০৭:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা

অক্সিজেন বেঁচে থাকার একটি প্রধান উপাদান হয়ে ওঠল কেন?

বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা

একসময়ের প্রাণঘাতী গ্যাস অক্সিজেন কীভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বদলে দিয়ে শক্তি উৎপাদন ও জটিল জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে—ড. রাশিদুল হকের এই লেখায় মহা জারণ ঘটনা থেকে মানবজীবন পর্যন্ত অক্সিজেনের বিস্ময়কর বিবর্তনীয় যাত্রা অনুসৃত হয়েছে।


সারাংশ: অক্সিজেনের ভূমিকা একটি বিষাক্ত উপজাত থেকে জটিল জীবনের জন্য অপরিহার্য জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা গ্রেট অক্সিজেনেশন ইভেন্টের সূচনা করেছিল। এই ঘটনাটি অবাতজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দিলেও সবাত শ্বসনকে সম্ভব করে তোলে, শক্তি উৎপাদনকে (ATP) বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং বহুকোষী জীব, বড় দেহ, মস্তিষ্ক ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের এই একসময়ের প্রাণঘাতী গ্যাসের উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল করে তুলেছে। এর বিবর্তন জীবনের অভিযোজনযোগ্যতাকে তুলে ধরে, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে রূপান্তরিত করেছে এবং ধ্বংসাত্মক অথচ সৃজনশীল পরিবেশগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশাল বিবর্তনীয় সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।


মূল শব্দ: অক্সিজেন, সায়ানোব্যাকটেরিয়া, মহা জারণ ঘটনা, মাইটোকন্ড্রিয়া, এটিপি


আমরা শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং এই পৃথিবী গ্রহে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে, আমরা এটিকে-ই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই—  অর্থাৎ, অক্সজেন-ই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপাদান। অথচ, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জীবনকাল ধরে এর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয়েছিল, তখন এর বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে-সময়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছিল বিজারক প্রকৃতির (যে পদার্থ ইলেকট্রন ত্যাগ করে), যা কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4) এবং জলীয় বাষ্প দ্বারা গঠিত ছিল, যা বর্তমান বায়ুমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমান বায়ুমণ্ডলে রয়েছে প্রধানত নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন। যদিও সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পকে ভেঙে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনে পরিণত করত, কিন্তু অক্সিজেন দ্রুত মিথেনের সাথে বিক্রিয়া করে পৃথিবীর ভূত্বকের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যেত, ফলে বায়ুমণ্ডলে এর সামান্যতম চিহ্নও থাকত না। তাহলে এটি খুব কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় যে বর্তমান পৃথিবী কীভাবে-ই বা অক্সিজেনে ছেয়ে গেল। কে ছিল এই নীরব, রহস্যময় শক্তি যে অবিরাম অক্সিজেন মুক্ত করার কাজ করে গিয়েছিল? সেই রহস্যময় সত্তাটি ছিল একটি অণুজীব: সায়ানোব্যাকটেরিয়া।

সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়ার একটি দল, যা নীল-সবুজ শৈবাল নামেও পরিচিত। তারা অনন্য, কারণ তারা প্রোক্যারিওট (নিউক্লিয়াসবিহীন কোষ), উদ্ভিদের মতো অক্সিজেন-উৎপাদনকারী জীব, যারা শক্তি তৈরির জন্য সূর্যের আলো, পানি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে পরিবেশে অক্সিজেন নির্গত করে। প্রায় ২.৪ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন=১০০ কোটি) বছর আগে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার উত্থান এবং তাদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার কারণে অক্সিজেন হয়ে ওঠে জীবনের একটি প্রধান উপাদান, যে প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে নির্গত হয় অক্সিজেন, যা ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে অক্সিজেনযুক্ত করে, যার ফলে ‘মহান জারণ ঘটনা’ বা ‘অক্সিজেন বিপ্লব’ ঘটে। সেই যুগটি ছিল প্রোটেরোজেয়িক (প্রি-ক্যামব্রিয়ান)। ওই যুগে এই রূপান্তরটি বায়বীয় শ্বসনের বিবর্তনের দিকে ধাবিত হয়, যা অবায়বীয় (অ্যানেরোবিক) প্রক্রিয়াগুলোর চেয়ে খাদ্য থেকে বেশি শক্তি সরবরাহ করে, যা প্রাণী এবং মানুষ-সহ জটিল, শক্তি-নিবিড় জীবন গঠনের বিকাশকে সক্ষম করে তোলে। 

বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা
বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা

কেন প্রায় সমস্ত জীব অক্সিজেনে শ্বাস নেয়, নাইট্রোজেনে নয় কেন ? 

আমাদের মনে তো প্রশ্ন জাগতেই পারে যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেনের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, কেন আমরা অক্সিজেন শ্বাস নেই? এছাড়া, জীবন তো আরও অনেক ইলেকট্রন গ্রহীতাকে ব্যবহার করতে পারতো — যেমন সালফেট, নাইট্রেট কিংবা লোহা — কিন্তু অবশেষে অক্সিজেন হলো সহজলভ্য সর্বোচ্চ শক্তির গ্রাহক। প্রাথমিক যুগে জীবেরা শক্তি উৎপাদনের জন্য নাইট্রোজেনের পরিবর্তে অক্সিজেন ব্যবহার করেছে, কারণ অক্সিজেন একটি অত্যন্ত সক্রিয় ইলেকট্রন গ্রহীতা, যা জ্বালানি (যেমন গ্লুকোজ) ভেঙে স্থিতিশীল পানি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে দক্ষতার সাথে স্বতঃস্ফূর্ত শক্তি নির্গমন (শ্বসন) সম্ভব করে তোলে। অন্যদিকে, নাইট্রোজেন গ্যাস (N2) তার শক্তিশালী ত্রিবন্ধনের কারণে অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং নিষ্ক্রিয়, এটিকে ভাঙতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয় এবং তাই এটি শক্তির উৎস হিসেবে অকেজো, যদিও ডিএনএ-এর মতো গাঠনিক উপাদানের জন্য এটি অপরিহার্য। যাইহোক, কিছু অণুজীব নাইট্রোজেন যৌগ (যেমন নাইট্রেট, নাইট্রাইট, অ্যামোনিয়া) বা এমনকি নাইট্রোজেন গ্যাসকে শক্তির উৎস হিসেবে বা শক্তি উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সাধারণত এটি নাইট্রোজেন চক্রের অংশ হিসেবে ঘটে, এটি এটিপি (ATP)-এর জন্য অক্সিজেন শ্বাস নেওয়ার মতো সরাসরি প্রক্রিয়া নয়। নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া কেমোসিন্থেসিসের জন্য অ্যামোনিয়া/নাইট্রাইট ব্যবহার করে, অন্যদিকে অ্যানামক্স ব্যাকটেরিয়া অ্যামোনিয়া এবং নাইট্রাইটকে নাইট্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত করে শক্তি উৎপন্ন করে, এবং কিছু অনন্য ইউক্যারিওট (শৈবাল) পুষ্টির জন্য নাইট্রোজেন-সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়াকে আশ্রয় দেয়।

অক্সিজেন বিপ্লব

এই বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এবং অগভীর সমুদ্রে অক্সিজেনের পরিমাণ অভুতপূর্বহারে বৃদ্ধি পায়। সমুদ্রের উপরিভাগে ভেসে থাকা অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ-সদৃশ প্রোক্যারিওট অণুজীব বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া সূর্যের আলো ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে, গাছের মতোই। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের পরিমাপে, এই বিপ্লব বা বৃহৎ জারণ ঘটনা ঘটেছিল  ২.৪ বিলিয়ন থেকে ২.০ বিলিয়ন বছর আগে। এটি প্যালিওপ্রোটেরোজেয়িক যুগের একটি ঘটনা। এই ‘মহা জারণ ঘটনা’ সেই সময়কালকে চিহ্নিত করে, যখন এই সমুদ্রের আধারগুলো অক্সিজেন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যায়, ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন সঞ্চিত হতে শুরু করে, এবং ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলকে বিজারক থেকে জারক অবস্থায় নিয়ে আসে, যা গ্রহের মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় এবং বায়বীয় জীবনের বিবর্তনকে সক্ষম করে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের অন্তত ৫০% বা তারও বেশি উৎপাদন করে এই ক্ষুদ্র অণুজীবরা। প্যালিওপ্রোটেরোজেয়িক যুগেই আর্কিয়া (Archaea) গ্রুপের বিকাশসহ প্রথম ইউক্যারিওট (নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষ) ও সরল বহুকোষী জীবনের উদ্ভব ঘটেছিল। বস্তুতঃ আর্কিয়া হলো প্রোক্যারিওট বা আদিকোষীয়, অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার মতোই এরা এককোষী জীব যাদের কোনো ঝিল্লি-আবদ্ধ নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য অঙ্গাণু নেই; তবে, আর্কিয়া জিনগত ও জৈবরাসায়নিকভাবে ব্যাকটেরিয়া থেকে স্বতন্ত্র এবং জীবনের বৃক্ষে তারা নিজস্ব একটি পৃথক ডোমেইন গঠন করে, যার কিছু বৈশিষ্ট্য ইউক্যারিওট বা প্রকৃতকোষীয়দের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ। বলা যায়, এই অক্সিজেন বিপ্লবটি পৃথিবীকে মূলত একটি অবাত জগৎ থেকে মুক্ত অক্সিজেনযুক্ত জগতে রূপান্তরিত করেছিল, যা সমুদ্রের রসায়নকে পরিবর্তন করে এবং আরও জটিল জীবন রূপের বিকাশে সক্ষম করে তোলে।

প্রাথমিকভাবে, অক্সিজেনের সঞ্চয় বিদ্যমান অবাতজীবী জীবদের জন্য বিষাক্ত হয়ে উঠে, যা ব্যাপক বিলুপ্তির কারণও ঘটে; তবে, অন্যান্য জীব অক্সিজেন সহ্য করার এবং অবশেষে তা ব্যবহার করার জন্য প্রক্রিয়া বিকশিত করে এবং সবাত বা বায়বীয় শ্বসন পদ্ধতি তৈরি করে। এই বিপাকীয় প্রক্রিয়াটি অবাত বা অবায়বীয় প্রক্রিয়ার চেয়ে খাদ্য থেকে শক্তি নিষ্কাশনে অনেক বেশি কার্যকর, যা কোষগুলোকে একই পরিমাণ খাদ্য থেকে আরও বেশি শক্তি অর্জন করতে সাহায্য করে। বায়বীয় শ্বসন থেকে প্রাপ্ত বর্ধিত শক্তি বৃহত্তর, আরও জটিল এবং আরও বেশি শক্তি-নির্ভরশীল জীবের বিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণীদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করেছিল। এছাড়া, অক্সিজেনের সঞ্চয়নের ফলে ওজোন স্তরেরও সৃষ্টি হয়েছিল, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠকে ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং ভূমিতে জীবন ধারণকে আরও সহজ করে তোলে।

জীবনপ্রবাহের উৎস নিয়ে গবেষণার পথিকৃৎ, বিশিষ্ট প্রাণরসায়নবিদ লেসলি অর্গেলের মতে, আমাদের গ্রহে জীবনের প্রথম সূচনা হয়েছিল প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন (৩৮০ কোটি) বছর আগে। যেহেতু সেই সময়ে পৃথিবীতে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি ছিল বলে ধারণা করা হয়, তাই জীবন্ত জীবদের বিপাক প্রক্রিয়া ছিল অবাত, যেখানে শক্তি উৎপাদনের জন্য সমুদ্রে উপস্থিত খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হতো। অক্সিজেনের আগে, মহাসাগরের আদিম অবাতজীবী জীবেরা (যেমন ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া) শক্তির জন্য ইলেকট্রন গ্রাহক হিসেবে খনিজ পদার্থ এবং সালফার যৌগ (সালফাইড, সালফেট), লোহা (Fe²), হাইড্রোজেন গ্যাস এবং মিথেনের মতো সরল যৌগ ব্যবহার করত, যা প্রায়শই আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্ভুত হতো। এটি মুক্ত অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে সালফাইট বিজারণ, লৌহ বিজারণ এবং মিথেন সৃষ্টির (মিথেনোজেনেসিস) মতো প্রক্রিয়াগুলোকে বিপাক ক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে সক্ষম করেছিল। যদিও এগুলো ছিল কম দক্ষতাসম্পন্ন, কিন্তু জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য প্রক্রিয়া। তবে, প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত এক বিশেষ ধরনের অণুজীবে বিবর্তন ঘটে। এই আদিম জীবদের বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য ১৬S এবং ২৩S rRNA (রাইবোজোমীয় আরএনএ)-এর উপর ভিত্তি করে ফাইলোজেনেটিক বা বিবর্তনীয় বংশগতি সম্পর্কিত বিশ্লেষণ, জিনোম পুনর্গঠন এবং জীবাশ্ম প্রমাণ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অণুজীবগুলোর মধ্যে সালোকসংশ্লেষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল (অর্থাৎ, তারা সূর্যের আলো থেকে শক্তি উৎপন্ন করতে পারত)। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পানিকে জারিত করে জ্বালানি উৎস হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালোকসংশ্লেষণের উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন হতো এবং নির্গত হতো বায়ুমণ্ডলে।

   

বৃহৎ জারণের ঘটনায় পৃথিবীর রসায়নের পরিবর্তন

বিবর্তনের সময়রেখায় মহা জারণ ঘটনাটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল এবং এর বেশ কয়েকটি গুরুতর পরিণতি ছিল কেবল পৃথিবীর জলবায়ুতে (পরোক্ষভাবে) নয়, জীবজগতের অভিযোজন এবং বিবর্তনের উপরও। প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে মহা জারণ ঘটনা প্রচুর পরিমাণে মুক্ত অক্সিজেন প্রবর্তন করে, যা বিজারক পরিবেশ থেকে জারণকারী পরিবেশে স্থানান্তরিত হয়, যা  বিশাল আয়রন এবং সালফার খনিজ গঠন  করে, ওজোন (O3) স্তর তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলীয় মিথেন-কে জারণ করে। ফলে, দ্রবীভূত আয়রন অপসারিত হয় এবং পুষ্টি চক্র পরিবর্তন করে সমুদ্রের রসায়ন পরিবর্তিত হয়, যা জটিল বায়বীয় জীবনের পথ প্রশস্ত করে। জারক পরিবেশের ফলে লাল স্তর (ভূমির পলিতে জারিত লোহা) এবং ক্যালসিয়াম সালফেটের মতো নতুন খনিজ পদার্থ তৈরি হয় এবং নদীর বালি থেকে ডেট্রিটাল পাইরাইট এবং ইউরেনাইটের ক্ষতি হয়। গবেষকরা ইঙ্গিত দেয় যে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মিথেনকে প্রতিস্থাপন করার সাথে সাথে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের রসায়ন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল (মিথেন আজও উপস্থিত, তবে খুব অল্প পরিমাণে)। এটি আরও অনুমান করা হয় যে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন জমা হওয়ার ফলে পৃথিবীতে প্রাচীনতম বরফ যুগের একটি সূচনা হয়েছিল। মিথেন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, কারণ এটি সূর্যালোক থেকে তাপ আটকে রাখে এবং গ্রহকে উষ্ণ করে। যেহেতু মিথেন অক্সিজেন দ্বারা স্থানচ্যুত হয়েছিল, তাই বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে বরফের চাদর তৈরি করে যা মেরু থেকে গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। অক্সিজেন নাইট্রেট (NO3-) এবং নাইট্রাইট (NO2-) গঠনে সহায়তা করেছিল, যা প্রাথমিক জীবনের জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য নাইট্রোজেন পুল তৈরি করেছিল।

মাইটোকন্ড্রিয়ার আবির্ভাব এবং ‘ইলেক্ট্রন পরিবহন শৃঙ্খল’ এর বিবর্তন

জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য প্রধান অক্সিজেন-নির্ভর বিপাকীয় প্রক্রিয়া হলো কোষীয় শ্বসন, বিশেষকরে সবাত শ্বসন, যেখানে জীবেরা মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে খাদ্য (যেমন কার্বোহাইড্রেট) ভাঙতে অক্সিজেন ব্যবহার করে জীবনের কার্যকারিতার জন্য শক্তি (এটিপি) তৈরি করে এবং বর্জ্য হিসেবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে। এটি বিপাকের একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ, যার মধ্যে শক্তি-মুক্তকারী (ক্যাটাবলিজম) এবং শক্তি-গঠনকারী (অ্যানাবলিজম) পথ অন্তর্ভুক্ত, এবং বেশিরভাগ জটিল জীবদেহে কার্যকর শক্তি আহরণের জন্য এই সব প্রক্রিয়া অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল।

প্রাথমিক জীবনের রূপগুলো সম্ভবত গ্লাইকোলাইসিস এবং ফারমেন্টেশনের মতো সরল, অক্সিজেন-মুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘এটিপি’ তৈরি করত, যেখানে জৈব অণু ভেঙে অল্প পরিমাণে এটিপি উৎপন্ন হতো। অন্যদিকে, আধুনিক জীবন বিপুল পরিমাণ এটিপি তৈরির জন্য ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন-সহ জটিল কোষীয় শ্বসন (সবাত/অবাত) ব্যবহার করে, এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সালোকসংশ্লেষণও ঘটে। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সূর্যালোক, রাসায়নিক পদার্থ বা খাদ্য ব্যবহার করে এডেনোসিন ডাইফসফেট (ADP)-এর সাথে একটি ফসফেট যুক্ত করে (ফসফোরিলেশন) শক্তি অণু ‘এটিপি’ তৈরি করা।

সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অক্সিজেন নিঃসরণ এবং অক্সিজেন বিপ্লবের মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়ার আবির্ভাবের পথ তৈরি করেছিল। একটি বৃহৎ পোষক কোষ (সম্ভবত একটি আদিম আর্কিয়ন) একটি সবাত ব্যাকটেরিয়াকে (একটি আলফা-প্রোটিওব্যাকটেরিয়াম) গ্রাস করেছিল, যা এই দক্ষ শ্বসন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারত। হজম হওয়ার পরিবর্তে, ব্যাকটেরিয়াটি ভেতরে বেঁচে থাকে এবং পোষক কোষের সাথে একটি মিথোজীবী সম্পর্ক স্থাপন করে। সময়ের সাথে সাথে, এই অভ্যন্তরীণ ব্যাকটেরিয়াটি মাইটোকন্ড্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়, যা তার নিজস্ব ডিএনএ এবং ঝিল্লি ধরে রাখে, কিন্তু পোষক কোষের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে এবং সবাত শ্বসনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে এটিপি সরবরাহ করে। পরবর্তীতে একটি অনুরূপ ঘটনা ঘটে, যখন কিছু ইউক্যারিওট সায়ানোব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস করে, যা উদ্ভিদ ও শৈবালে ক্লোরোপ্লাস্টের বিবর্তনের দিকে পরিচালিত করে, কিন্তু মূল সায়ানোব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেন-ই ছিল মূল উপাদান যা সমস্ত ইউক্যারিওটের জন্য মাইটোকন্ড্রিয়ার পথকে সম্ভব করে তুলেছিল।

ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল (ETC) একটি সরল, প্রাচীন ব্যবস্থা থেকে বিবর্তিত হয়েছে, যা প্রাথমিক জীবনের মৌলিক প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট থেকে শুরু করে, অবাত বিপাক প্রক্রিয়ার (যেমন মিথেনোজেনেসিস, আয়রন জারণ, ডিনাইট্রিফিকেশন) মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে এবং অবশেষে পৃথিবীর ভূ-রাসায়নিক পরিবর্তনের সাথে সাথে, বিশেষ করে সালোকসংশ্লেষণ থেকে অক্সিজেনের উত্থানের ফলে, বিভিন্ন অণুজীবীয় পথ থেকে মডিউলগুলিকে একত্রিত করে মাইটোকন্ড্রিয়ায় জটিল সবাত ETC-তে রূপান্তরিত হয়েছে। কমপ্লেক্স I, কমপ্লেক্স III এবং কমপ্লেক্স IV-এর মতো উপাদানগুলো স্বতন্ত্র অবাত কাজ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং সবাত শ্বসনের জন্য পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল, যা দক্ষ এটিপি উৎপাদনে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, কোষগুলো ইলেক্ট্রন দাতা NADH (Nicotinamide Adenine Dinucleotide+ hydrogen) এবং FADH (Flavin Adenine Dinucleotide+ hydrogen) পায় সাইট্রিক অ্যাসিড চক্র বা ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে, যা যথানুপূর্ব ইলেকট্রন-ট্রান্সফার চেইনের প্রোটিন কমপ্লেক্স I (protein complex I) ও প্রোটিন কমপ্লেক্স II (protein complex II)-এর সাথে বিজারক হিসেবে যুক্ত হয়।  গ্রেডিয়েন্টে সঞ্চিত শক্তি ‘এটিপি’ তৈরি করার প্রক্রিয়াকে কেমিওসমোসিস-ও বলে। বলাই বাহুল্য, যদি ইলেকট্রন গ্রহণ করার জন্য অক্সিজেনের অভাব ঘটে,  তাহলে ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খলটি বন্ধ হয়ে যাবে এবং কেমিওসমোসিস প্রক্রিয়ায় আর এটিপি তৈরি হবে না। পর্যাপ্ত এটিপি ছাড়া, কোষগুলো তাদের কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় বিক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে পারবে না বিধায় কোষগুলো ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, মারা যাবে।

 

শেষকথা 

বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে, জীবন অক্সিজেনবিহীন পৃথিবীতে বিকাশ লাভ করেছিল এবং বিভিন্ন বিপাকীয় কৌশল তৈরি করেছিল। সায়ানোব্যাকটেরিয়া দ্বারা সালোকসংশ্লেষণ জলকে ভাঙতে শুরু করে, অক্সিজেনকে বর্জ্য হিসাবে নির্গত করে এবং পৃথিবীর রসায়নকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে। অক্সিজেন জমা হতে শুরু করে, যা বিদ্যমান বেশিরভাগ অবাতজীবীর জন্য বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যার ফলে গণবিলুপ্তি ঘটে কিন্তু নতুন পরিবেশগত স্থান তৈরি হয়। জীবেরা অক্সিজেন ব্যবহার করার জন্য বিবর্তিত হয়, যা বৃদ্ধি, জটিলতা এবং বহুকোষী জীবের জন্য আরও অনেক বেশি শক্তি (এটিপি) উন্মোচন করে। অক্সিজেনের মাত্রা বিবর্তনীয় উল্লম্ফনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, যা শরীরের আকার, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বসন রঞ্জক পদার্থের (যেমন হিম/হিমোগ্লোবিন এবং হিমোসায়ানিন) উদ্ভব, সংবহনতন্ত্রের মতো জটিল সিস্টেমের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে।

উপসংহারে বলতে হয়, অক্সিজেনের গল্প বিবর্তনের শক্তির একটি প্রমাণ, যা দেখায় কীভাবে একটি বিপাকীয় উপজাত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, একটি “বিষকে” জটিল জীবনের ইঞ্জিনে রূপান্তরিত করেছে। অক্সিজেনের উপর আমাদের নির্ভরতা একটি দ্বিধারী তলোয়ার; এটি আমাদের উচ্চ-শক্তির জীবনযাত্রাকে শক্তি জোগায় কিন্তু ঝুঁকিও নিয়ে আসে, কারণ অতিরিক্ত অক্সিজেন ক্ষতিকারক হতে পারে। অক্সিজেনের ইতিহাস এবং জীবনের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া নিয়ে চলমান গবেষণা পৃথিবীর জীবমণ্ডল এবং জীবন কীভাবে সহ-বিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করে চলেছে, যা অণুজীব থেকে মানুষের মস্তিষ্ক পর্যন্ত সবকিছুকে আকার দিয়েছে।

 

সাহায্যকারী নোট:

ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল, ইলেক্ট্রন পরিবহন-সংযুক্ত ফসফোরিলেশন: (Electron transport chain/ETC; Electron transport-linked phosphorylation): ইলেক্ট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন হলো মাইটোকন্ড্রিয়ার অভ্যন্তরীণ ঝিল্লিতে থাকা প্রোটিন ও জৈব অণুর  (ইউবিকুইনোন অক্সিডোরিডাক্টেজ, সাক্সিনেট-কোএনজাইম Q রিডাক্টেজ; CoQH2-সাইটোক্রোম সি রিডাক্টেজ; সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ) একটি সিরিজ, যা NADH এবং FADH2 থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ধাপে ধাপে অক্সিজেন পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, আর এই প্রক্রিয়ায় নির্গত শক্তি ব্যবহার করে প্রোটন (H+) পাম্প করে একটি শক্তি-সমৃদ্ধ গ্রেডিয়েন্ট তৈরি করে, যা অবশেষে ATP/এটিপি সংশ্লেষণের (এটিপি সিন্থেজ দ্বারা) মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট/এটিপি (কোষের শক্তি) উৎপাদনে সাহায্য করে, যার শেষ উৎপাদ হলো জল (H2O)। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় অক্সিডেটিভ ফসফোরিলেশন। ইউক্যারিওটিক কোষে, সবাত শ্বসন এবং সালোকসংশ্লেষণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটি ঘটে মাইটোকন্ড্রিয়ায়। প্রসঙ্গতঃ সালোকসংশ্লেষণে আলোর দ্বারা উত্তেজিত হওয়ার পর ইলেকট্রনগুলি শৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং নির্গত শক্তি কার্বোহাইড্রেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। উল্লেখ্য, কোষগুলো ইলেক্ট্রন দাতা NADH (Nicotinamide Adenine Dinucleotide+ hydrogen) এবং FADH (Flavin Adenine Dinucleotide+ hydrogen) পায় ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে, যা যথানুপূর্ব ইলেকট্রন-ট্রান্সফার চেইনের প্রোটিন কমপ্লেক্স I (protein complex I) ও প্রোটিন কমপ্লেক্স II (protein complex II)-এর সাথে বিজারক হিসেবে যুক্ত হয়।

ব্যাকটেরিয়ার ইলেক্ট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত এনজাইম ইউক্যারিওটিক কোষের মতো ঝিল্লি আবদ্ধ, কিন্তু ব্যাকটেরিয়াতে এই অণুগুলি প্লাজমা ঝিল্লিতে উপস্থিত থাকে, কারণ ব্যাকটেরিয়ার কোন মাইটোকন্ড্রিয়া নেই। তাই এটিপি সংশ্লেষণের জন্য যে হাইড্রোজেন আয়ন গ্রেডিয়েন্ট প্রয়োজন, তা ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমা ঝিল্লি জুড়েই উৎপন্ন হয়। দেখুন অক্সিডেটিভ ফসফোরিলেশন, সাইটোক্রোম সি, সবাত শ্বসন, মাইটোকন্ড্রিয়া।

Methanogenesis (মিথেনোজেনেসিস): এটি একটি অণুজীবীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিপাকীয় উপজাত হিসেবে মিথেন (CH4) তৈরি হয়। এটি জলাভূমি, গভীর সমুদ্রের তলানি এবং প্রাণীদের অন্ত্রের মতো অক্সিজেনবিহীন (অ্যানারোবিক) পরিবেশে ঘটে এবং একচেটিয়াভাবে মিথেনোজেন নামক বিশেষ অণুজীব (এক ধরনের আর্কিয়া) দ্বারা সম্পন্ন হয়। এটি কার্বন চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা জীববস্তুর পচনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে কাজ করে এবং যে বাস্তুতন্ত্রে এটি খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি তৈরি করে, সেখানে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারেও অবদান রাখে।

বিষয়:

মন্তব্য

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
জনপ্রিয়

বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা

অক্সিজেন বেঁচে থাকার একটি প্রধান উপাদান হয়ে ওঠল কেন?

০৯:১৯:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬

একসময়ের প্রাণঘাতী গ্যাস অক্সিজেন কীভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বদলে দিয়ে শক্তি উৎপাদন ও জটিল জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে—ড. রাশিদুল হকের এই লেখায় মহা জারণ ঘটনা থেকে মানবজীবন পর্যন্ত অক্সিজেনের বিস্ময়কর বিবর্তনীয় যাত্রা অনুসৃত হয়েছে।


সারাংশ: অক্সিজেনের ভূমিকা একটি বিষাক্ত উপজাত থেকে জটিল জীবনের জন্য অপরিহার্য জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা গ্রেট অক্সিজেনেশন ইভেন্টের সূচনা করেছিল। এই ঘটনাটি অবাতজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দিলেও সবাত শ্বসনকে সম্ভব করে তোলে, শক্তি উৎপাদনকে (ATP) বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং বহুকোষী জীব, বড় দেহ, মস্তিষ্ক ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের এই একসময়ের প্রাণঘাতী গ্যাসের উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল করে তুলেছে। এর বিবর্তন জীবনের অভিযোজনযোগ্যতাকে তুলে ধরে, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে রূপান্তরিত করেছে এবং ধ্বংসাত্মক অথচ সৃজনশীল পরিবেশগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশাল বিবর্তনীয় সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।


মূল শব্দ: অক্সিজেন, সায়ানোব্যাকটেরিয়া, মহা জারণ ঘটনা, মাইটোকন্ড্রিয়া, এটিপি


আমরা শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং এই পৃথিবী গ্রহে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে, আমরা এটিকে-ই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই—  অর্থাৎ, অক্সজেন-ই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপাদান। অথচ, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জীবনকাল ধরে এর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন অনুপস্থিত ছিল। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয়েছিল, তখন এর বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে-সময়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছিল বিজারক প্রকৃতির (যে পদার্থ ইলেকট্রন ত্যাগ করে), যা কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4) এবং জলীয় বাষ্প দ্বারা গঠিত ছিল, যা বর্তমান বায়ুমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমান বায়ুমণ্ডলে রয়েছে প্রধানত নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন। যদিও সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পকে ভেঙে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনে পরিণত করত, কিন্তু অক্সিজেন দ্রুত মিথেনের সাথে বিক্রিয়া করে পৃথিবীর ভূত্বকের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যেত, ফলে বায়ুমণ্ডলে এর সামান্যতম চিহ্নও থাকত না। তাহলে এটি খুব কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় যে বর্তমান পৃথিবী কীভাবে-ই বা অক্সিজেনে ছেয়ে গেল। কে ছিল এই নীরব, রহস্যময় শক্তি যে অবিরাম অক্সিজেন মুক্ত করার কাজ করে গিয়েছিল? সেই রহস্যময় সত্তাটি ছিল একটি অণুজীব: সায়ানোব্যাকটেরিয়া।

সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়ার একটি দল, যা নীল-সবুজ শৈবাল নামেও পরিচিত। তারা অনন্য, কারণ তারা প্রোক্যারিওট (নিউক্লিয়াসবিহীন কোষ), উদ্ভিদের মতো অক্সিজেন-উৎপাদনকারী জীব, যারা শক্তি তৈরির জন্য সূর্যের আলো, পানি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে পরিবেশে অক্সিজেন নির্গত করে। প্রায় ২.৪ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন=১০০ কোটি) বছর আগে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার উত্থান এবং তাদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার কারণে অক্সিজেন হয়ে ওঠে জীবনের একটি প্রধান উপাদান, যে প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে নির্গত হয় অক্সিজেন, যা ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে অক্সিজেনযুক্ত করে, যার ফলে ‘মহান জারণ ঘটনা’ বা ‘অক্সিজেন বিপ্লব’ ঘটে। সেই যুগটি ছিল প্রোটেরোজেয়িক (প্রি-ক্যামব্রিয়ান)। ওই যুগে এই রূপান্তরটি বায়বীয় শ্বসনের বিবর্তনের দিকে ধাবিত হয়, যা অবায়বীয় (অ্যানেরোবিক) প্রক্রিয়াগুলোর চেয়ে খাদ্য থেকে বেশি শক্তি সরবরাহ করে, যা প্রাণী এবং মানুষ-সহ জটিল, শক্তি-নিবিড় জীবন গঠনের বিকাশকে সক্ষম করে তোলে। 

বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা
বিষাক্ত উপজাত থেকে জীবনের প্রধান ইঞ্জিন—মহা জারণ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শক্তি বিপাক ও জটিল জীবনের বিবর্তনে অক্সিজেনের যুগান্তকারী ভূমিকা

কেন প্রায় সমস্ত জীব অক্সিজেনে শ্বাস নেয়, নাইট্রোজেনে নয় কেন ? 

আমাদের মনে তো প্রশ্ন জাগতেই পারে যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেনের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, কেন আমরা অক্সিজেন শ্বাস নেই? এছাড়া, জীবন তো আরও অনেক ইলেকট্রন গ্রহীতাকে ব্যবহার করতে পারতো — যেমন সালফেট, নাইট্রেট কিংবা লোহা — কিন্তু অবশেষে অক্সিজেন হলো সহজলভ্য সর্বোচ্চ শক্তির গ্রাহক। প্রাথমিক যুগে জীবেরা শক্তি উৎপাদনের জন্য নাইট্রোজেনের পরিবর্তে অক্সিজেন ব্যবহার করেছে, কারণ অক্সিজেন একটি অত্যন্ত সক্রিয় ইলেকট্রন গ্রহীতা, যা জ্বালানি (যেমন গ্লুকোজ) ভেঙে স্থিতিশীল পানি এবং কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে দক্ষতার সাথে স্বতঃস্ফূর্ত শক্তি নির্গমন (শ্বসন) সম্ভব করে তোলে। অন্যদিকে, নাইট্রোজেন গ্যাস (N2) তার শক্তিশালী ত্রিবন্ধনের কারণে অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং নিষ্ক্রিয়, এটিকে ভাঙতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয় এবং তাই এটি শক্তির উৎস হিসেবে অকেজো, যদিও ডিএনএ-এর মতো গাঠনিক উপাদানের জন্য এটি অপরিহার্য। যাইহোক, কিছু অণুজীব নাইট্রোজেন যৌগ (যেমন নাইট্রেট, নাইট্রাইট, অ্যামোনিয়া) বা এমনকি নাইট্রোজেন গ্যাসকে শক্তির উৎস হিসেবে বা শক্তি উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সাধারণত এটি নাইট্রোজেন চক্রের অংশ হিসেবে ঘটে, এটি এটিপি (ATP)-এর জন্য অক্সিজেন শ্বাস নেওয়ার মতো সরাসরি প্রক্রিয়া নয়। নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া কেমোসিন্থেসিসের জন্য অ্যামোনিয়া/নাইট্রাইট ব্যবহার করে, অন্যদিকে অ্যানামক্স ব্যাকটেরিয়া অ্যামোনিয়া এবং নাইট্রাইটকে নাইট্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত করে শক্তি উৎপন্ন করে, এবং কিছু অনন্য ইউক্যারিওট (শৈবাল) পুষ্টির জন্য নাইট্রোজেন-সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়াকে আশ্রয় দেয়।

অক্সিজেন বিপ্লব

এই বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এবং অগভীর সমুদ্রে অক্সিজেনের পরিমাণ অভুতপূর্বহারে বৃদ্ধি পায়। সমুদ্রের উপরিভাগে ভেসে থাকা অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ-সদৃশ প্রোক্যারিওট অণুজীব বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া সূর্যের আলো ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে, গাছের মতোই। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের পরিমাপে, এই বিপ্লব বা বৃহৎ জারণ ঘটনা ঘটেছিল  ২.৪ বিলিয়ন থেকে ২.০ বিলিয়ন বছর আগে। এটি প্যালিওপ্রোটেরোজেয়িক যুগের একটি ঘটনা। এই ‘মহা জারণ ঘটনা’ সেই সময়কালকে চিহ্নিত করে, যখন এই সমুদ্রের আধারগুলো অক্সিজেন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যায়, ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন সঞ্চিত হতে শুরু করে, এবং ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলকে বিজারক থেকে জারক অবস্থায় নিয়ে আসে, যা গ্রহের মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় এবং বায়বীয় জীবনের বিবর্তনকে সক্ষম করে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের অন্তত ৫০% বা তারও বেশি উৎপাদন করে এই ক্ষুদ্র অণুজীবরা। প্যালিওপ্রোটেরোজেয়িক যুগেই আর্কিয়া (Archaea) গ্রুপের বিকাশসহ প্রথম ইউক্যারিওট (নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষ) ও সরল বহুকোষী জীবনের উদ্ভব ঘটেছিল। বস্তুতঃ আর্কিয়া হলো প্রোক্যারিওট বা আদিকোষীয়, অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়ার মতোই এরা এককোষী জীব যাদের কোনো ঝিল্লি-আবদ্ধ নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য অঙ্গাণু নেই; তবে, আর্কিয়া জিনগত ও জৈবরাসায়নিকভাবে ব্যাকটেরিয়া থেকে স্বতন্ত্র এবং জীবনের বৃক্ষে তারা নিজস্ব একটি পৃথক ডোমেইন গঠন করে, যার কিছু বৈশিষ্ট্য ইউক্যারিওট বা প্রকৃতকোষীয়দের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ। বলা যায়, এই অক্সিজেন বিপ্লবটি পৃথিবীকে মূলত একটি অবাত জগৎ থেকে মুক্ত অক্সিজেনযুক্ত জগতে রূপান্তরিত করেছিল, যা সমুদ্রের রসায়নকে পরিবর্তন করে এবং আরও জটিল জীবন রূপের বিকাশে সক্ষম করে তোলে।

প্রাথমিকভাবে, অক্সিজেনের সঞ্চয় বিদ্যমান অবাতজীবী জীবদের জন্য বিষাক্ত হয়ে উঠে, যা ব্যাপক বিলুপ্তির কারণও ঘটে; তবে, অন্যান্য জীব অক্সিজেন সহ্য করার এবং অবশেষে তা ব্যবহার করার জন্য প্রক্রিয়া বিকশিত করে এবং সবাত বা বায়বীয় শ্বসন পদ্ধতি তৈরি করে। এই বিপাকীয় প্রক্রিয়াটি অবাত বা অবায়বীয় প্রক্রিয়ার চেয়ে খাদ্য থেকে শক্তি নিষ্কাশনে অনেক বেশি কার্যকর, যা কোষগুলোকে একই পরিমাণ খাদ্য থেকে আরও বেশি শক্তি অর্জন করতে সাহায্য করে। বায়বীয় শ্বসন থেকে প্রাপ্ত বর্ধিত শক্তি বৃহত্তর, আরও জটিল এবং আরও বেশি শক্তি-নির্ভরশীল জীবের বিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণীদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করেছিল। এছাড়া, অক্সিজেনের সঞ্চয়নের ফলে ওজোন স্তরেরও সৃষ্টি হয়েছিল, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠকে ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং ভূমিতে জীবন ধারণকে আরও সহজ করে তোলে।

জীবনপ্রবাহের উৎস নিয়ে গবেষণার পথিকৃৎ, বিশিষ্ট প্রাণরসায়নবিদ লেসলি অর্গেলের মতে, আমাদের গ্রহে জীবনের প্রথম সূচনা হয়েছিল প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন (৩৮০ কোটি) বছর আগে। যেহেতু সেই সময়ে পৃথিবীতে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি ছিল বলে ধারণা করা হয়, তাই জীবন্ত জীবদের বিপাক প্রক্রিয়া ছিল অবাত, যেখানে শক্তি উৎপাদনের জন্য সমুদ্রে উপস্থিত খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হতো। অক্সিজেনের আগে, মহাসাগরের আদিম অবাতজীবী জীবেরা (যেমন ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া) শক্তির জন্য ইলেকট্রন গ্রাহক হিসেবে খনিজ পদার্থ এবং সালফার যৌগ (সালফাইড, সালফেট), লোহা (Fe²), হাইড্রোজেন গ্যাস এবং মিথেনের মতো সরল যৌগ ব্যবহার করত, যা প্রায়শই আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্ভুত হতো। এটি মুক্ত অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে সালফাইট বিজারণ, লৌহ বিজারণ এবং মিথেন সৃষ্টির (মিথেনোজেনেসিস) মতো প্রক্রিয়াগুলোকে বিপাক ক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে সক্ষম করেছিল। যদিও এগুলো ছিল কম দক্ষতাসম্পন্ন, কিন্তু জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য প্রক্রিয়া। তবে, প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত এক বিশেষ ধরনের অণুজীবে বিবর্তন ঘটে। এই আদিম জীবদের বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য ১৬S এবং ২৩S rRNA (রাইবোজোমীয় আরএনএ)-এর উপর ভিত্তি করে ফাইলোজেনেটিক বা বিবর্তনীয় বংশগতি সম্পর্কিত বিশ্লেষণ, জিনোম পুনর্গঠন এবং জীবাশ্ম প্রমাণ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অণুজীবগুলোর মধ্যে সালোকসংশ্লেষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল (অর্থাৎ, তারা সূর্যের আলো থেকে শক্তি উৎপন্ন করতে পারত)। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পানিকে জারিত করে জ্বালানি উৎস হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সালোকসংশ্লেষণের উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন হতো এবং নির্গত হতো বায়ুমণ্ডলে।

   

বৃহৎ জারণের ঘটনায় পৃথিবীর রসায়নের পরিবর্তন

বিবর্তনের সময়রেখায় মহা জারণ ঘটনাটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল এবং এর বেশ কয়েকটি গুরুতর পরিণতি ছিল কেবল পৃথিবীর জলবায়ুতে (পরোক্ষভাবে) নয়, জীবজগতের অভিযোজন এবং বিবর্তনের উপরও। প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে মহা জারণ ঘটনা প্রচুর পরিমাণে মুক্ত অক্সিজেন প্রবর্তন করে, যা বিজারক পরিবেশ থেকে জারণকারী পরিবেশে স্থানান্তরিত হয়, যা  বিশাল আয়রন এবং সালফার খনিজ গঠন  করে, ওজোন (O3) স্তর তৈরি করে এবং বায়ুমণ্ডলীয় মিথেন-কে জারণ করে। ফলে, দ্রবীভূত আয়রন অপসারিত হয় এবং পুষ্টি চক্র পরিবর্তন করে সমুদ্রের রসায়ন পরিবর্তিত হয়, যা জটিল বায়বীয় জীবনের পথ প্রশস্ত করে। জারক পরিবেশের ফলে লাল স্তর (ভূমির পলিতে জারিত লোহা) এবং ক্যালসিয়াম সালফেটের মতো নতুন খনিজ পদার্থ তৈরি হয় এবং নদীর বালি থেকে ডেট্রিটাল পাইরাইট এবং ইউরেনাইটের ক্ষতি হয়। গবেষকরা ইঙ্গিত দেয় যে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মিথেনকে প্রতিস্থাপন করার সাথে সাথে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের রসায়ন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল (মিথেন আজও উপস্থিত, তবে খুব অল্প পরিমাণে)। এটি আরও অনুমান করা হয় যে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন জমা হওয়ার ফলে পৃথিবীতে প্রাচীনতম বরফ যুগের একটি সূচনা হয়েছিল। মিথেন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, কারণ এটি সূর্যালোক থেকে তাপ আটকে রাখে এবং গ্রহকে উষ্ণ করে। যেহেতু মিথেন অক্সিজেন দ্বারা স্থানচ্যুত হয়েছিল, তাই বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে বরফের চাদর তৈরি করে যা মেরু থেকে গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। অক্সিজেন নাইট্রেট (NO3-) এবং নাইট্রাইট (NO2-) গঠনে সহায়তা করেছিল, যা প্রাথমিক জীবনের জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য নাইট্রোজেন পুল তৈরি করেছিল।

মাইটোকন্ড্রিয়ার আবির্ভাব এবং ‘ইলেক্ট্রন পরিবহন শৃঙ্খল’ এর বিবর্তন

জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য প্রধান অক্সিজেন-নির্ভর বিপাকীয় প্রক্রিয়া হলো কোষীয় শ্বসন, বিশেষকরে সবাত শ্বসন, যেখানে জীবেরা মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে খাদ্য (যেমন কার্বোহাইড্রেট) ভাঙতে অক্সিজেন ব্যবহার করে জীবনের কার্যকারিতার জন্য শক্তি (এটিপি) তৈরি করে এবং বর্জ্য হিসেবে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জল উৎপন্ন করে। এটি বিপাকের একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ, যার মধ্যে শক্তি-মুক্তকারী (ক্যাটাবলিজম) এবং শক্তি-গঠনকারী (অ্যানাবলিজম) পথ অন্তর্ভুক্ত, এবং বেশিরভাগ জটিল জীবদেহে কার্যকর শক্তি আহরণের জন্য এই সব প্রক্রিয়া অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল।

প্রাথমিক জীবনের রূপগুলো সম্ভবত গ্লাইকোলাইসিস এবং ফারমেন্টেশনের মতো সরল, অক্সিজেন-মুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘এটিপি’ তৈরি করত, যেখানে জৈব অণু ভেঙে অল্প পরিমাণে এটিপি উৎপন্ন হতো। অন্যদিকে, আধুনিক জীবন বিপুল পরিমাণ এটিপি তৈরির জন্য ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন-সহ জটিল কোষীয় শ্বসন (সবাত/অবাত) ব্যবহার করে, এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সালোকসংশ্লেষণও ঘটে। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সূর্যালোক, রাসায়নিক পদার্থ বা খাদ্য ব্যবহার করে এডেনোসিন ডাইফসফেট (ADP)-এর সাথে একটি ফসফেট যুক্ত করে (ফসফোরিলেশন) শক্তি অণু ‘এটিপি’ তৈরি করা।

সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অক্সিজেন নিঃসরণ এবং অক্সিজেন বিপ্লবের মাধ্যমে মাইটোকন্ড্রিয়ার আবির্ভাবের পথ তৈরি করেছিল। একটি বৃহৎ পোষক কোষ (সম্ভবত একটি আদিম আর্কিয়ন) একটি সবাত ব্যাকটেরিয়াকে (একটি আলফা-প্রোটিওব্যাকটেরিয়াম) গ্রাস করেছিল, যা এই দক্ষ শ্বসন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারত। হজম হওয়ার পরিবর্তে, ব্যাকটেরিয়াটি ভেতরে বেঁচে থাকে এবং পোষক কোষের সাথে একটি মিথোজীবী সম্পর্ক স্থাপন করে। সময়ের সাথে সাথে, এই অভ্যন্তরীণ ব্যাকটেরিয়াটি মাইটোকন্ড্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়, যা তার নিজস্ব ডিএনএ এবং ঝিল্লি ধরে রাখে, কিন্তু পোষক কোষের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে এবং সবাত শ্বসনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে এটিপি সরবরাহ করে। পরবর্তীতে একটি অনুরূপ ঘটনা ঘটে, যখন কিছু ইউক্যারিওট সায়ানোব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস করে, যা উদ্ভিদ ও শৈবালে ক্লোরোপ্লাস্টের বিবর্তনের দিকে পরিচালিত করে, কিন্তু মূল সায়ানোব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেন-ই ছিল মূল উপাদান যা সমস্ত ইউক্যারিওটের জন্য মাইটোকন্ড্রিয়ার পথকে সম্ভব করে তুলেছিল।

ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল (ETC) একটি সরল, প্রাচীন ব্যবস্থা থেকে বিবর্তিত হয়েছে, যা প্রাথমিক জীবনের মৌলিক প্রোটন গ্রেডিয়েন্ট থেকে শুরু করে, অবাত বিপাক প্রক্রিয়ার (যেমন মিথেনোজেনেসিস, আয়রন জারণ, ডিনাইট্রিফিকেশন) মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে এবং অবশেষে পৃথিবীর ভূ-রাসায়নিক পরিবর্তনের সাথে সাথে, বিশেষ করে সালোকসংশ্লেষণ থেকে অক্সিজেনের উত্থানের ফলে, বিভিন্ন অণুজীবীয় পথ থেকে মডিউলগুলিকে একত্রিত করে মাইটোকন্ড্রিয়ায় জটিল সবাত ETC-তে রূপান্তরিত হয়েছে। কমপ্লেক্স I, কমপ্লেক্স III এবং কমপ্লেক্স IV-এর মতো উপাদানগুলো স্বতন্ত্র অবাত কাজ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং সবাত শ্বসনের জন্য পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছিল, যা দক্ষ এটিপি উৎপাদনে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, কোষগুলো ইলেক্ট্রন দাতা NADH (Nicotinamide Adenine Dinucleotide+ hydrogen) এবং FADH (Flavin Adenine Dinucleotide+ hydrogen) পায় সাইট্রিক অ্যাসিড চক্র বা ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে, যা যথানুপূর্ব ইলেকট্রন-ট্রান্সফার চেইনের প্রোটিন কমপ্লেক্স I (protein complex I) ও প্রোটিন কমপ্লেক্স II (protein complex II)-এর সাথে বিজারক হিসেবে যুক্ত হয়।  গ্রেডিয়েন্টে সঞ্চিত শক্তি ‘এটিপি’ তৈরি করার প্রক্রিয়াকে কেমিওসমোসিস-ও বলে। বলাই বাহুল্য, যদি ইলেকট্রন গ্রহণ করার জন্য অক্সিজেনের অভাব ঘটে,  তাহলে ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খলটি বন্ধ হয়ে যাবে এবং কেমিওসমোসিস প্রক্রিয়ায় আর এটিপি তৈরি হবে না। পর্যাপ্ত এটিপি ছাড়া, কোষগুলো তাদের কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় বিক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে পারবে না বিধায় কোষগুলো ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, মারা যাবে।

 

শেষকথা 

বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে, জীবন অক্সিজেনবিহীন পৃথিবীতে বিকাশ লাভ করেছিল এবং বিভিন্ন বিপাকীয় কৌশল তৈরি করেছিল। সায়ানোব্যাকটেরিয়া দ্বারা সালোকসংশ্লেষণ জলকে ভাঙতে শুরু করে, অক্সিজেনকে বর্জ্য হিসাবে নির্গত করে এবং পৃথিবীর রসায়নকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে। অক্সিজেন জমা হতে শুরু করে, যা বিদ্যমান বেশিরভাগ অবাতজীবীর জন্য বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যার ফলে গণবিলুপ্তি ঘটে কিন্তু নতুন পরিবেশগত স্থান তৈরি হয়। জীবেরা অক্সিজেন ব্যবহার করার জন্য বিবর্তিত হয়, যা বৃদ্ধি, জটিলতা এবং বহুকোষী জীবের জন্য আরও অনেক বেশি শক্তি (এটিপি) উন্মোচন করে। অক্সিজেনের মাত্রা বিবর্তনীয় উল্লম্ফনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, যা শরীরের আকার, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বসন রঞ্জক পদার্থের (যেমন হিম/হিমোগ্লোবিন এবং হিমোসায়ানিন) উদ্ভব, সংবহনতন্ত্রের মতো জটিল সিস্টেমের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে।

উপসংহারে বলতে হয়, অক্সিজেনের গল্প বিবর্তনের শক্তির একটি প্রমাণ, যা দেখায় কীভাবে একটি বিপাকীয় উপজাত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, একটি “বিষকে” জটিল জীবনের ইঞ্জিনে রূপান্তরিত করেছে। অক্সিজেনের উপর আমাদের নির্ভরতা একটি দ্বিধারী তলোয়ার; এটি আমাদের উচ্চ-শক্তির জীবনযাত্রাকে শক্তি জোগায় কিন্তু ঝুঁকিও নিয়ে আসে, কারণ অতিরিক্ত অক্সিজেন ক্ষতিকারক হতে পারে। অক্সিজেনের ইতিহাস এবং জীবনের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া নিয়ে চলমান গবেষণা পৃথিবীর জীবমণ্ডল এবং জীবন কীভাবে সহ-বিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ করে চলেছে, যা অণুজীব থেকে মানুষের মস্তিষ্ক পর্যন্ত সবকিছুকে আকার দিয়েছে।

 

সাহায্যকারী নোট:

ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল, ইলেক্ট্রন পরিবহন-সংযুক্ত ফসফোরিলেশন: (Electron transport chain/ETC; Electron transport-linked phosphorylation): ইলেক্ট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন হলো মাইটোকন্ড্রিয়ার অভ্যন্তরীণ ঝিল্লিতে থাকা প্রোটিন ও জৈব অণুর  (ইউবিকুইনোন অক্সিডোরিডাক্টেজ, সাক্সিনেট-কোএনজাইম Q রিডাক্টেজ; CoQH2-সাইটোক্রোম সি রিডাক্টেজ; সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ) একটি সিরিজ, যা NADH এবং FADH2 থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ করে ধাপে ধাপে অক্সিজেন পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, আর এই প্রক্রিয়ায় নির্গত শক্তি ব্যবহার করে প্রোটন (H+) পাম্প করে একটি শক্তি-সমৃদ্ধ গ্রেডিয়েন্ট তৈরি করে, যা অবশেষে ATP/এটিপি সংশ্লেষণের (এটিপি সিন্থেজ দ্বারা) মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট/এটিপি (কোষের শক্তি) উৎপাদনে সাহায্য করে, যার শেষ উৎপাদ হলো জল (H2O)। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় অক্সিডেটিভ ফসফোরিলেশন। ইউক্যারিওটিক কোষে, সবাত শ্বসন এবং সালোকসংশ্লেষণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটি ঘটে মাইটোকন্ড্রিয়ায়। প্রসঙ্গতঃ সালোকসংশ্লেষণে আলোর দ্বারা উত্তেজিত হওয়ার পর ইলেকট্রনগুলি শৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং নির্গত শক্তি কার্বোহাইড্রেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। উল্লেখ্য, কোষগুলো ইলেক্ট্রন দাতা NADH (Nicotinamide Adenine Dinucleotide+ hydrogen) এবং FADH (Flavin Adenine Dinucleotide+ hydrogen) পায় ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে, যা যথানুপূর্ব ইলেকট্রন-ট্রান্সফার চেইনের প্রোটিন কমপ্লেক্স I (protein complex I) ও প্রোটিন কমপ্লেক্স II (protein complex II)-এর সাথে বিজারক হিসেবে যুক্ত হয়।

ব্যাকটেরিয়ার ইলেক্ট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত এনজাইম ইউক্যারিওটিক কোষের মতো ঝিল্লি আবদ্ধ, কিন্তু ব্যাকটেরিয়াতে এই অণুগুলি প্লাজমা ঝিল্লিতে উপস্থিত থাকে, কারণ ব্যাকটেরিয়ার কোন মাইটোকন্ড্রিয়া নেই। তাই এটিপি সংশ্লেষণের জন্য যে হাইড্রোজেন আয়ন গ্রেডিয়েন্ট প্রয়োজন, তা ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমা ঝিল্লি জুড়েই উৎপন্ন হয়। দেখুন অক্সিডেটিভ ফসফোরিলেশন, সাইটোক্রোম সি, সবাত শ্বসন, মাইটোকন্ড্রিয়া।

Methanogenesis (মিথেনোজেনেসিস): এটি একটি অণুজীবীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিপাকীয় উপজাত হিসেবে মিথেন (CH4) তৈরি হয়। এটি জলাভূমি, গভীর সমুদ্রের তলানি এবং প্রাণীদের অন্ত্রের মতো অক্সিজেনবিহীন (অ্যানারোবিক) পরিবেশে ঘটে এবং একচেটিয়াভাবে মিথেনোজেন নামক বিশেষ অণুজীব (এক ধরনের আর্কিয়া) দ্বারা সম্পন্ন হয়। এটি কার্বন চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা জীববস্তুর পচনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে কাজ করে এবং যে বাস্তুতন্ত্রে এটি খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি তৈরি করে, সেখানে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারেও অবদান রাখে।