বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

অকাস কী এং কেন গঠিত হয়? অকাস নিয়ে চীন ও ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া কী?

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও উন্নতি নিশ্চিত করা ও মূল্যবোধ সুরক্ষার জন্য তিন দেশ: অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র এই নতুন জোট অকাস (Aukus) গঠন করেছে

২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অকাস (AUKUS অথবা Aukus) নামে একটি নতুন জোট আবির্ভুত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই জোটের ব্যাপারে বিশ্বকে জানান। এখানে Aukus এর পূর্ণরূপ হলো- Australia, the United Kingdom, and the United States। স্বাভাবিকভাবেই অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র- এই তিনটি দেশ হলো অকাসের সদস্য।

অকাস কী?

অকাস হলো অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিরক্ষার কৌশলগত জোট। অকাস গঠন করা হয় ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখ। প্রাথমিকভাবে এই জোটের মনোযোগ পরমাণু শক্তি চালিত সাবমেরিন নির্মাণের দিকে। এছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও এই তিন দেশ একসাথে কাজ করবে এবং নিজেদের উপস্থিতি পূর্বের থেকেও বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। বলা হচ্ছে ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও উন্নতি নিশ্চিত করা ও মূল্যবোধ সুরক্ষার জন্য তিন দেশ: অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র এই নতুন জোট অকাস (Aukus) গঠন করেছে।

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। চীন এই ‘অকাস’ গঠনের চুক্তিকে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ ও ‘সংকীর্ণ মানসিকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফ্রান্স বলছে এই চুক্তি হলো ‘পেছন থেকে ছুড়িকাঘাত’।

অকাস হলো অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট

অকাস কেন গঠন করা হলো?

আনুষ্ঠানিকভাবে অকাস (Aukus) গঠনের উদ্দেশ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে (Indo-Pacific region) সমন্বিত নিরাপত্তা ও উন্নতি নিশ্চিতের পাশাপাশি মূল্যবোধের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

অকাস চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু চালিত সাবমেরিন নির্মাণের প্রযুক্তি দিয়ে সহযোগিতা করবে।

এখানে একটি বিষয় নিশ্চিত বলেই দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা, আর সেটি হলো বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোই প্রধান লক্ষ্য।

চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে উত্তেজনা

অকাস (Aukus) চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া কাগজে কলমে  চীনের একটি প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছে। অতীত ঘটনা ঘেটে দেখলে বোঝা যাবে যে, অস্ট্রেলিয়া সর্বদা যুক্তরাষ্ট্রের কথায় কথা মিলিয়ে চীনের বিপক্ষে ছিল; আবার কোয়াড সংলাপের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সেটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক বিষয়। কিন্তু এবার অস্ট্রেলিয়াকে কাগজে কলমে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই চীন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক ভরসা। চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে খুবই ভালো সম্পর্ক থাকলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুই দেশের মধ্যে বিবাদ ক্রমবর্ধমান।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) বলছে, চীনের উইঘুরদের (Uyghur) বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান, টেলিকম কোম্পানি হুয়াওয়ের (Huawei) কিছু প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা এবং করোনাভাইরাস মহামারী তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন দেওয়া নিয়ে তাদের (অস্ট্রেলিয়া ও চীন) রাজনৈতিক সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাপক বাড়ানো নিয়েও পশ্চিমারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। তারা চীনের কিছু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষুব্ধ ছিল। যেমন গত বছরই চীন অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইনের ওপর কর বাড়িয়েছিল ২০০ ভাগ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছেন, চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার নিজেকে সুরক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

অকাস প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ ফ্রান্স

ফ্রান্সের সাথে অস্ট্রেলিয়ার ১২ টি ডিজেল বৈদ্যুতিক শক্তি চালিত সাবমেরিন বানানোর চুক্তি ছিল, যার পরিমাণ ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলার। এখন যেহেতু অকাস (Aukus) চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন দিবে সেহেতু ফ্রান্সের সাথে অস্ট্রেলিয়ার এই ৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া। এতে স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ হবার কথা।

১৬, সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-ইভেস ল্য দ্রিয়াঁ (Jean-Yves Le Drian) অকাস প্রসঙ্গে বলেছেন,  ‘এটি সত্যিকার অর্থেই পেছন থেকে ছুড়িকাঘাত’।

ফ্রান্স নিশ্চিতভাবেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করেছিল কিন্তু অকাস চুক্তির মাধ্যমে সেই আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে অকাস; এরকমই মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে স্বীকার করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (European Union)। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ফ্রান্সের ক্ষোভের কারণ ইউনিয়ন বুঝতে পারছে কিন্তু চুক্তির (অকাস) আগে তাদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি।

অকাসের সাথে আনজুস ট্রিটির (ANZUS) পার্থক্য কোথায়?

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত The Australia, New Zealand and United States Security Treaty (ANZUS or ANZUS Treaty) একটি সমন্বিত নিরাপত্তার নন-বাইন্ডিং চুক্তি, যাতে ইন্দো-প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতার কথা বলা আছে। তবে এতে কোনো পরমাণু শক্তির ব্যবহারের বিষয়ে কিছু নেই। অপরদিকে অকাস প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধি করলে এর শুরুই হয়েছে পরমাণু শক্তি বৃদ্ধির প্রত্যয় নিয়ে। এই পরমাণু শক্তিই অকাস ও আনজুসের মধ্য প্রধান পার্থক্য গড়ে দেয়। নিউজিল্যান্ড যেহেতু সামরিক ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তি নিষিদ্ধ করেছে সেহেতু নতুন জোট থেকে দেশটিকে বাইরে রাখা হয়েছে বলে মনে হয়, তবে অফিশিয়াল কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি এ বিষয়ে।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

মু. মিজানুর রহমান মিজানhttps://www.mizanurrmizan.info
মু. মিজানুর রহমান মিজান সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকায় মাস্টার অব এডুকেশন প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী এবং একজন স্বাধীন লেখক। তিনি শিক্ষা গবেষণায় বেশ আগ্রহী।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।