০৭:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

সিয়াম সাধনা  ও আত্মভক্ষণ বা অটোফ্যাজির উপকারিতা

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
  • প্রকাশ: ০৬:৪৫:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০২২
  • / ১০৬১ বার পড়া হয়েছে

রোজা ইসলামের মূল ভিত্তির একটি


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

মাসব্যাপী পবিত্র রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে সিয়াম বা রোজা পালন করা। সিয়াম অর্থ বিরত থাকা, অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা থেকে ও রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা। শেষ রাতে সেহরি খাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে মাহে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা। রমজান আমাদেরকে স্ব-শৃঙ্খলা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, ত্যাগ ও দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি অনুশীলন করতে শেখায়। এ মাসে আত্মসংযমের মাধ্যমে দেহ, মন এবং চিন্তাচেতনার শুদ্ধি অর্জন করাই হচ্ছে সিয়ামের মূল লক্ষ্য। তাছাড়া, শান্তি, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মতো অতিমানবিক গুণাবলিও প্রকাশ পায় আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে। ইসলামপূর্ব যুগেও এ মাসটি পবিত্র মাস হিসেবে গণ্য হতো। এ মাসে রোজা রাখা ইসলামের পঞ্চমূল নীতির অন্যতম। 

রমজান মাসে বাধ্যতামূলক রোজা রাখা ছাড়াও বছরের অন্য কোনো সময় যদি কেউ রোজা রাখতে চান তাহলে তা পালনের জন্য নির্দিষ্টভাবে কিছু সুন্নাহ-দিন বিভিন্ন সহী হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: রমজান পরে শাওয়াল মাসের ৬ দিন, সপ্তাহের সোমবার এবং বৃহস্পতিবার, বৃহস্পতিবার বা শনিবারের সাথে একত্রে শুক্রবার, চন্দ্র ক্যালেন্ডারের শুভ্রদিন নামে অভিহিত ১৩, ১৪ এবং ১৫তম দিন, মুহাররম মাসের ১০ তারিখ (আশুরা), যারা হজ্ব পালন করছেন না তাদের জন্য ‘দুল-হিজ্জাহ’ মাসের নবম দিন (আরাফাহ)। এ ছাড়া, হাদিসে বর্ণিত আছে যে আমাদের মহানবী (সা.) শাবান মাসসহ সারা বছর মাঝে মাঝে রোজা রাখতেন (সহীহ্ বুখারী)। অর্থাৎ, সবিরাম বা মাঝে মধ্যে রোজা রাখা (intermittent fasting) যে স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম তাঁর জীবনী থেকে সেটাই আমরা শিক্ষা লাভ করেছি।

কিন্তু সে আদর্শের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা গত শতাব্দীর ৫০ দশক থেকে জীববিজ্ঞানের আণবিক পর্যায়ে আমাদের জ্ঞানকে আরো প্রসারিত করেছে যখন বেলজিয়ামের এক বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান  ডি ডুভ (Christian de Duve) কোষের ভিতর একটি বিশেষায়িত নতুন কক্ষ আবিষ্কার করেন যেখানে কোষের ব্যবহৃত প্রোটিন, শর্করা এবং লিপিড যাবতীয় বস্তুগুলিকে এনজাইম দ্বারা হজম করতে দেখা গেছে। ঐ বিশেষায়িত কক্ষটি “লাইসোজোম (Lysosome)” নামে পরিচিত। এটি  এক ধরনের কোষীয় অঙ্গাণু যা সাধারণত প্রাণী কোষে পাওয়া যায়। এতে বিদ্যমান ভেসিকলগুলো হাইড্রোলাইটিক এনজাইম দ্বারা পূর্ণ এবং কোষীয় উপাদানগুলির অবক্ষয়ের জন্য একটি ওয়ার্কস্টেশন হিসেবে কাজ করে।  যে কারণে এটিকে একে “আত্মঘাতী থলিকা” বা “আত্মঘাতী স্কোয়াড”ও  বলা হয়। লাইসোজোম আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৪ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিন শাখায় ডি ডুভ-কে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়েছিল।

সাম্প্রতিককালে, মলিক্যুলার জীববিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে সাময়িক অনাহার  এবং স্বল্পাহারের উপকারিতা নিয়ে অনেক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেহে প্রাকৃতিক ও জিনগত কিছু নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া আছে যার মাধ্যমে কোষের যাবতীয় ক্ষয়ে যাওয়া অকার্যকর বড়ো আকারের অণুগুলিকে (অঙ্গাণু, প্রোটিন, শর্করা, লিপিড এবং কোষঝিল্লি) কোষ থেকে অপসারণ অথবা অন্তঃকোষীয় পুনর্ব্যবহারের উপযুক্ত ক’রে কোষগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। এ যেন কোষের মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রিত জীর্ণ-বস্তুসমূহের সংস্করণ বা পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়া! ফলে, দেহের বার্ধক্য প্রক্রিয়াটিতেও একটি মন্থর গতি অর্জন করে। কোষের এই সংস্করণের প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানীগণ আত্মভক্ষণ বা অটোফ্যাজি (Autophagy) বলে অভিহিত করেছেন। মৌলিক গবেষণা এবং এই প্রক্রিয়াটি উদ্ভাবনের ফলে টোকিও টেকনোলজি ইনস্টিটিউট-এর সেল জীববিজ্ঞানী  ‘ইয়োশিনোরি ওহসুমি’ ফিজিওলজি বা মেডিসিনে ২০১৬ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। ওহসুমি তার গবেষণায় ১৫টি জীন সনাক্ত করেছিলেন যা অটোফ্যাজি  প্রক্রিয়াটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন।

অটোফ্যাজি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে তার আক্ষরিক অর্থ হলো আত্মভক্ষ অর্থাৎ নিজে নিজেকে খাওয়া (self-cannibalism)। যখন কোষের সমস্ত ভাঙাচুরো, ব্যবহৃত ধ্বংসাবশেষ কোষের মধ্যে জমা  হয়ে কোষগুলিকে বিষাক্ত করে তোলে, তখন তার থেকে মুক্তি পাবার জন্য ঐ কোষীয় উপাদানগুলিকেই অবনমিত এবং পুর্নব্যবহারোপযোগী করার যে নিয়ন্ত্রিত, সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়াটি কোষের মধ্যে বিদ্যমান তা হলো অটোফ্যাজি। অটোফ্যাজির মাধ্যমে টক্সিনসহ কোষীয় বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার হয় এবং আমাদের শরীরকে বিষমুক্ত করে। এটি আমাদের কোষগুলির পুনর্নবায়নের সহজাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম। অটোফ্যাজির মাধ্যমে ক্যান্সারজনিত বৃদ্ধি হ্রাসকরণসহ স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় কর্মকে প্রশমিত করতে সহায়ক হয়।

অটোফ্যাজি ছাড়াও ক্যাস্পেজ (Caspase) গ্রূপের এনজাইম দ্বারা সংঘটিত ‘অ্যাপোপটোসিস’ (Apoptosis) নামে আরো একটি অনুরূপ কার্যকর প্রক্রিয়া রয়েছে। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জন কের (John Kerr) ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি আনবিকভাবে অ্যাপোপটোসিস ব্যাখ্যা করেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ২০০২সালে অ্যাপোপটোসিস নিয়ন্ত্রণকারী জীনগুলি আবিষ্কারের ফলে তিনজন বিজ্ঞানীকে (ব্রেনার, হরভিটস এবং সুলস্টন) নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয। একটি দেহকোষ তার নির্দিষ্ট সংখ্যক বিভাজনের পর যখন অকার্যকর ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে, তখন অ্যাপোপটোসিস বা জিনগত প্রোগ্রাম দ্বারা কোষের ভিতরের জীর্ণ অংশ নবায়নের পরিবর্তে সম্পূর্ণ কোষটিকেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এটি এক ধরনের পরিকল্পিত কোষ-মৃত্যু (Programmed cell death) যাকে বলা হয় কোষপতন বা অ্যাপোপটোসিস। আপাতঃদৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়াটিকে বিস্ময়কর মনে হলেও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য তা অপরিহার্য। অর্থাৎ, দেহকে পুরানো ও জঞ্জালযুক্ত কোষগুলি থেকে মুক্ত করাই হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য। এইভাবে কোষপতনের কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি কোষের বিলুপ্তি ঘটে। রক্তে ভাসমান ফাগোসাইট কোষ দ্বারা মৃত কোষগুলিকে প্রদাহজনক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে দেহ থেকে অপসারণ করা হয়। বিভিন্ন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ‘অ্যাপোপটোসিস থেরাপি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অনাহার অ্যাপোপটোসিস-কে উদ্দীপ্ত করে যকৃত কার্সিনোমাকে প্রতিরোধ করে (Qi et al, Oxid Med and Cell Longevity, 2020)।

এখন প্রশ্ন হলো যে পবিত্র রোজার সাথে অটোফ্যাজির কি সম্পর্ক রয়েছে! নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সকল ধরনের খাদ্য এবং পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা হলো অটোফ্যাজির মূল সক্রিয়তা। আমরা জানি যে কার্যকারিতার দিক থেকে অগ্ন্যাশয়ের যথাক্রমে আলফা এবং বিটা কোষ হতে নিঃসৃত গ্লুকাগন (Glucagon) এবং ইনসুলিন {Insulin) হচ্ছে বিপরীতমূখী হরমোন। অর্থাৎ, যখন  রক্তে গ্লুকোজের উপস্থিতিতে ইনসুলিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, তখন গ্লুকাগনের পরিমান কম থাকে। অপরপক্ষে, রক্তপ্রবাহে যখন গ্লুকোজের পরিমান কমে যায় (hypoglycemia)  তখন অগ্ন্যাশয়ের আলফা কোষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্লুকাগন ক্ষরিত হয় এবং যকৃতে গ্লুকোনিওজেনেসিস (gluconeogenesis) প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ তৈরি করে আমাদের প্রাণ বাঁচায়। প্রকৃতিগতভাবে ইন্সুলিন ও গ্লুকাগন এভাবেই রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্যতা বজায় রাখে। প্রকৃতপক্ষে, গ্লুকাগন হরমোন বৃদ্ধির মাধ্যমে সাময়িক অনাহার বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাবার থেকে বিরত থাকাটাই অটোফ্যাজি সূত্রপাতের মূল উদ্দীপক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোজা অটোফ্যাজিকে উদ্দীপ্ত করা ছাড়াও দেহের সমস্ত পুরানো, জাঙ্কি প্রোটিন এবং কোষীয় পরিত্যক্ত বা বর্জিত অংশগুলি সরিয়ে দেহের বিশুদ্ধতা এনে দেয়।

সাধারণতঃ  অধিক ক্যালোরিগ্রহণ বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়াগুলির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যার ফলে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন (reactive oxygen) যা ডিএনএ, আরএনএ, প্রোটিন এবং লিপিডগুলিতে জারণজনিত পীড়নের (Oxidative Stress) কারণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে, রোজার মাধ্যমে ক্যালোরি সীমাবদ্ধতা প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের পরিমান হ্রাস করে এবং দেহকে অনেক জটিল রোগ থেকে মুক্ত রাখে। আণবিক জীববিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়, অটোফ্যাজি প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের স্তর পরিবর্তনে ফসফ্যাটিডিলইনোসিটল ৩-কাইনেজ (PI3K) নামক উৎসেচক ও তার কোষীয় সংকেত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (Kma and Baruah, Biotechnol Appl Biochem, 69, 2022)। রোজা রাখার অন্তর্নিহিত বিষয়টি হলো আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সুস্বাস্থ বজায় রাখা। জিনগত প্রক্রিয়া ছাড়াও, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে, সাময়িক অনাহার বা ক্যালোরির সীমাবদ্ধতা মানুষের জীবনকালকে সুস্থ এবং প্রসারিত করার যে  অন্যতম একটি বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস তা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্যালোরি গ্রহণের সীমাবদ্ধতা বা সাময়িক অনাহার কোষের মধ্যে নানান হিতকর প্রক্রিয়াকে উদ্দীপ্ত করে যার মধ্যে অটোফ্যাজি এবং অ্যাপোপ্টোসিসের সূত্রপাতসহ হরমোনের ভারসাম্যের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য (Golbidi et al, Curr Diab Rep, 2017)। সাধারণত ১০% থেকে ৪০% কম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে বার্ধক্যের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং বয়সজনিত বহু ব্যাধির (ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং হৃৎপিন্ড ও রক্তনালী-সম্পর্কিত জটিল রোগ) সংঘটনকে প্রতিরোধ করার ব্যাপারটিও আজ প্রমাণিত (Mattison et al, Nature, 2012)। 

ক্যালোরি সীমাবদ্ধতার কারণে বার্ধক্যজনিত ক্ষেত্রে কোষীয় বিপাকের মধ্যস্থতাকারী সিরটুইন (Sirt1) নামক একটি প্রোটিন সক্রিয় হয়ে উঠে, ফলে দেহে চর্বি তৈরির সাথে সম্পর্কিত অ্যাডিপোজ (Adipose) টিস্যু থেকে ক্ষরিত PPAR gamma (পেরোক্সিসোম প্রলিফরেটর-অ্যাক্টিভেটর রিসেপ্টর গামা) প্রোটিনকে বাধাগ্রস্থ করে। স্বভাবতই, অ্যাডিপোজেনেসিস (adipogenesis) বা চর্বি সৃষ্টি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হবার কারণে শরীরে চর্বির পরিমান হ্রাস পায় যা দেহকে নীরোগ রাখে এবং  বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়াকেও বিলম্বিত করে। (Wolf, Nutrition Reviews, 2006)। অধিকন্তু, সাময়িক অনাহার বা স্বল্পাহারের কারণে অ্যাডিপোস টিস্যু থেকে ক্ষরিত লেপটিন প্রোটিনের মাত্রা হ্রাস পায়, ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং দেহে তাৎক্ষণিক এনার্জির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অব্যবহিতভাবে, এডিপোস টিস্যুতে সঞ্চিত ফ্যাট বা ট্রাইগ্লিসেরাইড ভেঙে ‘এসিটিল কো-এনজাইম এ’ (Acetyl CoA) অণুতে রূপান্তরিত হয় (লাইপোলাইসিস) যা পরবর্তী রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ATP তৈরির মাধ্যমে দেহ এনার্জি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া, ‘এসিটিল কো-এনজাইম এ’ থেকে ‘কিটোন বডি’ তৈরির (কিটোজেনেসিস) মাধ্যমে গ্লুকোজের অভাবকে দূর করে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অনাহারে থাকলেও মূলত পেটের চর্বিকে ভেঙে দেহ তার শক্তি ও খাবার জোগাড় করে নেয় এবং দেহকে সুস্থ রাখে।

ইসলামে অতিভোজনকে বরাবরই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত আছে যে “একজন মুমিন এক অন্ত্রে খায়, অর্থাৎ সামান্য খাবারে সন্তুষ্ট হয়, এবং অবিশ্বাসী বা মুনাফিক সাতটি অন্ত্রে খায়, অর্থাৎ দেহের প্রয়োজনের চেয়ে সাতগুণ  বেশি খাবার খায়” (সহীহ্  বুখারী)”। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বড় পেট বা আন্ত্রিক (visceral) ফ্যাটের সৃষ্টি, যা কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণের কারণে আমাদের লিভার বেশি করে ট্রাইগ্লিসিরাইড (triglyceride) তৈরি করে এডিপোজ বা ফ্যাট টিস্যুতে সঞ্চিত রাখে, যা হৃদজনিত রোগের জন্য মারাত্মক। পরিমিত খাওয়া, পরিমিত ঘুমানো আর অটোফ্যাজিকে উদ্দীপ্ত করে শরীরকে সুস্থ রাখা হচ্ছে আমাদের কাম্য এবং তার জন্য রোজা বা সিয়াম সাধনা হচ্ছে একটি অন্যতম পথ। 

বিষয়:

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

সিয়াম সাধনা  ও আত্মভক্ষণ বা অটোফ্যাজির উপকারিতা

প্রকাশ: ০৬:৪৫:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০২২

মাসব্যাপী পবিত্র রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে সিয়াম বা রোজা পালন করা। সিয়াম অর্থ বিরত থাকা, অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা থেকে ও রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা। শেষ রাতে সেহরি খাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে মাহে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা। রমজান আমাদেরকে স্ব-শৃঙ্খলা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, ত্যাগ ও দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি অনুশীলন করতে শেখায়। এ মাসে আত্মসংযমের মাধ্যমে দেহ, মন এবং চিন্তাচেতনার শুদ্ধি অর্জন করাই হচ্ছে সিয়ামের মূল লক্ষ্য। তাছাড়া, শান্তি, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের মতো অতিমানবিক গুণাবলিও প্রকাশ পায় আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে। ইসলামপূর্ব যুগেও এ মাসটি পবিত্র মাস হিসেবে গণ্য হতো। এ মাসে রোজা রাখা ইসলামের পঞ্চমূল নীতির অন্যতম। 

রমজান মাসে বাধ্যতামূলক রোজা রাখা ছাড়াও বছরের অন্য কোনো সময় যদি কেউ রোজা রাখতে চান তাহলে তা পালনের জন্য নির্দিষ্টভাবে কিছু সুন্নাহ-দিন বিভিন্ন সহী হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: রমজান পরে শাওয়াল মাসের ৬ দিন, সপ্তাহের সোমবার এবং বৃহস্পতিবার, বৃহস্পতিবার বা শনিবারের সাথে একত্রে শুক্রবার, চন্দ্র ক্যালেন্ডারের শুভ্রদিন নামে অভিহিত ১৩, ১৪ এবং ১৫তম দিন, মুহাররম মাসের ১০ তারিখ (আশুরা), যারা হজ্ব পালন করছেন না তাদের জন্য ‘দুল-হিজ্জাহ’ মাসের নবম দিন (আরাফাহ)। এ ছাড়া, হাদিসে বর্ণিত আছে যে আমাদের মহানবী (সা.) শাবান মাসসহ সারা বছর মাঝে মাঝে রোজা রাখতেন (সহীহ্ বুখারী)। অর্থাৎ, সবিরাম বা মাঝে মধ্যে রোজা রাখা (intermittent fasting) যে স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম তাঁর জীবনী থেকে সেটাই আমরা শিক্ষা লাভ করেছি।

কিন্তু সে আদর্শের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা গত শতাব্দীর ৫০ দশক থেকে জীববিজ্ঞানের আণবিক পর্যায়ে আমাদের জ্ঞানকে আরো প্রসারিত করেছে যখন বেলজিয়ামের এক বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান  ডি ডুভ (Christian de Duve) কোষের ভিতর একটি বিশেষায়িত নতুন কক্ষ আবিষ্কার করেন যেখানে কোষের ব্যবহৃত প্রোটিন, শর্করা এবং লিপিড যাবতীয় বস্তুগুলিকে এনজাইম দ্বারা হজম করতে দেখা গেছে। ঐ বিশেষায়িত কক্ষটি “লাইসোজোম (Lysosome)” নামে পরিচিত। এটি  এক ধরনের কোষীয় অঙ্গাণু যা সাধারণত প্রাণী কোষে পাওয়া যায়। এতে বিদ্যমান ভেসিকলগুলো হাইড্রোলাইটিক এনজাইম দ্বারা পূর্ণ এবং কোষীয় উপাদানগুলির অবক্ষয়ের জন্য একটি ওয়ার্কস্টেশন হিসেবে কাজ করে।  যে কারণে এটিকে একে “আত্মঘাতী থলিকা” বা “আত্মঘাতী স্কোয়াড”ও  বলা হয়। লাইসোজোম আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৪ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিন শাখায় ডি ডুভ-কে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়েছিল।

সাম্প্রতিককালে, মলিক্যুলার জীববিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে সাময়িক অনাহার  এবং স্বল্পাহারের উপকারিতা নিয়ে অনেক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেহে প্রাকৃতিক ও জিনগত কিছু নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া আছে যার মাধ্যমে কোষের যাবতীয় ক্ষয়ে যাওয়া অকার্যকর বড়ো আকারের অণুগুলিকে (অঙ্গাণু, প্রোটিন, শর্করা, লিপিড এবং কোষঝিল্লি) কোষ থেকে অপসারণ অথবা অন্তঃকোষীয় পুনর্ব্যবহারের উপযুক্ত ক’রে কোষগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। এ যেন কোষের মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রিত জীর্ণ-বস্তুসমূহের সংস্করণ বা পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়া! ফলে, দেহের বার্ধক্য প্রক্রিয়াটিতেও একটি মন্থর গতি অর্জন করে। কোষের এই সংস্করণের প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানীগণ আত্মভক্ষণ বা অটোফ্যাজি (Autophagy) বলে অভিহিত করেছেন। মৌলিক গবেষণা এবং এই প্রক্রিয়াটি উদ্ভাবনের ফলে টোকিও টেকনোলজি ইনস্টিটিউট-এর সেল জীববিজ্ঞানী  ‘ইয়োশিনোরি ওহসুমি’ ফিজিওলজি বা মেডিসিনে ২০১৬ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। ওহসুমি তার গবেষণায় ১৫টি জীন সনাক্ত করেছিলেন যা অটোফ্যাজি  প্রক্রিয়াটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন।

অটোফ্যাজি শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে তার আক্ষরিক অর্থ হলো আত্মভক্ষ অর্থাৎ নিজে নিজেকে খাওয়া (self-cannibalism)। যখন কোষের সমস্ত ভাঙাচুরো, ব্যবহৃত ধ্বংসাবশেষ কোষের মধ্যে জমা  হয়ে কোষগুলিকে বিষাক্ত করে তোলে, তখন তার থেকে মুক্তি পাবার জন্য ঐ কোষীয় উপাদানগুলিকেই অবনমিত এবং পুর্নব্যবহারোপযোগী করার যে নিয়ন্ত্রিত, সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়াটি কোষের মধ্যে বিদ্যমান তা হলো অটোফ্যাজি। অটোফ্যাজির মাধ্যমে টক্সিনসহ কোষীয় বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার হয় এবং আমাদের শরীরকে বিষমুক্ত করে। এটি আমাদের কোষগুলির পুনর্নবায়নের সহজাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম। অটোফ্যাজির মাধ্যমে ক্যান্সারজনিত বৃদ্ধি হ্রাসকরণসহ স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় কর্মকে প্রশমিত করতে সহায়ক হয়।

অটোফ্যাজি ছাড়াও ক্যাস্পেজ (Caspase) গ্রূপের এনজাইম দ্বারা সংঘটিত ‘অ্যাপোপটোসিস’ (Apoptosis) নামে আরো একটি অনুরূপ কার্যকর প্রক্রিয়া রয়েছে। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জন কের (John Kerr) ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি আনবিকভাবে অ্যাপোপটোসিস ব্যাখ্যা করেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ২০০২সালে অ্যাপোপটোসিস নিয়ন্ত্রণকারী জীনগুলি আবিষ্কারের ফলে তিনজন বিজ্ঞানীকে (ব্রেনার, হরভিটস এবং সুলস্টন) নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয। একটি দেহকোষ তার নির্দিষ্ট সংখ্যক বিভাজনের পর যখন অকার্যকর ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে, তখন অ্যাপোপটোসিস বা জিনগত প্রোগ্রাম দ্বারা কোষের ভিতরের জীর্ণ অংশ নবায়নের পরিবর্তে সম্পূর্ণ কোষটিকেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এটি এক ধরনের পরিকল্পিত কোষ-মৃত্যু (Programmed cell death) যাকে বলা হয় কোষপতন বা অ্যাপোপটোসিস। আপাতঃদৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়াটিকে বিস্ময়কর মনে হলেও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য তা অপরিহার্য। অর্থাৎ, দেহকে পুরানো ও জঞ্জালযুক্ত কোষগুলি থেকে মুক্ত করাই হচ্ছে এই প্রক্রিয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য। এইভাবে কোষপতনের কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি কোষের বিলুপ্তি ঘটে। রক্তে ভাসমান ফাগোসাইট কোষ দ্বারা মৃত কোষগুলিকে প্রদাহজনক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে দেহ থেকে অপসারণ করা হয়। বিভিন্ন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ‘অ্যাপোপটোসিস থেরাপি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অনাহার অ্যাপোপটোসিস-কে উদ্দীপ্ত করে যকৃত কার্সিনোমাকে প্রতিরোধ করে (Qi et al, Oxid Med and Cell Longevity, 2020)।

এখন প্রশ্ন হলো যে পবিত্র রোজার সাথে অটোফ্যাজির কি সম্পর্ক রয়েছে! নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সকল ধরনের খাদ্য এবং পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা হলো অটোফ্যাজির মূল সক্রিয়তা। আমরা জানি যে কার্যকারিতার দিক থেকে অগ্ন্যাশয়ের যথাক্রমে আলফা এবং বিটা কোষ হতে নিঃসৃত গ্লুকাগন (Glucagon) এবং ইনসুলিন {Insulin) হচ্ছে বিপরীতমূখী হরমোন। অর্থাৎ, যখন  রক্তে গ্লুকোজের উপস্থিতিতে ইনসুলিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, তখন গ্লুকাগনের পরিমান কম থাকে। অপরপক্ষে, রক্তপ্রবাহে যখন গ্লুকোজের পরিমান কমে যায় (hypoglycemia)  তখন অগ্ন্যাশয়ের আলফা কোষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্লুকাগন ক্ষরিত হয় এবং যকৃতে গ্লুকোনিওজেনেসিস (gluconeogenesis) প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ তৈরি করে আমাদের প্রাণ বাঁচায়। প্রকৃতিগতভাবে ইন্সুলিন ও গ্লুকাগন এভাবেই রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্যতা বজায় রাখে। প্রকৃতপক্ষে, গ্লুকাগন হরমোন বৃদ্ধির মাধ্যমে সাময়িক অনাহার বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাবার থেকে বিরত থাকাটাই অটোফ্যাজি সূত্রপাতের মূল উদ্দীপক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোজা অটোফ্যাজিকে উদ্দীপ্ত করা ছাড়াও দেহের সমস্ত পুরানো, জাঙ্কি প্রোটিন এবং কোষীয় পরিত্যক্ত বা বর্জিত অংশগুলি সরিয়ে দেহের বিশুদ্ধতা এনে দেয়।

সাধারণতঃ  অধিক ক্যালোরিগ্রহণ বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়াগুলির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যার ফলে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন (reactive oxygen) যা ডিএনএ, আরএনএ, প্রোটিন এবং লিপিডগুলিতে জারণজনিত পীড়নের (Oxidative Stress) কারণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে, রোজার মাধ্যমে ক্যালোরি সীমাবদ্ধতা প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের পরিমান হ্রাস করে এবং দেহকে অনেক জটিল রোগ থেকে মুক্ত রাখে। আণবিক জীববিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়, অটোফ্যাজি প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনের স্তর পরিবর্তনে ফসফ্যাটিডিলইনোসিটল ৩-কাইনেজ (PI3K) নামক উৎসেচক ও তার কোষীয় সংকেত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (Kma and Baruah, Biotechnol Appl Biochem, 69, 2022)। রোজা রাখার অন্তর্নিহিত বিষয়টি হলো আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সুস্বাস্থ বজায় রাখা। জিনগত প্রক্রিয়া ছাড়াও, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে, সাময়িক অনাহার বা ক্যালোরির সীমাবদ্ধতা মানুষের জীবনকালকে সুস্থ এবং প্রসারিত করার যে  অন্যতম একটি বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস তা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্যালোরি গ্রহণের সীমাবদ্ধতা বা সাময়িক অনাহার কোষের মধ্যে নানান হিতকর প্রক্রিয়াকে উদ্দীপ্ত করে যার মধ্যে অটোফ্যাজি এবং অ্যাপোপ্টোসিসের সূত্রপাতসহ হরমোনের ভারসাম্যের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য (Golbidi et al, Curr Diab Rep, 2017)। সাধারণত ১০% থেকে ৪০% কম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে বার্ধক্যের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং বয়সজনিত বহু ব্যাধির (ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং হৃৎপিন্ড ও রক্তনালী-সম্পর্কিত জটিল রোগ) সংঘটনকে প্রতিরোধ করার ব্যাপারটিও আজ প্রমাণিত (Mattison et al, Nature, 2012)। 

ক্যালোরি সীমাবদ্ধতার কারণে বার্ধক্যজনিত ক্ষেত্রে কোষীয় বিপাকের মধ্যস্থতাকারী সিরটুইন (Sirt1) নামক একটি প্রোটিন সক্রিয় হয়ে উঠে, ফলে দেহে চর্বি তৈরির সাথে সম্পর্কিত অ্যাডিপোজ (Adipose) টিস্যু থেকে ক্ষরিত PPAR gamma (পেরোক্সিসোম প্রলিফরেটর-অ্যাক্টিভেটর রিসেপ্টর গামা) প্রোটিনকে বাধাগ্রস্থ করে। স্বভাবতই, অ্যাডিপোজেনেসিস (adipogenesis) বা চর্বি সৃষ্টি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হবার কারণে শরীরে চর্বির পরিমান হ্রাস পায় যা দেহকে নীরোগ রাখে এবং  বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়াকেও বিলম্বিত করে। (Wolf, Nutrition Reviews, 2006)। অধিকন্তু, সাময়িক অনাহার বা স্বল্পাহারের কারণে অ্যাডিপোস টিস্যু থেকে ক্ষরিত লেপটিন প্রোটিনের মাত্রা হ্রাস পায়, ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং দেহে তাৎক্ষণিক এনার্জির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অব্যবহিতভাবে, এডিপোস টিস্যুতে সঞ্চিত ফ্যাট বা ট্রাইগ্লিসেরাইড ভেঙে ‘এসিটিল কো-এনজাইম এ’ (Acetyl CoA) অণুতে রূপান্তরিত হয় (লাইপোলাইসিস) যা পরবর্তী রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ATP তৈরির মাধ্যমে দেহ এনার্জি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া, ‘এসিটিল কো-এনজাইম এ’ থেকে ‘কিটোন বডি’ তৈরির (কিটোজেনেসিস) মাধ্যমে গ্লুকোজের অভাবকে দূর করে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অনাহারে থাকলেও মূলত পেটের চর্বিকে ভেঙে দেহ তার শক্তি ও খাবার জোগাড় করে নেয় এবং দেহকে সুস্থ রাখে।

ইসলামে অতিভোজনকে বরাবরই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত আছে যে “একজন মুমিন এক অন্ত্রে খায়, অর্থাৎ সামান্য খাবারে সন্তুষ্ট হয়, এবং অবিশ্বাসী বা মুনাফিক সাতটি অন্ত্রে খায়, অর্থাৎ দেহের প্রয়োজনের চেয়ে সাতগুণ  বেশি খাবার খায়” (সহীহ্  বুখারী)”। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বড় পেট বা আন্ত্রিক (visceral) ফ্যাটের সৃষ্টি, যা কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণের কারণে আমাদের লিভার বেশি করে ট্রাইগ্লিসিরাইড (triglyceride) তৈরি করে এডিপোজ বা ফ্যাট টিস্যুতে সঞ্চিত রাখে, যা হৃদজনিত রোগের জন্য মারাত্মক। পরিমিত খাওয়া, পরিমিত ঘুমানো আর অটোফ্যাজিকে উদ্দীপ্ত করে শরীরকে সুস্থ রাখা হচ্ছে আমাদের কাম্য এবং তার জন্য রোজা বা সিয়াম সাধনা হচ্ছে একটি অন্যতম পথ।