বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

সাহিত্য ও সাহিত্যের রূপ, সাহিত্য প্রসঙ্গে প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল

ইন্দ্রিয়ের মাধমে জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হলো সাহিত্য।

প্রতিটি সাহিত্যরূপ স্বতন্ত্র

জীবনযাপনের প্রশ্নে মানুষের রূপ ও প্রকৃতি বিচিত্র। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই এই বিচিত্ররূপের জীবন উপভোগের জন্য মানুষ কেবল বস্তুগত উপাদানের ওপরই নির্ভর করেনি বরং সৃষ্টি করেছে অনুভূতি প্রকাশের ভিন্ন ভিন্ন উপায়। আদি মানব পারস্পরিক ভাব আদান-প্রদানের জন্য প্রথম যে ধ্বনিটি উচ্চারণ করেছিলো, তাই সভ্যতার আদি শিল্প। ধ্বনি>শব্দ> ভাষা; এই বিবর্তন পরম্পরার মধ্য দিয়ে সংগীত সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্পরূপের জন্ম হয়েছে। সভ্যতার একেকটি পর্যায়ে একেকটি সাহিত্য রূপের (Literary Form) জন্ম হয়েছে। মানুষের জীবনযাপনের প্রকৃতি, ভাব ও ভাবনা, চিন্তা ও প্রকাশক্ষমতার বৈশিষ্ট্যই বিভিন্ন যুগে সাহিত্যের রূপ ও শাখাগুলোর জন্ম দিয়েছে। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটোগল্প ও প্রবন্ধ সাহিত্যের প্রধান কয়েকটি আঙ্গিক। বিষয়ভাবনা ও বিন্যাসের দিক থেকে প্রতিটি সাহিত্যরূপই স্বতন্ত্র।

সাহিত্য সৃষ্টি

সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ ছিলো ভাষাহীন, নিঃশব্দ। তখন মানুষের ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিলো বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি। পরিবারভুক্ত, যূথবদ্ধ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনেই সৃষ্টি করে ভাষা। সেই প্রয়োজন ছিলো একান্তভাবেই বস্তুগত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও অনুভূতির বহুমুখী বিস্তার ঘটে। 

মানুষের সম্পর্কযেমন স্থূল, বস্তুসর্বস্ব থাকেনা, তেমনি তার জীবনযাপন ও জীবন উপভোগের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা ও সূক্ষ্মতার প্রকাশ ঘটতে থাকে। আদি মানব তার ভাব প্রথম প্রকাশ করে চিত্রের মাধ্যমে  প্রাচীন গুহাগাত্রে এখনও তার নিদর্শন বিদ্যমান। ভাষা আবিষ্কার হবার পর মানুষ ক্রমান্বয়ে তার বিচিত্র ভাবকে আঙ্গিকের আশ্রয়ে প্রকাশ করতে থাকে।

এভাবেই মানুষের আদি শব্দশিল্প কবিতার সৃষ্টি। নাটকের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন উপযোগী শিল্পমাধ্যম তৈরির প্রয়োজনবোধ থেকে। সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় এভাবেই মানুষ ক্রমান্বয়ে তার জীবনযাপন, জীবন উপভোগ ও তার সূক্ষ্মতর প্রকাশের প্রয়োজনে বিভিন্ন সাহিত্য আঙ্গিকের সৃষ্টি করেছে। এ ভাবেই ক্রমান্বয়ে মানুষ তার প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছে উপন্যাস, ছোটোগল্প ও প্রবন্ধ।

সাহিত্য হলো নির্বস্তুক

সাহিত্য প্রকৃতপক্ষে একটি নির্বস্তুক ধারণা। বস্তুর স্বভাব ও প্রকৃতি দিয়ে এর বিচার সম্ভব নয়। আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, সংবেদনশীলতা প্রভৃতি যে সকল ধারণা আমরা সাহিত্যবিচারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি এর একটিও বস্তুস্বভাবকে প্রকাশ করে না। কিন্তু মানুষের বাস্তব জীবনই সাহিত্যসৃষ্টির উৎস। ব্যক্তিমানুষ যেমন নিজে নিজে সৃষ্টি হয়না, তেমনি মানুষের সৃষ্ট সাহিত্য শূন্য থেকে আবির্ভূত হয়না।

সাহিত্য প্রসঙ্গে প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল

শিল্প ও সাহিত্য মানুষের জীবন থেকে উদ্ভূত; এই ধারণা প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত। গ্রিক দার্শনিক ও তাত্ত্বিক প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ (Republic) গ্রন্থে শিল্প-সাহিত্যসৃষ্টির বেশ কয়েকটি সূত্র নির্দেশ করেছেন:

  • ১. শিল্পসৃষ্টি হলো অনুকরণ।মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎই শিল্পসাহিত্যের অবলম্বন। তিনি মনে করতেন কবির সৃষ্টি অনুকরণের অনুকরণ এবং তা মিথ্যা।
  • ২. শিল্পের সঙ্গে নীতির সম্পর্কসুগভীর। শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব নৈতিক গুণাবলীর উপর নির্ভরশীল।
  • ৩. সাহিত্যশিল্প ভাবের বিষয়, জ্ঞানের বিষয় নয়।
  • ৪. দর্শনের সত্য শিল্পের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। এই ধারণার ফলে সাহিত্যের সত্য ও দর্শনের সত্যের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য নির্দেশ করতে পারেন নি।
  • ৫. কাব্যে রূপের চেয়ে ভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

এই সূত্রগুলো থেকে বোঝা যায় প্লেটো অনুকরণ বলতে অবিকল প্রতিরূপ বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল অনুকরণের বিশেষ লক্ষণ হিসেবে অনুকরণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অ্যারিস্টটলের মতে শিল্প এবং সাহিত্যের পার্থক্যের মাধ্যম হলো ভাষা। তিনি অনুকরণ শব্দটিকে গ্রহণ করেছিলেন ব্যাপক অর্থে। তাঁর মতে সাহিত্য জীবনের অনুকরণ  যে জীবনে ঘটনা, অনুভূতি, চিন্তা, কর্ম, বাস্তব অপেক্ষা সত্য হয়ে ধরা দেয়। এই অনুকরণ-তত্ত্বটি দীর্ঘকাল সাহিত্যবিচারের ক্ষেত্রে একটি প্রধান মানদন্ড হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ