০৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

সালাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মনিরুল ইসলাম রফিক
  • প্রকাশ: ০২:৩২:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২২
  • / ৭৮৩ বার পড়া হয়েছে

জুমআর দিন সবার আগে মসজিদে গেলে কী সাওয়াব মিলবে?

আহকামে ইলাহি, তথা ঐশ্বরিক বিধানের হিকমত ও প্রজ্ঞার সামনে আমাদের সকলকেই মাথা ঝুঁকিয়ে দেওয়া উচিত। এ অবিচল বিশ্বাস আমাদের থাকতে হবে যে, সালাত হলো বান্দার জন্য প্রেরিত আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠ উপহার। প্রধানতম ফরজ, দিনের অন্যতম মূল স্তম্ভ, নাজাত ও মুক্তির পূর্বশর্ত, ইমানের অতন্দ্র প্রহরী। আল্লাহ তায়ালা বলেন: তোমরা সালাত কায়িম করো আর মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ো না। (সুরা রুম: ৩১)। সুরা আ’লার ১৪-১৫ আয়াতে এসেছে: সফল ব্যক্তি সেই, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে। আপন প্রতিপালকের নাম স্মরণে অতঃপর সালাতে মগ্ন থেকেছে। প্রত্যেক সালাতের জন্যই আল্লাহ পাক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর সময়সহ ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা: ১০৩)।

অতএব, নির্ধারিত সময় মতোই আমাদের সালাত আদায় করতে হবে। সালাতের সময়সমূহের প্রতি ইঙ্গিত করে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে রাত আঁধার হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করুন, আর ভোরের সালাতও। নিশ্চয়ই ফজরের সালাত (ফিরিশতাদের) উপস্থিতির সময়।-(সুরা বণী ইসরাঈল: ৭৮ ) সুরা ত্ব-হা’র ১৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে: আপন প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠে রত থাকুন সূর্যদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং দিনের শুরু ও রাতের শেষে তাসবীহ পাঠ করুন: যেন আপনি সুখী হন।’

সময়ের অল্প অল্প ব্যবধানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করার পিছনে নিহিত রয়েছে আল্লাহ তায়ালার বিরাট হিকমত। সালাতের এই বারংবারতা ও প্রাত্যহিকতার মাধ্যমে মানুষ তার আত্মা ও রুহের জন্য লাভ করে পরিপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাদ্য। তদ্রƒপ এতে রয়েছে কলবকে সৃষ্টিবিমুখ ও স্রষ্টামুখী করে পার্থিব লোভ লালসা ও শয়তানের চতুর্মুখী প্ররোচনা থেকে হিফাজতের পরিপূর্ণ ও কার্যকর ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দীস দেহলবী (রহ:) লিখেছেন: মুসলিম উম্মাহ যদি প্রতিদিন বারবার জীবন ও কর্মের হাসাবা ও কর্মের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত না রাখে, তবে এই উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কিছুতেই সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান প্রদানের মাধ্যমে মহা-প্রজ্ঞাবান আল্লাহ পাক সে ব্যবস্থাই করেছেন। পূর্ব থেকেই নামাজের, অপেক্ষা ও প্রস্তুতি গ্রহণ মূলত সালাতেরই অন্তর্গত, সালাতের জ্যোতির্ময়তারই একটা অংশ। এ ভাবে দিনের অধিকাংশ সময় সালাতের গণ্ডিতে এসে পড়ে। আমাদের এ অভিজ্ঞতা আছে যে, যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ সালাতের নিয়ত করে শয্যা গ্রহণ করে, সে অন্ততপক্ষে পশুর মতো নিশ্চিন্তে কিছুতেই ঘুমোতে পারবে না। তদ্রূপ কারও অন্তর যদি সর্বদা সালাত ও অন্যান্য জিকির ইবাদতের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তবে তার ভেতরের পশুত্ব কিছুতেই তাকে কোনো পাশবিক কর্মে লিপ্ত করতে সফল হবে না। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে- ‘ঘুম থেকে জাগ্রত হতে হতে যার মুখে কালিমা শাহাদাৎ, তাসবীহ ও তাহমীদ তথা পবিত্রতা ও প্রশংসাবাদ উচ্চারিত হয়, সে যদি কোনো দু’আ করে কিংবা অজু করে সালাত আদায় করে, তবে তার দু’আ ও সালাত অবশ্যই কবুল হবে।’ (হাদিসটি তিরমিজি ও আবু দাউদেও উদ্ধৃতি হয়েছে)।

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) উপরে বর্ণিত এই মর্ম উদ্ধার করেছেন যে, যার মুখে আল্লাহর জিকির এতই স্বতঃস্ফূর্ত এবং অন্তরে সালাতের চিন্তা এতই প্রবল যে, চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে জিকির শুরু হয়ে যায়, সে কিছুতেই গাফিল ও অচৈতন্য অবস্থায় ঘুমোতে পারবে না।- (হুজ্জাতুলাহি’ল -বালিগাহ, খ ১, পৃ: ৭৮)।

আল্লাহ পাক মু’মিনদের সন্বন্ধে বলেছেন: এরা এমন লোক যাদেরকে ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয় কিছুই আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল করতে পারে না।’ (সুরা নুর: ৩৭)।

অতএব, নির্ধারিত সময়ে আমাদের সালাত আদায় করতে হবে। সময়ের মতো সালাতের রাকাআত সংখ্যা ও আল্লাহ পাক নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা অবশ্যই পালনীয়। কোনো অজুহাতেই এর অন্যথা হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (স.) ও তাঁর পুণ্যাত্মা সাহাবাগণ সালাতের সময় ও রাকাআত সংখ্যা উভয়েরই যথাযথ পাবন্দি করেছেন জীবনভর। এমনকি জিহাদ ও যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এ বিষয়ে কোনোরূপ শিথিলতা তারা প্রদর্শন করেননি।

ইসলামি উম্মাহ সালাতের এই ইবাদত এমন নিষ্ঠা, যতœ, ব্যাপকতা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে পালন করে এসেছে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসে। উত্থান-পতনের অনেক নাজুক মুহূর্তই এসেছে ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে। এসেছে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষার মুহূর্ত। কতবার অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা জাতির ভাগ্যাকাশ। কিন্তু কোথাও কোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতেই এক ওয়াক্তের জন্যও মুলতবি হয়নি আল্লাহ পাকের দেওয়া এই সালাত।

বস্তুতপক্ষে এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত- নির্ধারিত সময় ও রাকাআত সংখ্যাসহ- মানুষের রুহ ও আত্মার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও স্বাস্থ্য রক্ষাকারী ইঞ্জেকশনস্বরূপ। আর স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন এ ব্যবস্থাপত্র; যিনি মহাজ্ঞানী ও অনন্ত প্রজ্ঞার অধিকারী। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের যাবতীয় দুর্বলতা সম্পর্কে যিনি মানুষের চেয়েও বেশি অবগত। তাই মানুষের উচিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার বিধান মেনে নেওয়া এবং অবনত মস্তকে তার নির্দেশ পালন করে যাওয়া।

আসলে সালাতের সময় সমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং সে সময়গুলোতে আল্লাহর অপার রহমত ও করুণার যে ধারাবাহিকতা বর্ষিত হয়, জ্যোতির্ময় তাজাল্লী ও নুরের স্নিগ্ধ পরশে আত্মিক উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভের এবং নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের যে অনুপম অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তার যথার্থ ‘ইলম’ বা জ্ঞান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল (স.) ব্যতীত আর কারও নেই। তবে এই পাঁচটি সময় নির্ধারণের অনেক কারণ ও হিকমতের একটি এই যে, এ সময়গুলোতে আরব মুশরিকগণ তাদের উপাস্যের আরাধনা করত। তাই মুসলমানদের এই সময়গুলোতে ‘লা-শারিক আল্লাহর’ ইবাদতে মশগুল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানুষ একজন ডাক্তার বা চিকিৎসকদের পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র, ওষুধের মাত্রা ও পথ্য মেনে চলা অত্যাবশ্যক মনে করে এবং এ বিষয়ে সামান্য শিথিলতা প্রদর্শন কিংবা নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রয়োগকে অমার্জনীয় অপরাধরূপে বিবেচনা করে। অথচ চিকিৎসক ভিন্ন গ্রহের অতি বুদ্ধিমান কোনো জীব নয়, আমাদেরই মতো রক্ত-মাংসে গড়া সধারণ মানুষ, যার অভিজ্ঞতা সীমিত, জ্ঞান অনুমাননির্ভর। সে ক্ষেত্রে মহাজ্ঞানী ও অনন্ত প্রজ্ঞার অধিকারী আল্লাহ পাকের নির্দেশ ও বিধানের বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিরূপ হওয়া উচিত, যিনি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক?

বিষয়:

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

মনিরুল ইসলাম রফিক

অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব; ইমেইল: [email protected]
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

সালাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রকাশ: ০২:৩২:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২২

আহকামে ইলাহি, তথা ঐশ্বরিক বিধানের হিকমত ও প্রজ্ঞার সামনে আমাদের সকলকেই মাথা ঝুঁকিয়ে দেওয়া উচিত। এ অবিচল বিশ্বাস আমাদের থাকতে হবে যে, সালাত হলো বান্দার জন্য প্রেরিত আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠ উপহার। প্রধানতম ফরজ, দিনের অন্যতম মূল স্তম্ভ, নাজাত ও মুক্তির পূর্বশর্ত, ইমানের অতন্দ্র প্রহরী। আল্লাহ তায়ালা বলেন: তোমরা সালাত কায়িম করো আর মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ো না। (সুরা রুম: ৩১)। সুরা আ’লার ১৪-১৫ আয়াতে এসেছে: সফল ব্যক্তি সেই, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে। আপন প্রতিপালকের নাম স্মরণে অতঃপর সালাতে মগ্ন থেকেছে। প্রত্যেক সালাতের জন্যই আল্লাহ পাক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর সময়সহ ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা: ১০৩)।

অতএব, নির্ধারিত সময় মতোই আমাদের সালাত আদায় করতে হবে। সালাতের সময়সমূহের প্রতি ইঙ্গিত করে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে রাত আঁধার হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করুন, আর ভোরের সালাতও। নিশ্চয়ই ফজরের সালাত (ফিরিশতাদের) উপস্থিতির সময়।-(সুরা বণী ইসরাঈল: ৭৮ ) সুরা ত্ব-হা’র ১৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে: আপন প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠে রত থাকুন সূর্যদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং দিনের শুরু ও রাতের শেষে তাসবীহ পাঠ করুন: যেন আপনি সুখী হন।’

সময়ের অল্প অল্প ব্যবধানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করার পিছনে নিহিত রয়েছে আল্লাহ তায়ালার বিরাট হিকমত। সালাতের এই বারংবারতা ও প্রাত্যহিকতার মাধ্যমে মানুষ তার আত্মা ও রুহের জন্য লাভ করে পরিপূর্ণ ও পুষ্টিকর খাদ্য। তদ্রƒপ এতে রয়েছে কলবকে সৃষ্টিবিমুখ ও স্রষ্টামুখী করে পার্থিব লোভ লালসা ও শয়তানের চতুর্মুখী প্ররোচনা থেকে হিফাজতের পরিপূর্ণ ও কার্যকর ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দীস দেহলবী (রহ:) লিখেছেন: মুসলিম উম্মাহ যদি প্রতিদিন বারবার জীবন ও কর্মের হাসাবা ও কর্মের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত না রাখে, তবে এই উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কিছুতেই সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান প্রদানের মাধ্যমে মহা-প্রজ্ঞাবান আল্লাহ পাক সে ব্যবস্থাই করেছেন। পূর্ব থেকেই নামাজের, অপেক্ষা ও প্রস্তুতি গ্রহণ মূলত সালাতেরই অন্তর্গত, সালাতের জ্যোতির্ময়তারই একটা অংশ। এ ভাবে দিনের অধিকাংশ সময় সালাতের গণ্ডিতে এসে পড়ে। আমাদের এ অভিজ্ঞতা আছে যে, যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদ সালাতের নিয়ত করে শয্যা গ্রহণ করে, সে অন্ততপক্ষে পশুর মতো নিশ্চিন্তে কিছুতেই ঘুমোতে পারবে না। তদ্রূপ কারও অন্তর যদি সর্বদা সালাত ও অন্যান্য জিকির ইবাদতের চিন্তায় মগ্ন থাকে, তবে তার ভেতরের পশুত্ব কিছুতেই তাকে কোনো পাশবিক কর্মে লিপ্ত করতে সফল হবে না। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে- ‘ঘুম থেকে জাগ্রত হতে হতে যার মুখে কালিমা শাহাদাৎ, তাসবীহ ও তাহমীদ তথা পবিত্রতা ও প্রশংসাবাদ উচ্চারিত হয়, সে যদি কোনো দু’আ করে কিংবা অজু করে সালাত আদায় করে, তবে তার দু’আ ও সালাত অবশ্যই কবুল হবে।’ (হাদিসটি তিরমিজি ও আবু দাউদেও উদ্ধৃতি হয়েছে)।

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) উপরে বর্ণিত এই মর্ম উদ্ধার করেছেন যে, যার মুখে আল্লাহর জিকির এতই স্বতঃস্ফূর্ত এবং অন্তরে সালাতের চিন্তা এতই প্রবল যে, চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে জিকির শুরু হয়ে যায়, সে কিছুতেই গাফিল ও অচৈতন্য অবস্থায় ঘুমোতে পারবে না।- (হুজ্জাতুলাহি’ল -বালিগাহ, খ ১, পৃ: ৭৮)।

আল্লাহ পাক মু’মিনদের সন্বন্ধে বলেছেন: এরা এমন লোক যাদেরকে ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয় কিছুই আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল করতে পারে না।’ (সুরা নুর: ৩৭)।

অতএব, নির্ধারিত সময়ে আমাদের সালাত আদায় করতে হবে। সময়ের মতো সালাতের রাকাআত সংখ্যা ও আল্লাহ পাক নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা অবশ্যই পালনীয়। কোনো অজুহাতেই এর অন্যথা হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ (স.) ও তাঁর পুণ্যাত্মা সাহাবাগণ সালাতের সময় ও রাকাআত সংখ্যা উভয়েরই যথাযথ পাবন্দি করেছেন জীবনভর। এমনকি জিহাদ ও যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এ বিষয়ে কোনোরূপ শিথিলতা তারা প্রদর্শন করেননি।

ইসলামি উম্মাহ সালাতের এই ইবাদত এমন নিষ্ঠা, যতœ, ব্যাপকতা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে পালন করে এসেছে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসে। উত্থান-পতনের অনেক নাজুক মুহূর্তই এসেছে ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে। এসেছে কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষার মুহূর্ত। কতবার অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা জাতির ভাগ্যাকাশ। কিন্তু কোথাও কোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতেই এক ওয়াক্তের জন্যও মুলতবি হয়নি আল্লাহ পাকের দেওয়া এই সালাত।

বস্তুতপক্ষে এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত- নির্ধারিত সময় ও রাকাআত সংখ্যাসহ- মানুষের রুহ ও আত্মার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও স্বাস্থ্য রক্ষাকারী ইঞ্জেকশনস্বরূপ। আর স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন এ ব্যবস্থাপত্র; যিনি মহাজ্ঞানী ও অনন্ত প্রজ্ঞার অধিকারী। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের যাবতীয় দুর্বলতা সম্পর্কে যিনি মানুষের চেয়েও বেশি অবগত। তাই মানুষের উচিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার বিধান মেনে নেওয়া এবং অবনত মস্তকে তার নির্দেশ পালন করে যাওয়া।

আসলে সালাতের সময় সমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং সে সময়গুলোতে আল্লাহর অপার রহমত ও করুণার যে ধারাবাহিকতা বর্ষিত হয়, জ্যোতির্ময় তাজাল্লী ও নুরের স্নিগ্ধ পরশে আত্মিক উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভের এবং নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের যে অনুপম অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তার যথার্থ ‘ইলম’ বা জ্ঞান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল (স.) ব্যতীত আর কারও নেই। তবে এই পাঁচটি সময় নির্ধারণের অনেক কারণ ও হিকমতের একটি এই যে, এ সময়গুলোতে আরব মুশরিকগণ তাদের উপাস্যের আরাধনা করত। তাই মুসলমানদের এই সময়গুলোতে ‘লা-শারিক আল্লাহর’ ইবাদতে মশগুল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানুষ একজন ডাক্তার বা চিকিৎসকদের পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র, ওষুধের মাত্রা ও পথ্য মেনে চলা অত্যাবশ্যক মনে করে এবং এ বিষয়ে সামান্য শিথিলতা প্রদর্শন কিংবা নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রয়োগকে অমার্জনীয় অপরাধরূপে বিবেচনা করে। অথচ চিকিৎসক ভিন্ন গ্রহের অতি বুদ্ধিমান কোনো জীব নয়, আমাদেরই মতো রক্ত-মাংসে গড়া সধারণ মানুষ, যার অভিজ্ঞতা সীমিত, জ্ঞান অনুমাননির্ভর। সে ক্ষেত্রে মহাজ্ঞানী ও অনন্ত প্রজ্ঞার অধিকারী আল্লাহ পাকের নির্দেশ ও বিধানের বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিরূপ হওয়া উচিত, যিনি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক?