০৭:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ডিএনএ-এর জৈবিক ঘড়ি দীর্ঘায়ু ও বয়সের রহস্য

টেলোমেয়ার— বার্ধক্য পরিমাপের একটি প্রতিশ্রুতিশীল সূচক

টেলোমেয়ার  হলো বার্ধক্য পরিমাপের একটি প্রতিশ্রুতিশীল সূচক। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি প্রকৃতকোষীয় (মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী) জীবের জন্য এটি গ্রহণযোগ্য।

আমরা সবাই চাই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন। কিন্তু আমাদের শরীর কীভাবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের আয়ু নির্ধারণ করে? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের কোষের গভীরে, ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে। এগুলি হলো টেলোমেয়ার, যা দেখতে অনেকটা জুতোর ফিতের শেষ অংশের প্লাস্টিক ক্যাপের মতো। এই টেলোমেয়ারগুলো আমাদের ডিএনএ-কে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে সাথে এরা ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি আমাদের শরীরের জন্য একটি জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও বয়স-সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগের সূচনা করে। আপনার শরীর কেন বুড়িয়ে যায়? টেলোমেয়ার কীভাবে জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে এবং বার্ধক্য, রোগ ও দীর্ঘায়ুর সাথে এর সম্পর্ক কী তা জানুন। এই নিবন্ধে, আমরা টেলোমেয়ারের রহস্যময় জগতটি অন্বেষণ করব। আমরা জানব কীভাবে এটি বার্ধক্যকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, এবং আধুনিক বিজ্ঞানে এটি কীভাবে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।


টেলোমেয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে অবস্থিত পুনরাবৃত্তিমূলক ডিএনএ সিকোয়েন্স বা প্রতিরক্ষামূলক ক্যাপ যা প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে সাথে ছোট হয়ে যায়। এগুলি কোষের বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণকারী জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে। যখন টেলোমেয়ারগুলি অত্যন্ত ছোট হয়ে যায়, তখন কোষগুলি বিভাজন বন্ধ করে দেয়, প্রবেশ করে স্থায়ী বৃদ্ধি স্থবিরতার একটি অবস্থায় যাকে বার্ধক্য বলা হয়, অথবা কোষগুলি মারা যায়। এই প্রক্রিয়াটি সামগ্রিক বার্ধক্য, টিস্যুর অবক্ষয় এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের সূত্রপাত ঘটায়। 

বিষয়: অণুপ্রাণ বিজ্ঞান, ডিএনএ, টেলোমেয়ার, জেরোন্টোলজি, বার্ধক্য।

ভূমিকা

১৯০০ সালে, বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৩১ বছর, যা আজকের বিশ্বব্যাপী গড় আয়ুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।  জাতিসংঘের মতে, ২০২৪ সালে, বিশ্বব্যাপী মানুষের আয়ু এসে পৌঁছেছে ৭৩ বছরেরও বেশি। এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র উন্নত দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এশিয়াসহ সমস্ত বিশ্ব অঞ্চলে ঘটেছে, যা ১৯৫০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে আয়ুষ্কাল ২৫ বছরেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য হ্রাস বিশ্বব্যাপী আয়ু বৃদ্ধিতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও, ভ্যাকসিন, অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এবং চিকিৎসার মতো ক্ষেত্রগুলির উন্নতিও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে শতাব্দীর প্রথম দিকে। যদিও স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আয়ুবৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রয়েছে যে সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতা, বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই দু’য়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নতি হয়নি। এই বৈষম্যের কারণ হল, স্বয়ং বার্ধক্য অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ, যা আয়ুষ্কাল এবং জীবনের মান উভয়কেই সীমিত করে। গত কয়েক দশক ধরে জৈবিক বার্ধক্যের একটি নির্ভরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে, জিনোমীয় (জিনোম হলো একটি কোষের সম্পূর্ণ ডিএনএ সেট এবং তাদের সমষ্টিগত তথ্য) অস্থিরতা, কোষীয় বার্ধক্য, ডিএনএ মিথিলেশন (মিথাইল-CH3 গ্রুপের সংযুক্তি), প্রোটিওস্ট্যাসিস (প্রোটিন হোমিওস্ট্যাসিস) এবং মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতার মতো বার্ধক্য-সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলিকে চিহ্নিত করার পরিমিতি রয়েছে। তবে, উপরের কোনও পরিমাপ জৈবিক বয়সের একটি সম্পূর্ণ পরিমাপের প্রতিনিধিত্ব করে না। জৈবিক বয়স, যা বয়স-সম্পর্কিত অবক্ষয়ের হার প্রতিফলিত করে, তা পরিমাপের সঠিক সূচক কী হতে পারে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও জৈবিক বয়স মূল্যায়নের জন্য কিছু প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি যেমন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ বা ডিএনএ মিথিলেশন, ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সর্বোপরি, টেলোমেয়ার যেহেতু বার্ধক্যের সাথে সরাসরি সংযুক্ত, তাই এটিকে বার্ধক্যের বায়োমার্কার হিসেবে ব্যবহার করার উপযোগী করে তুলেছে।

টেলোমেয়ার কী ?

টেলোমেয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে একধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক “TTAGGG” ডিএনএ অনুক্রম, যা বিশেষ ছয়টি প্রোটিনের একটি কমপ্লেক্স “শেল্টেরিন” (TRF1, TRF2, TIN2, POT1, TPP1, RAP) দ্বারা আবদ্ধ থাকে। এদের স্যাটেলাইট (satellite) ডিএনএ-ও বলা হয়। এখানে উল্লেখ্য, ডিএনএ-র টেলোমেরিক অঞ্চলটি কোনও প্রোটিনের জন্য কোডিং বা সংকেত বহন করে না; এটি কেবল রৈখিক (linear) প্রকৃতকোষীয় (ইউক্যারিওট) ক্রোমোজোমের শেষ অঞ্চলে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক কোড, যা ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলিকে সুরক্ষা দেয়। ধারাবাহিক বেশ কিছু কোষ বিভাজনের পর, টেলোমেয়ারগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈর্ঘ্যে পৌঁছায় এবং বিভাজন বন্ধ হয়ে কোষটি বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পৌঁছে। অর্থাৎ, প্রতিটি কোষ বিভাজন/প্রতিলিপির সাথে, সোমাটিক বা দেহ কোষের টেলোমেয়ারগুলি ক্রমশ ছোট (সংক্ষিপ্ত) হতে থাকে (ছবি দেখুন) এবং খুব সংক্ষিপ্ত টেলোমেয়ার পি-৫৩ (p-53)-নির্ভর ডিএনএ ক্ষতির প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা ধীর পরিবর্তনের সাথে টিস্যুতে অ্যাপোপটোসিস (কোষের আত্মহত্যা) এবং বার্ধক্যের সূত্রপাত ঘটায়। জন্মকালে, শিশুদের ক্রোমোজোমের টেলোমেয়ারে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ নিউক্লিওটাইড থাকে, যেখানে বয়বৃদ্ধের ডিএনএ-তে দেখা যায় মাত্র ১,৫০০ নিউক্লিওটাইড। অর্থাৎ, ডিএনএ পলিমারেজ (যে এনজাইমটি ডিএনএ এর কপি বা অনুলিপন ঘটায়) এনজাইমটির অপারগতার কারণে, প্রতিটি সোমাটিক কোষ বিভাজন চক্রে টেলোমেয়ারগুলি ৫০-২০০ টি নিউক্লিওটাইড দ্বারা সংক্ষিপ্ত হতে থাকে । টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।
টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।

টেলোমেয়ার একটি বিস্তৃত জেনেটিক বৈশিষ্ট্য যা সাধারণত অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী জীবের (ইউক্যারিওট) জিনোমে পাওয়া যায়, ব্যাকটেরিয়া বা আদিকোষীয় জীবের (প্রোক্যারিওটিক) জিনোমে নয়— কারণ অধিকাংশ আদিকোষীয় ক্রোমোজোম রৈখিক নয়, বরং গোলাকার। টেলোমেয়ারগুলি ক্রমাগত অবক্ষয় থেকে ক্রোমোজোম-ডিএনএ এর প্রান্তীয় অঞ্চলগুলিকে রক্ষা করে; পক্ষান্তরে, এটি ক্রোমোজোমের প্রতিরক্ষাও দেয়, দমন করে প্রান্তীয় রিকম্বিনেশন (recombination) এবং নিশ্চিত করে ক্রোমোজোমের অখণ্ডতা। এছাড়া, টেলোমেয়ারের কারণে ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলি একসাথে আটকে যাওয়া বা আন্তঃক্রোমোজোমীয়  ফিউশন থেকে বিরত থাকে। ডিএনএ পলিমারেজ ক্রোমোজোমের একেবারে প্রান্তে, অর্থাৎ টেলোমেয়ার ডিএনএ-কে সম্পূর্ণরূপে অনুলিপি করতে সক্ষম নয়। তাই, ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি,  প্রতিটি কোষ চক্রের সময় প্রায় ৫০ – ২০০টি নিউক্লিওটাইড হারিয়ে যায়, যার ফলে ধীরে ধীরে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে। যখন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমার নীচে পৌঁছে যায়, তখন কোষগুলিতে বার্ধক্য নেমে আসে এবং অবশেষে মারা যায়। অপরদিকে, টেলোমেরেজ হল বিশেষায়িত একটি এনজাইম যা নতুন টেলোমেয়ারকে সংশ্লেষ করে। এই এনজাইমটি (যার মূল অংশ হল টেলোমেরেজ রিভার্স ট্র্যাক্রিপ্টেজ/TERT প্রোটিন) ক্রোমোজোমের প্রান্তে ‘TTAGGG’ পুনরাবৃত্তি যোগ ক’রে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখে। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে, জন্মের পরে, একজন ব্যক্তির দেহ কোষগুলিতে টেলোমেরেজ নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনটির সংশ্লেষ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ব্যতিক্রম শুধু জননকোষ, স্টেম কোষ, নিউরাল স্টেম কোষ এবং ক্যান্সার কোষ, যেখানে ক্রোমোজোমপ্রান্তে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হয় না। এখানে উল্লেখ্য, মানবমস্তিষ্কের নিউরন কোষে টেলোমেরের দৈর্ঘ্য ‘গ্লিয়া কোষ’ (নিউরন ছাড়া মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষ) এবং দেহ কোষের চেয়ে বেশি। তাই, মস্তিষ্কে নিউরন-কোষগুলির টেলোমেয়ারের ক্ষয়ক্ষতির হার অন্যান্য টিস্যুর তুলনায় অনেক ধীর। 

কোষের আয়ুষ্কাল এবং হেইফ্লিক ফেনোমেনন 

কোষের ধরন এবং শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতার উপর নির্ভর ক’রে কোষের আয়ুষ্কাল ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। মানবদেহের সমস্ত কোষের গড় বয়স প্রায় ৭ থেকে ১০ বছর হতে পারে, তবে এর অর্থ এই নয় যে, সমস্ত কোষ সেই সময়সীমার মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয় — যেমন লোহিত রক্তকণিকার আয়ুষ্কাল হল ~১২০ দিন, শ্বেত রক্তকণিকা ~১৩ দিন এবং যকৃত কোষ ~১৮ মাস। কিন্তু, হৃদপিণ্ডের কোষগুলি (কার্ডিওমায়োসাইট) বা অস্থি মজ্জার কোষগুলি (হেমাটোপয়েটিক কোষ) কয়েক দশক ধরে বেঁচে থাকতে পারে, আর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের কোষগুলি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকে। বিশেষ ধরনের কিছু কোষ যেমন- স্টেম কোষ, জীবাণু কোষ এবং ক্যান্সার কোষ টেলোমেরেজ নামক একটি এনজাইম প্রকাশ করে বলে তারা টেলোমেয়ার পুনর্নির্মাণ করতে পারে, যা ওই কোষগুলিকে আরও অনেক বার বা এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভক্ত করতে দেয়। সাধারণভাবে, স্বাভাবিক মানুষের দেহ (সোমাটিক) কোষ প্রায় ৪০ থেকে ৬০ বার ডিএনএ কপি এবং কোষ বিভাজন করতে পারে, কিন্তু টেলোমেয়ার ক্রমশ ছোট হয়ে যাবার কারণে, পরবর্তীতে তারা আর বিভক্ত হতে পারে না। যখন টেলোমেয়ার খুব ছোট হয়ে যায়, তখন কোষগুলি বার্ধক্যে পৌঁছায়, তারা বিভাজন বন্ধ করে দেয় এবং অবশেষে মারা যায়। ভাবুন তো, যদি একটি দেহের সামগ্রিক কোষসমূহ যখন মারা যেতে থাকে, তখন আমরাই বা বাঁচি কী করে! আমাদের মরলোক ছেড়ে যেতে হয়।

একটি কোষ যে অমর নয়, অর্থাৎ একটি কোষ যে অনন্তকাল ধরে বিভাজিত হতে পারে না, এই ধারণাটি প্রথমে দিয়েছিলেন মার্কিন অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ/অ্যানাটমিস্ট লিওনার্ড হেইফ্লিক ১৯৬১ সালে। কোষ বিভাজনের এই সীমিত ক্ষমতাকে ‘হেইফ্লিক সীমা’ বলা হয়। মূলত, হেইফ্লিক সীমা হল একটি অন্তর্নির্মিত প্রক্রিয়া যা একটি সোমাটিক কোষ কতবার বিভক্ত হতে পারে তা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং এই সীমা কোষীয় বার্ধক্য এবং রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, হেইফ্লিক তার আবিষ্কারকে কোষীয় স্তরে বার্ধক্য বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু কোষগুলির সামগ্রিক বার্ধক্য একটি জীবের সামগ্রিক শারীরিক বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, হেইফ্লিক সীমা বস্তুত ক্রোমোজোমের শেষপ্রান্তে অবস্থিত টেলোমেয়ার অঞ্চলের দৈর্ঘ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত— অর্থাৎ, টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়াটি এই সীমাবদ্ধতার জন্য মূলত দায়ী। টেলোমেয়ারগুলি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়ে গেলে, কোষটি বার্ধক্যের একটি অবস্থায় প্রবেশ করে, যেখানে এটি আর বিভক্ত হতে পারে না, যদিও স্বল্পসময়ের জন্য বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় থাকে। কিছু ক্ষেত্রে, কোষগুলি হেইফ্লিক সীমাতে পৌঁছালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে প্রোগ্রামকৃত কোষমৃত্যু (অ্যাপোপটোসিস) প্রক্রিয়ায় কোষটির মৃত্যু হতে পারে। ‘হেইফ্লিক সীমা’ ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভাজন থেকে বিরত রেখে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তবে, এই সীমা স্টেম বা ক্যান্সার কোষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যার টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখার এবং আরও বেশি বার বিভক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। 

ডিএনএ মেরামতে ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের যোগসূত্র

টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। এর ফলে আমাদের জিনোমে অস্থিরতা দেখা দেয়। আমাদের জিনগত তথ্য বহনকারী অণুডিএনএ’ ক্রমাগতভাবে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া যেমন, বিপাকের উপজাত এবং বাহ্যিক কারণ (অতিবেগুনি বিকিরণ, বিষাক্ত পদার্থ) উভয়ের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিপাক হল পুষ্টিকে শক্তি এবং ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত করার একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। কিন্তু, বিপাকের সময় কিছু উৎপন্ন উপজাত ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে। এর মধ্যে ‘হাইড্রোক্সিল র‌্যাডিক্যাল’ (অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাসায়নিক উপাদান), অ্যালকাইলেটিং এজেন্ট যেমন, ক্যান্সার থেরাপিউটিক এজেন্ট (ক্লোরামবিউসিল), এবং অ্যালডিহাইডের মতো প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি (ROS/আরওএস) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরওএস সরাসরি ডিএনএ বেস/নিউক্লিওটাইড এবং শর্করাকে জারিত করতে পারে, অন্যদিকে অ্যালকাইলেটিং এজেন্ট ডিএনএ বেসগুলিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং অ্যালডিহাইড ডিএনএ ক্রসলিংক তৈরি করতে পারে। ডিএনএ ক্রস-লিঙ্কিং হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাসায়নিক এজেন্টরা ডিএনএ-তে দুটি নিউক্লিওটাইডের মধ্যে সমযোজী বন্ধন তৈরি করে, হয় একই স্ট্র্যান্ডের (ইন্ট্রাস্ট্র্যান্ড) মধ্যে অথবা দ্বিসূত্রক হেলিক্সের বিপরীত স্ট্র্যান্ডের (ইন্টারস্ট্র্যান্ড) মধ্যে। এটি ডিএনএ অনুলিপন এবং প্রতিলিপনের (ট্রান্সক্রিপশন) মতো গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় প্রক্রিয়াগুলিকে ব্যাহত করে , ফলে কোষের মৃত্যু হতে পারে।  

এখানে উল্লেখ্য, জিনোমের অখণ্ডতা এবং কোষীয় স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএর মেরামত অপরিহার্য। কারণ, ডিএনএ মেরামতের প্রতিবন্ধকতা বা ব্যর্থতা অকাল বার্ধক্যজনিত সিন্ড্রোম (যেমন: ককেইন সিন্ড্রোম, ওয়ার্নার সিন্ড্রোম এবং হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোম), স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ, হৃদরোগ এবং অঙ্গের কার্যকারিতায় বয়সসম্পর্কিত হ্রাসের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তবে, এই ক্ষতিগুলি মোকাবেলা করার জন্য কোষগুলিতে বিভিন্ন ডিএনএ মেরামতের আণবিক কৌশল রয়েছে। এই কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে বেস এক্সিশন মেরামত (BER), নিউক্লিওটাইড এক্সিশন মেরামত (NER), ডিএনএ অমিল/মিসম্যাচ মেরামত (MMR), এবং ডাবলস্ট্র্যান্ড ব্রেক মেরামত (DSBR) তবে, এটিও সত্য যে জীবের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে, ক্ষুদ্র টেলোমেয়ার কোষীয় বা প্রতিলিপিমূলক বার্ধক্যে অবদান রাখে, যা শারীরিক বার্ধক্যের একটি বৈশিষ্ট্য, এবং এটি ডিএনএ মেরামতের কৌশলগুলির দক্ষতা হ্রাস করে, যা জিনোমের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য ক্যান্সার বিকাশের দিকে পরিচালিত করে।  

টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা কি নানা রোগের সাথেও সম্পর্কিত?

টেলোমেয়ার প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষিপ্ত হয় এবং এই সংক্ষিপ্তকরণ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলিতে, সংক্ষিপ্ত টেলোমেয়ার হৃদরোগ (যেমন-এথেরোস্ক্লেরোসিস, স্ট্রোক, করোনারি ধমনি রোগ, মায়োকার্ডিয় ইনফার্কশন) এবং ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। সংক্ষিপ্ত এবং অকার্যকর টেলোমেয়ার পালমোনারি ফাইব্রোসিস, লিভার সিরোসিস এবং অন্যান্য লিভার রোগের সাথেও সম্পর্কিত। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, ছোট টেলোমেয়ার যে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ তা ইনসুলিন/ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ (IGF1)-মধ্যস্থ সংকেতপথের মাধ্যমে ঘটে। বিপরীতে, যদিও ইনসুলিন-লাইক গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ রিসেপ্টর (IGF1R) স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু হ্রাসকৃত IGF1R সংকেত মানুষের আয়ুবৃদ্ধি এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়েছে (Front Endocrinol, ২০১৯)। বর্ধিত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মাধ্যমে ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়া (যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বৈশিষ্ট্য) টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণকে ত্বরান্বিত করে, যা IGF1R রিসেপ্টর এবং তার নিম্নগামী প্রভাবক FOXO3A (ফর্কহেড বক্স প্রোটিন O) ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরকে বাধা দিয়ে টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়াটিকে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। 

টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণ এবং পরবর্তী ডিএনএ ক্ষতির রেসপন্স বা প্রতিক্রিয়া (DDR/ডিডিআর) বার্ধক্য এবং ক্যান্সার বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই ভূমিকা পালন করে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোষের নজরদারি ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ টেলোমেয়ার-কে যা ডিএনএ-র ক্ষতি সাধন করতে পারে, তা p53-সংকেতপথের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। ফলে কোষ চক্র বন্ধ হয়ে যায় বা এমনকি কোষের মৃত্যুও ঘটে। যদি ক্ষুদ্র টেলোমেয়ারযুক্ত কোষগুলি ডিডিআর প্রতিক্রিয়াকে উপেক্ষা করে বিভাজন চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে জিনোমিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলস্বরূপ, ক্রোমোজোম ফিউশন, ব্রেকেজ-ফিউশন-ব্রিজ চক্র এবং অন্যান্য জিনোমের পুনর্বিন্যাস হতে পারে, যা ক্যান্সার বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। যদিও টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য রোগ-ঝুঁকির একটি কারণ, তবে এটি একমাত্র নির্ধারক নয়। অন্যান্য জিনগত এবং পরিবেশগত কারণগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

ডিএনএ মিথিলেশন বার্ধক্যের একটি সম্ভাব্য বায়োমার্কার

বার্ধক্যের প্রেক্ষাপটে, ডিএনএ মিথিলেশন এবং টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। সহজ ভাষায়, ডিএনএ মিথিলেশন হল এমন একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেখানে মিথাইল গ্রুপ (CH3) নামক একটি ছোট রাসায়নিক ট্যাগ (যা একটি কার্বন পরমাণু এবং তিনটি হাইড্রোজেন পরমাণু নিয়ে গঠিত) ডিএনএ-র ‘সাইটোসিন’ বেসগুলিতে যুক্ত করা হয়। ‘ডিএনএ মিথাইলট্রান্সফেরেজ’ নামক একটি এনজাইম এই ট্যাগটি করে দেয়। এই ট্যাগিং পদ্ধতির মাধ্যমে, অন্তর্নিহিত ডিএনএ কোড পরিবর্তন না করেই, একটি জিনের প্রকাশ সাধারণত ‘দমন’ করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, ডিএনএ মিথিলেশন হল জিনপ্রকাশ দমনের একটি বিবর্তনীয়ভাবে সংরক্ষিত রূপ, যা আদিকোষীয় ও প্রকৃতকোষীয় উভয় ধরনের জিনোমের বর্ণালীতে বিদ্যমান। প্রসঙ্গত, ভিন্ন একটি এনজাইম (TET- টেন-ইলেভেন ট্রান্সলোকেশন এনজাইম) দ্বারা মিথাইল গ্রুপটি অপসারণের মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে ওই জিনের প্রকাশকে আবারও ‘চালু’ করা হয়ে থাকে। ডিএনএ মিথিলেশন অনেক জৈবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে কোষের বিকাশ, পার্থক্য এবং জিনের প্রকাশ। ডিএনএ মিথিলেশন, এসিটিলেশন, হিস্টোন প্রোটিনের পরিবর্তন ইত্যাদি নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ডিএনএ অণুতে সংযুক্ত হয়ে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে একটি জিনের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হতে পারে— জিনগুলি কখনও সক্রিয়, অতিসক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। আবার, কিছু এপিজেনেটিক চিহ্ন উত্তরাধিকার সূত্রেও প্রাপ্ত হতে পারে। জেনেটিক্সের যে শাখাটি এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে, তাকে বলা হয়”এপিজেনেটিক্স”। যাইহোক, ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে জৈবিক বয়সও পরিমাপ করা যায়। এই প্যাটার্নগুলি বয়সের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং আণবিক স্তরে কারও শরীরের বয়স কত তা অনুমান করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডিএনএ মিথিলেশনের পরিবর্তনগুলি প্রকৃতপক্ষে বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিবর্তনগুলি একটি সু-নথিভুক্ত এপিজিনগত পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া যা সারা জীবন ধরে ঘটে। পরিবেশগত ও জিনগত কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্নগুলি ব্যক্তিদের মধ্যে বার্ধক্যের সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিবর্তনগুলি এলোমেলো ঘটে না, ডিএনএ-র নির্দিষ্ট সিপিজি (CpG sites) স্থানগুলিতে (যেখানে একটি সাইটোসিন বেসের পরে একটি গুয়ানিন বেস থাকে) বয়সের সাথে পুনরুৎপাদনযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় বলে জানা যায়। সাধারণত, বার্ধক্য সামগ্রিক ডিএনএ মিথিলেশন হ্রাসের (হাইপোমিথিলেশন) সাথে সম্পর্কিত, তবে নির্দিষ্ট অঞ্চলে, বিশেষ করে ‘সিপিজি’ গুচ্ছগুলিতে মিথিলেশন বৃদ্ধির সাথেও সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ- EDARADD, TOM1L1, এবং NPTX2 জিনে CpG-এর মিথিলেশন বিশেষভাবে বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত। ডিএনএ মিথিলেশনের এই পরিবর্তনগুলি জিনের প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে কোষীয় কর্মহীনতার দিকে পরিচালিত করে এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া ও ক্যান্সার, হৃদজনিত রোগ, স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ-সহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে অবদান রাখতে পারে। জৈবিক বয়সের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্যও ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বয়স-সম্পর্কিত এসব ডিএনএ মিথিলেশনের পরিবর্তন পূর্বাভাসযোগ্য প্যাটার্ন অনুসরণ করে, যা এপিজেনেটিক ক্লক বা “ডিএনএ মিথিলেশন ঘড়ি” তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট সিপিজি সাইটগুলিতে ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্নের উপর ভিত্তি করে এই ঘড়িগুলি সঠিকভাবে কালানুক্রমিক বয়স এবং কিছু ক্ষেত্রে জৈবিক বয়সের পূর্বাভাস দিতে পারে।

বলা বাহুল্য, টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্তকরণ এবং ডিএনএ মিথিলেশনে পরিবর্তন উভয়ই বার্ধক্যজনিত রোগের বিকাশে জড়িত। এখানে বলা প্রয়োজন যে, সাধারণভাবে জিনোমের যে অঞ্চলগুলিতে CpG থাকে কেবল সেগুলিই সরাসরি মিথিলেশনের জন্য সংবেদনশীল। স্তন্যপায়ীর টেলোমেয়ারে CpG অঞ্চল থাকে না, ফলে এই অঞ্চলটি সরাসরি ডিএনএ-মিথিলেশন থেকে মুক্ত বলে মনে করা হয়। তবে, সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে (টেলোমেয়ার সংলগ্ন এলাকা) ডিএনএ মিথিলেশন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ক্ষুদ্র টেলোমেয়ার-বিশিষ্ট ডিএনএ-এর সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে হাইপারমিথিলেশন ঘটে, যা বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। বিপরীতে, হাইপোমিথিলেশন বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। প্রসঙ্গত, সাবটেলোমেরিক অঞ্চল হল টেলোমেয়ার সংলগ্ন ডিএনএ ক্রম, যা ক্রোমোজোমের স্থিতিশীলতা এবং কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সাবটেলোমেরিক অঞ্চলগুলিতে অবস্থান করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিন, তম্মধ্যে একটি হল টেলোমেরেজ রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ (TERT), যার কোডে বা সংকেতে সংশ্লেষিত হয় ‘টেলোমেরেজ’ এনজাইম। মানব ৫-নম্বর ক্রোমোজোমের সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে এই জিনটি অবস্থান করে। কথিত “টেলোমেয়ার পজিশন এফেক্ট” অনুযায়ী, দীর্ঘ টেলোমেয়ার মানব ‘TERT’ অভিব্যক্তিকে দমন করে, কিন্তু ছোট টেলোমেয়ারগুলি, বিশেষকরে ক্যান্সার কোষে, এই এনজাইমটিকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ এবং লৈঙ্গিক পার্থক্য

নারীদের টেলোমেয়ার সাধারণত পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘ থাকে। এই পার্থক্যটি মূলত ইস্ট্রোজেনের মতো হরমোনজনিত কারণগুলির সাথে যুক্ত। ইস্ট্রোজেন হরমোন টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপকে উদ্দীপিত করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস ক’রে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে (Aging Cell. ২০২২)। পুরুষদের ক্ষেত্রে, বিশেষকরে কিছু কিছু টিস্যুতে, কোষ বিভাজনের সম্ভাব্য উচ্চ হার  এবং ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য কমাতে অবদান রাখতে পারে। উপরন্তু, নারীদের মধ্যে এক্স (X) ক্রোমোজোমে অবস্থিত DKC1 এর মতো জিনের দ্বি-অ্যালিলিক প্রকাশ (অর্থাৎ, জিনের উভয় কপি (অ্যালিল) সক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়) টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি ক’রে সম্ভাব্যভাবে টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা ধরে রাখে। প্রসঙ্গত, DKC1 জিন ‘ডিস্কেরিন’ প্রোটিন তৈরির জন্য নির্দেশনা প্রদান করে, যা টেলোমেরেজ সক্রিয় রাখার এবং রাইবোজোমীয় আরএনএ (rRNA) একত্রিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্কেরিন টেলোমেরেজ কমপ্লেক্সকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে, যা কোষ বিভাজনের সময় টেলোমেয়ারকে ছোট হওয়া থেকে রক্ষা করে।

উপসংহার

টেলোমেয়ার  হলো বার্ধক্য পরিমাপের একটি প্রতিশ্রুতিশীল সূচক। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি প্রকৃতকোষীয় (মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী) জীবের জন্য এটি গ্রহণযোগ্য। যেমন, সিশেল (Seychelles) বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের কচ্ছপগুলি প্রায় ২০০-২৫০ বছর বাঁচে, কিংবা “কুয়াহগ” জাতীয় একধরনের সামুদ্রিক ঝিনুক ৪০০ বছর এবং সামুদ্রিক লবস্টার ১৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মানুষের তুলনায় তাদের সুদীর্ঘ টেলোমেয়ার এবং তার অবক্ষয়ের ধীর গতি-ই হল দীর্ঘায়ুর মূল কারণ। মানুষের টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণের হারকে বার্ধক্যসহ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, যাদের টেলোমেয়ারের আকার ছোট,  তাদের রোগব্যাধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে এটিও প্রসঙ্গত যে, টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য জিনগত এবং এপিজিনগত ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হলেও, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ক্ষতিকারক পদার্থের সংস্পর্শের মতো জীবনধারাগুলিও টেলোমেয়ারের ক্ষয়ের হার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টেলোমেরেজ, যে এনজাইমটি টেলোমেয়ারের সঠিক দৈর্ঘ বজায় রাখে বা টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণকে প্রতিরোধ করে, তা বার্ধক্যকালীন সময়ে দেহকোষগুলিতে সংশ্লেষণ হয় না বল্লেই চলে। কাজেই বয়সকে ধরে রাখার জন্য টেলোমেয়ার যেহেতু বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সাথে স্পষ্টভাবে যুক্ত, তাই কোষে বার্ধক্য-প্রতিরোধী থেরাপির প্রেক্ষাপটে টেলোমেরেজ প্রবর্তন বা টেলোমেরেজকে সক্রিয় করে সুস্থ বার্ধক্যের এবং সম্ভাব্য আয়ুবৃদ্ধির জন্য প্রতিশ্রুতিশীল উপায় প্রদান করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুরের উপর করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি জীবনকাল বৃদ্ধি করতে পারে এবং হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও হাড়ের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির উন্নতি করতে পারে (EMBO Mol Med, ২০১২; Nature, ২০২২; PLoS Genet. ২০১৮)। টেলোমেরেজ এনজাইমকে সম্ভাব্য থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার আগে, টেলোমেয়ার, বার্ধক্য এবং ক্যান্সারের মধ্যে জটিল যে সম্পর্ক তা আরও ভালভাবে বোঝা দরকার। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলি সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এছাড়াও, সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি আশাব্যাঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে প্রমাণ মিলেছে যে,  মেটফর্মিন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, ডায়াবেটিস নিরাময়ে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত এই ওষুধ “মেটফরমিন” টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্ততা রোধ করতে সাহায্য করে। আগেই উল্লেখ করেছি, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর টেলোমেয়ার হল বার্ধক্যের একটি লক্ষণ এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের বিশেষ একটি কারণ। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, মেটফর্মিন চিকিৎসা টেলোমেরেজ এনজাইমকে সক্রিয় ক’রে দীর্ঘতর টেলোমেয়ার তৈরি করতে সক্ষম, যা সম্ভাব্যভাবে এর বার্ধক্য-বিরোধী প্রভাবে অবদান রাখে। মেটফর্মিন এই কাজটি করে AMPK-নির্ভর PGC-1α  সংকেতপথের মাধ্যমে (Exp Mol Med, ২০২৪)। 


নোট: প্রবন্ধে বর্ণিত জিনগুলির পূর্ণ নামকরণ- 

AMPK: এএমপি-এক্টিভেটেড প্রোটিন কাইনেজ; IGF1: ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১; IGF1R: ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ রিসেপ্টর; IGFBP7: (ইনসুলিন-লাইক গ্রোথ ফ্যাক্টর-বাইন্ডিং প্রোটিন ৭); NPTX2: নিউরোনাল পেনট্র্যাক্সিন II; POT1: প্রটেকশন অব টেলোমেয়ার ১; RAP1: রিপ্রেসার/অ্যাক্টিভেটর প্রোটিন ১; TIN2: TERF1-ইন্টারঅ্যাক্টিং নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর ২; TPP1: TIN2-ইন্টারঅ্যাক্টিং প্রোটিন ১; TOM1L1: টার্গেট অব Myb1-লাইক ১ মেমব্রেন ট্রাফিকিং প্রোটিন; PGC-1α: পেরক্সিসোম প্রলিফেরেটর-এক্টিভেটেড রিসেপ্টর গামা কোঅ্যাক্টিভেটর ১-আলফা; TRF1: টেলোমেরিক রিপিট-বাইন্ডিং ফ্যাক্টর ১; TRF2: টেলোমেরিক রিপিট-বাইন্ডিং ফ্যাক্টর ২; TERT: টেলোমারেজ রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ।


সাহায্যকারী নোট:

গ্লিয়া (Glia): গ্লিয়া বা নিউরোগ্লিয়া (একবচন: গ্লিওসাইট) কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু) এবং পেরিফেরাল বা পার্শ্বীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরন ছাড়া অন্যান্য কোষগুলিকে বোঝায়, যা বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি করে না। নতুন গণনা পদ্ধতি (isotropic fractionators) ব্যবহার করে দেখা গিয়েছে যে, মানবমস্তিষ্কে গড়ে নিউরনের সমসংখ্যক প্রায় ১০০ বিলিয়ন গ্লিয়া কোষ রয়েছে। পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্রে, সোয়ান গ্লিয়া কোষ (Schwann cells) থেকে উদ্ভুত মায়েলিন আবরক হিসেবে নিউরনকে সুরক্ষা প্রদান করে। এছাড়াও, সেখানে রয়েছে উপগ্রহ গ্লিয়া কোষ (satellite cells)। পক্ষান্তরে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে মূলত অলিগোডেন্ড্রোসাইট (oligodendrocytes) গ্লিয়া কোষগুলির থেকে সৃষ্টি হয় মায়েলিন আবরক; এছাড়াও, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে রয়েছে অ্যাস্ট্রোসাইট (astrocytes), এপেনডাইমাল কোষ (ependymal cells) ও মাইক্রোগ্লিয়া (microglia) ধরনের গ্লিয়া কোষ। এছাড়া, মুলার কোষ নামক এক ধরনের বিশেষ গ্লিয়া কোষ মেরুদণ্ডী রেটিনায় পাওয়া যায়, যা অন্যান্য গ্লিয়া কোষের মতোই রেটিনার নিউরনগুলির জন্য সহায়ক কোষ হিসেবে কাজ করে। নিউরনের তুলনায় গ্লিয়া কোষগুলিতে অনেক বেশি কোষীয় বৈচিত্র্য এবং কার্যকারিতা রয়েছে এবং এই কোষগুলি বিভিন্নভাবে নিউরনের সংকেতসংবহন (নিউরোট্রান্সমিশন) নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে, তাদের পাঁচটি প্রধান কাজ হলো: ১) নিউরনকে ঘিরে রাখা এবং তাদের জায়গায় স্থিতিশীল রাখা; ২) নিউরনগুলিতে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করা; ৩)  নিরোধক হিসেবে পার্শ্ববর্তী নিউরনগুলিকে পৃথক রাখা; ৪) ফ্যাগোসাইটমূলক বৈশিষ্ট্য থাকায় জীবাণুকে ধ্বংস করা ও মৃত নিউরনকে অপসারণ করা; এবং ৫) অনাহার অবস্থায় মস্তিষ্কে কিটোন তৈরি করা। এছাড়াও, গ্লিয়া নিউরোট্রান্সমিশন ও সিন্যাপটিক সংযোগে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিতেও ভূমিকা পালন করে। গ্লিয়া কোষগুলি মস্তিষ্ক এবং মেরুরজ্জুর মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক। গ্লিয়া:নিউরন অনুপাত গড়ে প্রায় সমসংখ্যক থাকলেও, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে তাদের অনুপাতে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, সেরেব্রাল কর্টেক্সে গ্লিয়া:নিউরন অনুপাত হলো ৬১: ১৬ (বিলিয়ন কোষ), অর্থাৎ এই অঞ্চলে নিউরনের তুলনায় গ্লিয়া কোষ থাকে ৩.৭২ গুণ বেশি। যখন, সেরিবেলামে এর অনুপাত মাত্র ১৬:৬৯ (১৬.০৪ বিলিয়ন গ্লিয়া; ৬৯.০৩ বিলিয়ন নিউরন)। সাধারণতঃ গ্লিয়া কোষের ক্যানসারকে বলা হয় গ্লিয়োমা। 

নিউক্লিওটাইড: নিউক্লিওটাইড (Nucleotide): নিউক্লিওসাইড এবং ফসফেট সমন্বয়ে গঠিত এক ধরনের জৈব যৌগ হচ্ছে নিউক্লিওটাইড, যা নিউক্লিয়িক অ্যাসিড পলিমার ‘ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়িক অ্যাসিড (ডিএনএ)’ ও ‘রাইবোনিউক্লিয়িক অ্যাসিড (আরএনএ)’-এর মনোমার একক হিসেবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, ডিএনএ ও আরএনএ উভয়ই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের মধ্যে অপরিহার্য একটি জৈব অণু। খাদ্যের মাধ্যমে নিউক্লিওটাইড পাওয়া যায় এবং সাধারণ পুষ্টি উপাদান থেকে যকৃতে নিউক্লিওটাইড সংশ্লেষিত হয়। নিউক্লিওটাইড তিনটি সাবইউনিট অণুর সমন্বয়ে গঠিত: একটি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক (নিউক্লিওবেস নামেও পরিচিত), একটি ৫-কার্বন বিশিষ্ট চিনি (রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ) এবং একটি ফসফেট গ্রুপ (ছবি দেখুন)। ডিএনএ-এর চারটি নাইট্রোজেন নিউক্লিওবেস হলো গুয়ানিন, অ্যাডেনিন, সাইটোসিন ও থাইমিন; আরএনএ অণুতে, থাইমিনের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয় ইউরাসিল।

নিউক্লিওটাইড তিনটি সাবইউনিট অণুর সমন্বয়ে গঠিত: একটি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক (নিউক্লিওবেস নামেও পরিচিত), একটি ৫-কার্বন বিশিষ্ট চিনি (রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ) এবং একটি ফসফেট গ্রুপ

অ্যাপোপ্টোসিস (Apoptosis): বহুকোষী দেহে যে কোষগুলির আর প্রয়োজন নেই বা জীবের জন্য হুমকিস্বরূপ, সেগুলি প্রাকৃতিকভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত কোষ-আত্মঘাতী প্রক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে যায়, যা ‘পরিকল্পিত কোষমৃত্যু’ (programmed cell death) বা অ্যাপোপ্টোসিস নামে পরিচিত। এটি একটি জিন-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। এই কোষপতন প্রক্রিয়ায় কোষ-সংকুচিতকরণ, ক্রোমাটিন ঘনীভূতকরণসহ কোষের সাইটোস্কেলটন (cytoskeleton), নিউক্লীয় ঝিল্লি (nuclear membrane) এবং ক্রোমোজোমীয় ডিএনএ টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। অ্যাপোপ্টোসিসের কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি (৫০-৭০ বিলিয়ন) কোষ মারা যায়। বহুকোষী জীবে অ্যাপোপ্টোসিস একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানবভ্রূণ বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্রূণের হাত এবং পায়ের আঙুলগুলির (বিশেষ করে পায়ের আঙ্গুল) মধ্যবর্তী পাতলা সংযোজক (web) বা ভ্রূণে লেজের উপস্থিতি পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হয় অ্যাপোপ্টোসিসের মাধ্যমে। এছাড়াও, মেরুদণ্ডীপ্রাণির স্নায়ুতন্ত্রে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি স্নায়ুকোষ সৃষ্টি হওয়ায় স্নায়ুতন্ত্রের অর্ধেক বা তার বেশি নিউরন অ্যাপোপ্টোসিসের মাধ্যমে পরবর্তী পর্যায়ে বিলুপ্ত করতে হয়।

আণবিকভাবে, অ্যাপোপ্টোসিসের সূচনা দুই পথে হতে পারে: ১) অন্তর্মুখী (intrinsic) বা মাইটোকন্ড্রীয় পথে, যেখানে কোষটি নিজেই নিজেকে হত্যা করে। বিসিএল-২ (BCL-2) প্রোটিন পরিবার (BAK ও BAX) ও মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে সাইটোপ্লাজমে বেরিয়ে আসা সাইটোক্রোম সি (cytochrome c) এবং পরবর্তীতে ক্যাসপেজ (caspase)-৩ ও ক্যাসপেজ-৯ এর সক্রিয়করণ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত; ২) বহির্মুখী/বহিঃস্থ (extrinsic) পথে একটি কোষ নিকটবর্তী কোষ থেকে আগত সংকেতের কারণে নিজেকে হত্যা করে। উভয় পথেই বিভিন্ন ক্যাস্পেজ নামের প্রোটিয়েজ (protease) উৎসেচকের এক সারি (ক্যাস্পেজ ২, ৩, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ এবং ১২) পর্যায়ক্রমে সক্রিয় হয়ে কোষের এই ধরনের মৃত্যু ঘটায়। ত্রুটিপূর্ণ কোষপতন প্রক্রিয়া বিভিন্ন ধরনের রোগের সাথে জড়িত হতে দেখা গিয়েছে। অতিরিক্ত কোষপতন দেহে ক্ষয় তৈরি করে, আর অপর্যাপ্ত কোষপতন কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটিয়ে ক্যান্সার তৈরি করতে পারে।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
জনপ্রিয়

ডিএনএ-এর জৈবিক ঘড়ি দীর্ঘায়ু ও বয়সের রহস্য

টেলোমেয়ার— বার্ধক্য পরিমাপের একটি প্রতিশ্রুতিশীল সূচক

০৬:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫

আমরা সবাই চাই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন। কিন্তু আমাদের শরীর কীভাবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের আয়ু নির্ধারণ করে? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের কোষের গভীরে, ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে। এগুলি হলো টেলোমেয়ার, যা দেখতে অনেকটা জুতোর ফিতের শেষ অংশের প্লাস্টিক ক্যাপের মতো। এই টেলোমেয়ারগুলো আমাদের ডিএনএ-কে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে সাথে এরা ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি আমাদের শরীরের জন্য একটি জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও বয়স-সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগের সূচনা করে। আপনার শরীর কেন বুড়িয়ে যায়? টেলোমেয়ার কীভাবে জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে এবং বার্ধক্য, রোগ ও দীর্ঘায়ুর সাথে এর সম্পর্ক কী তা জানুন। এই নিবন্ধে, আমরা টেলোমেয়ারের রহস্যময় জগতটি অন্বেষণ করব। আমরা জানব কীভাবে এটি বার্ধক্যকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, এবং আধুনিক বিজ্ঞানে এটি কীভাবে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।


টেলোমেয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে অবস্থিত পুনরাবৃত্তিমূলক ডিএনএ সিকোয়েন্স বা প্রতিরক্ষামূলক ক্যাপ যা প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে সাথে ছোট হয়ে যায়। এগুলি কোষের বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণকারী জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে। যখন টেলোমেয়ারগুলি অত্যন্ত ছোট হয়ে যায়, তখন কোষগুলি বিভাজন বন্ধ করে দেয়, প্রবেশ করে স্থায়ী বৃদ্ধি স্থবিরতার একটি অবস্থায় যাকে বার্ধক্য বলা হয়, অথবা কোষগুলি মারা যায়। এই প্রক্রিয়াটি সামগ্রিক বার্ধক্য, টিস্যুর অবক্ষয় এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের সূত্রপাত ঘটায়। 

বিষয়: অণুপ্রাণ বিজ্ঞান, ডিএনএ, টেলোমেয়ার, জেরোন্টোলজি, বার্ধক্য।

ভূমিকা

১৯০০ সালে, বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৩১ বছর, যা আজকের বিশ্বব্যাপী গড় আয়ুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।  জাতিসংঘের মতে, ২০২৪ সালে, বিশ্বব্যাপী মানুষের আয়ু এসে পৌঁছেছে ৭৩ বছরেরও বেশি। এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র উন্নত দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এশিয়াসহ সমস্ত বিশ্ব অঞ্চলে ঘটেছে, যা ১৯৫০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে আয়ুষ্কাল ২৫ বছরেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য হ্রাস বিশ্বব্যাপী আয়ু বৃদ্ধিতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও, ভ্যাকসিন, অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ এবং চিকিৎসার মতো ক্ষেত্রগুলির উন্নতিও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে শতাব্দীর প্রথম দিকে। যদিও স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আয়ুবৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রয়েছে যে সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতা, বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই দু’য়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নতি হয়নি। এই বৈষম্যের কারণ হল, স্বয়ং বার্ধক্য অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ, যা আয়ুষ্কাল এবং জীবনের মান উভয়কেই সীমিত করে। গত কয়েক দশক ধরে জৈবিক বার্ধক্যের একটি নির্ভরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট প্রচেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে, জিনোমীয় (জিনোম হলো একটি কোষের সম্পূর্ণ ডিএনএ সেট এবং তাদের সমষ্টিগত তথ্য) অস্থিরতা, কোষীয় বার্ধক্য, ডিএনএ মিথিলেশন (মিথাইল-CH3 গ্রুপের সংযুক্তি), প্রোটিওস্ট্যাসিস (প্রোটিন হোমিওস্ট্যাসিস) এবং মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতার মতো বার্ধক্য-সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলিকে চিহ্নিত করার পরিমিতি রয়েছে। তবে, উপরের কোনও পরিমাপ জৈবিক বয়সের একটি সম্পূর্ণ পরিমাপের প্রতিনিধিত্ব করে না। জৈবিক বয়স, যা বয়স-সম্পর্কিত অবক্ষয়ের হার প্রতিফলিত করে, তা পরিমাপের সঠিক সূচক কী হতে পারে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও জৈবিক বয়স মূল্যায়নের জন্য কিছু প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি যেমন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ বা ডিএনএ মিথিলেশন, ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সর্বোপরি, টেলোমেয়ার যেহেতু বার্ধক্যের সাথে সরাসরি সংযুক্ত, তাই এটিকে বার্ধক্যের বায়োমার্কার হিসেবে ব্যবহার করার উপযোগী করে তুলেছে।

টেলোমেয়ার কী ?

টেলোমেয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে একধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক “TTAGGG” ডিএনএ অনুক্রম, যা বিশেষ ছয়টি প্রোটিনের একটি কমপ্লেক্স “শেল্টেরিন” (TRF1, TRF2, TIN2, POT1, TPP1, RAP) দ্বারা আবদ্ধ থাকে। এদের স্যাটেলাইট (satellite) ডিএনএ-ও বলা হয়। এখানে উল্লেখ্য, ডিএনএ-র টেলোমেরিক অঞ্চলটি কোনও প্রোটিনের জন্য কোডিং বা সংকেত বহন করে না; এটি কেবল রৈখিক (linear) প্রকৃতকোষীয় (ইউক্যারিওট) ক্রোমোজোমের শেষ অঞ্চলে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক কোড, যা ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলিকে সুরক্ষা দেয়। ধারাবাহিক বেশ কিছু কোষ বিভাজনের পর, টেলোমেয়ারগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈর্ঘ্যে পৌঁছায় এবং বিভাজন বন্ধ হয়ে কোষটি বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পৌঁছে। অর্থাৎ, প্রতিটি কোষ বিভাজন/প্রতিলিপির সাথে, সোমাটিক বা দেহ কোষের টেলোমেয়ারগুলি ক্রমশ ছোট (সংক্ষিপ্ত) হতে থাকে (ছবি দেখুন) এবং খুব সংক্ষিপ্ত টেলোমেয়ার পি-৫৩ (p-53)-নির্ভর ডিএনএ ক্ষতির প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা ধীর পরিবর্তনের সাথে টিস্যুতে অ্যাপোপটোসিস (কোষের আত্মহত্যা) এবং বার্ধক্যের সূত্রপাত ঘটায়। জন্মকালে, শিশুদের ক্রোমোজোমের টেলোমেয়ারে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ নিউক্লিওটাইড থাকে, যেখানে বয়বৃদ্ধের ডিএনএ-তে দেখা যায় মাত্র ১,৫০০ নিউক্লিওটাইড। অর্থাৎ, ডিএনএ পলিমারেজ (যে এনজাইমটি ডিএনএ এর কপি বা অনুলিপন ঘটায়) এনজাইমটির অপারগতার কারণে, প্রতিটি সোমাটিক কোষ বিভাজন চক্রে টেলোমেয়ারগুলি ৫০-২০০ টি নিউক্লিওটাইড দ্বারা সংক্ষিপ্ত হতে থাকে । টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।
টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য এএবং এর সংক্ষিপ্তকরণের পুরো প্রক্রিয়া বংশগতভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়, সাথে পরিবেশগত কিছু প্রভাবও রয়েছে।

টেলোমেয়ার একটি বিস্তৃত জেনেটিক বৈশিষ্ট্য যা সাধারণত অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী জীবের (ইউক্যারিওট) জিনোমে পাওয়া যায়, ব্যাকটেরিয়া বা আদিকোষীয় জীবের (প্রোক্যারিওটিক) জিনোমে নয়— কারণ অধিকাংশ আদিকোষীয় ক্রোমোজোম রৈখিক নয়, বরং গোলাকার। টেলোমেয়ারগুলি ক্রমাগত অবক্ষয় থেকে ক্রোমোজোম-ডিএনএ এর প্রান্তীয় অঞ্চলগুলিকে রক্ষা করে; পক্ষান্তরে, এটি ক্রোমোজোমের প্রতিরক্ষাও দেয়, দমন করে প্রান্তীয় রিকম্বিনেশন (recombination) এবং নিশ্চিত করে ক্রোমোজোমের অখণ্ডতা। এছাড়া, টেলোমেয়ারের কারণে ক্রোমোজোমের প্রান্তগুলি একসাথে আটকে যাওয়া বা আন্তঃক্রোমোজোমীয়  ফিউশন থেকে বিরত থাকে। ডিএনএ পলিমারেজ ক্রোমোজোমের একেবারে প্রান্তে, অর্থাৎ টেলোমেয়ার ডিএনএ-কে সম্পূর্ণরূপে অনুলিপি করতে সক্ষম নয়। তাই, ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি,  প্রতিটি কোষ চক্রের সময় প্রায় ৫০ – ২০০টি নিউক্লিওটাইড হারিয়ে যায়, যার ফলে ধীরে ধীরে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে। যখন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমার নীচে পৌঁছে যায়, তখন কোষগুলিতে বার্ধক্য নেমে আসে এবং অবশেষে মারা যায়। অপরদিকে, টেলোমেরেজ হল বিশেষায়িত একটি এনজাইম যা নতুন টেলোমেয়ারকে সংশ্লেষ করে। এই এনজাইমটি (যার মূল অংশ হল টেলোমেরেজ রিভার্স ট্র্যাক্রিপ্টেজ/TERT প্রোটিন) ক্রোমোজোমের প্রান্তে ‘TTAGGG’ পুনরাবৃত্তি যোগ ক’রে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখে। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে, জন্মের পরে, একজন ব্যক্তির দেহ কোষগুলিতে টেলোমেরেজ নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনটির সংশ্লেষ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ব্যতিক্রম শুধু জননকোষ, স্টেম কোষ, নিউরাল স্টেম কোষ এবং ক্যান্সার কোষ, যেখানে ক্রোমোজোমপ্রান্তে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য ছোট হয় না। এখানে উল্লেখ্য, মানবমস্তিষ্কের নিউরন কোষে টেলোমেরের দৈর্ঘ্য ‘গ্লিয়া কোষ’ (নিউরন ছাড়া মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষ) এবং দেহ কোষের চেয়ে বেশি। তাই, মস্তিষ্কে নিউরন-কোষগুলির টেলোমেয়ারের ক্ষয়ক্ষতির হার অন্যান্য টিস্যুর তুলনায় অনেক ধীর। 

কোষের আয়ুষ্কাল এবং হেইফ্লিক ফেনোমেনন 

কোষের ধরন এবং শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতার উপর নির্ভর ক’রে কোষের আয়ুষ্কাল ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। মানবদেহের সমস্ত কোষের গড় বয়স প্রায় ৭ থেকে ১০ বছর হতে পারে, তবে এর অর্থ এই নয় যে, সমস্ত কোষ সেই সময়সীমার মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয় — যেমন লোহিত রক্তকণিকার আয়ুষ্কাল হল ~১২০ দিন, শ্বেত রক্তকণিকা ~১৩ দিন এবং যকৃত কোষ ~১৮ মাস। কিন্তু, হৃদপিণ্ডের কোষগুলি (কার্ডিওমায়োসাইট) বা অস্থি মজ্জার কোষগুলি (হেমাটোপয়েটিক কোষ) কয়েক দশক ধরে বেঁচে থাকতে পারে, আর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের কোষগুলি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকে। বিশেষ ধরনের কিছু কোষ যেমন- স্টেম কোষ, জীবাণু কোষ এবং ক্যান্সার কোষ টেলোমেরেজ নামক একটি এনজাইম প্রকাশ করে বলে তারা টেলোমেয়ার পুনর্নির্মাণ করতে পারে, যা ওই কোষগুলিকে আরও অনেক বার বা এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভক্ত করতে দেয়। সাধারণভাবে, স্বাভাবিক মানুষের দেহ (সোমাটিক) কোষ প্রায় ৪০ থেকে ৬০ বার ডিএনএ কপি এবং কোষ বিভাজন করতে পারে, কিন্তু টেলোমেয়ার ক্রমশ ছোট হয়ে যাবার কারণে, পরবর্তীতে তারা আর বিভক্ত হতে পারে না। যখন টেলোমেয়ার খুব ছোট হয়ে যায়, তখন কোষগুলি বার্ধক্যে পৌঁছায়, তারা বিভাজন বন্ধ করে দেয় এবং অবশেষে মারা যায়। ভাবুন তো, যদি একটি দেহের সামগ্রিক কোষসমূহ যখন মারা যেতে থাকে, তখন আমরাই বা বাঁচি কী করে! আমাদের মরলোক ছেড়ে যেতে হয়।

একটি কোষ যে অমর নয়, অর্থাৎ একটি কোষ যে অনন্তকাল ধরে বিভাজিত হতে পারে না, এই ধারণাটি প্রথমে দিয়েছিলেন মার্কিন অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ/অ্যানাটমিস্ট লিওনার্ড হেইফ্লিক ১৯৬১ সালে। কোষ বিভাজনের এই সীমিত ক্ষমতাকে ‘হেইফ্লিক সীমা’ বলা হয়। মূলত, হেইফ্লিক সীমা হল একটি অন্তর্নির্মিত প্রক্রিয়া যা একটি সোমাটিক কোষ কতবার বিভক্ত হতে পারে তা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং এই সীমা কোষীয় বার্ধক্য এবং রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, হেইফ্লিক তার আবিষ্কারকে কোষীয় স্তরে বার্ধক্য বলে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু কোষগুলির সামগ্রিক বার্ধক্য একটি জীবের সামগ্রিক শারীরিক বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, হেইফ্লিক সীমা বস্তুত ক্রোমোজোমের শেষপ্রান্তে অবস্থিত টেলোমেয়ার অঞ্চলের দৈর্ঘ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত— অর্থাৎ, টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়াটি এই সীমাবদ্ধতার জন্য মূলত দায়ী। টেলোমেয়ারগুলি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়ে গেলে, কোষটি বার্ধক্যের একটি অবস্থায় প্রবেশ করে, যেখানে এটি আর বিভক্ত হতে পারে না, যদিও স্বল্পসময়ের জন্য বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় থাকে। কিছু ক্ষেত্রে, কোষগুলি হেইফ্লিক সীমাতে পৌঁছালে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে প্রোগ্রামকৃত কোষমৃত্যু (অ্যাপোপটোসিস) প্রক্রিয়ায় কোষটির মৃত্যু হতে পারে। ‘হেইফ্লিক সীমা’ ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিভাজন থেকে বিরত রেখে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তবে, এই সীমা স্টেম বা ক্যান্সার কোষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যার টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখার এবং আরও বেশি বার বিভক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। 

ডিএনএ মেরামতে ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের যোগসূত্র

টেলোমেয়ারের ক্রমান্বয় সংক্ষিপ্তকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের ব্যর্থতা এবং বার্ধক্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র রয়েছে। এর ফলে আমাদের জিনোমে অস্থিরতা দেখা দেয়। আমাদের জিনগত তথ্য বহনকারী অণুডিএনএ’ ক্রমাগতভাবে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া যেমন, বিপাকের উপজাত এবং বাহ্যিক কারণ (অতিবেগুনি বিকিরণ, বিষাক্ত পদার্থ) উভয়ের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিপাক হল পুষ্টিকে শক্তি এবং ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত করার একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। কিন্তু, বিপাকের সময় কিছু উৎপন্ন উপজাত ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে। এর মধ্যে ‘হাইড্রোক্সিল র‌্যাডিক্যাল’ (অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাসায়নিক উপাদান), অ্যালকাইলেটিং এজেন্ট যেমন, ক্যান্সার থেরাপিউটিক এজেন্ট (ক্লোরামবিউসিল), এবং অ্যালডিহাইডের মতো প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি (ROS/আরওএস) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরওএস সরাসরি ডিএনএ বেস/নিউক্লিওটাইড এবং শর্করাকে জারিত করতে পারে, অন্যদিকে অ্যালকাইলেটিং এজেন্ট ডিএনএ বেসগুলিতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং অ্যালডিহাইড ডিএনএ ক্রসলিংক তৈরি করতে পারে। ডিএনএ ক্রস-লিঙ্কিং হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাসায়নিক এজেন্টরা ডিএনএ-তে দুটি নিউক্লিওটাইডের মধ্যে সমযোজী বন্ধন তৈরি করে, হয় একই স্ট্র্যান্ডের (ইন্ট্রাস্ট্র্যান্ড) মধ্যে অথবা দ্বিসূত্রক হেলিক্সের বিপরীত স্ট্র্যান্ডের (ইন্টারস্ট্র্যান্ড) মধ্যে। এটি ডিএনএ অনুলিপন এবং প্রতিলিপনের (ট্রান্সক্রিপশন) মতো গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় প্রক্রিয়াগুলিকে ব্যাহত করে , ফলে কোষের মৃত্যু হতে পারে।  

এখানে উল্লেখ্য, জিনোমের অখণ্ডতা এবং কোষীয় স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএর মেরামত অপরিহার্য। কারণ, ডিএনএ মেরামতের প্রতিবন্ধকতা বা ব্যর্থতা অকাল বার্ধক্যজনিত সিন্ড্রোম (যেমন: ককেইন সিন্ড্রোম, ওয়ার্নার সিন্ড্রোম এবং হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোম), স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ, হৃদরোগ এবং অঙ্গের কার্যকারিতায় বয়সসম্পর্কিত হ্রাসের দিকে পরিচালিত করতে পারে। তবে, এই ক্ষতিগুলি মোকাবেলা করার জন্য কোষগুলিতে বিভিন্ন ডিএনএ মেরামতের আণবিক কৌশল রয়েছে। এই কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে বেস এক্সিশন মেরামত (BER), নিউক্লিওটাইড এক্সিশন মেরামত (NER), ডিএনএ অমিল/মিসম্যাচ মেরামত (MMR), এবং ডাবলস্ট্র্যান্ড ব্রেক মেরামত (DSBR) তবে, এটিও সত্য যে জীবের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে, ক্ষুদ্র টেলোমেয়ার কোষীয় বা প্রতিলিপিমূলক বার্ধক্যে অবদান রাখে, যা শারীরিক বার্ধক্যের একটি বৈশিষ্ট্য, এবং এটি ডিএনএ মেরামতের কৌশলগুলির দক্ষতা হ্রাস করে, যা জিনোমের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য ক্যান্সার বিকাশের দিকে পরিচালিত করে।  

টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা কি নানা রোগের সাথেও সম্পর্কিত?

টেলোমেয়ার প্রতিটি কোষ বিভাজনের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষিপ্ত হয় এবং এই সংক্ষিপ্তকরণ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলিতে, সংক্ষিপ্ত টেলোমেয়ার হৃদরোগ (যেমন-এথেরোস্ক্লেরোসিস, স্ট্রোক, করোনারি ধমনি রোগ, মায়োকার্ডিয় ইনফার্কশন) এবং ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। সংক্ষিপ্ত এবং অকার্যকর টেলোমেয়ার পালমোনারি ফাইব্রোসিস, লিভার সিরোসিস এবং অন্যান্য লিভার রোগের সাথেও সম্পর্কিত। গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, ছোট টেলোমেয়ার যে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ তা ইনসুলিন/ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ (IGF1)-মধ্যস্থ সংকেতপথের মাধ্যমে ঘটে। বিপরীতে, যদিও ইনসুলিন-লাইক গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ রিসেপ্টর (IGF1R) স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু হ্রাসকৃত IGF1R সংকেত মানুষের আয়ুবৃদ্ধি এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়েছে (Front Endocrinol, ২০১৯)। বর্ধিত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মাধ্যমে ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়া (যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বৈশিষ্ট্য) টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণকে ত্বরান্বিত করে, যা IGF1R রিসেপ্টর এবং তার নিম্নগামী প্রভাবক FOXO3A (ফর্কহেড বক্স প্রোটিন O) ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরকে বাধা দিয়ে টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়াটিকে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। 

টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণ এবং পরবর্তী ডিএনএ ক্ষতির রেসপন্স বা প্রতিক্রিয়া (DDR/ডিডিআর) বার্ধক্য এবং ক্যান্সার বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই ভূমিকা পালন করে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোষের নজরদারি ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ টেলোমেয়ার-কে যা ডিএনএ-র ক্ষতি সাধন করতে পারে, তা p53-সংকেতপথের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। ফলে কোষ চক্র বন্ধ হয়ে যায় বা এমনকি কোষের মৃত্যুও ঘটে। যদি ক্ষুদ্র টেলোমেয়ারযুক্ত কোষগুলি ডিডিআর প্রতিক্রিয়াকে উপেক্ষা করে বিভাজন চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে জিনোমিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলস্বরূপ, ক্রোমোজোম ফিউশন, ব্রেকেজ-ফিউশন-ব্রিজ চক্র এবং অন্যান্য জিনোমের পুনর্বিন্যাস হতে পারে, যা ক্যান্সার বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। যদিও টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য রোগ-ঝুঁকির একটি কারণ, তবে এটি একমাত্র নির্ধারক নয়। অন্যান্য জিনগত এবং পরিবেশগত কারণগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

ডিএনএ মিথিলেশন বার্ধক্যের একটি সম্ভাব্য বায়োমার্কার

বার্ধক্যের প্রেক্ষাপটে, ডিএনএ মিথিলেশন এবং টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। সহজ ভাষায়, ডিএনএ মিথিলেশন হল এমন একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেখানে মিথাইল গ্রুপ (CH3) নামক একটি ছোট রাসায়নিক ট্যাগ (যা একটি কার্বন পরমাণু এবং তিনটি হাইড্রোজেন পরমাণু নিয়ে গঠিত) ডিএনএ-র ‘সাইটোসিন’ বেসগুলিতে যুক্ত করা হয়। ‘ডিএনএ মিথাইলট্রান্সফেরেজ’ নামক একটি এনজাইম এই ট্যাগটি করে দেয়। এই ট্যাগিং পদ্ধতির মাধ্যমে, অন্তর্নিহিত ডিএনএ কোড পরিবর্তন না করেই, একটি জিনের প্রকাশ সাধারণত ‘দমন’ করা যেতে পারে। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, ডিএনএ মিথিলেশন হল জিনপ্রকাশ দমনের একটি বিবর্তনীয়ভাবে সংরক্ষিত রূপ, যা আদিকোষীয় ও প্রকৃতকোষীয় উভয় ধরনের জিনোমের বর্ণালীতে বিদ্যমান। প্রসঙ্গত, ভিন্ন একটি এনজাইম (TET- টেন-ইলেভেন ট্রান্সলোকেশন এনজাইম) দ্বারা মিথাইল গ্রুপটি অপসারণের মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে ওই জিনের প্রকাশকে আবারও ‘চালু’ করা হয়ে থাকে। ডিএনএ মিথিলেশন অনেক জৈবিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে কোষের বিকাশ, পার্থক্য এবং জিনের প্রকাশ। ডিএনএ মিথিলেশন, এসিটিলেশন, হিস্টোন প্রোটিনের পরিবর্তন ইত্যাদি নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ডিএনএ অণুতে সংযুক্ত হয়ে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে একটি জিনের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হতে পারে— জিনগুলি কখনও সক্রিয়, অতিসক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। আবার, কিছু এপিজেনেটিক চিহ্ন উত্তরাধিকার সূত্রেও প্রাপ্ত হতে পারে। জেনেটিক্সের যে শাখাটি এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে, তাকে বলা হয়”এপিজেনেটিক্স”। যাইহোক, ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে জৈবিক বয়সও পরিমাপ করা যায়। এই প্যাটার্নগুলি বয়সের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং আণবিক স্তরে কারও শরীরের বয়স কত তা অনুমান করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডিএনএ মিথিলেশনের পরিবর্তনগুলি প্রকৃতপক্ষে বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিবর্তনগুলি একটি সু-নথিভুক্ত এপিজিনগত পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া যা সারা জীবন ধরে ঘটে। পরিবেশগত ও জিনগত কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্নগুলি ব্যক্তিদের মধ্যে বার্ধক্যের সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিবর্তনগুলি এলোমেলো ঘটে না, ডিএনএ-র নির্দিষ্ট সিপিজি (CpG sites) স্থানগুলিতে (যেখানে একটি সাইটোসিন বেসের পরে একটি গুয়ানিন বেস থাকে) বয়সের সাথে পুনরুৎপাদনযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় বলে জানা যায়। সাধারণত, বার্ধক্য সামগ্রিক ডিএনএ মিথিলেশন হ্রাসের (হাইপোমিথিলেশন) সাথে সম্পর্কিত, তবে নির্দিষ্ট অঞ্চলে, বিশেষ করে ‘সিপিজি’ গুচ্ছগুলিতে মিথিলেশন বৃদ্ধির সাথেও সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ- EDARADD, TOM1L1, এবং NPTX2 জিনে CpG-এর মিথিলেশন বিশেষভাবে বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত। ডিএনএ মিথিলেশনের এই পরিবর্তনগুলি জিনের প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে কোষীয় কর্মহীনতার দিকে পরিচালিত করে এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া ও ক্যান্সার, হৃদজনিত রোগ, স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ-সহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে অবদান রাখতে পারে। জৈবিক বয়সের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্যও ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বয়স-সম্পর্কিত এসব ডিএনএ মিথিলেশনের পরিবর্তন পূর্বাভাসযোগ্য প্যাটার্ন অনুসরণ করে, যা এপিজেনেটিক ক্লক বা “ডিএনএ মিথিলেশন ঘড়ি” তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট সিপিজি সাইটগুলিতে ডিএনএ মিথিলেশন প্যাটার্নের উপর ভিত্তি করে এই ঘড়িগুলি সঠিকভাবে কালানুক্রমিক বয়স এবং কিছু ক্ষেত্রে জৈবিক বয়সের পূর্বাভাস দিতে পারে।

বলা বাহুল্য, টেলোমেয়ার সংক্ষিপ্তকরণ এবং ডিএনএ মিথিলেশনে পরিবর্তন উভয়ই বার্ধক্যজনিত রোগের বিকাশে জড়িত। এখানে বলা প্রয়োজন যে, সাধারণভাবে জিনোমের যে অঞ্চলগুলিতে CpG থাকে কেবল সেগুলিই সরাসরি মিথিলেশনের জন্য সংবেদনশীল। স্তন্যপায়ীর টেলোমেয়ারে CpG অঞ্চল থাকে না, ফলে এই অঞ্চলটি সরাসরি ডিএনএ-মিথিলেশন থেকে মুক্ত বলে মনে করা হয়। তবে, সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে (টেলোমেয়ার সংলগ্ন এলাকা) ডিএনএ মিথিলেশন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ক্ষুদ্র টেলোমেয়ার-বিশিষ্ট ডিএনএ-এর সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে হাইপারমিথিলেশন ঘটে, যা বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। বিপরীতে, হাইপোমিথিলেশন বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। প্রসঙ্গত, সাবটেলোমেরিক অঞ্চল হল টেলোমেয়ার সংলগ্ন ডিএনএ ক্রম, যা ক্রোমোজোমের স্থিতিশীলতা এবং কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সাবটেলোমেরিক অঞ্চলগুলিতে অবস্থান করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিন, তম্মধ্যে একটি হল টেলোমেরেজ রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ (TERT), যার কোডে বা সংকেতে সংশ্লেষিত হয় ‘টেলোমেরেজ’ এনজাইম। মানব ৫-নম্বর ক্রোমোজোমের সাবটেলোমেরিক অঞ্চলে এই জিনটি অবস্থান করে। কথিত “টেলোমেয়ার পজিশন এফেক্ট” অনুযায়ী, দীর্ঘ টেলোমেয়ার মানব ‘TERT’ অভিব্যক্তিকে দমন করে, কিন্তু ছোট টেলোমেয়ারগুলি, বিশেষকরে ক্যান্সার কোষে, এই এনজাইমটিকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে।

টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ এবং লৈঙ্গিক পার্থক্য

নারীদের টেলোমেয়ার সাধারণত পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘ থাকে। এই পার্থক্যটি মূলত ইস্ট্রোজেনের মতো হরমোনজনিত কারণগুলির সাথে যুক্ত। ইস্ট্রোজেন হরমোন টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপকে উদ্দীপিত করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস ক’রে টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে (Aging Cell. ২০২২)। পুরুষদের ক্ষেত্রে, বিশেষকরে কিছু কিছু টিস্যুতে, কোষ বিভাজনের সম্ভাব্য উচ্চ হার  এবং ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য কমাতে অবদান রাখতে পারে। উপরন্তু, নারীদের মধ্যে এক্স (X) ক্রোমোজোমে অবস্থিত DKC1 এর মতো জিনের দ্বি-অ্যালিলিক প্রকাশ (অর্থাৎ, জিনের উভয় কপি (অ্যালিল) সক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়) টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি ক’রে সম্ভাব্যভাবে টেলোমেয়ারের দীর্ঘতা ধরে রাখে। প্রসঙ্গত, DKC1 জিন ‘ডিস্কেরিন’ প্রোটিন তৈরির জন্য নির্দেশনা প্রদান করে, যা টেলোমেরেজ সক্রিয় রাখার এবং রাইবোজোমীয় আরএনএ (rRNA) একত্রিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিস্কেরিন টেলোমেরেজ কমপ্লেক্সকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে, যা কোষ বিভাজনের সময় টেলোমেয়ারকে ছোট হওয়া থেকে রক্ষা করে।

উপসংহার

টেলোমেয়ার  হলো বার্ধক্য পরিমাপের একটি প্রতিশ্রুতিশীল সূচক। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি প্রকৃতকোষীয় (মেরুদন্ডী ও অমেরুদন্ডী) জীবের জন্য এটি গ্রহণযোগ্য। যেমন, সিশেল (Seychelles) বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের কচ্ছপগুলি প্রায় ২০০-২৫০ বছর বাঁচে, কিংবা “কুয়াহগ” জাতীয় একধরনের সামুদ্রিক ঝিনুক ৪০০ বছর এবং সামুদ্রিক লবস্টার ১৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মানুষের তুলনায় তাদের সুদীর্ঘ টেলোমেয়ার এবং তার অবক্ষয়ের ধীর গতি-ই হল দীর্ঘায়ুর মূল কারণ। মানুষের টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণের হারকে বার্ধক্যসহ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, যাদের টেলোমেয়ারের আকার ছোট,  তাদের রোগব্যাধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে এটিও প্রসঙ্গত যে, টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য জিনগত এবং এপিজিনগত ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হলেও, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ক্ষতিকারক পদার্থের সংস্পর্শের মতো জীবনধারাগুলিও টেলোমেয়ারের ক্ষয়ের হার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টেলোমেরেজ, যে এনজাইমটি টেলোমেয়ারের সঠিক দৈর্ঘ বজায় রাখে বা টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্তকরণকে প্রতিরোধ করে, তা বার্ধক্যকালীন সময়ে দেহকোষগুলিতে সংশ্লেষণ হয় না বল্লেই চলে। কাজেই বয়সকে ধরে রাখার জন্য টেলোমেয়ার যেহেতু বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সাথে স্পষ্টভাবে যুক্ত, তাই কোষে বার্ধক্য-প্রতিরোধী থেরাপির প্রেক্ষাপটে টেলোমেরেজ প্রবর্তন বা টেলোমেরেজকে সক্রিয় করে সুস্থ বার্ধক্যের এবং সম্ভাব্য আয়ুবৃদ্ধির জন্য প্রতিশ্রুতিশীল উপায় প্রদান করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুরের উপর করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, টেলোমেরেজ এনজাইমের কার্যকলাপ বৃদ্ধি জীবনকাল বৃদ্ধি করতে পারে এবং হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও হাড়ের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির উন্নতি করতে পারে (EMBO Mol Med, ২০১২; Nature, ২০২২; PLoS Genet. ২০১৮)। টেলোমেরেজ এনজাইমকে সম্ভাব্য থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার আগে, টেলোমেয়ার, বার্ধক্য এবং ক্যান্সারের মধ্যে জটিল যে সম্পর্ক তা আরও ভালভাবে বোঝা দরকার। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলি সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এছাড়াও, সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি আশাব্যাঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে প্রমাণ মিলেছে যে,  মেটফর্মিন টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্যের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, ডায়াবেটিস নিরাময়ে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত এই ওষুধ “মেটফরমিন” টেলোমেয়ারের সংক্ষিপ্ততা রোধ করতে সাহায্য করে। আগেই উল্লেখ করেছি, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর টেলোমেয়ার হল বার্ধক্যের একটি লক্ষণ এবং বয়স-সম্পর্কিত রোগের বিশেষ একটি কারণ। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, মেটফর্মিন চিকিৎসা টেলোমেরেজ এনজাইমকে সক্রিয় ক’রে দীর্ঘতর টেলোমেয়ার তৈরি করতে সক্ষম, যা সম্ভাব্যভাবে এর বার্ধক্য-বিরোধী প্রভাবে অবদান রাখে। মেটফর্মিন এই কাজটি করে AMPK-নির্ভর PGC-1α  সংকেতপথের মাধ্যমে (Exp Mol Med, ২০২৪)। 


নোট: প্রবন্ধে বর্ণিত জিনগুলির পূর্ণ নামকরণ- 

AMPK: এএমপি-এক্টিভেটেড প্রোটিন কাইনেজ; IGF1: ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১; IGF1R: ইনসুলিন গ্রোথ ফ্যাক্টর ১ রিসেপ্টর; IGFBP7: (ইনসুলিন-লাইক গ্রোথ ফ্যাক্টর-বাইন্ডিং প্রোটিন ৭); NPTX2: নিউরোনাল পেনট্র্যাক্সিন II; POT1: প্রটেকশন অব টেলোমেয়ার ১; RAP1: রিপ্রেসার/অ্যাক্টিভেটর প্রোটিন ১; TIN2: TERF1-ইন্টারঅ্যাক্টিং নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর ২; TPP1: TIN2-ইন্টারঅ্যাক্টিং প্রোটিন ১; TOM1L1: টার্গেট অব Myb1-লাইক ১ মেমব্রেন ট্রাফিকিং প্রোটিন; PGC-1α: পেরক্সিসোম প্রলিফেরেটর-এক্টিভেটেড রিসেপ্টর গামা কোঅ্যাক্টিভেটর ১-আলফা; TRF1: টেলোমেরিক রিপিট-বাইন্ডিং ফ্যাক্টর ১; TRF2: টেলোমেরিক রিপিট-বাইন্ডিং ফ্যাক্টর ২; TERT: টেলোমারেজ রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ।


সাহায্যকারী নোট:

গ্লিয়া (Glia): গ্লিয়া বা নিউরোগ্লিয়া (একবচন: গ্লিওসাইট) কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু) এবং পেরিফেরাল বা পার্শ্বীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরন ছাড়া অন্যান্য কোষগুলিকে বোঝায়, যা বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি করে না। নতুন গণনা পদ্ধতি (isotropic fractionators) ব্যবহার করে দেখা গিয়েছে যে, মানবমস্তিষ্কে গড়ে নিউরনের সমসংখ্যক প্রায় ১০০ বিলিয়ন গ্লিয়া কোষ রয়েছে। পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্রে, সোয়ান গ্লিয়া কোষ (Schwann cells) থেকে উদ্ভুত মায়েলিন আবরক হিসেবে নিউরনকে সুরক্ষা প্রদান করে। এছাড়াও, সেখানে রয়েছে উপগ্রহ গ্লিয়া কোষ (satellite cells)। পক্ষান্তরে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে মূলত অলিগোডেন্ড্রোসাইট (oligodendrocytes) গ্লিয়া কোষগুলির থেকে সৃষ্টি হয় মায়েলিন আবরক; এছাড়াও, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে রয়েছে অ্যাস্ট্রোসাইট (astrocytes), এপেনডাইমাল কোষ (ependymal cells) ও মাইক্রোগ্লিয়া (microglia) ধরনের গ্লিয়া কোষ। এছাড়া, মুলার কোষ নামক এক ধরনের বিশেষ গ্লিয়া কোষ মেরুদণ্ডী রেটিনায় পাওয়া যায়, যা অন্যান্য গ্লিয়া কোষের মতোই রেটিনার নিউরনগুলির জন্য সহায়ক কোষ হিসেবে কাজ করে। নিউরনের তুলনায় গ্লিয়া কোষগুলিতে অনেক বেশি কোষীয় বৈচিত্র্য এবং কার্যকারিতা রয়েছে এবং এই কোষগুলি বিভিন্নভাবে নিউরনের সংকেতসংবহন (নিউরোট্রান্সমিশন) নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে, তাদের পাঁচটি প্রধান কাজ হলো: ১) নিউরনকে ঘিরে রাখা এবং তাদের জায়গায় স্থিতিশীল রাখা; ২) নিউরনগুলিতে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করা; ৩)  নিরোধক হিসেবে পার্শ্ববর্তী নিউরনগুলিকে পৃথক রাখা; ৪) ফ্যাগোসাইটমূলক বৈশিষ্ট্য থাকায় জীবাণুকে ধ্বংস করা ও মৃত নিউরনকে অপসারণ করা; এবং ৫) অনাহার অবস্থায় মস্তিষ্কে কিটোন তৈরি করা। এছাড়াও, গ্লিয়া নিউরোট্রান্সমিশন ও সিন্যাপটিক সংযোগে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিতেও ভূমিকা পালন করে। গ্লিয়া কোষগুলি মস্তিষ্ক এবং মেরুরজ্জুর মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক। গ্লিয়া:নিউরন অনুপাত গড়ে প্রায় সমসংখ্যক থাকলেও, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে তাদের অনুপাতে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, সেরেব্রাল কর্টেক্সে গ্লিয়া:নিউরন অনুপাত হলো ৬১: ১৬ (বিলিয়ন কোষ), অর্থাৎ এই অঞ্চলে নিউরনের তুলনায় গ্লিয়া কোষ থাকে ৩.৭২ গুণ বেশি। যখন, সেরিবেলামে এর অনুপাত মাত্র ১৬:৬৯ (১৬.০৪ বিলিয়ন গ্লিয়া; ৬৯.০৩ বিলিয়ন নিউরন)। সাধারণতঃ গ্লিয়া কোষের ক্যানসারকে বলা হয় গ্লিয়োমা। 

নিউক্লিওটাইড: নিউক্লিওটাইড (Nucleotide): নিউক্লিওসাইড এবং ফসফেট সমন্বয়ে গঠিত এক ধরনের জৈব যৌগ হচ্ছে নিউক্লিওটাইড, যা নিউক্লিয়িক অ্যাসিড পলিমার ‘ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়িক অ্যাসিড (ডিএনএ)’ ও ‘রাইবোনিউক্লিয়িক অ্যাসিড (আরএনএ)’-এর মনোমার একক হিসেবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, ডিএনএ ও আরএনএ উভয়ই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের মধ্যে অপরিহার্য একটি জৈব অণু। খাদ্যের মাধ্যমে নিউক্লিওটাইড পাওয়া যায় এবং সাধারণ পুষ্টি উপাদান থেকে যকৃতে নিউক্লিওটাইড সংশ্লেষিত হয়। নিউক্লিওটাইড তিনটি সাবইউনিট অণুর সমন্বয়ে গঠিত: একটি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক (নিউক্লিওবেস নামেও পরিচিত), একটি ৫-কার্বন বিশিষ্ট চিনি (রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ) এবং একটি ফসফেট গ্রুপ (ছবি দেখুন)। ডিএনএ-এর চারটি নাইট্রোজেন নিউক্লিওবেস হলো গুয়ানিন, অ্যাডেনিন, সাইটোসিন ও থাইমিন; আরএনএ অণুতে, থাইমিনের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয় ইউরাসিল।

নিউক্লিওটাইড তিনটি সাবইউনিট অণুর সমন্বয়ে গঠিত: একটি নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারক (নিউক্লিওবেস নামেও পরিচিত), একটি ৫-কার্বন বিশিষ্ট চিনি (রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ) এবং একটি ফসফেট গ্রুপ

অ্যাপোপ্টোসিস (Apoptosis): বহুকোষী দেহে যে কোষগুলির আর প্রয়োজন নেই বা জীবের জন্য হুমকিস্বরূপ, সেগুলি প্রাকৃতিকভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত কোষ-আত্মঘাতী প্রক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে যায়, যা ‘পরিকল্পিত কোষমৃত্যু’ (programmed cell death) বা অ্যাপোপ্টোসিস নামে পরিচিত। এটি একটি জিন-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। এই কোষপতন প্রক্রিয়ায় কোষ-সংকুচিতকরণ, ক্রোমাটিন ঘনীভূতকরণসহ কোষের সাইটোস্কেলটন (cytoskeleton), নিউক্লীয় ঝিল্লি (nuclear membrane) এবং ক্রোমোজোমীয় ডিএনএ টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। অ্যাপোপ্টোসিসের কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি (৫০-৭০ বিলিয়ন) কোষ মারা যায়। বহুকোষী জীবে অ্যাপোপ্টোসিস একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানবভ্রূণ বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্রূণের হাত এবং পায়ের আঙুলগুলির (বিশেষ করে পায়ের আঙ্গুল) মধ্যবর্তী পাতলা সংযোজক (web) বা ভ্রূণে লেজের উপস্থিতি পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হয় অ্যাপোপ্টোসিসের মাধ্যমে। এছাড়াও, মেরুদণ্ডীপ্রাণির স্নায়ুতন্ত্রে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি স্নায়ুকোষ সৃষ্টি হওয়ায় স্নায়ুতন্ত্রের অর্ধেক বা তার বেশি নিউরন অ্যাপোপ্টোসিসের মাধ্যমে পরবর্তী পর্যায়ে বিলুপ্ত করতে হয়।

আণবিকভাবে, অ্যাপোপ্টোসিসের সূচনা দুই পথে হতে পারে: ১) অন্তর্মুখী (intrinsic) বা মাইটোকন্ড্রীয় পথে, যেখানে কোষটি নিজেই নিজেকে হত্যা করে। বিসিএল-২ (BCL-2) প্রোটিন পরিবার (BAK ও BAX) ও মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে সাইটোপ্লাজমে বেরিয়ে আসা সাইটোক্রোম সি (cytochrome c) এবং পরবর্তীতে ক্যাসপেজ (caspase)-৩ ও ক্যাসপেজ-৯ এর সক্রিয়করণ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত; ২) বহির্মুখী/বহিঃস্থ (extrinsic) পথে একটি কোষ নিকটবর্তী কোষ থেকে আগত সংকেতের কারণে নিজেকে হত্যা করে। উভয় পথেই বিভিন্ন ক্যাস্পেজ নামের প্রোটিয়েজ (protease) উৎসেচকের এক সারি (ক্যাস্পেজ ২, ৩, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ এবং ১২) পর্যায়ক্রমে সক্রিয় হয়ে কোষের এই ধরনের মৃত্যু ঘটায়। ত্রুটিপূর্ণ কোষপতন প্রক্রিয়া বিভিন্ন ধরনের রোগের সাথে জড়িত হতে দেখা গিয়েছে। অতিরিক্ত কোষপতন দেহে ক্ষয় তৈরি করে, আর অপর্যাপ্ত কোষপতন কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটিয়ে ক্যান্সার তৈরি করতে পারে।