বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

উপযোগ কী? উপযোগ তত্ত্বের বিকাশ, প্রান্তিক ও সমপ্রান্তিক উপযোগ কী?

দুইশত বছরেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা, বিবর্তন এবং সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে উপযোগ তত্ত্ব এর বর্তমান রূপ লাভ করেছে

উপযোগ কী? 

সাধারণ অর্থে উপযোগ বলতে কোনো জিনিসের উপকারিতাকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতিতে উপযোগ কথাটির বিশেষ অর্থ বহন করে। কোনো দ্রব্য বা সেবার অভাব মোচনের ক্ষমতাকে অর্থনীতিতে উপযোগ (utility) বলা হয়।

উপযোগ হলো কোনো কিছু থেকে ভোক্তার তৃপ্তি বা সন্তোষ। ভোক্তার এই তৃপ্তি সবসময় একরকম থাকে না। ভোগ ও আয়সহ বিভিন্ন কারণে এর পরিবর্তন হতে পারে। ব্যক্তির একক তৃপ্তি দিয়ে অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ক্রমে অনেক তাত্ত্বিক অগ্রগতি হয়েছে। উপযোগ ধারণার অনেক বিকাশ হয়েছে। 

উপযোগ তত্ত্বের বিকাশ

দুইশত বছরেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা, বিবর্তন এবং সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে উপযোগ তত্ত্ব এর বর্তমান রূপ লাভ করেছে। ১৭৩৮ সালে ড্যানিয়েল বারনৌলি (Daniel Bernoulli) নামের একজন গণিতবিদ ‘অর্থব্যয়ের সঙ্গে তৃপ্তির সংযোগ’ আবিষ্কার করেন। আঠারো শতকের শেষ দিকে ইংলিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্টহ্যাম (Jeremy Bentham) সমাজ বিজ্ঞানে প্রথম উপযোগ তত্ত্ব প্রয়োগ করেন। এখন পর্যন্ত জেরেমি বেন্টহ্যামের তত্ত্বই টিকে আছে।

বেন্টহ্যামের ‘অর্থব্যয়ের সাথে তৃপ্তির সংযোগ’ তত্ত্বটি অর্থশাস্ত্রে আরও সুনির্দিষ্ট এবং কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে ব্যবহার করবার ক্ষেত্রে উইলিয়াম স্ট্যানলির (William Stanley Jevons) ভূমিকা অসামান্য। তাঁর মূল বক্তব্যই ছিল যে, অর্থনৈতিক তত্ত্ব হচ্ছে একজন ভোক্তার “আনন্দ আর বেদনার হিসাব নিকাশ”।

জার্মান অর্থনীতিবিদ হারম্যান হেনরিক গসেন (Hermann Heinrich Gossen) ভোক্তার তৃপ্তি সম্পর্কে আরেকটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব প্রদান করেন এবং তা প্রতিষ্ঠা করেন। হারম্যান গসেন ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে লিখেছেন, “চূড়ান্ত মূল্য বলে কিছু নেই। কোনকিছুর মূল্য নির্ভর করে ব্যক্তি ও বস্তুর উপর। আর এই সম্পর্ক গড়ে উঠে উপযোগের উপর। একজন অর্থনৈতিক ব্যক্তির মূল লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ তৃপ্তি অর্জন”। হারম্যআন গসেন এখানে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিধি সূত্রায়ন করেন যেগুলো এককথায় ভোক্তার আচরণ সম্পর্কিত নিয়ো-ক্ল্যাসিকাল তত্ত্বের  ভিত্তি (neo-classical theory)। হারম্যান গসেনের এই তত্ত্বগুলো হলো- ১. ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি এবং ২. দ্বিতীয়ত: সমপ্রান্তিক উপযোগ বিধি।

লিয়োন ওয়ালরাস (Leon Walras) এর সার্বজনীন অর্থনৈতিক ভারসাম্য ((general economic equilibrium) পুরো বিশ্লেষণ কাঠামোতেই খুবই উল্লেখযোগ্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে।

এরপর ভোক্তার আচরণ সম্পর্কিত তত্ত্বকে আরও সুসংগঠিতভাবে উপস্থিত করেন আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall) যাঁকে নিয়ো-ক্ল্যাসিকাল অর্থশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান দিকপাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থশাস্ত্রেরববিকাশ ধারার ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টিকারী তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালে। এইসময়টায় ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ হয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। সমাজে ততদিনে ব্যক্তির উপস্থিতিও অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একক ব্যক্তি ও একক প্রতিষ্ঠান ধরে বিশ্লেষণ তখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই নয়া ক্ল্যাসিকাল অর্থশাস্ত্রের বিকাশ দ্রুততর হয়।

প্রান্তিক উপযোগ ও ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি

একজন ভোক্তার কোনো দ্রব্য থেকে প্রাপ্ত উপযোগের সঙ্গে তাঁর অর্থব্যয়ের সম্পর্ককে উপস্থালন করে প্রান্তিক উপযোগ। প্রান্তিক উপযোগ দেখায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে একই দ্রব্য একই দামে কিনতে থাকলে তা থেকে কীভাবে একক প্রতি উপযোগ কমতে থাকে।

প্রান্তিক উপযোগ মানে হলো প্রান্ত বা অতিরিক্ত এককবথেকে প্রাপ্ত উপযোগ।

অ্যাডাম স্মিথ মোট উপযোগের উপর কোনো পণ্যের দাম নির্ভর করে ভেবেছিলেন বলে বাতাস ও হীরার দাম মোট উপযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে অপারগ হন। বাজারে একটি পণ্যের দাম নির্ভর করে আসলে তার প্রান্তিক উপযোগের উপর, মোট উপযোগের উপর নয়। প্রান্তিক উপযোগ বাড়ে তার দুষ্প্রাপ্যতার জন্য। যে কারণে বাতাসের মোট উপযোগ অনেক বেশি হলেও অসীম যোগানের কারণে তার দাম নেই কিন্তু হীরার মোট উপযোগ কম হওয়া সত্ত্বেও তার দুষ্প্রাপ্যতার কারণে তার প্রান্তিক উপযোগ বেশি ফলে দামও বেশি। প্রান্তিক উপযোগ পরিবর্তনের হার অবশ্যই নিম্নগামী।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা একটি পণ্য ক্রমান্বয়ে ভোগ করতে থাকলে আমরা সাধারণভাবে একটি চিত্র পাই। দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা একটি পণ্য ক্রমান্বয়ে ভোগ করতে থাকলে ঐ পণ্য থেকে একক প্রতি প্রাপ্ত উপযোগ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এই কমা পর্যন্ত যায় এমনকি তা ঋণাত্মকও হয়। প্রান্তিক উপযোগ ০ (শূন্য) হওয়া পর্যন্ত মোট উপযোগ অর্থাৎ ঐ নির্দিষ্ট সময়ে ঐ

নির্দিষ্ট পণ্য থেকে প্রাপ্ত সম্মিলিত উপযোগ বাড়তে থাকে। কিন্তু একটানা ভোগ করতে থাকলে যখন

ভোক্তা ঐ পণ্য থেকে কোন তৃপ্তিই বোধ করে না বরঞ্চ বিরক্ত বোধ করে তখন প্রান্তিক উপযোগ হয়ে যায় ঋণাত্মক।

প্রান্তিক উপযোগ যখন ঋণাত্মক হয়ে যায় তখন ঐ পণ্য থেকে ঐ নির্দিষ্ট সময়ে প্রাপ্ত সম্মিলিত মোট উপযোগ আর বাড়ে না বরং এরপর কমতে থাকে। একজন ভোক্তা যে দামে একটি পণ্য ক্রয় করে তা থেকে কমপক্ষে সেই পরিমাণ উপযোগ আশা করে। প্রথম একক থেকে সে পায় সর্বোচ্চ প্রান্তিক উপযোগ। একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন ভোক্তা ঐ পণ্য ক্রমান্বয়ে ভোগ করতে থাকলে ঐ পণ্য থেকে একক প্রতি প্রাপ্ত উপযোগ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এই কমা শূন্য পর্যন্ত যায় এমনকি তা ঋণাত্মকও হয়। প্রান্তিক উপযোগ শূন্য হওয়া পর্যন্ত মোট উপযোগ বাড়তে থাকে কিন্তু তা একই হারে বাড়ে না, বাড়ে ক্রমহ্রাসমান হারে। একটি পণ্য ক্রমান্বয়ে ভোগ করতে থাকলে তা থেকে প্রান্তিক উপযোগ ক্রমহ্রাসমান হবার এই প্রক্রিয়াকে যে বিধি দ্বারা প্রকাশ করা হয় তাকেই “ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি” বলা হয়।

সমপ্রান্তিক উপযোগ 

একজন নির্দিষ্ট আয়ের ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও নির্দিষ্ট করবার দরকার হয়। যেসব পণ্য থেকে সে উপযোগ পাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে তাকে বিবেচনা করতে হয় যে অর্থ দিয়ে সে একটি পণ্য কিনছে সেই অর্থের প্রান্তিক উপযোগের বিষয়ও। নির্দিষ্ট আয় এবং নির্দিষ্ট বাজারে একজন ভোক্তা তখনই সর্বোচ্চ তৃপ্তি পাবে যখন কোন নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের জন্য ব্যয়কৃত অতিরিক্ত একক টাকা থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগ অন্য একটি পণ্য থেকেও একই সমান প্রান্তিক উপযোগ পেতে পারবে।

জারিন তাসনিম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্বাধীন লেখক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ