বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

খাদ্য কাকে বলে? খাদ্য ও খাদ্য উপাদানের সংজ্ঞা খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা কী?

খাদ্যের অভাবে ধীরে ধীরে মানুষ ও জীব মারাও যায়। তাই দেহকে সবল, সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে হলে বিভিন্ন খাদ্য উপাদান প্রয়োজন। এসব খাদ্য উপাদান বিভিন্ন ভাবে প্রয়োজন অনুসারে শরীরে কাজ করে থাকে।

খাদ্য ছাড়া আমরা বাঁচতে পারিনা। খাদ্য দেহ গঠন করে ও দেহে শক্তি এবং তাপ উৎপাদন করে। ফলে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্মক্ষম এবং সবল হয়। অপরদিকে খাদ্যের অভাব হলে দেহ গঠন ব্যাহত হয়, শরীর দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অক্ষম হয়ে পড়ে, দেহ সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয় না। খাদ্যের অভাবে ধীরে ধীরে মানুষ ও জীব মারাও যায়। তাই দেহকে সবল, সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে হলে বিভিন্ন খাদ্য উপাদান প্রয়োজন। এসব খাদ্য উপাদান বিভিন্ন ভাবে প্রয়োজন অনুসারে শরীরে কাজ করে থাকে। পুষ্টি প্রক্রিয়ায় খাদ্যবস্তু পরিপাক হয়ে শরীরে বিশোষিত হয়। পরিপাকের মাধ্যমে আহার্য বস্তু ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত হয়। তারপর দেহের বিভিন্ন কাজ করে। এভাবে খাদ্য থেকে উপাদানগুলো আমাদের দেহে বহু কাজে লাগে ও শরীরের সুস্থতা বিধান করে দেহকে কর্মক্ষম রাখে।

খাদ্যের সংজ্ঞা

মানুষ বা প্রাণি যা খায় তাই খাদ্য নয়। খাদ্য হচ্ছে যেসব বস্তু বা দ্রব্য যা আহার করলে, আহার্য বস্তু হজম হয়ে বিশোষিত হবে এবং বিশোষণের পর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের প্রয়োজনমত কাজে লাগবে। দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, তাপ ও শক্তি উৎপাদন করে, শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখবে।

যেমন: চাল, ডাল, মাছ, মাংস, শাক, সবজি, ফলমূল, দুধ, চিনি, পানি ইত্যাদি। 

খাদ্য উপাদানের সংজ্ঞা 

আমরা জানি একটি খাদ্য বস্তু দেহে এক বা একাধিক কাজ করতে পারে। তার কারণ হচ্ছে একটি খাদ্যবস্তুতে এক বা একাধিক রাসায়নিক দ্রব্য বা পদার্থের মিশ্রণে বিভিন্ন উপাদান থাকে। মৌলিক রাসায়নিক পদার্থগুলো হচ্ছে কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, সালফার, আয়োডিন, লৌহ, ফসফরাস, পটাসিয়াম ইত্যাদি। এসব রাসায়নিক পদার্থের আনুপাতিক সংমিশ্রনে এক একটি উপাদান গঠিত হয়। খাদ্য উপাদানগুলো হচ্ছে— প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি। 

যেকোন খাদ্যে মিশ্র উপাদানের উপস্থিতি থাকে। যেমন: মাছ— এতে আছে প্রোটিন, চর্বি, খনিজ লবণ ও ভিটামিন। মাংসে আছে, প্রোটিন, খনিজ লবণ, ফ্যাট কিছু ভিটামিন। এভাবে দেখা যায় কোন খাদ্যবস্তু একক কোন উপাদানে গঠিত নয়। তাই একটি খাদ্যবস্তু দেহে এক বা একাধিক কাজ করে যেতে পারে। দুধে লৌহ ছাড়া প্রায় সকল উপাদানই কমবেশি বিদ্যমান থাকে সেজন্য দুধ খেয়ে সুস্থ অবস্থায় শিশুরা ১ বছর কাল ধরে বেঁচে থাকতে পারে। 

যে খাদ্যে যে উপাদানটি বেশি বিদ্যমান থাকে সে খাদ্যকে আমরা সেই উপাদানবহুল খাদ্য নামে চিহ্নিত করি। অর্থাৎ “যেসব রাসায়নিক পদার্থ বিদ্যমান থেকে দেহে এক বা একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে পারে তাকে খাদ্য-উপাদান বলে।”

খাদ্য উপাদানের কাজগুলো হলো নিম্নরূপ-

  1. দেহের তাপ ও শক্তি যোগায়
  2. দেহের বর্ধন ও ক্ষয়পূরণ করে
  3. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে দেহকে সুস্থ রাখে 

অতএব খাদ্যের উপাদানই উল্লেখিত কাজগুলো একক বা যৌথভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা কী?

খাদ্যের প্রয়োজন এক কথায় শেষ করা যায় না। আমরা খাদ্যের কারণে বেঁচে থাকি। ক্ষুধা লাগলেই খাদ্যের প্রয়োজন হয়। এই খাদ্য আমাদের দেহে তাপ ও শক্তি যোগায়। কঠিন ও তরল যাবতীয় খাদ্যবস্তু গ্রহণ করে দেহ তার নানাবিধ প্রয়োজন মিটায়, খাদ্য গ্রহণের পর হজম প্রক্রিয়ার খাদ্য তরল পদার্থে পরিণত হয়। তারপর তরল পদার্থ নানান প্রক্রিয়ায় দেহের রক্ত তরলে প্রবাহিত হয় বিশেষণের জন্য। পুষ্টি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই খাদ্য দেহের বিভিন্ন কাজ করে পুষ্টি সাধন করে। অতএব খাদ্য গ্রহণ আমাদের দেহের সুস্থতা, সক্ষমতা ও জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। 

কাজ অনুযায়ী খাদ্য বস্তুগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। 

  • তাপ ও শক্তি প্রদানকারী খাদ্য: চাল, গম, মুড়ি, খই, চিড়া, আলু, গুড়, চিনি, মিষ্টি,  তেল, ঘি, মাংস ইত্যাদি। 
  • গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয় পূরণকারী খাদ্য: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম, বিচি, শুটকি  ইত্যাদি।
  • রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য: সবুজ ও হলুদ শাকসবজি, যেকোন ফলমূল, দুধ ও  ডিম ইত্যাদি। 

আমরা যে-কোনো খাদ্যই গ্রহণ করি না কেন তাতে সব রকম উপাদানই কমবেশি থাকে। 

খাদ্যের উপাদান ছয়টি। এই ছয়টি খাদ্য উপাদান হলো—

  1. প্রোটিন বা আমিষ
  2. কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা
  3. ফ্যাট বা তেল ও চর্বি
  4. ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ 
  5. খনিজ লবণ
  6. পানি

যে সমস্ত খাদ্যে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট উপাদান বহুল পরিমাণে থাকে সেসব খাদ্য আমাদের দেহে শক্তি যোগায়। তাপ ও শক্তি প্রদানকারী খাদ্যসমূহের মধ্যেই আমরা শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় উপাদান পেয়ে থাকি বেশি। শক্তি পরিমাপের একক হলো কিলোক্যালরি। 

প্রতি গ্রাম কার্বোহাইড্রেট হতে ৪ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়, প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ৩৫০-৪০০ কিলোক্যালরি কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য থেকে গ্রহণ করা উচিত। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের অভাবে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। 

বৃদ্ধি, গঠন ও ক্ষয়পূরণ করে সে সব খাদ্য সেগুলোতে বেশিরভাগই প্রোটিন জাতীয় উপাদান বিদ্যমান থাকে। প্রাণি থেকে আমরা মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এবং উদ্ভিদ থেকে ডাল, বীচি, বাদাম এ প্রোটিন বা আমিষ উপাদানটি বেশি পেয়ে থাকি। প্রোটিনের অভাবে কোয়াশিয়রকর নামক রোগ হয়। 

টাট্কা শাকসবজি ফলমূল ইত্যাদিতে ভিটামিন নামক রোগ প্রতিরোধক উপাদানটি বহুল পরিমাণে পাওয়া যায়। এছাড়াও তেল ও চর্বি জাতীয় খাদ্যে ভিটামিন এ, ডি, ই, কে ভিটামিনগুলো এককভাবে পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘সি’ স্কার্ভি নামক রোগ প্রতিরোধ করে। 

ভিটামিন ‘ডি’ রিকেট রোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়া ভিটামিন ‘এ’ নানা ধরনের চোখের রোগ থেকে শিশুদের রক্ষা করে। 

ভিটামিনের মতো খনিজ পদার্থ দেহের বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য আবশ্যক। লৌহ, ক্যালসিয়াম ফসফরাস ও আয়োডিন এগুলো উল্লেখযোগ্য খনিজ লবণ। 

পানি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। রসালো ফলমূল যেমন, লেবু, টমাটো, তরমুজ, শশা, লাউ, ইত্যাদি খাদ্য বস্তুতে প্রচুর পানি পাওয়া যায়। তদুপরি আমাদের দেশে নান রকম কোমল 

পানীয় পাওয়া যায় যেমন— কোক, ফান্টা ইত্যাদি।এছাড়াও অন্যান্য ফলের রসও বাজারজাত করা হয়। পানি দেহে রক্তের তরলতা বজায় রেখে দেহকে সচল ও সুস্থ রাখে। 

পেটের পীড়া, ঘামে, বমিতে এবং ডায়রিয়াতে দেহ কোষের তরলতা নষ্ট হয়। এতে রক্তের চাপ কমে যায়। জিহ্বা শুকিয়ে যায়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে, সুতরাং পানি দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করতে হয়।

সারাংশ

খাদ্য দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে। দেহকে নানা প্রকার রোগ থেকে রক্ষা করে 

বিভিন্ন কাজে শক্তি প্রদান করে, খাদ্যের মধ্যে ছয়টি রাসায়নিক উপাদান বিভিন্ন পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। যেমন-কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা প্রোটিন, ফ্যাট (তেল বা চর্বি) ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং পানি।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।