সোমবার, জুলাই ৪, ২০২২

ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ কেন সংঘটিত হয় এবং ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী?

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ ছিল বাঙালিদের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে কিংবা তারও আগ থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ফকির-সন্ন্যাসীদের বিচরণ ছিল, যাদের একটি বড়ো অংশ ছিল বাংলার অধিবাসী। এরা এমন এক অধিবাসী দল ছিল যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের নারী ও পুরুষ। ফকির-সন্নাসীররা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী সাধনায় সিদ্ধি লাভের জন্য সারা বছর দেশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়াত। ফকির-সন্নাসীরা কখনোই ইহলোক নিয়ে খুব একটা চিন্তা করেনি এবং এরা ধর্মচর্চা কিংবা নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চায় নিজেদের ব্যস্ত রাখত। অথচ সেই ফকির-সন্নাসীরা এক সময় নিজেদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়; তারা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কিন্তু কেন ফকির-সন্নাসীরা বিদ্রোহী হয়ে পড়ে এবং কী এমন ঘটেছিল যার জন্য তারা অস্ত্র ধারণ করেছিল। 

১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ বা আন্দোলন চলেছিল।

ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহের কারণ

বাংলায় ধর্মীয় সম্প্রদায় বলে পরিচিত এবং যাদের এই পৃথিবীতে বিশেষ কোনো চাহিদা ছিল দুই বেলা খাবার ছাড়া সেই ফকির-সন্ন্যাসীরা কেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছিল? কেন ফকির-সন্নাসীরা বিদ্রোহ করেছিল ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে?

আঠারো শতকের শেষার্ধে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের শুরু। এই বিদ্রোহ শুরুর পূর্বে নবাব মীর কাশিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসীদের সাহায্য চান এবং সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীরা নবাবের পক্ষে যুদ্ধ করে। ওই যুদ্ধেরম নবাব কাশিম পরাজিত হয় এবং জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যায়। তবে নবাব পালিয়ে গেলেও ফকির-সন্ন্যাসীরা তাদের ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। 

নবাবকে সাহায্য করার কারণে ইংরেজরা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা ফকির-সন্ন্যাসীদের গতিবিধির প্রতি কড়া নজর রাখতে থাকে। বাংলার ফকির-সন্ন্যাসীরা তাদের রীতি অনুযায়ী ভিক্ষাবৃত্তি বা মুষ্টি সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। ধর্মীয় উৎসব, তীর্থস্থান দর্শন উপলক্ষে সারা বছর তারা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়াত। যুদ্ধে নামার পর থেকে তাদের সাথে নিরাপত্তার জন্য নানা ধরনের হালকা অস্ত্র থাকত। বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত তারা ছিল স্বাধীন এবং মুক্ত। কিন্তু ইংরেজ সরকার তাদের অবাধ চলাফেরায় বাধার সৃষ্টি করতে থাকে। 

তীর্থস্থান দর্শনের উপর কর আরোপ করে এবং ভিক্ষা ও মুষ্টি সংগ্রহকে বেআইনি ঘোষণা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাছাড়া ফকির-সন্নাসীদেরকে ডাকাত ও দস্যু বলে আখ্যায়িত করতে থাকে। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ফকির সন্ন্যাসীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। 

বিদ্রোহী ফকির দলের নেতার নাম ছিল ফকির মজনু শাহ এবং সন্ন্যাসীদের নেতার নাম ছিল ভবানী পাঠক। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি কুঠি, জমিদারদের কাছারি ও নায়েব-গোমস্তার বাড়ি।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ফকির ও সন্নাসী বিদ্রোহ ছিল বাঙালিদের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সন্ন্যাসীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ শুরু করে। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে ফকির মজনু শাহ সারা উত্তর বাংলায় ইংরেজ বিরোধী তৎপরতা শুরু করেন। ১৭৭৭ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের তীব্রতা ছিল উত্তর বঙ্গে। এই সব অঞ্চলে ইংরেজদের সঙ্গে বিদ্রোহী ফকির-সন্ন্যাসীদের বহু সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এ সব সংঘর্ষে বিদ্রোহীরা অনেক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে এবং কোম্পানির বহু কুঠি লুট করে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ ছিল বাঙালিদের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ ছিল বাঙালিদের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন।

ফকির মজনু শাহর যুদ্ধ কৌশল ছিল গেরিলা পদ্ধতি, অর্থাৎ অতর্কিতে আক্রমণ করে নিরাপদে সরে যাওয়া। ইংরেজদের পক্ষে তাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা কখনোই সম্ভব হয়নি। ফকির মজনু শাহ ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যবরণ করেন। মজনু শাহর মৃত্যুর পরে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মুসা শাহ, সোবানশাহ, চেরাগ আলী শাহ, করিম শাহ, মাদার বক্স প্রমুখ ফকির। এই নেতারা কয়েক বছর ইংরেজ প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। অপরদিকে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা ভবানী পাঠক ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের নেতৃত্বে একদল ব্রিটিশ সৈন্যের আক্রমণে দুই সহকারীসহ নিহত হন। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন তিনি। ফলে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অবসান ঘটে।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ব্যর্থতা হওয়ার কারণ

কেন ব্যর্থ হয়েছিল ১৭৬০ সালে শুরু হওয়া সন্নাসীদের আন্দোলন এবং ১৭৭১ সালে শুরু হওয়া ফকিরদের আন্দোলন? উত্তরে খুব সহজেই বলে দেওয়া যায় যে, ব্রিটিশ বিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন যে সব কারণে ব্যর্থ হয়েছিল সে সবের মধ্যে মূল কারণ ছিল সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং দুর্বল নেতৃত্ব। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ফকির ও সন্ন্যাসীদের ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দৃঢ় নেতৃত্বের অভাব, এটা সবাই স্বীকার করেন। তবে ফকির মজনু শাহকে এই বিদ্রোহে হারানো যায়নি।

ফকির মজনু শাহর মৃত্যুর পরে ফকিরদের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দল ক্রমশঃ আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়। ফকির-সন্ন্যাসীরা কোনো এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিল না। ফলে বিদ্রোহীরা স্থানীয়দের সহযোগিতা সহানুভূতি পেতে ব্যর্থ হয়। অস্ত্র, রণকৌশল সবদিক দিয়ে তারা ইংরেজ সৈন্যদের সমকক্ষ ছিল না। ফলে ফকির সন্ন্যাসীরা ইংরেজদের উন্নত, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, রণকৌশল, সামরিক প্রযুক্তি এবং বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে প্রাণপণ লড়াই করেও হেরে যায়।

উপসংহার

ফকির সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বনের উপর কোম্পানি হস্তক্ষেপের কারণে তারা তাদের সনাতন অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এ অবস্থায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই তারা ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। এই সংগ্রাম ব্যর্থ হলেও, ইংরেজ শাসকদের নির্যাতনমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বাংলার সাধারণ নিঃস্ব মানুষের পক্ষ থেকে এটাই ছিল প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ।

আহমেদ মিন্টো
মিন্টো একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং বিশ্লেষণ'র কন্ট্রিবিউটর।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

পাঠ পরিকল্পনা: পাঠ পরিকল্পনার সংজ্ঞা এবং হার্বার্টের পঞ্চসোপান ও আধুনিক ত্রিসোপান

শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে তা শেখানো হবে এবং কীভাবে শিখন মূল্যায়ন করা হবে সে সম্পর্কে শিক্ষকের দৈনন্দিন নির্দেশনা হলো পাঠ পরিকল্পনা