০৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

বিচ্যুতিমূলক আচরণ: বিচ্যুত আচরণ কাকে বলে, বিচ্যুত আচরণের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

বিশ্লেষণ সংকলন টিম
  • প্রকাশ: ০৭:৩৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ অগাস্ট ২০২২
  • / ৬৮৩০ বার পড়া হয়েছে

বিচ্যুতিমূলক আচরণ ও অপরাধের প্রতীকী চিত্র | উইকিপিডিয়া

বিচ্যুত আচরণ সমাজ ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি সমাজে কোনো না কোনো ধরনের বিচ্যুত আচরণ লক্ষ করা যায়। সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে মানসিক, শারীরিক ও বুদ্ধিগত পার্থক্য বিদ্যমান। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ সাধারণত সামাজিক অনুশাসন মেনে চলে। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মানুষ অনেক সময় অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। এভাবেই সৃষ্টি হয় বিচ্যুত আচরণ। বিচ্যুত আচরণের জন্য আইনত শাস্তি বিধানের সুযোগ নেই। তবে অনেক সময় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বিচ্যুত আচরণই একসময় ব্যক্তিকে বিপথগামী করে তোলে এবং সে অপরাধে লিপ্ত হয়। 

বিচ্যুত আচরণের সংজ্ঞা (Definition of Deviant Behaviour)

সাধারণ অর্থে মানুষের যেসব আচরণ সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী, সমাজে অসংগতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাকে বিচ্যুত আচরণ বলে। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিচ্যুত আচরণকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। যেমন সমাজবিজ্ঞানী D. Ross (1972)  বলেছেন, বিচ্যুত আচরণ হচ্ছে ঐ সব আচরণ যেগুলো সামাজিক প্রত্যাশাকে নিশ্চিত করতে পারে না (Deviant behaviour is that behaviour which does not confirm to social expectation)।

B. Bhushan Zuvi ‘Dictionary of Sociology (1989) গ্রন্থে বলেছেন, বিচ্যুতি প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয় এমন আচরণ বুঝাতে যা বিধিনিষেধ বা অন্যের প্রত্যাশাকে লঙ্ঘন করে। এটি অননুমোদিত এবং শাস্তি বিধানের ব্যাপারে আগ্রহী (The term ‘deviance’ is used to refer to behaviour which infringe rules or the expectations of others and which attracts disapproval or punishment)।

David Dressler-এর মতে, বিচ্যুত আচরণকে বুঝতে হলে সামাজিক আদর্শের (ঝড়পরধষ হড়ৎসং) পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে হবে। সামাজিক আদর্শ থেকে নেতিবাচক ও ভিন্নতর আচরণই বিচ্যুত আচরণ। Dressler-এর ভাষায়,  “Deviant behaviour is the behaviour that deviates….. . Deviant behaviour that varies significantly in direction or degree from the social norm of that behaviour.”

উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যখন সামাজিক রীতি-নীতি, আইন-কানুন ও আদর্শানুসারে কাজ করে না, তখন সে ব্যক্তিকে ‘বিচ্যুত ব্যক্তি’। সামাজিক রীতি-নীতি বিবেচনায় ঐ বিচ্যুত ব্যক্তির কার্যকলাপ ও আচরণ, অপ্রত্যাশিত ও নৈতিক আদর্শ পরিপন্থী। মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাব, সমকামিতা, গর্ভপাত, আত¥হত্যা, দুর্নীতি, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বিচ্যুত আচরণ হিসেবে পরিগণিত।

বিচ্যুত আচরণের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Deviant Behaviour)

বিচ্যুত আচরণের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যথা— 

  • বিচ্যুত আচরণ আচরণবিধি ও মূল্যবোধ পরিপন্থী;
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিকভাবে নিন্দনীয় হলেও আইনগতভাবে দ-নীয় নয়;
  • আচরণের অস্বাভাবিক রূপ হচ্ছে বিচ্যুত আচরণ;
  • এটি সমাজের অপ্রত্যাশিত এবং অবাঞ্ছিত;
  • বিচ্যুত আচরণ ব্যক্তিগত, আদর্শগত এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিকর;
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে;
  • বিচ্যুত আচরণ আপেক্ষিক। সময় ও সমাজভেদে এর মাত্রাগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া এবং সামাজিকীকরণের ফল। এটি সামাজিক প্রপঞ্চও বটে। সমাজের বাইরে কোনো বিচ্যুতি নেই।
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত। যেমন— শিল্প সমাজে জ্ঞাতিত্ব বা প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক খুব কমই বিকশিত হয়। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে চাইলে তা বিচ্যুত আচরণ বলে গণ্য করা হয়।
  • বিচ্যুত আচরণ কখনো কখনো সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। চিরায়ত নিয়ম-কানুন ও সামাজিক বিধিনিষেধের বাইরে গিয়ে ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায় যেসব বিচ্যুত আচরণ করেছিলেন তা স্বাধীনতা ও সামাজিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করেছিল।

বিচ্যুত আচরণের প্রকারভেদ বা ধরনসমূহ (Types of Deviant Behaviour)

সমাজে নানা ধরনের বিচ্যুত আচরণ পরিলড়্গতি হয়। যেমন— Edwin Limert তাঁর ‘Social Pathology’ গ্রন্থে দুই ধরনের বিচ্যুত আচরণের উলেস্নখ করেছেন। যথা—

  • মুখ্য বিচ্যুত আচরণ (Primary deviance) এবং
  • গৌণ বিচ্যুত আচরণ (Secondary deviance)। 

মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ প্রদর্শন করলে তা মুখ্য বিচ্যুত আচরণ। যেমন: সংক্ষিপ্ত কাপড়ে মেয়েদের বাইরে চলাফেরা, শ্রেণিকড়্গরে মধ্যে ধূমপান করা ইত্যাদি। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ হচ্ছে গৌণ বিচ্যুতি। যেমন: বড়দের সালাম না দেয়া, জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পারাপার না হওয়া, অশস্নীল ভাষা প্রয়োগ করা ইত্যাদি। 

বিচ্যুত আচরণের আরো কয়েকটি ধরন সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো—

  • আচরণের বিচ্যুতি (Deviance of behaviour): বিচ্যুতির ধরনের মধ্যে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ হচ্ছে আচরণগত বিচ্যুতি। এ ধরনের বিচ্যুতির ফলেই সমাজের অধিকাংশ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। জুয়াখেলা, সমকামিতা, পরকীয়া প্রেম, পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি আচরণের বিচ্যুতি।
  • অভ্যাসের বিচ্যুতি (Habitual deviance): অভ্যাসগত বিপথগামিতা অনেক সময় সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাদকাসক্তি, জুয়াখেলা, নারীর প্রতি লোলুপ মনোভাব ব্যক্তিকে বেপরোয়া করে তুলতে পারে।
  • মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি (Psychological deviance): আচরণের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির প্রকাশ ঘটে। অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে উদাসীন, স্বার্থপর ও লোভী করে তোলে। ফলে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
  • সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি (Cultural deviance): সাংস্কৃতিক ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের এ ধরনের বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্যুত মানুষের কর্মকাণ্ড সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং সাংস্কৃতিক বিচ্যুতিও অনেক বিচ্যুত আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

শেষকথা

বিচ্যুতিমূলক আচরণ যে-কোনো সমাজের জন্যই নানামুখী সমস্যার কারণ। বিভিন্নভাবে ব্যক্তির মধ্যে বিচ্যুত আচরণ দেখা দিতে পারে। বিচ্যুত আচরণ সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের কাম্য নয়। মাত্রাতিরিক্ত বিচ্যুত আচরণের ফলে সমাজের পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ যেমন নিশ্চিত হয় না, তেমনি উন্নত, সুষ্ঠু, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্থ হয়। এজন্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সমাজবিরোধী, সামাজিক মূল্যবোধ ও আদর্শ পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য সামাজিক নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

বিচ্যুতিমূলক আচরণ: বিচ্যুত আচরণ কাকে বলে, বিচ্যুত আচরণের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

প্রকাশ: ০৭:৩৭:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ অগাস্ট ২০২২

বিচ্যুত আচরণ সমাজ ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি সমাজে কোনো না কোনো ধরনের বিচ্যুত আচরণ লক্ষ করা যায়। সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে মানসিক, শারীরিক ও বুদ্ধিগত পার্থক্য বিদ্যমান। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ সাধারণত সামাজিক অনুশাসন মেনে চলে। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মানুষ অনেক সময় অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। এভাবেই সৃষ্টি হয় বিচ্যুত আচরণ। বিচ্যুত আচরণের জন্য আইনত শাস্তি বিধানের সুযোগ নেই। তবে অনেক সময় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বিচ্যুত আচরণই একসময় ব্যক্তিকে বিপথগামী করে তোলে এবং সে অপরাধে লিপ্ত হয়। 

বিচ্যুত আচরণের সংজ্ঞা (Definition of Deviant Behaviour)

সাধারণ অর্থে মানুষের যেসব আচরণ সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী, সমাজে অসংগতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাকে বিচ্যুত আচরণ বলে। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিচ্যুত আচরণকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। যেমন সমাজবিজ্ঞানী D. Ross (1972)  বলেছেন, বিচ্যুত আচরণ হচ্ছে ঐ সব আচরণ যেগুলো সামাজিক প্রত্যাশাকে নিশ্চিত করতে পারে না (Deviant behaviour is that behaviour which does not confirm to social expectation)।

B. Bhushan Zuvi ‘Dictionary of Sociology (1989) গ্রন্থে বলেছেন, বিচ্যুতি প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয় এমন আচরণ বুঝাতে যা বিধিনিষেধ বা অন্যের প্রত্যাশাকে লঙ্ঘন করে। এটি অননুমোদিত এবং শাস্তি বিধানের ব্যাপারে আগ্রহী (The term ‘deviance’ is used to refer to behaviour which infringe rules or the expectations of others and which attracts disapproval or punishment)।

David Dressler-এর মতে, বিচ্যুত আচরণকে বুঝতে হলে সামাজিক আদর্শের (ঝড়পরধষ হড়ৎসং) পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে হবে। সামাজিক আদর্শ থেকে নেতিবাচক ও ভিন্নতর আচরণই বিচ্যুত আচরণ। Dressler-এর ভাষায়,  “Deviant behaviour is the behaviour that deviates….. . Deviant behaviour that varies significantly in direction or degree from the social norm of that behaviour.”

উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি যখন সামাজিক রীতি-নীতি, আইন-কানুন ও আদর্শানুসারে কাজ করে না, তখন সে ব্যক্তিকে ‘বিচ্যুত ব্যক্তি’। সামাজিক রীতি-নীতি বিবেচনায় ঐ বিচ্যুত ব্যক্তির কার্যকলাপ ও আচরণ, অপ্রত্যাশিত ও নৈতিক আদর্শ পরিপন্থী। মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাব, সমকামিতা, গর্ভপাত, আত¥হত্যা, দুর্নীতি, প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বিচ্যুত আচরণ হিসেবে পরিগণিত।

বিচ্যুত আচরণের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Deviant Behaviour)

বিচ্যুত আচরণের কতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যথা— 

  • বিচ্যুত আচরণ আচরণবিধি ও মূল্যবোধ পরিপন্থী;
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিকভাবে নিন্দনীয় হলেও আইনগতভাবে দ-নীয় নয়;
  • আচরণের অস্বাভাবিক রূপ হচ্ছে বিচ্যুত আচরণ;
  • এটি সমাজের অপ্রত্যাশিত এবং অবাঞ্ছিত;
  • বিচ্যুত আচরণ ব্যক্তিগত, আদর্শগত এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিকর;
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে;
  • বিচ্যুত আচরণ আপেক্ষিক। সময় ও সমাজভেদে এর মাত্রাগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া এবং সামাজিকীকরণের ফল। এটি সামাজিক প্রপঞ্চও বটে। সমাজের বাইরে কোনো বিচ্যুতি নেই।
  • বিচ্যুত আচরণ সামাজিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত। যেমন— শিল্প সমাজে জ্ঞাতিত্ব বা প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক খুব কমই বিকশিত হয়। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে চাইলে তা বিচ্যুত আচরণ বলে গণ্য করা হয়।
  • বিচ্যুত আচরণ কখনো কখনো সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। চিরায়ত নিয়ম-কানুন ও সামাজিক বিধিনিষেধের বাইরে গিয়ে ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায় যেসব বিচ্যুত আচরণ করেছিলেন তা স্বাধীনতা ও সামাজিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করেছিল।

বিচ্যুত আচরণের প্রকারভেদ বা ধরনসমূহ (Types of Deviant Behaviour)

সমাজে নানা ধরনের বিচ্যুত আচরণ পরিলড়্গতি হয়। যেমন— Edwin Limert তাঁর ‘Social Pathology’ গ্রন্থে দুই ধরনের বিচ্যুত আচরণের উলেস্নখ করেছেন। যথা—

  • মুখ্য বিচ্যুত আচরণ (Primary deviance) এবং
  • গৌণ বিচ্যুত আচরণ (Secondary deviance)। 

মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ প্রদর্শন করলে তা মুখ্য বিচ্যুত আচরণ। যেমন: সংক্ষিপ্ত কাপড়ে মেয়েদের বাইরে চলাফেরা, শ্রেণিকড়্গরে মধ্যে ধূমপান করা ইত্যাদি। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ হচ্ছে গৌণ বিচ্যুতি। যেমন: বড়দের সালাম না দেয়া, জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পারাপার না হওয়া, অশস্নীল ভাষা প্রয়োগ করা ইত্যাদি। 

বিচ্যুত আচরণের আরো কয়েকটি ধরন সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো—

  • আচরণের বিচ্যুতি (Deviance of behaviour): বিচ্যুতির ধরনের মধ্যে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ হচ্ছে আচরণগত বিচ্যুতি। এ ধরনের বিচ্যুতির ফলেই সমাজের অধিকাংশ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। জুয়াখেলা, সমকামিতা, পরকীয়া প্রেম, পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি আচরণের বিচ্যুতি।
  • অভ্যাসের বিচ্যুতি (Habitual deviance): অভ্যাসগত বিপথগামিতা অনেক সময় সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাদকাসক্তি, জুয়াখেলা, নারীর প্রতি লোলুপ মনোভাব ব্যক্তিকে বেপরোয়া করে তুলতে পারে।
  • মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি (Psychological deviance): আচরণের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির প্রকাশ ঘটে। অতিরিক্ত আবেগ মানুষকে উদাসীন, স্বার্থপর ও লোভী করে তোলে। ফলে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
  • সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি (Cultural deviance): সাংস্কৃতিক ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের এ ধরনের বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্যুত মানুষের কর্মকাণ্ড সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং সাংস্কৃতিক বিচ্যুতিও অনেক বিচ্যুত আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

শেষকথা

বিচ্যুতিমূলক আচরণ যে-কোনো সমাজের জন্যই নানামুখী সমস্যার কারণ। বিভিন্নভাবে ব্যক্তির মধ্যে বিচ্যুত আচরণ দেখা দিতে পারে। বিচ্যুত আচরণ সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের কাম্য নয়। মাত্রাতিরিক্ত বিচ্যুত আচরণের ফলে সমাজের পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ যেমন নিশ্চিত হয় না, তেমনি উন্নত, সুষ্ঠু, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্থ হয়। এজন্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সমাজবিরোধী, সামাজিক মূল্যবোধ ও আদর্শ পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য সামাজিক নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক।