০৩:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
                       

৭ই মার্চের ভাষণ এক অনন্য জাতীয় সম্পদ

সাধন চন্দ্র মজুমদার
  • প্রকাশ: ১০:১৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ মার্চ ২০২২
  • / ৮৫১ বার পড়া হয়েছে

রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ প্রদান করছেন


Google News
বিশ্লেষণ-এর সর্বশেষ নিবন্ধ পড়তে গুগল নিউজে যোগ দিন

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এবং স্বল্পমূল্যে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসের নাম মার্চ মাস। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলো স্মৃতির পাতায় সমুজ্জ্বল। ব্রিটিশরাজদের কাছ থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে আবার বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয় অনেকটা স্বেচ্ছায়, পাকিস্তান জন্মের মধ্য দিয়ে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জাতীয় চেতনায় আঘাতের পর আঘাত নেমে আসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা। দ্বিজাতিতৎত্বের ওপর ভিত্তি করে ভারতবর্ষ তিন খণ্ডে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এরই একটির নাম পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানের পূর্বাংশ তথা পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা সীমাহীন বঞ্চনার শিকার হয়। সামন্তবাদী কিছু ক্ষমতা ছাড়া বাঙালির কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না পূর্ব পাকিস্তানে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বসবাস এই পূর্ব পাকিস্তানে, সেখানে বাঙালি হয়ে যায় পরগাছা জাতি। এই ভেদনীতির রক্তাক্ত বেদনা নিয়ে একটা জাতির বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও সীমাহীন সামাজিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে বাঙালি মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে পাকিস্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই। বাঙালির এই দুর্দশা ও হতাশা দূর করতে দেবদূতের মতো আবির্ভাব ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রধান ব্যক্তি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ। তিনি পাকিস্তানের জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েও প্রথমেই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানেন। তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দুকেই গ্রহণ করেন। বাঙালি জাতি এর প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। শেখ মুজিব ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব মৃতু্যবরণ করলে পরবর্তী নেতৃত্বও উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। ভাষা আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শেখ মুজিবের দ্বিতীয় ঠিকানা হয়ে যায় জেলখানা। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন তীব্র গতি লাভ করলে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন দমাতে।

কিন্তু বাঙালি তরুণ ছাত্রযুবা তথা সাধারণ মানুষ ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। শাসকগোষ্ঠীর পেটুয়া বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। এতে শহিদ হন বেশ কিছু ছাত্র-যুবক। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি সেই রক্তাক্ত দিনটি ইতিহাসের পাতায় শহিদ দিবস হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় সিক্ত হয়ে বাঙালির গৌরবগাথা ত্যাগের ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিধারা সুস্পষ্ট হয়। ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে ওঠে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসক আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসীন। বাঙালির আবেগ-অনুভূতি তথা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে তিনি জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করে আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি গোটা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকেন।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করলে আবার গ্রেফতার হন। এভাবে অসংখ্য বার তাকে গ্রেফতার করে শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু বাঙালির প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একটানা জেলে আটকে রাখতে পারেনি বেশি দিন। জনতার রুদ্ররোষে শাসকগোষ্ঠী তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হতো। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির মুক্তির কান্ডারি।

১৯৬৯ সালে গণ-অভু্যত্থানে আইয়ুবের পতন ঘটে। এ সময় ক্ষমতায় আসে ইয়াহিয়া খান। এই ১৯৬৯ সালেই ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার সেই সমাবেশে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ছাত্র-জনতার পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্বই তাকে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত করে। তার বীরত্ব ও অমিয় ভাষণ বাঙালির বড় আকর্ষণের জায়গা। এক সম্মোহনী শক্তির অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিকে যান, সেদিকেই লাখো জনতার ঢল নামে। গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন করে সফল পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে দেশ ও জাতি।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা শাসক, বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। সূত্রপাত হয় মুক্তিযুদ্ধের।

বাংলার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস এক মাইলফলক। মহিমান্বিত ইতিহাস রচিত হয় এই ’৭১ সালে। পহেলা মার্চ ১৯৭১। ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে এক বৈঠক হয়। কিন্তু কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হলে বঙ্গবন্ধু হরতালের ঘোষণা দেন সারা দেশে। ২, ৩, ৪ হরতাল চলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এরপর ৭ই মার্চ জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানানো হয়। ৭ই মার্চ আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। কালজয়ী এই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে সাহসী করে তোলেন। ১৭ মিনিটের সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন দীর্ঘ ইতিহাসের বর্ণনা, প্রতিটি শব্দে, বাক্যে লুকিয়ে রয়েছে গৌরবগাথা মুক্তির মর্মকথা। তিনি ভাষণে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা দেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস— ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান ৭ই মার্চের ভাষণে। মুক্তিকামী মানুষের ব্যাকুলতায় রণধ্বনি সঞ্চারিত হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রকৃতিও যেন নেতার ডাক শুনে বাংলার মানুষকে কানে কানে বলে দেয়, ‘আর দেরি নয়, এবার ঝাঁপিয়ে পড়ো আন্দোলনে।’ মানুষ তার ঐ শুদ্ধ ভাষণকে মুক্তির বেদবাণী হিসেবে গ্রহণ করে নির্ভয়ে রাজপথে নেমে পড়ে। সব স্তরের মানুষ নবোদ্দীপনায় স্বাধীনতার অনন্ত নেশায় ঘর ছাড়ে। চারদিকে এক আওয়াজ বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

৭ মার্চের ১৭ মিনিটের ঐ ভাষণ যেন হয়ে ওঠে শৌর্যবীর্যের এক মহাকাব্য। শত্রু দমনের তথা বিনাশের কাব্যকথা। বাঙালির চৈতন্যবিকাশের পথকে চিহ্নিত করে দেয় ৭ই মার্চের ভাষণ। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ সমবেত হয় রেসকোর্স ময়দানে। আমি তখন কলেজের ছাত্র। সুদূর নওগাঁ থেকে দলবল নিয়ে চরম উদ্দীপনায় ঢাকায় হাজির হই তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান তথা বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখ লাখ জনতার ঢল নামে রাজধানীতে।

৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ও অমর কাব্যকথা শুনে কেউ কি ঘরে বসে থাকতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের সুনিপুণ কৌশল ৭ই মার্চের ভাষণেই নিহিত ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়েই প্রস্ত্তত থাকো।’ বাঙালির সম্বল বাঁশের লাঠি নিয়েই ঝঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণে পাকিস্তানি জান্তা শাসকের ভিত কেঁপে ওঠে। কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অস্ত্র নিয়ে। ২৫ মার্চ নেমে আসে পাকিস্তানি সশস্ত্র আঘাত। ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ির বাঙালি পুলিশ যে-যার মতো ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৫ মার্চের রাত ১২টার পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে যায়। মূলত ৭ই মার্চের ভাষণেই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা বর্ণিত হয়। গোটা জাতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে আমাদের জাতীয় জীবনে এক অসাধারণ অগ্রগতি সাধিত হয়। মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার নেশায় উন্মুক্ত হয়ে ওঠে দেশবাসী। চিরন্তন শক্তির মহিমা বিকশিত হয় সবার হূদয়ে। তাই ৯ মাসে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মানবসম্প্রদায়ের সমর্থনে বাঙালি বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধে বাঙালি আত্মাহুতি দেয় মর্যাদার সঙ্গে, ৭ই মার্চের ভাষণের প্রেরণা পেয়ে।

৭ই মার্চের ভাষণ আজ জাতিসংঘ কতৃ‌র্ক স্বীকৃত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি। জাতিসত্তার বিকাশ ও জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এক অনন্য জাতীয় সম্পদ। এই মহামূল্যবান সম্পদের অধিকারী হয়ে গর্বিত বাঙালি জাতি। যুগে যুগে এ ভাষণের মর্মার্থ মানবজাতিকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমাদের বীরত্বগাথা ইতিহাসকে ৭ই মার্চ অধিক সমৃদ্ধ করেছে বলেই বাঙালি আজ বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য সংরক্ষিত রাখুন

লেখকতথ্য

সাধন চন্দ্র মজুমদার

সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী, খাদ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই ওয়েবসাইটটি সামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করা হবে।

৭ই মার্চের ভাষণ এক অনন্য জাতীয় সম্পদ

প্রকাশ: ১০:১৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ মার্চ ২০২২

আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসের নাম মার্চ মাস। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলো স্মৃতির পাতায় সমুজ্জ্বল। ব্রিটিশরাজদের কাছ থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে আবার বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয় অনেকটা স্বেচ্ছায়, পাকিস্তান জন্মের মধ্য দিয়ে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জাতীয় চেতনায় আঘাতের পর আঘাত নেমে আসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা। দ্বিজাতিতৎত্বের ওপর ভিত্তি করে ভারতবর্ষ তিন খণ্ডে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এরই একটির নাম পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানের পূর্বাংশ তথা পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা সীমাহীন বঞ্চনার শিকার হয়। সামন্তবাদী কিছু ক্ষমতা ছাড়া বাঙালির কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না পূর্ব পাকিস্তানে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বসবাস এই পূর্ব পাকিস্তানে, সেখানে বাঙালি হয়ে যায় পরগাছা জাতি। এই ভেদনীতির রক্তাক্ত বেদনা নিয়ে একটা জাতির বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও সীমাহীন সামাজিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে বাঙালি মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে পাকিস্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই। বাঙালির এই দুর্দশা ও হতাশা দূর করতে দেবদূতের মতো আবির্ভাব ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রধান ব্যক্তি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ। তিনি পাকিস্তানের জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েও প্রথমেই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানেন। তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দুকেই গ্রহণ করেন। বাঙালি জাতি এর প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। শেখ মুজিব ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব মৃতু্যবরণ করলে পরবর্তী নেতৃত্বও উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। ভাষা আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শেখ মুজিবের দ্বিতীয় ঠিকানা হয়ে যায় জেলখানা। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন তীব্র গতি লাভ করলে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন দমাতে।

কিন্তু বাঙালি তরুণ ছাত্রযুবা তথা সাধারণ মানুষ ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। শাসকগোষ্ঠীর পেটুয়া বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। এতে শহিদ হন বেশ কিছু ছাত্র-যুবক। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি সেই রক্তাক্ত দিনটি ইতিহাসের পাতায় শহিদ দিবস হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় সিক্ত হয়ে বাঙালির গৌরবগাথা ত্যাগের ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিধারা সুস্পষ্ট হয়। ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে ওঠে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসক আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসীন। বাঙালির আবেগ-অনুভূতি তথা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে তিনি জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করে আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি গোটা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকেন।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করলে আবার গ্রেফতার হন। এভাবে অসংখ্য বার তাকে গ্রেফতার করে শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু বাঙালির প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একটানা জেলে আটকে রাখতে পারেনি বেশি দিন। জনতার রুদ্ররোষে শাসকগোষ্ঠী তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হতো। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির মুক্তির কান্ডারি।

১৯৬৯ সালে গণ-অভু্যত্থানে আইয়ুবের পতন ঘটে। এ সময় ক্ষমতায় আসে ইয়াহিয়া খান। এই ১৯৬৯ সালেই ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার সেই সমাবেশে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ছাত্র-জনতার পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্বই তাকে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত করে। তার বীরত্ব ও অমিয় ভাষণ বাঙালির বড় আকর্ষণের জায়গা। এক সম্মোহনী শক্তির অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিকে যান, সেদিকেই লাখো জনতার ঢল নামে। গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন করে সফল পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে দেশ ও জাতি।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা শাসক, বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। সূত্রপাত হয় মুক্তিযুদ্ধের।

বাংলার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস এক মাইলফলক। মহিমান্বিত ইতিহাস রচিত হয় এই ’৭১ সালে। পহেলা মার্চ ১৯৭১। ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে এক বৈঠক হয়। কিন্তু কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হলে বঙ্গবন্ধু হরতালের ঘোষণা দেন সারা দেশে। ২, ৩, ৪ হরতাল চলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এরপর ৭ই মার্চ জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানানো হয়। ৭ই মার্চ আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। কালজয়ী এই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে সাহসী করে তোলেন। ১৭ মিনিটের সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন দীর্ঘ ইতিহাসের বর্ণনা, প্রতিটি শব্দে, বাক্যে লুকিয়ে রয়েছে গৌরবগাথা মুক্তির মর্মকথা। তিনি ভাষণে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা দেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস— ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান ৭ই মার্চের ভাষণে। মুক্তিকামী মানুষের ব্যাকুলতায় রণধ্বনি সঞ্চারিত হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রকৃতিও যেন নেতার ডাক শুনে বাংলার মানুষকে কানে কানে বলে দেয়, ‘আর দেরি নয়, এবার ঝাঁপিয়ে পড়ো আন্দোলনে।’ মানুষ তার ঐ শুদ্ধ ভাষণকে মুক্তির বেদবাণী হিসেবে গ্রহণ করে নির্ভয়ে রাজপথে নেমে পড়ে। সব স্তরের মানুষ নবোদ্দীপনায় স্বাধীনতার অনন্ত নেশায় ঘর ছাড়ে। চারদিকে এক আওয়াজ বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

৭ মার্চের ১৭ মিনিটের ঐ ভাষণ যেন হয়ে ওঠে শৌর্যবীর্যের এক মহাকাব্য। শত্রু দমনের তথা বিনাশের কাব্যকথা। বাঙালির চৈতন্যবিকাশের পথকে চিহ্নিত করে দেয় ৭ই মার্চের ভাষণ। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ সমবেত হয় রেসকোর্স ময়দানে। আমি তখন কলেজের ছাত্র। সুদূর নওগাঁ থেকে দলবল নিয়ে চরম উদ্দীপনায় ঢাকায় হাজির হই তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান তথা বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখ লাখ জনতার ঢল নামে রাজধানীতে।

৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ও অমর কাব্যকথা শুনে কেউ কি ঘরে বসে থাকতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের সুনিপুণ কৌশল ৭ই মার্চের ভাষণেই নিহিত ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়েই প্রস্ত্তত থাকো।’ বাঙালির সম্বল বাঁশের লাঠি নিয়েই ঝঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণে পাকিস্তানি জান্তা শাসকের ভিত কেঁপে ওঠে। কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অস্ত্র নিয়ে। ২৫ মার্চ নেমে আসে পাকিস্তানি সশস্ত্র আঘাত। ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ির বাঙালি পুলিশ যে-যার মতো ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৫ মার্চের রাত ১২টার পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে যায়। মূলত ৭ই মার্চের ভাষণেই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা বর্ণিত হয়। গোটা জাতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে আমাদের জাতীয় জীবনে এক অসাধারণ অগ্রগতি সাধিত হয়। মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার নেশায় উন্মুক্ত হয়ে ওঠে দেশবাসী। চিরন্তন শক্তির মহিমা বিকশিত হয় সবার হূদয়ে। তাই ৯ মাসে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মানবসম্প্রদায়ের সমর্থনে বাঙালি বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধে বাঙালি আত্মাহুতি দেয় মর্যাদার সঙ্গে, ৭ই মার্চের ভাষণের প্রেরণা পেয়ে।

৭ই মার্চের ভাষণ আজ জাতিসংঘ কতৃ‌র্ক স্বীকৃত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি। জাতিসত্তার বিকাশ ও জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এক অনন্য জাতীয় সম্পদ। এই মহামূল্যবান সম্পদের অধিকারী হয়ে গর্বিত বাঙালি জাতি। যুগে যুগে এ ভাষণের মর্মার্থ মানবজাতিকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমাদের বীরত্বগাথা ইতিহাসকে ৭ই মার্চ অধিক সমৃদ্ধ করেছে বলেই বাঙালি আজ বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত।