উইলিয়াম কেরি (১৭ আগস্ট ১৭৬১ – ৯ জুন ১৮৩৪) ছিলেন একজন ব্রিটিশ মিশনারি, বাংলায় গদ্য পাঠ্যপুস্তকের প্রবর্তক, খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, অনুবাদক এবং সমাজসংস্কারক। তিনি ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি এবং শ্রীরামপুর কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।
প্রারম্ভিক জীবন
উইলিয়াম কেরি ১৭৬১ সালের ১৭ আগস্ট ইংল্যান্ডের নর্দানটন শায়ারের পলাইপুরী গ্রামে একটি দরিদ্র তাঁতী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এলিজাবেথ ও এডমন্ড কেরির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। ছয় বছর বয়সে তার পিতা স্থানীয় চার্চ সম্প্রদায়ের করণিক ও গ্রাম্য স্কুলশিক্ষককে তার শিক্ষার জন্য নিযুক্ত করেন।
বাল্যকাল থেকেই কেরি ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানপিপাসু। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, বিশেষত উদ্ভিদবিদ্যায় তার গভীর আগ্রহ ছিল। ভাষাশিক্ষার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন বিশেষ মেধাসম্পন্ন এবং স্বচেষ্টায় লাতিন ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন।
কর্মজীবনের সূচনা
১৭৭৭ সালে তিনি হ্যাকেল্টনে ক্লার্ক নিকোলাস নামক এক মুচির অধীনে কাজ শিখতে শুরু করেন। নিকোলসের কাছে শিক্ষানবিশ করার সময় তিনি স্থানীয় এক কলেজ-শিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তায় গ্রিক ভাষা শেখেন।
১৭৭৯ সালে নিকোলসের মৃত্যুর পর কেরি থমাস ওল্ড নামক অন্য এক মুচির নিকট কাজ করতে যান। ১৭৮১ সালে তিনি থমাস ওল্ডের শ্যালিকা ডরোথি প্ল্যাকেটকে বিবাহ করেন। তাদের মোট চার পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান জন্মেছিল, তবে দুই কন্যা ও পুত্র পিটার অল্পবয়সেই মারা যায়।
থমাস ওল্ডের মৃত্যুর পর কেরি তার ব্যবসার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি হিব্রু, ইতালীয়, ডাচ ও ফরাসি ভাষা শেখেন। জুতা তৈরির কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন।
ধর্মীয় জীবন ও মিশনারি সংকল্প
স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠার কারণে স্থানীয় মিশনারিদের সাথে কেরির সখ্যতা গড়ে ওঠে। তিনি নবগঠিত স্থানীয় সংঘ স্ট্রিক্ট ব্যাপ্টিস্টের কাজকর্মের সাথে জড়িত হন। ১৭৮৩ সালের ৫ অক্টোবর জন রিল্যান্ড কর্তৃক বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন এবং ব্যাপ্টিস্ট ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেন।
১৭৮৫ সালে মৌল্টন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পান। এই চাকরির পাশাপাশি তিনি ব্যাপ্টিস্ট হিসেবে গির্জায় ভাষণও দিতেন। এই সময় তিনি জোনাথান এডওয়ার্ডস এবং জেমস কুকের রচনাবলি অধ্যয়ন করেন এবং সমগ্র বিশ্বে খ্রিস্টীয় গসপেল প্রচার সম্বন্ধে সচেতন হন।

মিশনারি ইস্তেহার ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা
১৭৮৯ সালে কেরি লেইসেস্টারে একটি ব্যাপ্টিস্ট চার্চে পূর্ণসময়ের পাস্টর নিযুক্ত হন। তিন বছর পর ১৭৯২ সালে তিনি “An Enquiry into the Obligations of Christians to use Means for the Conversion of the Heathens” নামে একটি ঐতিহাসিক মিশনারি ইস্তেহার প্রকাশ করেন।
এই ছোট কিন্তু প্রভাবশালী বইটি পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। প্রথম খণ্ডে মিশনারি কার্যকলাপের ধর্মতাত্ত্বিক যাথার্থবিচার, দ্বিতীয় খণ্ডে মিশনারি কার্যকলাপের ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ডে বিশ্বের সকল দেশের অঞ্চল, জনসংখ্যা ও ধর্মীয় পরিসংখ্যানের তালিকা, চতুর্থ খণ্ডে মিশনারি প্রেরণের বিভিন্ন আপত্তির উত্তর এবং পঞ্চম খণ্ডে একটি মিশনারি সমাজ গঠনের আহ্বান ছিল।
কেরির এই প্রচেষ্টার ফলে ১৭৯২ সালের অক্টোবরে কেরি, অ্যান্ড্রু ফিলার, জন রিল্যান্ড ও জন সাটক্লিফের সহায়তায় পার্টিকুলার ব্যাপ্টিস্ট সোসাইটি ফর প্রোপাগেটিং দ্য গসপেল অ্যামং দ্য হিদেনস (বর্তমানে বিএমএস ওয়ার্ল্ড মিশন) প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারতে আগমন
১৭৯৩ সালের ১৩ জুন কেরি তার পরিবারসহ ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তার স্ত্রী ডরোথি যেতে অস্বীকার করেছিলেন, কিন্তু পরে তার বোন কেটির সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে রাজি হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধিতার কারণে অনেক বাধা পেরিয়ে অবশেষে ১৭৯৩ সালের নভেম্বর মাসে তারা কলকাতায় পৌঁছান।
কলকাতায় এসে কেরি রামরাম বসুর কাছে বাংলা শেখা শুরু করেন। প্রথমে তিনি মেদেনীপুরে একটি নীলকুঠিতে ম্যানেজারের কাজ নেন। এই ছয় বছরে তিনি একটি অবৈতনিক দৈনিক পাঠশালা খোলেন এবং বাংলা ভাষায় বাইবেলের নতুন নিয়মের অনুবাদ সম্পন্ন করেন।
শ্রীরামপুর মিশন ও প্রকাশনা কার্যক্রম
১৭৯৯ সালে মার্শম্যান ও ওয়ার্ডসহ নতুন মিশনারিরা ভারতে আসেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধিতার কারণে তারা শ্রীরামপুরের ডেনিশ কলোনিতে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি কেরি তাদের সাথে যোগ দেন এবং শ্রীরামপুরে ব্যাপ্টিস্ট মিশন গড়ে ওঠে।
ধর্মপ্রচার ও শিক্ষা প্রসারের জন্য তারা একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এই প্রেস থেকে ১৮০০ সালের ৫ মার্চ বাংলা ভাষায় বাইবেলের নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়। ১৮০৯ সালে তিনি বাংলায় সম্পূর্ণ বাইবেলের অনুবাদ সম্পন্ন করেন।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবদান
১৮০১ সালে গভর্নর-জেনারেল ওয়েলেসলি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করলে কেরি বাংলা ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি রামরাম বসু ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের সাথে মিলে বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। তার নিজের রচিত বাংলা ব্যাকরণ ও আদর্শ সংলাপের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
১৮১৮ সালে শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। একই বছর “দিকদর্শন” নামে একটি মাসিক ও “সমাচার দর্পণ” নামে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
কেরি শিক্ষা প্রসারের জন্য কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতের জনসাধারণের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করেন।
ভাষাগত অবদান
কেরি একাধিক ভারতীয় ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন। তার অনুবাদকৃত ভাষাগুলি হলো বাংলা, সংস্কৃত, মারাঠি ও পাঞ্জাবি। তিনি একটি বাংলা-ইংরেজি অভিধান এবং একটি সর্বভারতীয় ভাষার অভিধান প্রণয়নের কাজও করেছিলেন, যদিও পরেরটি আগুনে পুড়ে যায়।
সামাজিক সংস্কার
কেরি ভারতে নারী শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে এবং সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন জারি করলে সেই আইনের বাংলা অনুবাদের দায়িত্ব পান কেরি। তিনি সারাদিন ধরে এই অনুবাদ সম্পন্ন করেন এবং নিজেই বেন্টিঙ্কের হাতে পৌঁছে দেন।
কৃষি ও বাগান বিজ্ঞান
বাল্যকাল থেকেই উদ্ভিদবিদ্যায় কেরির আগ্রহ ছিল। ১৮১৯ সালে তিনি একটি কৃষি সমিতি স্থাপন করেন। ১৮২০ সালে হর্টিকালচার ও অ্যাগ্রিকালচার সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতির মাধ্যমে কয়েকটি স্থানে আদর্শ কৃষি উদ্যান গড়ে তোলা হয়।
ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ
কেরির ব্যক্তিগত জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট ছিল। ১৭৯৬ সালে তার পাঁচ বছরের পুত্র পিটার আমাশয় রোগে মারা যায়। এর ফলে তার স্ত্রী ডরোথির স্নায়ুবৈকল্য হয় এবং ১৮০৭ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৮০৮ সালে তিনি ডেনিশ মহিলা সার্লট রুউমোরকে বিয়ে করেন, কিন্তু ১৮২১ সালে তিনিও মারা যান। ১৮২৩ সালে তিনি গ্রেস হগসকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন।
১৮১২ সালে শ্রীরামপুর ছাপাখানায় বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে তার বহু মূল্যবান কাজ নষ্ট হয়। ১৮২২ সালে তার যোগ্য পুত্র ফেলিক্স কেরির মৃত্যু এবং তার ১৩টি ভাষার সর্বশব্দকোষ আগুনে পুড়ে যাওয়া তার জীবনের বড় দুটি ক্ষতি।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৮৩৪ সালের ৯ জুন ৭৩ বছর বয়সে উইলিয়াম কেরির কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাকে শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়।
উইলিয়াম কেরি শুধুমাত্র একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক শিক্ষা, প্রকাশনা, সাংবাদিকতা এবং সামাজিক সংস্কারের অগ্রদূত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শিক্ষা, ভাষা এবং সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে একটি জাতির উন্নতি সম্ভব।










