বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তাঁর মৌর্য সাম্রাজ্য

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শুধু দক্ষ যোদ্ধা ও বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি একজন সফল প্রশাসকও ছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের অধীনস্ত সাম্রাজ্যকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি একটি সুবিন্যস্ত শাসনব্যবস্থাও প্রবর্তন করেন, যা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক— এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।

প্রাচীন ভারতে সাম্রাজ্যের বিকাশ ঘটে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। মৌর্য সাম্রাজ্যই ভারতের ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য। আদি কৌম সমাজ রূপান্তরিত হয় সাম্রাজ্যে। মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। মৌর্য সম্রাটরা বহু-বিভক্ত ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৌর্য বংশের দুই জন সম্রাট— চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশোক বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন রাজ্য বিজয়, সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে। এখানে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (Chandragupta Maurya) এবং তার সাম্রাজ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

এখানে যা আছে

মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডারের মৃত্যু ঘটলে তাঁর অধিকৃত ভারতীয় অঞ্চলে গ্রিকদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং বিরোধ দেখা দেয়। এ সময়ে মগধে নন্দবংশীয় সম্রাট ধননন্দ রাজত্ব করছিলেন। তিনি মোটেও জনপ্রিয় ছিলেন না। এ অবস্থায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধের সিংহাসন দখল করেন এবং উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে গ্রিকদের বিতাড়িত করে ভারতে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য ইতিহাসে মৌর্য সাম্রাজ্য নামে বিখ্যাত।

ড. রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনারূপে বর্ণনা করেছেন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশপরিচয়

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশপরিচয় সর্ম্পকে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। হিন্দু সাহিত্যিক উপাদানের সাক্ষ্যানুসারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন নন্দ বংশোদ্ভূত। তাঁর মায়ের নাম ছিল মূরা এবং তিনি ছিলেন এক নন্দ রাজার পত্নী বা উপ-পত্নী। অনেকে মনে করেন যে মাতা মূরার নামানুসারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বংশের নাম হয় মৌর্য। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুসারে মূরার পুত্র হবে ‘মৌরেয়’, মৌর্য নয়। মধ্যযুগীয় শিলালিপিতে মৌর্যদের ক্ষত্রিয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৌদ্ধ লেখকদের মতানুসারে, মৌর্যরা ছিলেন ক্ষত্রিয়। গৌতম বুদ্ধের আমলে তাঁরা পিপ্পলিবন নামক প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যের শাসক ছিলেন। 

মুদ্রারাক্ষস নামক নাটকে চন্দ্রগুপ্তকে ‘বৃষল’ বলা হয়েছে যা থেকে অনেকেই মনে করেন যে তিনি শূদ্র ছিলেন। তবে মনে রাখা দরকার যে ‘বৃষল’ শব্দটি শুধু শূদ্রকেই বোঝায় না। এ শব্দটির অন্য দুটি অর্থ হচ্ছে রাজ-শ্রেষ্ঠ এবং জাতিচ্যুত। হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়েও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য গ্রিক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন এবং শেষ জীবনে জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য জাতিচ্যুত হিসাবে তাঁকে ‘বৃষল’ বলা যেতে পারে। অন্যদিকে বিশাল সাম্রাজ্য এবং সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি রাজ-শ্রেষ্ট হিসাবেও ‘বৃষল’ রূপে আখ্যায়িত হতে পারেন। জৈন কিংবদন্তী অনুসারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন ময়ূর-পোষক এক গ্রাম-প্রধানের দৌহিত্র। 

বৌদ্ধ উৎসগুলো মৌর্যদের ক্ষত্রিয় বলে বর্ণনা করেছে। মহাবংশে তাঁকে মৌর্য নামের ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দিব্যাবদানেও বিন্দুসার ও অশোককে ক্ষত্রিয়রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। 

মহাপরিনির্বাণ সূত্রে মৌর্যদের পিপ্পলিবনের শাসকগোষ্ঠীরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত উৎসগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ উৎসগুলো সবচেয়ে প্রাচীন এবং এ কারণে পন্ডিতরা মনে করেন যে, মৌর্যরা ক্ষত্রিয় ছিলেন। 

চন্দ্রগুপ্তের জন্ম

গৌতম বুদ্ধের আমলে মৌর্যরা ছিলেন পিপ্পলিবনের শাসকগোষ্ঠী। পরবর্তীকালে পিপ্পলিবন মগধ সাম্রাজ্যের  অন্তর্ভুক্ত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে মৌর্যরা দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ কিংবদন্তী থেকে জানা যায় যে চন্দ্রগুপ্তের পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতা অন্তঃসত্তা অবস্থায় মগধের রাজধানী পাটলিপুত্রে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জন্ম হয়। এক রাখাল চন্দ্রগুপ্তকে পোষ্যপুত্র হিসাবে গ্রহণ করে তাঁকে নিকটবর্তী এক গ্রামে নিয়ে যায়।

চন্দ্রিগুপ্ত মৌর্যের বাল্যকাল

কিংবদন্তী অনুসারে বাল্যকালে তিনি গো-পালক ও শিকারীদের মাঝে বড় হয়ে ওঠেন। সেখান থেকে কৌটিল্য নামে তক্ষশীলার এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত তাঁকে তক্ষশীলায় নিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক শিক্ষা দান করেন।

গ্রিক ও নন্দদের উৎখাত করেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

চন্দ্রগুপ্তকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার

প্লুটার্ক ও জাস্টিনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় চন্দ্রগুপ্ত মগধের অত্যাচারী নন্দরাজা ধননন্দকে উৎখাত করার জন্য আলেকজান্ডারকে আমন্ত্রণ জানাতে পাঞ্জাবে আলেকজান্ডারের শিবিরে গিয়েছিলেন। তাঁর এহেন আচরণকে ড. রায়চৌধুরী রাণা সংগ্রাম সিংহের বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আলেকজান্ডার চন্দ্রগুপ্তের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং তাঁর মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিলে চন্দ্রগুপ্ত পাঞ্জাব থেকে পালিয়ে আসেন। তখন থেকেই চন্দ্রগুপ্ত ভারত থেকে গ্রিক ও নন্দদের উৎখাত করার চেষ্টা করতে থাকেন।

কৌটিল্যের সাহায্য পান চন্দ্রগুপ্ত

ভারত থেকে গ্রিক-বিতাড়ন ও নন্দ-সাম্রাজ্যের ধ্বংস সাধনে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তক্ষশীলার ব্রাহ্মণ পন্ডিত কৌটিল্যের সাহায্যে পেয়েছিলেন। আর্থিক সাহায্যের আশায় কৌটিল্য পাটলিপুত্রে এসে নন্দরাজার কাছে অপমানিত হয়েছিলেন বলে তিনিও নন্দদের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে নন্দবংশের উচ্ছেদ সাধন করেছিলেন অথবা গ্রিকদের বিতাড়িত করেছিলেন সে বিষয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। গ্রিক ঐতিহাসিক জাস্টিনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে পাটলিপুত্র দখল করেন এবং পরে গ্রিকদের বিতাড়িত করেন। ডঃ রায়চৌধুরী এবং ভিনসেন্ট স্মিথ এ মতকে সমর্থন করেন। ঐতিহাসিক রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় অবশ্য মনে করেন যে চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে পাঞ্জাবে গ্রিকদের পরাজিত করার পর মগধ-রাজ ধননন্দকে সিংহাসনচ্যুত করেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রথমে পাটলিপুত্র অধিকার করেন এবং পরে গ্রিকদের বিতাড়িত করেন, এ মতই অধিক গ্রহণযোগ্য। 

চন্দগুপ্ত সিংহাসনে আরোহন করেন কবে?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসনারোহণের তারিখ সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। গ্রিক উৎস থেকে জানা যায় যে, ৩২৬ অথবা ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি পাঞ্জাবে আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তবে তখনো তিনি রাজা হননি। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে জানা যায় যে গৌতম বুদ্ধের নির্বাণলাভের ১৬২ বছর পরে চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেছিলেন। ক্যান্টনের দিনপঞ্জি অনুসারে বুদ্ধের মৃত্যু হয়েছিল ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এর ১৬২ বছরের পরের সালটি হয় (৪৮৭ – ১৬২) = ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরই চন্দ্রগুপ্ত রাজা হয়েছিলেন বলে সবাই মনে করেন। কাজেই ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেছিলেন এ কথা অনেকেই স্বীকার করেন না। অন্যদিকে দীপবংশ থেকে জানা যায় যে গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর ২১৮ বছর পর অশোকের অভিষেক হয়েছিল (৪৮৭ – ২১৮) = ২৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এর চার বছর আগেই তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ২৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। পুরাণের সাক্ষ্যানুযায়ী চন্দ্রগুপ্ত এবং বিন্দুসার যথাক্রমে ২৪ ও ২৫ বছর রাজত্ব করেছিলেন। কাজেই চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেছিলেন (২৭৩ + ৪৯) = ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এ তারিখ অধিকাংশ আধুনিক পন্ডিত স্বীকার করে নিয়েছেন। 

বিতারিত হয় গ্রিকরা

মগধের সিংহাসন দখল ও গ্রিকদের বিতাড়ণে সমকালীন পরিস্থিতি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সহায়ক হয়েছিল। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরপরই ভারতে তাঁর অধিকৃত অঞ্চলে গ্রিক গভর্নরদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হলে সেখানে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সিন্ধুর গভর্নর সঙ্গে সংঘর্ষে পাঞ্জাবের গভর্নর পিথন নিহতো হন। এর কিছুদিন পরে তক্ষশীলায় কৌটিল্যের নেতৃত্বে গ্রিক-বিরোধী বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ সময় আততায়ীর হাতে পুরু নিহতো হলে স্থানীয় অধিবাসীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ অবস্থায় চন্দ্রগুপ্তের পক্ষে সে অঞ্চল থেকে গ্রিকদের বিতাড়িত করা সহজ হয়েছিল।

ধননন্দ অত্যাচারী, চন্দ্রগুপ্ত দেশপ্রেমিক

মগধের রাজা ধননন্দ ছিলেন অত্যাচারী। জনগণ তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। চন্দ্রগুপ্ত এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নন্দদের পরাজিত করে সিংহাসন দখল করেন। এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে চন্দ্রগুপ্ত নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসাবে তুলে ধরেন। একদিকে বিদেশী শাসনের অবসান এবং অন্যদিকে অত্যাচারী শাসকের উচ্ছেদ উভয় লক্ষ্যইে তিনি জনগণের সাহায্য লাভ করেছিলেন।

ব্যর্থ হয়েছিল প্রথম দুই পাটলিপুত্র আক্রমণ 

পাটলিপুত্র দখলের উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রথম দুটি সরাসরি আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এর পর চন্দ্রগুপ্ত কৌটিল্যের সাহায্যে মগধ সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকা থেকে অভিযান শুরু করেন এবং রাজধানী পাটলিপুত্র অধিকার করতে সক্ষম হন। নন্দ সেনাপতি ভদ্রশাল বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে চন্দ্রগুপ্তকে বাধা দিয়ে পরাজিত হন। পাটলিপুত্রের সিংহাসন দখলের পর চন্দ্রগুপ্ত তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে গ্রিকদেরও বিতাড়িত করেন।

বিজয়ী বীর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন একজন বিজয়ী বীর। ক্ষমতা লাভের পর তিনি ভারতের এক বিশাল অংশ জুড়ে তাঁর 

সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। প্লুর্টাক বলেছেন যে, চন্দ্রগুপ্ত ছয়লক্ষ সৈন্য নিয়ে প্রায় সমগ্র ভারত দখল করেছিলেন। জাস্টিনও বলেছেন যে, চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন ‘ভারতের মালিক’। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দাক্ষিণাত্য ও পশ্চিম ভারতের সৌরাষ্ট্রও জয় করেছিলেন। 

চন্দ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য বিজয়

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দাক্ষিণাত্য বিজয় নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে চন্দ্রগুপ্ত নয়, দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন তাঁর ছেলে বিন্দুসার। ভিনসেন্ট স্মিথ এ মতের প্রবক্তা। তিনি বলেছেন যে সাধারণ অবস্থা থেকে সিংহাসন দখল, গ্রিকদের বিতাড়ন, পশ্চিম ভারত জয়, সেলুকাসকে পরাজিত করা- এত কিছু করার পর চন্দ্রগুপ্তের পক্ষে সুদূর দাক্ষিণাত্য জয় করা সম্ভব ছিল না। বিন্দুসার দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন এ মতের সমর্থনে তিনি বিন্দুসার ষোলটি রাজ্যের রাজাকে পরাজিত করেছিলেন— তারনাথের এ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। কিন্তু অধিকাংশ পন্ডিতই স্মিথের এ মত গ্রহণ করেন নি। বিন্দুসার দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন— এ কথা তাঁরা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, বিন্দুসারের পক্ষে দাক্ষিণাত্য জয় করা সম্ভব ছিল না। কোনো উৎসেই বিন্দুসারের দাক্ষিণাত্য অভিযানের বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত নেই। তাছাড়া বিন্দুসার যোদ্ধাসুলভ কোনো গুণেরও অধিকারী ছিলেন না। তাঁর রাজত্বকালে তক্ষশীলায় বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি নিজে বিদ্রোহ দমন করতে না গিয়ে তাঁর ছেলে অশোককে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। যে রাজা নিজের রাজ্যের এক অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করতে যাননি, তিনি পর্বতাকীর্ণ দুর্গম দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন এ কথা মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য। তা ছাড়া গ্রিক লেখকদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, বিন্দুসার ডুমুর ও মিষ্টি মদ পছন্দ করতেন এবং দরবারে বসে পন্ডিত ব্যক্তিদের সাথে দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা করতে ভালোবাসতেন। এ হেন চরিত্রের বিন্দুসার দাক্ষিণাত্য জয় করবেন এটা ভাবা যায়না। 

ড. রায়চৌধুরী মনে করেন যে, মৌর্যদের দাক্ষিণাত্য জয় করার কোনো প্রয়োজনই ছিলনা। তিনি বলেছেন যে, দাক্ষিণাত্য ছিল নন্দদের সাম্রাজ্যভুক্ত। কাজেই নন্দ রাজাকে পরাজিত করে পাটলিপুত্রের সিংহাসন দখল করার সাথে সাথে নন্দ সাম্রাজ্যের অংশ হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই দাক্ষিণাত্য মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এ মতের স্বপক্ষে তিনি গোদাবরী নদীর তীরে নও-নন্দ-দেহরা নামে একটি শহরের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। এ শহরের অস্তিত্ব থেকে তিনি মনে করেন যে, দাক্ষিণাত্যের একটা বিরাট অঞ্চল নন্দ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন তামিল সাহিত্যেও নন্দদের বিপুল ধন-সম্পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

তবে দাক্ষিণাত্য কিছুকালের জন্য নন্দদের অধিকারে থাকলেও এমনও হতে পারে যে নন্দদের শাসনকালে বা তাঁদের পতনের পর সে এলাকা স্বাধীন হয়ে যায়। এ কারণেই মৌর্যদের জন্য নতুন করে দাক্ষিণাত্য জয় করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ড. কৃষ্ণস্বামী আয়েঙ্গার বলেছেন যে, একজন প্রাচীন তামিল গ্রন্থকার মৌর্যদের তিনেভেলী জেলা পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। তবে চন্দ্রগুপ্তের নাম উল্লেখ না করে তিনি এ রাজাকে ‘মৌর্যভূঁইফোড়’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে মনে করা যায় যে, সাধারণ অবস্থা থেকে সিংহাসনে উন্নীত প্রথম মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তকেই বোঝানো হয়েছে।

মহীশুরে প্রাপ্ত কিছু শিলালিপিতে উত্তর মহীশুরে চন্দ্রগুপ্তের শাসনের উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে, শিকারপুর তালুকের অন্তর্গত নাগরখন্ড চন্দ্রগুপ্তের শাসনাধীনে ছিল। 

মুদ্রারাক্ষসেও চন্দ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য অধিকারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কাজেই প্লুটার্ক ও জাস্টিনের বর্ণনা, তামিল সাহিত্য এবং মহীশুরে প্রাপ্ত শিলালিপির সাক্ষ্য বিবেচনা করলে মনে হয় যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যই দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন। 

জৈন কাহিনীগুলোতেও দাক্ষিণাত্যের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের যোগাযোগের উল্লেখ আছে। এ প্রসঙ্গে হরিষেণের বৃহৎ-কথা, কোষ রত্নানন্দের ভদ্রবাহু-চরিত এবং রাজাবলীকথার উল্লেখ করা যায়। ঐ সব গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সিংহাসন ত্যাগ করে একদল জৈন ভিক্ষুর সঙ্গে ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যে চলে যান এবং জৈন বিধিমতে অনাহারে মহীশুরের শ্রাবণবেলাগোলায় দেহত্যাগ করেন। সবকিছু বিবেচনা করে আধুনিক পন্ডিতরা মনে করেন যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যই দাক্ষিণাত্য জয় করেছিলেন।

পশ্চিম ভারত জয় করেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যে পশ্চিম ভারতও জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পশ্চিম ভারতের সৌরাষ্ট্র তাঁর শাসনাধীন ছিল। মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামনের ১৫০ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ জুনাগড় প্রস্তরলিপিতে সৌরাষ্ট্রে চন্দ্রগুপ্তের ‘রাষ্ট্রীয়’ পুষ্যগুপ্ত কর্তৃক বিখ্যাত সুদর্শন হ্রদ খননের উল্লেখ রয়েছে। 

সেলুকাস ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

রাজত্বের শেষ ভাগে সেলুকাসের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে উত্তর পশ্চিম ভারতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সাম্রাজ্যের আরো বিস্তৃতি ঘটে। সেলুকাস ছিলেন আলেকজান্ডারের একজন সেনাপতি। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে পড়লে সেলুকাস প্রথমে ব্যাবিলন ও পরে সিরিয়া দখল করেন। এরপর তিনি ভারতে অভিযান পরিচালনা করে আলেকজান্ডারের বিজিত অঞ্চলগুলো দখল করার চেষ্টা করেন। গ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণে সেলুকাসের সিন্ধু নদী অতিক্রম ও বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব স্থাপনের উল্লেখ রয়েছে। জাস্টিন চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে সেলুকাসের বন্ধুত্ব স্থাপনের কথা বলেছেন। প্লুটার্ক বলেছেন যে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ হাতি উপহার দিয়েছিলেন। স্ট্র্যাবো এ বন্ধুত্বের ফলে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং উত্তর পশ্চিম ভারতে আলেকজান্ডারের অধিকৃত চারটি প্রদেশ চন্দ্রগুপ্তকে দানের কথা উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য যে, গ্রিক লেখকদের বিবরণে সেলুকাসের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের যুদ্ধের কোনো বিবরণ নেই। তাঁরা শুধু বন্ধুত্ব স্থাপন ও সন্ধির শর্তাবলির উল্লেখ করেছেন। মনে হয় যে এই অভিযানে সেলুকাস সাফল্য লাভ করতে পারেননি এবং সে কারণেই তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। সেলুকাস তাঁর কন্যাকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন একথা স্মিথ স্বীকার করেন না। কিন্তু ড. রায়চৌধুরী মনে করেন যে জামাতাকে যৌতুক হিসাবেই সেলুকাস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে চারটি প্রদেশ দিয়েছিলেন। এ প্রদেশ চারটি ছিল হিরাট, কান্দাহার, মাকরান এবং বেলুচিস্থান। উত্তর পশ্চিমের এসব এলাকা যে মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল তা অশোকের শিলালিপি দ্বারা প্রমাণিত। বন্ধুত্বের এ সম্পর্কের সূত্রেই সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তের দরবারে দূত হিসাবে মেগাস্থিনিসকে পাঠিয়েছিলেন। গ্রিকদের সঙ্গে মৌর্যদের এ কূটনৈতিক সম্পর্ক পরবর্তীকালেও অব্যাহতো ছিল। 

জৈনগ্রন্থ রাজাবলীকথা অনুসারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। রাজত্বের শেষদিকে উত্তর ভারতে এক দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসন ত্যাগ করে দাক্ষিণাত্যে চলে যান। মনে হয় এ সময়ই তিনি জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। মহীশুরের অন্তর্গত শ্রাবণবেলগোলায় জৈন বিধি অনুসরণ করে তিনি অনাহারে দেহত্যাগ করেন। দীর্ঘ ২৪ বছর রাজত্বের পর তিনি ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

প্রশাসক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর প্রশাসন ব্যবস্থা

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শুধু দক্ষ যোদ্ধা ও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল প্রশাসকও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশাল সাম্রাজ্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি একটি সুবিন্যস্ত শাসনব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা সর্ম্পকে জানার অনেকগুলো উৎস রয়েছে। চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, গ্রিক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিসের বিবরণ এবং অশোকের শিলালিপিগুলো এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামনের জুনাগড় প্রস্তরলিপি ও কিছু সাহিত্যিক রচনা থেকেও তাঁর শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায়। 

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য রচনা করেন ‘অর্থশাস্ত্র’। কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্র চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা সর্ম্পকে জানার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর রচয়িতা এবং রচনাকাল সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এটা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। ১৫ টি বিভাগ ও ১৮০ টি উপবিভাগে বিভক্ত এ গ্রন্থে প্রায় ৬০০০ শ্লোক রয়েছে। ১৯০৫ সালে আবিষ্কৃত এ গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে। অর্থশাস্ত্র রাজনীতি সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা গ্রন্থ নয়। এটা প্রশাসকের জন্য সারগ্রন্থ। এতে সরকারের সমস্যাবলী এবং সরকারি প্রশাসনিক যন্ত্র ও কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা সর্ম্পকে জানার গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় উৎস হচ্ছে গ্রিক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিসের রচিত ইন্ডিকা। মূল গ্রন্থটি পাওয়া না গেলেও স্ট্র্যাবো, অ্যারিয়ান, ডিওডরাস-এর মত পরবর্তীকালের লেখকদের উদ্ধৃতি থেকে ইন্ডিকার বিষয়বস্তু উদ্ধার করা সম্ভব। শোয়ানবেক এগুলো সংকলন করেছেন এবং ম্যাকক্রিন্ডল এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন।

প্রাচীনকালে মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকাকে নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করা হতো, যেমনটি করেছেন অ্যারিয়ান। তিনি মেগাস্থিনিসকে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিরূপে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু স্ট্রাবো মেগাস্থিনিসের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে নিদারুণ বিরক্ত হয়ে তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্লিনির চোখেও তিনি নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হননি। বিদেশী পর্যটকদের কিছু সহজাত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তাঁর ইন্ডিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসরূপে বিবেচিত। অনেকক্ষেত্রেই ইন্ডিকার বিবরণ অর্থশাস্ত্র দ্বারা সমর্থিত। অশোক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থায় কিছু কিছু পরিবর্তন করলেও মূল কাঠামো মোটামুটি আগের মতই ছিল বলে মনে হয়। সে হিসেবে অশোকের লিপিমালা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসরূপে বিবেচিত। 

মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ও প্রদেশিক— এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় তিনটি অংশ ছিল যথা: রাজা, অমাত্য ও সচিব এবং মন্ত্রীপরিষদ। 

রাজা ছিলেন রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীল ব্যক্তি। মৌর্য রাজারা নিজেদের ‘দেবতাদের প্রিয়’ রূপে অভিহিত করতেন। বিশাল সাম্রাজ্যের সম্পদের মালিকানা এবং বিশাল সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব ছিল তাঁর ক্ষমতার উৎস। সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হলেও রাজাকে কিছু প্রাচীন বিধিনিষেধ মেনে চলতে হতো। রাজা প্রজাদের তাঁর সন্তান বলে মনে করতেন। প্রজার মঙ্গল সাধনই ছিল তাঁর কর্তব্য। স্থানীয় শাসনের ক্ষেত্রে ক্ষমতার কিছুটা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা ছিল এবং রাজধানীতে এবং প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কয়েকজন মন্ত্রী থাকতেন যাদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজা তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাঁর সামরিক, বিচার বিষয়ক, আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী ক্ষমতা ছিল। সেনাপতির সঙ্গে আলোচনা করে তিনি যুদ্ধ-পরিকল্পনা তৈরি করতেন। যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত থাকতেন। বিচারকাজ সম্পাদনের জন্য তিনি দরবারে বসতেন। স্ট্রাবো বলেছেন যে প্রয়োজন হলে তিনি ব্যক্তিগত আরাম- আয়েশ ত্যাগ করে সারাদিনই দরবারে বিচার কাজে কাটাতেন। দরবারে বিচার কাজে বসলে কৌটিল্য রাজাকে বিচারপ্রার্থীকে অপেক্ষমান না রাখতে বা অন্যের ওপর দায়িত্ব না দিতে সাবধান করে দিয়েছেন। কারণ, এতে জনমনে অসন্তোষ ও শত্রুতার সৃষ্টি হতে পারে যা রাজার বিপদ ডেকে আনতে পারে। 

রাজার আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আমরা দেখতে পাই যে কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাজাকে ‘ধর্মপ্রবর্তক’ বা আইন প্রণেতা বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে ‘রাজ-শাসন’ বা রাজকীয় অনুশাসন ছিল আইনের উৎস।

আইনে পুরাণ-প্রকৃতি অনুসরণ

অশোকের শিলালিপিতে উৎকীর্ণ রাজকীয় অধ্যাদেশগুলো হচ্ছে রাজকীয় অনুশাসনের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আইন প্রণয়নে তিনি ‘পুরাণ-প্রকৃতি’ অর্থাৎ পুরাতন রীতি-নীতি মেনে চলতেন। প্রহরী নিয়োগ, রাজ্যের আয়-ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা, মন্ত্রী, পুরোহিত ও তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ, মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে আলোচনা, গুপ্তচরদের মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ এবং বিদেশী দূতদের অভ্যর্থনা জানানো ইত্যাদি ছিল রাজার নির্বাহী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। রাজ্যশাসনের মূলনীতিগুলো রাজা নিজেই ঠিক করতেন। সে মোতাবেক তিনি জনগণ ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ পাঠাতেন। গুপ্তচরদের মাধ্যমে রাজা দূরবর্তী এলাকার কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। 

কৌটিল্য বলেছেন যে এক চাকায় গাড়ী চলেনা – অর্থাৎ রাজার একার পক্ষে সুষ্ঠুভাবে রাজ্যশাসন করা সম্ভব নয়। এজন্য তাঁর সহযোগিতা প্রয়োজন। কৌটিল্যের উল্লেখিত সচিব বা অমাত্যকেই মেগাস্থিনিস সপ্তম— জাতি হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা রাজাকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করতেন। তাঁদের সংখ্যা কম হলেও গুরুত্ব ছিল অনেক।

অমাত্যদের প্রধান মহামন্ত্রী

সচিব বা অমাত্যদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তাদের বলা হতো ‘মন্ত্রিণ’ বা ‘মহামন্ত্রী’। 

অশোকের শিলালিপিতে উল্লেখিত মহামাত্রগণই সম্ভবত চন্দ্রগুপ্তের আমলে ‘মন্ত্রিণ’ বা ‘মহামন্ত্রী’নামে অভিহিত হতেন। তাঁদের বার্ষিক বেতন ছিল ৪৮০০০ পাণ (রৌপ্যমুদ্রা)।

মন্ত্রীণদের পরামর্শ নিতেন রাজা

শাসন সম্পর্কিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার আগে রাজা তিন-চারজন মন্ত্রিণের সঙ্গে আলোচনা করতেন। জরুরি অবস্থায় মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে মন্ত্রিণগণকেও ডাকা হতো। মন্ত্রিণরা রাজার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন এবং সৈন্যদের উৎসাহ দিতেন। যুবরাজদের ওপরেও তাঁদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ছিল। কৌটিল্যও এমনি একজন মন্ত্রিণ ছিলেন। মন্ত্রিণদের সংখ্যা ছিল একাধিক।

মৌর্য সাম্রাজ্যে ছিল উপদেষ্টা পরিষদ

মন্ত্রিণগণ ছাড়াও মন্ত্রীপরিষদ নামে একটি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল। মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে এই পরিষদের অবস্থান অশোকের শিলালিপি থেকে প্রমাণিত। মন্ত্রিণদের তুলনায় মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের স্থান ছিল নিচে। এই পরিষদের সদস্যদের বার্ষিক বেতন ছিল মাত্র ১২০০০ পাণ।

জরুরি পরিস্থিতি এবং শাসন সংক্রান্ত জটিল কাজের সময় রাজা এই পরিষদের পরামর্শ নিতেন। মন্ত্রিপরিষদের মতামত গ্রহণ করা রাজার পক্ষে বাধ্যতামূলক ছিলনা। তবে কৌটিল্যের মতো ক্ষমতাশালী মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গৃহীত সিদ্ধান্তকে অবহেলা করাও রাজার পক্ষে সহজ ছিল না। মন্ত্রীপরিষদ শাসনকাজে রাজাকে সাহায্য করতেন। প্রদেশপাল, উপরাজ্যপাল, কোষাধ্যক্ষ, সেনাপতি, বিচারক প্রভৃতি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রীপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতো। বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনা জানানোর সময়ও তাঁরা রাজার সঙ্গে দরবারে উপস্থিত থাকতেন। 

অন্যান্য অমাত্য

মন্ত্রিণ ও মন্ত্রীপরিষদের সদস্যগণ ছাড়াও তৃতীয় এক শ্রেণির অমাত্য ‘শাসন ও বিচার’ বিভাগের উঁচু পদগুলোতে নিযুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁরা নিযুক্ত পেতেন।এদের মধ্যে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতের বিচারক, সমাহর্ত্রী (রাজস্ব আদায় বিভাগের কর্মকর্তা) সন্নিধাত্রী (কোষাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও প্রমোদ-উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক উল্লেখযোগ্য।

অন্যান্যদের মধ্যে পুরোহিতের স্থান সর্বোচ্চ

পদস্থ অন্যান্য রাজকর্মচারীদের মধ্যে পুরোহিতের স্থান ছিল সর্বোচ্চ। তিনি ছিলেন রাজার ধর্মীয় বিষয়ে উপদেষ্টা। রাজদ্রোহের অপরাধেও তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া যেতো না। পুরোহিতের পরে স্থান ছিল যুবরাজের। তিনি কার্য-নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন, অথবা সাধারণভাবে শাসনকাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক শিক্ষালাভ করতেন তা স্পষ্ট নয়। সেনাপতি ছিলেন সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তবে তিনি সেনা-প্রধান না যুদ্ধমন্ত্রী ছিলেন তা বলা কঠিন। রাজার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকতেন প্রতিহার। 

বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন অধ্যক্ষগণ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নগরাধ্যক্ষ (নগর), বলাধ্যক্ষ (সেনাবিভাগ), সুতাধ্যক্ষ (কৃষি), সূত্রাধ্যক্ষ (বয়ন), শুল্কাধ্যক্ষ (শুল্ক) ইত্যাদি।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রদেশ

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল বিশাল। মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি তাঁর সাম্রাজ্যেকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করেছিলেন। অর্থাৎ, মৌর্য সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো ফেডারেল বা যুক্তিরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়।

রাজা শাসন করতেন কেন্দ্রে আর তাঁর প্রিয় ব্যক্তি প্রদেশপাল হিসাবে প্রদেশ শাসন করতেন। তাঁর সময়ে মৌর্য সাম্রাজ্য কয়টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়না।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পাঁচ প্রদেশ

অশোকের শিলালিপিতে উত্তরাপথ, অবন্তীরথ, দক্ষিণাপথ, কলিঙ্গ এবং প্রাচ্য নামে মোট পাঁচটি প্রদেশের উল্লেখ দেখা যায়।

পাঁচটি প্রদেশের রাজধানী নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • উত্তরাপথ প্রদেশের রাজধানী তক্ষশীলা
  • অবন্তীরথ প্রদেশের রাজধানী উজ্জয়িনী 
  • দক্ষিণাপধ প্রদেশের রাজধানী সুবর্ণগিরি
  • কলিঙ্গ প্রদেশের রাজধানী তোসালী
  • প্রাচ্য প্রদেশের রাজধানী পাটলিপুত্র

কলিঙ্গ প্রদেশ অবশ্য বিজিত হয়েছিল অশোকের আমলে বাকি চারটি প্রদেশে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়।

প্রদেশপাল করা হতো রাজকুমারদের

দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে সাধারণত রাজকুমারদের প্রদেশপাল হিসাবে নিয়োগ করা হতো। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হতে জানা যায় যে ‘কুমার’ উপাধিকারী এ সব প্রদেশপালের বার্ষিক বেতন ছিল ১২০০০ পাণ। 

বড়ো শহরে মহামাত্র নিয়োগ

সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচ্য প্রদেশটি ছিল সম্রাটের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন। প্রাচ্যের রাজধানী পাটলিপুত্র ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী। এই প্রদেশের শাসনকাজে তাঁকে সাহায্য করার জন্য তিনি পাটলিপুত্র, কৌশাম্বী ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে মহামাত্র নিয়োগ করেন।

জনপদে সমাহর্ত্রী, প্রদেষ্ট্রি, গোপ ও গ্রামিক

প্রদেশগুলো কতগুলো জনপদে বিভক্ত ছিল। জনপদের শাসন পরিচালনা করতেন সমাহর্ত্রী। জনপদের এক-চতুর্থাংশের শাসনভার ছিল স্থানিক নামক কর্মচারীর ওপর ন্যস্ত। প্রদেষ্ট্রি নামক এক শ্রেণির কর্মচারী ছিল সমাহর্ত্রীর ভ্রাম্যমাণ সহকারী। পাঁচ থেকে দশটি গ্রামের শাসনভার ছিল গোপ নামক কর্মচারীর ওপর ন্যস্ত। প্রতি গ্রামের অধিবাসীরা গ্রামিক উপাধিকারী একজন কর্মচারীকে নির্বাচিত করতেন যার ওপর গ্রামের শাসনভার ন্যস্ত ছিল।

চন্দ্রগুপ্তের সামরিক বাহনী

মেগাস্থিনিসের বর্ণনা থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সামরিক বাহিনীর সংগঠন সম্পর্কে জানা যায়। চন্দ্রগুপ্তের সেনাবাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী, রথারোহী ও হস্তি আরোহী সৈন্য ছিল।এছাড়া তাঁর একটি নৌ-বাহিনীও ছিল। ত্রিশজন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি পরিষদের ওপর ন্যস্ত ছিল সামরিক বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব।

এই পরিষদ আবার পাঁচজন সদস্য নিয়ে ছয়টি বোর্ডে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি বোর্ড একটি নির্দিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল যথা: পদাতিক, অশ্বারোহী, যুদ্ধ-রথ, হস্তিবাহিনী, খাদ্য সরবরাহ ও পরিবহণ এবং নৌ-বাহিনী। 

রাজধানী পাটলিপুত্রের পরিচালনার ভার ছিল সামরিক পরিষদের মত একটি নগর পরিষদের ওপর। এই পরিষদও প্রতি বোর্ডে পাঁচ জন সদস্য নিয়ে ছয়টি বোর্ডে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি বোর্ড একটি নির্দিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল যথা, শিল্পোৎপাদন, বিদেশী নাগরিক, জন্ম -মৃত্যু,খুচরা ব্যবসায়,ওজন ও মাপ, শিল্পজাত দ্রব্য বিক্রি, এবং বিভিন্ন দ্রব্যের বিক্রিত মূল্যের এক-দশমাংশ কর হিসাবে আদায়। মেগাস্থিনিস  চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে শুধুমাত্র পাটলিপুত্র নগরের পরিচালনা-ব্যবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর সাম্রাজ্যের 

অন্যান্য প্রধান নগর তক্ষশীলা, উজ্জয়িনী ইত্যাদিতেও অনুরূপ পৌরসংগঠন ছিল বলে মনে করা ভুল হবেনা। 

চুন্দ্রগুপ্তের বিচারব্যবস্থা

রাজা ছিলেন প্রধান বিচারক। দরবারে বসে তিনি বিচার করতেন। এ ছাড়া শহর ও গ্রামাঞ্চলেও বিচারালয় ছিল। শহরে বিচার করতেন মহামাত্রগণ এবং গ্রামাঞ্চলে বিচার করতেন রাজুকগণ। গ্রিক লেখকদের বিবরণে বিদেশীদের জন্য পৃথক বিচারকের কথা পাওয়া যায়। অর্থশাস্ত্রে ধর্মীয়-দেওয়ানি আদালতকে ‘ধর্মস্থির’ এবং ফৌজদারি আদালতকে ‘কন্টকশোধন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মেগাস্থিনিস এবং কৌটিল্য দুজনই ফৌজদারি আইনের বিশেষ কঠোরতার কথা বলেছেন। জরিমানা ছিল সাধারণ অপরাধের শাস্তি। বড় ধরনের অপরাধের শাস্তি ছিল অঙ্গচ্ছেদ ও শিরচ্ছেদ। অপরাধীর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার করা হতো। দন্ডবিধির কঠোরতার কারণে দেশে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা ছিল কম।

গ্রিক লেখকরা বলেছেন যে চুরির ঘটনা ছিল বিরল। বিশাল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার সংবাদ, কর্মচারীদের কার্যকলাপ এবং প্রজাদের মনোভাব জানার জন্য বহু গুপ্তচর নিয়োগ করা হতো। স্ট্র্যাবোর মতানুসারে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরই গুপ্তচর হিসাবে নিয়োগ করা হতো।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুপ্তচর— সংস্থাঃ ও সঞ্চারাঃ

অর্থশাস্ত্রে গুপ্তচরদের সংস্থাঃ এবং সঞ্চারা— এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যারা নির্দিষ্ট স্থানে থাকত তাঁরা সংস্থাঃ নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে গৃহী, ব্যবসায়ী এবং সন্ন্যাসীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এক স্থান থেকে স্থানান্তরে সঞ্চরণরতদের বলা হতো সঞ্চারা: এ দলে থাকতো ভিক্ষুকী সাপুড়ে, পরিব্রাজিকা, গণিকা এবং নর্তকী। স্ট্র্যাবো এবং কৌটিল্য, দুজনের বর্ণনাতেই গুপ্তচর বৃত্তিতে বহু সংখ্যক মহিলা নিয়োগের উল্লেখ রয়েছে।

মৌর্য সাম্রাজ্যের আয়ের উৎস

সাম্রাজ্যের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি-কর। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত দুধরনের কর ছিল- ভাগ এবং বলি। জমিতে উৎপন্ন ফসলের এক অংশ রাজাকে দিতে হতো যা ভাগ নামে পরিচিত। সাধারণত এর পরিমাণ ছিল এক-ষষ্ঠাংশ। তবে প্রয়োজনে এটা এক-চতুর্থাংশে উন্নীত বা এক অষ্টমাংশে হ্রাস করা হতো। বলি ছিল অতিরিক্ত কর। জমি জরিপ এবং সেচ-ব্যবস্থা তত্ত্বাবধানের জন্য কর্মচারী নিযুক্ত করা হতো। শহরাঞ্চলে রাজস্ব-আয়ের প্রধান উৎস ছিল জন্ম-মৃত্যু কর, জরিমানা, বিক্রিত দ্রব্যের ওপর কর ইত্যাদি। গণিকা, পানশালা, জুয়ার আড্ডা ইত্যাদি থেকেও রাজ্যের আয় হতো।

মৌর্য সাম্রাজ্যের ব্যয়

বিশাল সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক ব্যয়ও ছিল বিশাল। বিশাল সৈন্যবাহিনীর জন্য বহু অর্থ ব্যয় হতো। বেসামরিক প্রশাসনের ব্যয়ও ছিল বিরাট। রাজকীয় কারখানায় নিয়োজিত কারিগরদের সরকারি কোষাগার থেকে বেতন দেওয়া হতো।জঙ্গল পরিষ্কার ও বন্যপ্রাণী হত্যার জন্য পশুপলক ও শিকারীদের ভাতা দেওয়া হতো। ব্রাহ্মণ ও শ্রমণরা রাজকোষ থেকে অর্থলাভ করতেন।

জলসেচ,পথঘাট নির্মাণ, বিশ্রামাগার ও হাসপাতাল স্থাপন ইত্যাদি জনহিতকর কাজেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হতো। শিল্পসৌধ নির্মান এবং সংরক্ষণ, ধর্মপ্রচার ইত্যাদি কাজেও অর্থব্যয় করা হতো। গরীব দুঃখীকে সাহায্য দান এবং দুর্ভিক্ষজনিত দুর্দশা মোচনেও সরকারি অর্থ ব্যয় করা হতো।

চন্দ্রগুপ্তের শেষ জীবন ও মৃত্যু

জৈন কাহিনী অনুসারে রাজত্বের শেষভাগে উত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুকে অনুসরণ করে মহীশুরে চলে যান। মহীশুরের অর্ন্তগত শ্রাবণবেলগোলায় ২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জৈন বিধি অনুসারে অনাহারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রাণত্যাগ করেন।

সংক্ষেপে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাশনানল ও জীবন

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলে ভারতে তাঁর অধিকৃত অঞ্চলে গ্রিক গভর্নরদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ সময়ে মগধে নন্দবংশীয় সম্রাট ধননন্দ রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে জনগণ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রথমে ধননন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসন আরোহণ করেন। অতঃপর তিনি গ্রিকদের বিতাড়িত করে ভারতে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ কাজে তিনি তক্ষশীলার ব্রাহ্মণপন্ডিত কৌটিল্যের সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যই ইতিহাসে মৌর্য সাম্রাজ্য নামে বিখ্যাত।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শুধু দক্ষ যোদ্ধা ও বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি একজন সফল প্রশাসকও ছিলেন। অধীনস্ত সাম্রাজ্যকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি একটি সুবিন্যস্ত শাসনব্যবস্থাও প্রবর্তন করেন, যা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক— এই দুভাগে বিভক্ত ছিল। সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেও রাজাকে কিছু প্রাচীন বিধিনিষেধ মেনে চলতে হতো। জৈন কাহিনী অনুসারে রাজত্বের শেষভাগে উত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে একদল জৈন ভিক্ষুর সাথে মহীশুরে চলে যান।২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শ্রাবণবেলগোলায় জৈন বিধি অনুসারে অনাহারে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

[ড. আবদুল মমিন চৌধুরী, মোকাদ্দেসুর রহমান ও আকসাদুল আলম লেখকত্রয়ের ‘উপমহাদেশ ও বাংলার ইতিহাস: আর্য থেকে ১৫২৬’ নামক গ্রন্থ থেকে নিবন্ধটি সংগৃহীত। বইটি ২০০১ সালে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। এই নিবন্ধটি বিশ্লেষণ টিম ওয়েবসাইটের পাঠক চাহিদার প্রয়োজনে কিছু জায়গায় সংযোজন ও বিয়োজন করেছে এবং শৈলীতে পরিবর্তন এনেছে, তবে মূল তথ্যের পরিবর্তন করেনি]

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।