সোমবার, জুলাই ৪, ২০২২

ভারতের সবচেয়ে বড়ো জাদুঘর ভারতীয় জাদুঘরের ইতিহাস

ভারতীয় জাদুঘরের সংগ্রাহকরা ছিলেন ইউরোপীয় এবং একমাত্র ভারতীয় সংগ্রাহক ছিলেন বাবু রামকমল সেন।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্য কলকাতায় অবস্থিত ভারতীয় জাদুঘর (The Indian Museum) হলো ভারতের বৃহত্তম জাদুঘর। ১৮১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাদুঘর এবং জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটর ছিলেন ড্যানিশ উদ্ভিদতত্ত্ববিদ বা বোটানিস্ট ড. নাথানিয়েল ওলফ ওয়ালিচ (Nathaniel Wolff Wallich)। ভারতীয় জাদুঘর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জাদুঘর।

কলকাতা শহরের জওহরলাল নেহরু সড়কে অবস্থিত ভারতীয় জাদুঘর হলো প্রধানত সাংস্কৃতিক ও বিজ্ঞান বিষয়ক জাদুঘর। এই জাদুঘরটির মোট ছয়টি বিভাগ রয়েছে। ভারতীয় জাদুঘরের বিভাগগুলো হলো

  • শিল্পকলা বিভাগ
  • পুরাতত্ত্ব বিভাগ
  • নৃতত্ত্ব বিভাগ
  • ভূতত্ত্ব বিভাগ
  • প্রাণীতত্ত্ব বিভাগ
  • অর্থনৈতিক উদ্ভিজ্জ বিভাগ।

ভারতীয় সংবিধানের সপ্তম তফসিলে ভারতীয় জাদুঘরকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’-এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং এটি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পরিচালনাধীন। জাদুঘরটির ওয়েবসাইট https://www.indianmuseumkolkata.org/। 

ভারতীয় জাদুঘরের ইতিহাস

এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা ও জমি

স্যার উইলিয়াম জোন্স (Sir William Jones) ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল (The Asiatic Society of Bengal) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৯৬ সালে এই সোসাইটির সদস্যরা মানুষের তৈরি বস্তু ও প্রাকৃতিক সামগ্রী নিয়ে একটি জাদুঘর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮০৮ সালে জাদুঘর তৈরির কাজ শুরু হয়; একই বছরে জাদুঘর তৈরির জন্য ভারত সরকার সোসাইটিকে চৌরঙ্গী অঞ্চলে জন্য জমি দেয়।

ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচের চিঠি

এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা যে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার সমর্থন জানিয়ে ১৮১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সোসাইটির প্রতি ডাচ উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে ওয়ালিচ জাদুঘরে দুটি বিভাগ থাকা উচিত বলে নিজের মতামত জানান, এটিকে এক ধরনের সুপারিশও বলা যায়। ড. ওয়ালিচ যে বিভাগের কথা বলেন সেগুলোর একটি ‘পুরাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত’ এবং অপরটি ‘ভূতাত্ত্বিক ও প্রাণিতাত্ত্বিক’। ড. ওয়ালিচ তাঁর নেই নিজের সংগ্রহের কিছু সামগ্রীও জাদুঘরে দান করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন। সোসাইটি ড. ওয়ালিচের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল।

প্রথম কিউরেটর ড. ওয়ালিচ

ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ ছিলেন ভারতীয় জাদুঘরের প্রথম সাম্মানিক পরিচালক (কিউরেটর) নিযুক্ত করা হয়।  জুন ১, ১৮১৪ তারিখ ড. ওয়ালিচ ভারতীয় জাদুঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন; এর পূর্বে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রাচ্য জাদুঘরের সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর থেকে ড. ওয়ালিচের  উৎসাহেই জাদুঘরের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাঁর জন্যেই এই জাদুঘর আজ এত বড়ো হয়েছে বলে বেশিরভাগ লোকের মত।

ভারতীয় জাদুঘরের সংগ্রাহক

ভারতীয় জাদুঘরের সংগ্রাহকরা ছিলেন ইউরোপীয় এবং একমাত্র ভারতীয় সংগ্রাহক ছিলেন বাবু রামকমল সেন। বাবু রামকমল সেন পরবর্তীতে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের ভারতীয় সচিব হয়েছিলেন।

ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ ভারতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সময় জাদুঘরকে সবচেয়ে বেশি সামগ্রী দান করেছিলেন।

১৮১৬ সাল পর্যন্ত জাদুঘরে দান করা ৭৪টি সামগ্রীর মধ্যে ৪২টি ছিল উদ্দিজ্জ।

বেতনে কিউরেটর নিয়োগ ও সরকারি অনুদান

ড. ওয়ালিচ পদত্যাগ করার পর মাসিক ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেতনে কিউরেটর নিয়োগ শুরু হয়। ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটি এই বেতন দিত। এরপর সোসাইটির ব্যাংকার ‘পামার অ্যান্ড কোম্পানি’ দেউলিয়া হয়ে গেলে তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক পরিচালিত সরকার বেতন দিতে শুরু করে।

জাদুঘর ও গ্রন্থাগারের রক্ষনাবেক্ষণের জন্য মাসিক ২০০ টাকা অনুদান দেওয়া শুরু হয়। ১৮৪০ সালে সরকার জাদুঘর ভূতাত্ত্বিক ও খনিজ সংগ্রহ বিভাগ চালুর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে আরও ২৫০ টাকা মাসিক অনুদান দিতে শুরু করে শুধু ভূতত্ত্ব বিভাগের জন্য। 

ভারতীয় জাদুঘরের নতুন স্থাপনা

যেহেতু জাদুঘরের সামগ্রী দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেহেতু এর জন্য একটি নতুন স্থাপনার প্রয়োজন হয়। ১৮৭৫ সালে ১,৪০,০০০ টাকা ব্যয়ে এই নতুন স্থাপনার তৈরি হয়। স্যার টম হল্যান্ডের (Sir Tom Holland) পরামর্শে ভারতীয় জাদুঘরের এই স্থাপনার নকশা করেন ওয়াল্টার এল. গ্র্যানভিল (W L Granville)। ১৮৭৯ সালে সাউথ কেনসিংটনের ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের সংগ্রহের একাংশ এই জাদুঘরে আসে।

১৯১৬ সালে জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অনুদানে জাদুঘরে প্রাণিতত্ত্ব এবং ১৯৪৫ সালে অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অনুদানে নৃতাত্ত্বিক বিভাগ চালু হয়।

আহমেদ মিন্টো
মিন্টো একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং বিশ্লেষণ'র কন্ট্রিবিউটর।

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

পাঠ পরিকল্পনা: পাঠ পরিকল্পনার সংজ্ঞা এবং হার্বার্টের পঞ্চসোপান ও আধুনিক ত্রিসোপান

শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে তা শেখানো হবে এবং কীভাবে শিখন মূল্যায়ন করা হবে সে সম্পর্কে শিক্ষকের দৈনন্দিন নির্দেশনা হলো পাঠ পরিকল্পনা