সোমবার, আগস্ট ৮, ২০২২

উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশের গ্রামের নারী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে কেন?

গ্রামে নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহী করার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে নারীদের উচ্চশিক্ষাচর্চার সুযোগ করে দিলে ক্রমান্বয়ে গ্রামের মেয়েরা উৎসাহিত হবে।

একটি জাতির বিবর্তনের অপরিহার্য উপাদান হলো শিক্ষা। রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র একক পরিবার থেকে বিশ্বপরিমণ্ডলে শিক্ষার প্রভাব বিস্তৃত। বাংলাদেশে শিক্ষার হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে; কিন্তু সে অনুযায়ী গ্রামের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রামের ছাত্রীরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে। দেশের উন্নতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিবেচনায় গ্রামের নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার হার শহরের তুলনায় অনেক বেশি।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দেব’। উক্তিটিতে স্পষ্ট যে, নারীর শিক্ষার অগ্রাধিকার ঠিক কতটা সুউচ্চে। অথচ বর্তমানে নারীরা শিক্ষার দিকে এগিয়ে আসছেন ঠিকই; কিন্তু উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক হারে এগোতে পারছেন না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান বু্যরোর (ব্যানবেইস) ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ছাত্রীর হার ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ, জুনিয়র স্কুলে (৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) ৫৫ দশমিক ১৪ শতাংশ, মাধ্যমিকে (নবম থেকে দশম শ্রেণি ) ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর পরই ছাত্রীদের সংখ্যা কমতে থাকে। উচ্চমাধ্যমিকে ছাত্রীর হার (একাদশ-দ্বাদশ) ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, ডিগ্রিতে ৪১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ৩৬ দশমিক ০৭ শতাংশ।

গ্রামের নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নামক অগ্রযাত্রায় শামিল হতে না পারার পেছনে বহু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

প্রথমত, গ্রামীণ সমাজে নারী বৈষম্যমূলক প্রগাঢ় চিন্তাভাবনা। প্রান্তিক সমাজের বেশির ভাগ পরিবারসমূহে ভাবা হয় মেয়েরা ঘরের শোভা। কেবল সাক্ষর কিংবা সন্তানাদিকে অক্ষরজ্ঞান দিতে পারার সক্ষমতাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে নারীর শিক্ষা অর্জন মাধ্যমিকেই সমাপ্ত হয়।

দ্বিতীয়ত, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান কুসংস্কারের প্রভাব। কিছু পরিবারের আর্থিক সংগতি থাকলেও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার, অবরোধপ্রথা ইত্যাদির জন্য মেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহী করা থেকে বিরত রাখে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের কথায়— ‘উড়তে শেখার আগেই পিঞ্জিরাবদ্ধ এই নারীদের ডানা কেটে দেওয়া হয় এবং তারপর সামাজিক রীতিনীতির জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয় তাদের। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এই কার্যক্রমই চলছে। ধর্মের রীতিনীতিকে নিজেদের মতো বানোয়াট রূপ দিয়ে নারীদের উচ্চশিক্ষা থেকে বিরত রাখতে সদা প্রস্ত্তত এক শ্রেণির লোক। প্রান্তিক এলাকাসমূহে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে।

অনেক মেয়েই প্রাথমিক শিক্ষাস্তর পার হতে পারছে না। ছবি: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক

তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ গ্রামের নারীদের উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রতিবন্ধকতার নাম। একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে এসেও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েদের ১৮ বছরের পূর্বে সাবালিকা হলেই বিয়ে দেওয়া হয়। আর বিয়ের পরে পড়াশোনা চলমান থাকে, এমন শিক্ষার্থী খুবই কম। প্রায়শই স্বামীদের উদার মন-মানসিকতার অভাবে নারীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয় না। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাল্যবধূর সংখ্যা ৩ কোটি ৮০ লাখ।

চতুর্থত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীদের উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব শীর্ষক তথ্যের অভাব। আমাদের দেশে আনাচকানাচ এমন অনেক গ্রাম আছে, যারা জানেনই না যে, নারীদের উচ্চশিক্ষার জায়গা কতটা সুপ্রশস্ত। যার দরুন তারা মেয়ে সন্তানকে শুধুই গৃহস্থালি কাজে পারদর্শী করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

পঞ্চমত, সরকারি সাহাঘ্যের অপ্রতুলতা। একজন শিক্ষার্থীর স্কুল-কলেজে উৎসাহমূলক সরকারি সহায়তা পেলেও এরপর উচ্চশিক্ষা অর্জন প্রক্রিয়ায় ভীষণ বেগ পোহায়। উচ্চ মাধ্যমিকের পর কোচিং করানো কিংবা হোস্টেলে রেখে পড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবক আর্থিক অভাবে পিছিয়ে যান এবং নিরাপত্তা নিয়েও দ্বিধায় থাকেন।

একটি পরিবারের সুরক্ষায় একজন উচ্চশিক্ষিত নারী একটি সুরক্ষিত দুর্গের মতো কাজ করেন। এছাড়া পরিবারের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নেও তাদের অনবদ্য অবদান। গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের অনিবার্য ধাপ উচ্চশিক্ষা অর্জন। তাই গ্রামে নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহী করার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে নারীদের উচ্চশিক্ষাচর্চার সুযোগ করে দিলে ক্রমান্বয়ে গ্রামের মেয়েরা উৎসাহিত হবে। গ্রামাঞ্চলে বৈষম্যহীন সাম্যনীতি গড়ে তুলতে পারলেই কেবল নারীরা উচ্চশিক্ষার জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্ত্ততি নেবে। তাই নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে একটি সুস্হ ও অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সৌজন্যে দৈনিক ইত্তেফাক

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

তারিনা ইয়াছমিন ঝরা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

লেটেস্ট আপডেট পেতে গুগল নিউজে ফলো করুন

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

পাঠ পরিকল্পনা: পাঠ পরিকল্পনার সংজ্ঞা এবং হার্বার্টের পঞ্চসোপান ও আধুনিক ত্রিসোপান

শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে তা শেখানো হবে এবং কীভাবে শিখন মূল্যায়ন করা হবে সে সম্পর্কে শিক্ষকের দৈনন্দিন নির্দেশনা হলো পাঠ পরিকল্পনা

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...