০৮:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

নৈতিক চেতনা কী এবং নৈতিক চেতনার প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও উপাদান

বিশ্লেষণ সংকলন টিম
  • প্রকাশ: ০৬:২৪:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
  • / ২৫১২ বার পড়া হয়েছে

নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

নৈতিক চেতনা একটি মানসিক ক্রিয়া। মানুষ যখন তার ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায়-অন্যায় বোধ, উচিত-অনুচিত বোধ সম্পর্কে সচেতন হয় তখন ধরে নিতে হবে মানুষ নৈতিক চেতনার পরিসরে তার ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীকে বিবেচনা করছে। নৈতিক চেতনা মানুষকে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে যা মূলত চিন্তাপ্রসূত, সামাজিক, সক্রিয়, বাধ্যবাধকতামূলক, ভাবাবেগমূলক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

নৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ যখন একটি পরম লক্ষ্যরে দিকে অগ্রসর হয় তখন তাকে বলা হয় নৈতিক আদর্শ। আবার জীবনের পূর্ণতা অর্জনের জন্যে মানুষ যখন পরম লক্ষ্যরে দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় তখন তাকে বলা হয় নৈতিক প্রগতি। মানুষ নৈতিক আদর্শের বলে বলীয়ান হয়ে যখন নৈতিক প্রগতির দিকে ধাবিত হয় তখন তার কতকগুলো সদগুণ থাকতে হয় যেগুলো মানুষের নৈতিক অধিকার ও কর্তব্যের বন্ধনে যুগবদ্ধ থাকে।

নৈতিক চেতনা কী

অনৈতিক চেতনা নৈতিকতার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। ন্যায় ও অন্যায় সম্পর্কীয় নৈতিক চেতনা কেবল মানুষকে তার নিজস্ব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতেই সাহায্য করে না, বরং অপরাপর মানুষের সামাজিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে থাকে। 

নৈতিক চেতনা এমন এক বিশেষ ধরনের মানসিক ক্রিয়া যা আমাদেরকে আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী ন্যায়-অন্যায় বা উচিত-অনুচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। নৈতিক চেতনা আমাদের বলে দেয়, আমাদের প্রতিজ্ঞা পালন করা উচিত এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা উচিত নয়, দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্য করা ভাল এবং কাউকে আঘাত করা মন্দ। নৈতিক চেতনা আমাদেরকে আমাদের কার্যাবলীর ন্যায়বোধ ও অন্যায়বোধ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ডের নৈতিকতা সম্পর্কীয় এ চেতনা ন্যায় কাজ সম্পন্ন করার ও অন্যায় থেকে বিরত থাকার জন্যে আমাদের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। 

নৈতিক চেতনার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য

আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর গুণ বা আমাদের চরিত্রের নৈতিক গুরুত্বের অবগতি হচ্ছে নৈতিক চেতনা। নৈতিক চেতনার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং নীচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো: 

নৈতিক চেতনা চিন্তামূলক

নৈতিক চেতনা হলো আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর নৈতিক গুণ সম্পর্কীয় চেতনা। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী বিবেচনা, পছন্দ ও সংকল্পের সঙ্গে জড়িত বলে তা আমাদের মনের চিন্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটায়। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর উচিত ও অনুচিত বোধ নৈতিক আদর্শের প্রেক্ষিতে নিরুপণ করা হয়। যে কাজ নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তাকে ন্যায় এবং যে কাজ নৈতিক আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ তাকে অন্যায় কাজ বলা হয়। তাই আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায় ও অন্যায় বোধ সম্পর্কীয় নৈতিক চেতনা আমাদের চিন্তামূলক দুষ্টিভঙ্গীর ফল। 

নৈতিক চেতনা সক্রিয়

নৈতিক চেতনা আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায় ও অন্যায বোধ সম্পর্কীয় সচেতনতাকে বুঝায়। নৈতিক চেতনা মানুষের নিষ্ক্রিয় অভিজ্ঞতার পরিবর্তে ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর উল্লেখ করে। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ক্ষেত্রে মানুষের বিবেচনা, পছন্দ ইত্যাদি জড়িত বলে বিকল্প কার্যাবলীর মধ্যে ন্যায় কাজকে গ্রহণ করতে ও অন্যায় কাজকে বাদ দিতে নৈতিক সক্রিয়তা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর নৈতিক মূল্যায়ন সম্পর্কীয় সচেতনতা হচ্ছে নৈতিক চেতনা। তাই নৈতিক চেতনা সক্রিয়। 

নৈতিক চেতনা সামাজিক

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের নৈতিক জীবনে সামাজিক পটভূমির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। নৈতিক চেতনার মাধ্যমে মানুষের ভাল-মন্দের ধারণা সমাজের অপরাপর ব্যক্তির ভাল-মন্দের প্রশ্নকেও জড়িত করে থাকে। সমাজের অপরাপর ব্যক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কথা স্মরণ রেখেই মানুষের নৈতিক কর্তব্য ও দায়িত্ব বা ভাল-মন্দের বিচার করা হয়ে থাকে। তাই বলা যায়, নৈতিক চেতনা সামাজিক। 

নৈতিক চেতনামূলক

নৈতিক চেতনার ফলে আমরা ভালো কাজ করার জন্যে এবং মন্দ কাজ বাদ দেয়ার জন্যে একটা নৈতিক বাধ্যতাবোধ অনুভুব করি বলে নৈতিক চেতনার সঙ্গে নৈতিক বাধ্যবাধকতাবোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে যায়। এই নৈতিক বাধ্যবাধকতাবোধ কোন বাইরেরকর্তৃপক্ষের নিকট থেকে আসে না। এটা আমাদের অন্তরের ভেতর থেকে আসে। তাই, এটা স্ব-আরোপিত। অতএব বলা যায়, নৈতিক চেতনা বাধ্যবাধকতামূলক। 

নৈতিক চেতনা ভাবাবেগমূলক

নৈতিক আদর্শের জন্যে নৈতিক চেতনার একটা শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, এ কথা স্বীকার করতে হবে। ভালো কাজের ক্ষেত্রে যেমন আমাদের মনে একটা প্রীতিকর ভাব জেগে উঠে, তেমনি মন্দ কাজের ক্ষেত্রেও আমাদের মনে একটা অপ্রীতিকর ভাব জেগে উঠে। তাই নৈতিক চেতনার মধ্যে একটা ভাবাবেগমূলক অবস্থা বিরাজ করে। এটা নেহায়েতই মানুষের অš—রের অনুভূতির ব্যাপার। 

নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।

নৈতিক চেতনার উপাদান 

আমরা আগেই জেনেছি যে, ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী উচিত-অনুচিত বোধ, ভাল-মন্দ সম্পর্কিত চেতনাকে বলা হয় নৈতিক চেতনা। নৈতিক চেতনা একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া। এতে চিন্তামূলক, অনুভূতিমূলক ও ইচ্ছামূলক উপাদান বর্তমান। নিচে নৈতিক চেতনার উপাদান সম্পর্কে একটু বিস্তৃত আলোচনা করা হলো : 

চিন্তামূলক উপাদান

নৈতিক পার্থক্যবোধ ও এ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নৈতিক চেতনার চিন্তামূলক উপাদান। নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ নৈতিক পার্থক্যবোধের অন্তর্গত:

  • ভালোমন্দ, উচিত-অনুচিত বোধ সম্পর্কিত নৈতিক বিচার। এটি আচরণের উচিত-অনুচিতের বোধকে নির্দেশ করে। যথাযথ কাজ কোনটি তা বুঝতে অনুচিত কাজ কোনটি তা বুঝা দরকার।
  • আত্মসচেতন ও আত্মনিয়ন্ত্রণশীল সত্তা। মানুষ যে ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী ও অভ্যাসজাত কার্যাবলী সম্পাদন করে তা করার জন্যে তার নৈতিক বিচারে আত্মসচেতনতা থাকতে হবে। 
  • কোনো একটি আদর্শের চেতনা যে আদর্শ ন্যায়-অন্যায় ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞাপন করে।
  • কল্যাণের ধারণা নৈতিক আদর্শ সম্পর্কে সুষ্ঠু মতবাদ গঠনে সাহায্য করে।
  • নৈতিক বিচার যথোচিত ও অনুচিত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্যবোধের নির্দেশ দেয়।
  • উচিত ও অনুচিত ধারণা আমাদের মনে কর্তব্যবোধ সৃষ্টি করে। যে কাজকে আমরা উচিত বলে মনে করি সে কাজ সম্পাদন করার একটা তাগিদ অনুভব করি, আবার যে কাজকে আমরা অনুচিত বলে মনে করি সে কাজ সম্পাদন করার তাগিদ অনুভব করি না। 
  • কর্তব্যবোধের সাথে অধিকারের প্রশ্নও জড়িত। একজনের যা কর্তব্য অন্যের তা অধিকার। 
  • উৎকর্ষ ও অপকর্ষের চেতনা এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। কারণ যে ব্যক্তি কর্তব্যপরায়ণ তাকে আমরা প্রশংসা করি; আর যে ব্যক্তি কর্তব্য কাজে কর্তব্যপরায়ণ নয় তাকে আমরা নিন্দা করি।
  • দায়িত্ববোধের চেতনাও বিবেচ্য। বিচারশক্তিসম্পন্ন মানুষ তার ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসপ্রসূত কাজের জন্যে দায়ী।
  • ধর্ম ও অধর্মের চেতনা এ ক্ষেত্রে অন্যতম মানদন্ড বলে মনে করা যায়। 

আবেগমূলক উপাদান

নৈতিক ভাবাবেগ হচ্ছে নৈতিক চেতনার আবেগমূলক উপাদান। যখন আমরা কোন কাজকে ন্যায় বলে মনে করি, তখন আমাদের মনে একটা প্রীতিভাব জেগে উঠে এবং সেই কাজটি আমাদের অনুমোদন লাভ করে থাকে। আবার যখন আমরা কোন কাজকে অন্যায় বলে মনে করি, তখন আমাদের মনে একটা অপ্রীতিকর ভাব জেগে উঠে এবং সেই কাজটিকে আমরা অনুমোদন দেই না। তাই দেখা যায়, ন্যায় কাজের ক্ষেত্রে সন্তোষের ভাব ও অন্যায় কাজের ক্ষেত্রে অসন্তোষের ভাবের সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায়, নৈতিক অবধারণের ক্ষেত্রে সন্তোষ-অসন্তোষের মতো নৈতিক ভাবাবেগ বর্তমান থাকে। 

ইচ্ছামূলক উপাদান

তাড়না সংকল্প হচ্ছে নৈতিক চেতনার ইচ্ছামূলক উপাদান। নৈতিক অবধারণের ক্ষেত্রে আমাদের একটা কর্মপন্থাকে নির্বাচন করতে হয় এবং নৈতিক বিচার আমাদের মনে একটি বাধ্যবাধকতাবোধ সৃষ্টি করে।যে কাজটি ন্যায় বলে মনে হয় সে কাজটি করতে আমাদের মনে একটা তাড়নার সৃষ্টি হয় এবং যে কাজটি অন্যায় বলে মনে হয় সে কাজ থেকে বিরত থাকতে আমাদের মনে একটা তাড়নার সৃষ্টি হয়; আর এই তাড়নাকেই ক্রিয়ামূলক আবেগ বলা যেতে পারে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

নৈতিক চেতনা কী এবং নৈতিক চেতনার প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও উপাদান

প্রকাশ: ০৬:২৪:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

নৈতিক চেতনা একটি মানসিক ক্রিয়া। মানুষ যখন তার ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায়-অন্যায় বোধ, উচিত-অনুচিত বোধ সম্পর্কে সচেতন হয় তখন ধরে নিতে হবে মানুষ নৈতিক চেতনার পরিসরে তার ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীকে বিবেচনা করছে। নৈতিক চেতনা মানুষকে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে যা মূলত চিন্তাপ্রসূত, সামাজিক, সক্রিয়, বাধ্যবাধকতামূলক, ভাবাবেগমূলক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

নৈতিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ যখন একটি পরম লক্ষ্যরে দিকে অগ্রসর হয় তখন তাকে বলা হয় নৈতিক আদর্শ। আবার জীবনের পূর্ণতা অর্জনের জন্যে মানুষ যখন পরম লক্ষ্যরে দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় তখন তাকে বলা হয় নৈতিক প্রগতি। মানুষ নৈতিক আদর্শের বলে বলীয়ান হয়ে যখন নৈতিক প্রগতির দিকে ধাবিত হয় তখন তার কতকগুলো সদগুণ থাকতে হয় যেগুলো মানুষের নৈতিক অধিকার ও কর্তব্যের বন্ধনে যুগবদ্ধ থাকে।

নৈতিক চেতনা কী

অনৈতিক চেতনা নৈতিকতার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। ন্যায় ও অন্যায় সম্পর্কীয় নৈতিক চেতনা কেবল মানুষকে তার নিজস্ব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতেই সাহায্য করে না, বরং অপরাপর মানুষের সামাজিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে থাকে। 

নৈতিক চেতনা এমন এক বিশেষ ধরনের মানসিক ক্রিয়া যা আমাদেরকে আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী ন্যায়-অন্যায় বা উচিত-অনুচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। নৈতিক চেতনা আমাদের বলে দেয়, আমাদের প্রতিজ্ঞা পালন করা উচিত এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা উচিত নয়, দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্য করা ভাল এবং কাউকে আঘাত করা মন্দ। নৈতিক চেতনা আমাদেরকে আমাদের কার্যাবলীর ন্যায়বোধ ও অন্যায়বোধ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ডের নৈতিকতা সম্পর্কীয় এ চেতনা ন্যায় কাজ সম্পন্ন করার ও অন্যায় থেকে বিরত থাকার জন্যে আমাদের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। 

নৈতিক চেতনার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য

আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর গুণ বা আমাদের চরিত্রের নৈতিক গুরুত্বের অবগতি হচ্ছে নৈতিক চেতনা। নৈতিক চেতনার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং নীচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো: 

নৈতিক চেতনা চিন্তামূলক

নৈতিক চেতনা হলো আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর নৈতিক গুণ সম্পর্কীয় চেতনা। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী বিবেচনা, পছন্দ ও সংকল্পের সঙ্গে জড়িত বলে তা আমাদের মনের চিন্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটায়। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর উচিত ও অনুচিত বোধ নৈতিক আদর্শের প্রেক্ষিতে নিরুপণ করা হয়। যে কাজ নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তাকে ন্যায় এবং যে কাজ নৈতিক আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ তাকে অন্যায় কাজ বলা হয়। তাই আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায় ও অন্যায় বোধ সম্পর্কীয় নৈতিক চেতনা আমাদের চিন্তামূলক দুষ্টিভঙ্গীর ফল। 

নৈতিক চেতনা সক্রিয়

নৈতিক চেতনা আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ন্যায় ও অন্যায বোধ সম্পর্কীয় সচেতনতাকে বুঝায়। নৈতিক চেতনা মানুষের নিষ্ক্রিয় অভিজ্ঞতার পরিবর্তে ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর উল্লেখ করে। ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর ক্ষেত্রে মানুষের বিবেচনা, পছন্দ ইত্যাদি জড়িত বলে বিকল্প কার্যাবলীর মধ্যে ন্যায় কাজকে গ্রহণ করতে ও অন্যায় কাজকে বাদ দিতে নৈতিক সক্রিয়তা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলীর নৈতিক মূল্যায়ন সম্পর্কীয় সচেতনতা হচ্ছে নৈতিক চেতনা। তাই নৈতিক চেতনা সক্রিয়। 

নৈতিক চেতনা সামাজিক

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের নৈতিক জীবনে সামাজিক পটভূমির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। নৈতিক চেতনার মাধ্যমে মানুষের ভাল-মন্দের ধারণা সমাজের অপরাপর ব্যক্তির ভাল-মন্দের প্রশ্নকেও জড়িত করে থাকে। সমাজের অপরাপর ব্যক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কথা স্মরণ রেখেই মানুষের নৈতিক কর্তব্য ও দায়িত্ব বা ভাল-মন্দের বিচার করা হয়ে থাকে। তাই বলা যায়, নৈতিক চেতনা সামাজিক। 

নৈতিক চেতনামূলক

নৈতিক চেতনার ফলে আমরা ভালো কাজ করার জন্যে এবং মন্দ কাজ বাদ দেয়ার জন্যে একটা নৈতিক বাধ্যতাবোধ অনুভুব করি বলে নৈতিক চেতনার সঙ্গে নৈতিক বাধ্যবাধকতাবোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে যায়। এই নৈতিক বাধ্যবাধকতাবোধ কোন বাইরেরকর্তৃপক্ষের নিকট থেকে আসে না। এটা আমাদের অন্তরের ভেতর থেকে আসে। তাই, এটা স্ব-আরোপিত। অতএব বলা যায়, নৈতিক চেতনা বাধ্যবাধকতামূলক। 

নৈতিক চেতনা ভাবাবেগমূলক

নৈতিক আদর্শের জন্যে নৈতিক চেতনার একটা শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, এ কথা স্বীকার করতে হবে। ভালো কাজের ক্ষেত্রে যেমন আমাদের মনে একটা প্রীতিকর ভাব জেগে উঠে, তেমনি মন্দ কাজের ক্ষেত্রেও আমাদের মনে একটা অপ্রীতিকর ভাব জেগে উঠে। তাই নৈতিক চেতনার মধ্যে একটা ভাবাবেগমূলক অবস্থা বিরাজ করে। এটা নেহায়েতই মানুষের অš—রের অনুভূতির ব্যাপার। 

নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
নৈতিক চেতনা মানুষকে তার আচরণের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানুষকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।

নৈতিক চেতনার উপাদান 

আমরা আগেই জেনেছি যে, ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী উচিত-অনুচিত বোধ, ভাল-মন্দ সম্পর্কিত চেতনাকে বলা হয় নৈতিক চেতনা। নৈতিক চেতনা একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া। এতে চিন্তামূলক, অনুভূতিমূলক ও ইচ্ছামূলক উপাদান বর্তমান। নিচে নৈতিক চেতনার উপাদান সম্পর্কে একটু বিস্তৃত আলোচনা করা হলো : 

চিন্তামূলক উপাদান

নৈতিক পার্থক্যবোধ ও এ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নৈতিক চেতনার চিন্তামূলক উপাদান। নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ নৈতিক পার্থক্যবোধের অন্তর্গত:

  • ভালোমন্দ, উচিত-অনুচিত বোধ সম্পর্কিত নৈতিক বিচার। এটি আচরণের উচিত-অনুচিতের বোধকে নির্দেশ করে। যথাযথ কাজ কোনটি তা বুঝতে অনুচিত কাজ কোনটি তা বুঝা দরকার।
  • আত্মসচেতন ও আত্মনিয়ন্ত্রণশীল সত্তা। মানুষ যে ইচ্ছাপ্রসূত কার্যাবলী ও অভ্যাসজাত কার্যাবলী সম্পাদন করে তা করার জন্যে তার নৈতিক বিচারে আত্মসচেতনতা থাকতে হবে। 
  • কোনো একটি আদর্শের চেতনা যে আদর্শ ন্যায়-অন্যায় ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞাপন করে।
  • কল্যাণের ধারণা নৈতিক আদর্শ সম্পর্কে সুষ্ঠু মতবাদ গঠনে সাহায্য করে।
  • নৈতিক বিচার যথোচিত ও অনুচিত বিষয়ের মধ্যে পার্থক্যবোধের নির্দেশ দেয়।
  • উচিত ও অনুচিত ধারণা আমাদের মনে কর্তব্যবোধ সৃষ্টি করে। যে কাজকে আমরা উচিত বলে মনে করি সে কাজ সম্পাদন করার একটা তাগিদ অনুভব করি, আবার যে কাজকে আমরা অনুচিত বলে মনে করি সে কাজ সম্পাদন করার তাগিদ অনুভব করি না। 
  • কর্তব্যবোধের সাথে অধিকারের প্রশ্নও জড়িত। একজনের যা কর্তব্য অন্যের তা অধিকার। 
  • উৎকর্ষ ও অপকর্ষের চেতনা এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। কারণ যে ব্যক্তি কর্তব্যপরায়ণ তাকে আমরা প্রশংসা করি; আর যে ব্যক্তি কর্তব্য কাজে কর্তব্যপরায়ণ নয় তাকে আমরা নিন্দা করি।
  • দায়িত্ববোধের চেতনাও বিবেচ্য। বিচারশক্তিসম্পন্ন মানুষ তার ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসপ্রসূত কাজের জন্যে দায়ী।
  • ধর্ম ও অধর্মের চেতনা এ ক্ষেত্রে অন্যতম মানদন্ড বলে মনে করা যায়। 

আবেগমূলক উপাদান

নৈতিক ভাবাবেগ হচ্ছে নৈতিক চেতনার আবেগমূলক উপাদান। যখন আমরা কোন কাজকে ন্যায় বলে মনে করি, তখন আমাদের মনে একটা প্রীতিভাব জেগে উঠে এবং সেই কাজটি আমাদের অনুমোদন লাভ করে থাকে। আবার যখন আমরা কোন কাজকে অন্যায় বলে মনে করি, তখন আমাদের মনে একটা অপ্রীতিকর ভাব জেগে উঠে এবং সেই কাজটিকে আমরা অনুমোদন দেই না। তাই দেখা যায়, ন্যায় কাজের ক্ষেত্রে সন্তোষের ভাব ও অন্যায় কাজের ক্ষেত্রে অসন্তোষের ভাবের সৃষ্টি হয়। তাই বলা যায়, নৈতিক অবধারণের ক্ষেত্রে সন্তোষ-অসন্তোষের মতো নৈতিক ভাবাবেগ বর্তমান থাকে। 

ইচ্ছামূলক উপাদান

তাড়না সংকল্প হচ্ছে নৈতিক চেতনার ইচ্ছামূলক উপাদান। নৈতিক অবধারণের ক্ষেত্রে আমাদের একটা কর্মপন্থাকে নির্বাচন করতে হয় এবং নৈতিক বিচার আমাদের মনে একটি বাধ্যবাধকতাবোধ সৃষ্টি করে।যে কাজটি ন্যায় বলে মনে হয় সে কাজটি করতে আমাদের মনে একটা তাড়নার সৃষ্টি হয় এবং যে কাজটি অন্যায় বলে মনে হয় সে কাজ থেকে বিরত থাকতে আমাদের মনে একটা তাড়নার সৃষ্টি হয়; আর এই তাড়নাকেই ক্রিয়ামূলক আবেগ বলা যেতে পারে।