বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার লক্ষ্য

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে গবেষণার একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। গবেষণা বা রিসার্চ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় বিজ্ঞানীদের কার্যাবলি। তবে প্রতিটি গবেষণার একটি লক্ষ্য থাকতে হবে। আমাদের দেশে গবেষণার গতিপ্রকৃতি লক্ষ্যকেন্দ্রিক কিনা এই বিষয়ে তেমন কোনো বিচার বিশ্লেষণ নেই। আবার অনেক সময় গবেষকরাও গবেষণার লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারিত হবে বা কীভাবে লক্ষ্য অর্জনে গবেষণা করা দরকার— সেই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না।

আমাদের দেশে যে গবেষণাগুলো হচ্ছে তার ফলাফল কোনো সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হবে কিনা—সেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এজন্য গবেষণা শুরু করার আগে সেই গবেষণা থেকে কি লক্ষ্য অর্জিত হবে এবং এটি কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে যে গবেষণাগুলো হচ্ছে তার অধিকাংশরই বাস্তব প্রয়োগ বা ব্যবহার নেই। শিল্পক্ষেত্রে গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তির উন্নয়নে আমাদের দেশের গবেষকদের যেভাবে কাজ করা উচিত, সেভাবে তারা করতে পারছেন না। ফলে উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রযুক্তি আমদানি করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এতে করে প্রচুর অর্থ আমাদের দেশ থেকে বাইরে চলে যায়। যার প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতির উপর পড়ে। দেশে প্রযুক্তির ব্যবহারকে দুভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত বিদেশ থেকে প্রযুক্তি আমদানি করে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করা হলেও সময়ের সঙ্গে এই প্রযুক্তির যে উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটছে, তা নিয়ে আমাদের গবেষকরা ভাবছেন না।

আবার শিল্পকারখানার মালিকদের মধ্যেও গবেষণা যে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাতে পারে সে বিষয়টি বিবেচনা করেন না। ফলে শিল্পকারখানায় বিদ্যমান প্রযুক্তি যখন সময়ের সঙ্গে পুরাতন হয়ে যায় তখন শিল্প উদ্যোক্তারা আবার উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করে থাকে। কিন্তু বিষয়টি এভাবে ঘটার কথা ছিল না। বরং শিল্প উদ্যোক্তারা তাদের যে শিল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করে চলেছে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তার কোনো উন্নয়ন ঘটছে কিনা এটি দেশের গবেষকদের দেখার দায়িত্ব দিতে পারতেন।

এছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে রিচার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপন করে সেখানে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তনের ধারণা পেতেন। ইন্ড্রাস্ট্রির গবেষকদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের গবেষণা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বিদ্যমান শিল্প ধারণাকে ধীরে ধীরে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে গবেষকদের কোন কোন প্রযুক্তির ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে আর কোন কোন প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এই বিষয়গুলো বিভিন্ন তথ্যের উৎস থেকে সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। আধুনিক শিল্প ধারণা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন বিষয়ের যে জার্নালগুলো রয়েছে তা থেকে গবেষকদের নিয়মিত ধারণা নিতে হবে।

আবার নিজেদের গবেষণার অর্জিত ফলাফলকে গবেষণাপত্র হিসেবে বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। উদ্ভাবনকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়ে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প প্রযুক্তির ধারণাকে দেশজ প্রযুক্তিতে পরিণত করার পদক্ষেপ থাকতে হবে।

গবেষণা করার জন্য গবেষকদের গবেষণার মানসিকতা গড়ে তুলতে হয়। যেমন: আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণার জন্য কোনো ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার ছিল না। তিনটি জিনিস তার গবেষণার মূল উপাদান হিসেবে বিদ্যমান ছিল। এগুলো হলো- কাগজ, কলম ও চিন্তাশক্তি। এখানে চিন্তাশক্তিই গবেষণার মানসিকতা গড়ে তুলতে ও নতুন প্রযুক্তি ধারণা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মেধাশক্তির উৎকর্ষতার জন্য শিশুর মাতৃগর্ভ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবেশগত ও কৌশলগত পদ্ধতির প্রয়োগ প্রয়োজন হয়। যেমন— ইসরাইলের মানুষদের মেধাশক্তি পৃথিবীর সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়। এর কারণ জন্মগত নয় বরং মেধাশক্তি বিকাশের বিভিন্ন প্রক্রিয়াই এর কারণ।

আমাদের দেশের মানুষের মেধাশক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে কীভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায় সংযুক্ত করে বিজ্ঞান ও কর্মমুখী করে গড়ে তোলা যায় সেই বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য চর্চা করলেও বিজ্ঞান চর্চাও করে গেছেন। বিজ্ঞানের নিজের ধারণা তিনি আলবার্ট আইনস্টাইন, জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো বিজ্ঞানীদের আদান প্রদান করেছেন। এর মাধ্যমে সাহিত্য যেমন বিজ্ঞানকে সাহায্য করেছে, তেমনি সাহিত্য বিজ্ঞানের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। অমর্ত্য সেন ও রিচার্ড এইচ থ্যালার মানবিক প্রগতির মাধ্যমে অর্থনীতির উন্নয়ন কিংবা মানুষের কল্যাণের জন্য অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। একইভাবে মানবিক প্রগতির জন্য বিজ্ঞান চর্চা, এর ব্যবহার ও প্রয়োগকে আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে, তবেই মানুষের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব হবে।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।