০২:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

শিক্ষার ইতিহাস: ভারতীয় শিক্ষা কমিশন বা হান্টার কমিশন

জারিন তাসনিম
  • প্রকাশ: ০৪:১৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২
  • / ১৩৯৩০ বার পড়া হয়েছে

স্যার উইলিয়াম হান্টার

হান্টার কমিশন সরকারিভাবে ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশন নামে পরিচিত। ১৮৫৪ সালের উডে ডেসপ্যাচে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তন্মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান প্রদানের রীতি গ্রহণ এবং ধীরে ধীরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও পরিকল্পনাসমূহ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনমনে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের গভর্নর লর্ড রিপন ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (Indian Education Commission) গঠন করেন স্যার উইলিয়াম হান্টারকে সভাপতি করে। উইলিয়াম হান্টাররের নাম অনুসারেই ভারতীয় শিক্ষা কমিশন ‘হান্টার কমিশন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

স্যার উইলিয়ম উইলসন হান্টারকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিশনের অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন  আনন্দমোহন বসু, এ. ডব্লিউ ক্রফট্ (Director of Public Instruction, Bengal),  ভূদেব মুখোপাধ্যায়, মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, কাশীনাথ ত্রিম্বক তীলং এবং স্যার সৈয়দ আহমদ খান। অবশ্য সৈয়দ আহমদ খান পরবর্তীসময়ে তাঁর পুত্র সৈয়দ মুহম্মদের পক্ষে নিজের নিযুক্তি প্রত্যাহার করে নেন।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় কমিশনের সুপারিশ

কমিশন দেশজ পদ্ধতিতে ভারতীয়দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত স্কুলগুলোর অনুমোদন এবং সম্প্রসারণ, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রবর্তন, শিক্ষকদের শিক্ষণ ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ বা পাঠক্রম নির্ধারণ সম্পর্কে স্বাধীনতা প্রদান ও সহানুভূতিসূচক পরিদর্শন ব্যবস্থার আয়োজনের মাধ্যমে স্কুলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার উপর জোর দেয়। 

এসব স্কুলের প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও পরিদর্শনের সরাসরি দায়িত্ব মিউনিসিপ্যালিটি এবং লোকাল বোর্ডের উপর অর্পণ করার সুপারিশ করা হয়। তবে সরকারি শিক্ষা বিভাগও এরূপ দেশজ বিদ্যালয়গুলোর বিদ্যালয় নির্বাচনে সহজ হবে। এভাবে লুপ্তপ্রায় প্রাচীন দেশীয় বিদ্যালয় সরকারি সাহায্য লাভের সুযোগ পায়। কিন্তু কমিশনের এই সুপারিশ কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করেন। ফলে কালক্রমে দেশীয় বিদ্যালয়গুলো অবহেলায় অনাদরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

প্রাথমিক শিক্ষা

হান্টার কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ও উন্নয়নের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করে। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা হল জনশিক্ষা বিস্তারের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তাই কমিশন প্রাথমকি শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য নিম্ন বর্ণিত প্রশাসনিক সুপারিশ প্রদান করে।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থা

প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে একটি জিলা অথবা মিউনিসিপ্যাল বোর্ড স্ব-স্ব এলাকার স্কুলগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এর জন্য স্বায়ত্তশাসন কর্তৃপক্ষ সকল সদস্য অথবা কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে স্কুল বোর্ড গঠন করতে পারে। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজে অথবা নিজেদের তৈরি স্কুলবোর্ড স্ব-স্ব এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ব্যবস্থা করবে। এর জন্য কোথাও নতুন স্কুল স্থাপন এবং পুরাতন স্কুলগুলোর উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোর দায়িত্বও ধীরে ধীরে এই স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উপর অর্পণ করার সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার পরিপূর্ণ দায়িত্ব একটি সংস্থার উপর অর্পণ করলে নিশ্চয়ই প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি হবে-এই ছিল কমিশনের ধারণা। কিন্তু কার্যত ফল হল বিপরীত। কারণ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ^নিতান্ত দুর্বল। ফলে তারা এত বড় গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারে নি। 

প্রাথমিক শিক্ষার অর্থায়ন

প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য কমিশন অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে কয়েকটি মূল্যবান সুপারিশ করেন। 

  • প্রত্যেক জেলা ও মিউনিসিপ্যাল বোর্ড প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি বিশেষ অর্থভাণ্ডার সংরক্ষণ করবে।
  • শিক্ষা সংক্রান্ত সকল ব্যয় বরাদ্দের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রাধিকার ও অধিকতর পরিমাণে দাবী থাকবে।
  • প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় সংঙ্কুলানের জন্য এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ভার সরকারকে বহন করতে হবে।
  • প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের ব্যয় ও নর্মাল স্কুল পরিচালনার ব্যয় প্রাদেশিক সরকার বহন করবে। 

প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ্যসূচি সম্পর্কে কমিশনের সুপারিশ ছিল যে, প্রয়োজনভিত্তিক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পাঠক্রমে থাকবে গণিত, হিসাব-শিক্ষা, পরিমিতি বিজ্ঞান, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও শরীর বিজ্ঞান। কৃষি, শিল্প ও স্বাস্থ্য শিক্ষার ব্যবহারিক বিষয়ের কথাও রিপোর্টেউল্লেখ করা হয়। কমিশন আঞ্চলিক প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে পাঠ্যপুস্তক রচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাই পাঠ্যপুস্তক রচনা ও পাঠ্যসূচি নির্ণয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন হবে বলে সুপারিশ করা হয়। এর ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রয়োজনভিত্তিক নমনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে। 

শিক্ষক প্রশিক্ষণের দিকেও কমিশন গুরুত্বারোপ করে এবং প্রত্যেক মহকুমা পরিদর্শকের তত্ত্বাবধানে কমপক্ষে একটি করে শিক্ষা প্রশিক্ষণ স্থাপনের জন্য সুপারিশ করে। 

মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহদান

মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় কমিশনের সুপারিশ

মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থানা প্রসঙ্গে কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ক্রমশ সরকারি নিয়ন্ত্রণও উদ্যোগ পত্যাহার করে আর্থিক অনুদানের সাহায্যে বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করে। উপরন্তু বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য কমিশনসুপারিশ করে যে, সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের পরিচালনা সভা স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব বিদ্যালয়েরবেতনের হার নির্ধারণ করতে পারবে। তবে মাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চমান সংরক্ষণের জন্য প্রতি জেলায় একটি করে উচ্চমানের সরকারি আদর্শ বিদ্যালয় থাকবে। তাছাড়া অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সরকার নিজ নিয়ন্ত্রণাধীনে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারবে। 

মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম

ইতোপূর্বে মাধ্যামিক বিদ্যালয় শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে শুধু একমুখী তত্ত্বগত বিষয় পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা ছিল। অথচ যুগের দাবী ছিল ব্যবহারিক শিক্ষা প্রবর্তনের দিকে। তাই কমশিন উচ্চমানের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেেক দুটি অংশে ভাগ করার পরামর্শ দেন, যথা-‘এ’ কোর্স এবং ‘বি’ কোর্স। ‘এ’ কোর্স-এ থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশের পরীক্ষার পাঠ্যবিষয় এবং ‘বি’ কোর্স-এ থাকবে সাহিত্য বহির্ভূত, কারিগরি ও বৃত্তিশিক্ষার জন্য ব্যবহারিক পাঠ্যবিষয়।

মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যম 

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মাধ্যম কি হবে সে সম্পর্কে কমিশন নীরব ছিলেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে, কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ইংরেজি ভাষাকে মাধ্যম করে শিক্ষাপরিচালনার পক্ষপাতি ছিলেন। 

উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় হান্টার কমিশনের সুপারিশ

  • প্রতিটি কলেজের আর্থিক সাহায্য, শিক্ষক ও কর্মচারির সংখ্যা, পরিচালনার খরচ, দক্ষতা, স্থানীয় চাহিদা প্রভৃতি যাচাই করে দিতে হবে।
  • উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারকরতে হবে, তবে যে, সমস্ত কলেজের উৎকর্ষের উপর শিক্ষার মান নির্ভর করে, সে সমস্ত কলেজের পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের হাতে থাকতে পারে।
  • সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলির চাহিদা অনুযায়ী তাদের গৃহ নির্মাণ ও গৃহ মোরামতের জন্য অথবা আসবাবপত্র, গ্রন্থাগারের পুস্তক বা উপকরণ ইত্যাদি ক্রয় করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হবে।
  • প্রতিটি কলেজে কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য বিনাবেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। 
  • মেধাবী শিক্ষার্থীগণ যাতে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে পারে তার সুযোগ সুবিধা দিতে হবে।
  • বড়ো বড়ো কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ঐচ্ছিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করতে হবে যাতে বিভিন্ন মানসিক ক্ষমতাবিশিষ্ট শিক্ষার্থীরা তাদের সামর্থ্য ও প্রয়োজনমত শিক্ষা অর্জন করার সুযোগ পেতে পারে। 
  • উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
  • ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে ভারতীয়। ডিগ্রিধারীগণকে সরকারি কলেজসমূহে শিক্ষাদানের বেলায় বিশেষ সুযোগ দিতে হবে।
  • ধর্মীয় মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে এমন একখানি নৈতিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে যা সরকারি ও বেসরকারি কলেজে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। 
  • প্রত্যেক সেশনে কলেজের অধ্যাপকগণ নিজ ক্লাসগুলোতে নিয়মিতভাবে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে বক্তৃতা প্রদানের ব্যবস্থা করবেন।
  • এ কোর্স (A Course) এবং বি কোর্স (B Course) চালু। (এখানে ‘এ কোর্স’ হলো সাধারণ শিক্ষা এবং ‘বি কোর্স’ হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষা।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

জারিন তাসনিম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্বাধীন লেখক।
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

শিক্ষার ইতিহাস: ভারতীয় শিক্ষা কমিশন বা হান্টার কমিশন

প্রকাশ: ০৪:১৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২

হান্টার কমিশন সরকারিভাবে ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশন নামে পরিচিত। ১৮৫৪ সালের উডে ডেসপ্যাচে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তন্মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান প্রদানের রীতি গ্রহণ এবং ধীরে ধীরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও পরিকল্পনাসমূহ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনমনে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের গভর্নর লর্ড রিপন ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (Indian Education Commission) গঠন করেন স্যার উইলিয়াম হান্টারকে সভাপতি করে। উইলিয়াম হান্টাররের নাম অনুসারেই ভারতীয় শিক্ষা কমিশন ‘হান্টার কমিশন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

স্যার উইলিয়ম উইলসন হান্টারকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিশনের অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন  আনন্দমোহন বসু, এ. ডব্লিউ ক্রফট্ (Director of Public Instruction, Bengal),  ভূদেব মুখোপাধ্যায়, মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, কাশীনাথ ত্রিম্বক তীলং এবং স্যার সৈয়দ আহমদ খান। অবশ্য সৈয়দ আহমদ খান পরবর্তীসময়ে তাঁর পুত্র সৈয়দ মুহম্মদের পক্ষে নিজের নিযুক্তি প্রত্যাহার করে নেন।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় কমিশনের সুপারিশ

কমিশন দেশজ পদ্ধতিতে ভারতীয়দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত স্কুলগুলোর অনুমোদন এবং সম্প্রসারণ, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রবর্তন, শিক্ষকদের শিক্ষণ ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ বা পাঠক্রম নির্ধারণ সম্পর্কে স্বাধীনতা প্রদান ও সহানুভূতিসূচক পরিদর্শন ব্যবস্থার আয়োজনের মাধ্যমে স্কুলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার উপর জোর দেয়। 

এসব স্কুলের প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও পরিদর্শনের সরাসরি দায়িত্ব মিউনিসিপ্যালিটি এবং লোকাল বোর্ডের উপর অর্পণ করার সুপারিশ করা হয়। তবে সরকারি শিক্ষা বিভাগও এরূপ দেশজ বিদ্যালয়গুলোর বিদ্যালয় নির্বাচনে সহজ হবে। এভাবে লুপ্তপ্রায় প্রাচীন দেশীয় বিদ্যালয় সরকারি সাহায্য লাভের সুযোগ পায়। কিন্তু কমিশনের এই সুপারিশ কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করেন। ফলে কালক্রমে দেশীয় বিদ্যালয়গুলো অবহেলায় অনাদরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

প্রাথমিক শিক্ষা

হান্টার কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ও উন্নয়নের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করে। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা হল জনশিক্ষা বিস্তারের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তাই কমিশন প্রাথমকি শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য নিম্ন বর্ণিত প্রশাসনিক সুপারিশ প্রদান করে।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থা

প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে একটি জিলা অথবা মিউনিসিপ্যাল বোর্ড স্ব-স্ব এলাকার স্কুলগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এর জন্য স্বায়ত্তশাসন কর্তৃপক্ষ সকল সদস্য অথবা কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে স্কুল বোর্ড গঠন করতে পারে। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান নিজে অথবা নিজেদের তৈরি স্কুলবোর্ড স্ব-স্ব এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ব্যবস্থা করবে। এর জন্য কোথাও নতুন স্কুল স্থাপন এবং পুরাতন স্কুলগুলোর উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোর দায়িত্বও ধীরে ধীরে এই স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উপর অর্পণ করার সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার পরিপূর্ণ দায়িত্ব একটি সংস্থার উপর অর্পণ করলে নিশ্চয়ই প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি হবে-এই ছিল কমিশনের ধারণা। কিন্তু কার্যত ফল হল বিপরীত। কারণ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ^নিতান্ত দুর্বল। ফলে তারা এত বড় গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারে নি। 

প্রাথমিক শিক্ষার অর্থায়ন

প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য কমিশন অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে কয়েকটি মূল্যবান সুপারিশ করেন। 

  • প্রত্যেক জেলা ও মিউনিসিপ্যাল বোর্ড প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি বিশেষ অর্থভাণ্ডার সংরক্ষণ করবে।
  • শিক্ষা সংক্রান্ত সকল ব্যয় বরাদ্দের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রাধিকার ও অধিকতর পরিমাণে দাবী থাকবে।
  • প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় সংঙ্কুলানের জন্য এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ভার সরকারকে বহন করতে হবে।
  • প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের ব্যয় ও নর্মাল স্কুল পরিচালনার ব্যয় প্রাদেশিক সরকার বহন করবে। 

প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ্যসূচি সম্পর্কে কমিশনের সুপারিশ ছিল যে, প্রয়োজনভিত্তিক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পাঠক্রমে থাকবে গণিত, হিসাব-শিক্ষা, পরিমিতি বিজ্ঞান, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও শরীর বিজ্ঞান। কৃষি, শিল্প ও স্বাস্থ্য শিক্ষার ব্যবহারিক বিষয়ের কথাও রিপোর্টেউল্লেখ করা হয়। কমিশন আঞ্চলিক প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে পাঠ্যপুস্তক রচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাই পাঠ্যপুস্তক রচনা ও পাঠ্যসূচি নির্ণয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন হবে বলে সুপারিশ করা হয়। এর ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রয়োজনভিত্তিক নমনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে। 

শিক্ষক প্রশিক্ষণের দিকেও কমিশন গুরুত্বারোপ করে এবং প্রত্যেক মহকুমা পরিদর্শকের তত্ত্বাবধানে কমপক্ষে একটি করে শিক্ষা প্রশিক্ষণ স্থাপনের জন্য সুপারিশ করে। 

মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহদান

মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় কমিশনের সুপারিশ

মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থানা প্রসঙ্গে কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ক্রমশ সরকারি নিয়ন্ত্রণও উদ্যোগ পত্যাহার করে আর্থিক অনুদানের সাহায্যে বেসরকারি উদ্যোগকেও উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করে। উপরন্তু বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য কমিশনসুপারিশ করে যে, সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের পরিচালনা সভা স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব বিদ্যালয়েরবেতনের হার নির্ধারণ করতে পারবে। তবে মাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চমান সংরক্ষণের জন্য প্রতি জেলায় একটি করে উচ্চমানের সরকারি আদর্শ বিদ্যালয় থাকবে। তাছাড়া অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সরকার নিজ নিয়ন্ত্রণাধীনে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারবে। 

মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম

ইতোপূর্বে মাধ্যামিক বিদ্যালয় শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে শুধু একমুখী তত্ত্বগত বিষয় পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা ছিল। অথচ যুগের দাবী ছিল ব্যবহারিক শিক্ষা প্রবর্তনের দিকে। তাই কমশিন উচ্চমানের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেেক দুটি অংশে ভাগ করার পরামর্শ দেন, যথা-‘এ’ কোর্স এবং ‘বি’ কোর্স। ‘এ’ কোর্স-এ থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশের পরীক্ষার পাঠ্যবিষয় এবং ‘বি’ কোর্স-এ থাকবে সাহিত্য বহির্ভূত, কারিগরি ও বৃত্তিশিক্ষার জন্য ব্যবহারিক পাঠ্যবিষয়।

মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যম 

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মাধ্যম কি হবে সে সম্পর্কে কমিশন নীরব ছিলেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে, কমিশন মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ইংরেজি ভাষাকে মাধ্যম করে শিক্ষাপরিচালনার পক্ষপাতি ছিলেন। 

উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় হান্টার কমিশনের সুপারিশ

  • প্রতিটি কলেজের আর্থিক সাহায্য, শিক্ষক ও কর্মচারির সংখ্যা, পরিচালনার খরচ, দক্ষতা, স্থানীয় চাহিদা প্রভৃতি যাচাই করে দিতে হবে।
  • উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারকরতে হবে, তবে যে, সমস্ত কলেজের উৎকর্ষের উপর শিক্ষার মান নির্ভর করে, সে সমস্ত কলেজের পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের হাতে থাকতে পারে।
  • সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলির চাহিদা অনুযায়ী তাদের গৃহ নির্মাণ ও গৃহ মোরামতের জন্য অথবা আসবাবপত্র, গ্রন্থাগারের পুস্তক বা উপকরণ ইত্যাদি ক্রয় করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হবে।
  • প্রতিটি কলেজে কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য বিনাবেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। 
  • মেধাবী শিক্ষার্থীগণ যাতে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে পারে তার সুযোগ সুবিধা দিতে হবে।
  • বড়ো বড়ো কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ঐচ্ছিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করতে হবে যাতে বিভিন্ন মানসিক ক্ষমতাবিশিষ্ট শিক্ষার্থীরা তাদের সামর্থ্য ও প্রয়োজনমত শিক্ষা অর্জন করার সুযোগ পেতে পারে। 
  • উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
  • ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে ভারতীয়। ডিগ্রিধারীগণকে সরকারি কলেজসমূহে শিক্ষাদানের বেলায় বিশেষ সুযোগ দিতে হবে।
  • ধর্মীয় মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে এমন একখানি নৈতিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে যা সরকারি ও বেসরকারি কলেজে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। 
  • প্রত্যেক সেশনে কলেজের অধ্যাপকগণ নিজ ক্লাসগুলোতে নিয়মিতভাবে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে বক্তৃতা প্রদানের ব্যবস্থা করবেন।
  • এ কোর্স (A Course) এবং বি কোর্স (B Course) চালু। (এখানে ‘এ কোর্স’ হলো সাধারণ শিক্ষা এবং ‘বি কোর্স’ হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষা।