধীরে শ্বাস নেয়। অন্যান্য দীর্ঘজীবী প্রজাতিগুলো জলজ, যেমন বেলুগা স্টারজন এবং গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর। কচ্ছপের মতো, তাদেরও কোনো তাড়া নেই। শীতযাপনকারী বাদুড়েরা তাদের আকারের তুলনায় ব্যতিক্রমীভাবে দীর্ঘজীবী হয়, তাই এটা স্পষ্ট যে তাদের দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ বিপাকীয় হার নয়। বরং, তাদের এমন বিশেষ প্রক্রিয়া থাকতে পারে যা তাদের বার্ধক্য থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে, পূর্ব আফ্রিকার একটি স্থানীয় প্রজাতির ইঁদুর (সেটি অবশ্য ইঁদুর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রাণী নয়), যা আকারে প্রায় একটি ইঁদুরের সমান, কিন্তু যেখানে একটি ইঁদুর প্রায় দুই বছর বাঁচে, সেখানে এই “নগ্ন মোল ইঁদুর”-টি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় বাঁচতে পারে। তারা হাইড্রা এবং অমর জেলিফিশের মতো নয়, যারা সহজেই নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তবুও, ব্যতিক্রমী দীর্ঘজীবী স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে, তারা আমাদের নিজেদের বার্ধক্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। শিকাগোর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রোশেল বাফেনস্টাইন “নগ্ন মোল ইঁদুর” এর বার্ধক্যের জীববিদ্যা বোঝার জন্য সম্ভবত অন্য সবার চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যখন বাফেনস্টাইন এবং তার সহকর্মীরা অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করা কৌশল ব্যবহার করে  “নগ্ন মোল ইঁদুর” এর ত্বকের কোষে ক্যান্সার সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ, এই ইঁদুরগুলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী জিনের প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে সাড়া দেয়।

কোষে ডিএনএ মেরামত ব্যর্থতা (জিনোমিক অস্থিরতা) এবং ক্রোমোজোমীয় প্রান্ত টেলোমেয়ার এর সংক্ষিপ্তকরণ বার্ধক্যের দুটি প্রাথমিক, আন্তঃসম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত, যা নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো:

ডিএনএ-মেরামতে ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের যোগসূত্র:

টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। এর ফলে আমাদের জিনোমে (একটি কোষের সমস্ত ডিএনএ-এর জিনগত বা বংশগতিমূলক তথ্য) অস্থিরতা দেখা দেয়। ডিএনএ ক্ষতি হলো ডিএনএ অণুর ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন—যেমন ডিএনএ কাঠামো (স্ট্র্যান্ড) ভেঙে যাওয়া বা ভুল বেস পেয়ারিং—যা বিপাক (যেমন  প্রতিক্রিয়াশীল অণু ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যাল’), বিকিরণ (যেমন অতিবেগুনী বিকিরণ, আয়নাইজিং বিকিরণ/এক্স-রে), এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থের (তামাকের ধোঁয়া) কারণে ঘটে। এক্স-রে যে মিউটেশন ঘটায়, তা আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৬ সালে হারম্যান মুলার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বার্ধক্যের সাথে ডিএনএ-এর এই ক্ষতিগুলোর একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে: যখন ডিএনএ মেরামত ব্যর্থ হয়, তখন এসব ক্ষতি জমা হতে থাকে, যা কোষগুলোকে মিউটেশনের দিকে ঠেলে দেয়। আর কিছু রাসায়নিক এজেন্ট (যেমন অ্যাসিট্যালডিহাইড, ফরমালডিহাইড) ডিএনএ সুত্রকের সঙ্গে আঠার মত যুক্ত হয়ে কোষের ডিএনএ অনুলিপন বা প্রতিলিপন প্রক্রিয়াগুলোকে ব্যাহত করে।  যখন ডিএনএ-র ক্ষতিগুলো মেরামত করা যায় না, যখন আমাদের জিনোম এভাবে এলোমেলো হয়ে যায়, তখন কোষগুলো প্রায়শই বার্ধক্যে প্রবেশ করে— এমন একটি অবস্থা যেখানে তারা বিভাজন বন্ধ করে, ফলে কোষের মৃত্যুও হতে পারে। ডিএনএ-র ক্ষতি বিশেষত স্টেম সেলের জন্য ক্ষতিকর, যেগুলো টিস্যু পূরণের জন্য দায়ী। কিছু  ‘দীর্ঘায়ু জিন’ -ও রয়েছে, যেমন ‘সার্টুইন’ জিন (১-৭) মানুষের সুস্থ জীবনকাল এবং বার্ধক্য-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যথা,বিপাকক্রিয়া ও ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করে। ডিএনএ মেরামতের ক্ষেত্রে সার্টুইন-৬ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এর ঘাটতি ঘটলে বার্ধক্য প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

সুতরাং, জিনোমের অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করা এবং কোষীয় স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ–র মেরামত অপরিহার্য এবং এর জন্য প্রয়োজন নিরন্তর পর্যবেক্ষণ ও মেরামত। কারণ, ডিএনএ মেরামতের প্রতিবন্ধকতা বা ব্যর্থতা অকাল বার্ধক্যজনিত সিন্ড্রোম (যেমন: ককেইন/Cockayne সিন্ড্রোম, ওয়ার্নার সিন্ড্রোম এবং হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোম), স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ, হৃদরোগ এবং অঙ্গের কার্যকারিতায় বয়স–সম্পর্কিত হ্রাসের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তবে, এই ক্ষতিগুলো মোকাবেলা করার জন্য কোষগুলোতে ডিএনএ মেরামতের বিভিন্ন আণবিক কৌশল রয়েছে। এ শুধু আমাদের কোষগুলোর কৌশল নয়, ব্যাকটেরিয়া থেকে মানুষ পর্যন্ত সকল জীবের মধ্যে ডিএনএ মেরামত কৌশলের অনেক কিছুই মূলত একই রকম। ডিএনএ মেরামত জীবনের জন্য এতটাই অপরিহার্য যে এর উৎপত্তি হয়েছিল কোটি কোটি বছর আগে, ব্যাকটেরিয়া এবং উচ্চতর জীবের বিবর্তনেরও আগে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বেস এক্সিশন’ মেরামত (BER), ‘নিউক্লিওটাইড এক্সিশন’ মেরামত (NER), ‘ডিএনএ অমিল/মিসম্যাচ’ মেরামত (MMR), এবং ‘ডাবল–স্ট্র্যান্ড ব্রেক’ মেরামত (DSBR)। এসব মেরামতের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু মেরামতকারী এনজাইম, যারা আমাদের জিনোমের প্রহরী হিসেবে কাজ করে। তবে, এটিও সত্য যে জীবের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডিএনএ মেরামতকারী এনজাইমগুলোর দক্ষতা হ্রাস পায়, যা জিনোমের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য ক্যান্সার বিকাশের দিকে পরিচালিত করে। ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। নির্মম শুনালেও সত্য, ৫০-ঊর্ধ্ব বয়সি মানুষের জীবদ্দশায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি রয়েছে ৪০%। মানব ১৭নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত ডিএনএ মেরামতকারী BRCA1 জিনের মিউটেশন নারীদের প্রধানত স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিতে ফেলে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণাগারে কর্মরত শত শত বিজ্ঞানী এই আবিষ্কারগুলোতে অবদান রেখেছেন, কিন্তু সম্মান জানানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের  বেছে নেওয়ার কঠিন কাজটি নোবেল কমিটির উপর বর্তায়। সেই বিবেচনায়, ক্যান্সার ও বার্ধক্য উভয়ের ভিত্তি বোঝার জন্য এবং ডিএনএ মেরামতের এসব কার্যপ্রণালী বিষয়ক গবেষণার জন্য টমাস লিন্ডাল, পল মোডরিচ এবং আজিজ সানকার (তুর্কী) একত্রে ২০১৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।   

 পি-৫৩ (p53) একটি টিউমার দমনকারী জিন: পি-৫৩ জিন পরিবারটি ১ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে বিবর্তিত হয়েছিল এবং বহুকোষী প্রাণীজগতের (মেটাজোয়া) সূচনালগ্নে আধুনিক সামুদ্রিক অ্যানিমোন এবং কোয়ানোফ্ল্যাজেলেটদের সাথে সম্পর্কিত পূর্বপুরুষদের মধ্যে এর আবির্ভাব ঘটে। অর্থাৎ, ব্যাক্টেরিয়াগুলোতে এই জিনটি উপস্থিত থাকে না। বিবর্তনের প্রারম্ভে, এর মূল ভূমিকা ছিল জার্ম-লাইন গ্যামেটকে ডিএনএ-র ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে জটিল সোম্যাটিক স্টেম সেল বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে, এই জিনটি সোম্যাটিক কোষে টিউমারের বৃদ্ধি দমন করার ভূমিকা গ্রহণ করে। হাতি বা তিমির মতো বড় প্রাণীদের আমাদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি কোষ থাকে, যেমন মানুষের তুলনায় তিমির দেহে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। তবুও এই বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিরোধী এবং আমাদের প্রায় সমান বা তার চেয়েও বেশি দিন বাঁচে। বোহেড তিমি বাঁচে ২০০ বছর। যেখানে মানুষের রয়েছে মাত্র একটি পি-৫৩ জিন, সেখানে হাতির জিনোমে রয়েছে সক্রিয় কুড়িটি কপি। অন্যদিকে, বো-হেড তিমি-দের একটি পি-৫৩ জিন থাকলেও তারা CIRBP (কোল্ড-ইনডিউসিবল আরএনএ-বাইন্ডিং প্রোটিন) নামক একটি প্রোটিন উচ্চ মাত্রায় উৎপাদন করে (মানুষের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি), যা ডিএনএ-র প্রান্ত স্থিতিশীল করতে এবং নির্ভুল ডিএনএ মেরামতে সহায়তা করে বলে প্রমাণিত। এছাড়া, এটি মানুষের ক্ষেত্রে কোষীয় চাপের প্রতিক্রিয়ার সাথে জড়িত, দীর্ঘায়ুর সাথে নয়। অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের একটিমাত্র পি-৫৩ জিনটিতে একটি অনন্য, হাঙ্গর-নির্দিষ্ট মিউটেশন রয়েছে যা এটিকে ব্যতিক্রমীভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং তাদের ৪০০ বছরের জীবদ্দশায় ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানব ১নং ক্রোমোজোমে অবস্থিত আরও একটি জিন m-TOR (‘এম-টোর’: মেকানিস্টিক টার্গেট অব রাপামাইসিন) এবং এর প্রোটিন (প্রোটিন কাইনেজ) কোষীয় স্তরে দীর্ঘায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিণত হয়েছে। এটি খামির থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের জীবনের মধ্যেই পাওয়া যায়। ‘এম-টোর’ একটি প্রধান পুষ্টি-সংবেদনকারী প্রোটিন, যা পুষ্টির পর্যাপ্ততায় বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে, কিন্তু ত্বরান্বিত ‘এম-টোর-কার্যকলাপ’ বার্ধক্য এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগগুলোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, পুষ্টির স্বল্পতায় বা অভাবে অটোফ্যাজি-নামক কোষীয় নবায়ন ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করে, যা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ এবং প্রোটিনগুলোকে পরিষ্কার করে এবং বার্ধক্যজনিত ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে। ২০১৬ সালে অটোফেজি বিষয়ক আবিষ্কারের জন্য ইয়োশিনোরি ওসুমি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলোর সংকোচন বার্ধক্যের আরও একটি বড় কারণ:

একটি ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তে একধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক ডিএনএ অনুক্রম (TTAGGG) হলো “টেলোমেয়ার” বা সুরক্ষাকবচ, যা বিশেষ কিছু প্রোটিন (শেল্টারিন) দ্বারা আবদ্ধ থাকে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়া, সকল অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী জীবের জিনোমে টেলোমেয়ার পাওয়া যায়। মানুষের প্রতিটি কোষে মাত্র বিরানব্বইটি টেলোমেয়ার রয়েছে; ছেচল্লিশটি ক্রোমোজোমের প্রতিটির জন্য দুটি করে।  আমাদের জীবনের শুরুতে ক্রোমোজোমের দুইপ্রান্তে এই টেলোমেয়ারগুলোয় থাকে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ নিউক্লিওটাইড। এদের স্যাটেলাইট ডিএনএ-ও বলা হয়। এই অঞ্চলটি কোনও প্রোটিনের জন্য কোডিং বা সংকেত বহন করে না, বরং এটি ক্রোমোজোমের প্রান্তকে সুরক্ষা দেয়। ধারাবাহিক বেশ কিছু কোষ বিভাজনের পর, টেলোমেয়ারগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈর্ঘ্যে পৌঁছায়, যখন বিভাজন বন্ধ হয়ে কোষটি বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে বয়বৃদ্ধের ডিএনএ-তে দেখা যায় মাত্র ১,৫০০ নিউক্লিওটাইড (ছবি দেখুন)। অর্থাৎ, প্রতিটি কোষ বিভাজনের সময় প্রায় ৫০ – ২০০টি নিউক্লিওটাইড প্রান্ত থেকে ঝরে যায়, ফলে ধীরে ধীরে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে। টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো যা মারা না গিয়ে শরীরে জমে থাকে এবং সুস্থ কোষের ক্ষতি করে- এগুলোকে বলে সেনেসেন্ট কোষ। এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন, ক্যারল গ্রেইডার এবং জ্যাক সোস্টাক ২০০৯ সালে টেলোমেয়ার ও টেলোমারেজ নামক এনজাইমের মাধ্যমে ক্রোমোজোম কীভাবে সুরক্ষিত থাকে এবং কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া কীভাবে উন্মোচিত হয়, তা আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। বেশিরভাগ টিস্যুর কোষ খুব সামান্য বা একেবারেই ‘টেলোমারেজ’ তৈরি করে না। সুতরাং, এই এনজাইমটির অনুপস্থিতে ঝরে যাওয়া ক্রমগুলো পুনরুদ্ধার হয় না। ব্যতিক্রম শুধু জননকোষ, স্টেম কোষ, নার্ভীয় স্টেম কোষ এবং ক্যান্সার কোষ, যেখানে ‘টেলোমারেজ’ এনজাইম অবিরত সংশ্লেষিত হয় এবং ক্রোমোজোমপ্রান্তে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হয় না, কারণ এনজাইমটি টেলোমেয়ার পুনর্নির্মাণ করতে পারে । ফলে ওই কোষগুলো আরও অনেক বার, এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভক্ত হতে পারে। একটি কোষ যে অমর নয়, অর্থাৎ একটি কোষ যে অনন্তকাল ধরে বিভাজিত হতে পারে না, এই ধারণাটি প্রথমে দিয়েছিলেন মার্কিন অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ/অ্যনাটমিস্ট লিওনার্ড হেইফ্লিক ১৯৬১ সালে। কোষ বিভাজনের এই সীমিত ক্ষমতাকে ‘হেইফ্লিক সীমা’বলা হয়। কোষগুলো হেইফ্লিক সীমাতে পৌঁছালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে প্রোগ্রামকৃত কোষমৃত্যু (অ্যাপোপটোসিস) প্রক্রিয়ায় কোষটির মৃত্যু হতে পারে। 

শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি প্রকৃতকোষীয় (মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী) জীবের জন্য এটি গ্রহণযোগ্য। যেমন, সিশেল (Seychelles) বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের কচ্ছপগুলো প্রায় ২০০-২৫০ বছর বাঁচে, কিংবা “কুয়াহগ”জাতীয় একধরনের সামুদ্রিক ঝিনুক ৪০০ বছর এবং সামুদ্রিক লবস্টার ১৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মানুষের তুলনায় তাদের সুদীর্ঘ টেলোমেয়ার এবং তার অবক্ষয়ের ধীর গতি-ই হল দীর্ঘায়ুর মূল কারণ। মানুষের টেলোমেয়ারের সংকোচনের হারকে বার্ধক্যসহ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ এবং লৈঙ্গিক পার্থক্য

নারীদের টেলোমেয়ার সাধারণত পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘ থাকে। এই পার্থক্যটি মূলত ইস্ট্রোজেনের মতো হরমোনজনিত কারণগুলোর সাথে যুক্ত। ইস্ট্রোজেন হরমোন টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপকে উদ্দীপিত করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে (Aging Cell. ২০২২)। পুরুষদের ক্ষেত্রে, বিশেষকরে কিছু কিছু টিস্যুতে, কোষ বিভাজনের সম্ভাব্য উচ্চ হার  এবং ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য কমাতে অবদান রাখতে পারে। উপরন্তু, নারীদের মধ্যে এক্স (X) ক্রোমোজোমে অবস্থিত DKC1-এর মতো জিনের দ্বি-অ্যালিলিক প্রকাশ (অর্থাৎ, জিনের উভয় কপি (অ্যালিল) সক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়) টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে সম্ভাব্যভাবে টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা ধরে রাখে। প্রসঙ্গত, DKC1 জিন ‘ডিস্কেরিন’ প্রোটিন তৈরির জন্য নির্দেশনা প্রদান করে, যা টেলোমেরেজ সক্রিয় রাখার এবং রাইবোজোমীয় আরএনএ (rRNA) একত্রিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্কেরিন টেলোমেরেজ কমপ্লেক্সকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে, যা কোষ বিভাজনের সময় টেলোমেয়ারকে ছোট হওয়া থেকে রক্ষা করে।

কোষ থেকে ‘বৃত্তাকার আরএনএ (CircRNA)’ অপসারণ আয়ু বাড়ায়:

বৃত্তাকার আরএনএ (circRNA) হলো সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক শ্রেণীর ননকোডিং আরএনএ। এগুলো অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী প্রাণীদের সর্বত্রই  পাওয়া যায়, যারা বিভিন্ন জৈবিক কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে জিনের নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প স্প্লাইসিং, এবং এমনকী প্রোটিন সংশ্লেষণ। এখন পর্যন্ত, বৃত্তাকার আরএনএ  প্রধানত “বার্ধক্যের চিহ্ন” হিসেবে পরিচিত ছিল, কারণ এর উচ্চ স্থিতিশীলতার কারণে এটি বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্ষয় না হয়ে কোষে জমা হতে থাকে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় (কিম এট অল, মলিকিউলার সেল, ২০২৬) দেখা গিয়েছে যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে, দীর্ঘায়ুর জন্য অপরিহার্য আরএনএ-অবক্ষয়কারী প্রোটিন/এনজাইম  ‘আরএনএ-য়েজ -কে’ (RNASEK) বা ‘রাইবোনিউক্লিয়েজ কাপ্পা’ -এর পরিমাণ হ্রাস পায়, যার ফলে কোষের মধ্যে বৃত্তাকার আরএনএ-এর অস্বাভাবিক জমাট বেঁধে বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যা কোষের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে এবং বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই অবস্থায়, বয়স-নির্ভর বৃত্তাকার আরএনএ-গুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আরএনএ-সেক এর ব্যবহার মানব বার্ধক্য এবং অবক্ষয়জনিত রোগের চিকিৎসার কৌশল বিকাশে সাহায্য করতে পারে। রাইবোনিউক্লিয়েজ-কাপ্পা (RNASEK) সার্কুলার আরএনএ-অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে বয়স-নির্ভর সার্কুলার আর এনএ জমা হওয়াকে প্রতিরোধ করে।

জৈবিক অমরত্বের অন্বেষণে:

“অমরত্ব” শব্দটি প্রথম সেই-সব ক্যান্সার কোষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যেগুলো টেলোমেয়ার-দীর্ঘকারী এনজাইম ‘টেলোমারেজ’প্রকাশ করত এবং এর ফলে তারা ‘অ্যাপোপটোসিস’ বা কোষ-মৃত্যু এড়িয়ে যেত। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেসব সেল লাইনগুলোর জন্য, যেমন  ‘হি-লা’ এবং ‘জুরকাত’ ক্যান্সার সেল লাইন, যারা বাস্তবিক অর্থে অমর —পুষ্টির অভাব না হলে তাদের মৃত্যু নেই। জীবজগতেও, বেশ কয়েকটি প্রজাতির মধ্যেও “জৈবিক অমরত্ব” পরিলক্ষিত হয়েছে। অবশ্যই, গাছপালা তাদের পুনর্জন্মের বা ‘রিজেনেরেশন’ ক্ষমতার কারণে আমাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। তবে, প্রাণীজগতেও এমন কিছু প্রজাতি রয়েছে যাদের গাছের মতো বৈশিষ্ট্য আছে। যদি একটি তারামাছের বাহু কাটা যায়, তবে তা সঙ্গে সঙ্গে আবার গজিয়ে উঠতে পারে। যদি প্লেনারিয়া নামক একটি মুক্তজীবী ‘চ্যাপ্টা কৃমি’-কে দশটি ভাগে কাটা হয়, সেগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ দশটি প্লেনারিয়া জণ্ম নেয়। হাইড্রা নামক একটি ছোট জলজ প্রাণী আরও বেশি আশ্চর্যজনক: এর বয়স যেন বাড়েই না এবং এটি ক্রমাগত টিস্যু পুনরুৎপাদন করতে সক্ষম।  একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র এর মাথা পুনরুৎপাদনের জন্য প্রচুর সংখ্যক জিন জড়িত থাকে। এই সবকিছু এমন একটি জীবের জন্য যা দৈর্ঘ্যে মাত্র আধা ইঞ্চি। ট্রান্সডিফারেনসিয়েশনের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক মেরুদণ্ডী একপ্রকার অর্ধ-জলজ উভচর প্রাণী ‘নিউট’ এর চোখের লেন্স-পুনর্জন্ম একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে লেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের ‘আইরিস এপিথেলীয় কোষ’ সংখ্যাবৃদ্ধি করে একটি নতুন লেন্স তৈরি করে। আমাদের (মানুষের) প্রাপ্তবয়স্কতায়, আংশিকভাবে, এই পুনর্নবায়নমূলক সুবিধা রয়েছে, শুধুমাত্র যকৃতে। যকৃত তার হেপাটোসাইট (যকৃত কোষ)-এর স্টেম সেলের মতো আচরণের কারণে সম্পূর্ণভাবে (৯০% পর্যন্ত) পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ক্ষমতার দিক থেকে অনন্য। এই কোষগুলো আঘাত পেলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বিভাজিত হয়ে যকৃত পুনরুদ্ধার করে। ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড বা কিডনির মতো অন্যান্য অঙ্গের এই পুনরুজ্জীবনের নমনীয়তা নেই, কারণ তাদের কোষগুলো চূড়ান্ত ও বিশেষায়িত রূপে আবদ্ধ থাকে এবং নবায়নের চেয়ে তাৎক্ষণিক কার্যকারিতাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে, জেব্রাফিশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হৃৎপিণ্ডের গঠন ও কার্যকারিতা, Hmga1- এর মতো প্রোটিনের মহানুভবতায়, সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করে, যা এদেরকে মানব হৃৎপিণ্ডের নিরাময় প্রক্রিয়া অধ্যয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেলে পরিণত করে। পক্ষান্তরে, মানব হৃৎপিণ্ডের কোষগুলো (কার্ডিওমায়োসাইট) পলিপ্লয়েড (একটি কোষে দুইয়ের অধিক ক্রোমোজোম সেট ধারণকারী- 4n, 8n ) হওয়ায় দৃঢ়তা প্রদান করতে পারে, যা হৃৎপেশিকোষগুলোকে ক্ষতি, জারণজনিত পীড়ন এবং বিপাকীয় চাপ সামলাতে পারে; কিন্তু তারা প্রয়োজনে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ তৈরি করতে পারে না। 

তবে, এক আশ্চর্যজনক প্রজাতি হলো ‘টুরিটোপসিস ডব্রনি’, যা অমর জেলিফিশ নামে পরিচিত। এই জেলিফিশ আঘাত, চাপ বা বার্ধক্যের সম্মুখীন হলে সে তার যৌবন বয়সে ফিরে যায় এবং নতুন করে জীবন শুরু করে। এটা অনেকটা এমন, যেন একটি আহত প্রজাপতি নিজেকে আবার শুঁয়োপোকায় রূপান্তরিত করে নতুন করে জীবন শুরু করে। যেহেতু হাইড্রা এবং অমর জেলিফিশের মধ্যে বার্ধক্যের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না, তাই এদেরকে প্রায়শই জৈবিকভাবে অমর বলা হয়। অর্থাৎ, বয়সের সাথে সাথে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে না। পরিশেষে, সেই অমর প্রাণীদের কাছ থেকে আমরা যা জেনেছি তা হলো “অবিরাম স্টেম সেল পুনর্নবীকরণ, উন্নত ডিএনএ মেরামত, এবং কোষীয় রিপ্রোগ্রামিং (ট্রান্সডিফারেনসিয়েশন)” এর মাধ্যমে অনির্দিষ্ট দীর্ঘায়ু সম্ভব, যেখানে পরিপক্ক কোষগুলো টিস্যু পুনরুত্পাদনের জন্য ‘প্লুরিপোটেন্ট’ (পুনর্নবায়নকারী) অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। তবে যাই হোক, হাইড্রা বা জেলিফিশ থেকে প্রাপ্ত আবিষ্কার আমাদের মতো জটিল জীবনব্যবস্থায় কাজে লাগাতে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে।

একটি বিশেষ পরামর্শ:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তিটির মাধ্যমে সময়ের গভীর এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। প্রজাপতির আয়ু খুব স্বল্প, কিন্তু সে সেই সীমাবদ্ধ সময়ের মধ্যেও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করে। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য—আমরা দীর্ঘ সময়ের হিসেব করে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, যদি বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিই এবং প্রাণবন্তভাবে বাঁচার চেষ্টা করি, তবে আমাদের হাতেও জীবনের আনন্দ আস্বাদনের জন্য যথেষ্ট সময় থাকে। অর্থাৎ, জীবনের সার্থকতা সময়ের দৈর্ঘ্যের ওপর নয়, বরং মুহূর্তের গভীরতার ওপর নির্ভর করে:

“প্রজাপতি সেতো বরষ না গণে,

নিমেষ গণিয়া বাঁচে,

সময় তাহার যথেষ্ট তাই আছে॥”

 

সাহায্যকারী নোট:

DKC1 জিন (Dyskeratosis Congenita 1): এই জিনটি ‘ডিসকেরিন’ নামক প্রোটিন সংশ্লেষ করে। এই প্রোটিনটি টেলোমারেজকে স্থিতিশীল রাখা, ক্রোমোজোমের প্রান্তে টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখা এবং রাইবোজোমীয়  আরএনএ -এর প্রক্রিয়াকরণের জন্য অপরিহার্য। DKC1 জিনে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটলে ‘এক্স-লিংকড ডিসকেরাটোসিস কঞ্জেনিটা’ নামক একটি রোগ দেখা দেয়; এটি একটি বিরল ও অকালবার্ধক্যজনিত সিনড্রোম, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো অস্থিমজ্জার অকার্যকারিতা, ত্বকের অস্বাভাবিকতা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি। ডিসকেরিন প্রোটিন টেলোমারেজের আরএনএ উপাদানের (TERC) সাথে যুক্ত হয়ে টেলোমারেজের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। এছাড়া এটি জোমীয় আরএনএ-এর একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়া—’সিউডোইউরিডিলেশন’ (pseudouridylation)—এর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রাইবোসোম গঠনের প্রক্রিয়ায়ও এর ভূমিকা রয়েছে।

বিপাকীয় হার (Metabolism rate): বিপাকীয় হার বা মেটাবলিক রেট হলো সেই গতি, যে গতিতে আমাদের শরীর শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত ​​সঞ্চালন এবং কোষ উৎপাদনের মতো অপরিহার্য জীবন কার্য সম্পাদনের জন্য ক্যালোরি পোড়ায়, যা সাধারণত ২৪ ঘণ্টা ধরে পরিমাপ করা হয়। এটি বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR)—অর্থাৎ বিশ্রামের সময় ব্যবহৃত শক্তি—এবং শারীরিক কার্যকলাপ ও হজমের মাধ্যমে পোড়ানো ক্যালোরি নিয়ে গঠিত। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিশ্রামের সময় দৈনিক প্রায় ১,২০০–২,০০০ ক্যালোরি (কিলোক্যালোরি) পোড়ায়, সেখানে একটি ইঁদুরের বিপাকীয় হার তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি। একটি ইঁদুর শুধুমাত্র বিশ্রামকালীন শক্তি ব্যয়ের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোক্যালোরি পোড়ায়। এর কারণ হলো: ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃষ্ঠতল-থেকে-ভর  (surface-to-mass) অনুপাত মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, যার অর্থ হলো তারা দ্রুত তাপ হারায় এবং শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য তাদের দ্রুত শক্তি পোড়াতে হয়।

প্লুরিপোটেন্সি (pluripotency): একটি কোষ যখন তার বিভাজনের মাধ্যমে ভিন্ন জাতীয় কোষ তৈরি করার  জিনগত বিশেষ এক ক্ষমতা রাখে, তখন  সেই সামর্থ্যকে বলা হয় কোষটির প্লুরিপোটেন্সি ও কোষটিকে বলা হয় প্লুরিপোটেন্ট। সামর্থ্যের তারতম্যে স্টেম কোষকে কখনও বলা হয় টোটিপটেন্ট, প্লুরিপোটেন্ট, বা মাল্টিপোটেন্ট, যেমন প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতা টোটিপটেন্ট কোষের তুলনায় কম। কোষ জীববিজ্ঞানে, প্লুরিপোটেন্সি বলতে ভ্রূণীয় স্টেম কোষগুলোর ক্ষমতাকে বুঝায়, যা তিনটি ভ্রূণীয় স্তরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে: এন্ডোডার্ম, মেসোডার্ম বা এক্টোডার্ম। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলো একটি জীবের বেশিরভাগ বা সমস্ত কোষে বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ জীবে বিকাশ করতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা নেই। প্লুরিপোটেন্ট কোষ হিসেবে ভ্রূণীয় স্টেম সেল, অম্বিলিকাল কর্ড স্টেম সেল এবং প্ররোচিত বা ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃত্রিমভাবে প্রবর্তিত প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (যা সাধারণত iPS কোষ বা iPSCs হিসাবে পরিচিত) সৃষ্টি করা হয় সাধারণত একটি পরিপক্ক দেহকোষ কোষ থেকে এবং নির্দিষ্ট কিছু জিন ও ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের উদ্দীপনার মাধ্যমে কোষগুলোরকে রিপ্রোগ্রামিং করা হয়। ফলশ্রুতিতে, এই উদ্দীপ্ত দেহকোষগুলো প্রাথমিক ভ্রূণ কোষগুলোর মতোই জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে ও ফিরে পায় প্লুরিপোটেন্সি ক্ষমতা।  এই পদ্ধতিতে,  চারটি  ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (Oct4, Sox2, Klf4 ও c-Myc)র  উদ্দীপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষগুলোকে প্লুরিপোটেন্ট করে জীব বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে  দিয়েছিলেন  বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ও জন গার্ডন। তাঁদের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁরা (শিনিয়া ইয়ামানাকা এবং জন গারডন) ২০১২ সালের নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।  iPSCs প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আণবিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে।