ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল: আধুনিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অগ্রদূত

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামের এই মহীয়সী নারী ১৮২০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরীর এক অভিজাত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন উইলিয়াম শোর নাইটিঙ্গেল ও ফ্রান্সেস নাইটিঙ্গেল। খুব অল্পবয়স থেকেই ফ্লোরেন্স সমাজসেবা ও মানবসেবায় নিজের ভূমিকা রেখেছেন।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (Florence Nightingale) ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ (Lady with the Lamp) নামে পরিচিত। ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে যিনি ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করেছেন, সেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (১৮২০-১৯১০) ছিলেন যুক্তরাজ্যের একজন নার্স, সমাজ সংস্কারক ও পরিসংখ্যানবিদ। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় হচ্ছে তিনি আধুনিক নার্সিং বিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা। নার্সিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।

ক্রাইমিয়ান যুদ্ধে নার্স হিসেবে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের যে অভিজ্ঞতা সেটিই স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তাঁর মধ্যে আধুনিক ধ্যান-ধারণার বিকাশ লাভ করতে সাহায্য করেছে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে ভিক্টোরিয়ান সংস্কৃতির আইকন হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি যে সংস্কার সাধন করেছেন তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পুরো বিশ্বে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামের এই মহীয়সী নারী ১৮২০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরীর এক অভিজাত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন উইলিয়াম শোর নাইটিঙ্গেল ও ফ্রান্সেস নাইটিঙ্গেল। খুব অল্পবয়স থেকেই ফ্লোরেন্স সমাজসেবা ও মানবসেবায় নিজের ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের পারিবারিক ভূসম্পত্তির আশপাশের গ্রামগুলোতে গরিব ও অসুস্থ রোগীদের সহায়তার কাজে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৬ বছর বয়সে এসে তিনি বুঝতে পারলেন যে সেবিকা হওয়ার ব্রত নিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে এবং এটা তাঁর এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। ভিক্টোরিয়ান যুগে তাঁর মত ধনী ও অভিজাত পরিবারের একজন সুন্দরী তরুণী নার্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে তা যে-কোনো বাবা-মায়ের কাছে কল্পনাতীত ছিল। বিয়ের জন্য ধনী ও সুদর্শন কোনো যুবককে বেছে নেয়ার পরিবর্তে, বাবা-মায়ের আপত্তি উপেক্ষা করে, ১৮৪৪ সালে তিনি জার্মানির লুথেরান হসপিটাল অফ পাস্ত্তর ফ্লিয়েডনায় নার্সিংয়ের ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হন। ১৮৫০ সালের শুরুর দিকে তিনি লন্ডনে প্রত্যাবর্তন করেন ও মিডেলসেক্স হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা কর্তৃপক্ষকে বিমুগ্ধ করে ও তিনি এক বছরের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। যখন কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখন নাইটিঙ্গেল হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উন্নতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমাতে সাহায্য করেন।

ক্রাইমিয়ান যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৫৩ সালের অক্টোবর মাসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য দখল নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্যদের কৃষ্ণসাগরে পাঠানো হয় যেখানে খাদ্যের রসদ প্রায় ফুরিয়ে আসছিল। ১৮৫৪ সালে ১৮০০০ সৈন্য সেনাবাহিনীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি ছিল। সেই সময় ক্রাইমিয়ার কোনো হাসপাতালে নারী নার্স ছিল না। নারী নার্সদের নিয়ে দুর্নাম থাকার কারণে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রক অফিসগুলো নারীদের নার্স হিসেবে নিতে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু আলমা যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে অসুস্থ ও আহত সৈন্যদের প্রতি অবহেলার কারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এসব সৈন্যরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল কারণ পুরো ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালনা করার মতো লোকবল ছিল না। আর অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশ এই অবস্থাকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ১৮৫৪ সালের শেষের দিকে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সিডনি হারবার্ট থেকে একটি চিঠি পান। তিনি তাঁকে কিছু সেবিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্রাইমিয়াতে এসে আহত ও অসুস্থ সৈন্যদের দেখভাল করার অনুরোধ করেন। তিনি এতে সাডা দেন। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বিভিন্ন ধর্মানুসারী ৩৪ জন সেবিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্রাইমিয়াতে রওনা হয়ে যান।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

যদিও তাদের ওখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল কিন্তু স্কেটারিতে ব্রিটিশ বেইস হাসপাতালে তারা যা দেখলেন তা ছিল এক কথায় অবর্ণনীয়। পরিবেশ ছিল নোংরা আবর্জনায় ভরপুর, জিনিসপত্রের সরবরাহ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে কম, কর্মরত লোকজনের অসহযোগিতা ছিল চরমে আর হাসপাতালে রোগীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল কলেরা ওয়ার্ডে কাজ করতে শুরু করলেন। তাঁর আসার পাঁচ দিনের মাথায় বালাকলাভা ও ইনকারম্যান যুদ্ধ থেকে আহত সৈন্যরা স্কেটারিতে আসতে শুরু করল। তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে সমস্ত সুযোগ-সুবিধার উপর বড়ো ধরনের চাপ পড়তে শুরু করল। নাইটিঙ্গেলের ভাষায় এটা তখন হয়ে উঠেছিল ‘নরকরাজ্য’।

ইসমত আরা জুলী
ইসমত আরা জুলী একজন সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাহিত্য সমালোচক। প্রবন্ধ, কবিতা, ছোটোগল্প, অনুবাদ-সাহিত্য ও শিশু-সাহিত্যে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের একজন তালিকাভুক্ত সংবাদ পাঠিকা।
এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

সতেরো শতকের সাত গম্বুজ মসজিদ

সাত গম্বুজ মসজিদ ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত মুঘল আমলে নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসজিদটি চারটি মিনারসহ সাতটি গম্বুজের কারণে মসজিদের নাম হয়েছে 'সাতগম্বুজ...

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন

১২ জানুয়ারি  মাস্টারদা সূর্য সেনের  ফাঁসিদিবস । ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি...

কে২: বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ

কে২ বা কেটু (K2) এভারেস্ট পর্বতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার (২৮,২৫১ ফুট)। হিমালয় পর্বতমালার...

শিরক কী, মানুষ কীভাবে শিরকে লিপ্ত হয়

ইসলাম একমাত্র ধর্ম যেখানে স্রষ্টা তার কোনো ক্ষমতাতেই কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করেননি। অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র একক ইলাহ যিনি সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। সৃষ্টির...
আরও পড়তে পারেন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

জীবনী: সুভাষ মুখোপাধ্যায়

বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একটি হলো "ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত"; এই উক্তিটি কার জানেন? উক্তিটি পশ্চিমবঙ্গের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের।...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here