বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল: আধুনিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অগ্রদূত

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামের এই মহীয়সী নারী ১৮২০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরীর এক অভিজাত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন উইলিয়াম শোর নাইটিঙ্গেল ও ফ্রান্সেস নাইটিঙ্গেল। খুব অল্পবয়স থেকেই ফ্লোরেন্স সমাজসেবা ও মানবসেবায় নিজের ভূমিকা রেখেছেন।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (Florence Nightingale) ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ (Lady with the Lamp) নামে পরিচিত। ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে যিনি ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করেছেন, সেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (১৮২০-১৯১০) ছিলেন যুক্তরাজ্যের একজন নার্স, সমাজ সংস্কারক ও পরিসংখ্যানবিদ। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় হচ্ছে তিনি আধুনিক নার্সিং বিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা। নার্সিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।

ক্রাইমিয়ান যুদ্ধে নার্স হিসেবে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের যে অভিজ্ঞতা সেটিই স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তাঁর মধ্যে আধুনিক ধ্যান-ধারণার বিকাশ লাভ করতে সাহায্য করেছে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে ভিক্টোরিয়ান সংস্কৃতির আইকন হিসেবেও অভিহিত করা হয়। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি যে সংস্কার সাধন করেছেন তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পুরো বিশ্বে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামের এই মহীয়সী নারী ১৮২০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরীর এক অভিজাত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন উইলিয়াম শোর নাইটিঙ্গেল ও ফ্রান্সেস নাইটিঙ্গেল। খুব অল্পবয়স থেকেই ফ্লোরেন্স সমাজসেবা ও মানবসেবায় নিজের ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের পারিবারিক ভূসম্পত্তির আশপাশের গ্রামগুলোতে গরিব ও অসুস্থ রোগীদের সহায়তার কাজে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৬ বছর বয়সে এসে তিনি বুঝতে পারলেন যে সেবিকা হওয়ার ব্রত নিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে এবং এটা তাঁর এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। ভিক্টোরিয়ান যুগে তাঁর মত ধনী ও অভিজাত পরিবারের একজন সুন্দরী তরুণী নার্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে তা যে-কোনো বাবা-মায়ের কাছে কল্পনাতীত ছিল। বিয়ের জন্য ধনী ও সুদর্শন কোনো যুবককে বেছে নেয়ার পরিবর্তে, বাবা-মায়ের আপত্তি উপেক্ষা করে, ১৮৪৪ সালে তিনি জার্মানির লুথেরান হসপিটাল অফ পাস্ত্তর ফ্লিয়েডনায় নার্সিংয়ের ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হন। ১৮৫০ সালের শুরুর দিকে তিনি লন্ডনে প্রত্যাবর্তন করেন ও মিডেলসেক্স হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা কর্তৃপক্ষকে বিমুগ্ধ করে ও তিনি এক বছরের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। যখন কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখন নাইটিঙ্গেল হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উন্নতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমাতে সাহায্য করেন।

ক্রাইমিয়ান যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৫৩ সালের অক্টোবর মাসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য দখল নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্যদের কৃষ্ণসাগরে পাঠানো হয় যেখানে খাদ্যের রসদ প্রায় ফুরিয়ে আসছিল। ১৮৫৪ সালে ১৮০০০ সৈন্য সেনাবাহিনীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি ছিল। সেই সময় ক্রাইমিয়ার কোনো হাসপাতালে নারী নার্স ছিল না। নারী নার্সদের নিয়ে দুর্নাম থাকার কারণে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রক অফিসগুলো নারীদের নার্স হিসেবে নিতে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু আলমা যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে অসুস্থ ও আহত সৈন্যদের প্রতি অবহেলার কারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এসব সৈন্যরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল কারণ পুরো ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে পরিচালনা করার মতো লোকবল ছিল না। আর অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশ এই অবস্থাকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ১৮৫৪ সালের শেষের দিকে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল সিডনি হারবার্ট থেকে একটি চিঠি পান। তিনি তাঁকে কিছু সেবিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্রাইমিয়াতে এসে আহত ও অসুস্থ সৈন্যদের দেখভাল করার অনুরোধ করেন। তিনি এতে সাডা দেন। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বিভিন্ন ধর্মানুসারী ৩৪ জন সেবিকাকে সঙ্গে নিয়ে ক্রাইমিয়াতে রওনা হয়ে যান।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

যদিও তাদের ওখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল কিন্তু স্কেটারিতে ব্রিটিশ বেইস হাসপাতালে তারা যা দেখলেন তা ছিল এক কথায় অবর্ণনীয়। পরিবেশ ছিল নোংরা আবর্জনায় ভরপুর, জিনিসপত্রের সরবরাহ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে কম, কর্মরত লোকজনের অসহযোগিতা ছিল চরমে আর হাসপাতালে রোগীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল কলেরা ওয়ার্ডে কাজ করতে শুরু করলেন। তাঁর আসার পাঁচ দিনের মাথায় বালাকলাভা ও ইনকারম্যান যুদ্ধ থেকে আহত সৈন্যরা স্কেটারিতে আসতে শুরু করল। তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে সমস্ত সুযোগ-সুবিধার উপর বড়ো ধরনের চাপ পড়তে শুরু করল। নাইটিঙ্গেলের ভাষায় এটা তখন হয়ে উঠেছিল ‘নরকরাজ্য’।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

ইসমত আরা জুলী
ইসমত আরা জুলী একজন সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাহিত্য সমালোচক। প্রবন্ধ, কবিতা, ছোটোগল্প, অনুবাদ-সাহিত্য ও শিশু-সাহিত্যে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের একজন তালিকাভুক্ত সংবাদ পাঠিকা।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।