বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ

ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ নিয়ে 'নিহ্নবে চিত্তদাহ : সুফিবাদ সার্বজনীন' বইয়ে লিখেছিলেন ডা. জাহাঙ্গীর/ঈমান আল সুরেশ্বরী। মোস্তাক আহ্‌মাদ সংকলন করেন এই লেখাটি।

এই কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। তখনও ভারত ব্রিটিশের গোলাম। ১৯৪৬ সাল। কেরানিগঞ্জ উপজেলার শুভাঢ্যা ইউনিয়নের চুনকুটিয়া গ্রামে জামে মসজিদে ওয়াজ করার জন্য দাওয়াত করা হয়েছিল সেই দিনের বিখ্যাত আলেম চাঁদপুর জিলার ষাটনলের অধিবাসী মাওলানা ইব্রাহিম নূরী কে। সেই দিনেই উনাকে ওয়াজ করার পর পঞ্চাশ টাকা দক্ষিণা দেওয়া হতো। অধম লিখকের বয়স তখন আনুমানিক সোয়া সাত বছর, কারণ আমার জন্ম হয়েছিল ১৯৩৮ সালের ২৫ আগস্ট। সেই দিনে ওয়াজ করার সময়ে কোনো মাইক ব্যবহার করতে দেখি নি। মাওলানা ইব্রাহিম নূরীর গলার আওয়াজ ছিলো সিংহের গর্জন করার মতো এবং অপূর্ব সম্মোহনী শক্তির অধিকারী ছিলেন। ওয়াজ করার মাঝে মাওলানা ইব্রাহিম নূরী বলে ফেললেন যে ইংরেজি পড়া হারাম এবং যারা ইংরেজি পড়বে তারা হাবিয়া দোজখে চলে যাবে। আমি তখন সেই বয়সে ইংরেজি আদর্শলিপি পাঠ করছি। আমার শিশুমনে ভয়ঙ্কর একটি দাগ কেটেছিল। বাড়িতে এসে বাবাকে বললাম, ‘আমি আর পাঠশালায় পড়তে যাবো না।’ বাবা অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন যাবে না?’ আমি বললাম, ‘আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করবো। কারণ ইংরেজি পড়ে হাবিয়া নামক দোজখে যেতে আমার দারুণ ভয় লাগে।’ আমার বাবা ঢাকা ভার্সিটি হতে ১৯২২ সালে এম এ পাশ করেছেন। তাই আমি বাবাকে সরল মনে বললাম ‘তুমি আর আমার মায়ের মামা ওয়াজেদ আলী তথা আমার নানাভাই আগেই হাবিয়া দোজখে চলে গেছ।’ বাবা আমাকে বললেন, ‘মাওলানা ইব্রাহিম নূরীর এই কয়টি কথা বাদ দিয়ে দাও।’ সেই বয়সে প্রতিবাদ করার বুদ্ধিটুকুও ছিল না। নীরব রইলাম। কিন্তু আজ এই সত্তর বছর বয়সে যখন চিন্তা করি যে ইংরেজি শিক্ষার প্রশ্নে অন্য ধর্মের অনুসারীদের থেকে মুসলমানদের অনেক পিছিয়ে যাবার অন্যতম কারণ হলো মাওলানা ইব্রাহিম নূরীর মতো মাওলানাদের এই রকম প্রচার

আমার কিছুটা মনে আছে, সওগাত প্রত্রিকার মালিক নাসির উদ্দিন সাহেবের জীবনেও এই রকম ঘটনাটি বাস্তবে ঘটেছিল। কারণ নাসির উদ্দিনের পিতা ততটা শিক্ষিত ছিলেন না। পৃথিবী যখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায় তখন এই জাতীয় কিছু শ্রদ্ধেয় আলেম-উলামা পেছনের অন্ধকার যুগের দিকে টেনে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা চালা য়।

ব্রিটিশ ভারতের মসজিদ
ব্রিটিশ ভারতের মসজিদ। আগ্রা। ছবি: Varshesh Joshi/Unsplash

বছর দশেক আগের কথা। গুলশানে বাস করা আমার এক রোগী আমাকে বলে ফেললেন যে গুলশান, বারিধারা, বনানী, শঙ্কর, ঈদগাহ, ধানমন্ডীতে যারা বাস করেন তারা তাদের ছেলেমেয়েদের কমই মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। কথাটি কতটুকু সত্য আমি তা জানি না।

এই সেদিন, ১৯৬৯ সালে, অলড্রিন আর আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের বুকে পা রাখলেন তখন অধিকাংশ আলেম-উলামা বিশ্বাস করা তো দূরে থাক, বরং উদ্ভট গাঁজাখোরের মস্তিষ্কের ফসল বলে নানা রকম ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হতো। অথচ এই অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের যুগে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের যুগে, যারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতেন তারা ভিজা বেড়ালের মতো চুপ করে থাকেন। বিজ্ঞান এদেরকে ঘাড় ধরে প্রগতির পথে নিয়ে যায়। এরা নাকি কান্নায় কেঁদে কেঁদে বড় কষ্টে প্রগতির পথে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
চলতে থাকেন।

মুন্সিগঞ্জ জেলার রামপাল নামক স্থানে অনেক আগে একটি ওয়াজের মাহফিলে এক মাওলানা ধমক দিয়ে বললেন যে, যিনি জন্ম দিয়েছেন কেবলমাত্র তাকেই বাবা বলে ডাকতে হবে, অন্য কাহাকেও কোনো অবস্থাতেই বাবা বলা যাবে না। বুঝতে পারলাম মাওলানা সাহেব গোলাবি ওহাবি। উনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমরা যে খাজা বাবা বলি তাহা বলা সঠিক নয়। ওয়াজ শেষে খাবার টেবিলে বসে মাওলানা সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কি বিবাহিত?’ উনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ ‘আপনার কি সন্তান আছে?’ উনি বললেন, ‘দুটি মেয়ে এবং একটি ছেলে আছে।’ কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার পর একসময় উনাকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার মেয়েকে মা এবং ছেলেকে বাবা বলে কি ডাকেন?’ উনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার মেয়ে কি আপনার বাবার বিবাহিত স্ত্রী এবং আপনার ছেলে কি আপনার মায়ের বিবাহিত স্বামী?’

উনি লজ্জায় ‘নাউজুবিল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করলেন। ‘আপনার মেয়ে আপনার মা না হয়েও মা, এবং আপনার ছেলে আপনার বাবা না হয়েও বাবা,’ আমি ওনাকে বললাম। ‘জন্মপিতা’, ‘ডাকের পিতা’, ‘ধর্মপিতা’, ‘উকিল পিতা’, ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি শব্দগুলো আলঙ্কারিক। যেমন খাজা বাবা বলাটিও আলঙ্কারিক। যদিও বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু না বলে পারলাম না : ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায় যে, কোনো এক যুদ্ধে মাওলা আলি (আ.) কাফেরটিকে পরাজিত করে তরবারির আঘাত হানবেন এমন সময় সেই কাফেরটি মাওলা আলিকে লক্ষ করে থুতু নিক্ষেপ করলো। মাওলা আলি হত্যা করা হতে বিরত রইলেন। বিস্ময়ে অবাক হয়ে কাফেরটি মাওলা আলিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন আপনি আমাকে হত্যা করলেন না?’ মাওলা আলি বললেন ‘তুমি যখন আমার শরীরে থুতু নিক্ষেপ করেছ সেই মূহূর্তে আমার খুব রাগ হয়েছিল। এই রাগের মাথায় যদি আমি তোমাকে হত্যা করতাম তা হলে এই হত্যাটি আমার স্বার্থে করা হতো। আমার স্বার্থের উপর আঘাত লাগলে আমি কাহাকেও হত্যা করি না। আমি তখনই হত্যা করি, যখন সেই হত্যাটি একমাত্র ফি সাবিলিল্লাহ হয়, তথা আল্লাহর পথে হয়। আমার স্বার্থে হত্যা করা আর আল্লাহ্র পথে তথা ফি সাবিলিল্লাহর জন্য হত্যা করা দুটো বিষয় মোটেই এক নয়, বরং আকাশ-পাতাল প্রভেদ।’ পরে সেই কাফেরটি কলেমা পরে মুসলমান হয়ে গেলেন এবং মহানবির একজন সাহাবা হবার সৌভাগ্য লাভ করলেন। ফি সাবিলিল্লাহর এত সুন্দর দৃষ্টান্ত আমাদেরকে অভিভূত করে। মাওলা আলি এই ফি সাবিলিল্লাহর জন্য কতটুকু সাবধান থাকতেন তারই জ্বলন্তনমুনাটি আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই। কিন্তু আফসোস! ইতিহাসে এ রকম জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত থাকার পরেও ইতিহাস হতে আমরা কমই এ রকম শিক্ষাটি গ্রহণ করতে পেরেছি।


আমরা হাদিস হতে একটি মূল্যবান শিক্ষা পাই। মহানবি একদিন সাহাবাদের মধ্যে পণ্যসামগ্রী বিতরণ করছিলেন। এমন সময়ে একজন বলে ফেললো, ‘হে মুহাম্মদ, আপনি ন্যায়বিচার করুন এবং আল্লাহকে ভয় করুন।’ উপস্থিত সব সাহাবারা এই কথা শোনার পর চমকে গিয়েছিলেন। ফারুকে আজম হজরত উমর (রা.) সেই লোকটিকে হত্যা করতে চাইলে মহানবি হত্যা করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, ‘এই লোকটি হতে একটি ফেতনার সৃষ্টি হবে।’ এই লোকটি হতেই খারেজি ফেরকার জন্ম হয়েছিল। সিফ্ফিনের যুদ্ধের পর খারেজিরা একটি দলে সংগঠিত হতে পেরেছিল। সেই ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা থাকার কথা। নাহ্ওয়ানের যুদ্ধে মাওলা আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে এদের অনেকেই মারা পড়ে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিকসেদিক পালিয়ে যায়। খারেজিদের দর্শনে আল্লাহর ওলিদের স্থান পাবার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আল্লাহর ওলিদের মাওলা যিনি সেই আলির বিরুদ্ধেই এরা অস্ত্রধারণ করেছিল। এরা মহানবির সাফায়াতকে মেনে নেয় না।

আমরা হাদিসে পাই, জাহান্নামের আগুনে একজন জ্বলছে, মহানবি সেই জাহান্নামিকে তুলে জান্নাতে ঢুকিয়ে দিলেন। এই জাতীয় হাদিসগুলোকে খারেজি মন-মানসিকতায় গড়ে ওঠা মুসলমানেরা মেনে নিতে চায় না। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে আহলে সুন্নাতুল জামাতের আজান দেবার পর যে দোয়াটি পড়া হয় তার সাথে ওহাবিদের আজানের দোয়ার
কোনো মিল নাই। সেই খারেজিরা আর নেই সত্য, কিন্তু তাদের দর্শন আজও বেঁচে আছে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হাক্কুল এবাদ তথা বান্দার হকটির বিষয়ে কোরান-হাদিস-এ বার বার সাবধান করে দেওয়া হয়েছে এবং বার বার বলা হয়েছে যে বান্দার হক মেরে দিলে আল্লাহ মাফ করার বিধানটি রাখেন নি, তবে যে বান্দার হকটি মারা হয়েছে সেই বান্দা যদি মাফ করে দেন তো বলার কিছু নাই। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে এই বান্দার হক মেরে দেবার প্রশ্নে। তাই আল্লাহ কোরান-এ বলেছেন, তোমরা যতই চালাকি করো না কেন আমি সবচেয়ে বড় চালাক। (হুবহু উদ্ধৃত নয়)।

নামাজ-রোজা বিষয়টি একান্ত আল্লাহ্র বিষয় এবং মাফ করে দেবার বিষয়টিও আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। যেহেতু আল্লাহ নিজেই বলেছেন যে, বান্দার হক মেরে দিলে আল্লাহ মাফ করবেন না, বরং যাদের হক মেরেছে তারা মাফ না করা পর্যন্ত, এখানে একটা বিরাট কিন্তু রয়ে গেল। এই ভয়াবহ কিন্তুর খপ্পরে পড়ে বেশির ভাগ মানুষ যে জাহান্নামে যাবে ইহা মনেই করতে চায় না। এই হককুল এবাদ তথা বান্দার হকটির বিষয়ে দশ বছর পরিশ্রম করে যে বইটি আমি লিখেছি সেই বইটির নাম মারেফতের গোপন কথা। অধ্যাত্মবাদের কিছু কথা এবং বাকি সমস্ত বিষয়টি হককুল এবাদের উপর রচিত হয়েছে। অধম লিখক বলতে চেয়েছিলাম যে, হককুল এবাদ তথা বান্দার হক বিষয়টি বেমালুম ভুলে গিয়ে যারা অধ্যাত্মবাদের চর্চা করতে চায় তাদের জন্য কষ্ট হয় এবং বড়ই দুঃখ লাগে। অধম লিখক মনে করে হককুল এবাদকে অস্বীকার করে হককুল্লাহর রহস্যের কথা জানার আগ্রহটি অনেকটা গাছের গোড়া কেটে গাছের মাথায় পানি ঢালার মতো।

(সংকলক মোস্তাক আহমাদ আল জাহাঙ্গীরী আল সুরেশ্বরী, ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা ঈমান আল সুরেশ্বরীর স্নেহধন্য খলিফা)

মোস্তাক আহ্‌মাদ
চার শতাধিক গ্রন্থের লেখক ও গবেষক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ