ঋণ গ্রহণে ইসলামি নীতিমালা

যথাসময়ে ঋণ পাওয়া এবং প্রয়োজন পূরণ হওয়া নিশ্চয়ই আল্লাহর মহা-অনুগ্রহ। দয়াময় রবের শোকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি এ অনুগ্রহ যার মাধ্যমে লাভ হয়েছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও বাঞ্ছনীয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহর প্রতিও সে কৃতজ্ঞ নয়।’

অতি প্রয়োজনে ঋণ করা যেমন বৈধ, তেমনি অপ্রয়োজনে ধার করা চরম নিন্দিত। কেননা, ঋণের কারণে মানুষ সামাজে লাঞ্ছিত, অপদস্ত ও ধিকৃত হয়। অনেকে ঋণের বোঝা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ঋণ মোমিনের জান্নাত লাভের অন্তরায়। তাইতো রাসুল (সা.) মৃতের সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনের আগে তার ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৩৩)। শহিদের সব গোনাহ মাফ হলেও ঋণ মাফ হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঋণ ছাড়া শহিদের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম : ৪৭৭৭)।

নির্ধারিত সময় ঋণ পরিশোধে সচেষ্ট হওয়া

ঋণের বোঝা থেকে পরিত্রাণ লাভে নির্ধারিত সময় তা পরিশোধ করা কর্তব্য। কেননা, এটি একটি ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি। লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ওয়াদা ভঙ্গের ফলে নানা সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি হয় রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়ে। নড়বড়ে হয়ে পড়ে পারস্পরিক সম্পর্কের ভীত। হ্রাস পায় মানবিক মূল্যবোধ। প্রতিশ্রুতি রক্ষার আদেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা, তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ কর।’ (সুরা মায়িদা : ১)। ভয়ের কথা হলো, কেয়ামতের দিন অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেসও করা হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অঙ্গীকার পূর্ণ কর। অবশ্যই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৪)। তা ছাড়া ওয়াদা ভঙ্গ করা মোনাফিকের আলামত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মোনাফিকের আলামত তিনটি- কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (বোখারি : ৩৩)।

ঋণ পরিশোধে রবের ওপর ভরসা করা

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঋণ পরিশোধে যথাযথ প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে অবশ্যই তিনি তাকে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দেবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক : ৩)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার মানসে, আল্লাহ তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট (গ্রাস) করার নিয়তে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (বোখারি : ২৩৮৭)।

ঋণ পরিশোধে গড়িমসি না করা

দেনা পরিশোধে সক্ষম হয়ে অযথা টালবাহানা করা মহাঅন্যায়। এটা জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম। যখন তোমাদের কাউকে (তার জন্য) কোনো ধনী ব্যক্তির হাওয়ালা করা হয়, তখন সে যেন তা মেনে নেয়।’ (বোখারি : ২২৮৭)। তবে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যথাযথ পূর্ব পদক্ষেপ নেয়ার পরও নির্ধারিত সময় কর্জ আদায়ে অক্ষম হলে, সে গোনাহগার হবে না। অবশ্য তার করণীয় হলো, ঋণদাতার কাছে বিনম্রভাবে নিজের অপারগতা প্রকাশ করে সময় বাড়িয়ে নেয়া।

উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধ করা

ভালো আচরণের প্রতিদান ভালো হওয়া চাই। ঋণদাতা যেহেতু ঋণগ্রহীতাকে বিপদে দেনা দিয়ে সাহায্য করেছে, তাই মানবতা হচ্ছে, উৎকৃষ্ট পন্থায় পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে!’ (সুরা আর রহমান : ৬০)। এ ক্ষেত্রে ঋণদাতা যদি রূঢ় আচরণও করে, তবু তার সঙ্গে সদাচরণ করা চাই। তদুপরি পূর্বশর্ত না করে থাকলে খুশি মনে তাকে কিছু বাড়িয়েও দেয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে পাওনার জন্য তাগাদা দিতে এসে রূঢ় ভাষায় কথা বলতে লাগল। এতে সাহাবিরা তাকে শায়েস্তা করতে উদ্যত হলেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারের (কড়া) কথা বলার অধিকার রয়েছে।’ তারপর তিনি বললেন, ‘তার উটের সমবয়সী একটি উট তাকে দিয়ে দাও।’ তারা বললেন, ‘এমন তো নেই, এর চেয়ে উত্তম উট রয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘তাই দিয়ে দাও। তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোৎকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।’ (বোখারি : ২৩০৬)।

পাওনাদারের সঙ্গে বিনম্র ব্যবহার করা

মোমিনকে সব সময় নম্র ভদ্র ও বিনয়ী হওয়া চাই। উপরন্তু যখন সে কারও দয়া বা বদান্যতায় সিক্ত হয়, তখন তার প্রতি বিনীত হওয়া শরয়ি দৃষ্টিকোণে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মানবিক বিচারেও তাৎপর্যপূর্ণ। পাওনাদার খারাপ আচরণ করলেও নবীজি (সা.) তার সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, এক গ্রাম লোক রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে তার ঋণ পরিশোধের জন্য তাকে কঠোর ভাষায় তাগাদা দিল। এমনকি সে তাকে বলল, ‘আমার ঋণ পরিশোধ না করলে আমি আপনাকে নাজেহাল করব।’ সাহাবিরা তার ওপর চড়াও হতে উদ্ধৃত হয়ে বললেন, ‘তোমার অনিষ্ট হোক! তুমি কি জানো, কার সঙ্গে কথা বলছ?’ সে বলল, ‘আমি আমার পাওনা দাবি করছি।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কেন পাওনাদারের পক্ষ নিলে না?’ অতঃপর তিনি কায়েসের কন্যা খাওলা (রা.)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাকে বললেন, ‘তোমার কাছে খেজুর থাকলে আমাকে ধার দাও। আমার খেজুর এলে তোমার ধার পরিশোধ করব।’ খাওলা (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ!’ বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে ধার দিলেন। রাসুল (সা.) তা দিয়ে বেদুঈনের পাওনা পরিশোধ করলেন এবং তাকে আহার করালেন। সে বলল, ‘আপনি পূর্ণরূপে পরিশোধ করলেন। আল্লাহ আপনাকে পূর্ণরূপে দান করুন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘উত্তম লোকরা এমনই হয়। যে জাতির দুর্বল লোকরা জোর-জবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সে জাতি কখনও পবিত্র হতে পারে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৬)।

ঋণদাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ও তার জন্য দোয়া করা

যথাসময়ে ঋণ পাওয়া এবং প্রয়োজন পূরণ হওয়া নিশ্চয়ই আল্লাহর মহা-অনুগ্রহ। দয়াময় রবের শোকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি এ অনুগ্রহ যার মাধ্যমে লাভ হয়েছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও বাঞ্ছনীয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহর প্রতিও সে কৃতজ্ঞ নয়।’ (তিরমিজি : ১৯৫৫)। রাসুল (সা.) কারও কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। তার জন্য দোয়া করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৪)। কেউ কারও প্রতি অনুগ্রহ করলে তার জন্য ‘জাযাকাল্লাহু খাইরান’ বলে দোয়া করার নির্দেশনা এসেছে হাদিসে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কাউকে অনুগ্রহ করা হলে সে যদি অনুগ্রহকারীকে জাযাকাল্লাহু খাইরান (অর্থাৎ আপনাকে আল্লাহতায়ালা উত্তম প্রতিদান দান করুন) বলে, তাহলে সে উপযুক্ত ও পরিপূর্ণ প্রশংসা করল।’ (তিরমিজি : ২০৩৫)।

এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

মূল্যস্ফীতি কী এবং মূল্যস্ফীতি কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে?

মূল্যস্ফীতি হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের বা পণ্যসমূহের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া। মূল্যস্ফীতি বিভিন্নভাবে একটি দেশে বসবাসরত মানুষের জীবনকে...

সতেরো শতকের সাত গম্বুজ মসজিদ

সাত গম্বুজ মসজিদ ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত মুঘল আমলে নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসজিদটি চারটি মিনারসহ সাতটি গম্বুজের কারণে মসজিদের নাম হয়েছে 'সাতগম্বুজ...

প্রবাসে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশি ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে কৌশল, চ্যালেঞ্জ এবং এগিয়ে যাওয়ার পথ বাধা সমন্বয়হীনতা  

বাংলাদেশ হাই কমিশন, লন্ডন এর উদ্যোগে এবং অনুরোধে গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক স্মারকে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে...

ভোক্তাশ্রেণি মূল্যস্ফীতির ভয়ে থাকলে কোনো শাসনব্যবস্থাই সুস্থির থাকতে পারে না

আমার এক পরিচিত ব্যক্তি দিন কয়েক আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘স্যার, সেদিন বাসায় ফিরতেই গিন্নি বলল, ফ্রেশ হওয়ার আগে স্টোররুম থেকে চালের ড্রাম...
আরও পড়তে পারেন

টপ্পা গান কী, টপ্পা গানের উৎপত্তি, বাংলায় টপ্পা গান ও এর বিশেষত্ব

টপ্পা গান এক ধরনের লোকিক গান বা লোকগীতি যা ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই টপ্পা গান বলতে...

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here