০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

পানিচক্র কী এবং পানিচক্রের প্রক্রিয়া কেমন?

বিশ্লেষণ সংকলন টিম
  • প্রকাশ: ১১:০৬:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২
  • / ১৪৯৪৬ বার পড়া হয়েছে

পানিচক্র | ছবি: প্রথম আলো


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণি জীবনধারণ করতে পারে না। পানি না থাকলে ভূ-পৃষ্ঠ ও তার চারপাশের নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় না। তাই পৃথিবীপৃষ্ঠ ও তার জীবজগতের সার্বিক কল্যাণ অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য পানির গুরূত্ব অপরিহার্য। এখানে পানিচক্র সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

পানিচক্র (Water Cycle)

পানি আমরা পেয়ে থাকি নানা উৎস থেকে। ভূ-গর্ভস্থ পানি একটি গুরূত্বপূর্ণ উৎস যেখানে ভূ-পৃষ্ঠের নিচে বিশেষ গভীরতার বিভিন্ন শিলাস্তরে পানি সঞ্চিত থাকে। এক হিসাব অনুযায়ী, পুরো পৃথিবীর ৮০ মিটার গভীরতার মধ্যে অবস্থিত ভূ-গর্ভস্থ জলাধারে প্রায় ২৫৯ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার পানি সঞ্চিত আছে। বৃষ্টির পানি ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রধান উৎস। পৃথিবীর একেক অঞ্চলে বিভিন্ন ঋতুতে পার্থক্য আছে বলেই পৃথিবীতে বিভিন্ন এলাকায় নানারকম ও পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। যেমন— নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর ধরে বৃষ্টিপাত হলেও মৌসুমী অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ও ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টি হয়। 

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার কিছু পরিমাণ বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠে যায়, কিছু অংশ ভূ-পৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীতে এবং সমুদ্রে পড়ে বাকী অংশ (প্রায় ৩০ শতাংশ)। ভূ-পৃষ্ঠের ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও সেখানে সঞ্চিত থাকে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে সহজ ভাষায় পানিচক্র বলে।

পানিচক্রের প্রক্রিয়া

পানি মূলত কঠিন, তরল ও বায়বীয় এই তিনটি অবস্থায় থাকতে পারে। তবে পানি বিভিন্নভাবে সবসময় আবর্তিত হচ্ছে ও পানির অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে চলেছে। পৃথিবীর বিশাল পরিমণ্ডলের মহাসাগর, নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয় থেকে সূর্যের তাপে পানি বাষ্পীভূত হয় এবং বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে বাষ্পাকারে উপরে উঠে যায় এবং বায়ুমণ্ডলে এভাবেই মিশে যায়।

এছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা থেকে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলীয় অংশ বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। এই জলীয়বাষ্পতে সম্পূর্ণ বায়ু যখন শীতল হয়ে যায় তখন তা তুষার, মেঘ, শিশির, কুয়াশা, বরফ ইত্যাদিতে পরিণত হয়। এই মেঘ, তুষার, শিশির ইত্যাদি পরবর্তিতে বৃষ্টিপাত বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীপৃষ্ঠে এসে পড়ে। তবে ভূ-পৃষ্ঠে যে পানি পতিত হয় তা পুনরায় বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার দ্বারা আবারও বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এছাড়াও এই পানির কিছু অংশ নদী বাহিত হয়ে সুবিশাল সমুদ্রগর্ভে পতিত হয়, বাকি অংশ উদ্ভিদ অভিস্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করে। পানির অবশিষ্ট অংশ ভূ-পৃষ্ঠের শিলাস্তরের মধ্যে শোষিত হয়ে প্রবেশ করে; এই সম্পূর্ণ চলমান পদ্ধতিকে বলে পানিচক্র বা (Water Cycle)। পানির আরেকটি নাম যেহেতু জল, সেহেতু পানিচক্রকে বাংলায় জলচক্র বলেও অভিহিত করা হয়।

সহজ কথায়, পানিচক্র বা জলচক্র হলো প্রাকৃতিক প্রভাবে ক্রমাগত রূপান্তরের মাধ্যমে পানি বা জলের চক্রাকারে তথা ক্রমাগত সঞ্চারণশীলতা। এই চক্রকে হাইড্রলজিক্যাল চক্র বা H2O চক্র বলা হয়। এই পানিচক্রের জন্যেই এই পৃথিবীতে পানির সামঞ্জস্য ব্যাহত হয় না।

পানিচক্র

পানিচক্রের প্রক্রিয়াগুলো নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো—

বাষ্পীভবন (Precipitation)

বাষ্পীভবন এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা নদী, হ্রদ, জলাশয় বা সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে বাষ্পে পরিণত হয় এবং তা বায়ুমণ্ডলের মিশে যায়। এই জলীয়বাষ্প হালকা বলে তা উপরে উঠে বায়ুমণ্ডলে অদৃশ্য হয়ে যেতে সক্ষম হয়। এক্ষেেত্র বায়ুর উষ্ণতার পরিমাণের উপর নির্ভর করে যে কতটুকু জলীয়বাষ্প ধারণ করা সম্ভব হবে। 

জলীয়বাষ্প প্রধানত সমুদ্র থেকে বাষ্পীভূত হলেও নদ-নদী ও উদ্ভিদ জগতও জলীয়বাষ্পের অন্যতম উৎস।

ঘনীভবন (Condensation)

আমরা জানি যে, বায়ু যত বেশি উষ্ণ হবে তত বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট উষ্ণতার যতটুকু পরিমাণ জলীয়বাষ্প বায়ুতে থাকলে বায়ু এর চেয়ে বেশি জলীয়বাষ্প আর ধারণ করতে পারে না সেই অবস্থায় ঐ বায়ুকে বলা হয় সম্পৃক্ত বা পরিপৃক্ত বায়ু। এই সম্পৃক্ত বায়ু যখন শীতল হতে থাকে তখন তা আর অধিক পরিমাণে জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে জলীয়বাষ্পের কিছু অংশ পানিতে পরিণত হয় এবং এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন। বায়ু যে উষ্ণতায় জলীয়বাষ্পরূপে ঘনীভূত হয় তাকে বলা হয় শিশিরাঙ্ক (Dew Point)। জলীয়বাষ্প তখনই কঠিন আকার ধারণ করে যখন তাপমাত্রা ৩° সেলসিয়াম বা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। এই ঘনীভূত জলীয়বাষ্প তখন কঠিন আকার ধারণ করে তুষার ও বরফরূপে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। তবে হিমাঙ্ক শিশিরাঙ্কের উপরে থাকলে ঘণীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি, কুয়াশা ও শিশিরে পরিনত হয়।

বায়ুর আর্দ্রতা (Humidity)

বায়ুতে জলীয়বাষ্প ধারণ করা না হলে পানিচক্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হত না। বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ করাকে তাই বলা হয় বায়ুর আর্দ্রতা। বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ শতকরা ১ ভাগেরও কম। আর্দ্র বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ প্রায় শতকরা ২ থেকে ৫ ভাগ বেশি থাকে। বায়ুর এই আর্দ্রতা হাইগ্রোমিটার দ্বারা পরিমাপ করা যায়।

বায়ুর আর্দ্রতা মূলত দুই প্রকার। যথা—

  1. পরম আর্দ্রতা
  2. আপেক্ষকি আর্দ্রতা।

কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে জলীয়বাষ্পের প্রকৃত পরিমাণকে বলা হয় পরম আর্দ্রতা। আর আপেক্ষকি আর্দ্রতা হলো কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের জলীয়বাষ্পের প্রকৃত পরিমাণ আর একই আয়তনের বায়ুতে একই উষ্ণতায় পরিপৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প প্রয়োজন এ দুটির অনুপাত।

বারিপাত (Precipitation)

পানিচক্রের এই পর্যায়ে এসে বারিপাত ঘটে। জলীয়বাষ্প উপরে উঠে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে যখন ঘনীভূত হয় তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষারকণায় পরিণত হয়। এরপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে আবার পৃথিবীপৃষ্ঠে পতিত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বারিপাত। জলীয়বাষ্প ছাড়া বারিপাত সম্ভব নয়। বারিপাত নানা শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন— বৃষ্টিপাত, কুয়াশা ইত্যাদি।

সারাংশ

যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠ হতে পানি বাষ্পীভবনের দ্বারা বায়ুমণ্ডলে মিশে যায় এবং সেই সাথে ঘনীভবন, আর্দ্রতা ও বারিপাতের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়, সেই চলমান প্রবাহকে বলা হয় পানিচক্র। জলীয়বাষ্প পানিচক্রের অত্যন্তগুরূত্বপূর্ণ উপাদান। পানিচক্র মূলত বাষ্পীভবন, ঘনীভবন, আর্দ্রতা ও বারিপাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পানিচক্র না হলে বৃষ্টি, তুষার, শিশিরকণা, কুয়াশা পাওয়া যেত না এবং পৃথিবীতে পানির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।

শেয়ার করুন

One thought on “পানিচক্র কী এবং পানিচক্রের প্রক্রিয়া কেমন?

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

পানিচক্র কী এবং পানিচক্রের প্রক্রিয়া কেমন?

প্রকাশ: ১১:০৬:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণি জীবনধারণ করতে পারে না। পানি না থাকলে ভূ-পৃষ্ঠ ও তার চারপাশের নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় না। তাই পৃথিবীপৃষ্ঠ ও তার জীবজগতের সার্বিক কল্যাণ অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য পানির গুরূত্ব অপরিহার্য। এখানে পানিচক্র সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

পানিচক্র (Water Cycle)

পানি আমরা পেয়ে থাকি নানা উৎস থেকে। ভূ-গর্ভস্থ পানি একটি গুরূত্বপূর্ণ উৎস যেখানে ভূ-পৃষ্ঠের নিচে বিশেষ গভীরতার বিভিন্ন শিলাস্তরে পানি সঞ্চিত থাকে। এক হিসাব অনুযায়ী, পুরো পৃথিবীর ৮০ মিটার গভীরতার মধ্যে অবস্থিত ভূ-গর্ভস্থ জলাধারে প্রায় ২৫৯ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার পানি সঞ্চিত আছে। বৃষ্টির পানি ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রধান উৎস। পৃথিবীর একেক অঞ্চলে বিভিন্ন ঋতুতে পার্থক্য আছে বলেই পৃথিবীতে বিভিন্ন এলাকায় নানারকম ও পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। যেমন— নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর ধরে বৃষ্টিপাত হলেও মৌসুমী অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ও ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টি হয়। 

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার কিছু পরিমাণ বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠে যায়, কিছু অংশ ভূ-পৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীতে এবং সমুদ্রে পড়ে বাকী অংশ (প্রায় ৩০ শতাংশ)। ভূ-পৃষ্ঠের ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও সেখানে সঞ্চিত থাকে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে সহজ ভাষায় পানিচক্র বলে।

পানিচক্রের প্রক্রিয়া

পানি মূলত কঠিন, তরল ও বায়বীয় এই তিনটি অবস্থায় থাকতে পারে। তবে পানি বিভিন্নভাবে সবসময় আবর্তিত হচ্ছে ও পানির অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে চলেছে। পৃথিবীর বিশাল পরিমণ্ডলের মহাসাগর, নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয় থেকে সূর্যের তাপে পানি বাষ্পীভূত হয় এবং বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে বাষ্পাকারে উপরে উঠে যায় এবং বায়ুমণ্ডলে এভাবেই মিশে যায়।

এছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকার গাছপালা থেকে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলীয় অংশ বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। এই জলীয়বাষ্পতে সম্পূর্ণ বায়ু যখন শীতল হয়ে যায় তখন তা তুষার, মেঘ, শিশির, কুয়াশা, বরফ ইত্যাদিতে পরিণত হয়। এই মেঘ, তুষার, শিশির ইত্যাদি পরবর্তিতে বৃষ্টিপাত বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীপৃষ্ঠে এসে পড়ে। তবে ভূ-পৃষ্ঠে যে পানি পতিত হয় তা পুনরায় বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার দ্বারা আবারও বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এছাড়াও এই পানির কিছু অংশ নদী বাহিত হয়ে সুবিশাল সমুদ্রগর্ভে পতিত হয়, বাকি অংশ উদ্ভিদ অভিস্রবণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করে। পানির অবশিষ্ট অংশ ভূ-পৃষ্ঠের শিলাস্তরের মধ্যে শোষিত হয়ে প্রবেশ করে; এই সম্পূর্ণ চলমান পদ্ধতিকে বলে পানিচক্র বা (Water Cycle)। পানির আরেকটি নাম যেহেতু জল, সেহেতু পানিচক্রকে বাংলায় জলচক্র বলেও অভিহিত করা হয়।

সহজ কথায়, পানিচক্র বা জলচক্র হলো প্রাকৃতিক প্রভাবে ক্রমাগত রূপান্তরের মাধ্যমে পানি বা জলের চক্রাকারে তথা ক্রমাগত সঞ্চারণশীলতা। এই চক্রকে হাইড্রলজিক্যাল চক্র বা H2O চক্র বলা হয়। এই পানিচক্রের জন্যেই এই পৃথিবীতে পানির সামঞ্জস্য ব্যাহত হয় না।

পানিচক্র

পানিচক্রের প্রক্রিয়াগুলো নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো—

বাষ্পীভবন (Precipitation)

বাষ্পীভবন এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা নদী, হ্রদ, জলাশয় বা সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে বাষ্পে পরিণত হয় এবং তা বায়ুমণ্ডলের মিশে যায়। এই জলীয়বাষ্প হালকা বলে তা উপরে উঠে বায়ুমণ্ডলে অদৃশ্য হয়ে যেতে সক্ষম হয়। এক্ষেেত্র বায়ুর উষ্ণতার পরিমাণের উপর নির্ভর করে যে কতটুকু জলীয়বাষ্প ধারণ করা সম্ভব হবে। 

জলীয়বাষ্প প্রধানত সমুদ্র থেকে বাষ্পীভূত হলেও নদ-নদী ও উদ্ভিদ জগতও জলীয়বাষ্পের অন্যতম উৎস।

ঘনীভবন (Condensation)

আমরা জানি যে, বায়ু যত বেশি উষ্ণ হবে তত বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট উষ্ণতার যতটুকু পরিমাণ জলীয়বাষ্প বায়ুতে থাকলে বায়ু এর চেয়ে বেশি জলীয়বাষ্প আর ধারণ করতে পারে না সেই অবস্থায় ঐ বায়ুকে বলা হয় সম্পৃক্ত বা পরিপৃক্ত বায়ু। এই সম্পৃক্ত বায়ু যখন শীতল হতে থাকে তখন তা আর অধিক পরিমাণে জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে না। এ পরিস্থিতিতে জলীয়বাষ্পের কিছু অংশ পানিতে পরিণত হয় এবং এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন। বায়ু যে উষ্ণতায় জলীয়বাষ্পরূপে ঘনীভূত হয় তাকে বলা হয় শিশিরাঙ্ক (Dew Point)। জলীয়বাষ্প তখনই কঠিন আকার ধারণ করে যখন তাপমাত্রা ৩° সেলসিয়াম বা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। এই ঘনীভূত জলীয়বাষ্প তখন কঠিন আকার ধারণ করে তুষার ও বরফরূপে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। তবে হিমাঙ্ক শিশিরাঙ্কের উপরে থাকলে ঘণীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি, কুয়াশা ও শিশিরে পরিনত হয়।

বায়ুর আর্দ্রতা (Humidity)

বায়ুতে জলীয়বাষ্প ধারণ করা না হলে পানিচক্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হত না। বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ করাকে তাই বলা হয় বায়ুর আর্দ্রতা। বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ শতকরা ১ ভাগেরও কম। আর্দ্র বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ প্রায় শতকরা ২ থেকে ৫ ভাগ বেশি থাকে। বায়ুর এই আর্দ্রতা হাইগ্রোমিটার দ্বারা পরিমাপ করা যায়।

বায়ুর আর্দ্রতা মূলত দুই প্রকার। যথা—

  1. পরম আর্দ্রতা
  2. আপেক্ষকি আর্দ্রতা।

কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে জলীয়বাষ্পের প্রকৃত পরিমাণকে বলা হয় পরম আর্দ্রতা। আর আপেক্ষকি আর্দ্রতা হলো কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের জলীয়বাষ্পের প্রকৃত পরিমাণ আর একই আয়তনের বায়ুতে একই উষ্ণতায় পরিপৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প প্রয়োজন এ দুটির অনুপাত।

বারিপাত (Precipitation)

পানিচক্রের এই পর্যায়ে এসে বারিপাত ঘটে। জলীয়বাষ্প উপরে উঠে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে যখন ঘনীভূত হয় তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষারকণায় পরিণত হয়। এরপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে আবার পৃথিবীপৃষ্ঠে পতিত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বারিপাত। জলীয়বাষ্প ছাড়া বারিপাত সম্ভব নয়। বারিপাত নানা শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন— বৃষ্টিপাত, কুয়াশা ইত্যাদি।

সারাংশ

যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠ হতে পানি বাষ্পীভবনের দ্বারা বায়ুমণ্ডলে মিশে যায় এবং সেই সাথে ঘনীভবন, আর্দ্রতা ও বারিপাতের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়, সেই চলমান প্রবাহকে বলা হয় পানিচক্র। জলীয়বাষ্প পানিচক্রের অত্যন্তগুরূত্বপূর্ণ উপাদান। পানিচক্র মূলত বাষ্পীভবন, ঘনীভবন, আর্দ্রতা ও বারিপাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পানিচক্র না হলে বৃষ্টি, তুষার, শিশিরকণা, কুয়াশা পাওয়া যেত না এবং পৃথিবীতে পানির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।