০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
                       

হোলিকা: অনার্য বৃদ্ধাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ইতিহাস

রাজিব শর্মা
  • প্রকাশ: ০১:২৩:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ মার্চ ২০২২
  • / ৭৩০ বার পড়া হয়েছে

দোলযাত্রা বা হোলি উৎসবে মেয়েরা রঙ খেলছে

অঞ্চলভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদ্যাপনের রীতি এক। বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একটি থাম বানিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম- আমরা বলি ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতা ঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরোনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদ্যাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়। হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য পায়। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদ্যাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংশা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুণীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হতেন।

মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলির অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা শ্রীকৃষ্ণ ১০ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর সেথানে তার যাওয়াই হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব।

ভগবৎ পুরান (গীতা প্রেস, দ্বাদশ সংস্করণ, পাতা- ১৪৫ থেকে ১৫৮) ও নারদ সংহিতায় ( গীতা প্রেস, নবম সংস্করণ, পাতা- ২১৮ থেকে ২২৬, ২৩২) হোলিকা অসুরের কাহিনি বর্ণিত আছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি সংস্কৃত নাটক, যেমন- প্রহ্লাদ উপখ্যান, দশকুমার চরিত, ভক্তসুমতি, রত্নাবলী ইত্যাদি নাটকে হোলিকা অসুরের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। সর্বপরি সারা দক্ষিণ ভারতসহ মধ্যভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোকগাথা, লোককথা হিসাবে যে কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে একে আর্য অনার্যের সংঘাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

কাহিনিটি হলো- আর্যরা বা দেবতারা অনার্য মহাপরাক্রমাবলী রাজা হিরন্যকাশ্যপের রাজত্ব আক্রমন করলে রাজা হিরণ্যকাশ্যপ প্রবল যুদ্ধে আর্যদের পরাজিত করে। যুদ্ধে রাজা হিরন্যকাশ্যপের ছোটো ভাই হিরণ্যক্ষকে ছলনার দ্বারা বরাহরূপ ধারন করে সেনাপতি ইন্দ্র হত্যা করে। এরপর আর্য সেনাপতি ইন্দ্র একদিন গুপ্ত আক্রমণ করে রাজা হিরণ্যকাশ্যপের গর্ভবতী স্ত্রী কায়াধুকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। কায়াধুর প্রতি অনেক অত্যাচারের পর আর্য তথা দেবতাদের আশ্রয়ে জন্ম হয় প্রহ্লাদের।

প্রহ্লাদের পিতৃপরিচয় ভুলিয়ে দিতে জন্মের পর থেকেই আর্য বা দেবতারা তাদের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে পালন করতে থাকে প্রহ্লাদকে। তাই জন্মের পর থেকেই প্রহ্লাদকে দেবতাদের যাগযজ্ঞ, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি সংস্কারের প্রতি অনুরক্ত করে তোলা হয় এবং বিষ্ণুর প্রতি তার গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলা হয়। এরপর একদিন রাজা হিরণ্য কাশ্যপ দেবতাদের আক্রমণ করে রাজমহিষী কায়াধু ও রাজপুত্র প্রহ্লাদকে উদ্ধার করে হিরণ্যপুরীতে নিয়ে আসে।

কিন্তু শিশু প্রহ্লাদের দেবভক্তি ও বিষ্ণুর প্রতি ভক্তি দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। দেবতারা এই সুযোগে প্রহ্লাদের সহযোগিতায় মহাশক্তিশালী অনার্যবীর হিরণ্যকাশ্যপকে গভীর ছলনায় বিষ্ণুর মহিনী রূপের সাহায্যে ইন্দ্র নরসিংহ রূপ ধারণ করে হত্যা করে এবং প্রহ্লাদকে নামে মাত্র সিংহাসনে বসিয়ে রাজকার্য পরিচালনা করে দেবরাজ ইন্দ্র। ফলে হিরণ্যরাজ্যে দেবতারা যাগযজ্ঞ, বেদবিধি, শৌচাচার ইত্যাদি আর্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে থাকে এবং দেবরাজ ইন্দ্র প্রহ্লাদের কাছ থেকে প্রতিমুহূর্তে খাদ্যশস্য, সুরা, গরু, অস্ত্র, এমনকি অনার্য যুবতী নারী চাপ দিয়ে আদায় করতে থাকে। অনার্য ভূমিতে দেখা যায় আর্য তথা দেবতাদের আস্ফালন।

হোলিকা ছিলেন হিরণ্যকাশ্যপের দিদি অর্থাৎ প্রহ্লাদের পিসিমা। তিনি একদিকে যেমন বিদূষী নারী ছিলেন, অপর দিকে ছিলেন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতি, রাজত্ব পরিচালনায় সুদক্ষ, যুদ্ধ কৌশলী এবং প্রজা কল্যাণকামী নারী। রাজা হিরণ্যকাশ্যপের শক্তির মূল আধারও ছিলেন তিনি ও তার বুদ্ধি-জ্ঞান। এই সহৃদয়া ও প্রজাহিতৈষী নারীকে প্রজারা মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। প্রহ্লাদের রাজ্যের এরূপ কঠিন পরিস্থিতিতে হোলিকা সর্বপ্রথমে প্রহ্লাদকে তার পূর্বের ইতিহাস ও গৌরব গাথা ধীরে ধীরে স্মরণ করাতে থাকলেন – কীভাবে দেবতারা তার কাকা হিরণ্যক্ষকে অন্যায় ভাবে হত্যা করেছে, কীভাবে তার গর্ভবতী মাকে দেবরাজ ইন্দ্রহরণ করে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছে, কীভাবে তার মনকে বিষিয়ে দিয়ে ষড়যন্ত্র করে পিতাকে হত্যা করেছে। ধীরে ধীরে প্রহ্লাদের তার জাতির প্রতি মমত্ব বাড়ে এবং দেবতাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পিসির কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। অবশেষে হোলিকার সহায়তায় ও পরামর্শে রাজ্যকে সবদিক দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। তারপর দেবতাদের উপঢৌকন (খাদ্যশস্য, গরু, অস্ত্র, সুরা, নারী) দেয়া বন্ধ করে।

দেবতারা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে প্রহ্লাদের শক্তির মূল উৎস হলো হোলীকা। হোলিকা জীবিত থাকলে প্রহ্লাদকে যুদ্ধে কোনভাবেই পরাস্ত করা যাবে না। ফলে তারা যে কোন প্রকারে হোলিকাকে খুন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। অবশেষে গভীর ষড়যন্ত্রের দ্বারা বৃদ্ধা হোলিকাকে হরণ করে ফাঁকা মাঠের মাঝে একটা পর্ণ কুটিরে বন্দি করে অনাহারে রাখা হয়। দীর্ঘদিন না খেতে পেয়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় তার দেহ। অবশেষে প্রহ্লাদ জানতে পেরে সৈন্যবাহিনী নিয়ে পিসিকে উদ্ধার করতে গেলে দেবতারা আগে থেকে জানতে পেরে পাতার কুটিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে পাতার কুটির। আর তারই মাঝে অনাহারে ক্লিষ্ট কঙ্কালসার এক অনার্য-মূলনিবাসী বৃদ্ধা রমণীকে পুড়িয়ে মারা হয়। আর হোলিকার চিতাভস্ম গায়ে মাখিয়ে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে আর্য তথা দেবতারা। পরবর্তীকালে ছাই মাখানোর পরিবর্তে গায়ে রং বা আবির মাখানোর রীতি চালু হয়। এই হলো ‘হোলি’র ইতিহাস।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন বৃদ্ধা নারীর নির্মম-নৃশংস হত্যার ঘটনা কখনো কি উৎসব হতে পারে? সর্বপরি অনার্য-মূলনিবাসী-দলিত-বহুজন মানুষের প্রতিনিধি হোলিকার মৃত্যুতে যে উৎসব রচনা করেছে আর্য তথা ব্রাহ্মণ্যবাদীরা, সেই উৎসব অনার্য-মূলনিবাসী-দলিত-বহুজন সমাজের মানুষেরা কি পালন করতে পারে? আসলে দলিত বহুজন মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদের উপর ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে এমনভাবে চাপিয়ে দিয়েছে যে, বহুজন সমাজ তাদের পূর্বের সমস্ত ইতিহাস ভুলে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি বলে মনে করছেন।

পরবর্তীকালে এই কাহিনির ওপর রাধা-কৃষ্ণের দোল খেলার কাহিনিকে চাপিয়ে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে এবং বর্তমানকালে এই হোলি উৎসবের সঙ্গে বসন্ত উৎসবকে মিলিয়ে দিয়ে একে আরও উৎসব মুখর করে তোলা হয়েছে। কিন্তু এই একবিংশ শতকেও কি দলিত বহুজন সমাজের নারীদের প্রতি খুন, ধর্ষণ অত্যাচারের চিত্র এতটুকুও বদলেছে? এখনো দলিত নারীকে ধর্ষণ করে প্রকাশ্য বাজারের মাঝে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এখনো দলিত নারী ধর্ষিতা হয়ে কুড়ি ঘণ্টা রাস্তার পাশে পড়ে থাকে। ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ও সংস্কৃতির মোহ থেকে দলিত-বহুজনেরা যতদিন বের হতে না পারবে, ততদিন তাদের উন্নতি ও মুক্তি ঘটা সম্ভব কি? হে দলিত মূলনিবাসী মানুষ, উত্তর দাও।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

রাজিব শর্মা

সংবাদকর্মী
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে
তাহসান খান এবং মুনজেরিন শহীদের দুটি প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কোর্স করুন ২৮% ছাড়ে

২৮℅ ছাড় পেতে ৩০/০৬/২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রোমো কোড “professional10” ব্যবহার করুন। বিস্তারিত জানতে ও ভর্তি হতে ক্লিক করুন এখানে

হোলিকা: অনার্য বৃদ্ধাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ইতিহাস

প্রকাশ: ০১:২৩:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ মার্চ ২০২২

অঞ্চলভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদ্যাপনের রীতি এক। বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একটি থাম বানিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম- আমরা বলি ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতা ঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরোনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদ্যাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

আমাদের অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোক-সংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়। হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য পায়। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদ্যাপন রীতি পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংশা’য় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বেরুণীর বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সংযুক্ত হতেন।

মধ্যযুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পগুলির অন্যতম প্রধান বিষয় রাধা-কৃষ্ণের রঙ উৎসব। এই রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে হোলির যে অতি বৈষ্ণবীয় আচার তা অবশ্যই প্রশ্নযুক্ত। কেননা এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবন ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা শ্রীকৃষ্ণ ১০ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করার পর সেথানে তার যাওয়াই হয়নি। অন্যদিকে বহু গবেষক রাধার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন থেকে দোল কথার উদ্ভব।

ভগবৎ পুরান (গীতা প্রেস, দ্বাদশ সংস্করণ, পাতা- ১৪৫ থেকে ১৫৮) ও নারদ সংহিতায় ( গীতা প্রেস, নবম সংস্করণ, পাতা- ২১৮ থেকে ২২৬, ২৩২) হোলিকা অসুরের কাহিনি বর্ণিত আছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি সংস্কৃত নাটক, যেমন- প্রহ্লাদ উপখ্যান, দশকুমার চরিত, ভক্তসুমতি, রত্নাবলী ইত্যাদি নাটকে হোলিকা অসুরের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। সর্বপরি সারা দক্ষিণ ভারতসহ মধ্যভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোকগাথা, লোককথা হিসাবে যে কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে একে আর্য অনার্যের সংঘাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

কাহিনিটি হলো- আর্যরা বা দেবতারা অনার্য মহাপরাক্রমাবলী রাজা হিরন্যকাশ্যপের রাজত্ব আক্রমন করলে রাজা হিরণ্যকাশ্যপ প্রবল যুদ্ধে আর্যদের পরাজিত করে। যুদ্ধে রাজা হিরন্যকাশ্যপের ছোটো ভাই হিরণ্যক্ষকে ছলনার দ্বারা বরাহরূপ ধারন করে সেনাপতি ইন্দ্র হত্যা করে। এরপর আর্য সেনাপতি ইন্দ্র একদিন গুপ্ত আক্রমণ করে রাজা হিরণ্যকাশ্যপের গর্ভবতী স্ত্রী কায়াধুকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। কায়াধুর প্রতি অনেক অত্যাচারের পর আর্য তথা দেবতাদের আশ্রয়ে জন্ম হয় প্রহ্লাদের।

প্রহ্লাদের পিতৃপরিচয় ভুলিয়ে দিতে জন্মের পর থেকেই আর্য বা দেবতারা তাদের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে পালন করতে থাকে প্রহ্লাদকে। তাই জন্মের পর থেকেই প্রহ্লাদকে দেবতাদের যাগযজ্ঞ, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি সংস্কারের প্রতি অনুরক্ত করে তোলা হয় এবং বিষ্ণুর প্রতি তার গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলা হয়। এরপর একদিন রাজা হিরণ্য কাশ্যপ দেবতাদের আক্রমণ করে রাজমহিষী কায়াধু ও রাজপুত্র প্রহ্লাদকে উদ্ধার করে হিরণ্যপুরীতে নিয়ে আসে।

কিন্তু শিশু প্রহ্লাদের দেবভক্তি ও বিষ্ণুর প্রতি ভক্তি দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। দেবতারা এই সুযোগে প্রহ্লাদের সহযোগিতায় মহাশক্তিশালী অনার্যবীর হিরণ্যকাশ্যপকে গভীর ছলনায় বিষ্ণুর মহিনী রূপের সাহায্যে ইন্দ্র নরসিংহ রূপ ধারণ করে হত্যা করে এবং প্রহ্লাদকে নামে মাত্র সিংহাসনে বসিয়ে রাজকার্য পরিচালনা করে দেবরাজ ইন্দ্র। ফলে হিরণ্যরাজ্যে দেবতারা যাগযজ্ঞ, বেদবিধি, শৌচাচার ইত্যাদি আর্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে থাকে এবং দেবরাজ ইন্দ্র প্রহ্লাদের কাছ থেকে প্রতিমুহূর্তে খাদ্যশস্য, সুরা, গরু, অস্ত্র, এমনকি অনার্য যুবতী নারী চাপ দিয়ে আদায় করতে থাকে। অনার্য ভূমিতে দেখা যায় আর্য তথা দেবতাদের আস্ফালন।

হোলিকা ছিলেন হিরণ্যকাশ্যপের দিদি অর্থাৎ প্রহ্লাদের পিসিমা। তিনি একদিকে যেমন বিদূষী নারী ছিলেন, অপর দিকে ছিলেন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতি, রাজত্ব পরিচালনায় সুদক্ষ, যুদ্ধ কৌশলী এবং প্রজা কল্যাণকামী নারী। রাজা হিরণ্যকাশ্যপের শক্তির মূল আধারও ছিলেন তিনি ও তার বুদ্ধি-জ্ঞান। এই সহৃদয়া ও প্রজাহিতৈষী নারীকে প্রজারা মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। প্রহ্লাদের রাজ্যের এরূপ কঠিন পরিস্থিতিতে হোলিকা সর্বপ্রথমে প্রহ্লাদকে তার পূর্বের ইতিহাস ও গৌরব গাথা ধীরে ধীরে স্মরণ করাতে থাকলেন – কীভাবে দেবতারা তার কাকা হিরণ্যক্ষকে অন্যায় ভাবে হত্যা করেছে, কীভাবে তার গর্ভবতী মাকে দেবরাজ ইন্দ্রহরণ করে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছে, কীভাবে তার মনকে বিষিয়ে দিয়ে ষড়যন্ত্র করে পিতাকে হত্যা করেছে। ধীরে ধীরে প্রহ্লাদের তার জাতির প্রতি মমত্ব বাড়ে এবং দেবতাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পিসির কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। অবশেষে হোলিকার সহায়তায় ও পরামর্শে রাজ্যকে সবদিক দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। তারপর দেবতাদের উপঢৌকন (খাদ্যশস্য, গরু, অস্ত্র, সুরা, নারী) দেয়া বন্ধ করে।

দেবতারা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে প্রহ্লাদের শক্তির মূল উৎস হলো হোলীকা। হোলিকা জীবিত থাকলে প্রহ্লাদকে যুদ্ধে কোনভাবেই পরাস্ত করা যাবে না। ফলে তারা যে কোন প্রকারে হোলিকাকে খুন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। অবশেষে গভীর ষড়যন্ত্রের দ্বারা বৃদ্ধা হোলিকাকে হরণ করে ফাঁকা মাঠের মাঝে একটা পর্ণ কুটিরে বন্দি করে অনাহারে রাখা হয়। দীর্ঘদিন না খেতে পেয়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় তার দেহ। অবশেষে প্রহ্লাদ জানতে পেরে সৈন্যবাহিনী নিয়ে পিসিকে উদ্ধার করতে গেলে দেবতারা আগে থেকে জানতে পেরে পাতার কুটিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে পাতার কুটির। আর তারই মাঝে অনাহারে ক্লিষ্ট কঙ্কালসার এক অনার্য-মূলনিবাসী বৃদ্ধা রমণীকে পুড়িয়ে মারা হয়। আর হোলিকার চিতাভস্ম গায়ে মাখিয়ে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে আর্য তথা দেবতারা। পরবর্তীকালে ছাই মাখানোর পরিবর্তে গায়ে রং বা আবির মাখানোর রীতি চালু হয়। এই হলো ‘হোলি’র ইতিহাস।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন বৃদ্ধা নারীর নির্মম-নৃশংস হত্যার ঘটনা কখনো কি উৎসব হতে পারে? সর্বপরি অনার্য-মূলনিবাসী-দলিত-বহুজন মানুষের প্রতিনিধি হোলিকার মৃত্যুতে যে উৎসব রচনা করেছে আর্য তথা ব্রাহ্মণ্যবাদীরা, সেই উৎসব অনার্য-মূলনিবাসী-দলিত-বহুজন সমাজের মানুষেরা কি পালন করতে পারে? আসলে দলিত বহুজন মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদের উপর ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে এমনভাবে চাপিয়ে দিয়েছে যে, বহুজন সমাজ তাদের পূর্বের সমস্ত ইতিহাস ভুলে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি বলে মনে করছেন।

পরবর্তীকালে এই কাহিনির ওপর রাধা-কৃষ্ণের দোল খেলার কাহিনিকে চাপিয়ে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে এবং বর্তমানকালে এই হোলি উৎসবের সঙ্গে বসন্ত উৎসবকে মিলিয়ে দিয়ে একে আরও উৎসব মুখর করে তোলা হয়েছে। কিন্তু এই একবিংশ শতকেও কি দলিত বহুজন সমাজের নারীদের প্রতি খুন, ধর্ষণ অত্যাচারের চিত্র এতটুকুও বদলেছে? এখনো দলিত নারীকে ধর্ষণ করে প্রকাশ্য বাজারের মাঝে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এখনো দলিত নারী ধর্ষিতা হয়ে কুড়ি ঘণ্টা রাস্তার পাশে পড়ে থাকে। ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ও সংস্কৃতির মোহ থেকে দলিত-বহুজনেরা যতদিন বের হতে না পারবে, ততদিন তাদের উন্নতি ও মুক্তি ঘটা সম্ভব কি? হে দলিত মূলনিবাসী মানুষ, উত্তর দাও।