সোমবার, জানুয়ারি ১৭, ২০২২
সোমবার, জানুয়ারি ১৭, ২০২২

বাউল এবং বাউল গান

বাউল হলো এমন একটি বিশেষ ধরণের গোষ্ঠী ও লোকাচার সঙ্গীত পরিবেশক, যারা গানের সাথে সাথে সুফিবাদ, দেহতত্ত্ব প্রভৃতি মতাদর্শ প্রচার করে থাকে। বাউলদের 'বাউল শিল্পী' বা 'বাউল সাধক' নামেও ডাকা হয়।

সাধারণত বাউলেরা যে সংগীত বা গান রচনা ও পরিবেশন করে তাকে বাউল গান বলে। বাউল গান বাউল সম্প্রদায়ের সাধনসঙ্গীত। এটি লোকসঙ্গীতের অন্তর্গত। বাউল গানের উদ্ভব সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। এখানে বাউল ও বাউল গান সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো।

বাউল কারা?

বাউল হলো এমন একটি বিশেষ ধরণের গোষ্ঠী ও লোকাচার সঙ্গীত পরিবেশক, যারা গানের সাথে সাথে সুফিবাদ, দেহতত্ত্ব প্রভৃতি মতাদর্শ প্রচার করে থাকে। বাউলদের ‘বাউল শিল্পী’ বা ‘বাউল সাধক’ নামেও ডাকা হয়।

ইউনেস্কোর বলছে, “The Bauls are mystic minstrels living in rural Bangladesh and West Bengal, India”।

বাউল সম্প্রদায়কে বিশেষ কোনো এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক বলেও দাবি করা হয়, যদিও স্বীকৃত ধর্ম বা ধর্মসমূহের অনুসারী তারা নন বলেও অনেকে মত দিয়ে থাকেন।

বাংলার বাউল বা বাউল সংগীত সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। তবে ‘বাউল’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে এক গবেষক বলেছেন- সংস্কৃত ‘বায়ু” থেকে বাউল শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। তার মতে, “বাংলার যে সব লোক ‘বায়ু’ অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার সাহায্যে সাধনার মাধ্যমে আত্মিক শক্তি লাভ করার চেষ্টা করেন, তারাই বাউল”।

অনেকের মতে, সংস্কৃত ‘বাতুল’ শব্দ থেকে বাউল শব্দটির উৎপত্তি, এই গবেষকদের মতে- যে সব লোক প্রকৃতই পাগল, তাই তারা কোনো সামাজিক বা ধর্মের কোনো বিধিনিষেধ মানে না, তারাই বাউল। কেউ কেউ বলেন, ‘বাউর’ শব্দ থেকে ‘বাউল’ শদের উৎপত্তি, যার অর্থ এলো-মেলো, বিশৃঙ্খল, পাগল।

বাউল গান বা সংগীত কী?

বাউল শিল্পিরা যে সকল সংগীত পরিবেশন করে থাকেন তাকে বলা হয় বাউল গান বা বাউল সংগীত।

বাউল গান হলো বাউল সম্প্রদায় কর্তৃক রচিত ও পরিবেশিত এক প্রকারের আধ্যাত্মিক গান।

বাউল সম্প্রদায়ের ধর্মমত ও গান

বাউলরা দেহতত্ত্ব আশ্রিত ও অধ্যাত্মমুখী এক প্রকার লৌকিক ধর্মমত পোষণ করেন; একে বাউল ধর্মমত বলা হয়। বাউলদের ধর্ম কিংবা ধর্মমতের কোনো লিখিত সাহিত্য বা শাস্ত্র বা ধর্মগ্রন্থ নেই।

বাউল সম্প্রদায়ের লোকেরা যে সকল ধর্মীয় তত্ত্ব, ধর্মদর্শন, জীবনবোধ ও আদর্শের কথা প্রকাশ করেন, তা করেন তাদের নিজেদেরই সৃষ্ট গান ও সাহিত্যে। অবশ্য বাউল সাহিত্যকে বাউল গানের থেকে আলাদা করে দেখা হয় না। যারা বাউল তারা মনে করেন যে, তাদের গান হলো ধর্মের অঙ্গ।

বাউলরা নিজেদের মতো করে দিনযাপন করেন এবং বিভিন্ন রকমের ধর্মীয় আসর বিশেষ করে ওরস উৎসব পালন করেন। নিজদের বিশ্বাস ও খেয়াল অনুসারে তারা গান রচনা ও তা পরিবেশন করেন। এভাবেই তারা ধর্মকর্ম পালন করে থাকেন।

বাউলসমাজ ‘দেহতত্ত্ব’র সাধনার মাধ্যমে পরমাত্মার সন্ধান করে। তাদের গানগুলোতে খাঁচা, মানুষ, মনের মানুষ, অচিন পাখি, মনুরায় ইত্যাদি রুপক বা প্রতীকী ভাষায় তারা পরমাত্মাকে অভিহিত করে। যেমন- লালন শাহের গান ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’।

পরমাত্মা মানবদেহে বাস করে বলে বাউলদের বিশ্বাস। পরমাত্মার সাথে মানবাত্মার মিলন সাধন তাদের দেহসাধনার মূল লক্ষ্য; অধ্যাত্মপ্রেম তথা ভক্তি দ্বারা এ মিলন সাধন সম্ভব।

বাউলদের দেহকেন্দ্রিক অধ্যাত্ম সাধনা প্রধানত গুরু-নির্ভর; গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে যোগাদি সাধনা এবং নানা আচার পালন ও রীতিনীতি করতে হয়। এ দেহ, আত্মা, পরমাত্মা, গুরু, প্রেম-ভক্তি, সৃষ্টিরহস্য ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাউল গান রচিত হয়েছে।

বাউল গানে যা কিছু স্থান পেয়েছে সেগুলো হলো আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, মানুষতত্ত্ব প্রভৃতি। বাউল গানের আত্মতত্ত্বে মনের প্রস্ত্ততি, দেহতত্ত্বে সাধনার রীতি-পদ্ধতি, গুরুতত্ত্বে গুরুর চরণ শরণ, সৃষ্টিতত্ত্বে জীবসৃষ্টির রহস্য এবং মানুষতত্ত্বে পরমাত্মার মিলনাকাঙক্ষা ব্যক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয়ী গ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলী’ (Songs Offerings)-এ বাউল গানের প্রভাব রয়েছে।

বাউল গান এবং লালন শাহ

বাউল গানের স্রষ্টা ফকির লালন শাহ। লালন শাহের আনুমানিক জন্ম ১৭৭৪ সালে এবং মৃত্যু ১৮৯০ সালে। লালন শাহর জন্মস্থান কুষ্টিয়ার ভাড়রা গ্রাম; কেএ কেউ মনে করেন তিনি যশোরের হরিশপুর গ্রাম। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আস্তানা নিয়ে তিনি সাধক জীবন অতিবাহিত করে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃত্যুর পূর্বে লালন শাহ অনেক শিষ্য-প্রশিষ্য গ্রহণ করে বাউল সম্প্রদায়কে সংগঠিত করেন। লালন বাউল গান রচনা করে নিজে  গাইতেন, শিষ্যরাও গাইত। পরবর্তীকালে শিষ্য-প্রশিষ্যের নিকট থেকে লালনের গান সংগ্রহ করা হয়েছে। লালন শাহর যত শিষ্যের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েক জন হলেন দুদ্দু শাহ, পাঞ্জু শাহ, পাগলা কানাই প্রমুখ। লালনের শিষ্যরাও লালনকে অনুসরণ করে বহু বাউল গান রচনা করেছেন।

লালনের গানের সংখ্যা আনুমানিক দুই থেকে আড়াই হাজার। শিষ্যরাও শত শত বাউল গান রচনা করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ও গগন হরকরার গান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। পাগলা কানাইয়ের শতাধিক গান সংগৃহীত ও সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। 

উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ (১৩৬৪) গ্রন্থে  ৯০ জন বাউল কবির ৬৭৯টি গান সংকলিত করেছেন; এগুলির মধ্যে কিছু অজ্ঞাত কবির গানও আছে। যেহেতু পরমাত্মা মানবদেহে বাস করে, সেহেতু  বাউলরা বিশ্বাস করেন যে, নিজেকে জানলে সেই পরম পুরুষকে জানা যায়। লালন শাহ জাতিভেদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউলদের জাতি, ধর্ম ও বর্ণভেদমুক্ত জীবনবোধ ও ধর্মাদর্শের  প্রশংসা করে একে ‘মানবধর্ম’ বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, হিন্দু কিংবা ইসলাম ধর্মের অনুসারী লালন শাহ ছিলেন না; লালন শাহ ছিলেন মানবধর্মের অনুসারী।

২০০৪ সালে ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত বিবিসি বাংলার এক জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০ জন বাঙালির তালিকায় ১২ তম স্থানে আসেন সাধক লালন ফকির।

বাউল গানের বাদ্যযন্ত্র

বাউল গানে হরেক রকম বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় যেগুলোর মধ্যে প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো একতারা। কোনো কোনো বাউল কোমরে বাঁয়া বাঁধে। ডান হাতে একতারা এবং বাম হাতে বাঁয়া বাজিয়ে বাউলরা একা অথবা দলবদ্ধভাবে গান-নাচ করে। গান, নাচ, বাদ্য- তিনের সমন্বয়ে বাউল গান স্বতন্ত্র আবেগ ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। গানই তাদের ধর্মসাধনার অঙ্গ। বাউল ভাটিয়ালি অঙ্গের গান; এতেও টানা সুর আছে। কীর্তনের টানা ও লঘু সুরের মিশ্র আঙ্গিকেও বাউল গান রচিত হয়েছে। এ ছাড়াও অন্য অনেক গুণে বাউল স্বতন্ত্র সংগীত ধারা সৃষ্টি করেছে। মরমিয়াপন্থী বাউল গানের বেদনাবিধুর সুর সর্বশ্রেণীর মানুষের চিত্ত জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

বাউল গানের কেন্দ্র কুষ্টিয়া

বাংলাদেশের কুষ্টিয়া হলো বাউল গানের কেন্দ্র-ভূমি বা জন্মভূমি। এই বাউল গান কুষ্টিয়া থেকে কালক্রমে পার্শ্ববর্তী যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল, পাবনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এই বাউল গান পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, বর্ধমান ও বীরভূম জেলায় প্রসার লাভ করেছে।

বাউল গান হলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান

বাউল গান হলো বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি বড়ো উপাদান, যা অনেকেই মনে করেন। যখন থেকে বাউল গানকে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অংশ মনে করা শুরু হলো, তখন থেকে এই বাউল গানের চর্চা শুধু বাউল সাধকদের মধ্যে সীমিত তা দেশের সকল শ্রেণির শিক্ষিত শিল্পীর কণ্ঠে গীত হয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে।

বাউল গানকে এখন বাংলা সংগীত শিল্পের একটি বড়ো উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। লালন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম কিংবা অন্য সকল বাউলদের গান নিয়ে যেমন গবেষণা হচ্ছে তেমনই বাণিজ্যিকভাবেও তাদের গানগুলোর তুমুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্তমান সময়ে।

বাউল গানের মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সংগীত-মাধুর্য অধুনা বিশ্ববাসীর মন জয় করেছে। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ২০১৫ সালে বাউল গানকে মানবজাতির ঐহিত্যের স্মারক রূপে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • আহমদ, ওয়াকিল. বাউল সংগীত. বাংলাপিডিয়া. https://bn.banglapedia.org/index.php/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%89%E0%A6%B2_%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%A8
  • করীম, আনোয়ারুল. বাউল. https://bn.banglapedia.org/index.php/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%89%E0%A6%B2
  • বিবিসি. (২০২০). সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপে ১২ নম্বরে বাউল সাধক ফকির লালন শাহ. https://www.bbc.com/bengali/news-50202856
  • UNESCO. Baul Songs. https://ich.unesco.org/en/RL/baul-songs-00107
মু. মিজানুর রহমান মিজানhttps://www.mizanurrmizan.info
মু. মিজানুর রহমান মিজান সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকায় মাস্টার অব এডুকেশন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী এবং একজন স্বাধীন লেখক। তিনি শিক্ষা গবেষণায় বেশ আগ্রহী।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

সেরা দশটি বিভাগ

এই বিষয়ের আরও নিবন্ধ