গতকাল ডা. জাকির নায়েকের এক বিশাল মাহফিলে উপস্থিত একজন ব্যক্তিকে প্রশ্ন করতে শুনলাম, “সব কাজ যদি আল্লাহর হুকুমে হয়, তবে ধর্ষণও কি আল্লাহর হুকুমে হয়?” ডা. জাকির নায়েক এ প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছিলেন তা শোনার সুযোগ আমার হয়নি। তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোকে এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আমি এখানে কিছু আলাপ করতে চাই।
উপর্যুক্ত প্রশ্ন ছাড়াও আমি অনেক মানুষকে প্রায়ই বলতে শুনি— যা কিছু হয়, সব আল্লাহর হুকুমেই হয়। মানুষ যা কিছু করে, সবই আল্লাহর হুকুমে করে। তার মানে কি মানুষ চুরি, ডাকাতি, খুনখারাবি, হত্যা, ধর্ষণ, মিথ্যাচার, নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের জুলুম-নির্যাতন, লুটপাট, গুম-খুন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধ্বংসযজ্ঞ, যৌনাচার, মানুষ ঠকানোর মতো পৃথিবীতে যত অপকর্ম আছে, সবই আল্লাহর হুকুমে করে?
কিছুদিন আগে এক নাস্তিক বুদ্ধিজীবী এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহ আছেন বলে বিশ্বাস করি না। আল্লাহ থাকলে পৃথিবীতে এত খুনখারাবি, রাহাজানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অশান্তি লেগে থাকতো না। আল্লাহ থাকলে তিনি পৃথিবীকে নরকে পরিণত না করে স্বর্গ বানিয়ে দিতেন, যেখানে মানুষ সুখ-শান্তিতে বসবাস করত, কোনো অশান্তি ও দুঃখ-কষ্ট থাকতো না।”
বস্তুত এই ধারণা অজ্ঞতা ও কল্পনাপ্রসূত, এবং কোনোভাবেই সঠিক নয়। মানুষের আদি পিতা-মাতা আদম-হাওয়া তো বেহেশতেই ছিলেন এবং সুখেই ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্য ও অভিশপ্ত শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে তাঁরা আল্লাহর দেওয়া আদেশ লঙ্ঘন করলেন, ফলে বেহেশত হারিয়ে শয়তানকে সঙ্গী করে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পৃথিবীতে আগমন করলেন।

পৃথিবী হলো মানুষ আর শয়তানের মধ্যে ভালো-মন্দের পরীক্ষার রণক্ষেত্র। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষের কাজকর্মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেন না। মানুষের সব কর্ম ও চিন্তা যদি আল্লাহ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো, তবে পাপ-পুণ্য বা অন্য কোনো কাজের জন্য মানুষকে দায়ী করা যেত না, বিচার দিবসের প্রয়োজন হতো না, জান্নাত ও জাহান্নামের কোনো প্রশ্নই থাকত না।
যেহেতু সব কাজ আল্লাহর হুকুমে হয় না, সেহেতু সব কাজের দায় আল্লাহর ওপর বর্তায় না। মানুষ তখন নিষ্পাপ রয়ে যেত।
আল্লাহ তা‘আলা কোনো মন্দ কাজের আদেশ দেন না। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর হস্তক্ষেপ করেন না। ফলে মানুষ ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে যা করে, তার জন্য সে দায়ী থাকবে। বিচার দিবসে সে তার কর্ম অনুযায়ী ফল পাবে।
মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা থাকে— এক মানবিক, অন্যটি পাশবিক। যারা পাশবিক সত্তার অনুগামী, তারা শয়তানের পথ অনুসরণ করে; তারা আল্লাহর সান্নিধ্য পায় না। আর যারা মানবিক সত্তার গুণে গুণান্বিত, তারা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে যারা তাঁর মহিমা প্রত্যক্ষ করতে পারে, তারা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা, ঈর্ষা, প্রতিহিংসার মতো সকল পাপকর্ম থেকে মুক্তি পায়। এবং এটাই হলো মানুষের চূড়ান্ত সাফল্য।
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর প্রবেশ করো আমার বিশিষ্ট বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো জান্নাতে।”
— সূরা আল ফজর, আয়াত ২৭-৩০
দুই
আমি প্রায় দেখি— কেউ মারা গেলে সাথে সাথে মানুষ পড়ে বা লিখে রাখে: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পত্রপত্রিকায়ও কারও মৃত্যু সংবাদে একইভাবে আয়াতের শুরু ও শেষাংশ দিয়ে দায়সারাভাবে লেখা হয়, যা যথাযথ নয়।
আমরা কেন শুধু মানুষ মারা গেলে সুরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াতটি পড়ি? আয়াতটি কি শুধুই মৃত ব্যক্তির জন্য?
আয়াতটি হলো—
“আল্লাজিনা ইজা আসাবাতহুম মুসিবাহ, কালু: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
(সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৬)
অর্থাৎ: “যারা কোনো বিপদে পতিত হলে বলে: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।”
এই আয়াতটি শুধু মৃত্যুর ক্ষেত্রে নয়, বরং যেকোনো বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদির সময় পাঠযোগ্য। যেমন: করোনা বা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে আপনি আয়াতটি নিয়মিত পড়তে পারেন এবং দোয়া করতে পারেন— আল্লাহ যেন আমাদের রক্ষা করেন।
এই আয়াত পড়লে মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার হয় না যদি আপনি মৃতের জন্য আলাদা দোয়া না করেন। তবে মৃত ব্যক্তির আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করলে এবং আল্লাহ তা কবুল করলে, তিনি তা থেকে উপকৃত হতে পারেন।
কে কখন আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে তা কেউ জানে না। যদি জানত, তাহলে হয়তো সে ভয়েই আগে মারা যেত।
মানুষ সাধারণত ভাবে— সে অনেকদিন বাঁচবে। কিন্তু মৃত্যু অনিবার্য, বয়সনিরপেক্ষ। ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনো কিছুই মৃত্যুর সময় কোনো কাজে আসে না।
করোনায় বাংলাদেশে কত কোটিপতি মারা গেছেন। তাঁদের কোটি কোটি টাকাও তাঁদের বাঁচাতে পারেনি। প্রতিদিনই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে বহু ধনী-প্রভাবশালী মানুষ, রেখে যাচ্ছে তাদের গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সা, স্ত্রী-সন্তান।
তাই জীবনকে সৎ, নির্লোভ, অহংকারবর্জিত এবং কল্যাণময় করে গড়ে তোলাই আমাদের কর্তব্য। আমাদের এই সুন্দর দেহখানি, যা নিয়ে এত অহংকার— তা মৃত্যুর পর পঁচে গলে যাবে। অবশেষে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
থেকে যাবে শুধু সৎকর্ম, মানবিক অবদান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা কাজ।










