০৪:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

রাষ্ট্রব্যবস্থা: দুঃশাসনের ভেতর-বাহিরে পুঁজিবাদ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
  • প্রকাশ: ০৮:০৬:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২
  • / ৩৭৮ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্র যে জুলুম করে— এ নিয়ে কোনো তর্ক নেই। যারা জুলুম করে তারাও যে সেটা জানে না, তা নয়। তবে রাষ্ট্রের ওই জুলুমের চরিত্রটা কী, তা নিয়ে তর্ক আছে; বিশেষ করে জুলুমবাজ রাষ্ট্রকে যারা ভেঙে ফেলে মানুষকে মুক্ত করতে চায় তাদের মধ্যে, সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে।

ব্রিটিশ রাষ্ট্রের শাসনাধীনে অর্থনীতিতে যে সামন্তবাদী শোষণ চালু ছিল— এটা নিয়ে তর্ক নেই। সমাজতন্ত্রীদের ভেতর যাঁরা অগ্রগণ্য সেই কমিউনিস্ট পার্টি সামন্তবাদের কথা বলবে; এটা স্বাভাবিক ছিল; বিশেষ করে এই কারণে যে, অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। কিন্তু ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ যখন চলে গেল তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা এলো এবং তাদের শাসনাধীনে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শোষণ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন এলো কিনা— এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা সংগত। প্রশ্ন উঠেছেও। কমিউনিস্ট পার্টিগুলো তখনও মনে করেছে, সামন্তবাদ যে বিদায় হয়েছে, তা নয়; আছে। এমনকি ১৯৫০ সালে যখন জমিদারি ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটল, তখনও জমিদার না থাক; জোতদার ও তাদের সহযোগী মহাজনদের শোষণ যে রয়ে গেল; এটা তাঁরা বলতে চেয়েছেন।

ওদিকে রাষ্ট্র কিন্তু এগোচ্ছিল পুঁজিবাদের পথেই এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা যারা পেয়েছে, পেয়ে পূর্ববঙ্গকে যারা তাদের উপনিবেশ হিসেবে কায়েম করে রাখতে চেয়েছিল; তাদের মধ্যে ভূস্বামীরা থাকলেও, পাকিস্তানি শাসনামলে যাদের দুর্দান্ত বাড় বেড়েছিল তারা ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। এরা কৃষিতে পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল অধিকতর উদ্বৃত্ত লাভের আশায়। কষ্টেসৃষ্টে হলেও পূর্ববঙ্গে একটি বুর্জোয়া শ্রেণি গড়ে উঠছিল। তারা দেখেছে, পাকিস্তানি নামধারী বুর্জোয়ারা তাদের দাবিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। সেটি তারা মেনে নিতে রাজি হয়নি। দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল অবশ্যম্ভাবী। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ওই দ্বন্দ্বের যে মীমাংসা হবে- সেটা ছিল একেবারে অসম্ভব। গড়ার পথেই পাকিস্তানের ভেঙে পড়ার এটিই একমাত্র কারণ নয়, তবে একটা বড়ো কারণ তো বটেই।

শাসনক্ষমতার ব্যাপারে পাকিস্তানের বেলায় যেটা ঘটেছিল, বাংলাদেশের বেলায়ও কিন্তু সেটাই ঘটল। ক্ষমতা চলে গেল বুর্জোয়াদের হাতে। কারণ রাষ্ট্র আয়তনে ছোট হলো ঠিকই; চেহারাতেও বদল হলো, কিন্তু চরিত্রের বদল হলো না। সমাজ বিপ্লব ঘটল না। আমাদের এই রাষ্ট্রে অনেক কিছু বেশ ভালো রকমেই মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সর্বাধিক মুক্তিপ্রাপ্তি যার ঘটেছে, তার নাম পুঁজিবাদ। বুর্জোয়ারা পুঁজিবাদী শোষণ-শাসনই চায়। পাকিস্তানি বুর্জোয়ারা চেয়েছে; বাংলাদেশি বুর্জোয়ারাও সেটাই চাইছে। এতেই তাদের সুবিধা। পুঁজিবাদ তাই দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।

এটা অবশ্য যে বাংলাদেশের ব্যাপারেই সত্য; এমন নয়। সারাবিশ্বেই এখন পুঁজিবাদের অপ্রতিহত দুঃশাসন চলছে। পুঁজিবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী হবে- এটা অনিবার্য। সেটা তারা হয়েছেও। বাঘ কি তার মুখের দাঁত ও গায়ের দাগ বদলে ফেলে দিতে পারে? আধুনিক কালে বিশ্বে যে দুই দুটি প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ ঘটেছে, তার আসল কারণ তো পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের ভেতর আধিপত্য নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদই। তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধেরও অশনিসংকেত শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। ঘটেনি যে তার কারণ দ্বন্দ্বের মীমাংসা নয়। কারণ হচ্ছে বিবদমান দুই পক্ষের উভয়ের হাতেই ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্রের প্রাচুর্য। তবে স্থানীয় যুদ্ধ তো চলছেই।

রাশিয়া যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, সেটা তো পুঁজিবাদী দুই বড়ো শক্তির লড়াই ছাড়া অন্য কিছু নয়। রাশিয়া বিলক্ষণ জানে, কার বিরুদ্ধে লড়ছে। আমেরিকারও তালে আছে এই সুযোগে রাশিয়াকে সিজিল করার। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার পুতিনকে বলছে নব্য-হিটলার। সেই অভিধা মিথ্যা নয়; তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও যে কম যান না, সেটা অমান্য করবে কে? ব্যবধানটা গুণের নয়; পরিমাণেরই।

অবশ্য পুঁজিবাদীরা নিজেদের সরাসরি পুঁজিবাদী বলতে চান না। বয়স যদিও নিতান্ত কম হয়নি, তবু লুকোচুরি খেলেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরাও নিজেদের লেখায় পুঁজিবাদ পর্যন্ত না গিয়ে করপোরেট পুঁজি, বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন ইত্যাদি পর্যন্ত পৌঁছে থেমে যান। জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন বিশ্ব যে এখন ধ্বংসের একেবারে দ্বারপ্রান্তে- সেটা বললেও, এর জন্য দায়ী যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ভিন্ন অন্যকিছু নয়- সেই মোটা কথাটা বলতে সংকোচ বোধ করেন। তবে আবরণে যে আর কুলাবে না; দানবটি এতটাই স্থূল, বৃহৎ ও জুলুমবাজ হয়ে পড়েছে যে, তাকে ভদ্র গোছের অন্য কোনো নামে ডাকার সুযোগ যে আর নেই- সেই সত্যটি এখন সামনেই চলে এসেছে। পুঁজিবাদই যে দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে এবং মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সবকিছুরই যে সে এখন মূল শত্রু- সেই সত্যটা সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশেও তো দেখতে পাচ্ছি ওই একই ঘটনা। মুক্ত পুঁজিবাদের দুঃশাসন এখানেও। মানুষ এখন সবকিছুর আগে টাকা বোঝে ও চেনে। টাকার জন্য হন্যে হয়ে সম্ভব-অসম্ভব সবকিছুতে হাত দেয়। ধরা যাক কিছুদিন আগে নড়াইলের ঘটনাটা। ফালতু একটা অজুহাত খাড়া করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া ও সম্পত্তি লুণ্ঠন করার যে কাণ্ডটি ঘটেছে; সেখানে আওয়াজটা ধর্মীয় ছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরের নির্দয় চালিকাশক্তি ছিল অর্থলোলুপতা। হামলাকারীরা বলেছে- টাকা দে, নইলে মারা পড়বি। সোজাসাপ্টা বক্তব্য। যারা টাকা দিতে পেরেছে তারা ছাড়া পেয়েছে। যারা পারেনি তাদের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। নগদ টাকা-পয়সা যা পেয়েছে নিয়েছে। স্বর্ণালংকারও বাদ পড়েনি।

নড়াইলে সাম্প্রদায়িক আওয়াজটা ছিল মুখোশ; ভেতরের মুখটা লোলুপতার। কেউ নগদ চেয়েছে। অন্য যারা কিছুটা গভীরের, তারা আশায় আশায় আছে- হিন্দু পরিবারগুলো কখন দেশ ছেড়ে যায়। চলে গেলে তারা দখলে নেবে ওদের ভিটেমাটি, দোকানপাট, জমিজমা। রাতের অন্ধকারে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে দেওয়া আগুন যতটা না লেলিহান ছিল; তার চেয়ে অধিক ছিল লুণ্ঠনের লিপ্সা।

পুঁজিবাদী দুর্বৃত্তপনা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও। চাঁদাবাজি, নারী লাঞ্ছনা, ছিনতাই, অপহরণ, ঠিকাদারি— সবকিছু করছে ‘মেধাবী’ ছাত্ররা। নড়াইলের দুর্বৃত্তদের মতো তাদেরও একই দাবি। টাকা চাই! বেশিরভাগ সময় প্রশাসন নির্লিপ্ত থাকে। দেখেও না দেখার ভান করে। মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়। গড়িমসি করে হলেও অপরাধী বলে চিহ্নিতদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বলাবাহুল্য, দেখা যায়, সাম্প্রতিক অভিযুক্ত সবাই একই ছাত্র সংগঠনের সদস্য। ছাত্রলীগ ছাড়া আবার কে! আর কার অত বুকের পাটা?

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের পক্ষে যাঁরা বলেন, তাঁরা মনে হয় জানেন না— ছাত্র রাজনীতি নেই বলেই সরকারি দলের সমর্থক সেজে ছাত্ররা এ রকম দুর্বৃত্তপনা করে থাকে। পাকিস্তান আমলেও এরা ছিল। তখন এদের নাম ছিল এনএসএফ। পাকিস্তান চলে গেছে, কিন্তু এরা ঠিকই রয়ে গেছে। কারণ রাষ্ট্র বদলেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তর্গত চরিত্রটা বদলায়নি। কিছুটা উন্নতি ঘটেছে এটা খুবই সত্য; তবে সেটা ওই পুঁজিবাদী লাইনেই।

এনএসএফের গুন্ডারা সাপ ও ছুরি দেখাত। এমনকি অধ্যাপককে লাঞ্ছিত করতেও দ্বিধা করেনি। তবে অগ্রসর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎপরতা চালালেও তাদের কায়দাটা ছিল অনেকটা সামন্তবাদী। এখন সামন্তবাদ নেই; পুঁজিবাদ এসে গেছে। এখনকার এনএসএফ তাই সবকিছুর আগে টাকা খোঁজে। চাঁদা তোলে, ভাড়া তোলে; সহপাঠীদের কাছেও টাকা দাবি করে। ছিনতাইয়ে নামে। দলের নেতারা ক্ষমতা যতটা না চেনে, তার চেয়ে বেশি চেনে টাকা এবং জানে যে, ক্ষমতার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ঘটে টাকা হাতিয়ে নেওয়াতে। পাড়া-মহল্লার দুর্বৃত্তদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পার্থক্য থাকে না। একাকার হয়ে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের দায়িত্ব দুষ্টের দমন করা। পুলিশ চাইলে পারেও। অতীতের ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে। পুলিশ অদক্ষ নয়। তবে পুলিশ কাজটা সব সময় করে না। কেন করে না? করে না কারণ, তারা ব্যস্ত থাকে অন্য কাজে। রাজনীতির মাঠ গরম হলে তাদের কাজ যায় বেড়ে। যার লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

রাষ্ট্রব্যবস্থা: দুঃশাসনের ভেতর-বাহিরে পুঁজিবাদ

প্রকাশ: ০৮:০৬:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অক্টোবর ২০২২

রাষ্ট্র যে জুলুম করে— এ নিয়ে কোনো তর্ক নেই। যারা জুলুম করে তারাও যে সেটা জানে না, তা নয়। তবে রাষ্ট্রের ওই জুলুমের চরিত্রটা কী, তা নিয়ে তর্ক আছে; বিশেষ করে জুলুমবাজ রাষ্ট্রকে যারা ভেঙে ফেলে মানুষকে মুক্ত করতে চায় তাদের মধ্যে, সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে।

ব্রিটিশ রাষ্ট্রের শাসনাধীনে অর্থনীতিতে যে সামন্তবাদী শোষণ চালু ছিল— এটা নিয়ে তর্ক নেই। সমাজতন্ত্রীদের ভেতর যাঁরা অগ্রগণ্য সেই কমিউনিস্ট পার্টি সামন্তবাদের কথা বলবে; এটা স্বাভাবিক ছিল; বিশেষ করে এই কারণে যে, অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। কিন্তু ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ যখন চলে গেল তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা এলো এবং তাদের শাসনাধীনে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শোষণ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন এলো কিনা— এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা সংগত। প্রশ্ন উঠেছেও। কমিউনিস্ট পার্টিগুলো তখনও মনে করেছে, সামন্তবাদ যে বিদায় হয়েছে, তা নয়; আছে। এমনকি ১৯৫০ সালে যখন জমিদারি ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটল, তখনও জমিদার না থাক; জোতদার ও তাদের সহযোগী মহাজনদের শোষণ যে রয়ে গেল; এটা তাঁরা বলতে চেয়েছেন।

ওদিকে রাষ্ট্র কিন্তু এগোচ্ছিল পুঁজিবাদের পথেই এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা যারা পেয়েছে, পেয়ে পূর্ববঙ্গকে যারা তাদের উপনিবেশ হিসেবে কায়েম করে রাখতে চেয়েছিল; তাদের মধ্যে ভূস্বামীরা থাকলেও, পাকিস্তানি শাসনামলে যাদের দুর্দান্ত বাড় বেড়েছিল তারা ছিল সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। এরা কৃষিতে পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল অধিকতর উদ্বৃত্ত লাভের আশায়। কষ্টেসৃষ্টে হলেও পূর্ববঙ্গে একটি বুর্জোয়া শ্রেণি গড়ে উঠছিল। তারা দেখেছে, পাকিস্তানি নামধারী বুর্জোয়ারা তাদের দাবিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। সেটি তারা মেনে নিতে রাজি হয়নি। দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল অবশ্যম্ভাবী। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ওই দ্বন্দ্বের যে মীমাংসা হবে- সেটা ছিল একেবারে অসম্ভব। গড়ার পথেই পাকিস্তানের ভেঙে পড়ার এটিই একমাত্র কারণ নয়, তবে একটা বড়ো কারণ তো বটেই।

শাসনক্ষমতার ব্যাপারে পাকিস্তানের বেলায় যেটা ঘটেছিল, বাংলাদেশের বেলায়ও কিন্তু সেটাই ঘটল। ক্ষমতা চলে গেল বুর্জোয়াদের হাতে। কারণ রাষ্ট্র আয়তনে ছোট হলো ঠিকই; চেহারাতেও বদল হলো, কিন্তু চরিত্রের বদল হলো না। সমাজ বিপ্লব ঘটল না। আমাদের এই রাষ্ট্রে অনেক কিছু বেশ ভালো রকমেই মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সর্বাধিক মুক্তিপ্রাপ্তি যার ঘটেছে, তার নাম পুঁজিবাদ। বুর্জোয়ারা পুঁজিবাদী শোষণ-শাসনই চায়। পাকিস্তানি বুর্জোয়ারা চেয়েছে; বাংলাদেশি বুর্জোয়ারাও সেটাই চাইছে। এতেই তাদের সুবিধা। পুঁজিবাদ তাই দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।

এটা অবশ্য যে বাংলাদেশের ব্যাপারেই সত্য; এমন নয়। সারাবিশ্বেই এখন পুঁজিবাদের অপ্রতিহত দুঃশাসন চলছে। পুঁজিবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী হবে- এটা অনিবার্য। সেটা তারা হয়েছেও। বাঘ কি তার মুখের দাঁত ও গায়ের দাগ বদলে ফেলে দিতে পারে? আধুনিক কালে বিশ্বে যে দুই দুটি প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ ঘটেছে, তার আসল কারণ তো পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের ভেতর আধিপত্য নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদই। তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধেরও অশনিসংকেত শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। ঘটেনি যে তার কারণ দ্বন্দ্বের মীমাংসা নয়। কারণ হচ্ছে বিবদমান দুই পক্ষের উভয়ের হাতেই ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্রের প্রাচুর্য। তবে স্থানীয় যুদ্ধ তো চলছেই।

রাশিয়া যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, সেটা তো পুঁজিবাদী দুই বড়ো শক্তির লড়াই ছাড়া অন্য কিছু নয়। রাশিয়া বিলক্ষণ জানে, কার বিরুদ্ধে লড়ছে। আমেরিকারও তালে আছে এই সুযোগে রাশিয়াকে সিজিল করার। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার পুতিনকে বলছে নব্য-হিটলার। সেই অভিধা মিথ্যা নয়; তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও যে কম যান না, সেটা অমান্য করবে কে? ব্যবধানটা গুণের নয়; পরিমাণেরই।

অবশ্য পুঁজিবাদীরা নিজেদের সরাসরি পুঁজিবাদী বলতে চান না। বয়স যদিও নিতান্ত কম হয়নি, তবু লুকোচুরি খেলেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরাও নিজেদের লেখায় পুঁজিবাদ পর্যন্ত না গিয়ে করপোরেট পুঁজি, বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন ইত্যাদি পর্যন্ত পৌঁছে থেমে যান। জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন বিশ্ব যে এখন ধ্বংসের একেবারে দ্বারপ্রান্তে- সেটা বললেও, এর জন্য দায়ী যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ভিন্ন অন্যকিছু নয়- সেই মোটা কথাটা বলতে সংকোচ বোধ করেন। তবে আবরণে যে আর কুলাবে না; দানবটি এতটাই স্থূল, বৃহৎ ও জুলুমবাজ হয়ে পড়েছে যে, তাকে ভদ্র গোছের অন্য কোনো নামে ডাকার সুযোগ যে আর নেই- সেই সত্যটি এখন সামনেই চলে এসেছে। পুঁজিবাদই যে দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে এবং মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সবকিছুরই যে সে এখন মূল শত্রু- সেই সত্যটা সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশেও তো দেখতে পাচ্ছি ওই একই ঘটনা। মুক্ত পুঁজিবাদের দুঃশাসন এখানেও। মানুষ এখন সবকিছুর আগে টাকা বোঝে ও চেনে। টাকার জন্য হন্যে হয়ে সম্ভব-অসম্ভব সবকিছুতে হাত দেয়। ধরা যাক কিছুদিন আগে নড়াইলের ঘটনাটা। ফালতু একটা অজুহাত খাড়া করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া ও সম্পত্তি লুণ্ঠন করার যে কাণ্ডটি ঘটেছে; সেখানে আওয়াজটা ধর্মীয় ছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরের নির্দয় চালিকাশক্তি ছিল অর্থলোলুপতা। হামলাকারীরা বলেছে- টাকা দে, নইলে মারা পড়বি। সোজাসাপ্টা বক্তব্য। যারা টাকা দিতে পেরেছে তারা ছাড়া পেয়েছে। যারা পারেনি তাদের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। নগদ টাকা-পয়সা যা পেয়েছে নিয়েছে। স্বর্ণালংকারও বাদ পড়েনি।

নড়াইলে সাম্প্রদায়িক আওয়াজটা ছিল মুখোশ; ভেতরের মুখটা লোলুপতার। কেউ নগদ চেয়েছে। অন্য যারা কিছুটা গভীরের, তারা আশায় আশায় আছে- হিন্দু পরিবারগুলো কখন দেশ ছেড়ে যায়। চলে গেলে তারা দখলে নেবে ওদের ভিটেমাটি, দোকানপাট, জমিজমা। রাতের অন্ধকারে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে দেওয়া আগুন যতটা না লেলিহান ছিল; তার চেয়ে অধিক ছিল লুণ্ঠনের লিপ্সা।

পুঁজিবাদী দুর্বৃত্তপনা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও। চাঁদাবাজি, নারী লাঞ্ছনা, ছিনতাই, অপহরণ, ঠিকাদারি— সবকিছু করছে ‘মেধাবী’ ছাত্ররা। নড়াইলের দুর্বৃত্তদের মতো তাদেরও একই দাবি। টাকা চাই! বেশিরভাগ সময় প্রশাসন নির্লিপ্ত থাকে। দেখেও না দেখার ভান করে। মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়। গড়িমসি করে হলেও অপরাধী বলে চিহ্নিতদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বলাবাহুল্য, দেখা যায়, সাম্প্রতিক অভিযুক্ত সবাই একই ছাত্র সংগঠনের সদস্য। ছাত্রলীগ ছাড়া আবার কে! আর কার অত বুকের পাটা?

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের পক্ষে যাঁরা বলেন, তাঁরা মনে হয় জানেন না— ছাত্র রাজনীতি নেই বলেই সরকারি দলের সমর্থক সেজে ছাত্ররা এ রকম দুর্বৃত্তপনা করে থাকে। পাকিস্তান আমলেও এরা ছিল। তখন এদের নাম ছিল এনএসএফ। পাকিস্তান চলে গেছে, কিন্তু এরা ঠিকই রয়ে গেছে। কারণ রাষ্ট্র বদলেছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্তর্গত চরিত্রটা বদলায়নি। কিছুটা উন্নতি ঘটেছে এটা খুবই সত্য; তবে সেটা ওই পুঁজিবাদী লাইনেই।

এনএসএফের গুন্ডারা সাপ ও ছুরি দেখাত। এমনকি অধ্যাপককে লাঞ্ছিত করতেও দ্বিধা করেনি। তবে অগ্রসর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎপরতা চালালেও তাদের কায়দাটা ছিল অনেকটা সামন্তবাদী। এখন সামন্তবাদ নেই; পুঁজিবাদ এসে গেছে। এখনকার এনএসএফ তাই সবকিছুর আগে টাকা খোঁজে। চাঁদা তোলে, ভাড়া তোলে; সহপাঠীদের কাছেও টাকা দাবি করে। ছিনতাইয়ে নামে। দলের নেতারা ক্ষমতা যতটা না চেনে, তার চেয়ে বেশি চেনে টাকা এবং জানে যে, ক্ষমতার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ঘটে টাকা হাতিয়ে নেওয়াতে। পাড়া-মহল্লার দুর্বৃত্তদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পার্থক্য থাকে না। একাকার হয়ে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের দায়িত্ব দুষ্টের দমন করা। পুলিশ চাইলে পারেও। অতীতের ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে। পুলিশ অদক্ষ নয়। তবে পুলিশ কাজটা সব সময় করে না। কেন করে না? করে না কারণ, তারা ব্যস্ত থাকে অন্য কাজে। রাজনীতির মাঠ গরম হলে তাদের কাজ যায় বেড়ে। যার লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে।