প্রকৃতি আমাদের মস্তিষ্কে গড়ে তুলেছে এক অসাধারণ নেভিগেশন ব্যবস্থা— যাকে বলা যায় “অভ্যন্তরীণ জিপিএস”। স্থান কোষ, গ্রিড কোষ, দিকনির্দেশক ও সীমানা কোষের সমন্বয়ে মস্তিষ্ক তৈরি করে জ্ঞানীয় মানচিত্র, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই চলাচল ও দিকনির্দেশনায় সাহায্য করে। পরিযায়ী পাখি, সামুদ্রিক কচ্ছপ বা ডলফিনের মতো প্রাণীরা বিশেষায়িত ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে দূরদূরান্তের গন্তব্যে পৌঁছায়। মানুষের ক্ষেত্রেও স্মৃতি, দৃষ্টি, সময়বোধ ও সামাজিক জ্ঞানের সঙ্গে এই স্নায়বিক ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে পরিবেশে চলাচলকে সম্ভব করে তোলে।
মূল কথা: নেভিগেশনের জন্য মানুষ এবং প্রাণীদের একই রকম মস্তিষ্কের কাঠামো বা “অভ্যন্তরীণ জিপিএস” থাকলেও, বিভিন্ন সংকেত এবং জ্ঞানীয় কৌশলের উপর তাদের নির্ভরতা ভিন্ন। অন্তর্নির্মিত নেভিগেশন সিস্টেমের মূল অংশে বিশেষায়িত নিউরন থাকে, যেমন স্থান কোষ এবং গ্রিড কোষ, যা পরিবেশের একটি মানসিক ও জ্ঞানীয় মানচিত্র তৈরি ক’রে লক্ষ্য-নির্দেশিত চলাচল সক্ষম করে। এই কৌশলটিতে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তারা ল্যান্ডমার্ক, শব্দ বা গন্ধের মতো বাহ্যিক রেফারেন্স পয়েন্ট (অ্যালোথেটিক সংকেত) ব্যবহার করে, কিংবা বিশেষায়িত ম্যাগনেটোরিসেপশন বা বায়োসোনার ব্যবহার ক’রে তারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছয়। মানুষ এবং প্রাণী উভয়ই তাদের অভ্যন্তরীণ দিকনির্দেশনা ক্যালিব্রেট করার জন্য এই বাহ্যিক সংকেতের উপর প্রচুর নির্ভর করে।
মূল বিষয়: নিউরোবিজ্ঞান, ইলেক্ট্রোফিজিওলজি, প্রাণিবিদ্যা, জেনেটিক্স-সেল বায়োলজি, নেভিগেশন, জিপিএস।
ভূমিকা
আধুনিক প্রযুক্তিতে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) একটি অভূতপূর্ব আবিষ্কার। এটি স্যাটেলাইট, রিসিভার এবং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে বায়ু, সমুদ্র এবং স্থল ভ্রমণের জন্য অবস্থান, বেগ এবং সময়ের তথ্য সমন্বয় করে। বিস্ময়কর বটে যে মানুষসহ প্রাণীদেরও প্রাকৃতিক, অন্তর্নির্মিত জিপিএস সিস্টেমের একটি অসাধারণ বিন্যাস রয়েছে, যা তাদের বিশাল এবং জটিল পরিবেশে চলাচল করতে সাহায্য করে। প্রাণীদের মহাদেশ জুড়ে স্থানান্তরিত হওয়া, খাদ্যের সন্ধান করা, বা বাড়ি ফিরে যাওয়া যাই হোক না কেন, তাদের পথ খুঁজে পেতে বিভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল সংকেত তারা ব্যবহার করে। মানুষের ক্ষেত্রে, এটি আরও অনেক জটিল। ছবি, শব্দ, সময়, দূরত্বসহ বহুমাত্রিক তথ্য মানুষ ব্যবহার করতে পারে। এই জটিল, সহজাত ক্ষমতা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিকশিত হয়েছে এবং বিজ্ঞানীদের জন্য বিস্ময়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মস্তিষ্কের “অভ্যন্তরীণ জিপিএস” অধ্যয়নের মাধ্যমে বিশেষায়িত কোষ এবং স্নায়ুতন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছে যা আমাদের জানতে সাহায্য করে যে আমরা কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি এবং কীভাবে পৌঁছাবো, এমনকি পরিবেশের জটিল স্মৃতিও আমরা ধরে রাখি। মানুষ এবং প্রাণী উভয়ই অভ্যন্তরীণ “মানচিত্র” এবং বাহ্যিক সংকেতের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে, যদিও এর সাথে জড়িত নির্দিষ্ট ইন্দ্রিয় এবং মস্তিষ্কের গঠন উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। স্মৃতিভ্রংশ বা অ্যালঝেইমারের মতো রোগে এই ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মানব মস্তিষ্কের “জিপিএস” কীভাবে কাজ করে?
মস্তিষ্কের জিপিএস হল একটি নার্ভিয় ব্যবস্থা, যা মূলত হিপোক্যাম্পাস এবং এন্টোরাইনাল (হিপোক্যাম্পাস-সংলগ্ন) কর্টেক্সকে জড়িত ক’রে নেভিগেশনের একটি ত্রিমাত্রিক স্নায়ুভিত্তিক “জ্ঞানীয় মানচিত্র” তৈরি করে। এই ব্যবস্থাটি বিশেষ কিছু কোষের উপর নির্ভর করে, যার মধ্যে রয়েছে স্থান কোষ (অবস্থান চিহ্নিতকারী), গ্রিড কোষ (একটি স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা প্রদানকারী), দিকনির্দেশক কোষ (দিকনির্দেশনা স্থাপনকারী), এবং সীমানা কোষ (পরিবেশগত সীমানা নির্ধারণকারী), যা অবস্থান, দূরত্ব এবং দিকনির্দেশনার অনুভূতি প্রদান করে এবং পরিচিত বা নতুন উভয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে চলাচল সক্ষম করে (ছবি দেখুন)।

স্থান কোষ (place cells): স্থান কোষ হল মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের একধরনের উত্তেজক নিউরন যা প্রাণীর স্থানীয় পরিবেশে একটি স্থান ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছই, তখন এই কোষগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে, স্থানিক স্মৃতি তথ্য দিয়ে বিভিন্ন পরিবেশের স্বতন্ত্র মানচিত্র উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (J Neurosci. 35, 2015)। এই কোষগুলির কার্যকলাপ, অর্থাৎ স্থানিক স্মৃতি গঠন ‘গ্রিড কোষ’ এর মতো অন্যান্য বিশেষায়িত নিউরনের সাথে একীভূত হয়ে একটি বিস্তৃত স্থানিক বোঝাপড়া তৈরি করে বলে মনে করা হয়। ফস/FOS প্রোটিন (একটি ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর), স্ট্যাথমিন, এবং অ্যাক্টিন হিপ্পোক্যাম্পাসের নিউরোনগুলিতে স্থানিক মানচিত্র গঠন এবং স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা নেভিগেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্থানকোষ এবং গ্রিড কোষগুলির আবিষ্কারের মাধ্যমে ২০১৪ সালে আমেরিকান-ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন ও’কিফ এবং নরওয়ের বিজ্ঞানী দম্পতি এডভার্ড মোজার ও মে-ব্রিট মোজার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
গ্রিড কোষ (grid cells): গ্রিড কোষ হল মস্তিষ্কের এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের মধ্যে অবস্থিত এক ধরনের নিউরন যা ষটকোণাকারে বা জ্যামিতিক নকশার মতো সিগন্যাল প্রদান করে (Nature, 436, 2005), এবং যখন আমরা চলাচল করি বা ভ্রমণ করি, তখন এই কোষগুলি ঘন ঘন ‘স্মৃতি-পদাঙ্ক’ তৈরি ক’রে একটি অভ্যন্তরীণ স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা তৈরি করে, যা চলাচলের জন্য অবস্থান, দূরত্ব ও দিক সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ এবং সংহত ক’রে তার অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। স্থানিক নেভিগেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানিক কোষ এবং গ্রিড কোষগুলি অনেক প্রাণীদের (যেমন: ইঁদুর, বাদুড়, বানর) ক্ষেত্রেও মানুষের মতো একইভাবে কাজ করে।
দিকনির্দেশক কোষ (head-direction cells): স্থানিক নেভিগেশনের জন্য হিপোক্যাম্পাস-এন্টোরাইনাল সার্কিটের একটি মৌলিক উপাদান হল হেড-ডিরেকশন কোষ বা ‘সম্মুখ নির্দেশনামূলক কোষ’ এবং এই নিউরন কোষগুলি সর্বপরি অভ্যন্তরীণ দিকনির্দেশনা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বলা যায়, একটি নার্ভিয় কম্পাস হিসেবে এই কোষগুলি সম্ভাব্য সম্মুখ দিকনির্দেশনার একটি অবিচ্ছিন্ন, টপোগ্রাফিক মানচিত্র তৈরি করে। চলার পথে, এই কোষগুলি ভেস্টিবুলার ইনপুট, যেমন অভ্যন্তরীণ কান থেকে নড়াচড়ার অনুভূতি এবং পরিবেশ থেকে চাক্ষুষ সংকেত উভয় দ্বারা প্রভাবিত হয়, উভয়কেই একীভূত করে দিকনির্দেশনার অনুভূতি/সংকেত প্রদান করে। হেড-ডিরেকশন কোষগুলি তাদের দিকনির্দেশনার টিউনিং বজায় রাখতে এবং স্থানিক নেভিগেশনে অংশগ্রহণের জন্য ক্যালবিন্ডিন এবং টিউবুলিনের মতো নির্দিষ্ট প্রোটিনের উপর নির্ভর করে।
সীমানা কোষ (boundary cells): নেভিগেশনে, হিপোক্যাম্পাস এবং এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের এ জাতীয় নিউরন সক্রিয় হয়, যখন কোনও প্রাণী পরিবেশের পরিধির কাছাকাছি চলে যায়- হতে পারে সেটি কোনো দেয়াল বা কোনো সীমানার অবস্থান। এগুলি মস্তিষ্কের “জ্ঞানীয় মানচিত্র” এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা তার চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে এবং নেভিগেট করতে সহায়তা করে।
নিউরনের অ্যাকশন পটেনশিয়াল হল নেভিগেশনের ভিত্তি
নিউরোনের উদ্দীপনা সৃষ্টি হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি নিউরন পার্শ্বস্থ নিউরনের সাথে যোগাযোগের জন্য একটি বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত তৈরি করে এবং স্ফুলিঙ্গের মাধ্যমে প্রেরণ করে, যাকে অ্যাকশন পটেনশিয়াল বা বৈদ্যুতিক আবেগ বলা হয়, যার মাধ্যমে প্রায় ১০০ মিলিভোল্ট (mV) স্পাইক তৈরি হয়। আমরা এসব নিউরনের স্ফুলিঙ্গের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ সরাসরি অনুভব করি না বটে, কিন্তু এই বৈদ্যুতিক আবেগ, বা অ্যাকশন পটেনশিয়াল, নিউরনগুলির একে অপরের সাথে যোগাযোগের মৌলিক উপায় যা চিন্তাভাবনা তৈরি করে, স্মৃতি গঠন করে এবং আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। (স্নায়ু আবেগ এবং স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি সমন্ধে বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন: www.bishleshon.com/6022)।
স্নায়ুতন্ত্রের এক অংশ থেকে অন্য অংশে সংবেদনশীল ইনপুট এবং মোটর কমান্ড প্রতিনিধিত্বকারী সংকেত প্রেরণ করে স্নায়ুতন্ত্রের ‘ক্রিয়া বিভব’ নেভিগেশনে মৌলিক ভূমিকা পালন করে, যা স্থানিক সচেতনতা এবং দিকনির্দেশনামূলক গতিবিধির মতো জটিল প্রক্রিয়াগুলিকে সক্ষম করে। একটি সংক্ষিপ্ত বৈদ্যুতিক আবেগ হিসেবে, একটি ক্রিয়া বিভব একটি নিউরনের অ্যাক্সন বরাবর ভ্রমণ করে, যা সিন্যাপসে নিউরোট্রান্সমিটারের মুক্তিকে ট্রিগার করে। দৃশ্যমান সংকেত এবং প্রোপ্রিওসেপশন (শরীরের অবস্থানের অনুভূতি) এর মতো সংবেদনশীল তথ্য এভাবেই বৈদ্যুতিক সংকেতে (ক্রিয়া বিভব) রূপান্তরিত হয়, যা স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে। এই সংকেতগুলি হিপোক্যাম্পাস ও এন্টোরাইনাল অঞ্চলে একত্রিত হয় এবং পরিবেশের একটি “জ্ঞানীয় মানচিত্র” তৈরি করে। এই স্থানিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে, মস্তিষ্ক শরীরকে একটি নির্দিষ্ট দিকে সরানোর জন্য মোটর কমান্ড তৈরি করে, যা মোটর নিউরনগুলির মাধ্যমে যথাযথ পেশিগুলিতে ক্রিয়া বিভব হিসেবে পাঠানো হয়। সংবেদী ইনপুট থেকে মোটর আউটপুট পর্যন্ত এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অ্যাকশন পটেনশিয়ালের গতি এবং নির্ভরযোগ্যতার উপর নির্ভর করে, যাতে মস্তিষ্ক কার্যকরভাবে তথ্য গ্রহণ এবং প্রেরণ করে, যা নেভিগেশনের জন্য গতিবিধির সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সক্ষম করে।
মানব অভ্যন্তরীণ নেভিগেশন ব্যবস্থা কি অন্যান্য প্রাণীদের থেকে উন্নত?
যদিও মানুষের বিমূর্ত মানচিত্র ব্যবহারের ক্ষমতা একটি নমনীয় এবং অভিযোজিত নেভিগেশন সিস্টেম প্রদান করে, তবে এটি সকল প্রেক্ষাপটে উচ্চতর বা উন্নত নয়। প্রাণীরা নেভিগেশনের জন্য অসাধারণ, বিশেষায়িত অভিযোজন প্রদর্শন করে, প্রায়শই এমন সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়গুলিকে ব্যবহার করে যা মানুষের কাছে সম্পূর্ণরূপে অনুপলব্ধ। অনেক পরিযায়ী প্রাণীর মতো, মানুষের চৌম্বকীয় দিকনির্দেশের একটি শক্তিশালী, সচেতন অনুভূতি বিকশিত হয়নি— সে বিষয়ে পরে বর্ণনা করছি। তবে, মানুষের মস্তিষ্কে, বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাসের নিজস্ব একটি অত্যাধুনিক ‘জিপিএস’ সিস্টেম রয়েছে। যেহেতু নির্দিষ্ট অবস্থান মনে রাখার জন্য “প্লেস/স্থান সেল” এবং দূরত্ব গণনা করার জন্য “গ্রিড সেল” আমরা ব্যবহার করি, যা আমাদের পরিবেশের জটিল “জ্ঞানীয় মানচিত্র” তৈরি করতে সাহায্য করে, তাই মানুষের মস্তিষ্কে একটি চৌম্বকীয় ইন্দ্রিয়কে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আদি মানুষেরা দীর্ঘ দূরত্বে তাদের চলাচলের জন্য পাহাড়, নদী এবং উপকূলরেখার মতো পর্যবেক্ষণযোগ্য সংকেতের উপর নির্ভর করতেন। সূর্য, চাঁদ এবং তারার অবস্থান পর্যবেক্ষণ ক’রে প্রাচীন নাবিকরা বিশাল, উন্মুক্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে গতিপথ নির্ধারণ করতে পারতেন— যেমন, পলিনেশিয়ানরা প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে চলাচলের জন্য এই পদ্ধতিটি বিশেষভাবে ব্যবহার করতেন।
চলাচলের জন্য স্থানিক স্মৃতির পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তির উপরও মানুষ প্রচুর নির্ভর করে। আমরা সামাজিক উৎস থেকে উচ্চ-স্তরের তথ্য যেমন মৌখিক নির্দেশনা, ভৌগোলিক মানচিত্র এবং লিখিত তথ্যও একীভূত করতে পারি। কিন্তু, অনেক প্রাণী পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, গন্ধ এবং এমনকি মেরুকৃত আলোর মতো একাধিক অ-দৃশ্যমান ইন্দ্রিয়কে ব্যবহার করে। যখন একটি ইঙ্গিত ব্যর্থ হয়, তখন তারা প্রায়শই অন্যগুলির উপর নির্ভর করতে পারে।
বিশেষ কিছু প্রাণীর চলাচলের উদাহরণ
পরিযায়ী পাখি: গৃহপালিত কবুতরের চঞ্চু বা ঠোঁটে ম্যাগনেটাইট থাকে, একটি চৌম্বকীয় খনিজ, যা একটি ক্ষুদ্র জিপিএস ইউনিট হিসেবে কাজ করতে পারে। এরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে, সূর্যের অবস্থান এবং তাদের পরিবেশে গন্ধের “ঘ্রাণ মানচিত্র” ব্যবহার ক’রে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে তাদের বাড়ির পথ খুঁজে পেতে পারে। ইউরোপীয় রবিনের মতো পাখিরা তাদের চোখের আলো-সংবেদনশীল একটি আয়রন-বাঁধাইকারী প্রোটিন MagR-কে সাথে নিয়ে ক্রিপ্টোক্রোম প্রোটিন, বিশেষ করে ফ্ল্যাভোপ্রোটিন ব্যবহার ক’রে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভূত করে এবং এটিকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে।
সামুদ্রিক কচ্ছপ: লগারহেড সামুদ্রিক কচ্ছপগুলিও পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের একটি পরিশীলিত অনুভূতি ব্যবহার করে। তাদের দুটি স্বতন্ত্র চৌম্বকীয় ইন্দ্রিয় রয়েছে এবং তারা একটি সাধারণ কম্পাস ব্যবহার করা ছাড়াও, নির্দিষ্ট অবস্থানের একটি শেখা “চৌম্বকীয় মানচিত্র” তৈরি করতে পারে। তারা ডিম পাড়ে, বাসা বাঁধে পশ্চিম আফ্রিকায় (যেমন গ্যাবন দেশে) এবং আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে হাজার হাজার মাইল সাঁতার কেটে ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার উপকূলের পুষ্টিসমৃদ্ধ জলে খাবারের সন্ধান করে, কিন্তু ওই শেখা “চৌম্বকীয় মানচিত্র” তথ্য ব্যবহার ক’রে ঠিক একই সমুদ্রপথে তারা আবার ফিরে আসে স্বদেশে, পশ্চিম আফ্রিকায়। তাদের এই অনন্য চৌম্বকীয় স্বাক্ষর সনাক্ত ক’রে জন্মগত সৈকত এবং খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্র উভয় স্থানে তারা বংশপরম্পরায় নেভিগেশন করে থাকে। এছাড়া, লেদারব্যাক এবং সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপগুলিও একইভাবে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রগুলিতে স্থানান্তরিত হয়।
বাদুড়, ডলফিন এবং তিমি: তাদের চারপাশের পরিবেশ উপলব্ধি করতে শব্দ নির্গত করে এবং সেগুলোর প্রতিধ্বনি ব্যাখ্যা করে তাদের চারপাশের বিশদ, ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে, এমনকি অন্ধকার বা ঘোলা জলেও, বায়োসোনার বা ইকোলোকেশন জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে।
মনার্ক প্রজাপতি: এগুলি ৩,০০০ মাইল পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয় এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম একই গন্তব্যে যাত্রা অব্যাহত রাখে। তারা তাদের সির্কাডিয়ান ছন্দের সাথে একটি সূর্য কম্পাসকে সংযুক্ত ক’রে এই অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করে।
স্যামন/স্যালমন মাছ: সমুদ্রে বছরের পর বছর থাকার পর, তারা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঠিক সেই মিঠা পানির স্রোতে ফিরে আসে, যেখানে তারা জন্মগ্রহণ করেছিল। চৌম্বক ক্ষেত্র এবং তাদের হৃদয়ানিষ্ঠ গন্ধের অনুভূতি উভয়ই ব্যবহার ক’রে তারা অসাধ্যকে সম্ভব করেছে।
গোবর/ডাং বিটল: কিছু বিটল জাতীয় প্রজাতি সূর্য, চাঁদ এবং এমনকি মিল্কিওয়ে থেকে আসা মেরুকৃত আলোর প্যাটার্ন ব্যবহার ক’রে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছয়। দিনের বেলায়, তারা সূর্যালোকের মেরুকরণ প্যাটার্ন ব্যবহার করে, এবং রাতে, তারা চাঁদের ম্লান মেরুকরণ প্যাটার্ন বা এমনকি মিল্কিওয়ে থেকে আসা তারার আলো ব্যবহার করে। তাদের চোখের বিশেষায়িত আলোক-রিসেপ্টরগুলি এই মেরুকরণের আলো সনাক্ত করে, যার ফলে তারা সূর্য, চাঁদ বা তারা মেঘের আড়ালে থাকলেও সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে।
ভূ-চৌম্বকত্ব কী এবং মানব মস্তিষ্ক কি ভূ-চৌম্বকত্ব সনাক্ত করতে সক্ষম?
পৃথিবীর বাইরের কেন্দ্রে গলিত লোহার গতির ফলে উৎপন্ন হয় ভূ-চৌম্বকত্ব। এই চৌম্বক ক্ষেত্রটি একটি চৌম্বকমণ্ডল তৈরি করে যা পৃথিবীকে সৌর বায়ু এবং ক্ষতিকারক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে, যার ফলে গ্রহে জীবনধারণ সম্ভব হয়। প্রাণীরা কেবল এই চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে শুধু বেঁচেই থাকেনি, বরং এটিকে সক্রিয়ভাবে অভিযোজন এবং নেভিগেশনের জন্য ব্যবহার করার জন্য বিবর্তিত হয়েছে, যা “ম্যাগনেটোরিসেপশন” নামে পরিচিত। অনেক প্রাণী চলাচলের জন্য একাধিক কৌশল (কম্পাস এবং মানচিত্র হিসেবে) ব্যবহার ক’রে চৌম্বকীয় তথ্যকে সূর্য, তারা এবং ল্যান্ডমার্কের মতো অন্যান্য সংকেতের সাথে সফলভাবে চলাচলের জন্য একত্রিত করে।
সচেতন ‘জিপিএস’ না থাকা সত্ত্বেও, কিছু প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের চুম্বকত্বের দুর্বল, অবচেতন অনুভূতি থাকতে পারে। মস্তিষ্কের কার্যকলাপ (ম্যাগনেটোএনসেফালোগ্রাফি) এবং হৃদস্পন্দন (ম্যাগনেটোকার্ডিওগ্রাফি) এর মতো শারীরিক ক্রিয়াকলাপ থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। যদিও এই অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রগুলি সচেতনভাবে অনুধাবন (ইন্টারোসেপশন) করা বা বাহ্যিক ইলেকট্রনিক্সে হস্তক্ষেপ করার জন্য অনেকটাই দুর্বল, তথাপি ২০১৯ সালের ক্যালটেক ইনস্টিটিউটের গবেষণায় (eNeuro 6-2, 2019) প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে মানব মস্তিষ্ক পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সনাক্ত করতে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা ‘অবচেতন চৌম্বকীয় ইন্দ্রিয়’ নামে পরিচিত। অনেকে এটিকে ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ নামেও আখ্যায়িত করেন। এ ধরনের ইন্দ্রিয় অনুভূতি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রতি অবচেতন সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়। তবে, সেই চৌম্বকীয় ইন্দ্রিয় বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় (সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়) নেভিগেশনের জন্য কতটুকু ব্যবহৃত হয়, কী আদৌ হয় না, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অস্পষ্ট। যাই হোক, মানুষের মস্তিষ্কে চৌম্বকীয় লৌহ খনিজ (ম্যাগনেটাইট) এর উপস্থিতি এবং আমাদের বিবর্তনীয় অতীতের একটি চিহ্ন হিসেবে এই ক্ষমতা থাকার সম্ভাবনা এই ঘটনাটিকে ঘিরে কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এটা অনুমান করাই যায় যে, যেহেতু আমাদের অনেক প্রাণীরই চৌম্বকীয় ইন্দ্রিয় আছে, তাই বিবর্তনীয়ভাবে মানুষ চৌম্বকীয় সংবেদন ব্যবস্থার কিছু কার্যকরী উপাদান ধরে রাখতে পারে, এমনকি যদি তা সচেতনভাবে অনুভূত নাও হয়— এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ন্যাভিগেশন সিস্টেম এবং জৈবিক ঘড়ি কি সংযুক্ত?
আমাদের পুরো দেহজুড়েই বিভিন্ন টিস্যুর প্রতিটি কোষে, এমনকি হিপোক্যাম্পাস ও এন্টোরাইনাল স্নায়ুকোষেও, রয়েছে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা জৈবিক ঘড়ি যেগুলিকে বলা হয় দেহের পার্শ্বীয় ক্লক, যাদের নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথালামাস অঞ্চলের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াসে (SCN) অবস্থিত একটি মাস্টার ক্লক। মানুষের “অন্তর্নির্মিত নেভিগেশন সিস্টেম”, যা হিপোক্যাম্পাস এবং অন্যান্য মস্তিষ্কের অঞ্চলের উপর নির্ভর করে, তা সির্কাডিয়ান/জৈবিক ঘড়ির সাথে জটিলভাবে সংযুক্ত এবং প্রভাবিত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, নেভিগেশন এবং স্মৃতি-ভিত্তিক কাজের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ, দৈনন্দিন ২৪-ঘন্টা চক্র বা সির্কাডিয়ান ছন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জৈবিক ঘড়ি সফল নেভিগেশনের জন্য অপরিহার্য। যদিও দেহের মাস্টার ক্লক হাইপোথ্যালামাসের সুপ্রাকায়াজমেটিক নিউক্লিয়াসে (SCN) অবস্থিত, স্থানিক স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্কের অঞ্চল হিপোক্যাম্পাসেও নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সির্কাডিয়ান ক্লক রয়েছে।
এই সংযোগের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘড়ি-সম্পর্কিত জিন হল পিরিয়ড (Per1/2), ক্রিপ্টোক্রোম-২ (Cry2) এবং Bmal1 জিন, যেগুলো সির্কাডিয়ান ছন্দ এবং মানুষের নেভিগেশন উভয়ের সাথেই জড়িত। এই জিনগুলি তাদের সময় নির্ধারণের ফাংশনের মাধ্যমে নেভিগেশন ক্ষমতাকে সংশোধন করে। প্রসঙ্গত, মানুষের ক্ষেত্রে, পিরিয়ড (Per) জিন দিনের বেলায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, যেখানে বাদুড়ের ক্ষেত্রে Per1 জিনের প্রকাশ রাতে বেশি সক্রিয় থাকে, যা বাদুড়ের নিশাচর আচরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নিয়মিত সির্কাডিয়ান ছন্দযুক্ত ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনার অনুভূতি ও সক্ষমতা ভাল থাকে, যা নেভিগেশন এবং জৈবিক ক্লক এই দুই সিস্টেমের মধ্যে যোগসূত্রকে আরও শক্তিশালী করে। সির্কাডিয়ান ছন্দের ব্যাঘাত ঘটলে কিংবা হিপোক্যাম্পাসের মূল জৈবিক ঘড়ির জিনগুলির কোনোটিতে মিউটেশন হলে বা মুছে ফেলা হলে তাদের সময়-নির্ভর নেভিগেশন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, হিপোক্যাম্পাসের মতো অঞ্চলে স্থানীয় সির্কাডিয়ান ঘড়িগুলি সরাসরি স্মৃতি কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও, রাত্রিকালীন শিফট কর্মীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, স্বাভাবিক সির্কাডিয়ান ছন্দের ব্যাঘাত কীভাবে নেভিগেশন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে রাতে যখন সতর্কতা স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে কম থাকে। জৈবিক ঘড়ি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: “জৈবিক ঘড়ি— মোরগের বাঁকে ঘুম যখন ভাঙল“, ২০২৩, www.bishleshon.com/8196।
এছাড়া, নেভিগেশনের জিনগত নেটওয়ার্কে এমন জিন অন্তর্ভুক্ত থাকে যা বিপাক, ক্ষুধা (যেমন, নিউরোপেপ্টাইড Y /NPY এবং ঘ্রেলিন/ghrelin) এবং দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির মজুদ (যেমন চর্বি) তৈরি নিয়ন্ত্রণ করে। নিউরোপেপটাইড Y (NPY), একটি শক্তিশালী নিউরোপেপটাইড যা শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ ক’রে বিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর, ঘ্রেলিন বিপাকক্রিয়ায় শক্তির হোমিওস্ট্যাসিস, গ্লুকোজ এবং লিপিড বিপাক এবং চর্বি সঞ্চয়কে প্রভাবিত করে, মূলত মস্তিষ্কের উপর এর ক্রিয়া এবং চর্বি কোষের সাথে এর মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে।
শেষকথা
আমাদের জৈবিক জিপিএস সিস্টেম, অর্থাৎ মানব স্নায়ুতন্ত্রের নেভিগেশন সিস্টেম স্থানিক মানচিত্রের জন্য একটি মৌলিক প্রক্রিয়া থেকে বিকশিত হয়েছে। “স্থান” এবং “গ্রিড” কোষের সৃষ্টি এই সাধারণ চাহিদাকেই নিশ্চিত করেছে, প্রতিষ্ঠিত করেছে যে আমাদের পূর্বপুরুষরা, আধুনিক শিকারী-সংগ্রাহক সমাজের মতো, তাদের ভৌত পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার এবং উন্নতির জন্য একটি সহজাত “অভ্যন্তরীণ জিপিএস”-এর উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই প্রাচীন ‘জ্ঞানীয় স্থাপত্য’ ছিল খাদ্য সংগ্রহ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সহজতর করার জন্য অপরিহার্য জৈবিক ব্যবস্থা। আজ, প্রযুক্তির কাছে নেভিগেশন আউটসোর্সিং আমাদের পরিবেশের মানসিক মানচিত্র তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে সীমিত করেছে। স্থানিক স্মৃতি সিস্টেমের দীর্ঘস্থায়ী অপব্যবহার সম্ভাব্যভাবে বয়স-সম্পর্কিত জ্ঞানীয় পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে বা আলঝাইমারের মতো অবস্থার জন্য দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে— ঠিক যেমন, চ্যাটজিপিটি-এর মতো AI-এর অত্যধিক বা অতিরিক্ত নির্ভরশীল ব্যবহার স্মৃতিশক্তি এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার ফলে জ্ঞানীয় অবক্ষয় হতে পারে। তাই, প্রযুক্তি কম ব্যবহার ক’রে আমাদের অভ্যন্তরীণ নেভিগেশন দক্ষতা অনুশীলন করা বা স্থানিক স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সাহায্যকারী নোট:
এন্টোরাইনাল কর্টেক্স (Entorhinal cortex): মস্তিষ্কে লিম্বিক সিস্টেমের একটি অংশ হলো এন্টোরাইনাল কর্টেক্স। হিপোক্যাম্পাস-সংলগ্ন এই অঞ্চলটি মস্তিষ্কের মধ্য টেম্পোরাল লোবে অবস্থিত, যার কাজগুলির মধ্যে রয়েছে স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ, নেভিগেশন এবং সময়ের উপলব্ধির জন্য একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা। স্মৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব হলো মূলতঃ হিপোক্যাম্পাস (hippocampus) ও এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের। হিপোক্যাম্পাসে তথ্য গ্রহণ করা ও মস্তিষ্কের বাকি অংশে তথ্য পাঠানো উভয় ঘটে থাকে এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের মাধ্যমে। এটি হিপোক্যাম্পাস-সহ মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সাথে একটি তথ্যকেন্দ্রিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করে। এটি প্রভাব বিস্তার করে ভাষা, যুক্তি এবং সামাজিক আচরণের জন্য দায়ী সেরিব্রাল কর্টেক্সের অঞ্চলগুলিতে। এন্টোরাইনাল কর্টেক্সে রয়েছে “গ্রিড (Grid) কোষ” নামক একধরনের বিশেষ নিউরন, যা মানব মস্তিষ্কে ও অন্যান্য প্রাণিদের মস্তিষ্কেও “গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম” বা GPS/জিপিএস হিসেবে কাজ করে। মস্তিষ্কের এটি-ই হলো প্রথম এলাকা যা আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত হয়। এই এলাকায় গ্লুটামেটারজিক নিউরনের আধিক্য রয়েছে, যেখানে প্রোটিন অ্যামাইলয়েড-বিটা (Amyloid-β)-সম্পর্কিত কর্মহীনতা ছাড়াও রিলিন (Reelin)নামক একটি প্রোটিনের মিউটেশন বা কম ক্ষরণ আলঝেইমারস রোগটির মাত্রা আরও বৃদ্ধি করে। এছাড়াও, এখানকার নিউরনগুলিতে দেখা গিয়েছে “টাউ (Tau)” প্রোটিনের উপস্থিতি। আলঝেইমারস রোগটি শুরু হয় স্মৃতি হ্রাস বা ভুলে যাওয়া দিয়ে এবং ধীরে ধীরে রোগী সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে। এই এলাকাটি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে ঢের, অর্জন হয়েছে বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার। মস্তিষ্কে জিপিএস সিস্টেম আবিষ্কারের জন্য জন ও’কিফ, মে-ব্রিট মোসার এবং এডভার্ড মোসার ২০১৪ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। দেখুন হিপোক্যাম্পাস।
জৈবিক ঘড়ি/বায়োলজিক্যাল ক্লক (Biological clock): আমাদের শরীরের অনেক শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলী ছন্দময়, যেমন, ঘুম, রেচন, রক্তচাপ, শ্বসন, গতিপথ নির্ধারণ বা নেভিগেশন, এবং স্নায়বিক কার্যাবলী প্রতিটি নিজ নিজ ছন্দে জৈবিক ঘড়ি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দিবা-রাত্রির এই জৈবিক ছন্দকে বলা হয় সির্কাডিয়ান ছন্দ (circadian rhythm)। পুরো দেহজুড়েই বিভিন্ন টিস্যুর প্রতিটি কোষে রয়েছে ক্লক যেগুলিকে বলা হয় দেহের পার্শ্বীয় ক্লক, যাদের নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথালামাসের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াসে (SCN) অবস্থিত একটি মাস্টার ক্লক। SCN অঞ্চলটিতে মাত্র ২০ হাজার স্নায়ুকোষ থাকে যেগুলি মাস্টার ক্লক ধারণ করে। মাস্টার ক্লক ও পার্শ্বীয় ক্লক উভয়ই একটি নির্দিষ্ট জীনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিচালিত, যার মুলে রয়েছে চার ধরনের জিন, যা ক্লকটির একটি ‘নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ’ তৈরি করে। মানবজৈবিক ঘড়ির জিনগত মৌলিক উপাদান হচ্ছে: Period (Per1/2/3) ও Cryptochrome (Cry1/Cry2) এবং Bmal1, Clock ও Npas (1/2)। প্রোটিনরূপে এগুলিকে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরও বলা হয়। সির্কাডিয়ান-ঘড়ির মূল ট্রান্সক্রিপশন কমপ্লেক্সটি (Haque R et al., J Neurochem,113, 2010), যা দেহের প্রায় ৩০% জিনের প্রকাশকে সূর্যালোকের উপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ কোনো জিন বেশি প্রকাশ পায় দিনে, কোনোটি রাতে। দিনের আলোয়, PER ও CRY প্রোটিন দুটি জুটি বেঁধে (হেটারোডাইমার) দিনের জিনগুলিকে প্রকাশ করে এবং BMAL ও CLOCK/NPAS1/2 হেটারোডাইমার মৃদু আলোর বা রাতের জিনগুলির প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। বলা বাহুল্য, দিনের শুরুতে চোখের পিছনের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষগুলির (বিশেষকরে গ্যাংলিওন কোষগুলির বিশেষায়িত কিছু কোষ) দ্বারা গৃহীত আলোর সিগন্যাল প্রেরিত হয় SCN এ অবস্থিত মাস্টার ক্লকে। এ সিগন্যালের ফলেই পুরো শরীর একটি ছন্দ বা লয়ে কাজ করতে থাকে। নেভিগেশন প্রক্রিয়ার সাথে দেহের জৈবিক ঘড়ি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস (Suprachiasmatic nucleus, SCN): সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস হল মস্তিষ্কে হাইপোথ্যালামাসের একটি ছোট অঞ্চল (২০,০০০ নিউরন নিয়ে গঠিত), যা সরাসরি অপটিক কায়াজমার উপরে অবস্থিত। এটি স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে একটি মূল সির্কাডিয়ান (circadian) পেসমেকার বা মাস্টার জৈবিক ঘড়ি (দেহঘড়ি), যা দেহে নানা বৈশিষ্ট্যের দিবা-রাত্রি (সির্কাডিয়ান)কালীন ছন্দ (circadian rhythm) তৈরি করে (দেখুন বায়োলজিক্যাল ক্লক)। জৈবিক ঘড়ির মাধ্যমে প্রায় ২৪-ঘন্টা চক্রে শরীরের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে SCN। সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াসকে ভেন্ট্রোল্যাটেরাল এবং ডরসোল্যাটেরাল অংশে ভাগ করা যায়, যা যথাক্রমে কোর (core) এবং শেল (shell) নামেও পরিচিত। এই অঞ্চলগুলিতে জৈবিক ঘড়ির মূল জিনগুলি (Clock, Bmal1, ক্রিপ্টোক্রোম [Cry1/2] এবং Period 1/2/3) প্রকাশ পায়। মানবদেহে প্রায় ৩০% প্রোটিন SCN বা জৈবিক ঘড়ির জিন দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত। রেটিনোহাইপোথ্যালামিক ট্র্যাক্ট (RHT) দ্বারা রেটিনার সাথে SCN সরাসরি সংযুক্ত। রেটিনার গ্যাংলিয়ন কোষ-উদ্ভুত RHT মেলানোপসিন, PACAP (পিটুইটারি অ্যাডিনাইলেট সাইক্লেজ-অ্যাক্টিভেটিং পলিপেপ্টাইড) এবং গ্লুটামেটের মাধ্যমে দৃষ্টিগত তথ্য প্রেরণ করে সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াসে।
হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus): হিপোক্যাম্পাস মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত, টেম্পোরাল লোবের মধ্যবর্তী অংশের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এটি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট কাঠামো, যা মূলত ঘনবসতিপূর্ণ পিরামিডাল কোষ দ্বারা গঠিত। সমস্ত নিউরনের মতো, পিরামিডাল কোষগুলি একটি কোষের দেহ এবং স্নায়ু ফাইবার নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে ডেনড্রাইট এবং অ্যাক্সন রয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কে দুটি হিপোক্যাম্পাস রয়েছে – প্রতিটি সেরিব্রাল গোলার্ধে একটি। হিপোক্যাম্পাস তিনটি ভাগে বিভক্ত: হিপোক্যাম্পাস বডি, ডেন্টেট গাইরাস, এবং সাবিকুলাম। মানবদেহের মস্তিষ্কের মধ্যে, হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলটি দেখা গিয়েছে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন ও বিকাশ করতে সক্ষম। ক্রমাগত এই বিকাশের প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় নিউরোজেনেসিস। ডেন্টেট গাইরাস একটি ইনপুট অঞ্চল, যা হিপোক্যাম্পাস-সংলগ্ন এন্টোরাইনাল কর্টেক্স থেকে তথ্য গ্রহণ করে। এটি প্রথম অঞ্চল যেখানে সমস্ত সংবেদনশীল পদ্ধতি থেকে তথ্য একত্রিত হয়ে অনন্য উপস্থাপনা এবং স্মৃতি তৈরি করে, যার ফলে শেখার এবং স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি অনুঘটক হিসেবে হিপোক্যাম্পাস স্বল্প-স্থায়ী স্মৃতির তথ্যসমূহকে একত্র করে দীর্ঘ-স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর করে এবং সেগুলি মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষকরে নিওকর্টেক্সে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকে। বিশ্লেষণমূলক স্মৃতি ছাড়াও, হিপোক্যাম্পাস তার স্মৃতিতে ধরে রাখে স্থান সম্পর্কিত বা ভ্রমণ-সম্পর্কিত (ন্যাভিগেশনাল) স্মৃতি। হিপোক্যাম্পাস এবং এন্টোরহিনাল কর্টেক্সে রয়েছে স্থান/Place ও “গ্রিড/Grid কোষ” নামক একধরনের বিশেষ নিউরন, যা মানব মস্তিষ্কে ও অন্যান্য প্রাণিদের মস্তিষ্কেও “গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম” বা জিপিএস হিসেবে কাজ করে, যা কোনও স্থান সম্পর্কিত স্মৃতি বা ভ্রমণ-সম্পর্কিত স্মৃতি সংরক্ষণ করে; ঠিক যেমন একজন গাড়িচালক তার জিপিএস সিস্টেম কাজে লাগিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।






