বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২

এইডস প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

কোরআন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে দুনিয়ার শান্তি এবং আখেরাতের মুক্তি সুনিশ্চিত। এ বিধান মেনে চলার মাঝেই রয়েছে এইডসের মতো মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার উত্তম উপায়। আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে এইডসমুক্ত রাখুন।

Acquired immunodeficiency syndrome বা সংক্ষেপে AIDS (এইডস) হলো যৌনতার কারণে সৃষ্ট এক ধরনের জটিল রোগ। এইডস রোগ সম্পর্কে খুব কম মানুষই সঠিক তথ্য সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। সত্যিকার অর্থে রোগটি ভীতিকর হলেও প্রতিরোধযোগ্য। এইডস একটি সংক্রামক রোগ, যা এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণের মাধ্যমে হয়। এটি মানুষের দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এইচআইভি সংক্রমণের ফলে অন্যান্য রোগ যেমন— নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। এইচআইভি সংক্রমণের পরের ধাপকেই এইডস বলা হয়। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭ কোটি ৮ লাখ মানুষ মরণব্যাধি এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৯০ লাখ আক্রান্ত রোগী মারা যায়।

আল্লাহ মানুষকে রোগ-ব্যাধি দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো রোগ মানুষের পাপ তথা সীমা লঙ্ঘনের কারণেও হয়ে থাকে, যা মানুষের জন্য অভিশাপ। এইডসের মতো মরণব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে এবং জাতিকে মুক্ত রাখতে ইসলামি নির্দেশনা মেনে চলার বিকল্প নেই। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা

যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে, তুলনামূলকভাবে তাদের এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে ৫০ ভাগ এইডস রোগীর বয়স ১৫-২৪ বছরের মধ্যে। সুতরাং প্রত্যেক বাবা-মার উচিত তার সন্তান কোথায় যায়, কী করছে তা দেখবেন। ১৫ বছর পর্যন্ত সন্তানরা সাধারণত বাবা-মায়ের সঙ্গেই বেশি থাকে। তাই তাদের ধর্মীয় জীবনযাপনের প্রতি জোর দেওয়া বাবা-মায়ের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মোমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতারা। (সুরা তাহরিম: ৬)। যেহেতু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে, তরুণ-তরুণীরা এইডস ব্যাধিতে বেশি আক্রান্ত। তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত তাদের সন্তানকে এইডস বিষয়ে সচেতন করে তোলা। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া এবং তারা যেন কোনো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে নজর রাখা।

জেনা-ব্যভিচার না করা 

জেনা-ব্যভিচার বা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক স্থাপন ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা জেনার কাছেও যেও না। কেননা এটি অত্যন্ত অশ্লীল ও মন্দ পথ।’ (সুরা ইসরা : ৩২)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জিহ্বা) আর দুই ঊরুর মধ্যবর্তী স্থানের (যৌনাঙ্গের) দায়িত্ব নেবে, আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব নেব। (বোখারি : ৮/১০০)। অবাধ যৌনাচার এইডস রোগ হওয়ার একটি মাধ্যম। তাই আল্লাহর নির্দেশ মেনে অবাধ যৌনাচার থেকে মুক্ত থাকাই কোরআন ও হাদিসের অকাট্য নির্দেশ।

পর্দা মেনে চলা

ইসলামে নারী-পুরুষ সবার জন্য পর্দাকে ফরজ করা হয়েছে। বেপর্দার কারণে অপর নারীর সৌন্দর্য যেন কাউকে জেনার দিকে প্ররোচিত না করে, সে জন্য ইসলাম বেপর্দায় কঠিনভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আল্লাহ বলেন, মোমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মোমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সুরা নুর : ৩০-৩১)।

সমকামিতা বন্ধ করা

ইসলামে সমকামিতা নিষিদ্ধ। কোরআনে এসেছে, ‘তোমরা কামবশত পুরুষদের কাছে গমন করো স্ত্রীদের ছেড়ে, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। (সুরা আরাফ : ৮১)। আল্লাহর এ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে পূর্ববর্তী (কাওমে লুত) জাতিকে, তাদের জনপদকে উল্টিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত সেই মৃত সাগরে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। সমাজ থেকে নারী-পুরুষের অবাধ যৌনাচার, পতিতালয়, বহুগামিতা ও পরকীয়াসহ সব নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করার তাগিদ দিয়েছে ইসলাম।

এছাড়া এইডসমুক্ত দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পালন করা একান্ত জরুরি।

  • ধর্মীয় ও আদর্শ অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলা। শিক্ষা ক্ষেত্রে সব স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ওয়াজ মাহফিলে ইসলামিক স্কলাররাও এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন।
  • এইডসের কুফল গণমাধ্যমে তুলে ধরা। বিশেষ করে সর্বজন গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম হিসেবে খ্যাত মসজিদের ইমামদের এইচআইভি/এইডসের ওপর বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজে লাগানো। এ ক্ষেত্রে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার ধর্মীয় যাজকরাকেও এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • সব ধরনের অনৈতিক, অবৈধ ও অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক বর্জন করা। যৌন কৌতূহল জাগে বা যৌনকর্ম সম্পাদনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এমন কাজ বন্ধ করা। যেমন যৌন আবেদনময়ী অশ্লীল উপন্যাস, নোংরা যৌন পত্রপত্রিকা, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর নগ্নদেহ প্রদর্শনী প্রভৃতি বন্ধ করা।
  • পতিতাপল্লি তথা দেহব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
  • বিবাহে সক্ষম ব্যক্তিদের বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা। নচেৎ সংযম অবলম্বন করা।
  • উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের প্রতি অভিভাবকদের সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা। বয়ঃসন্ধিকালে তাদের ধর্মীয় অনুরাগ ও ধর্মীয় নীতি-আদর্শ মেনে চলার ব্যবস্থা করা।
  • জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে এইচআইভিমুক্ত রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া।
  • অপারেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করা।
  • দুগ্ধপোষ্য শিশুদের এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের দুধ পান করানো থেকে বিরত রাখা।

শেষকথা

পরিশেষে আল্লাহতায়ালা মানুষ সৃষ্টি করে সুস্থ-সুন্দর-সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য দিয়েছেন গাইড আল কোরআন। এতে রয়েছে বান্দার কল্যাণের পথনির্দেশ আবার অকল্যাণের কথাও রয়েছে। সুতরাং কোরআন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে দুনিয়ার শান্তি এবং আখেরাতের মুক্তি সুনিশ্চিত। এ বিধান মেনে চলার মাঝেই রয়েছে এইডসের মতো মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার উত্তম উপায়। আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে এইডসমুক্ত রাখুন। আমিন।

সৌজন্যে— দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য এবং প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ রোগী কল্যাণ সোসাইটি

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে

১টি মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।

অর্থনীতি কাকে বলে? অর্থনীতির সংজ্ঞা, পরিধি বা বিষয়বস্তু কী?

অর্থনীতির ইংরেজি হলো 'ইকোনোমিকস' (Economics); এই ইকোনোমিকস শব্দটি গ্রিক...