বরিশাল বিভাগের প্রাচীন নাম ছিল বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ, যা বাংলার ইতিহাস ও ভূগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চল মোগল আমলে সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল এবং ব্রিটিশ শাসনে ‘বাকেরগঞ্জ’ নামে পরিচিত হয়। নদ-নদীর আবাসস্থল হিসেবে বরিশালের জনপদ বহু প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে গড়ে উঠেছে। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বোঝা যায়, বরিশালের ভূগঠন ও জনজীবন হাজার হাজার বছর আগে থেকেই স্থায়ী। এই নিবন্ধে বরিশালের ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
আজকের বরিশাল বিভাগ অতীতে “বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ” নামে পরিচিত ছিল। এক সময় এটি ‘বাঙ্গালা’ নামেও খ্যাত ছিল, যা পরে রূপান্তরিত হয়ে ‘বাকলা’ নাম ধারণ করে। একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতকের তাম্রলিপি দলিলসমূহে ‘বাঙ্গালা’ ও ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
চতুর্দশ শতকে রাজা দনুজমর্দন চন্দ্রদ্বীপ নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যার রাজধানী ছিল বাকলা। মোগল আমলে এই অঞ্চল ছিল বাংলার একটি উন্নত প্রশাসনিক ইউনিট। ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জেলা পরিচিত ছিল ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ নামে। এরপর ১৭৯৭ সালে ইংরেজরা ঢাকা বিভাগের অধীন এই অঞ্চল নিয়ে ‘বাকেরগঞ্জ জেলা’ গঠন করে। ঐ সময়ের চট্টগ্রামের ফৌজদার ও বাকলার প্রভাবশালী জমিদার আগাবাকের নবাব আলীবর্দী খানের নাম অনুসারে জেলার নাম রাখা হয় ‘বাকেরগঞ্জ’। ১৮০১ সালে জেলার সদর দপ্তর বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে ‘বরিশাল’ নামটি আধুনিক প্রচলনে স্থান পায়। যদিও জেলা পরিচিত ছিল বাকেরগঞ্জ নামে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পটভূমিতে এটি বরাবরই ‘বরিশাল’ নামেই প্রসিদ্ধ ছিল। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ছিল, পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে খুলনা বিভাগ সৃষ্টি হলে বাকেরগঞ্জ তার অন্তর্ভুক্ত হয়। অবশেষে ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা মিলিয়ে নতুন করে বরিশাল বিভাগ গঠিত হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তরদিকে হিমালয়, পশ্চিমে বিহার ও ওড়িশা, পূর্বদিকে আসাম ও মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর দ্বারা সীমাবদ্ধ। এর দক্ষিণাংশে অবস্থিত বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ তথা বর্তমান বরিশাল অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের তীরে বিস্তৃত। এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি বোঝার জন্য তার ভূ-গঠনের ইতিহাস জানা জরুরি।
প্রাগৈতিহাসিক কালের বহু মানবগোষ্ঠীর মিলন ও দ্বন্দ্বে গড়ে উঠেছে এই ভূমি ও এর জনগোষ্ঠী। অসংখ্য নদ-নদী পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস ছিল। প্রকৃতির রূঢ় ও মনোহর দুই বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়েই এখানকার মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে—সংগ্রাম, স্বজাত্যবোধ, আত্মনির্ভরতা ও জীবনঘনিষ্ঠতা। এই জনপদের বাসিন্দারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থেকেছে।
এদেশের মানুষের মানসিকতা গঠনে জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। এখানকার সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জনপদ গড়ে উঠেছে নদীতীরবর্তী অঞ্চলজুড়ে। আবার নদীর ভাঙনে তা ধ্বংসও হয়েছে বারবার। এই ভাঙা-গড়ার চক্রে গড়ে উঠেছে বাঙালির মানসিক দৃঢ়তা।
আধুনিক বাংলাদেশ যে সাংস্কৃতিক-ভাষাগত জনগোষ্ঠীর সমন্বয়, তা মূলত মধ্যযুগ থেকে রূপ নিতে থাকে। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ‘রাড়’, ‘গৌড়’, ‘বঙ্গ’ ও ‘পুণ্ড্র’ নামে বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল। প্রাথমিক বসতি ছিল বিচ্ছিন্ন ও দুর্লভ। আনুমানিক চার থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এখানকার প্রাচীন অধিবাসীরা শিকারি ও যাযাবর জীবন ত্যাগ করে কৃষিভিত্তিক সমাজ গঠন শুরু করে। উর্বর মাটি ও মাছপ্রচুর নদী-জলাশয় থাকায় কঠোর পরিশ্রম ছাড়াই জীবিকা নির্বাহ সম্ভব ছিল। ফলে তারা ধীরে ধীরে ভোগপ্রবণ ও কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। জৈন, বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব মতাদর্শও এই কর্মবিমুখতার পৃষ্ঠপোষকতা করে। এর ফলে সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি ও চৌর্যবৃত্তির প্রবণতা বেড়ে যায়। একদিকে সত্যবিমুখতা, প্রবঞ্চনা ও আত্মসম্মানহীনতা এবং অন্যদিকে অদৃষ্টবাদী মানসিকতা বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। বহু শতাব্দী বিদেশি শাসন ও শোষণের ফলে এ জাতি স্বাধীন বিকাশের সুযোগ পায়নি—এবং একরকম নির্ভরশীলতা ও উদ্যমহীনতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাংলার ইতিহাস নির্মাণে নদ-নদীর ভূমিকা অতুলনীয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলল জমে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান ভূখণ্ড। বহু প্রাচীনকালে, যখন হিমালয়ের স্থান ছিল সমুদ্রগর্ভে, তখন টিচিস সাগর নামে এক বিস্তৃত জলরাশি হিমালয় থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। প্লাইস্টোসিন যুগে জলবায়ু ছিল অত্যন্ত ঠাণ্ডা এবং বঙ্গোপসাগরের পানির স্তর ছিল অনেক নিচে। বরফ গলার ফলে ক্রমে বঙ্গোপসাগরের পানির স্তর বাড়তে থাকে এবং হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
এই প্রক্রিয়ায় নদী দ্বারা আনা পলিমাটি জমতে জমতে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে—বাংলাদেশের জন্ম আনুমানিক দুই লক্ষ বছরের প্রাচীন, তবে দক্ষিণাঞ্চলের (যেমন বরিশাল) ভূ-গঠন সম্ভবত ৫০ হাজার বছরের বেশি পুরনো নয়। জনবসতির সঠিক সময় জানা না গেলেও অনুমান করা হয়, এই অঞ্চলে বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে প্রায় চার-পাঁচ হাজার বছর পূর্বে।
নব্যপ্রস্তর যুগ ও তাম্রপ্রস্তর যুগের নিদর্শন যেমন বিক্রমপুরে লোহার কুড়াল, কিংবা ছাগলনাইয়ায় পাথরের তৈরি মূর্তি, এসব প্রমাণ করে যে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে মানববসতি ছিল। আর্যদের আগমনের পর অনেক দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলে সরে আসে—যার ফলে এই অঞ্চলে নতুন জনপদ গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশ তথা চন্দ্রদ্বীপের ভূগঠনের ইতিহাস অনেকাংশে পৌরাণিক কাহিনীতেও প্রতিফলিত। মহাভারত, রামায়ণসহ প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে এ অঞ্চলের উল্লেখ আছে। যেমন, মহাভারতে বাংলাকে পাণ্ডববর্জিত ও ম্লেচ্ছদের আবাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলরামের গঙ্গার মোহনায় স্নান, ভীমের সাগরতীরের দিক জয়—এসব ঘটনাও ইঙ্গিত দেয় এই অঞ্চলের প্রাচীনত্বকে। এমনকি রামায়ণে গঙ্গা দেবীর পাতালগমনকেও অনেকে ভূগঠনের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭), মেগাস্থিনিসের বিবরণে মোদকলিঙ্গ দ্বীপ, মৌর্য ও গুপ্ত আমলের শাসন ও বিভিন্ন তাম্রলিপি—এসব ইতিহাসের টুকরো থেকে বোঝা যায়, চন্দ্রদ্বীপ বা বর্তমান বরিশাল অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই জনপদ গড়ে উঠেছিল।
গৌরনদী থানার ‘মেদাকুল’ নামটি মেগাস্থিনিস বর্ণিত ‘মোদকলিঙ্গ’ দ্বীপের বিবর্তিত রূপ হতে পারে বলেও অনুমান করা হয়। চতুর্থ শতকে রাজা চন্দ্রবর্মণ কোটালীপাড়ায় দুর্গ নির্মাণ করেন, যা বরিশালের সঙ্গে তার সংযুক্তির আরেকটি প্রমাণ। ষষ্ঠ শতকে পাওয়া তাম্রশাসন নির্দেশ করে যে এই অঞ্চল তখন মৌর্য ও গুপ্তদের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক আওতার মধ্যে ছিল।
যদিও কিছু ঐতিহাসিক বরিশালের ভূগঠনকে আধুনিক বলে মনে করেন, ভূতাত্ত্বিক তথ্য ও প্রাচীন শিলালিপির আলোকে বলা যায় যে, বরিশালের উত্তরাঞ্চল (যেমন গৌরনদী, হিজলা, মুলাদী, উজিরপুর) প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই গঠিত হয়ে আসছে এবং সেখানে বসতির ইতিহাসও যথেষ্ট প্রাচীন।












