রবিবার, মে ২২, ২০২২

সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান বা ভূমিকা

রামমোহন রায় মূর্তিপূজা বিরোধী বক্তব্য উপস্থাপনের পক্ষে সমর্থন পেলেন উপনিষদ থেকে। উপনিষদে বহু দেবদেবীর পরিবর্তে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনার কথা রয়েছে। এই সূত্রেই রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্মসভা’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম দেন।

উনিশ শতকে ভারতে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সাথে ধর্মসংস্কার ও শিক্ষান্নোয়নের একটি সম্পর্ক ছিল। বাংলার হিন্দু সমাজ সংস্কারে অভিন্ন বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা যায়। ইংরেজদের আগমন ও ক্ষমতাসীন হওয়া বাংলার সাধারণ হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে শাসক ইংরেজদের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ অনুমোদন দেয়নি ইংরেজদের সংস্পর্শে আসার। ইংরেজ সান্নিধ্যকে তারা ধর্মীয় অনাচার হিসেবে মনে করতে থাকে। একারণে আধুনিক ইউরোপীয় জ্ঞানের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে পারে নি। ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণকে পাপ বিবেচনা করতে থাকে। এই বাস্তবতায় হিন্দু সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করে আধুনিকতার পথে এগিয়ে এনেছিলেন যেকজন বাঙালি সংস্কারক তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রামমোহন রায় উনিশ শতকের একজন ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।

হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক হিন্দু পরিবারে মে ২২, ১৭৭২ খ্রি. তারিখ রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন। রামমোহন রায়ের পারিবারিক ধর্মীয় ঐতিহ্য সে যুগের বিচারে ব্যাতিক্রমী ছিল। রামমোহন রায়ের পরিবার রাঢ়ী ব্রাহ্মণ এবং পারিবারিক উপাধি বন্দ্যোপাধ্যায়।

রামমোহন রায়ের ঠাকুরদা কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘রায়’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় বৈষ্ণব মতবাদ গ্রহণ করেন। 

অন্যদিকে তাঁর মা তারিণী দেবী শৈব পরিবারের মেয়ে ছিলেন। এসব কারণেই সম্ভবত একটি উদার ও মিশ্র ধর্মীয় অবয়বের ভেতর অনেকটা মুক্ত মানসিকতায় বেড়ে উঠেছিলেন রামমোহন রায়। তাই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত ছিল। 

রাজা রামমোহন রায় একজন ধর্ম সংস্কারক ও শিক্ষা সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হলেও সমাজ সংস্কারক হিসেবেই তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। 

রামমোহন রায় ১৮১৫ সালে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে কলকাতাতে চলে আসেন। এসময় থেকে তিনি সমাজ সংস্কারে নিবেদিত হন। এখানে তিনি সমমনা বন্ধুদের একত্রিত করে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, এর নাম হয় ‘আত্মীয়সভা’। নিয়মিত আলোচনা সভার আয়োজন করা হতো এখানে। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হতো। এই সভায় দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের মত বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। 

সাধারণ হিন্দুদের ভেতর মুক্তচিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে ১৮২১ সালে প্রকাশ করেন সংবাদ কৌমুদী নামে একটি বাংলা সংবাদপত্র। পরের বছর ফারসি ভাষায় আরেকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। এর নাম ছিল মিরাত উল আখবার। 

রামমোহন রায় মূর্তিপূজা বিরোধী বক্তব্য উপস্থাপনের পক্ষে সমর্থন পেলেন উপনিষদ থেকে। উপনিষদে বহু দেবদেবীর পরিবর্তে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনার কথা রয়েছে। এই সূত্রেই রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্মসভা’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম দেন। এখানে নিরাকার ব্রহ্মার স্মরণে ধর্মসঙ্গীত গেয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ব্রাহ্মসভা ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু সমাজে অনেক কুপ্রথা প্রচলিত হয়েছিল। এর অন্যতম হচ্ছে সতী। সতীদাহ প্রথা অনুসারে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পেড়ানো হতো। গোঁড়া হিন্দুদের প্রবল প্রতিরোধের মধ্যেও রামমোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে থাকেন, তিনি প্রভাবিত করতে থাকেন কোম্পানির শাসকদের। এই সূত্রে ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংকের অনুমোদনে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে আইন পাশ হয়। 

রামমোহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধি দেন সে সময়ের নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর (১৮০৬-১৮৩৭)।

রাজা রামমোহন রায় মৃত্যুবরণ করেন সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩ খ্রি. তারিখ যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলে।

[পড়ুন— সমাজ সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।

পাঠ পরিকল্পনা: পাঠ পরিকল্পনার সংজ্ঞা এবং হার্বার্টের পঞ্চসোপান ও আধুনিক ত্রিসোপান

শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে তা শেখানো হবে এবং কীভাবে শিখন মূল্যায়ন করা হবে সে সম্পর্কে শিক্ষকের দৈনন্দিন নির্দেশনা হলো পাঠ পরিকল্পনা