শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

তারাবি সালাত বা নামাজ কী, তারাবি সালাত কত রাকাত এবং এর প্রেক্ষাপট কী?

মাহে রমজানে রাত্রিকালে এশার নামাজের চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে দুই রাকাত করে ১০ সালামে যে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, একে 'তারাবি নামাজ' বলা হয়। আরবি 'তারাবিহ' শব্দটির মূল ধাতু 'রাহাতুন' অর্থ আরাম বা বিশ্রাম করা

ইসলামে প্রতিটি ভালো আমলের বিনিময় আল্লাহ্ নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কিন্তু রমাদানের সাওমের কোনো বিনিময় আল্লাহ্‌ বান্দার জন্য নির্ধারণ করে দেননি। আল্লাহ্‌র ঘোষণা,  সাওম একমাত্র আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেবো। (মুসলিম: ২৭৬০)।

সাওমের এই অগণিত বিনিময় পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ পুরো রমাদান মাসকে করে দিয়েছেন ইবাদতের উন্মুক্ত শস্যক্ষেত্রে। সালাতুল তারাবি হচ্ছে সেই শস্যক্ষেত্রেরই একটি গাছ। যার পরিপূর্ণ লালনপালনে আমরা পেতে পারি বেশুমার নিয়ামত ও বরকত। আজ আমরা পবিত্র সালাতুল তারাবি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

এখানে যা আছে

তারাবি অর্থ কী?

তারাবি একটি আরবি শব্দ।  যা এসেছে  তারবিহাতুন শব্দ থেকে। তারবিহাতুন  শব্দের অর্থ হলো আরাম, প্রশান্তি অর্জন, বিরতি দেওয়া, বিশ্রাম নেওয়া ইত্যাদি। আর তারাবি শব্দটি তারাবিহাতুন শব্দেরই বহুবচন।

সালাতুল তারাবি বা তারাবির নামাজ কী?

পুরো রামাদান মাসে এশার সালাতের পর থেকে বিতর ও  ফজরের সালাতের আগপর্যন্ত যে সালাত আদায় করা তাকে সালাতুল তারাবি বা তারাবি নামাজ বলে। এই সালাত তাহাজ্জুদের সালাতের অনুরূপ দুই দুই  রাকাত করে করে আদায় করতে হয়। এই সালাতে প্রতি চার রাকআত শেষে বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ আছে। 

সাধারণ নফল ও সুন্নত সালাতের চেয়ে তারাবির সালাত অধিকতর মর্যাদাবান।  গুরুত্বের দিক থেকে তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ যা ওয়াজিবের কাছাকাছি। তারাবির ক্ষেত্রে সুন্নাহ হলো রাতের শেষ দিকে আদায় করা। 

তারাবি সালাত যেহেতু ৮ থেকে ২০ বা ৩৬ ইত্যাদি রাকাত পর্যন্ত আদায় করা যায়।  সেহেতু এই সালাতে বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট বিরতি দিতে হয়। অনেক গুলো বিরতির কারণে এই সালাতকে সালাতুল তারাবি বলা হয়।

বাইতুল আমান জামে মসজিদ, গুঠিয়া, বরিশাল।

তারাবির সালাত বা নামাজের ফজিলত কী?

পবিত্র রমাদান মাসে সাওম পালনের পাশাপাশি তারাবির সালাত আদায় করাও অসীম ফজিলতপূর্ণ। এই সালাতের কত ফজিলত তা আমরা  হাদিস থেকে জানতে পারি। হাদিসে এসেছে, 

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - কে রমাদান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় কিয়ামে রমাদান অর্থাৎ তারাবির সালাত আদায় করবে তার পূর্ববর্তী গোনাহ সমূহ মাফ করে দেয়া হবে।" (সহিহ বুখারী- ২০০৮ সুনানে আন-নাসায়ি- ২২০১ সহিহ্ মুসলিম -১৬৬৫) 

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে, 

"সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমাদান মাস পেলো, অথচ নিজের গোনাহ মাফ করাতে পারলো না" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৫)। 

উপর্যুক্ত হাদিস সমূহের আলোকে দেখা যাচ্ছে যে, রমাদান মাস হলো গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নেওয়ার মাস। সুতরাং এই মাসে সাওমের পাশাপাশি সালাতুল তারাবির গুরুত্ব ও ফজিলত অত্যাধিক। অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে,

"রমাদান মাসের প্রতিটি রাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা দেন। এ মাসে প্রত্যেক মুসলমানের দোয়া কবুল করা হয়।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৫০)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ্ বুখারী হাদিস গ্রন্থে আরেকটি হাদিসে এসেছে, 

আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: " মহামহিম আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন: কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।" (হাদিস নং ১১৪৫) 

উপর্যুক্ত হাদিস থেকে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ্ রাতের সালাতকে বেশি পছন্দ করেন। এবং আল্লাহ্ রমাদানসহ প্রতি রাতেই তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করেন এবং প্রয়োজনীয় সাহায্যাদি পূরণ করে থাকেন। যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত সাওমের পাশাপাশি এই তারাবির সালাত আদায় করে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চায় এবং তার প্রয়োজনীয় মনোবাসনা পূরণ করতে চায়, তাহলে  আল্লাহ্ তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং মনোবাসনা পূরণ করবেন বলে ওয়াদাবদ্ধ।

তারাবি নামাজের ইতিহাস বা প্রেক্ষাপট কী, কীভাবে এলো তারাবি?

আমরা আজ সারা বিশ্বের সমগ্র মুসলিম উম্মাহ যেভাবে বা যে পদ্ধতিতে তারাবির সালাত আদায় করছি, তা ইসলামের শুরু থেকেই এমন ছিলো না। আমরা সম্মিলিত জামাত সহকারে যে তারাবির সালাত আদায় করছি তা হযরত উমর (রা.) ১৪ তম হিজরি সালে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবদ্দশায় তিনি কয়েকদিন সালাতুল তারাবি জামাতের সহিত আদায় করেছিলেন। যদিও শুরু থেকেই  রমাদানের সাওমের সাথে সালাতুল তারাবির প্রচলন ছিলো। সেই সালাত ছিলো বিক্ষিপ্তভাবে একাকী নিজেদের ঘরে বা মসজিদে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সংখ্যা দ্বারা কখ‌নো এই সালাতকে সংজ্ঞায়িত করেননি। তিনি রমাদানে সালাত আদায় করার জন্যই বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।

প্রথমদিকে নবী (সা.) সাহাবাদের নিয়ে তারাবির সালাত জামাতে আদায় করলেও কয়েকদিন পর সেই তারাবির জামাত বন্ধ করে দিলেন। কেননা তিনি আশংকা করেছিলেন,  লাগাতার জামাতে সালাত আদায় আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় হলে তা তিনি ফরজ করে দিতে পারেন। যদি তারাবির সালাত ফরজ হয়ে যেত তাহলে তা উম্মতের জন্য পালন করা অত্যন্ত কষ্টকর হতো। জামাতে তারাবির সালাত আদায়ের কথা হাদিসে এভাবে এসেছে,

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:

"রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি  ওয়া সাল্লাম) এক রাত্রে মসজিদে তারাবির সালাত আদায় করলেন, তাঁর সংগে শরীক হয়ে কিছু সংখ্যক লোক সালাত আদায় করল। তারপর  তিনি পরবর্তী রাত্রেও তারাবির সালাত আদায় করলে লোকের সংখ্যা বেড়ে গেল। তারপর তারা তৃতীয় রাত্রেও অথবা চতুর্থ রাত্রেও তারাবির সালাত আদায় করার জন্য জড়ো হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি  ওয়া সাল্লাম) আর তাদের সামনে বের হলেন না। সকাল হলে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি  ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা যা করেছিলে আমি তা দেখছিলাম। তোমাদের উপর তারাবিহ্‌র সালাত ফরয হয়ে যাওয়ার আশংকা ব্যতীত অন্য কোন কিছুই তোমাদের সামনে বের হওয়া থেকে আমাকে বিরত রাখেনি। এ ঘটনা রমযান মাসে ঘটেছিল।" (সুনানে আন-নাসায়ি, হাদিস নং ১৬০৪, সহিহ্ বোখারী-১১২৯) 

হাদিসের উল্লেখিত কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাকি জীবদ্দশায় জামাতে তারাবির সালাত আদায় করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরবর্তীতে হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত উমরের (রা.) শাসনামলের প্রথম দিকেও সম্মিলিত জামাত সহকারে সালাতুল তারাবি আদায় করা হতো না। এর স্বপক্ষে হাদিস হলো,  

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:

"আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় তারাবির সালাতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। হাদিসের রাবী ইব্‌নু শিহাব (রহ:) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকাল করেন এবং তারাবির ব্যাপারটি এভাবেই চালু ছিল। এমনকি আবু বকর (রা.)- এর খিলাফতকালে ও ‘উমর (রা.)- এর খিলাফতের প্রথমভাগে এরূপই ছিল।"(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০০৯)

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) খিলাফতের প্রথম দিক পর্যন্ত তারাবির সালাত একাকী আদায় করা হতো। তখন পর্যন্ত জামাতে তারাবির সালাত আদায় শুরু হয়নি। বর্তমান আমরা  জামাতে যে সালাতুল তারাবি আদায় করছি তা খলিফা উমর (রা.) প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই সম্পর্কে যে হাদিসটি এসেছে তা নিম্নরূপ, 

‘আবদুর রাহমান ইবনু ‘আবদ আল-ক্বারী (রহ:) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, " আমি রমাদানে এক রাতে ‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)- এর সাথে মসজিদে নাবাবীতে গিয়ে দেখি যে, লোকেরা এলোমেলোভাবে জামাতে বিভক্ত। কেউ একাকী সালাত আদায় করছে আবার কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং ইকতেদা করে একদল লোক সালাত আদায় করছে। ‘উমর (রা.) বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে জমা করে দেই, তবে তা উত্তম হবে। এরপর তিনি ‘উবাই ইব্‌নু ‘কাব (রা.)- এর পিছনে সকলকে জমা করে দিলেন। পরে আর এক রাতে আমি তাঁর [‘উমর (রা.)] সাথে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। ‘উমর (রা.) বললেন, কত না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা! তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত। "(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১০) 

উপর্যুক্ত হাদিসের আলোকে আমরা বলতে পারি হযরত উমর (রা.) একটি সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি যে জামাতে তারাবি আদায়কে বিদআত বা  নতুন ব্যবস্থা উল্লেখ করেছেন তা কিন্তু শরিয়তের বিদআত নয়। কেননা শরিয়তে বিদআত হারাম। তিনি এটাকে ঐ বিদআত বা নতুন ব্যবস্থা বলেছেন যা তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এটা বিদআত নয় এইজন্যই যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) জামাতে সালাতুল তারাবি আদায়ের প্রমাণ আছে। তিনি জামাত এইজন্যই ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে তাঁর জীবদ্দশায় তা ফরজ হয়ে না যায়। তাঁর পরবর্তীতে এখন এটা আর  ফরজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে রাসুলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করায় হযরত উমর (রা.) আজ প্রসংশিত।

এভাবেই আমরা উমর (রা.) পরবর্তী হতে জামাত সহকারে সালাতুল তারাবি আদায়ের আমল করে আসছি। যা যুগ যুগ ধরে আজও মক্কা মদিনাসহ সমগ্র মুসলিম আঙ্গিনায় চলে আসছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর তারাবি:

রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় জামাত সহকারে এবং একাকী উভয় ভাবেই তারাবির সালাত আদায় করেছেন। আমরা এশার সালাতের পরপরই তারাবির সালাত আদায় করলেও, রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময়ই মধ্য ও শেষ রাত্রির দিকে তারাবির সালাত আদায় করতেন (সহিহ্ বুখারী ১১৪৬)। তাঁর তারাবির সালাতের বর্ণনা হাদিসে এভাবে এসেছে, 

আবু সালামাহ্‌ ইবনু আবদুর রাহমান (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি ‘আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, রমযান মাসে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমযান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) এগার রাক’আতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাক’আত সালাত আদায় করতেন। তুমি সেই সালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর চার রাক’আত সালাত আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অত:পর তিনি তিন রাক’আত (বিত্‌র) সালাত আদায় করতেন। ‘আয়িশা (রা.) বলেন, (একদা) আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি কি বিত্‌রের পূর্বে ঘুমিয়ে থাকেন? তিনি ইরশাদ করলেন: আমার চোখ দু’টি ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না।" (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১১৪৭) 

উপর্যুক্ত হাদিসের অনুসারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর তারাবিসহ রাতের অন্যান্য সালাত ছিলো খুবই দীর্ঘ এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। সুতরাং তারাবির সালাত দীর্ঘ করা এবং মধ্য রাত্রির পরে আদায় করে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুন্নাহ। এছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট ২০ রাকাত তারাবির সালাত আদায় করেছেন এমন কোনো সুস্পষ্ট নির্ভেজাল দলিল পাওয়া যায় না। 

তারাবি সালাতের জন্য কঠোরতা নয়

বর্তমান সমাজে আমরা হাফেজ দিয়ে খতমে কুরআনের মাধ্যমে জামাতে সালাতুল তারাবির আদায় করে থাকি। যা যথেষ্ট দীর্ঘতর। এরফলে অধিকাংশ মানুষের জন্য তা কষ্টকর বলে প্রতীয়মান হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) কখ‌নো তারাবির ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করেননি। এই বিষয়ে একটি হাদিসে এসেছে, 

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন," রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দৃঢ় বা কঠোরভাবে নির্দেশ না দিয়ে রমাদান মাসের তারাবি পড়তে উৎসাহিত করে বলতেন: যে ব্যক্তি ঈমানসহ ও একান্ত আল্লাহর সন্তষ্টির নিমিত্তে রমাযান মাসের তারাবি পড়ল তার পূর্বের সব পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়। অত:পর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুবরণ করলেন। তখনও এ অবস্থা চলছিল (অর্থাৎ মানুষকে তারাবি পড়তে নির্দেশ না দিয়ে শুধু উৎসাহিত করা হত)। আবু বকর (রা.) এর খিলাফতকালে এবং ‘উমার (রা.) এর খিলাফতের প্রথম দিকেও এ নীতি কার্যকর ছিল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৬৫)

উপর্যুক্ত হাদিসের আলোকে আমরা বলতে পারি তারাবি সালাত সিয়াম সাধনার অংশবিশেষ হলেও সাওমের কোনো অংশ নয়। অর্থাৎ কেউ কোনো কারণে তারাবি আদায় করতে না পারলে তা সাওম পরিপূর্ণ হবেনা এমন নয়। আমাদের উপমহাদেশে এমন কথা চালু আছে যে, তারাবি ছাড়া সাওম আদায় হবেনা। তাই অধিকাংশেরও বেশি মানুষ সারাবছর সালাত আদায় না করলেও, রমাদানের শুরু থেকে ঈদউল ফিতরের চাঁদ দেখা যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মিত সালাত আদায় করে।

অথচ তারাবি সালাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য হচ্ছে, এর দ্বারা আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করে দেন। সেইসাথে সারাবছর সালাত আদায় না করে রমাদানের এক মাস সালাত আদায় করে কখনোই প্রকৃত ঈমানদার হওয়া যাবেনা। শুধু তাইনয় ঈমানের পরিপূর্ণতা না থাকলে কখনোই সাওম আদায় এবং রমাদানের বিনিময়ও পাওয়া যাবে না। 

তারাবির নামাজ কত রাকাত?

তারাবির নামাজ ২০ রাকাত  নাকি ৮ রাকাত?

পবিত্র রমাদান মাস আসলেই যে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সমালোচনা এবং পর্যালোচনার জন্ম দেয়, তা হচ্ছে তারাবির সালাত কত রাকাত? বিভিন্ন ওলামায়ে কেরামের ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে তারাবি ৮ রাকাত না ২০ রাকাত তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব আছে এবং থাকবে। আজ আমরা সকল প্রকার তথ্য উপাত্ত যাচাই করে সঠিক কী আছে তা জানার এবং বুঝার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।

এটা স্বীকৃত যে বিভিন্ন হাদিস ও ওলামায়ে কেরামের পর্যালোচনায়  ২০ রাকাত ও ৮ রাকাত দুটোর পক্ষেই যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। তাই কেউ যদি চায় তারাবির সালাত ২০ রাকাত পড়তে তাহলে তাতে কোনো আপত্তি নেই। ঠিক একইভাবে কেউ যদি চায় তারাবির সালাত ৮ রাকাত আদায় করতে, তাহলে তিনি  ৮ রাকাত আদায় করলেও তা অশুদ্ধ হবেনা। মোটকথা ৮ কিংবা ২০ উভয়ই মতই বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ দ্বারা শুদ্ধ। এই বিষয়ে বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে ইস্তিহাদ রয়েছে।

তবে সমগ্র বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম  ওলামাদের মতামতে ২০ রাকাত তারাবির সালাত আজ সুন্নাহ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। পুরো মুসলীম উম্মাহ গত ১৪০০ বছর ধরে ২০ রাকাত তারাবির উপর আমল করে যাচ্ছেন, যা সাহাবীদের যুগ থেকেই তাবেঈ তাবে-তাবেঈনদের (রা.) আমলের মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত চলমান।

তারাবি নামাজ ২০ রাকাতের পক্ষে যেসব দলিল

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর আমল

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) রমাদান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-৫/২২৫, হাদিস নং- ৭৬৯২, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ-২১৮, আল মুজামুল কাবীর, হাদিস নং-১২১০২, মাজমাউজ যাওয়ায়েদ, হাদিস নং-১৭২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদিস নং-৪৩৯১)

হযরত জাবের (রা.) বলেন: রমাদান মাসের এক রাতে রাসূল (সা.) বাহিরে তাশরীফ নিয়ে এলেন। আর সাহাবায়ে কেরামকে ২৪ রাকাত (৪ রাকাত এশার, আর ২০ রাকাত তারাবিহের) সালাত আদায় করলেন। আর তিন রাকাত বিতির পড়ালেন। [তারিখে জুরজান-২৭]

হজরত উমর (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের আমল

ইয়াযিদ ইবনু রুমান (র) থেকে বর্ণিত:

মালিক (র) ইয়াযিদ ইবনু রুমান (র) হতে বর্ণনা করেন- তিনি বলেছেন, লোকজন উমার ইবনু খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে রমাদানে তেইশ রাকাত তারাবিহ পড়াতেন তিন রাকাত বিতর এবং বিশ রাকাত তারাবি। এটাই উমার (রা) শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। (হাদিসটি ইমাম মালিক (র:) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ২৪৪) 
ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (রহ.) বলেন, সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমাদান  মাসে ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন। তিনি আরো বলেন যে, তারা নামাজে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন এবং হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। -আস সুনানুল কুবরা ও বাইহাকি, ২/৪৯৬/৪২৮৮

তাবেই আবদুল আজিজ ইবনে রুফাই (রহ.) বলেন,

উবাই ইবনে কাব (রা.) রমাদানে মদিনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৬

হজরত আলি (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের তারাবির নামাজ

বিখ্যাত তাবেই ইমাম আবু আবদুর রহমান সুলামি (রহ.) বলেন, আলী (রা.) রমজানে হাফেজদের ডাকেন এবং তাদের একজনকে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেন, আলি (রা.) তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। -সুনানুল বাইহাকি: ২/৪৯৬-৪৯৭/৪২৯১

তাবেইদের মতে তারাবির সালাত

হযরত সুয়াইদ বিন গাফালা যিনি বয়সে রাসূল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মাত্র তিন বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ইমামতি করাতেন। হযরত আবুল হাজীব বলেন:

"হযরত সুইয়াইদ বিন গাফালা রমজান মাসে আমাদের জামাতের সাথে পাঁচ তারবিহায় বিশ রাকাত নামায পড়াতেন"। (বায়হাকি-২/৪৯) 

বাইতুল্লাহ শরিফে বিশ রাকাত তারাবিহ

মক্কা মুকাররমায় হযরত আতা বিন আবী রাবাহ (রা.) (ইন্তেকাল ১১৪হিজরি)  বলেন:

সেখানে আমি লোকদের (সাহাবা ও তাবেয়ীগণ) বিতির সহ ২৩ রাকাত পড়তে দেখেছি। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩] 

আর ইমাম ইবনে আবি মালিকাহ (ইন্তেকাল ১১৭হিজরী) লোকদের মক্কায় বিশ রাকাত তারাবিহ পড়াতেন। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩]

ইমাম শাফেয়ি (রা.) (ইন্তেকাল ২০৪হিজরী) বলেন,

আমি স্বীয় শহর মক্কায় লোকদের বিশ রাকাত তারাবিহ পড়া অবস্থায়ই পেয়েছি। -তিরমিজী-১/১৬৬।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত মক্কা মুকাররমায় বিশ রাকাত তারাবিই পড়া হচ্ছে।

মসজিদে নববিতে তারাবি

মদিনা তায়্যিবাহর মাঝে হযরত ওমর (রা.) হযরত উসমান (রা.) হযরত আলী (রা.) এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবিই পড়া হতো। আজও মদিনায় বিশ রাকাত তারবীহই পড়া হয়। 

বিশ্ববিখ্যাত চার ইমাম (রা.)-এর বক্তব্য

শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী (রা.) বলেন:

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত চার মাজহাবে সীমাবদ্ধ। এ চার ইমামের মাঝে প্রথম ইমাম হলেন ইমাম আবু হানীফা (রা.) (ইন্তেকাল ১৫০ হিজরী), তিনিও ২০ রাকাত তারাবির প্রবক্তা। [ফাতাওয়া কাজিখান-১/১১২]

ইমাম মালিক (রা.) এর একটি বক্তব্য বিশ রাকাতের পক্ষে, দ্বিতীয় বক্তব্য ৩৬ রাকাতের পক্ষে। (যাতে বিশ তারাবিহ আর ১৬ রাকাত নফল)। হেদায়াতুল মুজতাহিদ-১/১৬৭)।

ইমাম শাফেয়ি (রা.) তারাবির নামাজ ২০ রাকাতের প্রবক্তা। (আলমুগনী-২/১৬৭)। 

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রা.) এর মুখতার বক্তব্যও বিশ রাকাতের পক্ষে। (আলমুগনী- ২/১৬৭)

উপর্যুক্ত বিভিন্ন হাদিসের আলোকে এবং সাহাবি, তাবেয়ি ও তবেতাবেয়ী (রা.)-দের আমলসহ মক্কা ও মদিনার আমল থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে,  তারাবির সালাত জামাত সহকারে ২০ রাকাতেই প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যখন থেকেই তারাবির সালাত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জামাত সহকারে আদায় করা শুরু হয় তখন থেকেই তারাবির সালাত ২০ রাকাত আদায় করাই সুন্নাহ হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। 

তারাবির নামাজ ৮ রাকাতের পক্ষে দলিল

যারা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত ৮ রাকাত তারাবির দাবি করেন, তাদের মতে তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, ক্বিয়ামে রমাদান,  ক্বিয়ামুললায়েল সবকিছুকে এক কথায় “সালাতুল লাইল” বা “রাত্রির নফল সালাত” বলা হয়। তাদের দাবি রমাদানে  রাতের প্রথমাংশে যখন জামাতসহ এই নফল সালাতের প্রচলন হয়, তখন প্রতি চার রাকাত অন্তর  কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হতো। সেখান থেকে “তারাবি” নামকরণ হয় (ফাৎহুল বারী, আল-কামুসুল মুহিত)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে রমজান মাসে ৮ রাকাত তারাবির দলিল হচ্ছে নিম্মোক্ত হাদিস—

আবু সালামাহ্‌ ইব্‌নু আবদুর রাহমান (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি ‘আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, রমাদান মাসে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাদান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) এগার রাক’আতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাক’আত সালাত আদায় করতেন। তুমি সেই সালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর চার রাক’আত সালাত আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাক’আত (বিত্‌র) সালাত আদায় করতেন। ‘আয়িশা (রা.) বলেন, (একদা) আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি কি বিত্‌রের পূর্বে ঘুমিয়ে থাকেন? তিনি ইরশাদ করলেন: আমার চোখ দু’টি ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১১৪৭)

উপর্যুক্ত সহিহ্ হাদিস দ্বারা এটা সুস্পষ্ট যে রাসুলুল্লাহ (সা.) রমাদান এবং রমাদান ছাড়া উভয় সময়ই ৮ রাকাত নফল সালাত আদায় করেছিলেন। যদি আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর তারাবির আমল পালন করতে চাই, তাহলে তা হবে ৮ রাকাত এই হাদিস অনুযায়ী। 

উপর্যুক্ত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর  একাকী সালাত আদায়ের কথা থাকলেও অন্য একটি হাদিসে জামাত সহকারে রমাদান মাসে সালাত আদায়ের কথা এসেছে। 

আবুজর (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, আমরা একবার রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি  ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সিয়াম পালন করেছিলাম। রমাদান মাসে তিনি আমাদের নিয়ে তারাবির সালাত আদায় করলেন না। যখন মাসের মাত সাত রাত্র অবশিষ্ট রয়ে গেল, তিনি আমাদের নিয়ে তারাবির সালাত আদায় করতে লাগলেন রাত্রের তৃতীয় প্রহর অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত। যখন মাসের ছয় রাত্র অবশিষ্ট রয়ে গেল তিনি আমাদের নিয়ে তারাবির সালাত আদায় করলেন না। যখন পাঁচ রাত্র  অবশিষ্ট রয়ে গেল তিনি আমাদের নিয়ে তারাবির সালাত আদায় করলেন অর্ধ রাত্রি অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! যদি আপনি আমাদের নিয়ে অত্র রাত্রের অবশিষ্ট অংশেও নফল সালাত আদায় করতেন! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি ইমামের সাথে তারাবির সালাত আদায় করে ঘরে ফিরে যায় আল্লাহ তা'আলা তার জন্য পূর্ণ রাত্রি সালাত আদায় করার সওয়াব লিখে রাখেন। অত:পর তিনি আমাদের নিয়েও তারাবির সালাত আদায় করলেন না এবং নিজেও আদায় করলেন না। যখন মাসের তিন রাত্রি অবশিষ্ট রয়ে গেল, তিনি আমাদের নিয়ে ঐ রাত্রে তারাবিহ্‌র সালাত আদায় করলেন (এবং ঐ সালাতে) তাঁর সন্তান-সন্ততি এবং পরিবারবর্গও জড়ো হয়ে গেল। আমরা আশঙ্কা করতে লাগলাম যে, "ফালাহ" না হারিয়ে ফেলি। আমি বললাম, "ফালাহ"-এর অর্থ কি? তিনি বললেন, সাহ্‌রি খাওয়ার সময়। (সুনানে আন-নাসায়ি, হাদিস নং ১৬০৫) 

উপর্যুক্ত হাদিস ছাড়াও আগে উল্লেখিত হাদিসে(সুনানে আন-নাসায়ি, হাদিস নং ১৬০৪, সহিহ্ বোখারী-১১২৯) রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের নিয়ে জামাতে তারাবি আদায় করেছেন বলে প্রমাণিত। যদিও উপর্যুক্ত হাদিস সমূহে তারাবির রাকাত সংখ্যার উল্লেখ নাই।

যারা সহিহ্ হাদিস মতে ৮ রাকাত তারাবির পক্ষপাতী, তাদের দাবি হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সরাসরি ২০ রাকাত তারাবি আদায়ের প্রমাণ নেই। শুধু তাইনয় যেসব হাদিস দ্বারা রাসুলুল্লাহ ২০ রাকাত তারাবি আদায় করেছেন বলে দাবি করা হয়। তার সবই জাল এবং দুর্বল হাদিস। এছাড়াও তাদের দাবি,  রাসুলুল্লাহ (সা.) রমাযানের রাতে তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ একইসাথে  দু’টিই আদায় করেছেন এই মর্মে কোনো সহিহ্ বা যঈফ হাদিসও নেই। ( মির‘আত ৪/৩১১ পৃ:, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭)

তারাবির নামাজ ২০ রাকাত প্রতিষ্ঠিত কীভাবে?

এটা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে, খলিফা হযরত উমর (রা.) এর শাসনামল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ২০ রাকাত তারাবির সূচনা। যদিও যারা যৌক্তিক কারণে ৮ রাকাতের দাবিদার তারা এটা স্বীকার করতে চায় না। 

তারপরও ২০ রাকাত তারাবি পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

১. আট (৮) রাকাতের  দীর্ঘ কিয়ামে দাঁড়াতে  কষ্ট হওয়া এবং সালাতে রাকাত বাড়ানো

তারাবির সালাতে রাকাত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহ.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত্রির সালাত ১১ বা ১৩ রাকাতে আদায় করতেন। পরবর্তীকালে মদিনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলে তারা রাকাত সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকে, যা ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পৌঁছে যায়’।  ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (মক্কা: আননাহযাতুল হাদীছাহ ১৪০৪/১৯৮৪), ২৩/১১৩)

২. বেশি নেকির আশায় ‘রাতের সালাত দুই দুই করে’

এই হাদিসের আলোকে অনেক আলেমদের মতে ২৩ রাকাত পড়া যাবে,  আবার শত রাকাতের বেশিও আাদায় করা যাবে  যদি কেউ ইচ্ছাকরে। দলীল হিসাবে ইবনু ওমর (রা.) বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসটি দলিল দেওয়া হয় যে, “রাত্রির সালাত দুই দুই  করে। অত:পর ফজর হয়ে যাওয়ার আশংকা হলে এক রাকাত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে”- এই হাদিসের আলোকে অনেকে পরবর্তীতে তারাবির সালাত ২০ রাকাত হওয়ার কারণ দেখে। যদিও ৮ রাকাত দাবিদারদের মতে, এখানে  ২ রাকাত করে মোট ৮ রাকাত পড়ার কথা বলা হয়েছে, মহানবী (স:) যতটুকু পড়েছেন ততটুকুই। ২ রাকাত করে অসীম রাকাত সালাত আদায় করা যাবে না।  

তারপরও এভাবেই পরবর্তীতে মদিনার মানুষরাই এটাকে  সবোর্চ্চ রাকাতে নিয়ে যায়। পরে বর্তমান রাজতন্ত্র  এটাকে  ২০ রাকাতে পরিনত করে। যদিও ২০ রাকাত ছাড়াও ৩৯ কিংবা ৪১ রাকাত পর্যন্ত তারাবি সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তবে সৌদির শাসক গোষ্ঠি যে এটা খারাপ উদ্দেশ্যে করেছে, এমন না। (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫)।

৩. অধিকাংশের ঐক্যমত্য

উপর্যুক্ত তথ্যপ্রমাণাদি থেকে এটা বুঝা যাচ্ছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ৮ রাকাত তারাবিই আদায় করেছেন। এছাড়া সাহাবীগণ একাকী ও বিক্ষিপ্তভাবে ঘরে ও মসজিদে তারাবির সালাত আদায় করতেন। যার রাকাতের কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। যার কারণে হযরত উমর (রা.) ২০ রাকাত তারাবির প্রচলন করলে সবাই তাঁর  সাথে ঐক্যমত পোষন করেন।

এই ঐক্যমত্য হযরত উমর (রা.), ওসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.) এই ৩ খলীফার সময় পর্য্যন্ত চলতে থাকে। এই কারনে ইমাম আবু হানিফা (রহ), ইমাম (শাফেয়ী), ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) ২০  রাকাত সমর্থন করেছিলেন।

হযরত উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) ২০ রাকাতের পরিবর্তে ৩৬ রাকাত পড়া শুরু করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মক্কার বাহিরের লোকেরা যেন, মক্কার সমান  সওয়াবের অধিকারী হয়। মক্কার লোকদের নিয়ম ছিল, তারা তারাবির ৪ রাকাতের পর, তারা কাবা ঘর তাওয়াফ করে নিত। তাই তিনি তাওয়াফের পরিবর্তে সালাতে অতিরিক্ত রাকাত  শুরু করলেন।

এই নিয়ম যেহেতু মদিনায় চালু ছিল,আর ইমাম মালেক (রা.) মাদিনাবাসীর কাজকে সনদ মনে করতেন, তাই তিনি ৩৬ রাকাতকে সমর্থন জানান। আর এভাবেই ৮ রাকাতের পরিবর্তে ২০ বা ততোধিক রাকাতের তারাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। যা বর্তমান সৌদি রাজপরিবার সরকার আসার পর ২০ রাকাত তারাবিতেই সীমাবদ্ধ করে দেয়।

তারাবির নামাজ এবং একটি ভ্রান্তির দোলক

এত তথ্য উপা‌ত্তের পরও একটি গোলক ধাঁধা থেকেই যায়। যারা তারাবির নামাজ ৮ রাকাতের দাবিদার তারা মা আয়েশা (রা.) এর ১১ রাকাতের হাদিসের রেফারেন্স দেন। সেইসাথে তিনি অবস্থানও করতেন মদিনায়। আর তিনিই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন,  “যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে বিদআত বের করবে, তার কাজটি পরিত্যাজ্য।” যদি বিশ রাকাত তারাবির সালাত বিদআত ও নাজায়েজই  হতো, তাহলে হযরত আয়েশা (রা.) বছরের পর বছর এর বিরুদ্ধে কথা না বলে চুপ করে বসে ছিলেন কেন? 

শুধু তাইনয়, হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.)ও মদিনায় অবস্থান করছিলেন। তিনি ঐ হাদিসের রাবী, যে হাদিসে বলা হয়েছে, “প্রত্যেকটি বিদআত গোমরাহী আর প্রত্যেক গোমরাহী জাহান্নামে নিক্ষেপকারী”। অথচ তারই উপস্থিতিতে অর্থ শতাব্দী পর্যন্ত মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবি জামাতের সাথে পড়া হচ্ছিল। অথচ তিনি এর বিরুদ্ধে কোন কথা বলেন নি, এর কারণ কী হতে পারে? 

সুতরাং ৮ রাকাত সালাতই যদি রাসুলুল্লাহ (সা.) কতৃক প্রতিষ্ঠিত তারাবি হতো, তাহলে তাঁর পরবর্তীতে তাঁর সাহাবীগণ কীভাবে ২০ রাকাত তারাবির প্রচলন এবং প্রতিষ্ঠিত করতে পারে? 

তারাবির নামাজ ২০ রাকাতের পক্ষে অধিকাংশের ঐক্যমত্য যে কারণে

ইতিহাস স্বীকৃত যে, হযরত উমর (রা.) তারাবির ২০ রাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। সাহাবীদের মধ্যে আনসার এবং মুজাহির উভয়ই তাঁর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে। খলিফা হযরত উমর (রা.) এর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অনেক গুলো কারণ রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে উমর (রা.)কে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী সমূহ। যেমন: 

ইবনু ‘উমার (রা.) থেকে বর্ণিত:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ তা'আলা উমার (রা.)-এর মুখে ও হৃদয়ে সত্যকে স্থাপন করেছেন। ইবনু 'উমার (রা.) বলেন, জনগণের সম্মুখে কখনো কোন প্রসঙ্গ আবির্ভূত হলে লোকজনও তা সম্পর্কে মন্তব্য ব্যক্ত করত এবং 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-ও অভিমত ব্যক্ত করতেন। দেখা যেত, 'উমার (রা.)-এর অভিমত এর সমর্থনে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সহিহ: ইবনু মাজাহ-১০৮, জামে তিরমিযী - ৩৬৮২) ।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আগের উম্মাতগণের মধ্যে অনেক মুহাদ্দাস (যার ক্বলবে সত্য কথা অবতীর্ণ হয়) ব্যক্তি ছিলেন। আমার উম্মাতের মধ্যে যদি কেউ মুহাদ্দাস হন তবে সে ব্যক্তি উমর। যাকারিয়া (রহ.)....আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে অধিক বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আগের বনী ইসরাঈলের মধ্যে এমন কতক লোক ছিলেন, যাঁরা নাবী ছিলেন না বটে, তবে ফেরেশতামন্ডলী তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমার উম্মাতে এমন কোন লোক হলে সে হবে ‘উমার (রা.)। সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৬৮৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮৯) 

আনাস ইব্‌নু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, ‘উমর (রা.) বলেছেন: তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহ্‌র ওয়াহীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহ্‌র রসূল! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়: “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও” – (সূরা আল-বাক্কারাহ ২/১২৫)। (দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললাম: হে আল্লাহ্‌র রসূল! আপনি যদি আপনার সহধর্মিণীগণকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাঁদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়। আর একবার নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে একত্রে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাঁদেরকে বললাম: “আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি তোমাদের ত্বালাক দেন, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম অনুগত স্ত্রী দান করবেন” – (সুরাহ তাহরীম ৬৬/৫)। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৪০২, অনুরূপ  ৪৪৮৩, ৪৭৯০, ৪৯১৬) 

ইরবাজ ইবনু সারিয়াহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন ফজরের নামাযের পর আমাদেরকে মর্মস্পর্শী ওয়াজ শুনালেন, যাতে (আমাদের) সকলের চোখে পানি এলো এবং অন্তর কেপে উঠলো। কোন একজন বলল, এ তো বিদায়ী ব্যক্তির নাসীহাতের মতো। হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এখন আপনি আমাদেরকে কি উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন: আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার এবং (নেতার আদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহি। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। (জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৭৬, ইবনু মা-জাহ -৪২, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৭১৪৪, ১৭১৪৫) 

হুযাইফাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমরা আমার পরে আবু বাক্‌র ও 'উমারের অনুসরণ করবে। (জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৩৬৬২, ৩৬৬৩,  ইবনু মাজাহ -৯৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৩২৪৫, ২৩২৭৬, ২৩৩৮৬; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৬৯০২) 

উপর্যুক্ত হাদিসসহ আরও অসংখ্য হাদিসে উমর (রা.) এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য  নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভবিষ্যৎ বাণী রয়েছে। যা দ্বারা দ্বীন ইসলামে উমর (রা.) এর স্থান কতটুকু তা নির্ণীত হয়। সেইসাথে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে কার এবং কাদের অনুসরণ করা যাবে তারও উল্লেখ আছে। যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরবর্তীতে হযরত আবু বকর (রা.) এর সাথে উমর (রা.) এর নাম এসেছে।  আর এই কারণেই তৎকালীন সাহাবীগণসহ পরবর্তী সকল মুসলিম মিল্লাত তারাবি নিয়ে হযরত উমর (রা.) এর সিদ্ধান্তকে রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ হিসাবে মেনে নিয়েছে।

তারাবির সালাতে প্রচলিত দোয়ার বিধান

আমাদের উপমহাদেশে তারাবির চার রাকাত বিরতিতে একটি প্রসিদ্ধ দোয়া (সুবাহানা জিল মুলকি ওয়ালা মালাকুতি) এবং মোনাজাত (আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল ….ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু)  পড়া হয়। যা এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, আমরা সবাই মনে করি এটাই বুঝি তারাবি সালাতের দোয়া! অথচ যারাই এই দোয়া প্রতিষ্ঠিত করেছে,  তারাসহ সকল আলেম ওলামারা জানে যে –  এই দোয়া কখনোই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর তারাবির সুন্নাহ নয়। 

যদিও এই দোয়া বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বিক্ষিপ্ত ভাবে আছে। তবে তা কখনোই তারাবির জন্য নির্দিষ্ট নয়। তারাবি আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতি চার রাকাত পর পর বিরতির ব্যবস্থা রয়েছে। ঐ বিরতিতে মুসল্লিদের জন্য  কোনো আমল রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট করে দেননি। একইসাথে সাহাবীগণথেকেও কোনো নির্দিষ্ট আমল উল্লেখ্য নেই।

কেননা তারাবির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে সালাত আদায় করা। যে ২০ রাকাত সালাত সাহাবীদের (রা.) থেকে প্রমাণিত, তার ব্যপ্তি ছিলো তিন থেকে চার ঘন্টা ব্যাপী। যারফলে তাঁরা চার রাকাত পরপর বিরতিতে বিশ্রাম নিতেন। আর আমরা এক ঘন্টায় তারাবি শেষ করার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেই। তাই আমরা যে দোয়া ও মোনাজাত আবিষ্কার করেছি তা কিছু বুজুর্গের সৃষ্টি। কেউ যদি এই দোয়া ও মোনাজাত তারাবির অংশ মনে করে পড়ে তাহলে তা বিদআত হবে। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

তাই তারাবির ব্যাপারে আল্লামা শামি রহ: তার বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব, ‘ফতোয়ায়ে শামি’তে উল্লেখ করেছেন যে,  তারাবির প্রতি চার রাকাতের পর তার সমপরিমান সময় বিরতি দেয়া মুস্তাহাব। একইভাবে  মুস্তাহাব হলো তারাবি এবং বিতরের মাঝে বিরতি দেয়া। এই বিরতিতে তাসবিহ পাঠ করা, কোরআন তেলাওয়াত করা, নিরব থাকা বা একাকি নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাধীন। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৬০০)। 

সুতরাং এই সময় যে কেউ চাইলে দোয়া দরুদ, কোনো তাসবিহ পাঠ, কুরআন তেলাওয়াত, কিংবা নফল সালাত ইত্যাদি আদায় করতে পারে। তারাবির বিরতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ কোনো দোয়া পড়াকে সুন্নাত সাব্যস্ত করা হয়নি। তাই এই বিরতির সময়ে একদম চুপ না থেকে কোনো দোয়া, দরুদ, তেলাওয়াত ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকা উত্তম।

আমাদের উপমহাদেশে যে দোয়াটি তারাবির জন্য একপ্রকার ফরজ হয়ে গেছে, সেই সম্পর্কে প্রখ্যাত ফকিহ আল্লামা কাহাস্তানী ‘মানহাজুল ইবাদ’ নামক গ্রন্থের উদ্বৃতি দিয়ে স্বীয় কিতাবে ঐ দোয়া উল্লেখ করেছেন। যেমনটি ফতোয়ায়ে শামিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দোয়াকে সুন্নত বা জরুরি মনে করে পড়া যাবে না। একইসাথে  সম্মিলিতভাবে উচ্চ আওয়াজে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যার কোনো কিছুই আমরা পালন করি না।

আমরা মনে করি এটাই তারাবির দোয়া আর তাই যত দ্রুত পড়া যায় তত দ্রুত পড়ে শেষ করে ফেলি। যার অর্থ অধিকাংশেরও বেশি মুসল্লী জানে না বুঝে না। আর এক মিনিটের বিরতি দিয়ে আবার তারাবির সালাতে দাঁড়িয়ে যায়। যা কখনোই সুন্নাহ সম্মত নয়। এমনকি যারা এই দোয়ার প্রচলন করেছেন তাদের শর্তও আমরা পালন করছি না। 

সুতরাং, গদবাঁধা তারাবির আদায়ের চাইতে সঠিক পদ্ধতিতে তারাবির আদায় করা উচিত। যাতে আমরা এই তারাবি থেকে বরকত এবং নেয়ামত নিতে পারি।

তারাবি যেমন হওয়া উচিত?

তারাবি সালাতের মূল উদ্দেশ্য হলো আরাম সহকারে সালাত আদায় করা। অর্থাৎ সালাত আদায় করতে গিয়ে যেন মুসল্লীদের কষ্ট না হয়। তাই এর নাম তারাবি অর্থাৎ বিশ্রামের সমষ্টি। তারাবির সালাত বিশ্রাম সহকারে আদায় করার কথা থাকলেও, আমাদের উপমহাদেশে তা ১৮০ মাইল বেগে আদায়ের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে তারাবি সালাত বা নামাজ আদায়ের ঐতিহ্য হলো কে কত আগে তারাবিতে কুরআন খতম করতে পারে। আমাদের দেশে তারাবির হাফেজ নিয়োগ দেওয়া কুরআন পড়ার গতির উপর। যে যত গতিতে কুরআন পড়তে পারে, সে ততো গতিতে ইমাম হিসাবে নিয়োগ পায়।

অথচ কুরআন তিলাওয়াতেরও কিছু আইনকানুন রয়েছে। যা উপমহাদেশে মানার কোনো বালাই নাই। দ্রুত তিলাওয়াতের কারণে এক হরফের জায়গায় আরেক হরফ,বা এক বাক্যের জায়গায় আরেক বাক্য পড়লে সালাত নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও উচ্চারণে মাকরূহ পর্যায়ে যদি বিঘ্ন ঘটে, তাহলে সেই সালাতও দুষণীয় হবে।  সালাতে কুরআন তেলাওয়াত এমনভাবে করতে হবে যাতে কোনভাবেই অর্থ পরিবর্তন না হয়।

আর আমাদের তারাবি আদায়ের যে ঐতিহ্য, সেই কুরআন তেলাওয়াত খোদ আরবীয়দের শোনানো হলে তারাও বুঝতে অক্ষম হবে। অথচ আল্লাহ্ বলেন, 

কুরআন তিলাওয়াত কর ধীরস্থির ভাবে, স্পষ্টরূপে। (সুরা: মুযযামমিল, আয়াত: ৪)

হাদিসে এসেছে, 

"সুন্দর সূরের মাধ্যমে কুরআনকে  (এর তিলাওয়াতকে) সৌন্দর্যমণ্ডিত কর"। -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪৬৮

সুতরাং, কুরআনের তেলাওয়াত হতে হবে সুন্দর ধীর, স্থির এবং সুমিষ্ট কন্ঠে সৌন্দর্য্যের সাথে। শুধু তাইনয় এতো দ্রুতগতিতে তারাবির পড়া যার পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব। তা নিয়ে ইসলামি আইনবিদদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইসলামি আইনবিদদের মতে, যে দ্রুততায় পড়লে কোরআনের শব্দ সমূহ বোঝা যায়, ন্যূনতম সেই গতিতে পবিত্র কোরআন পড়তে হবে। তবে যে গতিতে পড়লে কিছুই বোঝা যায় না, সে গতিতে পড়া বৈধ নয়, এর দ্বারা সওয়াবও হবে না। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ২/৪৭, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/১১৭)

তারাবি রমজানের অন্যতম ইবাদত। তারাবির নামাজের অসংখ্য ফজিলত আছে। অথচ তাড়াহুড়া করে দৌড়ের উপর তারাবি আদায় করতে গিয়ে, আমাদের আজ সালাতই ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। সেখানে তারাবির ফজিলতই বা পাবো কী করে?

আল্লাহ্‌র ঘোষণা হচ্ছে কুরআনের আয়াত মানুষের অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ যে ই কুরআনের আয়াত শুনবে তা তার অন্তরে দ্বীনের প্রতি আবেগ সৃষ্টি করবে। অথচ আমাদের তারাবির সালাতে যেভাবে কুরআন পড়া হয় তা কখনোই মুসল্লদের অন্তরে পৌঁছায় না। যারফলে তারাবির সালাত তাদের জন্য একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমনিতেই সারাদিনের সাওম শেষে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। এজন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তারাবি পাড়াটা খুবই কষ্টকর। 

তার ওপর আবার কোরআন তেলাওয়াত না বুঝার কারণে সালাতের প্রতি আরও বেশি অনীহা সৃষ্টি হয়। তাছাড়াও ২০ রাকাত তারাবি পড়তেই হবে-এই ধরাবাঁধা নিয়মের কারণে অধিকাংশ মুসল্লী সালাতে মনযোগ দিতে পারে না। তাদের মধ্যে কখন তারাবি শেষ হবে এই উৎকণ্ঠায় কাজ করতে থাকে। যেকারণে রমাদানের শুরুতে মসজিদ কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকলেও, কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে মসজিদে মুসল্লির ভাটা পড়ে যায়। 

আমাদের উপমহাদেশে টাকার বিনিময়ে হাফেজ নিয়োগ করা হয় (যদিও তা অন্যায় নয়)। এই কারণে হাফেজদের মধ্যে দ্রুতগতিতে তারাবির পড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যে মসজিদে যত দ্রুত তারাবি শেষ হয়, সেই মসজিদে ততবেশী মুসল্লী! আর যতবেশী মুসল্লী ততবেশী টাকা! সুতরাং তারাবির সালাত আজ একটি ব্যবসায়িক ডিলে পরিনত হয়েছে। যেখানে অনেক মসজিদে হাফেজদের হাদিয়া নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় (যদিও হাদিয়া যা উঠে তা সমান ভাগে হাফেজগণ পাওয়ার অধিকার রাখে)। যারফলে বাকি উদ্ধৃত টাকা মসজিদ কমিটি রেখে দেয়। যা তারাবির মাধ্যমে একটি আয়ের পথ তারা খুঁজে পেয়েছে।

তারাবি আদায়ের ফজিলত কত তা আমরা আগেই জেনেছি। অথচ সঠিক উপায়ে তারাবি আদায় না করার কারণে আমাদের দেশ উপমহাদেশে সেই ফজিলত আমরা কাজে লাগাতে পারছি না । রাসুলুল্লাহ (সা.) তারাবির জন্য কঠোরতা অবলম্বন করেননি, বরং তিনি উৎসাহ দিয়েছেন তারাবি আদায়ের। আর আমরা তারাবিতে কুরআন খতম করতেই হবে, এই ভাবনার কারণে – প্যাকেজ খতমে তারাবি চালু করেছি।

এইসব তারাবির প্যাকেজ হচ্ছে কত কম দিনে কুরআন খতম করা যায়। ৬, ১০,১৫ ইত্যাদি দিন নির্ধারণ করে আজ তারাবির সালাত আদায় হয় যা কখনোই সহিহ্ হতে পারে না। কেননা তারাবি আরাম ও বিশ্রাম সহকারে আদায়ের সালাত। এই সালাত আদায় করতে গিয়ে কেউ অসুবিধায় পরলে, তার সালাত কতটুকু হবে আর ফজিলতই কী পাবে?

শুধু তাই নয়, যারাই এইসব প্যাকেজ চালু করে এবং সেখানে তারাবি আদায় করে, তাদের অধিকাংশের বেশি  নিয়মিত ফরজ সালাত আদায়কারী নয়। এমনকি তারা তারাবির সালাতে কুরআন খতমকে ফরজ মনে করে। খতম শেষ হওয়ার পর মসজিদের ধারেকাছেও আর যায় না। তারাবি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে  ধোঁয়াসা রয়েছে। যে কারণে মানুষের মধ্যে আজ এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং আমাদের উচিত হবে তারাবির সালাত মনোযোগী হয়ে আদায় করা। প্রয়োজনে একাকী হলেও মনোযোগ দিয়েই যেন আমরা সালাত আদায় করি। তবেই আমরা এর পরিপূর্ণ নেকী পাবো। 

তারাবি সালাত নিয়ে একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ

উপর্যুক্ত সকল তথ্য প্রমাণাদি থেকে এটা প্রমাণিত যে, তারাবির সালাত হলো মূলত বিশ্রাম নিয়ে ধীরে সুস্থে  আদায়ের সালাত। এই সালাত কত রাকাত (৮/২০) তা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সুস্পষ্ট সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই যেকোনো রাকাত আদায় করলে আল্লাহ্ তার প্রতিদান ইনশাআল্লাহ অবশ্যই দিবেন। এটা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি মুসলিম উম্মাহর ধ্বংসের লক্ষণ। কেননা এই সালাত আদায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন তবে জোরালো নির্দেশ নয়। 

এই সালাতে কুরআন খতম দেওয়া জরুরী নির্দেশিত নয়। জামাতে এই সালাত আদায় করতেই হবে এমনও নয়। মূলত এই সালাত হলো আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার এবং সন্তুষ্টি পাওয়ার সালাত। সবচেয়ে উত্তম হলো রাতের প্রথম অংশের চাইতে মধ্য বা শেষ অংশে সালাত আদায় করা। 

জামাতে তারাবির সালাত আদায় করলে কুরআনের অবমাননা না হয় এমনভাবে সালাত আদায় করতে হবে। একইসাথে প্রচলিত দোয়া বর্জন করে কুরআন হাদিসের উল্লেখযোগ্য দোয়া পড়া উত্তম। 

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী জন্ম চট্টগ্রামে। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় প্রবাসী ছিলেন। প্রবাসের সেই কঠিন সময়ে লেখেলেখির হাতেখড়ি। গল্প, কবিতা, সাহিত্যের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলা পত্রিকায়ও নিয়মিত কলাম লিখেছেন। প্রবাসের সেই চাকচিক্যের মায়া ত্যাগ করে মানুষের ভালোবাসার টানে দেশে এখন স্থায়ী বসবাস। বর্তমানে বেসরকারি চাকুরিজীবী। তাঁর ভালোলাগে বই পড়তে এবং পরিবারকে সময় দিতে।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।