বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

উইকি কলিন্স রচিত ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ রিভিউ

উইকি কলিন্স রচিত তুমুল জনপ্রিয় ‘দ্য উমেন ইন হোয়াইট’ উপন্যাসটি বাংলাদেশে সেবা প্রকাশনী থেকে ১৯৯০ সালে সুলেখক নিয়াজ মোরশেদের কলমে ‘শ্বেতবসনা’ নামে রূপান্তর হয়ে প্রকাশিত হয়।

বুক শেলফের বইগুলো আগুপিছু করতে গিয়ে সেবার বইগুলো দেখছিলাম। একসময় এই সেবায় ছিল দেশি বিদেশি বইয়ের সাথে পরিচয়ের একমাত্র মাধ্যম। কত শত ক্লাসিকের সাথে পরিচয় হয়েছে সেবার হাত ধরে তার শেষ নেই। বইয়ের কথা যখন উঠলো চলুন তাহলে আমার পছন্দের একটা ক্লাসিক উইকি কলিন্সের দ্য উইমেন ইন হোয়াই’ (The Woman in White) নিয়ে আলোচনা করা যাক।

‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ পরিচিতি

বই রিভিউ: উইকি কলিন্স রচিত দ্য উইমেন ইন হোয়াইট
দ্য উইমেন ইন হোয়াইট বইয়ের প্রচ্ছদ | ছবি: অ্যামাজন

ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম উইকি কলিন্স (William Wilkie Collins) রচিত সেনসেশন ধারার একটি পাঠকপ্রিয় রহস্য উপন্যাস হলো ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’। উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ এই সংস্করণটি প্রকাশ করে নিউ ইয়র্কের হার্পার অ্যান্ড ব্রাদার্স পাবলিশার্স। পরবর্তিতে এই বইটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়।

‘The Woman in White’ বইটিকে বিশ্বের প্রথম মিস্ট্রি উপন্যাস বললে মোটেও অতুক্তি হবে না। যদিও বইটি জনপ্রিয় ধরণ বা জনরা (genere) ‘সেনসেসেনাল ফিকশন’ নামে অধিক পরিচিত তবুও এটিকে প্রথম সাইকোলজিক্যাল মিস্ট্রি থ্রিলার বলা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে বইটি কখনো আউট অব প্রিন্ট হয়নি এবং জনপ্রিয় অধিক পঠিত বইয়ের তালিকায় সব সময় এ বইয়ের নাম উঠে এসেছে।

চার্লস ডিকেন্সের পরিচালিত ও সম্পাদিত  ‘All the Year Round’ জার্নালে ২৬ নভেম্বর, ১৮৫৯ থেকে ২৫ আগস্ট, ১৮৬০ তারিখ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে  এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং খুব দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। এই উপন্যাসটি জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো গল্পের দারুণ প্লট ও ততধিক শক্তিশালী এর চরিত্রগুলোর জন্য।

উপন্যসটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল, যে কারণে লেখক ১৮৬০ সালে উপন্যাসটি বই আকারে ছাপার কথা চিন্তা করেন। ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হলে তা তাকে লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তার সাথে সাথে ধনী ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই উপন্যাসের জন্য সে সময় তিনি ৫০০০ পাউন্ড অ্যাডভান্স লাভ করেন।

তুমুল জনপ্রিয় ‘দ্য উমেন ইন হোয়াইট’ উপন্যাসটি আমাদের বাংলাদেশে সেবা প্রকাশনী থেকে ১৯৯০ সালে সুলেখক নিয়াজ মোরশেদের কলমে ‘শ্বেতবসনা’ নামে রূপান্তর হয়ে প্রকাশিত হয়।

দ্য উইমেন ইন হোয়াইট বা শ্বেতবসনা গল্পের কথা

গল্পটি ভাগ্যবিতাড়িত তরুন চিত্রকর ওয়াল্টার হার্টরাইটের। নিজের ভাগ্য ফেরাতে লন্ডনের এক অভিজাত জমিদার কন্যাকে ছবি আঁকানো শেখার চাকুরি নেয় এবং সেই জমিদার কন্যা লরা ফেরিলের প্রেমে পড়ে যায়। প্রেমে পড়লেও লরাকে প্রেম নিবেদন করা বা তার পানি গ্রহণের চিন্তা তাকে বাদ দিতে হয় কারণ লরা আগে থেকেই স্যার পার্সিভাল গ্লাইড নামক এক ব্যারনের বাগদত্তা। অর্থলোভী পার্সিভালের লরাকে বিয়ে করার মূল উদ্দেশ্যই হলো লরার সম্পত্তি হস্তগত করা, কিন্তু এই কাজে বড় বাধা হয়ে দেখা দিল উইলে উল্লেখিত কিছু শর্ত। লরার জীবদ্দশায় এ সম্পত্তি কোনভাবেই হাত দিতে পারবে না পার্সিভাল  তাই বন্ধু কাউন্ট ফসকো কে সাথে নিয়ে ভয়ংকর এক মতলব আঁটলেন পার্সিভাল। কি সেই ভয়ংকর পরিকল্পনা?

এদিকে কুয়াশাবৃত নির্জন  সন্ধ্যায় লন্ডনের রাস্তায় দেখা সাদা কাপড় পরা মহিলাটিকে? এক ঝলক দেখা চেহারাটা কেন পরিচিত মনে হলো ওয়াল্টার হার্টরাইটের? কে সেই শ্বেতবসনা অ্যান ক্যাথরিক?  রাতের নির্জনতা খানখান করে দিয়ে বাজছে পাগলা গারদের ঘন্টি। কে পালালো পাগলা গারদ থেকে? জানতে হলে পড়তে হবে উইকি কলিন্সের কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’।

দ্য উইমেন ইন হোয়াইট গল্পের ভালো লাগা ও মন্দলাগা

গল্পের যে দিকটা প্রথমেই আমাকে টানে তা হলো

গল্পের প্লট ও পরিবেশ: ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ অভিজাত সহজ সরল এক ধনীর দুলালীর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের।  ঠাঁস বুনটে বোনা  শ্বাসরুদ্ধকর উপন্যাস হলেও গল্পে কলিন্স মর্ডান ড্রেসে গোথিক প্রেম তুলে আনার চেষ্টা করেন। ব্ল্যাকওয়াটারের ক্ষয়িষ্ণু দুর্গের শ্বাসরুদ্ধকর আবহাওয়া,সাথে দমন নিপিড়ীনের বৈবাহিক সম্পর্ক, শক্ত  অভিভাবকের অভাব সব কিছুই লেখক সুনিপুণভাবে আঠারো শতকের ইউরোপের সমাজচিত্রকে তুলে ধরেছেন।

বর্ণনা শৈলী: ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ গল্পটির কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো এর বর্ণনাশৈলী। গল্পটা  লেখক একাই বর্ণনা করেন না বরং গল্পটা বিভিন্ন সাক্ষী তাদের দেখা অংশটুকু বর্ণনার মাধ্যমেই গল্পটা এগোতে থাকে  আর একটা সুচতুর পরিকল্পনার পর্দা ফাঁস হতে থাকে। কখনও লরার ডাইরি থেকে,কখনও তা মেরিয়ানের বর্ণনা আবার কখনও তা ওয়াল্টার হার্থরাইট ও  পারিবারিক উকিল ভিনসেন্ট গিলমোরের বর্ণনায় আবার কখনও চাকর বাকরদের জবানিতে। এমন ধারার বর্ণনা সাধারণত আমরা আদালতে দেখি বাদী বিবাদী এভাবেই তাদের দলিলাদি পেশ করে থাকেন। কোন গল্প উপন্যাসে এ ধারার ব্যবহার গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।এক একজনের সাক্ষ্য গল্পের এক একটা অংশ উন্মোচন করে যা পাঠককে পরবর্তী অংশ পড়তে উৎসাহিত করে।

দ্য উইমেন ইন হোয়াইট গল্পের চরিত্রচিত্রণ

গল্পে প্রধান চরিত্রগুলোর মাঝে প্রথমেই নাম আসে:

ওয়াল্টার হার্থরাইট: গল্পের  ভাগ্যতাড়িত নায়ক পেশায় চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষক। যদিও পরবর্তীতে বুদ্ধিমত্তার বলে নায়িকা কে দুষ্টুদের কবল হতে মুক্ত করতে সামর্থ্য হন তবুও ঠিক নাইট এন শাইনিং আর্মারে তাকে দেখা যায় না। বরং সত্য উদঘাটনে উদগ্রীব ডিডেক্টিভের ভূমিকাতেই পরবর্তীতে তাকে আমরা দেখতে পাই।

মেরিয়ান হলকম্ব: গল্পের সবচেয়ে ইম্প্রেসিভ চরিত্র। আমাদের নায়িকার সৎ বোন হলেও বোনের প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসা লক্ষ্যনীয়। অবিবাহিত সাদামাঠা এই রমনীর বুদ্ধিমত্তা আর দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণেই পরাভূত হয় কুচক্রীদের ঘৃণ্য পরিকল্পনার।

লরা ফেরিল: আমাদের গল্পের নায়িকা। ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস। পিতৃ-মাতৃহীন জমিদারের সুন্দরী কন্যা।

ব্যারন পার্সিভাল গ্লাইড: গল্পের নায়িকার বাগদত্তা ও স্বামী। প্রয়োজনে সে মিষ্টভাষী। ধূর্ত, ক্ষমতা ও অর্থলোভী একজন মানুষ।এ গল্পের ভিলেন হিসেবেই চিহ্নিত যার অতীত ঢেকে আছে ধোঁয়াশায়।

কাউন্ট ফসকো: স্যার পার্সিভাল গ্লাইডের ইতালিও বন্ধু,পরামর্শদাতা এবং দুষ্কর্মের সহযোগী।

অ্যান ক্যাথরিক: অদ্ভুত রহস্যময়ী যুবতী। সাদা পোশাকের প্রতি তার ভালোবাসার কারণেই তার নাম শ্বেতবসনা বা উইমেন ইন হোয়াইট (The Woman in White) ।

এছাড়াও ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ উপন্যাসে সে সকল চরিত্রের উপস্থিতি চোখে পড়বে সে সকল চরিত্র হলো- সব সময় নিজের অসুস্থতা নিয়ে বলতে থাকা আত্মকেন্দ্রিক লর্ড ফেড্রিক ফেরিল লরার চাচা এবং অভিভাবক। লরার খালা কাউন্টেস এলিনর ফসকো যার একমাত্র কাজ স্বামীর কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলানো। আনার দায়িত্ব জ্ঞানহীন মা জেন ক্যাথরিন, লরাদের পারিবারিক বন্ধু ও আইনি পরামর্শদাতা ভিনসেণ্ট গিলমোর এবং ওয়াল্টারের বন্ধু প্রফেসর পেসকো।

গল্পের দুর্বলদিক

‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ নামের এই চমৎকার ঠাঁস বুনটের রোমাঞ্চকর উপন্যাসে একটাই মাত্র দুর্বল দিক, এর সমাপ্তি। শুরু থেকেই এত রহস্যের দেখা মিলে যে পাঠকের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায় তাই যখন ঘটনার যবনিকা পতন হয় তখন সব সূত্র মিলে গিয়ে যা বের হয়ে আসে তা নিতান্তই সাদাসিধা একটা কারণ বলে মনে হয়।

বিয়ের পরে স্ত্রীর সম্পদ স্বামীর নামে হয়ে যাওয়া, মহিলাদের শুধুমাত্র সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্ব অর্পণ, সম্পত্তি হস্তগত করার জন্য পাগল স্বব্যস্ত করে পাগলা গারদে প্রেরণ, আঠারো শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগের লন্ডনের কথা চিন্তা করলে এসবই স্বাভাবিক মনে হলেও তা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মন কে তৃপ্ত করতে খানিকটা হলেও ব্যর্থ হয়েছে। তবু্ও ভিক্টোরিয়ান যুগের মিস্ট্রির স্বাদ নিতে চাইলে পড়ে ফেলুন উইকি কলিন্সের ‘দ্য উইমেন ইন হোয়াইট’ বইটি। বইটিকে কেন্দ্র করে মিনি টেলিভিশন সিরিজ ও চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়েছে। আপনি চাইলে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন সেখানেও।

তাহলে আর দেরি কেন? ডুব দিন রহস্যের জগতে আর খুঁজে দেখুন কে এই শ্বেতবসনা।

শাহনীন রহমান
শাহনীন রহমান সাহিত্য প্রেমী একজন মানুষ। সংসার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বাইরে টুকটাক লেখালেখিই তার নেশা। বিভিন্ন বইয়ের মাঝে ডুবে থাকতেই যার আনন্দ। আর এই আনন্দ তিনি ছড়িয়ে দিতে চান অগনিত পাঠকদের মাঝে। লেখক হবার মকসো করে চলেছেন রিভিউ আর পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ