বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

২১ সেপ্টেম্বর: আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস

২০১৩ সাল থেকে বিশ্ব শান্তি সম্পর্কিত নানান শিক্ষামূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করা শুরু হয়

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। ওই নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। পালনীয় সেই সমস্ত দিবসগুলির মধ্যে একটি হল আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস (International Day of Peace)। আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালন করা প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর। ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- একটি ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই বিশ্বের জন্য উত্তম উপায় পুনরুদ্ধার  (Recovering better for an equitable and sustainable world)।

শান্তি দিবস পালন করার কারণ এবং এর ইতিহাস

সারা বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস বিশেষ করে পালিত হয়। একটি যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের (United Nations General Assembly) কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাব অনুসারে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার দিনটিকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০০১ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর, রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের দ্বারা গৃহীত প্রস্তাব অনুসারে ২০০২ সাল থেকে প্রতি বছরের ২১শে সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসটি প্রথম পালিত হয়েছিল। তারপর ১৯৮৩ সালে, জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল শান্তির সংস্কৃতি ঘোষণা করেন। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল (secretary general) বান কি মুন (Ban Ki-moon) এই দিনটিতে ২৪ ঘন্টার জন্য সারা পৃথিবী জুড়ে সব রকমের অশান্তি মূলক কাজ বন্ধ রাখার ডাক দেন এবং এই দিনটি উপলক্ষে প্রত্যেক দেশকে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করা আর্জি করেন।

২০০৯ সালে যুদ্ধ থেকে বিরত থেকে সারা বিশ্বে শান্তি বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পুনর্মিলন বর্ষ পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা (International Law), ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অশান্তি থেকে দূরে রাখার জন্য অঙ্গীকার নেওয়া হয়। এই দিনটি উদযাপন এর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল শান্তি বজায় রাখা, প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং সহনশীল মনোভাব গড়ে তোলা ইত্যাদি।

২০০৫ সালে করা একটি সমীক্ষায় বলা হচ্ছে যে প্রায় ৪৬ টি দেশ এই দিনটি উদযাপন করে যার মধ্যে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলি অন্যতম। এই দিনে শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সারা বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই দিবসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে দেশে সেমিনার (seminar) ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। পৃথিবীকে পারমাণবিক বোমা থেকে মুক্ত করা এই দিনটি উদযাপন এর আরেকটি লক্ষ্য।

২০১০ সালে তরুণ প্রজন্মকে যারা সারা বিশ্ব জুড়ে শান্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের একত্র করার পরিকল্পনা করা হয়। তরুণ প্রজন্মই বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে পারবে বলে রাষ্ট্রসংঘ বিশ্বাস করে। শান্তি এবং গণতন্ত্র একসাথে মিলে একটি আদর্শ দেশ গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করা হয়। বিশ্ব শান্তির জন্য পরিবেশ সচেতনতাকেও খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবেশকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশ্ব শান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলেই মনে করা হয়।

২০২১ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- একটি ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই বিশ্বের জন্য উত্তম উপায় পুনরুদ্ধার

২০১৩ সাল থেকে বিশ্ব শান্তি সম্পর্কিত নানান শিক্ষামূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস সম্পর্কে নানান তথ্য এবং এর গুরুত্ব ও উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ওয়াকিবহাল করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাছাড়াও একজন নাগরিকের শান্তিতে থাকার অধিকার সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন করা হয়। এখানে প্রতিটি মানুষকে সমান সম্মান দেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়। 

২০১৮ সালে কালচার অব পিস নিউজ নেটওয়ার্ক (Culture of Peace News Network) কর্তৃক করা একটি সমীক্ষায় বলা হচ্ছে যে সারা পৃথিবী জুড়ে ১২৯ টি দেশ এই কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছে। প্রায় ৭৬৪ রকম ভাবে এই দিনটি পালন করা হয় যার মধ্যে ২৩৩ টি অনুষ্ঠান কানাডা এবং আমেরিকায়, ১৭৭ টি অনুষ্ঠান ইউরোপের নানান দেশে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালে এই দিনটির থিম ছিল “শান্তির জন্য অধিকার” (The Right to Peace) এবং ২০১৯ সালে এর থিম ছিল “শান্তির জন্য পরিবেশ” (Climate Action for Peace)। দিনে দিনে যেভাবে আমাদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা ভবিষ্যতের জন্য খুবই উদ্বিগ্নজনক তাই এই দিনটির মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করার প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২০ সালে এই উদযাপনের কুড়ি বছর উপলক্ষে “একসাথে শান্তি গড়ে তোলা” (shaping Peace Together) কে থিম হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোভিড ১৯ মহামারীর সময় মানুষের মধ্যে দয়া, মায়া ও আশার আলো জাগিয়ে তোলা এবং একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে মনে করা হয়। সাম্প্রদায়িকতা এবং হিংসার দ্বারা যে ক্ষতি মানব সভ্যতার হচ্ছে তা শান্তির দ্বারা জয় করা যাবে বলেই বিশ্বাস করা হয়।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

সাঈমা আক্তার
সাঈমা একজন প্রাবন্ধিক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।