রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

ডোপামিন ও একটি স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ— পার্কিনসন’স

মানবমস্তিষ্কের ডোপামিনার্জিক (dopaminergic: যেসব নিউরন ডোপামিন তৈরি করে) নিউরনগুলো শারীরবৃত্তীয় এবং আচরণগত উভয় প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত, যার মধ্যে রয়েছে দেহের মুভমেন্ট বা চলাচল, জ্ঞানীয় কর্মকান্ড, স্বীকৃতি, প্রেরণা এবং নিউরোএন্ডোক্রাইন নিয়ন্ত্রণ। চারটি প্রধান ডোপামিনার্জিক সংকেতসংবহন পথগুলো হলো মেসোকর্টিক্যাল (mesocortical), টিউবারোইনফান্ডিবুলার (tuberoinfundibular), মেসোলিম্বিক (mesolimbic), এবং নাইগ্রোস্ট্রায়াটাল (nigrostriatal) পাথওয়ে। প্রতিটি সংকেতসংবহন পথেই রয়েছে পৃথক ডোপামিন নিউরন। বলা বাহুল্য, প্রত্যেকটি পথে ডোপামিন সম্পর্কিত ত্রুটির কারণে পার্কিনসন’স বা অন্যান্য রোগের কারণ হতে পারে। তবে, এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র বর্ণনা করা হয়েছে নাইগ্রোস্ট্রায়াটাম-এর সংকেতসংবহন, যা পার্কিনসন’স রোগ সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রাখে।

মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ (Dopamine) নামক একটি প্রাণপদার্থ নিঃসরণ করে থাকে, যা আমাদের প্রাণশক্তিকে উজ্জীবিত করে, বিষণ্ণতা হ্রাস করে, বাড়িয়ে দেয় আমাদের স্মৃতি ও মেধাশক্তি। যেসব রাসায়নিক পদার্থ আমাদের সেই সুখ, ঘনিষ্ঠতা ও আনন্দের অনুভূতি এনে দেয়, সেগুলো কেন্দ্রীয় ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে নিঃসৃত প্রোটিন, নিউরোট্রান্সমিটার ও তাদের পরিবেশগত মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল। এছাড়া, আরেকটি বিশেষ কারণেও ডোপামিন হয়ে উঠেছে আরও বেশি গুরুত্ববহ, যা এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়। ‘ডোপামিন সিস্টেম’ মোটর (motor) ফিজিওলজিতে একটি অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে। ডোপামিন মস্তিষ্কের অতি গুরুত্বপূর্ণ মোটর কেন্দ্রগুলির (যেমন, ব্যাসাল গ্যাংলিয়া/basal ganglia) কার্যক্রম উপযোজন (মড্যুলেশন) বা সামঞ্জস্যসাধনের মাধ্যমে দেহের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সরাসরি মটোনিউরন (motoneuron) কার্যক্রমের মাধ্যমে দেহের চলাচল বা মুভমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে। ডোপামিনের অভাবে এই কার্যসমূহ ব্যাহত হয়, ফলে দেখা দেয় নানান স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগ, যেমন পার্কিনসন’স। বিশ্বব্যাপী, ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষ পারকিনসন’স রোগে আক্রান্ত, যার প্রকোপ গত ২৫ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।  

স্নায়ুতন্ত্র বা স্নায়বিক কলার মৌলিক একক হচ্ছে নিউরন (neuron) বা স্নায়ুকোষ। মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় ৮৬ বিলিয়ন (৮৬০০ কোটি) নিউরন ও সমপরিমাণ সহযোগী গ্লিয়া (glia) কোষের সমন্বয়ে সৃষ্ট একটি জটিল অঙ্গ, যেখানে ২.৫ মিলিয়ন গিগাবাইট ডিজিটাল সমতুল্য মেমরি ও আবেগ ধরে রাখা সক্ষম। শরীরের দ্রুততম সংকেত প্রেরণ করে মেরুরজ্জুতে অবস্থিত আলফা মোটর নিউরনগুলো, অর্থাৎ প্রতি ঘন্টায় তারা ৪৩১ কিমি বেগে তাদের স্নায়ুসংকেত সঞ্চারণ করে। গ্লিয়া-কোষগুলো নিউরনের জন্য সহযোগী কোষ, তারা নিউরন ঘিরে মাইয়েলিন আবরণ তৈরি করে এবং নিউরনগুলোতে পুষ্টি সরবরাহ করে। নিউরন-কোষদেহ থেকে উৎপন্ন বেশ লম্বা ও শাখাবিহীন তন্তু  বা অ্যাক্সন (axon) হতে পারে প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত লম্বা, যেমন সায়াটিক (sciatic) নার্ভের অ্যাক্সন। কার্যতঃ তিন ধর নিউরন দেখা যায়: অ্যাফারেন্ট (Afferent) বা সেন্সরি নিউরন; যা দেহের বিভিন্ন কলা বা অঙ্গ থেকে সংকেত নিয়ে আসে মস্তিষ্কে; ইফারেন্ট (Efferent) বা মোটর (motor) নিউরন যা মস্তিস্ক থেকে সংকেত নিয়ে যায় দেহে- বিভিন্ন পেশী ও গ্রন্থিগুলোতে; এবং ইন্টারনিউরন, যা  (Interneurons) কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ভিতরেই পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নিউরোনের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। নিউরন থেকে নিঃসৃত সংকেতবাহী রাসায়নিক অণুগুলোকে বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার (neurotransmitter)। তারা হতে পারে একক অ্যামিনো অ্যাসিড (যেমন গ্লুটামেট/glutamate, GABA), মনোঅ্যামিন (সেরোটোনিন, ডোপামিন), পেপটাইড (অক্সিটোসিন, সোমাটোস্ট্যাটিন), গ্যাসীয় নিউরোট্রান্সমিটার (নাইট্রিক অক্সাইড), পিউরিন (ATP, অ্যাডিনোসিন) বা ওপিয়য়েড গোত্রীয়। যে প্রকৃতির-ই হোক না কেন, তারা সিন্যাপস (synapse) বা স্নায়ুসন্ধি দিয়ে পোস্টসিন্যাপ্টিক নিউরনে বিদ্যমান স্বীয় রিসেপ্টর (receptor) প্রোটিনের মাধ্যমে পরবর্তী নিউরনগুলোতে পর্যায়ক্রমে তাদের রাসায়নিক সিগন্যাল প্রেরণ করে। নিউরনগুলোর মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান হয় বৈদ্যুতিক চার্জ/উদ্দীপনা বা অ্যাকশন পোটেনশিয়াল (action potential) সৃষ্টির মাধ্যমে। 

গ্লুটামিক অ্যাসিড, যা গ্লুটামেট নামেও পরিচিত, হলো একটি α-অ্যামিনো অ্যাসিড, যা প্রোটিনের জৈব সংশ্লেষণে প্রায় সমস্ত জীবদেহে ব্যবহৃত হয়। মানবদেহ নিজস্বী এনজাইম দ্বারাই গ্লুটামিক অ্যাসিড সংশ্লেষ করতে পারে, খাদ্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয় না। গ্লুটামেট মেরুদন্ডী স্নায়ুতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত একটি উত্তেজনাসৃষ্টিকারী (excitatory) নিউরোট্রান্সমিটার। প্রিসিন্যাপ্টিক স্নায়ু উত্তেজনায় গ্লুটামেট নিঃসৃত হয় স্নায়ু সিনাপ্সে, যা পোস্টসিনাপটিক কোষের ঝিল্লিতে অবস্থিত আয়নোট্রপিক (Ionotropic) এবং মেটাবোট্রপিক (Metabotropic) জি প্রোটিন-যুক্ত রিসেপ্টরগুলোতে আবদ্ধ হয়ে তাদের প্রভাব ফেলে।  ফলে, পোস্টসিনাপটিক নিউরোনে তৈরি হয় GABA (gamma-aminobutyric acid)। মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত গ্লুটামেট নিঃসরণের ফলে অত্যাধিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, কোষগুলোতে বিষাক্ততা এনে দেয়, ফলে কোষের মৃত্যু ঘটে, জন্ম দেয় ইস্কেমিক স্ট্রোক, খিঁচুনি, আলঝেইমার রোগ, হান্টিংটন ও পারকিনসন’স রোগ। 

অপরদিকে, GABA স্নায়ুর উত্তেজনামূলক সঞ্চালনকে বাধা দেয়। এটি কেন্দ্রীয়, প্রান্তীয় ও অন্ত্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে একটি প্রধান প্রতিরোধক (inhibitory) নিউরোট্রান্সমিটার। স্বাভাবিকভাবে, GABA নিউরনগুলোর অতিরিক্ত উত্তেজনা কমিয়ে উদ্বেগ কমায়, মনোযোগ বৃদ্ধি করে, অনিদ্রা থেকে মুক্তি দেয়, রক্তচাপ কমায় এবং পেশী-সংকোচন ও শিথিলতার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্যতা এনে দেয়। দেখা গেছে, GABA সিগন্যালিং এর অস্বাভাবিকতা অনেক স্নায়বিক এবং মানসিক অবস্থাসহ স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগের সৃষ্টি করে, যেমন পারকিনসন’স রোগ (Błaszczyk JW. Parkinson’s Disease and Neurodegeneration: GABA-Collapse Hypothesis. Front Neurosci. 2016; 10: 269)। দুটি প্রধান পোস্ট-সিনাপটিক রিসেপ্টর (GABA-A ও GABA-B)গুলোর সাথে আবদ্ধ হয়ে GABA তার প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলে। GABA-A রিসেপ্টর হলো একটি আয়োনোট্রপিক রিসেপ্টর (ligand-gated ion channel), যা GABA বন্ধনে পোস্টসিন্যাপটিক ক্লোরাইড (chloride) চ্যানেলের মাধ্যমে ক্লোরাইড আয়নের পরিবাহিতা বাড়ায় ও প্রতিহত করে স্নায়ু-উত্তেজনাকে বা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়-অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ইতিবাচক বৈদ্যুতিক চার্জকে হ্রাস করে। এই অবস্থাটি হলো নিউরোনের হাইপারপোলারাইজেশন (hyperpolarization)। অপরপক্ষে, GABA-B রিসেপ্টর একটি মেটাবোট্রপিক ‘জি প্রোটিন’-যুক্ত (G protein-coupled) রিসেপ্টর, যা পোস্টসিন্যাপটিক পটাসিয়াম চ্যানেলের মাধ্যমে পটাসিয়ামের পরিবাহিতা বাড়ায় এবং প্রিসিন্যাপটিক ক্যালসিয়াম পরিবাহিতা হ্রাস করে- ফলে পোস্ট-সিন্যাপটিক নিউরনে উত্তেজনামূলক সংকেতসংবহন-কে রোধ করে। 

মানবমস্তিষ্কের ডোপামিনার্জিক (dopaminergic)

যেসব নিউরন ডোপামিন তৈরি করে) নিউরনগুলো শারীরবৃত্তীয় এবং আচরণগত উভয় প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত, যার মধ্যে রয়েছে দেহের মুভমেন্ট বা চলাচল, জ্ঞানীয় কর্মকান্ড, স্বীকৃতি, প্রেরণা এবং নিউরোএন্ডোক্রাইন নিয়ন্ত্রণ। চারটি প্রধান ডোপামিনার্জিক সংকেতসংবহন পথগুলো হলো মেসোকর্টিক্যাল (mesocortical), টিউবারোইনফান্ডিবুলার (tuberoinfundibular), মেসোলিম্বিক (mesolimbic), এবং নাইগ্রোস্ট্রায়াটাল (nigrostriatal) পাথওয়ে। প্রতিটি সংকেতসংবহন পথেই রয়েছে পৃথক ডোপামিন নিউরন। বলা বাহুল্য, প্রত্যেকটি পথে ডোপামিন সম্পর্কিত ত্রুটির কারণে পার্কিনসন’স বা অন্যান্য রোগের কারণ হতে পারে। তবে, এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র বর্ণনা করা হয়েছে নাইগ্রোস্ট্রায়াটাম-এর সংকেতসংবহন, যা পার্কিনসন’স রোগ সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা  রাখে। নাইগ্রোস্ট্রায়াটাম পাথওয়েটি মধ্যমস্তিষ্কে অবস্থিত সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা (Substantia nigra)কে মস্তিষ্কের অগ্রভাগে বিদ্যমান স্ট্রায়াটাম (striatum), যথা কডেট নিউক্লিয়াস (caudate nucleus) এবং পিউটামেন (putamen) অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করে। এটি মস্তিষ্কের ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (basal ganglia) মোটর লুপ (motor loop)নামক একটি সিস্টেমের অংশ (ছবি দেখুন)। এই পথের ডোপামিনার্জিক নিউরনগুলো স্ট্রায়াটামে গ্যাবার্জিক (GABAergic: যেসব নিউরন GABA নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে) নিউরনগুলোর সাথে সংকেতসংবহনের একটি পথ স্থাপন করে। এখানে বলা প্রয়োজন, গ্লুটামেট নিউরোট্রান্সমিটারের মতো ডোপামিন হলো উত্তেজক (excitatory) ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার; আর GABA পোস্ট-সিনাপটিক নিউরনে প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলে। সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রায় ডোপামিনার্জিক নিউরনের অবক্ষয় হলো পার্কিনসন’স রোগের অন্যতম প্রধান প্যাথলজিকাল বৈশিষ্ট্য, যার ফলে ডোপামিনের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং ধীরগতি চলাচল (hypokinesia বা bradykinesia) ও দেহের কম্পনসহ পার্কিনসন’স রোগের লক্ষণগত মোটর (motor) সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দেয়।

ডোপামিন ও ডোপামিন রিসেপ্টর

ক্যাটেকোলামাইন (catecholamine) পরিবারের (যে গ্রুপে এপিনেফ্রিন ও নর-এপিনেফ্রিন হরমোনও অন্তর্ভুক্ত) একটি হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটার হলো ডোপামিন। ডোপামিন প্রধানত মস্তিষ্কে সংশ্লেষিত হয়, তবে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির মেডুলা, প্লাসেন্টা এবং চোখের রেটিনার অ্যামাক্রাইন (amacrine) কোষগুলোও ডোপামিন তৈরি করতে সক্ষম ৷ চোখের রেটিনায় ডোপামিন একটি নিউরোমড্যুলেটর যা দিনের আলোয় চোখের বিভিন্ন কোষীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে (Nir I, Haque R, et al., Diurnal metabolism of dopamine in the mouse retina. Brain Res. 2000, 870(1-2):118-25)।  

মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনার্জিক নিউরন সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম (প্রায় চার লক্ষ নিউরন) এবং সেগুলো মূলতঃ মস্তিষ্কের সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা (পার্স কম্প্যাকটা/pars compacta) ও ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল অঞ্চল (ventral tegmental area)জুড়ে অবস্থিত। এছাড়াও, পশ্চাৎ হাইপোথ্যালামাস (hypothalamus), আর্কুয়েট নিউক্লিয়াস (the arcuate nucleus), জোনা ইনসার্টা (the zona incerta) এবং পেরিভেন্ট্রিক্যুলার নিউক্লিয়াস (periventricular nucleus) অঞ্চলের স্নায়ুকোষগুলো থেকেও স্বল্পপরিমানে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। ডোপামিনের পূর্বসূরী এল-ডোপা (L-dopa/levodopa) সংশ্লেষিত হয় অ্যামিনো অ্যাসিড ফেনিল্যালানিন (phenylalanine) বা টাইরোসিন (L-tyrosine) থেকে । প্রথমটি আমাদের দেহে তৈরি হয় না, খাবার থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যদিও এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো প্রায় প্রতিটি প্রোটিনে বা খাবারে সহজেই পাওয়া যায়, কিস্তু এগুলো রক্ত-মস্তিষ্কের প্রতিবন্ধকতা (blood-brain barrier) অতিক্রম করতে সক্ষম নয়। ফলে নিউরোনের কার্যকলাপ সঞ্চালনের জন্য মস্তিষ্কের ভিতরেই ডোপামিনের সংশ্লেষণ হওয়া বাঞ্চনীয়। টাইরোসিন হাইড্রোক্সিলেজ (tyrosine hydroxylase) এনজাইম দ্বারা টাইরোসিন রূপান্তরিত হয় এল-ডোপা (L-DOPA)-তে। এনজাইম ডোপা ডিকারবক্সিলেজ (DOPA decarboxylase) দ্বারা এল-ডোপা রূপান্তরিত হয় ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটারে। ডোপামিন স্বয়ং রূপান্তরিত হতে পারে নর-এপিনেফ্রিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটারে। 

ডোপামিন ৫ ধরনের ডোপামিন রিসেপ্টর (Dopamine receptors: D1-D5)-র সাথে আবদ্ধ হয়ে তার কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা প্রভাবিত করে। এই রিসেপ্টরগুলো পোস্টসিন্যাপটিক (postsynaptic) নিউরনের ডেনড্রাইডে অবস্থিত। পাঁচটি রিসেপ্টর দুইটি গ্রুপে বিভক্ত- D1-এর মতো (D1-like: D1 ও D5) এবং D2-এর মতো (D2-like: D2, D3 ও D4) রিসেপ্টর। এই রিসেপ্টরগুলো মেটাবোট্রপিক, জি প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর হিসেবে কাজ করে, যার অর্থ তারা একটি জটিল সংকেত-সংবহনের মাধ্যমে তাদের প্রভাব প্রয়োগ করে। D1 ও  D5 রিসেপ্টরগুলো সোডিয়াম চ্যানেল (sodium channel) খোলার মাধ্যমে নিউরনে উত্তেজনামূলক প্রভাব আনতে পারে, অথবা পটাসিয়াম চ্যানেল (potassium channel) খোলার মাধ্যমে তারা প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলতে পারে। অপরপক্ষে, D2-এর মতো রিসেপ্টরগুলো (D2, D3 এবং D4) শুধুমাত্র প্রতিরোধমূলক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে ডোপামিনকে শুধুমাত্র উত্তেজক বা প্রতিরোধক হরমোন হিসেবে বর্ণনা করাও ভুল হবে। মস্তিস্ক-স্নায়ুতন্ত্রের সর্বাধিক ডোপামিন রিসেপ্টর হলো D1 রিসেপ্টর। দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়, পেশির সংকোচন-প্রসারণ, দেহের চলাচল (motor movement), আবেগ সৃষ্টি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মূলতঃ D1 রিসেপ্টর। 

দেহের মুভমেন্ট বা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরী হয়ে যায় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবে অবস্থিত মোটর কর্টেক্সে- প্রাথমিক মোটর কর্টেক্স (primary motor cortex), প্রিমোটর কর্টেক্স  (premotor cortex) ও অতিরিক্ত (supplementary) মোটর এলাকা। সে পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবে তারা তাৎক্ষণিক সেই সংকেতগুলো প্রেরণ করে ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (basal ganglia)-য়, যাতে করে পরিকল্পনার মাত্রা আরও নির্ভুল ও বেগবান হয়। দেহের মুভমেন্টের জন্য মোটর কর্টেক্সের উচ্চ মাত্রায় বৈদ্যুতিক চার্জ বা উদ্দীপনা প্রয়োজন। ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার নিম্নধৃত এই লুপটি সৃষ্টি করে সেই মাত্রায় উদ্দীপনা, মূলত গ্লুটামেট নিঃসরণের মাধ্যমে। তাই, নিঃসন্দেহে বলা যায় যে দেহের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্যাসাল গ্যাংলিয়া ও মস্তিষ্কের অন্যান্য উপকর্টিক্যাল মোটর অঞ্চল, যেমন সাবস্টেনশিয়া নাইগ্রা, অর্থাৎ ডোপামিনার্জিক নিউরন। এছাড়া, স্বতন্ত্রভাবে  সেরিবেলাম (Cerebellum)ও দেহের মুভমেন্ট সংক্রান্ত সংকেত পাঠায়, যা এই সন্দর্ভে আলোচিত হয় নি।

মস্তিষ্কে ডোপামিনের অভাব পার্কিনসন’স রোগের মূল কারণ। পার্কিনসন’স রোগের উৎস, তার রাসায়নিক ভিত্তি ও ডোপামিনের ভূমিকা নিয়ে জানতে হলে আমাদের মস্তিষ্কের একগুচ্ছ স্নায়ুকোষের কাঠামো, তথা ‘ব্যাসাল গ্যাংলিয়া’ সমন্ধে কিছুটা মৌলিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সংক্ষেপে সেটি ছবিসহ বর্ণনা করা হলো।

ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (Basal ganglia)

ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (নিউরন সেল-বডির একত্রিত গুচ্ছকে গ্যাংলিয়ন বা স্নায়ুগ্রন্থি বলা হয়) অগ্রমস্তিকের গোড়ায় এবং মধ্যমস্তিকের শীর্ষে অবস্থিত। সেরিব্রাল কর্টেক্স (প্রিফ্রন্টাল), থ্যালামাস এবং ব্রেনস্টেম, সেইসাথে মস্তিষ্কের অন্যান্য অঞ্চলগুলোর সাথে ব্যাসাল গ্যাংলিয়া দৃঢ়ভাবে আন্তঃসংযুক্ত। দৈহিক চলাচল (motor movement), তদর্থে পেশি-সংকোচন-প্রসারণ, পদ্ধতিগত শিক্ষা, অভ্যাসগত শিক্ষা, চোখের নড়নচড়ন, জ্ঞানীয় কর্মকান্ড এবং আবেগসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে যুক্ত ব্যাসাল গ্যাংলিয়া। ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার প্রধান অংশগুলো  হচ্ছে: ১) স্ট্রায়াটাম (striatum), যার মধ্যে রয়েছে ডোরসাল স্ট্রায়াটাম (কডেট নিউক্লিয়াস/caudate nucleus ও পিউটামেন/putamen) এবং ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম (নিউক্লিয়াস অ্যাকম্বেন্স/nucleus accumbens ও ঘ্রাণজ টিউবারকল/olfactory tubercle); ২) গ্লোবাস প্যালিডাস (globus pallidus: externus ও internus); ৩) ভেন্ট্রাল প্যালিডাম (ventral pallidum); ৪) সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা (substantia nigra); এবং ৫) সাবথ্যালামিক নিউক্লিয়াস (subthalamic nucleus)। ব্যাসাল গ্যাংলিয়া মূলতঃ মস্তিষ্কের তিনটি অঞ্চল থেকে সংকেত গ্রহণ করে, যেমন মোটর কর্টেক্স, থ্যালামাস ও সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা (পার্স কম্প্যাকটা)। কডেট নিউক্লিয়াস, পিউটামেন, এবং অ্যাকাম্বেন্স নিউক্লিয়াস সবই ইনপুট (input) নিউক্লিয়াস/গ্যাংলিয়া হিসাবে বিবেচিত, আর আউটপুট (output) নিউক্লিয়াস হলো সেসব কাঠামো, যেখানে ব্যাসাল গ্যাংলিয়া তার সংকেত প্রেরণ করে, যেমন গ্লোবাস প্যালিডাস এক্সটারনাস (পরোক্ষ পাথওয়ে) বা ইন্টারনাস (প্রত্যক্ষ পাথওয়ে), সাবথ্যালামাস, থ্যালামাস ও সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা  (পার্স রেটিকুলাটা/pars reticulata)। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে, মস্তিষ্কের মূলতঃ দুটি স্নায়ুপথ বা সংকেতসংবহন পথ (পাথওয়ে), প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মোটর-কর্টেক্স ও নাইগ্রো-সাবস্ট্যানশিয়া পাথওয়ে, দেহের চলাফেরা/মোটর মুভমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যক্ষ পাথওয়েটি নিয়ন্ত্রণ করে উপরিল্লিখিত মোটর কর্টেক্স, যেখান থেকে ‘গ্লুটামেট’ (glutamate) নিউরোট্রান্সমিটার উত্তেজনামূলক (excitatory) সংকেত প্রেরণ করে স্ট্রায়াটামে। অর্থাৎ. ইনপুট সংকেত-পথগুলো হচ্ছে এক্সসাইটেটোরি। অপরদিকে, আউটপুট নিউরনগুলো থেকে নির্গত GABA একটি ইনহিবিটরি (inhibitory) নিউরোট্রান্সমিটার।

ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার এই পুরো সিস্টেমটি এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া (positive feedback)র নীতিতে কাজ করে। যেহেতু দুটি ইনহিবিটরি সিন্যাপ্স পর্যায়ক্রমে সংযুক্ত, অর্থাৎ প্রথম ইনহিবিটরি নিউরন (স্ট্রায়াটাম) দ্বিতীয় ইনহিবিটরি নিউরনের (গ্লোবাস প্যালিডাস) কার্যকলাপকে দমন করে, সেহেতু থ্যালামাসের উপর গ্লোবাস প্যালিডাসের যে প্রতিরোধমূলক প্রভাব পড়ে তার অবসান (disinhibition) ঘটে, যা মোটর কর্টেক্সের উত্তেজনার সমতুল্য। তাই, থ্যালামাসের উত্তেজনাকর গ্লুটামেট সংকেতের মাধ্যমে ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার প্রত্যক্ষ-পথের চূড়ান্ত কাজ হলো মোটর কর্টেক্সকে উত্তেজিত করা বা দেহের চলাফেরার জন্য মোটর কার্যকলাপকে বৃদ্ধি করা।

দেহকে চলিষ্ণু রাখতে সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা-র প্রভাব অপরিহার্য

সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা (পার্স কম্প্যাকটা) ব্যাসাল গ্যাংলিয়া সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ডোপামিন নিঃসরণের মাধ্যমে উত্তেজনাকর (excitatory) সংকেত প্রেরণ করে স্ট্রায়াটামে, নির্দিষ্টভাবে পিউটামেন নিউক্লিয়াসে। পিউটামেনের নিউরনগুলোতে দুই ধরনের জি প্রোটিন-কাপল্ড ডোপামিন-রিসেপ্টর (D1 ও D2) বিদ্যমান, যেখানে ডোপামিনজনিত সংকেত গৃহীত হয় – একটি উত্তেজনাকর (D1) ও অপরটি প্রতিরোধমূলক (D2)। D1 রিসেপ্টর পরিবাহিত সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে cAMP সংশ্লেষণ, আর D2 রিসেপ্টর cAMP সংশ্লেষণে বাধা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, এই দুটির মিশলে সৃষ্টি হয় সংকেতসংবহনের একটি ভারসাম্যতা। ডোপামিনজনিত সংকেত স্ট্রায়াটাম থেকে প্রেরিত হয় গ্লোবাস প্যালিডাস অঞ্চলে, যা GABA নিঃসরণের মাধ্যমে থ্যালামাস (thalamus) হয়ে অবশেষে গ্লুটামেটের মাধ্যমে উত্তেজনামূলক সংকেত পৌঁছয় প্রাইমারি মোটর কর্টেক্সে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা এবং দেহের মোটর মুভমেন্টের জন্য ডোপামিন-রিসেপ্টর অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ত্রুটি ও কর্মহীনতার ফলে আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং মোটরজনিত ব্যাধি (movement disorder)সহ বিভিন্ন স্নায়বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। মোটরজনিত ব্যাধিগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে পার্কিনসন’স ডিজিজ, যা সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা অঞ্চলে অবস্থিত ডোপামিন-উৎপাদনকারী কোষগুলোর অবক্ষয়ের সাথে জড়িত। ফলে, ডোপামিনজনিত সংকেত স্ট্রায়াটামে খুব স্বল্পমাত্রায় পৌঁছয়, কিংবা পৌঁছয়-ই না। প্রসঙ্গতঃ একজনের সুস্থমস্তিষ্কে সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রায় রয়েছে মাত্র ৪ লক্ষ নিউরন, যেখানে পুরো মস্তিষ্কে রয়েছে ৮,৬০০ কোটি নিউরন।। নাইগ্রা অঞ্চলে ডোপামিনার্জিক নিউরনগুলোর অবক্ষয়ের পেছনে স্নায়ুকোষগুলোর বার্ধক্য ছাড়াও বিভিন্ন কারণ রয়েছে, তম্মধ্যে LRRK-2 (Leucine-rich repeat kinase 2), PARK-2 (Parkinson disease 2), DJ-1 (deglycase) ও আলফা-সাইনিউক্লিন (α-synuclein) জিনগুলোর মিউটেশন ও তাদের অকার্যকর প্রোটিনগুলোকেই দায়ী করা হয়েছে। ডোপামিনার্জিক নিউরনগুলোর অবক্ষয় ও ফলশ্রুতিতে ডোপামিনের অভাব পার্কিনসন’স রোগের মূল কারণ।  

পার্কিনসন’স রোগ (Parkinson’s disease)

পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মস্তিষ্কের ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (basal ganglia) অঞ্চলটি দেহের চলাফেরার গতি সমন্বয় করে থাকে। ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার সাথে যুক্ত সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাধি হলো পার্কিনসন’স রোগ। এটি একটি স্নায়বিক অবক্ষয়মূলক রোগ, ফলশ্রুতিতে দেহের স্বাভাবিক গমনাগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না, সৃষ্টি হয় দেহে কম্পনসহ এই রোগের নানান উপসর্গ। পার্কিনসন’স রোগের কারণ হিসেবে নিউরোট্রান্সমিটার গ্লুটামেট, ডোপামিন ও GABA পরিবাহিত সংকেত-সঞ্চারণের অস্বাভিকতাকে দায়ী করা হয়, যদিও মস্তিষ্কের ডোপামিনার্জিক অঞ্চলগুলো (বিশেষকরে, সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা)তে স্নায়ুকোষগুলোর ক্রমাগত মৃত্যু ও অবক্ষয়ের কারণে ডোপামিনের ঘাটতি-কেই পার্কিনসন’স রোগের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ দেহকোষের মতো নিউরনগুলোর কোষ বিভাজন হয় না এবং সে কারণে তাদের অবক্ষয় নতুন কোষ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা সম্ভব হয় না।  

এছাড়াও, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫% পার্কিনসন’স রোগ বেশ কিছু জিনের মিউটেশনের কারণে ঘটে থাকে। অর্থাৎ, একটি পরিবারে এই রোগটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত. প্রভাবিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। যেমন GBA (glucocerebrosidase), LRRK-2 (Leucine-rich repeat kinase 2), PARK-2 (Parkinson disease 2), PARK-7, TMEM230 (transmembrane protein), DJ-1 (deglycase) ও আলফা-সাইনিউক্লিন (α-synuclein, SNCA) জিনগুলোর মিউটেশনের ফলে এই রোগ বংশগতভাবে সঞ্চারিত হতে পারে। আলফা-সাইনিউক্লিনসহ এমাইলয়েড (amyloid) ও Tau-নামক জমাটবদ্ধ প্রোটিন মোটর স্নায়ুকোষ (motor neurons)গুলোকে আক্রমণ করে ও দেহের ঐচ্ছিক পেশীগুলোকে দুর্বল করে ফেলে। ফলে দেখা দেয় দেহ-দৌর্বল্য, মাথায় ও হাতে-পায়ে কম্পন, বিষাদগ্রস্ততা, বিভ্রান্তি ও ধীরগতিতে (bradykinesia) চলাফেরার মতো উপসর্গ। অধিকন্তু,, গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সাথে পার্কিনসন’স রোগের একটি সম্পর্ক রয়েছে। ডায়াবেটিস-রোগীদের ৩০% পার্কিনসন’স  রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে (De Pablo-Fernandez E , Goldacre R, Pakpoor J et al., Association between diabetes and subsequent Parkinson disease: A record-linkage cohort study. Neurology, 2018,10; 91(2): e139-e142) ।

সনাতন চিকিৎসা

পৃথিবীব্যাপী, পার্কিনসন’স  রোগ এবং ডোপামিন-প্রতিক্রিয়াশীল ডিস্টোনিয়া (dystonia) রোগের  চিকিৎসায় ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত L-DOPA বা Levodopa, যা ডোপামিন সংশ্লেষণের পূর্বসূরি একটি অণু। চিকিৎসার জন্য সরাসরি ডোপামিনের পরিবর্তে L-DOPA প্রয়োগ করা হয় এই কারণে যে ডোপামিন রক্ত-মস্তিস্ক প্রতিবন্ধক (blood-brain barrier) অতিক্রম করতে সক্ষম নয়- তবে, L-DOPA তা সহজেই অতিক্রম করতে পারে। এছাড়াও, আরো একটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। লেভোডোপা অন্ত্ৰীয় টিস্যু, যকৃত এবং কিডনির মতো প্রান্তীয় টিস্যুগুলোতে ডিকার্বোক্সিলেশন (decarboxylation)র মাধ্যমে দ্রুত রূপান্তরিত হয় ডোপামিনে। ফলে, ওষুধের মাত্র ১% লেভোডোপা পৌঁছতে সক্ষম হয় মস্তিষ্কে। সে কারণে, চিকিৎসকগণ পিডি/PD চিকিৎসায় L-DOPA+carbidopa একত্রে সেবন করার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কার্বিডোপা ডিকার্বোক্সিলেশন প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করে। বাংলাদেশেও পার্কিনসন’স রোগের প্রাথমিক চিকিৎসায় লেভোডোপা প্রয়োগ করা হয়। দুই বছরের তথ্য সংগ্রহ করে শারমিন সুলতানা ও তাঁর সহযোগী গবেষকগণ একটি সাধারণ পরিসংখ্যানমূলক সমীক্ষা প্রকাশ করেছেন একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে, যেখানে দেখা যায় যে ১০০ জন পার্কিনসন’স রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মাত্র ১৪% ও ৮% ব্যাবহার করছেন যথাক্রমে লেভোডোপা ও কার্বিডোপা, এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রোগীদের সংখ্যা ২০% (Sultana S et al. Int J Sci Rep. 2020 Apr;6(4):139-14)। বাংলাদেশে এই ধরনের একাধিক সমীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

এছাড়াও, পিডি চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় ডোপামিন রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ সংস্থা (FDA) অনুমোদিত চারটি ডোপামিন রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট পিডি চিকিৎসার জন্য উপলব্ধ: প্র্যামিপেক্সোল (pramipexole), রোপিনিরোল (ropinirole), রোটিগোটিন (rotigotine) এবং অ্যাপোমরফিন (apomorphine)। পার্কিনসন’স রোগে এটি এককভাবে বা লেভোডোপার সাথে একসাথে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপঃ প্র্যামিপেক্সোল D2 ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোর অ্যাগোনিস্ট হিসাবে কাজ করে, যা সরাসরি স্ট্রায়াটাম (striatum)র অকার্যকর ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোকে উদ্দীপিত করতে পারে, যার ফলে ব্যাসাল গ্যাংলিয়ার সঠিক কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় ডোপামিনার্জিক সংকেতগুলো পুনরুদ্ধার করা যায়। লেভোডোপার সাথে দ্বিতীয় একটি ওষুধ যোগ করা হলে চিকিৎসার প্রভাব বৃদ্বি পায় । যেসব রোগী ওষুধ দিয়ে তাদের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, তাদের জন্য ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন  (Deep brain stimulation, DBS) সার্জারি বর্তমানে পার্কিনসন’স বা ডিস্টোনিয়া-এর মতো ‘মুভমেন্ট ডিজঅর্ডার’ চিকিৎসার জন্য একটি সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পদ্ধতি। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ সংস্থা (FDA) পার্কিনসন’স রোগের চিকিৎসায় এই পদ্ধতিটি অনুমোদন করেছিল ২০০২ সালে। এ পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট এলাকায় একটি পেসমেকার-সদৃশ ইলেক্ট্রোড ইমপ্ল্যান্ট করা হয়, যার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা বা ইম্পালস (impulse) পাঠানো হয় ও সক্রিয় করা হয় ডোপামিনার্জিক স্নায়ুকোষগুলোকে। এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে সম্প্রতি ঢাকায় বেশ কিছু সফল অস্ত্রোপচারও করা হয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের নিউরোসার্জারি বিভাগে (যুগান্তর, ১১ জুন, ২০২২)। পার্কিনসন’স-সহ স্নায়ুঅবক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ কোনো স্নায়ুবিশেষজ্ঞ বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন ও আপনার রোগের চিকৎিসা সমন্ধে বিস্তারিত জানুন।

উপসংহৃতি

মস্তিষ্কের ব্যাসাল গ্যাংলিয়া (basal ganglia) অঞ্চলটি দেহের চলাচল ও তার গতি সমন্বয় করে থাকে। ডোপামিনের অভাবে এ সমন্বয় নষ্ট হয়ে যায়। পার্কিনসন’স রোগের বিদ্যমান বেশিরভাগ থেরাপি হলো ডোপামিন প্রতিস্থাপনের উপর ভিত্তি করে, যা লক্ষণগতভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর, কিন্তু ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে ওষুধগুলো কম কার্যকরী হয়ে ওঠে, সাথে দেখা দেয় গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও। উপরন্তু, মস্তিষ্কের আল্ফ়া-সাইনিউক্লিন (α-synuclein)-সম্পর্কিত দলাবদ্ধ লিউই (Lewy bodies) বস্তুগুলোকে দ্রবীভূত করার লক্ষে পিডি চিকিৎসার কার্যকর কৌশল হিসেবে বেশ কিছু মনোক্লোনাল এন্টিবডি, যেমন Prasinezumab, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়েও রয়েছে। এছাড়াও, ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে GLP-1 (Glucagon-like peptide-1) অ্যাগনিস্টগুলি। সর্বোপরি, ‘স্টেম সেল থেরাপি’ (stem cells therapy) হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, যার সক্ষমতায় মস্তিষ্কের (যেমন সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা)মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া ডোপামিন-উৎপাদনকারী স্নায়ুকোষগুলোর প্রতিস্থাপন ও মেরামত করার সুযোগ এনে দিবে। মানুষের বিভিন্ন স্টেম কোষ (stem cells), যেমন ভ্রূণ স্টেম সেল (embryonic stem cells), মেজেনকাইম্যাল (mesenchymal) স্টেম সেল, নিউরাল (neural) স্টেম সেল বা ইন্ডিউস্ড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল (induced pluripotent stem cells) ব্যবহার করে সেল-রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এবং সে বিষয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে ইতোমধ্যেই অনেক সাফল্যও অর্জন করেছে। 

প্রফেসর ড. রাশিদুল হক
সাবেক উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে

১টি মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।

অর্থনীতি কাকে বলে? অর্থনীতির সংজ্ঞা, পরিধি বা বিষয়বস্তু কী?

অর্থনীতির ইংরেজি হলো 'ইকোনোমিকস' (Economics); এই ইকোনোমিকস শব্দটি গ্রিক...